দারিদ্র্য দূরীকরণে জাকাত এবং ওশর -প্রফেসর মো. মোসলেম উদ্দীন শিকদার

অধুনাবিশ্বে অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলমী অর্থনীতি বিশেষত জাকাতব্যবস্থা যথানিয়মে চালু না থাকার দরুন দারিদ্র্যক্লিষ্ট নর-নারী সুদভিত্তিক বহুবিধ অর্থনৈতিক সংস্থা, সমিতি ও এনজিওর শরণাপন্ন হচ্ছে। অতঃপর প্রত্যাশিত সুখ-শান্তিতো পাচ্ছে না বরং বেঈমানী ও বে-ইজ্জতির সাথে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। আল্লাহ তায়ালা সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং জাকাত সাদাকাকে বর্ধিত করে দেন। (সূরা বাকারা : ২৭৬)।

আল্লাহ সুদকে হারাম করেছেন এবং ব্যবসাকে করেছেন হালাল। (সূরা বাকারা : ২৭৫) নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস সুদভিত্তিক গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে দারিদ্র্যকে চাইলেই জাদুঘরে পাঠাতে পারবেন না। সুদ মানুষকে দরিদ্র বানায় ও সম্পদকে কুক্ষিগত করে এবং জাকাত মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি ও পরিশুদ্ধির নিয়ামক। জাকাত স্তম্ভ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে শিশুরাষ্ট্র ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর রা. (৬৩২-৬৩৪) এর ন্যায় কোমলমতি ঈমানদীপ্ত মহাপুরুষ জাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। পরবর্তী খলিফা ওমর ফারুকের (৬৩৪-৬৪৪) এক প্রশ্নের জবাবে আবু বকর রা. বললেন, আল্লাহর কসম, যে ব্যক্তি সালাত (নামাজ) ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি অবশ্যই তার সাথে যুদ্ধ করবো যদিও তারা সালাত ও সাওমসহ ইসলামের অন্যান্য ফরজ স্তম্ভসমূহ মেনে চলতো। (হযরত আবু হুজাইফা রা. ইমাম বুখারি ও মুসলিম, রিয়াদুস সালেহিন, তৃতীয় খণ্ড হাদিস নং ১২১০, পৃষ্ঠা ১৪৬; বি. আই সি ঢাকা-১৯৯২)

একজন ঈমানের দাবিদার ধনী মুসলমানের পক্ষে জাকাত ওশরসহ দ্বীন ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজ অথচ কুরআন হাদিসের আলোকে সব কিছু জেনেও যারা তদনুযায়ী আমল করে না, তারা ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনে যতই সুখ-সমৃদ্ধিতে থাকুক না কেন, পরকালীন স্থায়ী জীবনে তাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত। চলতি শতকের শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমে দ্বীন আল্লামা ড. ইউসুফ কারজাবিসহ অনেকে আর্থসামাজিক সমস্যা সমাধানে জাকাতের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি করেছেন। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে জাকাতদাতাদের সচেতন কল্পে সামান্য সমীক্ষা পেশ করা হলো:

জাকাত ও ওশরের মধ্যে পার্থক্য

ইসলামী অর্থনীতির দুুটো গুরুত্বপূর্ণ উৎস জাকাত ও ওশরের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব নিয়ে সঙ্গত কারণে এই ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধে আলোচনায় যেতে চাই না। জাকাত ও সালাত প্রকৃতপক্ষে গোটা দ্বীন ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী ফরজ ইবাদত। দৈনিক ইবাদাতে সালাত সমগ্র দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করে। সালাত আল্লাহর হক আদায় করার জন্য প্রত্যহ বান্দাহকে তৈরি করে এবং জাকাত বছরে মাত্র একবার আদায় করার মাধ্যমে ও আল্লাহপ্রেমের গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করে। এভাবে হক্কুল্লাহ ও হক্কুল ইবাদ এ দু’প্রকার হক ঠিক ঠিক আদায় করার নামই ইসলাম। কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য যে, ৮৫% জন মুসলিম অধ্যুষিত দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের একটি স্তম্ভ (জাকাত) কোন মতে বেসরকারিভাবে স্বীকৃতি পেলেও, দ্বীন কায়েম না থাকার কারণে ঢিলেঢালাভাবে একটা জাকাত বোর্ড করা হলেও সালাত কায়েম করার কোন সরকারি উদ্যোগ নেই।

ওশর জমির জাকাত এবং অন্যান্য সম্পদের জাকাত থেকে স্বতন্ত্র। তাই ইসলামী শরিয়তে ওশরকে জাকাত থেকে আলোচনার দাবি রাখে। নিম্নোক্ত জাকাত ও ওশরের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উভয় বিষয় সম্পর্কে একটা ধারণা পরিষ্কার হতে পারে।
১. ওশর দেয়ার জন্য জাকাতের ন্যায় ফসলের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। জমির ফসল বাড়িতে এনে পরিমাপ করার সাথে সাথেই ফসলের ওশর দেয়া ফরজ হয়ে যায়। কিন্তু অন্যান্য সম্পদের জাকাত ফরজ হবার জন্য এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত। এ পার্থক্যের দরুন বছরে বিভিন্ন মওসুমে যে কয়টি ফসল পাওয়া যায় তার প্রত্যেকটির ওপরে ভিন্ন ভিন্নভাবে ওশর ফরজ হয়।
২. ওশর ফরজ হবার জন্য জমির মালিক হওয়া শর্ত নয়। শুধু উৎপন্ন ফসলের মালিক হওয়া শর্ত।
৩. ওশর ফরজ হবার জন্য ঋণমুক্ত শর্ত নয়। জাকাতের ব্যাপারে ঋণ পরিশোধ করার পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকলে তার হিসাব করে জাকাত আদায় করতে হবে। কিন্তু ওশর আগে দান করার পর ঋণ পরিশোধ করতে হবে।
৪. ওশর ফরজ হবার জন্য সুস্থ ও প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া শর্ত নয়। নাবালেগ ও পাগল ব্যক্তির ফসলের ওশর ফরজ হয় কিন্তু তাদের সম্পদে জাকাত ফরজ হয় না।
৫. যদি কোনো মুসলিম অন্য কারো জমি বর্গা কিংবা ইজারা নিয়ে ফসল উৎপন্ন করে অথবা ওয়াকফকৃত জমি চাষ করে ফসল পায় তবে তাতে ওশর ফরজ হয় কিন্তু জাকাত ফরজ হবার জন্য সম্পদের মালিক হওয়া শর্ত।

জাকাত ও ওশর আদায়ের কতিপয় প্রচলিত ভুল

ক. আমাদের দেশে কতিপয় কৃপণ অথচ বুদ্ধিমান রয়েছে যারা মনে করে যে ইনকাম ট্যাক্স দিলে আবার জাকাত দিতে হবে কেন। অথচ সরকারের পক্ষ থেকে জনসাধারণের ওপর যে ট্যাক্স ধার্য করা হয়ে জাকাত এ ধরনের কোনো জিনিস নয় কিংবা বিকল্প কিছু নয়। এ হচ্ছে একটা আর্থিক ইবাদত এবং দ্বীন ইসলামের অন্যতম রুকন বা স্তম্ভ, যেমন নামাজ রোজা হজ আদায় ইত্যাদি আল কুরআনে সালাতের সাথে জাকাত কায়েমের কথা ৩২ থেকে ৮২ স্থানে উল্লিখিত হয়েছে। এটা হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র দ্বীন ইসলামের একটি অপরিহার্য স্তম্ভ যা প্রত্যেক যুগে নবী-রাসূলগণের দ্বীন ও শরিয়ত ছিল।
জাকাত ব্যবস্থার ফলে মানুষের মনে এবং ইসলামী সমাজে যে বিরাট নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বোধোদয় হয় তা একমাত্র তখনই হতে পারে যখন ইবাদত ও ট্যাক্সের মৌলিক পার্থক্য মনে বদ্ধমূল হবে এবং জাকাতকে আল্লাহর অবশ্য পালনীয় ইবাদত মনে করেই তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে (ঝঢ়ড়হঃধহবড়ঁংষু) আদায় করা হবে।
খ. কারো কারো ধারণা যে ব্যাংকে জমাকৃত টাকার জাকাত দিতে হবে না। কিন্তু সঠিক মাসআলা যে ব্যাংকে রাখা জামানতের ওপর জাকাত আদায় ওয়াজিব।
গ. আমাদের দেশে কোনো কোনো মুসলিম পরিবারের ধারণা ব্যবহৃত অলঙ্কারের জাকাত দিতে হবে না। কেউ কেউ তো নেসাব পরিমাণ থেকে অব্যাহতি পাবার লক্ষ্যে স্বীয় কন্যা তথা স্বজনদের মধ্যে বিয়ের আগেই অলঙ্কার বণ্টন করে থাকে। এ প্রসঙ্গে খোদ রাসূল সা. আমলের একটা ঘটনা উল্লেখযোগ্য। একবার ইয়েমেনের জনৈক সম্ভ্রান্ত মহিলা বিশ্বনবী সা.-এর খিদমতে হাজির হলে ভদ্রমহিলার সাথে তার যুবতী কন্যা যার হাতে সোনার দুটি মোটা কঙ্কণ ছিল। মহানবী সা. জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি তার জাকাত দাও? সে উত্তর দিল জি-না। নবী সা. বললেন তুমি কি এটা পছন্দ কর যে ভয়াবহ কিয়ামতের দিন ঐ অপরাধে আগুনের কঙ্কণ তোমাকে পরিয়ে দেয়া হোক? একথা শুনে মহিলাটি কন্যার হাত থেকে কঙ্কণ দু’টি খুলে নবী সা.-এর হাতে দিয়ে বললো ‘এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টির জন্য পেশ করা হলো।’ (নাসায়ী ও তিরমিজি)
ঘ. ঘরে কাজ কর্মের যে সব চাকর-চাকরানী থাকে তাদের কাজের মজুরি ও বেতন হিসেবে তাদেরকে জাকাত থেকে দেয়া জায়েজ হবে না।
ঙ. কাউকে হকদার মনে করে জাকাত দেওয়ার পরে জানা গেল সে অমুসলিম, তাহলে জাকাত আদায় হবে না পুনরায় ঐ পরিমাণ জাকাত আদায় করতে হবে।
আমাদের সমাজে অনেক দ্বীনদার এমনকি কোনো বড় ওলামা-মাশায়েখকে বলতে শোনা যায় যে, আমরা জমিনের খাজনা দিয়ে থাকি। তাই ওশর দিতে হবে না। আবার কেউ কেউ বলেন, আমরাতো আনুমানিক ওশর মাদরাসা, মক্তব, মাজার, মাসজিদ, লিল্লাহ বোর্ডিং, কিংবা পীর মাশায়েখকে দিয়ে থাকি, তাতে ওশর আদায় হয়ে যাবে। অথচ জাকাত ও ওশর প্রদানের বিধান, যেখানে জাকাত দিতে হবে। ঠিক সেখানেই ওশর দিতে হবে। এমনি ধরনের বিভিন্ন বিভ্রান্তি ও সমস্য হতে মুসলিম উম্মাহকে বাঁচাতে হলে এবং আদালতে-আখিরাতে আল্লাহ ঘোষিত আযাব তথা কঠিন শাস্তি হতে রেহাই পেতে জাকাত ও ওশরের ব্যাপারে কুরআন-হাদিস এবং সাহাবায়ে কিরামদের সঠিক নির্দেশনা ও মতামত জানতে ও মান্য করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। (আসান ফেকাহ, ২য় খণ্ড, ২:৫৫, মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী, ভারত)

জাকাত না দেবার শাস্তি ও পরিণতি

সামাজিক জীবনে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাকাত ও ওশর খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলতে অকল্পিতভাবে সাহায্য করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ ধনী ও সম্পদশালীরা জাকাত ও ওশরের মাসায়ালা মাসায়েলে যথার্থভাবে জানে না। জানার চেষ্টাও তেমন করে না। বড়জোর একটু আধা মোল্লা মৌলভীর কাছে জিজ্ঞেস করে বিভ্রান্ত হয়। অথচ অধিকাংশ মুসলমানের জ্ঞাত থাকার কথা, জাকাত প্রদান না করলে বা প্রদানে গরমিল বা গড়িমসি করলে এমনকি শঠতার আশ্রয় নিলে শরিয়তের নানাবিধ শাস্তির বিধান রয়েছে। আল কুরআনের সূরা তাওবায় ৩৪ ও ৩৫ নং আয়াতে, সূরা আলে ইমরানের ১৮০, সূরা হামিম সাজদাহর ৬-৭ নং আয়াতে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যারা জাকাত দেয়না বুখারিসহ অসংখ্য হাদিসে আখিরাতের ভয়ঙ্কর আযাবের চিত্র এঁকেছেন। হযরত মুসা (আ)-এর জামানায় তাঁর একান্ত আপনজন কুখ্যাত ধনকুবের কারুনের মালের জাকাত না দেয়ায় শোচনীয় পরিণতির কথা কার না জানা রয়েছে। জনৈক বাগান মালিকের কৃপণ পুত্র কর্তৃক শস্যাদির (ফলের) ওশর না দেয়ার দরুণ উক্ত বাগানের ফল ধ্বংস হবার ঘটনা সূরা কালামে বর্ণিত হয়েছে। (৬৮:১৭,৩২)
আজো আমাদের সমাজে প্রায়ই পরিদৃষ্ট হয় সম্পদের জাকাত অনাদায়ে বহু ধনী ব্যক্তি শুধু নিঃস্ব নয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আর মালামাল নিয়ে নদীতে ডুবে যাওয়া জাকাতদাতা ক্ষয় ক্ষতির শিকার হতে আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করেছেন। বিত্তশালীদেরকে অতীত ও বর্তমানের একটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সচেতন ও সক্রিয় হবার আহ্বান রাখছি।

জাকাত আদায় প্রসঙ্গে ইজতিহাদ কাম্য কি?

জাকাত আদায় প্রসঙ্গে আল কুরআনের সূরা তাওবার ৬০ নং আয়াতে বর্ণিত খাতের বাইরে নতুন কিছু চিন্তা ধৃষ্টতা ও কুফরির শামিল। তবে দু’একটা খাত নিয়ে ইজতিহদের প্রয়োজন আছে কিনা সুহৃদ পাঠকদের মধ্যে ওলামা, গবেষক ও ইসলামী চিন্তানায়কদের সবিনয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। কেউ কেউ বলতে চায় বিশ্বনবী সা. এর সময় থেকেই প্রধানত দাসপ্রথা বন্ধ হয়ে গেছে, তাই এখনতো আর জাকাত দেওয়ার সুযোগ নেই। আমার ধারণায় দাস কিংবা বন্দীমুক্তির বাস্তব অর্থে কোনোদিন শেষ হবে বলে মনে করার কোনো কারণই ছিল না। বর্তমানে যারা জরিমানা/জামিনের অর্থাভাবে জেলে কিংবা অন্য কোথাও আটক থাকে, তাদের মুক্তির জন্য জাকাত/ওশর আরো অধিক পরিমাণে দেয়া উচিত। বলাবাহুল্য, কারাবন্দী বলতে আমি খুন-খারাবি কিংবা ধর্ষণ, সন্ত্রাসকারীদের কথা বলছি না। আল্লাহর নবী হযরত ইউসুফ আ. ও হযরত ঈসা আ. এবং আধুনিক কালে ইখওয়ান নেতা কর্মীদের ন্যায় দেশে বিদেশে বিনা অপরাধে কারা প্রাচীরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মানবেতর জীবন যাপন করছে, বিশ্ববরেণ্য নায়েবে রাসূল সা. হয়েও আমরণ কারাভোগ করছে তাদের কথা বলছি। সূরা আলে ইমরানের ১০৩-১০৪ আয়াতে ও সূরা আন নিসার ৭৪-৭৫ আয়াতের নির্দেশক্রমে মুমিনদের ও আল্লাহর সাথে জিহাদ করার জন্য জান দেবার পাশাপাশি মাল দেওয়া অপরিহার্য।

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর ব্যপদেশে অসি-মসি দিয়ে হোক, অথবা কঠোর শ্রম সাধনা দ্বারা হোক, তার সীমারেখা এতো সীমিত নয় যে তার অর্থ সশস্ত্র যুদ্ধ এবং তা এতটা ব্যাপকও নয় যে, তার মধ্যে দৈনন্দিন সকল সমাজ সেবামূলক কাজও করা যায়। অতীতের ইসলামী চিন্তাবিদ বিশেষ করে গেল শতকের প্রাজ্ঞ মুসলিম মনীষীগণ (জিহাদ) ফি সাবিলিল্লাহর নিয়্যতে খাতে সর্বসম্মত এ অর্থ গ্রহণ করেছেন, যেভাবে তা দ্বীনে হক কায়েম করার জন্য তা প্রচার ও প্রসারের জন্য ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ ও রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য করা হয়। জাকাত উসুলকারী কর্মচারীদের ন্যায় উক্ত মুজাহিদ যানবাহন ক্রয়সহ যাতায়াত খরচ ও প্রয়োজনীয় সাজ-সরঞ্জাম ক্রয় তথা সংগ্রহ করার জন্য জাকাত থেকে অর্থ ব্যয় করার জোর দাবি রাখে। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নির্দেশিত ব্যয়ের খাতগুলো উল্লেখ করা হলো। (কুরআন ও হাদিসের দর্পণে মানব জীবন পৃ: ১৬৩, ৭৫)
প্রবন্ধকারের উপরিউক্তি প্রস্তাব ও পরামর্শ উপলব্ধি ও মূল্যায়নে সহায়ক হবার কথা।
এ সাদাকা (এখানে জাকাত) তো ফকির মিসকিনদের জন্য এবং তাদের জন্য যারা সাদাকার কাজের জন্য নিয়োজিত এবং তাদের জন্য যাদের মন জয় করা উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য, ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্ত করার জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করার উদ্দেশ্যে অবশ্য পালনীয় কাজে আল্লাহর পক্ষ থেকে। (সূরা তাওবাহ : ৬০)।

পরিশেষে বলতে চাই জাকাত/ওশর মহান আল্লাহ তায়ালার অমোঘ বিধান এবং এটি চলমান প্রক্রিয়া। এ শর‘য়ী বিধান অনুসারে যে সম্পদ অর্জিত হয়ে থাকে, তার জাকাত/ওশর আদায় করা ফরজ। ফসলের জাকাত (ওশর) ফসল কেটে মাড়াইয়ের সময় আদায় করতে হয়। বিলম্ব ও বকেয়া হলে সেটি আল্লাহর কাছে ঋণ হিসেবে গণ্য হবে। এ মহান ব্যবস্থাকে গতিশীল করা গেলে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার জাকাত এবং লক্ষ লক্ষ টন ওশর আদায় হবে। ফলে ইসলামী অর্থনীতিই শুধু সমৃদ্ধ ও সচ্ছল হবে না, দারিদ্র্যকে পর্যায়ক্রমে জাদুঘরে পাঠাবার রাজপথ প্রশস্ত হবে। এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ একদিন সুজলা, সুফলা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় পরিণত হবে। ইনশাআল্লাহ।

সবশেষে আর একটি বিষয়ে জাকাত সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতে নানাভাবে অর্থ অপচয় সত্ত্বেও এদেশে গত কয়েক বছরে কোটিপতির সংখ্যা নাকি অনেক বেড়ে গেছে। অথচ জাকাতদাতা বৃদ্ধির কোনো উল্লেযোগ্য উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সম্প্রতি সরকার কর্তৃক জাকাত বোর্ড বাতিল পূর্বক জাকাত ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সংস্কার করা হয়েছে। বৈশ্বিক করোনার ছোবলে দেশের অর্থনীতি তছনছ হয়ে গেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনেকটা বিলুপ্তির পথে। আর কথায় বলে অভাবে স্বভাব নষ্ট এবং দরিদ্রতা মানুষকে কুফরির পর্যায়ে নিয়ে যায়। তাই এই দারিদ্র্য বিলুপ্তির জন্য জাকাত ওশরভিত্তিক অর্থনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আল্লাহর আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সকল ধর্মপ্রাণ ভাইবোনদের আশু দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি গৌরনদী কলেজ, বরিশাল

SHARE

Leave a Reply