তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও আমাদের দাওয়াতি কাজ । গাজী নেওয়াজ আরিফ

তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও আমাদের দাওয়াতি কাজ । গাজী নেওয়াজ আরিফতাকওয়া: আভিধানিক অর্থ হলো সচেতনতা, সতর্কতা। ব্যবহারিক অর্থ আল্লাহভীতি, পরহেজগারিতা।

তাকওয়ার পরিপূর্ণ অর্থ: বান্দা যে জিনিসকে ভয় করে তার থেকে বাঁচা ও তার থেকে আড়াল হওয়ার ঢাল গ্রহণ করার নাম তাকওয়া।

আল্লাহর তাকওয়া অর্জন করার অর্থ: বান্দা যে জিনিসকে ভয় করে, যেমন আল্লাহর গোস্বা, শাস্তি ও অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচা ও তা থেকে সুরক্ষার জন্য আল্লাহর আনুগত্য করা ও তার নাফরমানি থেকে বিরত থাকা।
“আর আল্লাহকে ভয় করো” বাক্যটি পবিত্র কুরআনে এসেছে ৩০টি আয়াতে।
ওয়াও ছাড়া আরো ৯ বারসহ মোট প্রায় ৬৬ আয়াতে সরাসরি আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে।
তাকওয়া শব্দ এসেছে ৯ বার। জাহান্নাম, কিয়ামতের দিনসহ তাকওয়ার কথা এসেছে প্রায় ৮৪ বার। ঈমানদারকে সরাসরি আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে সাত বার।
(১) ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।’ (সূরা বাকারা: ২৭৮)
(২) ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সূরা আলে ইমরান: ১০২)
(৩) ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর এবং তাঁর পথে জেহাদ কর যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সূরা মায়িদা: ৩৫)
(৪) ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।’ (সূরা তাওবা: ১১৯)
(৫) ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।’ (সূরা আহযাব: ৭০)
(৬) ‘মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি নিজে অনুগ্রহের দ্বিগুণ অংশ তোমাদেরকে দিবেন, তোমাদেরকে দিবেন জ্যোতি, যার সাহায্যে তোমরা চলবে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।’ (সূরা হাদীদ: ২৮)
(৭) ‘মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামী কালের জন্য সে কি প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করতে থাক। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা’আলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন।’ (সূরা হাশর: ১৮)
কুরআনে মোট তিনবার বলা হয়েছে। আল্লাহ মুত্তাকিদের (আল্লাহভীরুদের) সাথে আছেন।
সূরা বাকারা: ১৯৪; সূরা তাওবা: ৩৬ ও ১২৩ নং আয়াতে
‘আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে আছেন’ কুরআনে এসেছে ৩ বার: সূরা আলে ইমরান: ৭৬; সূরা তাওবা: ৪ ও ৭ মুত্তাকি শব্দটি ২৫ বার, মুত্তাকুন শব্দটা ৬ বার।
কিয়ামত বা পরকালকে ভয় করার কথা এসেছে ৩ বার। সূরা বাকারা: ৪৮, ১২৩ ও ২৮১

তাকওয়া বিষয়টা এমন যে হযরত ওমর (রা) কাব বিন মালিক (রা) কে বললেন তাকওয়ার সংজ্ঞা কী? তিনি বললেন, হে আমিরুল মুমিনিন আপনি কি এমন সরু পথ দিয়ে হেঁটেছেন যে পথে কাঁটা বিছানো থাকে তখন আপনি কী করেন? তিনি বললেন, আমি তখন কাপড় গুটিয়ে এমনভাবে হাঁটি যাতে কাপড় না আটকে যায়। এটাই হলো তাকওয়া যে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা।
‘তাকওয়া’ শব্দটি কুরআনে এসেছে ৮৪ বার, আমাদের ব্যবহারিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বলা হয়েছে এই তাকওয়া মেনে চলতে। ঘর থেকে শুরু করে যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করে চলতে বলা হয়েছে।
আপনার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়েছে- আল্লাহ বললেন তাকওয়া অবলম্বন কর, বিয়ে দুইটা করেছেন বা অধিক সেখানেও বলা হয়েছে তাকওয়া অবলম্বন কর, হজ্জ করবেন সেখানেও তাকওয়ার কথা বলা হয়েছে, বন্ধু নির্বাচন করবেন সেখানেও, স্ত্রী এর কাছে যাবেন সেখানেও তাকওয়া, সফরেও, ধনসম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রেও অর্থাৎ সর্বাবস্থায় তাঁকে ভয় কর।

কেন বার বার তাকওয়া অর্জনের কথা বলা হয়েছে; কারণ আপনি তখনিই পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারবেন যখন ঘর থেকে শুরু করে বাইরে সর্বাবস্থার সর্বক্ষেত্রে তাকওয়া অর্জন করবেন।
তাকওয়া অর্জন আমরা কেন করব?
(১) আল্লাহর কাছে মর্যাদা লাভের জন্য-
হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন। (সূরা হুজুরাত: ১৩)

(২) আসমান ও জমিনের বরকত লাভের জন্য-
আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের উপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম। (সূরা আল আরাফ: ৯৬)
এখানে বলা হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করলে আসমান ও জমিনের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হবে। আসমানের বরকত বলতে বৃষ্টি এবং জমিনের বরকত বলতে উৎপন্ন ফসলাদি, যা মানব জীবনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য।

৩) উত্তম ফল লাভের জন্য-
আর যদি তারা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে (তাদের জন্য) প্রতিদান উত্তম হত। যদি তারা জানত। (সূরা বাকারা:১০৩)
হাদিসে এ ব্যাপারে একটি ঘটনা আছে-
ওমর (রা) এর যুগে একটা ঘটনা। তিনি প্রতিরাতে প্রজাদের অবস্থা দেখার জন্য বের হতেন তখন শুনতে পেলেন মা তার মেয়েকে বলছে দুধে পানি মিশাতে, মেয়ে বলছে মিশাবে না, মা বলল আমিরুল মুমিনিন তো এখন দেখবে না তুমি পানি মিশাও। মেয়ে বলল উনি না দেখুক আল্লাহ তো দেখছেন। এটাই হলো তাকওয়া।

ফলাফল অর্থাৎ তাকওয়ার ফলটা কি হল- হযরত উমর (রা) তাঁর ছেলেকে এই মেয়ের সাথে বিয়ে দিলেন। আল্লাহকে যারা ভয় করে তাদেরকে তিনি এভাবেই পুরস্কৃত করেন।
৪) রহমত লাভের জন্য (সূরা আরাফ: ৬৩, সূরা আনআম: ১৫৫)
৫) আল্লাহর সাহায্য লাভের জন্য (সূরা বাকারা: ১২৫)
৬) সফলতা অর্জনের জন্য (সূরা মায়িদাহ: ১০০)
৭) যেকোন কাজ সহজ হওয়ার জন্য (সূরা তালাক: ৪)
৮) গুনাহ মোচনের জন্য (সূরা আহজাব: ৭০)
৯) শয়তানের অনিষ্ট হতে সুরক্ষার জন্য (সূরা আরাফ: ২০১)
১০) হক ও বাতিলের পার্থক্য বুঝার জন্য (সূরা ফুরকান: ২৯)
১১) কাফিরদের অনিষ্ট হতে বাঁচার জন্য (সূরা আলে ইমরান: ১২০)
১২) আল্লাহর বন্ধুত্ব অর্জন (সূরা আনফাল: ৩৪)
১৩) মুসিবত ও দুশমনের মোকাবিলার মুহূর্তে আসমান থেকে সাহায্য (সূরা ইমরাম: ১২৪)
১৪) ইলম ও জ্ঞান অর্জন (সূরা বাকারা: ২৮২)
১৫) পার্থিব জগতে সুসংবাদ লাভ (সূরা ইউনুস: ৬৩-৬৪)
১৬) মহাপ্রতিদান ও জান্নাত লাভের জন্য (সূরা আলে ইমরান: ১৫)
সর্বোপরি আমাদের সবার যেটা আকাক্সক্ষা তা হল জান্নাত। আল্লাহ বলেন,
“বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এর চেয়েও উত্তম বস্তুর সংবাদ দেবো? যারা তাকওয়া অর্জন করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট জান্নাত, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর পবিত্র স্ত্রীগণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে সন্তুষ্টি। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক দ্রষ্টা।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫)

তাকওয়া এমন একটা বিষয় যা মানুষকে উপরে নিয়ে যেতে সাহায্য করে, রিযিক এর চিন্তা হতে মুক্তি দেয়।
তাওয়াক্কুল কী?
তাওয়াক্কুল অর্থ ভরসা করা।
কার উপর তাওয়াক্কুল করব?
মানুষকে দুনিয়ার জীবনে ভরসা করতে হয়। কোথাও না কোথাও তাকে আত্মসমর্পণ করতেই হয়। সব দুঃখ-বেদনা কোথাও না কোথাও বলতেই হয়। সেই স্থানটা কোনটা? যারা ঈমান থেকে বঞ্চিত, ঈমানের শিক্ষা থেকে মাহরুম, তারা সেই স্থান এমন ব্যক্তি বা বস্তুকে বানিয়ে নেয় বাস্তবে যাদের কল্যাণ-অকল্যাণের কোনোই ক্ষমতা নেই। পক্ষান্তরে আল্লাহ যাদেরকে ঈমান দান করেছেন, তাওহিদের আলোয় আলোকিত করেছেন তারা তাদের সকল বেদনা; সকল প্রার্থনা এমন একজনের কাছে পেশ করে যিনি বাস্তবেই মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক। আর যিনি সৃষ্টির প্রতি পরম দয়ালু।
তাওয়াক্কুল হচ্ছে ভরসা করা, জীবনের সকল বিষয়ে, কল্যাণ লাভের ক্ষেত্রেও, অকল্যাণ থেকে মুক্তি পাবার ক্ষেত্রেও। আর তা এমন সত্তার উপরই হতে পারে যিনি সকল বস্তুর স্রষ্টা। বস্তুর গুণ ও বৈশিষ্ট্যের স্রষ্টা। যিনি গোটা জাহানের পালনকর্তা এবং যিনি দুনিয়া-আখিরাতের সকল কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক, এমন সত্তার উপরই ভরসা করা যায়। তার পরিবর্তে মানুষ যদি অন্য কারো উপর ভরসা করে তাহলে তা হবে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী।
আল্লাহ্ তাআলার উপর ভরসা ইসলামে একটি বিরাট বিষয়। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। আল্লাহর প্রতি ভরসা ছাড়া কোন বান্দাই কোন মুহূর্ত অতিবাহিত করতে পারে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহর তাওহিদের সাথে সম্পর্ক গাঢ় ও গভীর হয়। আল্লাহ্ বলেন,
“আর ভরসা কর সেই জীবিত সত্তার (আল্লাহর) উপর, যিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। (সূরা ফুরক্বান: ৫৮)

এই আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কারো নিকট নিজেকে পেশ করবেন না। কেননা তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি পরাক্রমশালী, কোন কিছুই তাঁকে পরাজিত করতে পারে না। যে ব্যক্তিই তাঁর উপর নির্ভর করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন- তাকে সাহায্য ও সমর্থন করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপর ভরসা করবে, সে তো এমন কিছুর ওপর ভরসা করল যে মৃত্যুবরণ করবে, বিলীন ও ক্ষয় হয়ে যাবে। দুর্বলতা ও অপারগতা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে। একারণে তাঁর প্রতি ভরসাকারীর আবেদন বিনষ্ট হয়ে যায়, সে হয়ে যায় দিশেহারা।

এ থেকেই বুঝা যায় আল্লাহর উপর ভরসা করার ফজিলত ও মর্যাদা কি? তার সাথে হৃদয়ের সম্পর্ককে গভীর করার গুরুত্ব কতটুকু?
আল্লাহ্ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে তাওয়াক্কুলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াত উল্লেখ করেছেন। তার মর্যাদা ও ফলাফল উল্লেখ করেছন। তন্মধ্যে:
আল্লাহ বলেন, “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাকে তবে আল্লাহর উপরেই ভরসা কর।” (সূরা মায়েদা: ২৩)
তিনি আরও বলেন, “মু’মিনগণ যেন একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা করে।” (সূরা তওবা: ৫১)
তিনি আরও এরশাদ করেন:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।” (সূরা তালাক্ব: ৩)
তিনি আরও বলেন, “যখন তুমি দৃঢ়ভাবে ইচ্ছা করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল ইমরান: ১৫৯)

হাদিসে তাওয়াক্কুল এর ঘটনা
হাদীছ গ্রন্থ সমূহেও তাওয়াক্কুলের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।
১) ওমার বিন খাত্তাব (রা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে তবে তিনি তোমাদেরকে রিজিক দান করতেন- যেমন পাখিকে রিযিক দান করে থাকেন- তারা খালি পেটে সকালে বের হয় এবং পেট ভর্তি হয়ে রাতে ফিরে আসে।” (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ্)
হাফেয ইবনু রজব (র) বলেন, তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে এ হাদিসটিই হল মূল। আর তাওয়াক্কুলই হলো জীবিকা পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “আর যে আল্লাহ্কে ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্য নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা ত্বালাক: ২,৩)
২) উদাহরণটি উল্লেখযোগ্য: রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরতের সময় মদিনার দিকে যাওয়ার জন্য মক্কা থেকে উল্টা দিকে গমন করেন। আর তা ছিল রাতের আঁধারে। অতঃপর তাঁরা ‘সওর’ নামক গুহায় আত্মগোপন করেন। আবু বকর (রা:) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হিজরতের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যখন ‘গারে সওরে’ ছিলাম তখন আমি উপর দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম মুশরেকদের পা আমাদের মাথার ঠিক উপরেই। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায় তাহলেই আমাদেরকে দেখতে পাবে। তখন তিনি আমাকে বললেন, “আমাদের দুজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি হে আবু বকর! আল্লাহ্ আমাদের তৃতীয় জন। অর্থাৎ আমাদের সাহায্যকারী।”
যে কথা কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে-
“যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।” (সূরা তওবাহ্: ৪০)

৩) রাসূল (সা) বলেছেন- আমার উম্মত থেকে ৭০ হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের অন্যতম গুণ হবে তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপর ভরসা করে। (বুখারি: ৫৭০৫, মুসলিম: ২১৮)
সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে, সে অকল্পনীয়ভাবে তার মর্যাদা লাভ করবে, তার ফলাফল ভোগ করবে। আর সে হবে সর্বাধিক উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষ, সবচাইতে সুখী মানুষ।
কেন আমরা তাওয়াক্কুল করব
১) কল্পনাতীত রিজিক (তালাক্ব: ৩)
২) ইচ্ছা পূরণের জন্য (তালাক্ব: ৩)
৩) আল্লাহই সবকিছুর জন্য যথেষ্ট (তালাক্ব: ৩)
৪) মুমিন হওয়ার পূর্ব শর্ত (ইবরাহীম: ১১)
৫) আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য (আলে ইমরান: ৩১)

তাকওয়া এবং তাওয়াক্কুল এর মাঝে সম্পর্ক
তাওয়াক্কুল তখনি আপনি করতে পারবেন যখন সকল ক্ষেত্রে তাকে ভয় করেন, কারণ যে আল্লাহকে ভয় করে না সে কিভাবে তার উপর তাওয়াক্কুল করবে। এ যেন মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ।
তাকওয়া অর্জন সহজ কিন্তু তাওয়াক্কুল করা কঠিন, কারণ তাওয়াক্কুল করবেন আপনি সকল কঠিন অবস্থায় যেমন দুঃখের দিনে, হতাশার দিনে, খারাপ অবস্থায় এটা কিন্তু কঠিন কাজ এটা সবার দ্বারা সম্ভব নয়। একটি ছাড়া আরেকটি অর্জন সম্ভব নয়।

দাওয়াতি কাজ কী?
দাওয়াত মানে আহ্বান করা, প্রচার করা। জাহেলিয়াত-এর সমাজে দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূল (সা) এই দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন জাতিকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করেছেন। তাই আমাদের উচিত সবার কাছে ইসলামের প্রাথমিক দাবিসমূহ পৌঁছে দেয়া।

নবীদের দাওয়াতের ভিত্তি ছিল এই তাকওয়া–তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। (সূরা শুআরা: ১০৮ ও ১১০)
তারা মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে তাই আমাদের দাওয়াতের ভিত্তি হওয়া উচিত তাকওয়া।

কেন আমরা দাওয়াতি কাজ করব?
১) উত্তম ব্যক্তি হওয়ার জন্য-
“আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে আহবান করে এবং সৎকর্ম করে এবং বলে নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ফুসসিলাত : ৩৩)
২) এটি রাসূল (সা)-এর কাজ-
রাসূল (সা) বলেছেন, “প্রচার কর একটি আয়াত হলেও” এটাই হলো দাওয়াতি কাজ।

৩) সকল সম্পদ হতে উত্তম-
আল্লাহর রাস্তায় একটি সকাল বা একটি বিকাল ব্যয় করা দুনিয়ার সকল সম্পদ হতে উত্তম। (সহিহ বুখারী)
৪) সরল সঠিক পথের দিশা পাওয়া
আমাদের দাওয়াত সরল-সঠিক পথের দাওয়াত (মুমিনুন: ৭৩)

দাওয়াতি কাজে তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের সম্পর্ক কতখানি
দাওয়াতি কাজে আপনি যখন একজন ছাত্রকে দাওয়াত দিবেন তখন সর্বপ্রথম যদি তার মাঝে আল্লাহ ও পরকালের ভয় (সূরা বাকারা: ৪৮,১২৩ ও ২৮১) ঢুকিয়ে দিতে পারেন আপনি ১০০% সফল। দেখবেন অনেক খারাপ মানুষটাও খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদেরকে সবার আগে তাকওয়া অর্জন করতে হবে ও তাকওয়া বিষয়ে সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে।
দাওয়াতি কাজ করতে গিয়ে হতাশ হলে চলবে না, আপনি দাওয়াত দিবেন আর সবাই দাওয়াত গ্রহণ করে ফেলবে ব্যাপারটা এমন নয়। বরং আপনি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করুন এবং ওই ভাইটির জন্য বেশি বেশি দোয়া করুন দেখবেন আল্লাহ এর উত্তম ফলাফল দিবেন।
সর্বশেষ একটি কথা বলে শেষ করব সকল পাপ বা মন্দ কাজ বন্ধের একমাত্র মাধ্যম হলো এই তার মূল সফলতা।

লেখক : কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply