জীবনে দৃষ্টিভঙ্গির আনন্দ -রুমী ফেরদৌস

দৃষ্টিভঙ্গি জীবনে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দৃষ্টিভঙ্গিই পরিচালিত করে একজন মানুষকে। এর আলোকেই পথ চলে মানুষ। মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস জড়িয়ে আছে এর সাথে। জড়িয়ে আছে উন্নতি ও অগ্রগতির অভিমুখ। জীবনকে নির্মাণ করতে হয়, প্রস্তুত করতে হয় ভবিষ্যতের জন্য। এ ক্ষেত্রেও রয়েছে দৃষ্টিভঙ্গির আশ্চর্য ভূমিকা। জীবনের সামগ্রিক বাঁক-প্রতিবাঁকে জাগ্রত থাকে দৃষ্টিভঙ্গির চোখ।
জীবনকে জীবনের কাছে পৌঁছে দেয়ার আকাক্সক্ষা থাকে যাদের, তারা জানে জীবন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়, কম দামি কোনো বিষয় নয়। হেলাফেলা কিংবা খেলার বিষয়ও নয়। নয় যেনতেনভাবে খরচ করে দেয়ার মতো কোনো কিছু। জীবন মহান স্রষ্টার এক অসাধারণ দান।
এ কারণে একে নির্মাণ করতে হয়। প্রস্তুত করতে হয়। শিল্প সুন্দরে করে তুলতে হয় অনুকরণীয়। করে তুলতে হয় দৃষ্টান্তমূলক। পৃথিবীর বুকের ওপর প্রবাহিত বাতাসের কাছে থাকে জীবনের ঋণ। রোদের উষ্ণতার কাছে ঋণ থাকে। ঋণ থাকে বৃষ্টির শীতলতার কাছে। বৃক্ষের প্রাণবন্ত সজীবতার কাছে আছে জীবনের ঋণ। নদীর বহতা গতি এবং সীমাহীন আকাশের শূন্যতার কাছে ঋণী জীবন।
প্রতিনিয়ত প্রকৃতির হৃদয় থেকে গ্রহণ করছে জীবন। মুহূর্তে মুহূর্তে প্রকৃতির কাছে ঋণী হয়ে উঠছে সে। সব থেকে বড় ঋণ এসব কিছুর স্রষ্টার কাছে। এ ঋণ শোধ দেয়ার দায় থাকে মানুষের। এ দায় থেকে আসে দায়িত্ব। দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গ এলেই বিচার বিবেচনা শাণিত হয়। বিচার বিবেচনা তখনি শাণিত হয়, যখন স্বচ্ছ থাকে দৃষ্টির চোখ। সত্য-মিথ্যার ব্যবধানকারীর নাম হলো বিবেক। বিবেকই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ বিচারক। বিবেক কাজ করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখায়।
দৃষ্টি যখন সত্যকে সত্য এবং মিথ্যাকে মিথ্যা দেখে তখনই কাজ করে বিবেক। তা-ই নির্ণয় করে দৃষ্টি। সত্যের জায়গায় কখনো মিথ্যাকে প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে না বিবেক। করবে না কারণ বিবেক যখন স্বচ্ছতায় জাগ্রত থাকে তখন সে থাকে স্বাধীন। সীমাহীন আকাশের বুকে ভেসেচলা পাখির মতো সে। মুক্তবিহঙ্গের আনন্দে সে বসত করে মানুষের ভেতর। মানুষ তাকে কালিমালিপ্ত না করলে সে থাকে পূত-পবিত্র। যত অবিচার, অন্যায় ও অসঙ্গত পরিবেশ হোক সে থাকে ন্যায়ের পক্ষে। তার চোখ সত্যের শরীরে থাকে নিয়ত জ্যোতির্ময়। বিবেককে দলিত করেই অন্যায় আচরণ করে মানুষ। এখানেও দৃষ্টির কাজ। এখানেও দৃষ্টিভঙ্গি মানুষকে পথ দেখায় ও শেখায়। দৃষ্টি যখন ন্যায় অন্যায়ের ব্যবধান মানে না। যখন অপরাধকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে না তখনই বিবেক নিভে যায়। ঘুমিয়ে যায় বিবেকের সব চোখ। ক্রমাগত দলিত হতে হতে বিবেক এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়। হারিয়ে যায় মনুষ্যত্বের ছাপ। তখন পাশবিক আচরণ করে মানুষ। কিন্তু মানুষ কি পশু হতে পারে? না পারে না। সৃষ্টিগতভাবেই পাশবিকতা নিয়েই পশুর জীবন কিন্তু মানুষ, সৃষ্টির গভীরতায় সে শ্রেষ্ঠ। প্রাণিকুলের ভেতর মানুষ আলাদা। মানুষ মর্যাদার অধিকারী। মানুষ সম্মানীয়। মানুষই প্রেরণা ও প্রার্থনার আয়োজন করে। মানুষই নির্মাণ করে জীবনের নান্দনিক বাগান। সে মানুষ যখন মানুষ থাকে না তখন সে পশুর অধম। তখন সে বন্য জন্তুর থেকে নিকৃষ্ট।
একজন মানুষের যখন বিবেক ধ্বংস হয়ে যায় তখন সে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। জীবন ও জগতের নান্দনিক অনুভূতি তার বোধের ত্রিসীমানায় থাকে না। বীভৎসতার লীলায় সে হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। তার বিপদ তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের জন্য হয়ে যায় ঝুঁকি। সমাজের জন্য অনিরাপদ এবং রাষ্ট্রের জন্য ধ্বংসাত্মক।
মানুষের জীবন জাগানিয়া স্বপ্নের গান গাইবার আকাক্সক্ষা থাকা চাই। চাই জীবনকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার উন্নত মানসিকতা। এমন চেতনাই মানুষকে ন্যায়-অন্যায়ের পথ চিনিয়ে দেয়। চিনিয়ে দেয় কোথায় তার ব্যবধান। সত্যের রঙ দেখিয়ে দেয়। জাগিয়ে দেয় সত্যের অনুভূতি। যা একজন মানুষকে ক্রমাগত সাজিয়ে নিতে চায় সুন্দরের ঔদার্যে।
সর্বাঙ্গীণ সুন্দরের সাধনা করে যেতে হয় মানুষকে। পোশাকে-আশাকে যেমন, তেমনি চিন্তা-চেতনায়, তেমনি চলনে বলনেও। সুন্দরের কথা ভাবা, সুন্দরকে চিন্তা করা এবং সুন্দরকেই ধারণ করার দৃষ্টি অর্জন করা একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিষয় সম্পর্কে মানুষ যে দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তা-ই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। তা-ই ভাবে এবং শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তে দাঁড়ায় তাও তার দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। দৃষ্টির শাণিত তীক্ষèধারা একজন মানুষকে নিয়ে যায় জগতের গৌরবময় অধ্যায়ের দিকে। সাফল্যের সৌরভে ভরে দেয় সব। যে মানুষ সুন্দরে সাজিয়ে তোলে নিজেকে, তিনি হয়ে যান দৃষ্টান্ত। মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায় তার কাছে। তার কাছে গেলে আরামবোধ করে মানুষ। প্রশান্তি খুঁজে পায় মনের গভীর থেকে। নিজেকে ভাববার মানসিকতা জন্ম নেয়। ভাবেও মানুষ। ভাবে কিভাবে নিজেকে আরো গুছিয়ে নেয়া যায়, কিভাবে সুন্দরের সান্নিধ্য পাওয়া যায় এবং কিভাবে সাফল্যের দিকে ছোটা যায়। এভাবে বৃক্ষের ছায়ার স্নিগ্ধতার মতন আনন্দে আপ্লুত হয় মানুষ। মানুষের এ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে পারিপার্শ্বিক আবহে। বাতাস তখন সংবাদ বয়ে নিয়ে যায় দূর থেকে দূরান্তরে।
এভাবে মানুষ হয়ে ওঠে মানুষের মধ্যে অনন্য। মানুষ হয়ে ওঠে মানুষের অনুকরণীয়। একজনকে দেখে জাগ্রত হয় হাজার জন। একজন মানুষের স্বপ্ন বয়ে বেড়ায় হাজার হাজার মুখ। যিনি স্বপ্ন দেখেন এবং অন্যকে দেখান তিনি তো স্বপ্নেরই রাজা। তার রাজ্যজুড়ে মানুষেরা তাকেই অনুসরণ করবে। তাকে মানবে আইকন। তাকেই ভাববে জীবনের অগ্রপথিক। স্বপ্ন সাজিয়ে নেয়ার এবং সাজিয়ে দেয়ার কর্তব্য থাকে এসব মানুষের ওপর। এসব মানুষ শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকেন না। তারা বেঁচে থাকেন অন্যের, সমাজের এবং দেশের জন্য। বলা যায়- বিশ্বের জন্য। ফলে এরা দেশকালের ঊর্ধে বিশ্বের সম্পদ হয়ে যান। বিশ্ব মানবের প্রতি থাকে এদের উদাত্ত আহ্বান। কোনো গোষ্ঠীর জন্য এরা সুন্দর চর্চা করেন না। কোনো সীমাবদ্ধ ভূগোলের জন্যও নয়। এরা বিশ্বজগতের দিকে চেয়ে থাকেন। বিশ্ব মানবের দিকে এদের বিচরণ এবং বিশ্বজগৎই থাকে এদের আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।
একজন মানুষ ইচ্ছে করলেই তার সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে সীমাহীনতার ভেতর নিজেকে জাগ্রত রাখতে পারেন। সীমাহীন সুন্দরের সান্নিধ্যে পৌঁছাতে পারেন। ধারণ করতে পারেন অসীম আনন্দের উৎসব। এসব উৎসবে শুধু নিজে নয়, হাজির করাতে পারেন তার সমাজকে, তার দেশ জাতিকে এবং বিশ্বমানবকে।
মানুষ যা ভাবে তা-ই তো সে। নিজস্ব ভাবনার মতোই নিজে। ভাবনার জগৎই তার জগৎ। ভাবতে ভাবতেই মানুষ প্রস্তুত করে নিজেকে। এ প্রস্তুতির ভেতরই সে আবিষ্কার করে তার নিজস্ব জগৎ। তার একান্ত পৃথিবী। যে পৃথিবী কেবলই তার। যে পৃথিবীতে বিচরণ তার অনিবার্য হয়ে ওঠে। যে পৃথিবী হয়ে ওঠে তার সুখ-দুঃখের বাতিঘর। এই পৃথিবীকে ঘিরেই তার জীবনের সব। তার এ পৃথিবী জ্যোতির্ময়। জোছনা জোয়ারে প্লাবিত তার এ পৃথিবী। সমাজ ও দেশকে এ জ্যোতি জোছনায় জাগিয়ে দেয়ার স্বপ্ন আঁকেন তিনি। তিনি মানুষকে দেখিয়ে দিতে চান কত নিরাময় তার পৃথিবী। কত নন্দনে উচ্চকিত তার জগৎ। তার নিকটবর্তী হলেই সুঘ্রাণ পেয়ে যায় মানুষ। মানুষ তার স্বপ্নের সৌরভে মুদ্রণ করে জীবনগ্রন্থ। সে গ্রন্থ একবার প্রস্তুত হলে মহাকাল তাকে রেখে দেয় বুকের ভেতর। কাল পরিক্রমায় তার কোনো পরিশেষ নেই। কাল থেকে কালান্তরে তার অভিযাত্রা থাকে অব্যাহত। মহাকালের শরীরজুড়ে তার জন্য থেকে যায় স্মৃতির মিনার। যে মিনার কেবলই তার নকশা বহন করে। তার কথাই বলে কাল এবং মহাকালকে।
পৃথিবীর বুকে একবারই একটি জীবন পায় মানুষ। এই একটি জীবন কি যে গুরুত্বপূর্ণ, কি যে মর্যাদার সে কথা ভাবতেই হয়। কেবল একবারই যে জীবন মেলে পৃথিবীতে তাকে যতœআত্তি করার বিষয়ে কেন থাকবে আলস্যের ধুম। কেন তাকে হতে হবে অবহেলার শিকার। খেলার আসরের মতো তো জীবন নয়। জীবন কেবলই জীবনের মতো। জীবনের সাথে চলে না আর কোনো উপমা। অথবা তুলনা। এই যে তুলনাহীন জীবন। একে নির্মাণ করার দায়িত্ব নিতে হয় জীবনের যিনি বাহক তাকেই। সাজিয়ে গুছিয়ে তাকেই বলতে হয় জীবন আমার তুমি সঙ্গেই থাকো, সঙ্গেই রাখো আমাকে। আমি সম্মান করি তোমাকে। তোমাকে মর্যাদার ভাবি। তোমাকে মান্য করি সানন্দে।
জীবন আমাকে দিয়েছে বিশ্বজগতের সৌন্দর্য। এই বৃক্ষ, ফুল, পাখি, নদী ও আকাশ দেখার। যার বুকে ফোটে জোছনার মতো মায়াবী রাত। ফোটে অজস্র প্রাচীন নক্ষত্রের মুখ আর ফোটে সূর্যের মতো আশ্চর্য আলোর প্রদীপ।
জীবনের পাতাজুড়ে বহমান সময়ে ফোঁটা ঝরছে। ঝরে ঝরে সরে যাচ্ছে দূর থেকে অতি দূরে। এভাবে ঝরে যাওয়া সময়ের নাম অতীত। অতীত নামক সময় সমুদ্রেই ডুবে থাকে আমাদের ফেলে আসা জীবন। আমরা ফিরে দেখি। দেখে দেখে ভাবি। ভাবতে ভাবতেই আমরা ছুটে যাই ভবিষ্যতের দিকে। এ ভবিষ্যই ধেয়ে আসে বর্তমানের সামান্য ঠিকানায়। এ ঠিকানা ছুঁয়ে চলে যায় সময় পাখি। উড়ে যায় অতীত বনে।
আহা-রে জীবন এভাবেই ক্ষয়ে যায় তার শরীর। এভাবেই সে ধীরে ধীরে ফিরতে থাকে অতীতের দিকে। আর অতীত হয়ে যায় অন্তরালের আঁধার। যে আঁধার লুকিয়ে রাখে হারিয়ে যাওয়া জীবনের সব প্রাণ।
তাহলে জীবনকে যতটুকু নির্মাণ করা যায় করতেই হবে। করতে হবে আপন স্বার্থেই। কারণ নিঃশেষ হবেই তো সে। যে নিঃশেষ হয় তাকে অনিঃশেষের আনন্দে জাগাতে হয়। জাগাতে হয় চিরন্তন সুন্দরের সৌহার্দ্য। তবেই জীবন হয়ে ওঠে অমরত্বের শিখা। যা জ্বলতেই থাকে চিরকাল। যা আলো বিলাবে পৃথিবীর পথিককে। আর এসবই জোগাড় করে দৃষ্টিভঙ্গির আনন্দ। হ

SHARE

Leave a Reply