সর্বশেষঃ
post

দুর্ভিক্ষের শঙ্কায় বাংলাদেশ

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

১৪ নভেম্বর ২০২২

আগামী ২০২৩ সাল বিশ্ববাসীর জন্য সঙ্কটের বছর হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়া পরিবর্তন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা কারণে আগামী বছরটি মন্দার হবে বলে আভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ইতোমধ্যে সেই মন্দা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বাংলাদেশেও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক অনুষ্ঠানে মন্দার ব্যাপারে আগাম সতর্ক করেছেন। এছাড়া সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আলোচনায়ও উঠে আসছে বিষয়টি। সম্ভাব্য এই সঙ্কট বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা মোকাবেলায় কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সেটা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে।

বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ‘বিশ্বে কি মন্দা আসন্ন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতির তিন মূল চালিকাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপের অর্থনীতি দ্রুত গতি হারাচ্ছে। ফলে আগামী বছরে সামান্য আঘাতেও মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সেই প্রতিবেদনের পরই মূলত মন্দার বিষয়টি আলোচনায় আসে।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা নেড ডেভিড রিসার্চ বলছে, বিশ্বজুড়ে মন্দার আশঙ্কা ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ। এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলেছে, ‘এর অর্থ হচ্ছে, ২০২৩ সালে মন্দার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।’ এর আগে ২০২০ সালে যখন বিশ্বজুড়ে লকডাউন ও নানা বিধিনিষেধ ছিল, তখনও  নেড  ডেভিসের পূর্বাভাস এমনটাই বেশি ছিল। এছাড়া ২০০৮-০৯ সালের আর্থিক মন্দার সময়ও তাদের সম্ভাব্যতার মডেলের স্কোর এমনটাই ছিল।

বিশ্বের বড় সংস্থাগুলোও মন্দার আশঙ্কা করছে। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদদের নিয়ে মতামত জরিপ করেছে। সেখানে ৭৩ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মত দিয়েছেন, ২০২৩ সালে মন্দা হতে পারে। তাদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ মন্দার আশঙ্কা করেছেন। বাকি ৯ শতাংশ শক্তিশালী মন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

কোনো বছর মোট উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কতটা বাড়ল, সেই তুলনামূলক হারকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় জিডিপি প্রবৃদ্ধি। কোনো বছর মোট উৎপাদন না বেড়ে কমে গেলে বলা হয় অর্থনীতি ‘সঙ্কুচিত’ হয়েছে। তখন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার নেমে আসে শূন্যের নিচে। অর্থনীতির ওই দশাকেই ‘মন্দা’ বলে।

বিশ্বায়নের এই যুগে বাংলাদেশও সঙ্কটের বাইরে না। তবুও অর্থনীতির সূচকগুলো এখন যে জায়গায় আছে, তাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অতটা খারাপ বলে মনে করছেন না বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ।

তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ তিনিও দেখছেন। তার ভাষায়, “বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভিকটিম।”

বাংলাদেশ ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পরপরই মহামারী এসে হাজির। গত দুই বছরে অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। সেই ধাক্কা সামলে ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু মহামারীর মতই কোনো পূর্বাভাস না দিয়ে ইউক্রেনে যুদ্ধ লাগিয়ে দিলো রাশিয়া। তাতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হলো বিশ্ব বাণিজ্যে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সাজানো ঘরও নড়ে উঠছে উপর্যুপরি দুই ঝড়ে।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে হু হু করে। মূল্যস্ফীতির হার পৌঁছেছে দেড় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের সংসারে তেল-নুনের হিসাব মেলাতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। মহামারীর ধাক্কা সামলে আমদানি বাড়ায় স্বস্তিই পাচ্ছিলেন অর্থনীতিবিদরা। কিন্তু সার্বিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে ডলারের দাম চড়তে থাকায় পণ্য আমদানিই এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে।

বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য ইতিহাসের সর্বোচ্চে ঘাটতিতে পড়েছে। ডলারের দর হয়ে উঠেছে পাগলা ঘোড়া। ২০২১ সালের মে থেকে ২০২২ সালের মে এই এক বছরে ডলারের বিপরীতে ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ মান হারিয়েছে টাকা। এদিকে রফতানি বাড়লেও রেমিট্যান্সে টান পড়েছে। কিন্তু পণ্য আমদানি করতে গিয়ে ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে অনেক। তাতে চাপ পড়ছে রিজার্ভে।

এই মুহূর্তে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্রটি কেমন? দেশে দক্ষ-অদক্ষ মোট ৪০ শতাংশ বেকারত্ব। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সর্বকালের সব  রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম কয়েকগুণ বাড়েনি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীবর্গ বলছেন, ‘মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে’! নিরেট সত্য হলো তারা কোনো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিষয়ে ন্যূনতম ধারণাও রাখেন না। সরকার একজন শিল্পপতির বাজার ২ হাজার টাকা কেজি দরে রিঠা মাছ কেনা এবং এবং টিসিবির ট্রাকের লাইনে মধ্যবিত্তের বাজার থেকে ৫ টাকা কমে আটা কেনাকে এক করে দেখেন।

দেশের সামনে মহাবিপদ ঘনিয়ে আসছে বিশেষজ্ঞদের মতে। বাংলাদেশ তার ১৮ কোটি জনগণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের অনেক কিছু উৎপাদন করে না। সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। বিশেষ করে তেল, গম, পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ডিজেল-পেট্রোল-অকটেন, কয়লা, রাসায়নিক কাঁচামাল, খুচরো এবং ভারী যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ। ডলারের তুলনায় টাকার অবমূল্যায়নে এখন প্রত্যকটি পণ্য বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের খাদ্যসচিবের ভাষ্যমতে, দেশে ১.৪ লাখ টন গমের মজুদ আছে। নির্মম বাস্তবতা হলো এই স্টক মাত্র এক মাসের ব্যবধানেই শেষ হয়ে যাবে।

দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটে নড়েচড়ে বসেছে সরকারও। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেলসহ নানা ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সঙ্কটের কারণে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতিতে হাঁটতে গিয়ে বিদ্যুতের উৎপাদন কমিয়ে এনেছে সরকার। সারা দেশে লোডশেডিংয়ের শিডিউল করে দেওয়ার মতো কঠোর নীতিও চালু করা হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ জ্বালানি তেলের সঙ্কটের কারণে চাপে পড়েছে দেশের শিল্প উৎপাদন। এরই মধ্যে শিল্পোদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্বেগের কথা জানাতে শুরু করেছেন। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের  ক্ষেত্রে ভুল নীতির কারণে আজকের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে যে অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে, সেটি দ্রুতই কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। বরং আগামীতে এ পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কট কাটাতে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর কাছ  থেকে ঋতসহায়তা নেওয়ার আলোচনা উঠেছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ চেয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায়  দেখা যায়, প্রাচীন বাংলার এই জনপদ বহুবার দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ঘটেছিল বাংলা সন ১১৭৬-এ (১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে) যেটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে বহুল পরিচিত। মূলত আঠারো শতকের চলমান চরম অর্থনৈতিক মন্দার ওই বছরে অতিবৃষ্টি-বন্যায় ব্যাপক ফসলের ক্ষয়ক্ষতি-ভ‚মি রাজস্ব ব্যবস্থা-খাদ্যবাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের ফলে সার্বিক অবস্থার অপরিমেয় অবনতি ঘটে। ব্রিটিশ রাজের কোম্পানি শাসকরা এটিকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দাবি করলেও, কোম্পানি শাসনের সহযোগিতায় খাদ্য-শস্যের বাজার থেকে মুনাফা লুট এবং অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে জনমানুষের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। এই দুর্ভিক্ষে মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১০ মিলিয়ন লোক মারা যায়।

১৯৪৩-এ বাংলা আরেকটি বৃহৎ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। ১৯৩৮ সাল থেকে লাগাতার ফসলহানি-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও আরও কিছু ধ্বংসাত্মক ঘটনা বাংলাকে দুর্ভিক্ষে নিপতিত করে।

প্রায় সমগ্র বাংলায় এ দুর্ভিক্ষ আঘাত হেনে মোট ৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটায়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭০ দশকের প্রথমে বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড়-খরা-বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্য-সার-তেলসঙ্কটের  মোকাবেলা করতে হয়েছে।

১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধে বিধ্বস্ত অর্থনীতি ও সামাজিক বিপর্যয়ে দেশের ব্যাপকসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হয়। সাধারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পিছিয়ে পড়ে। এ চরম অবস্থার শিকার হয়েছিল শিল্প শ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি শ্রমিক এবং নিম্ন বেতনভুক্ত মানুষ। ১৯৭৩ সালে তেল সঙ্কটের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতিতে সরকারের পক্ষে খাদ্য আমদানি দুষ্কর হয়ে পড়েছিল।

এবার যদি বৈশ্বিক মন্দা দেখা দেয় তবে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ পড়তে পারে তা নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন করেছে বিবিসি বাংলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক সায়মা হক বিদিশার বরাত দিয়ে এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বিষয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসবে। এগুলো হলো- রফতানি আয় কমে যেতে পারে, আমদানি করা খাদ্যপণ্যের দাম বাড়বে, রেমিট্যান্স কমতে পারে।

জীবনের জন্য খাদ্য জরুরি। খাদ্য ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে সৃষ্টিজগতের সব প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহপাক নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী রয়েছে সবার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর, তিনিই জানেন তারা কোথায় থাকে আর কোথায় তাদের মরণ হবে। সবকিছুই একটি সুবিন্যস্ত কিতাবে সংরক্ষিত আছে।’ (সূরা হুদ : ৬)

বিশাল এ পৃথিবীর কোথাও কোনো প্রাণী খাবারের কষ্ট পেলে তা মানুষের কারণেই পেয়ে থাকে। কারণ মানুষ বেশি পাওয়ার লোভে কখনও কখনও উৎপাদন বন্ধ  রেখেছে, কখনও বা অসম বণ্টন করে অন্যদের বঞ্চিত করেছে। আবার কখনও মানুষের সীমালঙ্ঘনের কারণে চেপে বসা দুর্ভিক্ষ জনজীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে। সে ক্ষেত্রে উত্তরণের পথ কী হবে তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলে দিয়েছেন।

দুর্ভিক্ষ কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে এবং দুর্ভিক্ষের আগে সরকার ও জনগণ কিভাবে প্রস্তুতি নেবে এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফে একটি রাষ্ট্রের দুর্যোগকালীন অর্থনীতি নিয়ে যে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় রাষ্ট্র ও বিশ্ব নেতৃত্বের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে।

প্রাচীন মিসরে সাত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছিল। দুর্ভিক্ষ শুরুর সাত বছর আগেই মহান আল্লাহ মিসরের বাদশাহকে একটি স্বপ্ন দেখান। যে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে নবী হজরত ইউসুফ (আ) জানিয়ে দেন, মিসরে সাত বছর প্রচুর শস্য ও ফলফলাদি উৎপাদন হবে, বাকি সাত বছর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমে আসবে। এ থেকে বাঁচার উপায় হচ্ছে প্রথম সাত বছরের বাড়তি শস্য জমা রাখা। তাহলে দুর্ভিক্ষের সাত বছর অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে। শস্য মজুদের দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকেই। কিন্তু প্রাচীন মিসরের বিশাল সাম্রাজ্যে এতো বড় দায়িত্ব সহজ ছিল না। ফলে হজরত ইউসুফ (আ)কে খাদ্য ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে কাজে নামিয়ে দিলেন বাদশাহ।

বড় বাধা ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগ, শস্য সংগ্রহ ও তা সাত বছর সংরক্ষণ। হজরত ইউসুফ (আ) শুরুতেই একটি পরিকল্পনা করলেন। অঞ্চলভিত্তিক বড় বড় গুদাম নির্মাণ করলেন, যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ করলেন শস্য সংগ্রহে। ফসল উঠার সময় হলে তারা সরাসরি কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং জানিয়ে দেয় রাষ্ট্রের কাছে এ গম বিক্রি করা হলে তারা বিশেষ সুবিধা পাবেন। কৃষকদের নাম তালিকাভুক্ত হবে এবং দুর্যোগকালীন সময়ে তাদের এর চেয়ে কম দামে শস্য দেওয়া হবে। ছদ্মবেশে মাঠপর্যায়ে গিয়ে কৃষকদের ভালোমন্দ জেনে নিতেন মন্ত্রী নিজেই। সে হিসেবে তদারকি ও সার্বিক ব্যবস্থা নিতেন। এভাবে সাত বছর কৃষকদের অতিরিক্ত ফসল রাষ্ট্রীয় গুদামে চলে আসে। এগুলো নষ্ট হবে কিনা এটি ছিল বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, শীষসহ গম সংরক্ষণ করা হবে তাহলে আর নষ্ট হবে না। বিষয়টি ¯্রষ্টাই জানিয়ে দিয়েছেন।

এরপর দুর্ভিক্ষের সাত বছর শুরু হলো। এমন পরিস্থিতি এলো যখন অর্থের বিনিময়ে খাদ্য পাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। সব শ্রেণি পেশার মানুষ দলে দলে খাদ্যের জন্য আসতে লাগল। সবাইকে ন্যায্যমূল্যে গম দেওয়া হলো পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী। যাদের সামর্থ্য নেই তাদের দেওয়া হলো বিনামূল্যে। এভাবে সাত বছর পুরো মিসরবাসী রাষ্ট্রের কাছ থেকে খাদ্যসুবিধা পেল। শুধু তাই নয়, ভয়াবহ ওই দুর্ভিক্ষে আশপাশের অনেক অঞ্চল থেকেও মানুষ এসে মিসর থেকে খাদ্য সংগ্রহ করেছে। হজরত ইউসুফের মাধ্যমে আল্লাহ কোটি কোটি মানুষকে অনাহারে মৃত্যু থেকে রক্ষা করলেন।   

হজরত ইউসুফ (আ)-এর এ ঘটনার মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় যে জরুরি বিষয়গুলো আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন তা হলো- ১. কৃষি ও খাদ্য বিভাগের দায়িত্বশীলকে অবশ্যই খাদ্য ও ফসল উৎপাদন বিদ্যায় পারদর্শী এবং সুষম বণ্টনে অভিজ্ঞ হতে হবে, ২. তাকে অবশ্যই শতভাগ আমানতদার হতে হবে, ৩. খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ ও সংরক্ষণের বিজ্ঞান সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা থাকা চাই, ৪. জনগণের বাস্তব অবস্থার সঠিক তথ্য এবং পরিসংখ্যান জানতে হবে, ৫. প্রয়োজনমতো খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, ৬. স্বজনপ্রীতি ও প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে থেকে সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে, ৭. জনগণের সামর্থ্যানুযায়ী বিনিময়মূল্য গ্রহণ করে এবং সামর্থ্যহীনদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে, ৮. দুর্ভিক্ষকবলিত জনগণের প্রতি অনুগ্রহ নয় বরং অধিকার হিসেবে আপৎকালে তাদের খাদ্য সরবরাহ করতে হবে, ৯. ব্যবস্থা এমন হতে হবে যেন মানুষ সরকারি ত্রাণ সম্মানের সঙ্গে নিতে পারে, ১০. এ বিভাগের কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় ভাতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, ১১. সব কাজ তাকওয়ার ভিত্তিতে এবং সততার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে, ১২. সবসময় মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও ভরসা রাখতে হবে।

নবীজি সা. ও সাহাবায়ে কিরামের যুগে মাঝে মাঝে খাদ্যসঙ্কট, অভাব-অনটন দেখা দিয়েছিল। তা  থেকে উত্তরণের জন্য তাঁরা  যে সকল পথ অবলম্বন করেছেন, তা হলো-

ধৈর্যসহকারে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া : দুঃসময়ে  ধৈর্যধারণও এক ধরনের নেক আমল। খাদ্যসঙ্কট বা দুর্দিনে মহানবী সা. ও সাহাবায়ে কিরাম ধৈর্যসহকারে আল্লাহর সাহায্য চাইতেন এবং মুমিনদের দুর্দিনে ধৈর্যধারণের দীক্ষা দিয়েছেন। 

সংযত জীবনাচার : নবীজি সা.-এর যুগে যখন মদিনায় দুর্ভিক্ষ এসেছিল, এই দুর্ভিক্ষ থেকে উম্মতকে বাঁচাতে সবাইকে তিনি জীবনাচারে সংযত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। হজরত জাবালা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মদিনায় কিছুসংখ্যক ইরাকি লোকের সঙ্গে ছিলাম। একবার আমরা দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হই, তখন ইবনে জুবায়ের রা. আমাদের খেজুর  খেতে দিতেন। ইবনে উমর রা. আমাদের কাছ দিয়ে যেতেন এবং বলতেন, রাসুলুল্লাহ সা. কাউকে তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া একসঙ্গে দুটো করে খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারি-২৪৫৫)

অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো : কোনো অভাবী ব্যক্তি যাতে ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট না পায় তাই ভাগাভাগি করে খাবার গ্রহণের তাগিদ দিয়েছিলেন নবীজি।

অধিক হারে দোয়া করা : অভাব-অনটন ও দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পাওয়ার আরেকটি করণীয় আমল হলো দোয়া। মহান আল্লাহর কাছে অতীতের গুনাহগুলো থেকে তাওবা করে, পরিস্থিতি অনুক‚লে এনে দেওয়ার জন্য দোয়ায় মগ্ন হয়ে যাওয়া। অনেক ক্ষেত্রে দোয়ার মাধ্যমেও অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। নবীজি সা. দুর্ভিক্ষ  থেকে মুক্তি  পেতে মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করেছিলেন। আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, ‘নবীজি সা.-এর যুগে (অতিবৃষ্টির কারণে) মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হলে একদিন জুমার দিন রাসূল সা. মিম্বারে উপবিষ্ট হয়ে লোকদের সামনে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। এক বেদুইন দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, ধন-সম্পদ বরবাদ হয়ে গেল, সন্তান-সন্ততি ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ছে। ... রাসূল সা. বলেছেন, হে আল্লাহ, আমাদের চারপাশে, আমাদের ওপর নয়। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর রাসূল সা. হাত দিয়ে যেদিকেই ইশারা করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে সেদিকেই ফরসা হয়ে গেছে। এমনকি আমি মদিনাকে আয়নার মতো পরিষ্কার দেখতে পেলাম। এদিকে ‘কানাত’ নামক প্রান্তরে এক মাস ধরে পানির ধারা বয়ে গেল। যেকোনো প্রান্ত  থেকে যে কেউই এসেছে সে-ই অতিবৃষ্টির সংবাদ দিয়েছে।” (মুসলিম-১৯৬৪)

গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার তাগিদ দেওয়া : খাদ্যসঙ্কট কিংবা অভাব-অনটনের একটি কারণ হলো পাপাচার, তাই মহানবী সা. তাঁর উম্মতদের সঙ্কট থেকে বাঁচাতে পাপাচার থেকে দূরে থাকার তাগিদ দিতেন। সাওবান রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, সৎকর্ম ছাড়া অন্য কিছু আয়ুষ্কাল বাড়াতে পারে না এবং দোয়া ছাড়া অন্য কিছুতে ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। মানুষ তার পাপ কাজের দরুন তার প্রাপ্য রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাজাহ-৪০২২)

কৃষিখাতে মনোযোগ দেওয়া : প্রিয় নবী সা.-এর এই শিক্ষাগুলো সাহাবায়ে কিরামও তাদের শাসনামলে প্রয়োগ করেছেন। ফলে দুর্ভিক্ষের কারণে তাদেরও খুব বেশি বিপদে পড়তে হয়নি। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. দুর্ভিক্ষের বছর বলেন, আর  সেই বছর ছিল ভীষণ দুর্বিপাক ও কষ্টের। উমর রা. পল্লী অঞ্চলের  বেদুইনদের উট, খাদ্যশস্য ও তেল প্রভৃতি সাহায্যসামগ্রী পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি গ্রামাঞ্চলের একখণ্ড জমিও অনাবাদি পড়ে থাকতে  দেননি এবং তাঁর চেষ্টা ফলপ্রসূ হলো। ওমর রা. দোয়া করতে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘ হে আল্লাহ, আপনি তাদের রিজিক পর্বতচ‚ড়ায় পৌঁছে দিন।’ আল্লাহ তাঁর এবং মুসলমানদের দোয়া কবুল করলেন। তখন বৃষ্টি বর্ষিত হলে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ (সব প্রশংসা আল্লাহর)। আল্লাহর শপথ! যদি আল্লাহ এই বিপর্যয় দূর না করতেন, তবে আমি কোনো সচ্ছল মুসলমান পরিবারকেই তাদের সঙ্গে সমসংখ্যক অভাবী লোককে যোগ না করে ছাড়তাম না। যতটুকু খাদ্যে একজন জীবন ধারণ করতে পারে, তার সাহায্যে দু’জন লোক ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পারে। (আদাবুল মুফরাদ-৫৬৪)

দেশ ও জাতির সম্ভাব্য এই সঙ্কটে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি

জনগণের সামর্থ্যানুযায়ী বিনিময়মূল্য গ্রহণ করে এবং সামর্থ্যহীনদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। দুর্ভিক্ষ কবলিত জনগণের প্রতি অনুগ্রহ নয় বরং অধিকার হিসাবে আপৎকালে তাদের খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। ব্যবস্থাপনা এমন থাকবে যেন মানুষ সরকারি ত্রাণ সম্মানের সঙ্গে নিতে পারে। স্বজনপ্রীতি এবং চুরি বন্ধ করতে হবে। কোনো জমিকে চাষাবাদ ছাড়া রাখা যাবে না। সরকারি ব্যবস্থাপনায় খাদ্য সংরক্ষণ করতে হবে। এছাড়াও যে সকল কাজ করতে হবে তা হলো-

ক. ডিজেল-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করে প্রয়োজনে সরকারকে কিছু ভর্তুকি দিয়ে হলেও ডিজেল-বিদ্যুতের মূল্য কিছুটা কমিয়ে আনতে হবে।

খ. সারাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সকল পতিত জমি চাষের আওতায় আনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ে সয়াবিন গাছ লাগিয়ে সয়াবিন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সারাদেশে সরিষা চাষের জন্যও সরকার বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। 

গ. কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে সার ও কীটনাশক বিতরণ এবং সকল কৃষকদের বিনা সুদে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কৃষি  লোন দিতে সকল সরকারি বেসরকারি ব্যাংকসমূহে নির্দেশ প্রদান করা দরকার। 

ঘ. সারাদেশের কৃষিপণ্য সংরক্ষণে প্রতিটি উপজেলায় হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ)  করতে হবে। 

চ. দক্ষ শ্রমিক রফতানিতে সারাদেশের প্রতিটি জেলায় বিশেষ ইনস্টিটিউট তৈরি করতে হবে। 

ছ. প্রবাসী শ্রমিক রফতানিতে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইট চালু করে বিমান ভাড়া (ওয়ানওয়ে) ফ্রি করে দিতে হবে। যা প্রবাসী শ্রমিক রফতানি বৃদ্ধির সহায়ক হবে। 

জ. বিদেশ থেকে আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক পণ্য, সিগারেট, কসমেটিক ও পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের উপর চাপ কমাতে হবে এবং প্রবাসীদের দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, এজন্য বিশেষ কিছু সৌজন্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। 

ঝ. আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ওপর আস্থা রেখে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে, কেননা তিনিই সবার উত্তম রিজিকদাতা।

মোটকথা অর্থনৈতিক মন্দার এ অস্বাভাবিক অবস্থার কবল থেকে উদ্ধার পেতে হলে কুরআন হাদিসের আলোকে ইসলামি অর্থনীতির অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন ও ব্যবহার জরুরি। বর্তমান যুগেও যদি কোনো দেশের সরকার দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে হজরত ইউসুফ (আ), হজরত মুহাম্মাদ সা. ও তাঁর সাহাবিদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করে, তাহলে ইনশাআল্লাহ মহান আল্লাহ আমাদের যেকোনো ধরনের দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্ত রাখবেন। আল্লাহ সব বিপদ থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্ববাসীকে হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির