তাওরাত ও ইঞ্জিলে মহানবী সা.-এর আগমনবার্তা । ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

তাওরাত ও ইঞ্জিলে মহানবী সা.-এর আগমনবার্তা । ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দহযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত ঈসা (আ) পর্যন্ত যত নবী (আ) দুনিয়ায় এসেছেন এবং তাঁদের ওপর যত আসমানি কিতাব ও সহিফা নাজিল হয়েছে এর সবগুলোতে রাসূল হিসেবে হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আগমনবার্তা ঘোষণা করা হয়েছে। পৃথিবীতে যত ধর্মমত ও ধর্মগ্রন্থ আছে সেখানেও নবী সা.-এর উচ্চ প্রশংসাসহ তাঁর আগমনের খবর দেয়া হয়েছে। হযরত ইব্রাহিম (আ) ও তাঁর সুযোগ্যপুত্র হযরত ইসমাইল (আ) দু’জন মিলে পবিত্র কা’বাঘর নির্মাণের কাজ শেষ করার পর হারাম শরিফ ও সে স্থানের বাসিন্দাদের জন্য দুআ করেন। দুআয় তারা যা বলেছেন তা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১২৮-১২৯ নম্বর আয়াতে বিধৃত হয়েছে, “হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের মধ্য থেকেই তাদের জন্য একজন নবী প্রেরণ করুন; যিনি তাদেরকে আপনার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন। তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।” উল্লিখিত আয়াত থেকে বুঝা যায়, এ দুআতে হযরত ইব্রাহিম (আ)-এর সঙ্গে তাঁর প্রিয়পুত্র হযরত ইসমাইলও (আ) শরিক ছিলেন। আর যে নবীর জন্য তাঁরা দুআ করেছিলেন তিনি উভয়ের বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং মক্কায় প্রেরিত হয়েছেন। আবুল আলিয়া ও কাতাদাহ রহমাতুল্লাহ বলেন, হযরত ইব্রাহিমকে (আ) জানানো হয়েছিল, তোমাদের দুআ কবুল করা হয়েছে তবে আখেরি জামানায় তিনি আসবেন। (ইবনে কাসির) সূরা ফাতির ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “এমন কোন সম্প্রদায় নেই যেখানে আমি সতর্ককারী পাঠাইনি।” সূরা রাদ-এর ৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- “প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য আমি পথপ্রদর্শক পাঠিয়েছি।” সূরা নিসার ১৬৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে- “আমি আগে তোমাকে বলেছি কিছু নবীদের কথা, কিছু রাসূলদের কথা, বাকিদের কথা বলিনি।” তার মানে পবিত্র কোরআনে সব নবী-রাসূলের কথা উল্লেখ করা নেই। হযরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা এ পৃথিবীতে প্রায় এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর পাঠিয়েছেন (মিশকাত, হাদিস নং ৫৭৩৭)। এইসব নবী বা রাসূল যারা এসেছেন সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা.এর আগে, তাঁরা এসেছিলেন শুধু তাদের সম্প্রদায়ের জন্য; আর তাঁরা যে কথাগুলো প্রচার করেছেন সে কথাগুলো মেনে চলা দরকার ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। সূরা ইমরানের ৪৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- “ঈসা নবী ছিলেন বনি ইসরাইলের জন্য একজন নবী হিসেবে।” গসপেল অব ম্যাথিউর ১৫ নম্বর অধ্যায়ের ২৪ অনুচ্ছেদে- যিশুখ্রিস্ট বলেছেন যে, “আমাকে পাঠানো হয়েছে শুধু ইসরাইলবাসীদের পথ দেখানোর জন্য।” তার মানে হলো, কুরআন এবং বাইবেলের কথা অনুযায়ী যিশুখ্রিস্ট তথা হযরত ঈসাকে (আ) পাঠানো হয়েছে শুধু বনি ইসরাইলিদের জন্য। তবে নবী হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন সর্বশেষ এবং চূড়ান্ত নবী। পবিত্র কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ১৪৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন- “আমি তোমাকে বিশ্ব জগতের জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছি।” সূরা সাবার ২৮ নম্বর আয়াতে আরো বলা হয়েছে- আমি তো তোমাকে পাঠিয়েছি পুরো মানবজাতির রাসূল হিসেবে। তুমি সুসংবাদ দেবে আর পাপ কাজে সতর্ক করবে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এটা জানে না।

তাওরাত
তাওরাত হচ্ছে মূসা (আ)-এর উপরে নাজিলকৃত আল্লাহর কিতাব। পরবর্তীকালে এটিকে নানা বিষয়ে পরিবর্তন করে বাইবেল বা ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ নামে সংকলন করা হয়েছে। সেই তাওরাতে উল্লেখ আছে- “আল্লাহ বলেন, আমি তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তোমার (মূসার) মতই একজন পয়গম্বর উত্থিত করব এবং তার মুখে আমার বাণী প্রকাশ করব। তিনি তোমাদেরকে তাই শুনাবেন যা আমি আদেশ করব।” হযরত কাব (রা) তাওরাত থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা তাওরাতে লিখিত পাচ্ছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ, আমার সম্মানিত সেবক। তিনি কর্কশ ভাষী নন, কঠোর হৃদয় নন, বাজারে কলহকারী নন, মন্দের বদলে মন্দ করেন না, কিন্তু মার্জনা করেন ও ক্ষমা করেন। তাঁর জন্মস্থান মক্কা, তাঁর হিজরত স্থান ইয়াসরিব (মদিনা) এবং তার রাজ্য সিরিয়া দেশ।” (মিশকাত দারেমি থেকে)
ওল্ড টেস্টামেন্টে বুক অব ডুইট্রনমি অধ্যায় ১৮, ভার্স নাম্বার ১৮ তে, আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ)-কে বলছেন, “আমি তোমার ভ্রাতাদিগের মধ্য থেকে আরেকজন নবী আনবো যে হবে তোমারই মতন। আর সে নিজে কিছু বলবে না, আমি যা তাকে বলতে বলবো সে শুধু তাই বলবে।” বাইবেলে যাহন : অধ্যায় ১৪-এ উল্লেখ আছে, “তোমাদেরকে বলার আমার আরো অনেক কথা আছে কিন্তু তোমরা এখন সে সকল সহ্য করতে পারবে না। পরন্ত সে সত্যের আত্মা যখন আসবেন তখন তিনি তোমাদেরকে সত্যের সন্ধান দিবেন। কারণ তিনি নিজ থেকে কিছু বলবেন না, যা যা শুনবেন তাই বলবেন এবং ভবিষ্যতের ঘটনাও জানাবেন।”
বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে দ্বিতীয় বিবরণ- ১৮:১৫তে উল্লেখ আছে “তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য আমার মত একজন নবী দাঁড় করাবেন। তার কথামত তোমাদের চলতে হবে।” বাইবেলে দ্বিতীয় বিবরণ ১৮:১৮এ উল্লেখ আছে, “আমি তাদের ভাইদের মধ্য থেকে তাদের জন্য তোমার মত একজন নবী দাঁড় করাবো। তার মুখ দিয়েই আমি আমার কথা বলব, আর আমি যা বলতে তাকে আদেশ দেবো সে তাই তাদের বলবে।”
মুহাম্মদ সা.-এর আগমন সংক্রান্ত এই ভবিষ্যদ্বাণী যখন উপস্থাপন করা হয় তখন খ্রিস্টানরা এই আপত্তি করেন যে, মুহাম্মদ সা. নয় বরং যিশুর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণীই এখানে করা হয়েছে। তাদের এই দাবির মোটেও কোন ভিত্তি নেই। এখানে মোশি অর্থাৎ মূসা (আ) স্পষ্টভাবে বলছেন ‘আমার মত একজন নবী দাঁড় করাবেন’ অথচ যিশু কখনো নিজেকে মূসার সদৃশ বলে ইঞ্জিলের কোথাও দাবি করেননি। যিশু মূসার ন্যায় কোন নতুন ব্যবস্থা বা শরিয়ত নিয়ে আসেননি বরং তার শরিয়তকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য আগমন করেছেন। মথি ৫: ১৭-১৮; ৩-এ বলা হয়েছে ‘ইস্রায়েলীয় ভাইদের মধ্য হতে আগমন করবেন।’ এখানে ‘তাদের মধ্য থেকে’ বলা হয় নি। আর ইস্রায়েলীয় ভাই বলতে ইবরাহিমের আরেক পুত্র ইসমাইলের বংশধর অর্থাৎ বনি ইসমাইলকেই বোঝায়। আর হযরত মুহাম্মদ সা. বনি ইসমাইলেই জন্মগ্রহণ করেছেন। মূসা (আ) ৪০ বৎসর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছিলেন (প্রেরিত ৭: ৩০)। অনুরূপভাবে মুহাম্মদ সা. ও ৪০ বৎসর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছেন পক্ষান্তরে যিশু নবুয়ত লাভ করেছিলেন ৩০ বৎসর বয়সে। বাইবেলে দ্বিতীয় বিবরণ ৩৩: ২ তে উল্লেখ আছে “সদাপ্রভু সিনাই থেকে আসলেন, তিনি সেয়ীর থেকে তাদের উপর আলো দিলেন, তার আলো ‘পারন’ পাহাড় থেকে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি লক্ষ লক্ষ পবিত্র স্বর্গদূতদের মাঝখান থেকে আসলেন; তার ডান হাতে রয়েছে তাদের জন্য আগুন ভরা আইন।” মক্কাসহ সমগ্র হেজাজ এলাকাকে ‘পারন’ বা আরবিতে ‘ফারান’ বলা হয়। আরব ভূগোল বিশারদদের মতানুযায়ী এ কথা প্রমাণিত। আর বাইবেলে এ কথা স্পষ্টভাবে বিদ্যমান যে, মহানবী সা.-এর পূর্ব-পুরুষগণ অর্থাৎ বনি ইসমাইল এ এলাকাতেই বসবাস করতেন। বাইবেলে বলা হয়েছে- “পারন নামে এক মরু এলাকায় সে (ইসমাইল) বাস করতে লাগলো।” (আদিপুস্তক ২১:২১) এই ভবিষ্যদ্বাণীর আরেকটি অংশে যে আগুন ভরা আইনের কথা বলা হয়েছে তা-ও কুরআন করীম নাজিল হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করেছে।

ইঞ্জিল
ইঞ্জিল মূলত বর্তমানে খ্রিস্টানদের বাইবেল নিউ টেস্টামেন্ট সংকলন। সেই কিতাবের ৭২ অধ্যায়ে বলা হয়েছে- যিশু বলেছেন, তিনি তোমাদের যুগে আসবেন না তোমাদের কয়েক বছর পর তিনি আগমন করবেন। যখন আমার ওপর নাজিলকৃত ইঞ্জিল (বাইবেল) এমন অরক্ষিত হয়ে পড়বে যে, মাত্র ত্রিশজন মুমিন টিকে থাকবে। তখন আল্লাহ দুনিয়াবাসীদের ওপর রহম করবেন এবং তাঁর রাসূলকে পাঠাবেন যার ওপর মেঘমালা ছায়া বিস্তার করবে। যাকে আল্লাহ মনোনীত করবেন তার মাধ্যমে আল্লাহ পরিচিত হবেন। তিনি আল্লাহবিমুখ লোকদের ওপর বিরাট ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং প্রতিমা পূজার মূলোৎপাটন করবেন। তিনি এমন সত্যতা নিয়ে আসবেন যে সকল নবীর সত্যতা থেকে অধিকতর সুস্পষ্ট হবে। “যখন এই ‘সত্য আত্মা’ আসবেন তখন তিনি তোমাদেরকে সর্বপ্রকার সত্যপথে চালিত করবেন; কারণ তিনি নিজের কথা কিছু বলবেন না। কিন্তু যা তিনি (আল্লাহর কাছ থেকে) শুনবেন তাই বলবেন এবং তিনি ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা দেখাবেন।” ‘সত্য আত্মা’ দ্বারা যিশু বুঝাতে চান যে, সেই সহায় হবেন সকল নবীর সরদার সাইয়্যেদুল মুরসালিন। হযরত ঈসা (আ) যে সুসংবাদ দিয়েছিলেন পবিত্র কুরআনে এসেছে, সূরা সফ এর ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে- “এবং স্মরণ কর যখন মরিয়ম পুত্র ঈসা বলেছিলেন, হে ইসরাইল বংশীয়গণ নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ। আমার সামনে যে তাওরাত কিতাব আছে আমি তার সত্যতার প্রমাণকারী এবং এরূপ একজন প্রেরিত পুরুষের সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসবেন, যাঁর নাম হবে আহমদ।”
বাইবেলের সলোমনের পরমগীত পুস্তিকায় বিশ্বনবীর আবির্ভাব সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নাম উল্লেখ করে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। হযরত সোলায়মান (আ) ভবিষ্যতের নবীর নাম উল্লেখ করেছেন ‘মহামাদইম’ নামে। হিব্রুভাষায় শব্দের শেষে ‘ইম’ প্রত্যয় সম্মানার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ এর প্রতিশব্দ ‘এলোহা’। বাইবেলে এ শব্দটি ‘এলোহিম’ রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, এটা পরিষ্কার যে সোলায়মান (আ) খুব স্পষ্টভাবেই ভবিষ্যৎ নবীর নাম ‘মহামাদইম’ বলে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে ইয়াসর (রা) বলেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনিল আসের সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, আপনি আমাকে রাসূল সা. সম্বন্ধে তাওরাতে লিখিত গুণাবলীর সংবাদ দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, কুরআনে উল্লিখিত কতক গুণাবলীর কথা তাওরাতে উল্লিখিত হয়েছে, ‘হে নবী! নিশ্চয়ই আমি তোমাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা সাবধানকারী এবং নিরক্ষর সম্প্রদায়ের জন্য আশ্রয়স্থল করেছি। তুমি আমার সেবক রাসূল, তোমাকে নির্ভরকারী নাম দিয়েছি।’ তিনি কর্কশ ভাষী নন, কঠোর হৃদয়ের নন, বাজারে কলহকারী নন। ‘তিনি ক্ষতির প্রতিশোধে ক্ষতি করেন না’। বরং মার্জনা করেন এবং ক্ষমা করেন। যতক্ষণ তিনি কুটিল ধর্মাবলম্বীকে সরল না করেন, এমনকি তারা এক আল্লাহ ব্যতীত উপাস্য নেই বলে এবং বাক্যের দ্বারা তিনি অন্ধ চক্ষুগুলোকে চক্ষুষ্মান না করেন এবং বধির কর্ণগুলোকে শ্রবণকারী না করেন এবং আবৃত হৃদয়কে মুক্ত না করেন, সে পর্যন্ত আল্লাহ কিছুতেই তাঁকে মৃত্যুগ্রস্ত করবেন না। (বোখারি, তিরমিজি)
বাইবেলে হযরত সুলায়মান (আ) সেই প্রতিশ্রুত নবীর চেহারার বর্ণনা দিতে গিয়ে পরমগীত ৫:১০-১৬তে বলা হয়েছে, “আমার প্রিয়ের চেহারা শ্বেত, লালচে তার গায়ের রং; দশ হাজার জনের মধ্যে তিনি বিশেষ একজন। তাঁর মাথা খাঁটি সোনার মত, তাঁর চুল ঢেউ খেলানো আর দাঁড় কাকের মত কালো।” এই ভবিষ্যদ্বাণীতে সেই নবীর চেহারার যে বর্ণনা এসেছে তা পুরোপুরি মুহাম্মদ সা.-এর চেহারার সাথে সাদৃশ্য রাখে। যেমন, মহানবী সা.-এর চেহারা ছিল সাদা ও উজ্জ্বল লালচে আর চুল ছিল কালো ও ঢেউ খেলানো। পক্ষান্তরে হযরত ঈসা (আ)-এর চেহারা ছিল রক্তিম বর্ণের ও চুল ছিল কোঁকড়ানো ও সোনালি বর্ণের। এই ভবিষ্যদ্বাণীর আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, সেই নবী দশ হাজার জনের মধ্যে বিশেষ একজন। মুহাম্মদ সা. যখন মক্কা বিজয় করেন তখন তাঁর সাথে দশ হাজার সাহাবী ছিলেন। তিনি সা. ছিলেন তাঁদের সবার মাঝে বিশেষ একজন।
বারনাবাস বাইবেলে ১৩ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ঈসা তার শিষ্যবর্গসহ জর্ডান নদী অতিক্রম করে মরু অঞ্চলে গমন করলেন আর জোহরের নামাজ শেষ করার পর একটি গাছের নিকট উপবেশন করলেন এবং পাপ বৃক্ষের ছায়ায় জড়ো হলেন তাঁর শিষ্যবর্গ। ঈসা তখন বললেন, “তকদির এত দুর্জ্ঞেয় হে ভাইসব! যা আমি তোমাদেরকে বলছি, অবশ্যই একজনের কাছে তা ধরা পড়বে। তিনি হলেন সেইজন যাকে জাতিপুঞ্জ সন্ধান করছে, যার কাছে আল্লাহর রহস্যাবলি এতো স্পষ্ট যে যখন তিনি দুনিয়ায় আগমন করবেন, সৌভাগ্যবান হবেন তারা যারা তাঁর বাণী শ্রবণ করবেন। কারণ তাদের ওপর আল্লাহ পাক রহমতের ছায়া বিস্তার করবেন; ঠিক যেমনি এ পাপ গাছটি আমাদের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে ছায়া। হ্যাঁ, ঠিক এই গাছটি যেভাবে আমাদেরকে রক্ষা করেছে সূর্যের খরতাপ থেকে, তেমনি আল্লাহর করুণা বাঁচাবে শয়তান থেকে তাদেরকে যারা সেই মানুষের ওপর ঈমান আনবে।” শিষ্যগণ বললেন, ওগো মুর্শিদ! সেই মানুষ কে হবেন যাঁর সম্পর্কে বলেছেন আপনি, কে তিনি যে আসবেন দুনিয়ায়? ঈসা হৃদয়ের পূর্ণ আনন্দ নিয়ে জওয়াব দিলেন, তিনি মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল।
বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টে প্রেরিত ৩:২২-২৩ অর্থাৎ ইঞ্জিলে মুহাম্মদ সা.এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণীতে নবী মূসা বলেছিলেন, “তোমাদের ঈশ্বর সদাপ্রভু তোমাদের ভাইদের মধ্য থেকেই তোমাদের জন্য আমার মত একজন নবী দাঁড় করাবেন। তার কথামত তোমাদের চলতে হবে। যে তার কথা শুনবে না তাকে তার লোকদের মধ্য থেকে একেবারে ধ্বংস করা হবে।” বাইবেলের এই ভবিষ্যদ্বাণীও হযরত সা.এর ক্ষেত্রে পূর্ণ হয়েছে। কারণ তাঁর সা. জীবদ্দশাতেই তাঁর বড় বড় বিরোধীরা ধ্বংস হয়েছিল যেমন আবু জাহেল, আবু লাহাবসহ আরো অনেকেই। এই ভবিষ্যদ্বাণী কখনো মসীহ্ দ্বারা পূর্ণ হয় না কেননা তার জীবদ্দশাতে তাঁর কোন বিরুদ্ধবাদী মারা যায়নি উপরন্তু তাঁকেই ক্রুশে চড়তে হয়েছিল।
ইঞ্জিলে যোহন ১৬:১৩ মসীহ্ সেই প্রতিশ্রুত নবীর আগমন সম্পর্কে বলছেন- “কিন্তু সেই সত্যের রুহ্ যখন আসবেন তখন তিনি তোমাদের পথ দেখিয়ে পূর্ণ সত্যে নিয়ে যাবেন। তিনি নিজ থেকে কথা বলবেন না, কিন্তু যা কিছু শোনেন তাই বলবেন। আর যা কিছু ঘটবে তাও তিনি তোমাদের জানাবেন।” মসীহ্র পর মুহাম্মদ সা.-ই এসেছেন যিনি পূর্ণ সত্য দেখিয়েছেন। মুহাম্মদ সা. যা কিছু বলতেন আল্লাহ তা’লার পক্ষ থেকেই বলতেন। পৃথিবী সাক্ষী যে, মুহাম্মদ সা. আজ থেকে চৌদ্দ শত বৎসর পূর্বে যে সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন তা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে এবং আজও পূর্ণ হচ্ছে। মসীহ্ সেই নবী সম্পর্কে বলছেন, “সেই সত্যের রুহ্ আমারই মহিমা প্রকাশ করবেন, কারণ আমি যা করি ও বলি তাই তিনি তোমাদের কাছে প্রকাশ করবেন।” (যোহন ১৬: ১৪) মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের মাধ্যমে মসীহ্র এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পেয়েছে। মুহাম্মদ সা. এসে মসীহ্ মহিমা প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁকে ক্রুশীয় মৃত্যুর অপবাদ থেকে এবং তাঁর মাকে অসতী অপবাদ থেকে মুক্ত করেছেন।
যোহন ১৪: ১৬তে উল্লেখ আছে, মসীহ্ বলেন “আমি পিতার কাছে চাইব, আর তিনি তোমাদের কাছে চিরকাল থাকবার জন্য আরেকজন সাহায্যকারীকে পাঠিয়ে দিবেন।” এই ভবিষ্যদ্বানীটিও একমাত্র মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের মাধ্যমেই পূর্ণতা লাভ করেছে। কেননা মসীহর পর চিরস্থায়ী শরিয়ত নিয়ে একমাত্র মুহাম্মদ সা.-ই আগমন করেছেন। বুক অব আইজাহা অধ্যায় ১৯ ভার্স নম্বর ১২, তে বলা হয়েছে, “এবং কিতাবখানি নাযিল করা হবে তাঁর উপর যিনি নিরক্ষর। তাকে বলা হবে পড় তোমার প্রভুর নামে, সে বলবে আমি তো পড়তে জানি না, আমি নিরক্ষর।”
পরিশেষে বলা যায় যে, পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর আগমন সম্বন্ধীয় যে সমস্ত ভবিষ্যদ্বাণী বিদ্যমান তা একমাত্র আমাদের নেতা নবীকুল শিরোমণি রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা সা.-এর শুভাগমনের মাধ্যমেই অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণতা লাভ করেছে। তাঁর আগমনের মাধ্যমে শরিয়ত পূর্ণতা লাভ করেছে। মানবজাতি তার উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উপনীত হয়েছে। তাই আমাদের সকলের উচিত এই মহান নবীর প্রতি প্রতিনিয়ত অবারিত দরুদ প্রেরণ করা আর এই দুআ করা যে, এই পৃথিবীর যে সমস্ত মানুষ এখনো এই মহান নবীর শান ও মর্যাদা সম্বন্ধে অবহিত নয় আল্লাহ তায়ালা তাদের সকলকে এই মহা মর্যাদাবান নবীর শান ও মর্যাদা অনুধাবন করার তৌফিক দান করুন এবং এই নবীর প্রতি ঈমান এনে হেদায়াত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আর আল্লাহ্ তা’য়ালা আমাদেরকেও এই মহান নবীর পবিত্র জীবনাদর্শ অনুসরণ করার ও তাঁর প্রতি বেশি বেশি দরুদ প্রেরণ করার তৌফিক দান করুন।

লেখক : কবি, গবেষক ও প্রফেসর; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply