জীবন স্রোতে আবদুল মান্নান তালিব -তৌহিদুর রহমান

ছুটে চলা নদী, বয়ে যাওয়া স্রোত- বয়ে চলা জীবনের স্মৃতি; চলমান জীবনের পথপরিক্রমায় প্রতিটি বাঁকে বাঁকে কত না স্মৃতিচিহ্ন সময়ের আর্শিতে ক্রমেই বিবর্ণ হয়ে যায়। তবুও জীবন চলার পথে এমন কিছু স্মৃতিচিহ্ন থাকে যা কখনো অনুজ্জ্বল হয় না। প্রায় দীর্ঘ পঁচিশ বছর আমি আবদুল মান্নান তালিবের সাথে পথ চলেছি- এই পঁচিশ বছরের কত শত স্মৃতিই না আজ মনের জানালায় উঁকি দিচ্ছে। এর কোনটা সাতরঙা রঙিন। আবার কোনটা সব রঙের মিশ্রণ-গাঢ় অন্ধকার। জীবনের এই রঙ্গমঞ্চে তার সবটুকু হয়ত স্বপ্নময় ক্যানভাসে পরিপূর্ণভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে না। তবুও স্মৃতির মিনার সত্যের আলোয় সমুজ্জ্বল রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা থাকবে আমার।
৭১ নিউ এলিফ্যান্ট রোড। পুরনো বিআইসির অফিস। চিরচেনা এ.কে.এম নাজির আহমদ, হারিয়ে যাওয়া সিদ্দীক জামাল, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, কবি আসাদ বিন হাফিজ, এ.কে.এম শরীফুর রহমান, বদরুল আলম, আব্দুল হামীদ, শেখ আহমদ, আবদুর রহিম আরো অনেকে। অতিথি কবি মহারসিক আবদুস সাত্তার, সোনালী কাবিনের কবি আল মাহমুদ, এক পশলা বৃষ্টির কবি মাহবুবুল হক, সোনালি শাহজাদার কবি সাজজাদ হোসাইন খান, কবি বুলবুল ইসলাম, কবি সোলায়মান আহসান, কবি বুলবুল সরওয়ার, কবি হাসান আলীম, কবি গোলাম মোহাম্মদ, কবি মোশাররফ হোসেন খান প্রমুখ একঝাঁক সোনালি সূর্যের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ আল্লামা আবদুল মান্নান তালিব। মাথাভর্তি কুচকুচে কালো চুল। মুখে ঘন কালো দাড়ি। চেহারাও কালো। তবে হৃদয়জুড়ে ছিল অসম্ভব রকমের মায়াবী আলো। যে আলোর বিচ্ছুরণ বহু দূর থেকে অনুভব করা যেত। সেজন্য সেই আলোর আকর্ষণে তাঁর চারপাশে এত পতঙ্গের মেলা বসেছিল।
বিশিষ্ট এই ইসলামী চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবদুল মান্নান তালিব ২২ সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে ছিয়াত্তর বছরে ইন্তেকাল করেছেন। এটা তার অষ্টম মৃত্যু দিন। এই মহান ব্যক্তিত্ব সারা জীবন মুসলমানদের কল্যাণ ও ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতিষ্ঠা প্রচার ও প্রসারে অতিবাহিত করেছেন। স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য নিজের নামের শেষে তিনি যুক্ত করেছিলেন ‘তালিব’। এই তালিব শব্দের অর্থ-গবেষণাকারী, সন্ধানী, অন্বেষণকারী, তালাশকারী। নিজের ধর্ম, ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় ও সত্যের সন্ধানে পুরোটা জীবন ব্যয় করে তিনি ‘তালিব’ নাম ধারণকে অর্থবহ ও সার্থক করে তুলেছিলেন। তাঁর গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে বাঙালি মুসলমান অনেকেই পেয়েছে সঠিক দিকনির্দেশনা। তাঁর চিন্তা-চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে পূর্ণতা পেয়েছে অজস্র মুসলমানের জীবন। ধন্য হয়েছে অনেকেই। তাঁর লেখার মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা রূপে ইসলাম উপস্থাপিত হয়েছে।
আবদুল মান্নান তালিব বিরল প্রতিভাধর একজন মানুষ। সারা দুনিয়াতে আবদুল মান্নান তালিব একজনই ছিলেন। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। এমন বহুমুখী গুণের সমাবেশ সচরাচর পরিলক্ষিত হয় না। তিনি অবশ্যই একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। একই সাথে কুরআন, হাদিস, ফেকাহ, আইন, ইতিহাস, আন্তঃধর্ম, সাহিত্য, ইসলামি সাহিত্য, কবিতা, ছন্দ ইত্যাদি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখেন এমন ব্যক্তিত্ব দুনিয়াতে খুব কমই আছেন। তিনি নামের দিক থেকে যেমন একক ও অনন্য, কাজের দিক থেকেও তেমনি অনন্য।
তিনি ছিলেন কুরআন-হাদিসে সুবিজ্ঞ এবং সাহিত্য সাধনায় পথিকৃৎ। একাধারে তিনি আল কুরআন ও হাদিস অনুবাদের পাশাপাশি ইসলামী নানা বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি শিশুদের মানসগঠন যেভাবে ইসলামী ভাবধারার সাহিত্য রচনা করেছেন তা সত্যিই অতুলনীয়। ইসলামী ভাবধারার সাহিত্য কেমন হবে তার দিকনির্দেশনামূলক মূল্যবান গ্রন্থও রচনা করেছেন। বিভিন্ন সাহিত্য ও গবেষণামূলক পত্র-পত্রিকাও তিনি সার্থকভাবে সম্পাদনা করেছেন। তিনি লাহোরে থাকাকালীন একটি উর্দু দৈনিক পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। পত্রিকা সম্পাদনার পাশাপাশি সমকালীন বিষয় ও যুগ জিজ্ঞাসামূলক বহু নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তার বিষয়ে পরিপূর্ণ গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখা এখন সময়ের দাবি। আমি এখানে শুধু তাঁর ব্যক্তিজীবনের সংক্ষিপ্ত কিছু পরিচিতি পাঠকের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরলাম।
ব্যক্তিজীবনে রঙতুলির মতো একটা মোলায়েম কম্বিনেশন ছিলেন আবদুল মান্নান তালিব। রাস্তা দিয়ে যখন হাঁটতেন তখন চারদিকে রঙধনুর সাত রঙের একটা মধুর আস্তরণ ছড়িয়ে পড়তো। সে আভায় কখনো চোখ ধাঁধিয়ে যেতো না আবার তা চোখ জুড়েও থাকতো না। তা সহসায় ছড়িয়ে পড়তো মনের পরতে পরতে। এতই আস্তে হাঁটতেন যেন মাটিও টের পেত না। তিনি মহাজীবন ব্যবস্থার প্রতিটি আদেশ নিষেধ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলার চেষ্টা করতেন। সে কারণে তিনি কখনো মাটিতে দম্ভভরে পা ফেলতেন না। পথের দাবি যতটা সম্ভব আদায় করে চলতেন। সবার আগেই পরিচিত অপরিচিত পথিকের দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি কামনা করতেন। মানে প্রথমেই সালাম বলতেন। সালাম সম্পর্কে আবদুল মান্নান তালিবের লেখা, ‘আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের খুব বেশি বেশি করে সালাম করতে বলেছেন। ছোটদের একটা লেখায় তিনি বলেছেন, বেশি বেশি করে সালাম করলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা বাড়বে। প্রিয় নবীর (সা) সাহাবাগণ তাঁর একথাটি মনের মধ্যে গেঁথে নিয়েছিলেন। প্রিয় নবীর (সা) দেখাদেখি সাহাবাগণ বড় ছোট সবাইকে সালাম করতেন। প্রিয় নবী (সা) পথে কোথাও ছোট ছেলেমেয়েদের খেলা করতে দেখলে তাদেরকেও সালাম করতেন। জবাবে তারাও তাঁকে সালাম করতো।’ আবদুল মান্নান তালিবও ছোট-বড় সবাইকে সালাম বলতেন। পথে চলার সময় তাঁকে আগে সালাম দিতে পেরেছেন এমন লোকের সংখ্যা কম। সব সময় মাথা নিচু করে হাঁটতেন। যতটা উচিত দৃষ্টি সংযত রাখতেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প-গুজব করা, কিছু খাওয়া পরিহার করে চলতেন। পথে কষ্টদায়ক কিছু থাকলে সম্ভব হলে নিজ হাতে তা সরিয়ে ফেলতেন। রিকশাচালক, দারোয়ান, কুলি-মজুর বা অন্য কারো সাথে উচ্চস্বরে কথা বলতেন না। সাধারণত হেঁটেই চলা-ফেরা করতেন। প্রয়োজনে আগেই দাম-দর করে রিকশায় বা সিএনজিতে উঠতেন। অসুস্থতা বা অন্য কোন কারণে গৃহশিক্ষকরা পুরো মাস পড়াতে না পারলেও পুরো মাসের টাকা কিন্তু ঠিকই পরিশোধ করে দিতেন। তাঁর বাচ্চাদের দীর্ঘ দিন থেকে পড়াতেন, সেই গৃহশিক্ষক কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘আমার শিক্ষকতা জীবনের ১৮ বছরে এমন ভালো মানুষ আমি আর দেখিনি। কখনো পড়াতে আসতে না পারলে বা সময় মতো না এলে কোনদিন আমাকে একটি কথাও বলেননি। বলেননি, আপনি নিয়মিত আসেন না কেন? ডিসেম্বর মাসে সাধারণত পরীক্ষা শেষে স্কুল বন্ধ থাকে। তখন পড়ানো বন্ধ করে দিলেও তিনি পুরো মাসের বেতন দিতেন। আমি না নিতে চাইলে জোর করে হাতের মধ্যে দিয়ে দিতেন এবং বলতেন, আপনি পরিবার নিয়ে একমাস চলবেন কিভাবে?’
কর্মক্ষেত্রে তিনি কখনো কারো সাথে খারাপ আচরণ করেননি। অনেক সময় কাজ ভাগ করে নিতেন। প্রায় দিনই প্রত্যেকের কাজের হিসাব নিতেন। তবে কখনো ওভারটেক করে কারো কাছে কৈফিয়ৎ চাইতেন না। নিয়মমাফিক সবকিছু করতেন। বিশেষ কোন কারণে ত্র“টি-বিচ্যুতি ঘটলে সবাইকে নিয়ে এক সাথে বসতেন, তার কারণ খুঁজে বের করতেন। কোন কাজে অসম্ভব রকম তাড়াহুড়া করতেন না। সব সময় মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতেন।
তিনি সব সময় অপ্রয়োজনীয় কথা এড়িয়ে চলতেন। তবে প্রয়োজনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতেন। আহার করতেন পরিমিত। মাঝে মাঝে অফিসে দুপুরে হালকা নাস্তা হতো, তিনি একটার বেশি রুটি খেতেন না। তবে সবজি হলে একটু বেশি সবজি খেতেন। ডায়াবেটিস-এর কারণে মিষ্টি খাবার এড়িয়ে চলতেন। তিনি নিজের জন্য কখনো অফিসের টাকায় খাবার কিনে আনতে বলতেন না। শেষের দিকে প্রায়ই অফিসে আসার পথে এক প্যাকেট ডায়াসল্ট বিস্কুট কিনে আনতেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, ইদানীং পেট খালি থাকলে পেটে প্রচণ্ড ব্যথা করে। আসলে ভেতরে ভেতরে তিনি অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে লেখার আছে অনেক। তাঁকে নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সারাজীবন তিনি শুধু কাজই করেছেন। এই কাজের পরিধিও ব্যাপক ও বিচিত্রমুখী।
যা হোক, অশেষ আন্তরিক, অসম্ভব অমায়িক এবং অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই আলেমে দীন মানুষটির কাছে সম্ভাব্য এমন কোন বিষয় ছিল না যা আমার জন্য উন্মক্তু ছিল না। জীবনের সব বিষয় আমি তাঁর সাথে মন খুলে শেয়ার করেছি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক সর্বোপরি এমন কোন বিষয় ছিল না যা নিয়ে তাঁর সাথে আমার মতবিনিময় হয়নি। কুরআন, হাদিস, ফেকাহ, ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাকার নানা বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়েছে। তিনিও আমার কাছে তাঁর জীবনের সব বিষয় একদম খোলামেলাভাবে আলাপ করতেন। আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় হওয়ার পরও জীবনের কোন পর্বই আমাদের মধ্যে গোপন ছিল না। যা ইচ্ছা তাই তাঁর কাছে জানতে চাওয়াতে কোন অপরাধ হতো না। শুধু আমি নই প্রত্যেক ব্যক্তিই এমনকি নবাগত একজন হলেও তাঁর কাছে যে কোন ধরনের প্রশ্ন করতে পারতেন। তিনি সবাইকে আপনি বলে সম্বোধন করতেন। এমন উদার মনের মানুষ পৃথিবীতে বর্তমানে কম আছে।
অনন্য একটি দেশের নাম বাংলাদেশ। এমন সুন্দর দেশ দুনিয়াতে বিরল। নিরস্ত্র অবস্থায় স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করেও মাত্র নয় মাসের এক সম্মুখ যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে এ জাতি। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে এ দেশের মানুষ প্রমাণ করে ছেড়েছে, এ জাতি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করে না। বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো সারা বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে এ দেশের মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে টিকে আছে। এ জাতি সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতা- পরবর্তী বাংলাদেশে সেই সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবই যেন আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুসংস্কার, দুর্নীতি, অশিক্ষা, কুশিক্ষা এখনো আমাদের পিছনের দিকে টানছে। তার ফলে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও আমরা এখনো পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছি না। অথচ এ অবস্থা থেকে উত্তরণের একটা পথ আমাদের জন্য সবসময় খোলা ছিল। তা হলো পরিপূর্ণ মুসলিম হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা। তাহলে সৎ, যোগ্য ও ন্যায়পরায়ণ একটা জাতি হিসেবে আমরা বিশে¡র দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারতাম।
কিন্তু সে পথে আমরা পা রাখিনি। সেই পথ ধরে চলার দূরদর্শিতা আমরা দেখাতে পারিনি। ফলে আমাদের জাতীয় অগ্রগতি কাক্সিক্ষত মানে হয়নি। বিষয়টি যেকোনো সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিকের জন্য পীড়াদায়ক। তবে একজন মানুষ ছিলেন যিনি আমৃত্যু দেশ নিয়ে ভেবেছেন, দেশের মানুষ নিয়ে ভেবেছেন আর ভেবেছেন মুসলমানদের নিয়ে এবং কাজ করেছেন কিভাবে আল্লাহর দুনিয়ায় আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মানুষের জন্য দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতের কল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। আর সেই মানুষটি ছিলেন লেখক, গবেষক, সম্পাদক, অনুবাদক ও সর্বোপরি এ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতের প্রাণপুরুষ আল্লামা আবদুল মান্নান তালিব। তার সম্যক উপলব্ধি ছিল আর সব দেশ থেকে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে দ্রুত সামনে এগিয়ে নিতে হলে মোক্ষম হাতিয়ার হচ্ছে সংস্কৃতি। তিনি জানতেন যে জাতি যত বেশি সংস্কৃতিবান সে জাতি তত উন্নত।
আবদুল মান্নান তালিব একজন কিংবদন্তিতুল্য মানুষ। তিনি ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের একজন মহীরূহ। আবদুল মান্নান তালিবের তুলনা শুধু তিনি নিজেই। ইসলামী সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার টানে তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন। এই উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই তাঁর এই অবিরাম পথ চলা। টাকা-পয়সা, খ্যাতি কোনো কিছুর মোহ তাকে কখনো টলাতে পারেনি। উপমহাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির পৌত্তলিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে যারা একটি নবতর খালেস ইসলামী সংস্কৃতির ধারা প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছেন তিনি তাদের অন্যতম। তাই তিনি প্রতিটি শব্দই লিখেছেন মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়ার কল্যাণ ও আখেরাতের মুক্তির জন্য।
আর এক্ষেত্রে আবদুল মান্নান তালিবের উপলব্ধি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। সে উপলব্ধিতে তাড়িত হয়েই তিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে নিজের জন্মভূমি ছেড়েছিলেন। ভেবেছিলেন মুসলমানদের যে স্বতন্ত্র আবাসভূমি হচ্ছে সেখানে গেলে অবশ্যই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য কাজ করা সহজ হবে। কিন্তু তাঁর সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তিনি তাঁর স্বপ্ন এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ শুরু করেন প্রথমে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশে, পরে অবশ্য চলে আসেন পূর্ব অংশে। এখানে এসে তিনি পরিপূর্ণভাবে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমেই চিন্তা করেন, দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের ফলে মুসলমানরা তাদের নিজস¡ সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদেরকে সামনে এগিয়ে যেতে হলে নিজস¡ সংস্কৃতির পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে আর সেই লক্ষ্যেই কাজ শুরু করেন আবদুল মান্নান তালিব। প্রথমেই তিনি কাজ শুরু করেন, ‘জাহানে নও’ পত্রিকায়। ‘জাহানে নও’ নামটাও কিন্তু তাঁরই দেয়া। ‘জাহানে নও’-তে তিনি শেষ অবধি সম্পাদকের দায়িত্বেই ছিলেন। এটা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক কাজের শুধু সূচনাই করেননি, সেই সাথে সূচনা করেন একটি আন্দোলনের। সে আন্দোলন এ দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সামনে এগিয়ে নেয়ার আন্দোলন। এ দেশের ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতি সংশ্লিষ্ট সবাই জানেন এবং অকপটে স¡ীকার করেন, মরহুম আবদুল মান্নান তালিব এ আন্দোলনে অসমান্তরাল অবদান রেখে গেছেন। এই অবদান সূত্রেই তিনি বাংলাদেশে এখন অভিহিত হচ্ছেন ‘বাংলাদেশের ইসলামী সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রপথিক’ অভিধায়।
এরপর তাঁকে ‘মাসিক পৃথিবী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। তখন থেকে সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার স¡ার্থে তাঁকে প্রচলিত সাংবাদিকতার অর্গল ভাঙতে হয়েছে। প্রতি মাসে একটি করে পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি তিনি সময়ের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে যখন যা দরকার, সাধ্যমতো তাই করেছেন।
আয়োজন করেছেন সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ের ওপর সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও সাহিত্য সভার। এর বাইরে সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক বই প্রকাশ করে তা তুলে দিয়েছেন একঝাঁক তরুণ বিশ্বাসী পাঠকের হাতে। তার পর তিনি শুরু করেন, সাহিত্য পত্রিকা ‘কলম’ প্রকাশের কাজ। আসলে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল স্বভাবজাত। তাই আমরা তাকে ছাত্রজীবনেও ‘জিয়াউল ইসলাম’ নামে বার্ষিকী সম্পাদনা করতে দেখেছি। তবে ‘পৃথিবী’ তার এক্ষেত্রে সফল উদ্যোগ। কয়েক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ পত্রিকাটি এ দেশের নিয়মিত, সর্বাধিক প্রচারিত ও সবচেয়ে প্রভাবশালী পাঠকপ্রিয় ইসলামী গবেষণামূলক মাসিক হওয়ার গৌরব নিয়ে আজও প্রকাশিত হয়ে আসছে। আর তাই এই চল্লিশ বছরের ইসলামী সংস্কৃতি অঙ্গনের মিছিলে অবধারিতভাবে উঠে আসে আল্লামা আবদুল মান্নান তালিবের নাম। তাই তো সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের একদল কর্মীকে উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না- আল্লামা আবদুল মান্নান তালিব কী করে গেছেন আর কী করতে প্রয়াসী ছিলেন।
অনেকেই দ্বিধাহীনভাবে সতর্ক করেন, আবদুল মান্নান তালিব তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে অনেক ওপরে তুলে রেখে গেছেন। তিনি একজন ব্যক্তি মাত্র নন, একটি প্রতিষ্ঠান। একটি ইনস্টিটিউশন। এ ইনস্টিটিউশন কাজ করে গেছেন একটি মাত্র লক্ষ্য নিয়ে : এ জাতিকে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আর এক্ষেত্রে তিনি প্রধানতম হাতিয়ার করতে চেয়েছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতিকে। সেখানেই তিনি ছিলেন অনন্য এক প্রেরণাপুরুষ। ভাবলে অবাক হবেন, তিনি বিপরীত মেরুর কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পী, রাজনৈতিক সর্বোপরি আম জনতার কাছে ইসলাম তথা ইসলামী সংস্কৃতির দাওয়াত পৌঁছে দিতে অভাবনীয় শ্রম, মেধা ও শক্তি ব্যয় করে গেছেন। যার ফলশ্র“তিতে আমরা দেখতে পাই কবি আল মাহমুদ থেকে শুরু করে কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ পর্যন্ত তাঁর গুণমুগ্ধতা। সাংবাদিক নূরুল আমীন থেকে রুহুল আমীন গাজী সকলেই তাঁর অনুগামী। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাদেরকে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আনতে চেয়েছিলেন তাদের তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে, তা আজ আমাদের পক্ষে অনুমান করাও সত্যিই কষ্টসাধ্য। শুধুই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অবিরাম ছুটেছেন কারকুন বাড়ি লেন থেকে মেরাদিয়া, যাত্রাবাড়ী থেকে পল্লবী। নিজ উদ্যোগে নীরবে-নিভৃতে ঢাকা থেকে একাই চলে গেছেন কুষ্টিয়ার অধ্যাপক আবু জাফরের বাড়িতে।
২২ সেপেম্বর ২০১১ ইন্তেকাল করেছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক, সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবদুল মান্নান তালিব (৭৬)। এই মহান ব্যক্তিত্ব সারা জীবন মুসলমানদের কল্যাণ ও ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতিষ্ঠা প্রচার ও প্রসারে অতিবাহিত করেছেন। আবদুল মান্নান নামের আধিক্যের কারণে লেখক সত্তার স¡াতন্ত্র্য বজায় রাখার জন্য তিনি পিতৃপ্রদত্ত নাম আবদুল মান্নান-এর সাথে যুক্ত করেছিলেন ‘তালিব’। যা পিতা তালেব আলী মোল্লা নামের অংশ বিশেষ। এই তালিব শব্দের অর্থ-সন্ধানী, অনে¡ষণকারী, তালাশকারী। নিজের ধর্ম, ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় ও সত্যের সন্ধানে পুরোটা জীবন ব্যয় করে তিনি ‘তালিব’ নাম ধারণকে অর্থবহ ও সার্থক করে তুলেছিলেন। তাঁর গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে বাঙালি মুসলমানরা পেয়েছে সঠিক দিকনির্দেশনা। তাঁর চিন্তা-চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে পূর্ণতা পেয়েছে অজস্র মুসলমানের জীবন। ধন্য হয়েছে অনেকেই। তাঁর লেখার মাধ্যমে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থারূপে ইসলাম উপস্থাপিত হয়েছে।
আবদুল মান্নান তালিবের সাহিত্যকর্মের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে উপস্থাপিত হলো-
মৌলিক গ্রন্থ : অবরুদ্ধ জীবনের কথা (১৯৬২), মুসলমানের প্রথম কাজ (১৯৭৫), বাংলাদেশে ইসলাম (১৯৭৯), ইসলামী সাহিত্য : মূল্যবোধ ও উপাদান (১৯৮৪), আমল আখলাক (১৯৮৬), ইমাম ইবনে তাইমিয়ার সংগ্রামী জীবন (১৯৮৭), ইসলামী আন্দোলন ও চিন্তার বিকাশ (১৯৮৮), সাহিত্য সংস্কৃতি ভাষা: ঐতিহ্যিক প্রেক্ষাপট (১৯৯১), ইসলামী জীবন ও চিন্তার পুনর্গঠন (১৯৯৪), সত্যের তরবারী ঝলসায় (২০০০), আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও ইসলাম (২০০১)।
শিশু-কিশোর সাহিত্য : সহজ পড়া (১৯৮২), ছোটদের ইসলাম শিক্ষা ১ম ভাগ (১৯৮০), ২য় ভাগ (১৯৮১), ৩য় ভাগ (১৯৮২), ইসলাম শিক্ষা ১ম ভাগ (১৯৭৬), ২য় ভাগ (১৯৭৬), এসো জীবন গড়ি ১ম ভাগ (১৯৭৫), ২য় ভাগ (১৯৭৫), পড়তে পড়তে অনেক জানা (২০০০), মা আমার মা (২০০১), আমাদের প্রিয় নবী (১৯৭৫), মজার গল্প (১৯৭৬), কে রাজা (১৯৮১), হাতিসেনা কুপোকাত (১৯৯০), আদাবুল আরারিয়া (১৯৮৪)।
সম্পাদিত গ্রন্থ : আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা (১৯৬৯), সহীহ আল বুখারী, ১ম খণ্ড (১৯৮২), সহীহ আল বুখারী ৩য় খণ্ড (১৯৯৬), রিয়াদুস সালেহীন ১ম খণ্ড (১৯৮৫), মুসলিম শরীফের মুকদ্দমা (১৯৮৬), নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), সত্য সমুজ্জ্বল (১৯৮১), রসূলের যুগে নারী স¡াধীনতা ১ম খণ্ড, ২য় খণ্ড ও ৪র্থ খণ্ড (১৯৯৫-২০০৪)।
অনুবাদ সাহিত্য : খতমে নবুয়ত (১৯৬২,) পয়গামে মোহাম্মদী (১৯৬৭,) ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিকোণ (১৯৬৪), ইসলামী রেনেসাঁ আন্দোলন (১৯৬৫), ইসলামের দৃষ্টিতে জীবন বীমা (১৯৬৬), ইসলামের সমাজ দর্শন (১৯৬৭), সুদ ও আধুনিক ব্যাংকিং (১৯৭৯), আত্মশুদ্ধির ইসলামী পদ্ধতি (১৯৭৬), আত্মশুদ্ধি কিভাবে (১৯৭৬), ভাষাভিত্তিক সাংস্কৃতিক জাহেলিয়াত (১৯৭৫), ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূলনীতি (১৯৬৮), মুসলিম নারীর নিকট ইসলামের দাবি (১৯৮২), মহররমের শিক্ষা (১৯৭৭), ইসলামী আন্দোলন সাফল্যের শর্তাবলী (১৯৭৫), কুরবানীর শিক্ষা (১৯৭৬), চরিত্র গঠনের মৌলিক উপাদান (১৯৬৮), রাসায়েল ও মাসায়েল ২য় খণ্ড (১৯৯১), ৩য় খণ্ড (১৯৯১), যরবে কলিম (কাব্য গ্রন্থ, ১৯৯৪), সীরাতে সরওয়ারে আলম ১ম খণ্ড (১৯৮১), রাসায়েল ও মাসায়েল ৩য় খণ্ড (১৯৯১), রাসূলের যুগে নারী স¡াধীনতা ৩য় খণ্ড (১৯৯৪), রিয়াদুস সালেহীন ২য় খণ্ড (১৯৮৬), ৩য় খণ্ড (১৯৮৬), ৪র্থ খণ্ড (১৯৮৭), ইরান বিপ্লব একটি পর্যালোচনা (১৯৮২), সহীহ আল বুখারী ৪র্থ খণ্ড (১৯৮২), তাফহীমুল কুরআন ১ম, ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ, ৭তম, ৮ম, ৯ম, ১০ম, ১১তম, ১২তম, ১৩তম ও ১৯তম খণ্ড (১৯৮৯-১৯৯৪), ভারত যখন ভাঙলো (২০০২), প্রত্যয়ের সূর্যোদয় (২০০৩), অপরাজিত (২০০৩)।
সাময়িকী ও পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা : সাময়িক পত্র ‘জিয়াউল ইসলাম’ সম্পাদনা (বার্ষিকী ১৯৫২, বীরভূম পশ্চিম বঙ্গ), সহ-সম্পাদক, উর্দু দৈনিক ‘রোজনামা তাসনীম’ (লাহোর ১৯৫৭-৫৯), সহ-সম্পাদক ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’ ঢাকা (১৯৫৯-৬০), সম্পাদক ‘সাপ্তাহিক জাহানে নও’ (১৯৬২-৬৬), সম্পাদক ‘মাসিক পৃথিবী’ (১৯৬৯-৭১ ও ১৯৮১-৯৯), ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ‘সাপ্তাহিক মীযান’ (কলিকাতা ১৯৭৩-৭৫) সম্পাদক, ‘ত্রৈমাসিক ও মাসিক কলম’ (১৯৭৭-৯৪) সম্পাদক শাহীন শিবির, দৈনিক সংগ্রাম (১৯৭০-৭১), ১৯৮৩ থেকে দৈনিক সংগ্রামের কলামিস্ট ও ফিচার এডিটর হিসেবে ছিলেন।
যা হোক, তিনি জাতিকে যা দেয়ার দিয়ে গেছেন হৃদয় নিংড়ে। আজ জাতির কাছে সবকিছু চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে তিনি। তবে জাতি হিসেবে আমাদের ওপর তাগিদ বর্তেছে তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান আর শ্রদ্ধা জানানোর। সেই সাথে তাগিদ আসে তাঁর অবদানের জাতীয় স্বীকৃতি।
আবদুল মান্নান তালিব শত শত লেখকের বই সম্পাদনা করে দিয়েছেন কোন প্রকার পারিশ্রমিক ছাড়াই। কিন্তু তিনি কারো বইয়ে সম্পাদক হিসেবে নিজের নাম ব্যবহার করেননি। নতুন লেখক তৈরি করার জন্য তিনি যারপরনাই অসম্ভব রকম পরিশ্রম করেছেন। লেখক সৃৃষ্টি করাই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য।
মৃত্যুর আগে আমরা অনেকে সার্বক্ষণিক তার পাশে ছিলাম। তিনি হাসপাতালে থাকতে খুব অস্বস্তি ফিল করছিলেন। বারবার বলছিলেন, আমাকে বাসায় নিয়ে চলুন, পাকসাফ হয়ে আমার কিছু আমল করা দরকার। একদিন হাসপাতালে অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, আমি আর বারো দিন বাঁচতে পারি। আমাকে রিলিজ করার ব্যবস্থা করুন। ডাক্তারদের বললেন, আমার ক্যানসার হয়েছে এটা আমি জেনেছি। আমি আর বেশি দিন বাঁচবো না। দয়া করে আমাকে রিলিজ করে দিন। তাঁর ব্যবহারে সেদিন হাসপাতালের অনেকেই মনে কষ্ট পেয়েছিলেন। এরপরেও জোর করে তাকে আরও ৬ দিন হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। বাসায় এসে তিনি বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। মৃত্যুর দিন চুল দাড়ি কেটে ফ্রেশ হয়ে গোসল করে মসজিদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু তখনো আমরা জানতাম না তার কথাই সত্য হতে চলেছে। ঠিকই তিনি বারো দিনের দিন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। এ দিনের মৃত্যু নাকি সৌভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহ তাঁর এই প্রিয় বান্দাকে ক্ষমা করুন।
দেখতে দেখতে সাতটা বছর পার হয়ে গেল। আমি মাঝে মাঝেই তাঁকে দেখতে যাই। কখনো দিনে কখনো রাতে। কখনো একা কখনো বা মাওলানা মোজাম্মেল হক সাহেবকে সাথে নিয়ে। আমি কবরের পাশে দু’একটি ফুলের চারা লাগিয়েছিলাম। তাতে পাপড়ি মেলেছে। এবার যখন দেখতে গিয়েছিলাম তারা আমার চোখের পাপড়িতে অশ্র“র বন্যা এনে দিয়েছিল। গভীর রাতে আজিমপুরে গেলে দেখবেন লক্ষ তারার মেলা বসে। সেই লক্ষ-কোটি তারার মাঝে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আল্লামা আবদুল মান্নান তালিব। তখন মনে পড়ে ‘তোমার সমাধি ফুলে ফুলে ঢাকা, কে বলে আজ তুমি নেই/ তুমি আছ মন বলে তাই।’ আল্লাহ তাঁকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন!
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক

SHARE

Leave a Reply