দাওয়াত কেমন হবে? -শাহীদুল হাসান তারেক

একবার কল্পনা করেছেন মার্কেটে আপনাকে যে মানুষটা ঠকিয়ে দেয় তার ধর্ম পরিচয় কী? ফল বিক্রেতা- যে আপনাকে একশ পার্সেন্ট নিশ্চয়তা দিয়ে ফল তুলে দিলো তার নাম পরিচয়? নেতার নাম টাঙিয়ে ওয়াজ মাহফিলের ঘোষণা দেওয়া হলো সেই নেতার ক্ষমতায় থাকাকালীন ওয়াজ মাহফিল বন্ধ হয়ে যাওয়াতে তার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগছে কিনা? যে লোকটি লম্বা দাড়ি ও মাথায় টুপি দিয়ে রীতিমতো মিথ্যা বলে যায় তার মধ্যে আল্লাহর শাস্তির কোনো ভয় আছে কিনা?
যে নামাজি দিনের পর দিন নামাজ আদায় করে, কুরআন খতম দেয়, হাত থেকে তাসবিহ রাখে না সে তার আত্মীয়স্বজনের সাথে কেমন আচরণ করে? তাদের সম্পদ ও অধিকার বুঝিয়ে দেয় কিনা?
যে দরবেশ/পীর/মাশায়েখ সারাক্ষণ ইবাদতের ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করেন তিনি গীবতমুক্ত কিনা?
উল্লিখিত প্রত্যেকটি প্রশ্নই ইসলামিক আচার-তাহযিব তমদ্দুন। এসবের ওপরই নির্ভর করে সমাজের ভিত্তি, পারিবারিক সমৃদ্ধি, ব্যক্তিগত সৌন্দর্য। এমন সব সৌন্দর্য ছাড়া কিভাবে ইসলামী জীবনবোধ তৈরি হয়। এখন প্রশ্ন হলো কিভাবে এই জীবনবোধ জাগবে?
ইসলামের সর্বোত্তম উসুল হলো দাওয়াত। কিন্তু দাওয়াত তো সর্বদিকে চলমান! তবুও কেন পূর্বোল্লিখিত আচরণ অনুপস্থিত। কেন নামাজিরাও আচরণে অসহনশীল? ওয়ায়েজিনগণ ওয়াদারক্ষায় দুর্বল? উস্তাদ/স্যারগণ ছাত্রদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ? ছাত্রদের আমলে গোঁজামিল? ব্যবসায়ী লেনদেনে মিথ্যুক? রাজনীতিবিদ আমানত রক্ষায় অক্ষম?
একবিংশ শতাব্দীতে এসে মুসলিম জাতিকে ভাবতে হয় কেন আমাদের দাওয়াত ফলপ্রসূ হচ্ছে না। কিভাবে দাওয়াতি কাজ করলে দাওয়াত সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। বিভিন্ন গ্রুপ, দল, সংঘ, সংস্থা, ব্যক্তি দাওয়াতি কাজ করছেন কিন্তু দাওয়াতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রশ্ন দাঁড়াবে দাওয়াতের উদ্দেশ্য কী? একটাই উত্তর পৃথিবী রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য মানুষকে আল্লাহর গোলামির পথে ডাকা। এক আল্লাহর গোলামি ছাড়া এই পৃথিবীতে কোনো শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা হবে না- এই ইয়াকিন মনের ভিতর তৈরি করা।
আল্লাহর গোলামি কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। এটা একদিনে হয় না। সকলের দ্বারা এটা সম্ভবও হয় না। হঠাৎ করে আসমান থেকেও অবতীর্ণ হয় না। অন্তরকে ত্যাগের আগুনে পুড়িয়ে বিশ্বাসকে খাঁটি সোনায় পরিণত করে এটা উপলব্ধি করতে হয়। এটা ধীরে ধীরে, ক্ষয়ে ক্ষয়ে অর্জন করে নিতে হয়। আর এজন্য প্রয়োজন দাওয়াতের, সহনশীল মেজাজের, লেগে থাকার মতো চরম ধৈর্যের, সূক্ষ্মবুদ্ধিমত্তার ও আশান্বিত হৃদয়ের। এবার জানবো দাওয়াত কেমন হবে?

দাওয়াত হবে

সহজ
‘তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

সুসংবাদ
‘সুসংবাদ দাও, দুঃসংবাদ দিও না।’ (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

রবের শ্রেষ্ঠত্বের
‘তোমার রবের পবিত্র ঘোষণা করো।’ (৭৪:৩)

নিকটাত্মীয়কে সবার আগে
‘তোমার নিকটবর্তী আত্মীয়দের সতর্ক করো।’ (২৬:২১৪)
দায়ীর আমলের সৌন্দর্য
‘তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও। অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করে থাকো। তোমরা কি জ্ঞান বুদ্ধি একটুও কাজে লাগাও না?’ (২:৪৪)

তাওহিদের
‘আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো বন্দেগি ও দাসত্ব করবো না। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবো না। আর আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও নিজের রব হিসেবে গ্রহণ করবে না। যদি তারা এ দাওয়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে পরিষ্কার বলে দাও: “তোমরা সাক্ষী থাকো, আমরা অবশ্যই মুসলিম (একমাত্র আল্লাহর বন্দেগি ও আনুগত্যকারী)।” (৩:৬৪)

রিসালাতের
‘স্মরণ করো, যখন আল্লাহ নবীদের থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন- আজ আমি তোমাদের কিতাব ও হিকমত দান করেছি, কাল যদি অন্য একজন রাসূল এই শিক্ষার সত্যতা ঘোষণা করে তোমাদের কাছে আসে, যা আগে থেকেই তোমাদের কাছে আছে, তাহলে তোমাদের তার প্রতি ঈমান আনতে হবে এবং তাকে সাহায্য করতে হবে।” এই বক্তব্য উপস্থাপন করার পর আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন: “তোমরা কি এ কথার স্বীকৃতি দিচ্ছো এবং আমার পক্ষ থেকে অঙ্গীকারের গুরুদায়িত্ব বহন করতে প্রস্তুত আছো?” তারা বললো, হ্যাঁ, আমরা স্বীকার করলাম। আল্লাহ্ বললেন: “আচ্ছা, তাহলে তোমরা সাক্ষী থাকো এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকলাম।” (৩:৮১)

আখেরাতের
‘হে মানবজাতি! তোমাদের রবের গজব থেকে বাঁচো। আসলে কিয়ামতের প্রকম্পন বড়ই (ভয়ঙ্কর) জিনিস।’ (২২:০১)

সুস্পষ্ট ও বক্রতাহীন
‘হে মুহাম্মাদ! বলো, আমার রব নিশ্চিতভাবেই আমাকে সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। একদম সঠিক নির্ভুল দ্বীন, যার মধ্যে কোনো বক্রতা নেই, ইবরাহিমের পদ্ধতি, যাকে সে একাগ্রচিত্তে একমুখী হয়ে গ্রহণ করেছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।’ (৬:৬১)

নরম ও কোমল শব্দে/ভাষায়
‘তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।’ (২০:৪৪)

প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা ও সদুপদেশ সহকারে
‘হে নবী! প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা এবং সদুপদেশ সহকারে তোমার রবের পথের দিকে দাওয়াত দাও এবং লোকদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পদ্ধতিতে। তোমার রবই বেশি ভালো জানেন কে তাঁর পথচ্যুত হয়ে আছে এবং সে আছে সঠিক পথে।’ (১৬:১২৫)
ধৈর্য ও সহনশীলতা সহকারে
‘তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকে মিথ্যা বলা হয়েছে কিন্তু তাদের ওপর যে মিথ্যা আরোপ করা হয়েছে এবং যে কষ্ট দেয়া হয়েছে, তাতে তাঁরা সবর করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে গেছে। আল্লাহর কথাগুলো পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারোর নেই এবং আগের রাসূলদের সাথে যা কিছু ঘটে গেছে তার খবর তো তোমার কাছে পৌঁছে গেছে।’ (৬:৩৪)

অন্তর্দৃষ্টি সহকারে
‘আমার পথতো এটাই, আমি আল্লাহর দিকে ডাকি, আমি নিজেও পূর্ণ আলোকে নিজের পথ দেখছি এবং আমার সাথীরাও। আর আল্লাহ পাক-পবিত্র এবং শিরককারীদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (১২:১০৮)

দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি না করার জন্য
‘দুনিয়ায় সুস্থ পরিবেশ বহাল করার পর আর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। আল্লাহকেই ডাকো ভীতি ও আশা সহকারে। নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীল লোকদের নিকবর্তী।’ (৭:৫৬)

মুনাফিকি ত্যাগের
‘এ মুনাফিকদের যখন বলা হলো, এসো আল্লাহর পথে যুদ্ধ করো অথবা (কমপক্ষে) নিজের শহরের প্রতিরক্ষা করো, তারা বলতে লাগলো: যদি আমরা জানতাম আজ যুদ্ধ হবে, তাহলে আমরা অবশ্যি তোমাদের সাথে চলতাম। যখন তারা একথা বলছিল তখন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির অনেক বেশি কাছে অবস্থান করছিল। তারা নিজেদের মুখে এমন সব কথা বলে, যা তাদের মনের মধ্যে নেই এবং যা কিছু তারা মনের মধ্যে গোপন করে আল্লাহ তা খুব ভালো করেই জানেন।’ (৩:১৬৭)

তাগুতি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের বিপরীতে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার
‘জেনে রাখো, সৃষ্টি যার নির্দেশও চলবে তাঁর। (৭:৫৪)
জমিনে দাওয়াত শক্তিশালী হলে মানুষের চিন্তার পরিশোধন আসবে, চিন্তার উদারতা, দ্বীন ও সমাজ সচেতনতা তৈরি হলেই ইসলাম বড় প্রভাবক ও মুখ্য শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। মুসলিম, প্রত্যেক মুসলিমকে দায় নিতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমি মিথ্যা বলব না। আমি লুকোচুরি করব না। আমি সত্য গোপন করব না। আমি- প্রত্যেক আমিই যদি সত্যাশ্রয়ী হয়ে যাই তাহলে সমাজ সত্য ও সুন্দরের পতাকাবাহী হবে। প্রশান্তি ছড়িয়ে যাবে মাশরিক থেকে মাগরিব। কোনো দুর্বল ডরে ভয়ে পথ অতিক্রম করবে না। কোনো নারী আতঙ্কিত হয়ে জীবন কাটাবে না। কোনো ক্রেতা উদ্বিগ্ন অবস্থায় বাজারে যাবে না। জাতি সুগঠিত ও সুষম শক্তি নিয়ে আল্লাহর খেলাফতকে জীবনের স্থায়ী ও চিরন্তন সমাধান হিসেবে গ্রহণ করবে। এভাবেই একটি জাতির খোদায়ী বুনিয়াদ প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ সর্বোত্তম দাওয়াত যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার তাওফিক দিন, আমিন।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সংবাদপত্র

SHARE

Leave a Reply