দুর্নীতিমুক্ত সমাজগঠনে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা -আ. জ. ম. ওবায়েদুল্লাহ

গত ১৬-ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালনের মুহূর্তে দেশের জন্য এক দুঃখজনক সংবাদ প্রকাশিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। ২ প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এর মধ্যে আছে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানির মূল্য বেশি দেখানো (Over invoicing) এবং রপ্তানিতে মূল্য কম দেখানো (Under invoicing)। এর মধ্যে এক বছরের পাচার করা অর্থ দিয়েই তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশ থেকে প্রতি বছর যে টাকা পাচার হয়, এটি তার আংশিক চিত্র। “বাংলাদেশ কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো কেবল নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে দুর্নীতি আজ উন্নয়নের পথে একটি প্রধান বাধা। দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক অনুন্নয়নের সাথে সাথে বাড়ছে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, দেখা দিচ্ছে সুশাসনের অভাব। জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও এ কারণে গড়ে উঠতে পারছে না।” বিশ্বের ৯১টি দেশ নিয়ে দুর্নীতি সংক্রান্ত যে জরিপ (২০০১) পরিচালনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) তাতে ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবারই বাংলাদেশের অবস্থান দুর্নীতির শীর্ষে, সুনীতির সর্বনি¤েœ। সর্বশেষ জরিপে ২০২০-এর হিসাব পাওয়া যায়। বাংলাদেশ তাতে ২৬ স্কোর করে ১২তম অবস্থানে আছে। ২০১৮ ও ২০১৯-এও একই অবস্থান ছিল। দাতাদেশসমূহ উন্নয়নশীল দেশসমূহকে ঋণ দানের ক্ষেত্রে সুশাসনকে শর্ত করেছে, দাতাগোষ্ঠীর আলোচনায় ‘সুশাসনের অভাব আর ব্যাপক দুর্নীতি’, মুখ্য ইস্যু হিসেবে উঠে আসছে।

জগৎজোড়া এই দুর্নীতি সমাজের উঁচু স্তর হতে নিচে পর্যন্ত রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। মূলত প্রশাসনযন্ত্রের গোটাটাই আজ আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। বাংলাদেশের এক সরকারপ্রধান দুর্নীতিকে একটি ‘কাল ব্যাধি’ হিসেবে সংসদে উল্লেখ করেছেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সকল প্রধান দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘দুর্নীতি উচ্ছেদ’কে অন্যতম ইস্যু হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। কোনো কোনো সরকার ‘দুর্নীতির’ বিরুদ্ধে জিহাদও ঘোষণা করেছেন। কিন্তু দিন যত যায়, আঁধার ততই ঘনায়। দুর্নীতির অক্টোপাস আমাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দী করে ফেলেছে। একজন সরকারপ্রধানকে আফসোস করে বলতে হয়েছে, ‘ঘুষ না দিলে চাকরির ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের সুপারিশেও কাজ হয় না।” এই সর্বগ্রাসী দুর্নীতির হাত থেকে দেশ, জাতি ও সমাজকে রক্ষা করার সকল সুদৃঢ় অঙ্গীকার কোথায় যেনো হারিয়ে যাচ্ছে, প্রতিদিন প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে দুর্নীতির দৃশ্যমানতা ও শক্ত ভিত।

একটি সুখী, সুন্দর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ এবং এক অনাবিল আনন্দভরা পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের আজ এক নাম্বার এজেন্ডা, একটি দুর্নীতিমুক্ত বিশ্ব। এ কাজটি করতে হলে আম খাওয়ার জন্য যেমন আমগাছ লাগানো দরকার তেমনি দুর্নীতিবিরোধী মন-মানস চিন্তা-চেতনা ও বাস্তব সাহস সঞ্চারী একটি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার প্রণয়ন একমাত্র সমাধান। আজকের প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় এটি।

সমাজ ও ব্যক্তি মানুষ
মানুষ একটি সামাজিক জীব, social being। সমাজবদ্ধতা তার প্রধান বৈশিষ্ট্য। সমাজবদ্ধতা পিপীলিকা বা মৌমাছিরও বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মানুষের সমাজবদ্ধতা তার survival এর জন্য অপরিহার্য। মানুষ একা বাস করতে পারে না। তাদের পরস্পরের ওপর নির্ভর করতে হয়।
পরিবার সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। আর এর বৃহত্তম একক রাষ্ট্র। সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষকে অনেক রকম ভূমিকাই পালন করতে হয়। বাবা, মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, চাচা-চাচী ইত্যাদি নানারকম আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকে মানুষের মাঝে। ফলে এ সম্পর্ক সূত্র ধরে তাদের কিছু আত্মীয়তার অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্জন ও পালনের ব্যবস্থা রয়েছে। এই মানুষেরা, ব্যক্তিরা সকলে মিলে সমাজ।

মানুষের সমাজ আজ অনেক বিস্তৃত। ছোট থেকে বড় সমাজ কাঠামোয় (Social structure) মানুষকে যুক্ত থাকতে হয় নানা বিষয়ে। এ যুক্ততা তাদের সামনে আনে দায়িত্ব ও কর্তব্যের পাহাড় আবার সুযোগ-সুবিধার বিশাল প্রান্তর। এখানে পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতাগুলো আস্তে আস্তে প্রকট হতে থাকে। নানা প্রকারের আর্থিক সুযোগ, প্রশাসনিক ক্ষমতা, সামাজিক মর্যাদা সামনে আসতে থাকে। সমাজ সুন্দর ও সুস্থ থাকার জন্য এসব বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ (controlled) রাখার ব্যবস্থাও থাকে। তবে সকল ক্ষেত্রেই রয়ে গেছে আইনের ফাঁক, অদৃশ্য সুযোগ-সুবিধা। সমাজ ততটাই সুস্থ হবে যতটা সুস্থ হবে এর মানুষেরা, ব্যক্তিগণ। ব্যক্তি সমাজের একক। তাই, সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আয়োজন রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থার।২

দুর্নীতি এক দুষ্টু ব্যাধি
Oxford Advanced learning Dictionary’র মতে দুর্নীতি বা corruption হচ্ছে dishonest বা illegal behaviour especially of people in authority. অর্থাৎ দুর্নীতির সাথে ক্ষমতার সংযোগ রয়েছে। ক্ষমতাহীন লোক দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সমাজের বিভিন্ন কাঠামোতে নিয়োজিত বা নির্বাচিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ, সরকারি বা বেসরকারি যে ধরনের প্রতিষ্ঠানেই হোক না কেন যখন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম, অসততা বা অবৈধ আচরণ করেন তাকে আমরা বলি দুর্নীতি।
দুর্নীতির একটি সুন্দর ও গ্রহণীয় সূত্র প্রকাশ করেছেন Robert Klitgaard. তার সূত্র অনুযায়ী Corruption (দুর্নীতি) = Monopoly power (একচ্ছত্র ক্ষমতা) + Discretionary power (মর্জিমাফিক ক্ষমতা) – Accountability (জবাবদিহিতা)
এ সূত্র অনুযায়ী দেখা যায় দুর্নীতিপ্রবণতার জন্য দায়ী হচ্ছে ক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ভারসাম্যহীনতা। এই দুইয়ের পার্থক্য যত বড় হবে দুর্নীতির মাত্রা তত বৃদ্ধি হবে।
উন্নত বিশ্বে দুর্নীতি কম, নাই বললেই চলে। এর প্রধান কারণ সেখানে জনগণ শিক্ষিত, সচেতন, প্রতিবাদী, আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত, সর্বোপরি গণ জবাবদিহিতা বা public accountability বেশি। সেখানে মানুষের মাঝে দেশপ্রেম বড়, ব্যক্তি স্বার্থের চাইতে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
দুর্নীতি যাচাই করার জন্য সব সময়ই দেখা হয় ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য দক্ষতার অপব্যবহারের মাত্রাও abuse of power for personal gain
ক্ষেত্র হিসেবে যেদিকেই আমরা তাকাই সেদিকেই দুর্নীতি দেখতে পাই। বাংলাদেশের মতো কোনো কোনো দেশে দুর্নীতিই হলো সবচাইতে সংগঠিত বিষয় most organised thing. কেবল সংগঠনই নয় এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপও লাভ করেছে শক্তভাবে। এজন্য বলা হয় Corruption is highly institutionalised. অফিসগুলোর চেয়ার টেবিলও ঘুষ খায় বলে একটা প্রবাদ চালু আছে। প্রবাদটা আরেকটু শুদ্ধ হয় যদি বলা হয়- “সাহেবেরা হাতে ঘুষ ছুঁয়েও দেখেন না, উনাদের ড্রয়ার কিংবা account-গুলো ঘুষ নেয়।”
জাপানে প্রায় সময়ই দেখতে পাওয়া যায় মন্ত্রীগণ ঘুষের দায়ে চাকরি হারাচ্ছেন কিংবা পদত্যাগ করছেন। দুর্নীতি সেখানে উপরতলার কাজ। একজন পুলিশ সেখানে ঘুষের কথা চিন্তাও করতে পারে না। এক সময় মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডের পুলিশও সেটা জানতো না, কিন্তু ঐ যে কথায় বলে- ‘রোগ সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়’। যার কারণে প্রবাসীদের সংখ্যাধিক্য হওয়ার পর ঘুষের দুর্নীতির অপসংস্কৃতি বাংলাদেশ থেকে ওসব দেশেও সংক্রমিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) কী?
বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রতি বছর সিপিআই (করাপশন পারসেপশনস্ ইনডেক্স বা দুর্নীতির ধারণা সূচক) প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতির বিশ্বব্যাপী ব্যাপকতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে। সিপিআই- এ অন্তর্ভুক্ত দেশসমূহের রাজনীতি ও প্রশাসনে বিরাজমান দুর্নীতির ব্যাপকতা সম্পর্কে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, সংশ্লিষ্ট খাতের গবেষক ও বিশ্লেষকবৃন্দের ধারণার ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট দেশকে ০ (উচ্চ মাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত) থেকে ১০০ (কম মাত্রায় দুর্নীতিগ্রস্ত) এর স্কেলে পরিমাপ করে স্কোর এর মাধ্যমে দেশসমূহের দুর্নীতির অবস্থান নির্ণীত হয়।

দুর্নীতির তিনটি প্রধান খাত : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

দুর্নীতি কত ব্যাপক তা বুঝার জন্য এ ছোট্ট আলোচনাটি জরুরি। ২০০১-২০০৫ পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে মোট ৩৮টি খাতে দুর্নীতির শতকরা হার নির্ণয় করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পত্রিকায় প্রকাশিত ১৫১৪টি দুর্নীতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (২৪৭), শিক্ষা (১৯৩), স্থানীয় (৮৩), যোগাযোগ (১১) এই পাঁচটি খাতের রিপোর্ট ৫০% এরও বেশি। এরপরই আছে ভূমি প্রশাসন, ডাক ও টেলিযোযোগ, অর্থ ও কর বিভাগ। অর্থাৎ সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী ৫টি খাত সর্বাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত খাত।
২০১৭ সালে এ চিত্রটি নিম্নরূপ: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর তথ্য মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ৭২.৫%, পাসপোর্ট ৬৭.৩% বিআরটিএ ৬৫.৪%, বিচার বিভাগ ৬০.৫%, ভূমি প্রশাসন ৪৪.৯%, শিক্ষা ৪২.৯% ও স্বাস্থ্য ৪২.৫% সার্ভিসের ক্ষেত্রে দুর্নীতি করেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার আওতাধীন উপখাতসমূহ হলো- পুলিশ, বিডিআর, আনসার, ভিডিপি। পুলিশ সম্পর্কে জনগণের ধারণা অত্যন্ত নেতিবাচক। ২০০০ সালের এক জরিপে দেখা যায় ৯৫% জন মানুষ মনে করে পুলিশ দুর্নীতিপরায়ণ। পুলিশ বাহিনীতে শতকরা হার অনুযায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ ও ভীতিপ্রদর্শন এই দুই ধরনের দুর্নীতি শীর্ষে যথাক্রমে ৫৩% ও ২৫%। পুলিশের একজন এসআই পোস্টিংয়ের জন্য ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেন। দুর্নীতিলব্ধ অর্থ না চাইতেই শতকরা হারে উপরের দিকের কর্তাদের হিসাবে জমা হয়।

শিক্ষা খাত বাংলাদেশের সরকারের অন্যতম বৃহৎ খাত। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সাথে জড়িত জনসংখ্যাও বিশাল। শিক্ষার হার কাগজে কলমে বর্তমানে ৩৭%। এটি বাজেটের সর্বাধিক বরাদ্দের একটি খাত। উন্নয়ন, বৃত্তি, উপবৃত্তি সব মিলে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যয় বরাদ্দ হয়। এখানে উপখাতগুলো মোটামুটি- মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসসমূহ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, জাতীয় ও উন্মুক্তসহ স্বায়ত্তশাসিত বিশ^বিদ্যালয়সমূহ, ফুড ফর এডুকেশন, শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষা সচিবালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ প্রশাসন। মজার জিনিস হচ্ছে- এখানকার প্রতিটি লোক ‘জাতির মেরুদণ্ড’ শিক্ষার মেরুদণ্ড সোজা রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত। এরা সবাই শিক্ষিত, শিক্ষার জন্য নিবেদিত। অথচ এখানে এমপিওভুক্তীকরণ থেকে শুরু করে উন্নয়ন বরাদ্দ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট হারে ংঢ়ববফ সড়হবু বা ঘুষ হিসেবে ব্যয় করতে হয়। এক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে মাদ্রাসা বোর্ড। এক্ষেত্রে দুর্নীতির ধরনের মাঝে-ক্ষমতার অপব্যবহার সর্বাধিক। এর পরপরই হচ্ছে ‘ডোনেশন’ ও ছাত্রদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আত্মসাৎ। প্রতারণার ঘটনা বেশি শিবিখা ও মাদ্রাসাসমূহে (অতিরিক্ত ছাত্র দেখানো। শিক্ষকের অতিরিক্ত তালিকা ইত্যাদি)। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকায় শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির আশ্রয় নেন।

স্থানীয় সরকার খাতে সরকারের খরচ হয় হাজার কোটি টাকা। সেখানে জেলা পরিষদ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, রাস্তাঘাট, খাল কাটা কর্মসূচিসহ অনেক খাত। সকল ক্ষেত্রেই রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার রেকর্ড। ক্ষমতার অপব্যবহার বেশি ঘটে- জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও ওয়াসায়।
স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কথা বলাই বাহুল্য। রোগী সেবার প্রতি আন্তরিকতা ও সহানুভূতির অভাব, ঔষধ আত্মসাৎ, নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, হাসপাতালে দালাল-টাকা-সন্ত্রাসীদের অবস্থান, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দোর্দণ্ড প্রতাপ, সর্বোপরি দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্যসেবার মান দিনদিন নিম্নমুখী। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ২০ হাজার কোটি টাকার উপরে ব্যয় করার পরও দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার অভাবে দুর্নীতি সমগ্র স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্যসেবাকে বিঘিœত করছে। জেলা ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সিভিল অর্জন অফিস এবং পরিবার কল্যাণসহ সার্বিক স্বাস্থ্য খাত দৃশ্যত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত (ইত্তেফাক, ৫ ডিসেম্বর, ২০০০)। এ খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার (৬৫%), দায়িত্বে অবহেলা (১৫%), ঘুষ (১৪%) এবং প্রতারণার (৯%) ঘটনা উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির রেকর্ড ২০২০ সালে সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি মহামারী করোনাতেও তারা পাল্লা দিতে ছাড়েনি।
এভাবে আমরা অনুসন্ধানে যতই গভীরে যাবো ততই হতাশ হবো। দুর্নীতির করাল গ্রাসে ভেসে যাচ্ছে আমাদের মূল্যবোধ। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী যেনো বেতন পান চাকরি করেন, তাই আর সেবা দিতে হলে তাদের চাই ঘুষ। উপরি পাওনা ছাড়া যেনো কোন ফাইলই নড়ে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা এক সুদূর পরাহত বিষয়।

দুর্নীতির কুফল
দুর্নীতি আমাদের এক নম্বর না হলেও অন্যতম প্রধান সমস্যা। পৃথিবীর অন্যতম অনুন্নত, দরিদ্র দেশ যার মাথাপিছু আয় এখনও মাত্র ২৫৫৪ ডলার, ব্যাপক গণদারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, জনসংখ্যাধিক্য, অপুষ্টি, সম্পদের অভাব, পশ্চাৎপদ অর্থনীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সুশাসনের অভাব এবং সরকারের বিভিন্ন দফতর, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে সর্বব্যাপী দুর্নীতি লেগে আছে। এর ফলেই দেশটি কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ^ব্যাংকের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট অ্যাসেসমেন্টে বলা হয়েছে- “সরকারি অফিসে ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না। ঘুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেন এটা বেতনের অংশ হয়ে গেছে।” (দৈনিক যুগান্তর, ৯ জানুয়ারি ২০১১)। দুর্নীতির ব্যাপারে এখন আর কারো রাখঢাক নেই। দৃশ্যত দুর্নীতি না থাকলে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীগণ কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, টেন্ডার গৃহীত হয় না, ফাইল নড়ে না। প্রকল্প বাস্তবায়ন বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন, দুর্নীতি যেনো বাংলাদেশের প্রশাসনযন্ত্রের চালিকাশক্তি।

দুর্নীতিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মূলত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতির সমন্বিত প্রভাবের কারণে। সোজাসাপ্টা ভাষায় বলা যায়- দেশের একশ্রেণীর আইনপ্রণেতা ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ পারস্পরিক যোগসাজশে দেশে দুর্নীতিকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন। দেশটি এখনও দারিদ্র্যপীড়িত জনপদ। দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য যত বরাদ্দই হোক না কেন তার সিংহভাগ চলে যায় দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, কর্মী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উদরে। একটি দুর্নীতির কালো বিড়াল (Black Cat) উন্নয়নের সব অর্থ খেয়ে ফেলে। বরাদ্দের ৭০% লুটপাট হয় (আবুল বারাকাত ২০০১)। ২০২১-এ এ মাত্রা ফুলে ফলে সুশোভিত।
দুর্নীতি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে ফেলছে। দুর্নীতি করার জন্য শারীরিক নির্যাতন, এমনকি হত্যার মতো নারকীয় ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দুর্নীতি করার জন্য সাধারণ জনগণের ওপর চাপ প্রয়োগ করে, অর্থ আদায়ের জন্য নির্যাতন করে। জরিপ থেকে দেখা যায়- সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ডি.আই.জি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আয় তাদের নিজ নিজ বেতনের এক হাজার গুণ বেশি। (দৈনিক ইনকিলাব, ১৮ এপ্রিল ২০০২)
প্রধানত দুর্নীতির ফলে সরকার ও জনগণ- ১. আর্থিক ক্ষতি ২. পরিবেশ বিপর্যয় ৩. শারীরিক নির্যাতন ৪. অধিকার খর্ব ও ৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির শিকার হয়। ২০০৪ এর হিসাব অনুযায়ী সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০১ সালের গবেষণায় পাওয়া যায় প্রধান ৫টি খাতে জনগণের কাছ থেকে জোরপূর্বক আদায় করা অর্থের পরিমাণ ৬১৭.৩ কোটি টাকা। এর শিকার প্রধানত জনগণ। তবে সরকার বঞ্চিত হয় পরোক্ষভাবে। যেমন- ৫০০০ টাকা ঘুষ দিয়ে সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া হয় ৫,০০,০০০ টাকা। অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িতদের একটি বিরাট অংশের সাথে সরকারের বিভিন্ন খাতে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে লেনদেন হয় হাজার কোটি টাকা।

দুর্নীতি দমনে কী কী করণীয়
বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণাপত্র, প্রবন্ধসমূহ ও মতামত জরিপে এ পর্যন্ত যেসব করণীয় নির্দেশক পরামর্শ এসেছে তা নিম্নরূপ-
১. রাজনৈতিক সদিচ্ছা। নেতারা কেবল ইশতেহার বা বক্তৃতায় বললে হবে না এ বিষয়ে আন্তরিক ও বাস্তব কর্মসূচি নিতে হবে।
২. স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। পুরোপুরি স্বাধীন ও পর্যাপ্ত ক্ষমতাসহ এ কমিশন কাজ করতে হবে।
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা সৃষ্টি। জনগণ সব ব্যাপারে অবাধ তথ্যপ্রবাহ পেতে হবে। জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দুর্নীতির বিচারের জন্য আলাদা দ্রুত বিচারালয় করতে হবে। আদালত ও পর্যাপ্ত আলাদা বিচারক থাকতে হবে।
৫. শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শাস্তিমূলক বদলি নয় ‘চাকরিচ্যুতি’র ভয় থাকতে হবে।
৬. ন্যায়পাল নিয়োগ করা।
৭. জনপ্রশাসন সংস্কার করে সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে।
৮. সুশীলসমাজ : জনগণকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন ও সজাগ করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দল ও সুশীলসমাজের।
৯. গবেষণা : দুর্নীতি, এর প্রকার: প্রকৃতি, পরিধি এবং তা নির্মূল নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হতে হবে।
১০. গণমাধ্যম : সচেতনতা বৃদ্ধি ও জনমত সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণমাধ্যমের ভূমিকা আরো বেশি, সাহসী ও জোরালো হলে তা অনেকাংশে সাহায্য করবে।
সবচেয়ে বড় কথা দুর্নীতির সাথে জড়িত মানুষ। দুর্নীতি করে মানুষ, এর ভোগান্তির শিকারও মানুষ। এ কাজটি কেবল আইন তৈরি করার বিষয় নয়। এদেশে আইনের অভাব নেই। অভাব তার সুষ্ঠু ও নিশ্চিত প্রয়োগের। এজন্য মানুষ তৈরির একটি প্রকল্প প্রয়োজন। আর. এ প্রকল্প গড়ে তোলা সম্ভব কেবল শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে।

সৎ, সুন্দর, সুশীল মানুষ ও শিক্ষাব্যবস্থা
ইংরেজ কবি John Milton ঠিকই বলেছেন- Education is the harmonious development of body, mind and soul.” মানুষকে আল্লাহ- দেহ, মন ও আত্মা এ তিনটি উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। একজন সর্বতো সুন্দর সুস্থ মানুষ তিনি যার দেহের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও সুস্থতা রয়েছে, যার মন বয়স অনুপাতে বড় হয়েছে, বিকশিত হয়েছে এবং যার আত্মা আস্তে আস্তে সমৃদ্ধি ও পূর্ণতায় ঋদ্ধ হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় এজন্য এ তিনটি বিষয়ের সমান্তরাল, সামঞ্জস্যপূর্ণ বিকাশের আয়োজন থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে অধিকাংশ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এ তিনটির সমন্বয় ও সামঞ্জস্য ঘটছে না। ফলে আমরা কাক্সিক্ষত মানের মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা ডিগ্রিধারী লোক পাচ্ছি, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, কর্তাব্যক্তি, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী এমনকি ধর্মগুরু পাচ্ছি কিন্তু আমরা আল্লামা ইকবালের সেই কাক্সিক্ষত ‘ইনসানে কামিল’ পরিপূর্ণ মানুষ পাচ্ছি না। আইনস্টাইন যে বলেছিলেন ‘Science without relegion is lame and Religion without science is blind’. তাই যেনো সত্যি হচ্ছে।
একদিকে একদল ধর্মবিদ্বেষী খোঁড়া বিজ্ঞানী ও শিক্ষিত সমাজ সভ্যতার চাকাকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিয়ে চলছে অপরদিকে একদল বিজ্ঞানবিমুখ ধর্মাচারী অন্ধকারের বিভীষিকায় পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরা একদল জাগতিকভাবে খুবই পারদর্শী কলাকুশলী মানুষ পাচ্ছি অথচ তাদের মূল্যায়ন করলে উন্নত এক জাতের রোবট বই মনে হয় না, মনে হয় এরা একদল শিক্ষিত বর্বর (educated savage) তৈরি হচ্ছে। Sir Stanely Pole যে কথা বলেছেন তারই বাস্তবায়ন হচ্ছে সর্বত্র।
এজন্যই আমাদের ব্যর্থতা এক জায়গায় আর তাহলো আমরা পৃথিবীর প্রয়োজনে বিভিন্ন পেশার অসংখ্য লোক তৈরি করছি ঠিকই কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছি একদল সৎ, সুন্দর, সুশীল মানুষ তৈরি করতে। এখন মানুষের ভিড়ে মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অবস্থা যেনো- Water, water, water everywhere, but not a single drop of water to drink. বখে যাওয়া এ মানুষ দিয়ে কী হবে? না সেখানে সুন্দর সমাজ হবে, না কমে আসবে দুর্নীতির মাত্রা, না আসবে কোনো সুখের দিন।
এ অবস্থার মোকাবেলা করতে হলে- বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা, কেরানি ও আমলা তৈরির শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্মহীন কর্মযজ্ঞ সর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা কর্মহীন ধর্মভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা যা-ই এখন আছে এর একটি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
এ কথাই বিগত সত্তর-আশি বৎসর পর্যন্ত তার স্বরে বলা হচ্ছে। ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত মুসলিম শাসকবর্গ বুঝতেই চাচ্ছেন না লর্ড ম্যাকলে কিংবা লর্ড ক্রোমার কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে স্বাধীন দেশ ও জাতিসমূহের উপযোগী খোদাভীরু সৎ মানুষ দিতে পারে না।
ÒIf you give 3R (i.e. Reading, Writing and Arithmetic) to your child and don’t give him the 4th R (i.e. Religion), definitely you will get a 5th R (i.e. Rascality).”- Sir Stanely Pole. Hall

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা ও
ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিশ^নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর আগমনের আগে আরবের সমাজ ছিল একটি জাহেলি সমাজ ও আগাগোড়া দুর্নীতিগ্রস্ত জনপদ। সেখানে তিনি মাত্র ২৩ বৎসরের মাঝে একটি আমূল পরিবর্তন আনয়ন করেন। এই পরিবর্তনটি মূলত সাধিত হয়েছে মানুষগুলোর ভেতর নতুন এক মানুষে পরিণত হওয়ার তাগাদা urge) সৃষ্টি করা এবং তাদের জন্য একটি নতুন সংশোধনী স্কুল প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে দৃষ্টিভঙ্গির বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছে। এ ব্যবস্থায় মানুষ জানতে পারছে তার সাফল্য ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি দুনিয়ার সাফল্য, অর্থবিত্ত নাম-যশ অর্জন।
তার ভেতরে ‘যোগ্যতরের জয়’ ‘Survival of the fittest’ এর অনুভূতি ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। তাকে জানানো হচ্ছে- ‘খাও দাও ফুর্তি কর, দুনিয়াটা মস্ত কর’ ‘Eat, drink and be merry. তাকে নগদের আহ্বানে সাড়া দিতে বলা হচ্ছে- “নগদ যা পাও হাত পেতে নাও বাকির খাতা শূন্য থাক, দূরের বাদ্য শূনে কি লাভ মাঝখানে তার বেজায় ফাঁক।” ভোগবাদী এক দর্শন তাকে উন্মাতাল করে তুলছে।
মানুষকে এই শিক্ষাব্যবস্থা ভেজাল, সুদ আর প্রতারণার মধ্য দিয়ে বড়লোক হতে, আর্থিক লাভ করতে শেখাচ্ছে। বর্তমানে সর্বত্র ব্যবসায়ী মহলের জন্য একটাই সূত্র- Profit maximization, Minimum investment, maximum profit. এ অবস্থায় মানুষ সৎ থাকবে কোত্থেকে। সততা, সত্যবাদিতা, জনকল্যাণ, জনস্বার্থ, জনসেবা এসবতো বহুত ‘দূরকি বাত্’, নির্বাসিত কথামালা।

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের ভেতর প্রেম, প্রীতি, ¯েœহ-মমতা নয়, বরং এক প্রচণ্ড পাশবিক চাহিদাকে উসকে দেয়। জীবনের সুন্দর দিকগুলো উপেক্ষিত হয়ে এখন পাদপ্রদীপে উঠে আসছে নগ্নতা ও অশ্লীলতা।
মুসলিম দুনিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্ম বিতাড়িত, ধর্মকে একটি আচারসর্বস্ব বিষয়ে পরিণত করে ইসলামের শাশ^ত সৌন্দর্য সম্পর্কে তাদেরকে অনবহিত, অনাগ্রহী করে রাখছে। কোথাও যদি ধর্ম পাঠ দেয়া হয় তাহলে তাকে হাত পা দন্ত নখরহীন, ফোঁসফাঁস ঢুশঢাশ করতে অপারগ এক বিষয় হিসেবে শেখানো হয়।
এরই ফলে যে মানুষগুলো দুর্নীতি রোধ করবে তারা দুর্নীতিরvicious circle-এ আটকে পড়া একদল অসহায় মানুষে পরিণত হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সেই প্রজন্ম যারা ‘পুরানেরে তাড়িয়ে, সুন্দর নতুনের সৌধ রচনা করবে, এরকম একটি নতুন প্রজন্ম আশা করা দুরাশা মাত্র।
এক্ষেত্রে একমাত্র ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাই পারে আমাদেরকে নতুন মনজিলে নিয়ে পৌঁছাতে এবং তা পারে নি¤েœাক্ত প্রক্রিয়ায়:
এক. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম : এই শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম হচ্ছে একদল মানুষ তৈরি করা যারা হবে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’, সাচ্চা ‘ঈমানদার’ প্রকৃত ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পণকারী বা এক কথায় জান্নাত পাওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন একদল ‘ইনসানে কামেল’।
দুই. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাস হবে ইসলামী ও জাগতিক বিষয়সমূহের একটি সমন্বিত সিলেবাস। এখানে জ্ঞানের প্রধান উৎসসমূহের সাথে প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে দেয়া হবে। ‘কুরআন’, ‘হাদিস’, ‘ফিক্হ’কে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একজন মানুষকে ‘তাওহিদ’, রিসালাত’, ‘আখিরাতের’ প্রকৃত জ্ঞান ও তা বাস্তবে মেনে নেয়ার মত সম্যক ধারণা প্রদান করা হবে। এর ফলে সে মানুষ অবশ্যই প্রযুক্তি হিসেবে সাম্প্রতিকতম আবিষ্কার, ‘ডিশ’ ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে তবে অশ্লীলতার বিস্তারের জন্য নয় বরং আল্লাহর মহিমা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য ও মানবতার বিকাশের জন্য। এই সিলেবাসে একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরা হবে। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ ‘খলিফাতুল্লাহ’, বিবেকসম্পন্ন, বাকশক্তিসম্পন্ন, জ্ঞানসম্পন্ন জীব হিসেবে তার পরিচয় বিস্তারিতভাবে তাকে জানানোর ব্যবস্থা থাকবে।
তিন. এই শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে জানিয়ে দেবে তাঁর চার স্তর জীবনের চূড়ান্ত (রূহের জগৎ, দুনিয়ার জগৎ, বর্জাখ বা কবরের জগৎ ও আখেরাত) সাফল্য নির্ভর করছে দুনিয়ার কাজ কর্মের ভিত্তিতে আখেরাতের সাফল্যের ওপর। দুনিয়ার স্বল্পতম সময়ে অবস্থানের জন্য আল্লাহ যে হেদায়াত (আল কুরআন) ও সত্য দ্বীন (আল ইসলাম) দিয়েছেন তার ভিত্তিতে জীবন যাপন করেই এই চূড়ান্ত সাফল্য পাওয়া যাবে। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ ও সাফল্য লাভের জন্য যার মন সদা প্রস্তুত তার পক্ষে কল্যাণ ধারা ছাড়া অন্যপথে চলা অসম্ভব।

চার. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা একজন মানুষকে আল্লাহতে সমর্পিত হিসেবে তৈরি করে। তাঁর কাছে এ কথাটি সুস্পষ্ট করে দেয়া হয় যে- আল্লাহ আমাদের ¯্রষ্টা, রব, মালিক, ইলাহ, রাজ্জাক। তিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা। মানুষকে তিনি ভালো ও মন্দ উভয় ধরনের কাজের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ কল্যাণের ওপর থাকতে হলে তার মনে আল্লাহর ভয় বা তাক্ওয়া সৃষ্টি হতে হবে। “আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই সম্মানিত যে আল্লাহকে ভয় করে।”
পাঁচ. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে একজন সামাজিক জীব হিসেবে তার দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ স্থির করে দেয়। তাকে জানিয়ে দেয়- “আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, মা বাবা ভাইবোন, সন্তানাদির প্রতি কী কী দায়িত্ব, এবং এ প্রসঙ্গে অধিকারসমূহও পরিষ্কার করে দেয়। সে লোক আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় যে পেট পুরে খায়, অথচ তার প্রতিবেশী উপোস করে।” তাকে জানিয়ে দেয়া হয় কী কী কাজ করলে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয় আর কোনো কোনো কাজ সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। এভাবে আধুনিক শিক্ষার “ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী” চিন্তার বিপরীতে ইসলামে সামাজিক দায়িত্ববোধ শিক্ষা দেয়া হয়।
ছয়. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা শৈশব থেকেই একজন মানুষের মনে জন্ম দেয় আমানতের তীব্র অনুভূতি ব্যক্তির শরীর, মেধা, যোগ্যতা, সুস্থতা, দৃষ্টি, সৃজনশীলতাসহ সব কিছুই যে আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত, এ আমানতের সুষ্ঠু হেফাজত ও সঠিক পন্থায় তার ব্যবহার নিশ্চিত করাই যে সাফল্যের সূত্র এ কথা জানিয়ে দেয়া হয়। সে সাথে অন্য মানুষের ধন-সম্পদ অধিকার ইত্যাদির আমানত রক্ষাকে গুরুত্বসহ শিখানো হয়। “সফল তারা যারা আমানত হেফাজত করে।” যে আমানত রক্ষা করে না সে ঈমানদার নয়। “মুনাফিকের তিন লক্ষণ- যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা দেয় খেলাপ করে আর যখন আমানত রাখা হয় তার খেয়ানত করে।” এ বিষয়গুলো তাকে পরের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করা থেকে হেফাজত করে, বাঁচায়।
সাত. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা সব সময় মানুষের মাঝে জবাবদিহিতার তীব্র অনুভূতি জাগায়। মানুষকে জানিয়ে দেয়, “আর তাদের জন্য রয়েছে সম্মানিত লেখকদ্বয়, যারা জানে তারা যা করছে।” “তারা সেদিন জানবে যা তারা পাঠিয়েছে আগে ও পরে।” সকল মানুষই তার কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে। “তোমরা পরস্পর পরস্পরের দায়িত্বশীল, প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” “কিয়ামতের দিন প্রত্যেককেই পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, তার আগে সে এক কদমও সামনে যেতে পারবে না- তার জীবন, যৌবন কী কাজে ব্যবহার করেছে, অর্জিত জ্ঞান কোন কাজে ব্যবহার করেছে, আর আয় কোন পথে হয়েছে এবং ব্যয় হয়েছে কোন পথে।” আল্লাহর রাসূলের সাহাবীগণকে তিনি আমানতের যে শিক্ষা দিয়েছেন তাই এ শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থী জানবে। মক্কার লোকেরা তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত ছিল ঠিকই কিন্তু সে অবস্থায়ও তাদের মূল্যবান সামগ্রী তাঁরই কাছে আমানত রেখেছিল।
আট. ‘সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ’ এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম শিক্ষা। মানুষকে এভাবেই জানানো হয়- “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের উত্থিত করা হয়েছে মানবতার জন্য, যাতে তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখো এবং ঈমান পোষণ করো।” এই শিক্ষাব্যবস্থা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি একজন তরুণকে সহশিক্ষা কার্যক্রম ও এক্সট্রা কারিকুলাম কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সংঘবদ্ধ, সৎকাজের প্রতি আগ্রহী এবং অসৎকাজের নিষেধকারী হিসেবে তৈরি করে।
সৎকাজ ও অসৎকাজের দৃষ্টিভঙ্গিও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মূলত এ শিক্ষাব্যবস্থা একজন মানুষকে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত ও প্রদর্শিত সৎ ও অসৎ কাজ সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে। ঘুষ, সুদ, দুর্নীতিসহ সব ধরনের দুষ্কৃতির প্রতি ঘৃণা, এর পরিণতির ভয় এবং সুকৃতির পুরস্কারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি এ শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রয়াস।
নয়. ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা মূলত প্রস্তুতি ও প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থার কথা শিক্ষা দেয়। এটি জানিয়ে দেয় মানুষের আত্মার তিন অবস্থার কথা। নফসে আম্মারা (প্ররোচনাকারী আত্মা), নফসে লাওয়ামা (অনুশোচনাকারী আত্মা) এবং নফসে মুত্মাইন্না (প্রশান্ত আত্মা)। এটি জানিয়ে দেয় আত্মাকে বিকশিত করে প্রশান্ত আত্মার অধিকারী সুন্দরতম মানুষে পরিণত হওয়ার জন্য, যে আত্মা অভাব-অনটনেও হক্-নাহকের পার্থক্য করতে পারবে, কঠিন বিপদের মাঝেও ধৈর্য ধারণ করবে, অত্যাচারীর চরম নির্যাতনও তাকে অন্যায়কে গ্রহণ করতে বাধ্য করতে পারবে না।
রাসূলে আকরাম সা. মানবতার শিক্ষক হিসেবে “আমাকে শিক্ষক করে প্রেরণ করা হয়েছে।” পৃথিবীবাসীকে যে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দিয়েছিলেন তাতে অন্যতম উপাদান ছিল “তিনি তাদেরকে আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে শোনান, সংশোধন করেন। আর কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেন।” অর্থাৎ তাজকিয়ায়ে নফস্ বা আত্মার পরিশুদ্ধি এর একটি বড় কাজ। তার শিক্ষায় আত্মশুদ্ধ মানুষেরা ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক প্রজন্ম। আরবরা তাদের চিনেও যেনো চিনতে পারছে না। এরা এমন এক প্রজন্ম – নষ্ট হয়ে যাওয়া, অসৎকাজে জড়ানো এদের জন্য ছিল অকল্পনীয় বিষয়।

দশ. নবী করিম সা.-এর সাহচর্য, নির্দেশনা, শিক্ষকতার মাধ্যমে দুনিয়ার রং পাল্টে দেয়ার নতুন ইতিহাস রচনার একদল মানুষ তৈরি হয়েছিল। এরাই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্র। রাসূলের প্রতিটি কথাকে তারা কত শ্রদ্ধার সাথে তুলে ধরতেন তা বিস্ময়কর। এ শিক্ষাব্যবস্থায় জন্ম নিয়ে মানুষ তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী সোনার মানুষ। যারা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আত্মসাৎ, আমানতের খেয়ানত, ঘুষ, জোরপূর্বক অর্থ আদায়, আয় ও ব্যয়ের হারাম পথে পদার্পণ কখনোই তাদের জীবনে স্থান লভে করতে পারে না। বরং তাদের মনে কেবলই ভয় “ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামি”, এরা ভয়ে অস্থির, “হায় উমর কেনো শুকনো খড় হলো না, তাহলে তো তাকে আর জবাব দিতে হতো না।” আত্মসাৎ তো দূরের কথা দুধের শিশু ক্ষুধার তাড়নায় বাইতুলমালের আপেল থেকে একটি আপেল হাতে নিয়ে কামড় বসিয়েছে, অমনি খলিফা তার হাত থেকে তা কেড়ে নিয়ে বায়তুলমালে জমা দিলেন।
এই হচ্ছে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার ইতিবাচক একটি আলেখ্য।
যদি এরূপ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয় তাহলেই সম্ভব হেরার রাজ তোরণ ধরে মুক্তির নয়া সড়কে পৌঁছা যেখানে দুর্নীতি বলতে কিছুই থাকবে না বরং থাকবে কেবল সুনীতি, সুশাসন এবং জবাবদিহিতামূলক যাবতীয় ব্যবস্থা।
দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত জাতিসমূহ এমনি এক সোনালি দিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply