post

নতুন বছর নতুনভাবে সাজাও

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। ঘণ্টা দিন সপ্তাহ মাস বছর এভাবেই বছরের পর বছর কেটে গিয়ে জীবনের এক প্রান্তে এসে আমরা উপনীত। দেখতে দেখতে ২০২২ সালও চলে যেতে বসেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ২০২৩ সাল এসে হাজির হবে। অতীতের জন্য কান্নাসহ ইসতেগফার, আর আগামীর জন্য তাওফিক কামনা। বিদায় ২০২২। ইতোমধ্যে বিদায় হয়েছে হিজরি ১৪৪৩। বিদায় হয়েছে বাংলা ১৪২৮। বছরগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কোনোদিন আর দেখা হবে না বিগত বছরগুলোর সাথে। ‘যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়’ জীবনের এই কঠিন সত্যটি রবি ঠাকুর বলেছিলেন অনেক আগে। তবুও মায়ার বাঁধন ছিঁড়তে চায় না মানুষ। তেমনি সময়ও চলে যায়। বিগত বছরের কাজ কামগুলো মূল্যায়ন করা এবং নতুন বছরে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা বুদ্ধিমান মানুষের জন্য খুবই প্রয়োজন। যারা জীবনকে ঠিকমতো বুঝতে পারে না তারা অলসতায় এবং হেলায় খেলায় জীবনকে কাটিয়ে দেয়। দুনিয়াটা মস্ত বড় খাও দাও আর ফুর্তি করো- এটাই জীবনকে করাতের মতো কুরে কুরে শেষ করে দেয়। যেদিন চলে যাচ্ছে সেই দিনকে আর ফিরে পাবো না, সময় স্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না- ঞরসব ধহফ ঃরফব ধিরঃ ভড়ৎ হড়হব. আসুন আমাদের পিছনের বছরের দিকে ফিরে তাকাই এবং আগামী বছর কি করলে লাভবান হওয়া যায় সফল হওয়া যায় সেদিকে একটু দৃষ্টিপাত করি। ভালো কাজ করে থাকলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি এবং তা কবুল হওয়ার জন্য দোয়া করি এবং বিগত বছরে যে সমস্ত ভুল ত্রুটি অন্যায় গুনাহ খাতা হয়েছে তার জন্য চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াময়। ‘আপনি বলে দিন, (আল্লাহ বলেন) হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছো, তোমরা আল্লাহ তায়ালার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ (অতীতের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু।’’ (সূরা জুমার : ৫৩)


তারা গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বারবার করে না। মানবিক প্রবৃত্তিবশে তাদের দ্বারা কোনো পাপ কাজ হয়ে গেলে, তারা সত্বর তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করে। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৫)। ‘যারা অসৎ কাজ করে তারা পরে তওবা করে অনুতপ্ত হলে ও ঈমান আনলে তোমার প্রতিপালক তো পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ (সূরা আরাফ : ১৫৩)। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, বিশুদ্ধ তওবা।’ (সূরা তাহরিম : ৮)। ‘বিশুদ্ধ তওবা’ হলো ১. গুনাহের জন্য অনুশোচনা করা ২. গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং ৩. ভবিষ্যতে গুনাহ না করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া। 

রাসূলুল্লাহ সা. একদিন হজরত মুআজ রা.-কে অসিয়ত করে বলেন, ‘সাবধান! নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রেখো! কারণ, গুনাহ করলে আল্লাহর গজব নাজিল হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ) তিনি আরও বলেন, ‘আমি তোমাদের আসল রোগ এবং খাঁটি ওষুধের কথা বাতলে দিচ্ছি। তোমাদের আসল রোগ হলো ‘গুনাহ’ আর খাঁটি ওষুধ হলো তওবা করা।’ (বায়হাকি)। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘ঐ ব্যক্তি হঠকারী নয় যে ক্ষমা প্রার্থনা করতেই থাকে যদিও তার দ্বারা দিনে সত্তরবারও পাপকার্য সাধিত হয়। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, তারা জানে। অর্থাৎ তারা জানে যে, আল্লাহ তায়ালা তওবা কবুলকারী। মুসনাদ-ই-আহমাদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. মিম্বরের উপর বর্ণনা করেন, হে জনমণ্ডলী! তোমরা অন্যদের উপর দয়া প্রদর্শন কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়া করবেন। হে লোকসকল! তোমরা অন্যদের অপরাধ ক্ষমা কর, আল্লাহ তোমাদের পাপসমূহ মার্জনা করবেন।

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা আল্লাহর কাছে তোমাদের গুনাহের জন্য তওবা করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমার প্রতি লক্ষ করো! আমি প্রত্যহ শতবার করে আল্লাহর কাছে তওবা করে থাকি।’ (মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ সা. আরও বলেছেন, ‘বান্দাহ গুনাহ করার পর তওবা করলে আল্লাহ সে ব্যক্তির ওপর ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক খুশি হন যে ব্যক্তি নিজের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উট কোনো ময়দানে হারিয়ে যাওয়ার পর তা হঠাৎ পেয়ে গেলে খুশি হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)। তাই বিগত বছরের ও বিগত জীবনের জানা-অজানা গোপন প্রকাশ্য ছোট বড় ইচ্ছাকৃত অনিচ্ছাকৃত সকল প্রকার গুনাহ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়াবান। আমরা যেন ইসলামের অত্যাবশ্যকীয় শরিয়তের সব বিধি-বিধান ও অনুশাসন যথাযথভাবে মেনে চলে তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে নাজাত লাভ করতে পারি! হে আল্লাহ! পাপকাজ করার পরপরই যাতে আপনার কাছে তওবা করতে পারি, সেই তাওফিক দান করুন!’

আদম ও হাওয়া (আ) : আদম (আ) ও হাওয়া (আ) থেকে আমাদের শিখতে হবে, বলতে হবে- আদম (আ) ও হাওয়া (আ) দোয়া করেছিলেন “হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। এখন যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো এবং আমাদের প্রতি রহম না করো, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো।’ (সূরা আরাফ : ২৩)। নবী সা. এ সম্পর্কে দোয়া করেছেন: “হে আল্লাহ! আমি তোমার রহমতের আশা করি। কাজেই এক মুহূর্তের জন্যও আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করে দিয়ো না।” 

শয়তান নিজের ভুল স্বীকার করে বন্দেগির দিকে ফিরে আসার পরিবর্তে নাফরমানির ওপর আরো বেশি অবিচল হয়ে যায়। অন্যদিকে মানুষ নিজের ভুল বুঝতে পারার সাথে সাথেই লজ্জিত হয়ে পড়ে নিজের ত্রুটি স্বীকার করে, বিদ্রোহ থেকে আনুগত্যের দিকে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে নিজের রবের রহমতের ছত্রছায়ায় আশ্রয় খুঁজতে থাকে, তাকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়। কিরামান কাতিবিন (ফেরেশতা) আমাদের কারো গুনাহ্ লিখার পূর্বে আল্লাহ আমাদেরকে তওবার ব্যাপারে অনেক সুযোগ দেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন: নিশ্চয় বামপাশের ফেরেশতা কলম উঠিয়ে অপেক্ষায় থাকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত গুনাহকারী মুসলিম বান্দার জন্য। বান্দা যদি অনুতপ্ত হয় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চায় তাহলে তা মাফ করে দেওয়া হয়, নতুবা একটি গুনাহ লিখা হয়। (তাবারানি, বায়হাকি, ইমাম আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন) আরেকটি অবকাশ লিখার পরে এবং মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত দেওয়া হয়। হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত- তিনি বলেন, তোমরা এমন সব কাজ কর যা তোমাদের দৃষ্টিতে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম। কিন্তু আমরা রাসূলুল্লাহর যুগে এগুলোকে মনে করতাম ধ্বংসকারী।

হজরত ইবনে মাসউদ রা. তায়ালা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন মুমিন গুনাহকে এভাবে দেখে থাকে যে, সে যেন এক পাহাড়ের নিচে বসে আছে যা তার মাথার উপর ভেঙে পড়বে। পক্ষান্তরে পাপী তার গুনাহকে দেখে যেন মাছি তার নাকের ডগায় বসেছে, তাকে এভাবে তাড়িয়ে দেয়। এক বর্ণনায় এসেছে যে, ‘তোমরা নগণ্য ছোট ছোট গুনাহ থেকে সাবধান হও; কেননা সেগুলো মানুষের কাঁধে জমা হতে থাকে অতঃপর তাকে ধ্বংস করে দেয়।’ (মুসনাদে আহমদ, সহিহ আল জামে-২৬৮৬-২৬৮৭)। এটি তাদের জন্য যারা বিশ্বাস করে মহান আল্লাহর এ বাণীকে- ‘আপনি আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয় আমিই একমাত্র ক্ষমাকারী দয়ালু।” (সূরা হিজর : ৪৯)। 

তওবার শর্ত হচ্ছে- পূর্বে যা ঘটে গেছে সে জন্য অনুতপ্ত হতে হবে। পুনরায় পাপ কাজে ফিরে না আসার জন্য দৃঢ় সঙ্কল্প গ্রহণ করতে হবে। প্রাপকদের হক ফিরিয়ে দেওয়া ও তাদের নিকট থেকে মাফ চেয়ে নিতে হবে। ‘তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন (তওবা) কর।’’ (সূরা হুদ : ৩)

শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য পাপ ত্যাগ করা- তাকে তওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি পাপ ত্যাগ করল তার শক্তি ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য। যেমন; কেউ যিনা করা ত্যাগ করলো যেন দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে বাঁচতে পারে অথবা তার শরীর ও স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল না করে। তাকে তওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে; কোনো বাড়িতে ঢুকার পথ না পেয়ে বা সিন্দুক খুলতে অসমর্থ কিংবা পাহারাদার ও পুলিশের ভয়ে। তাকে তওবাকারী বলা যাবে না, যে দুর্নীতি দমন বিভাগের লোকজনদের জোর তৎপরতায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘুষ খাওয়া বন্ধ রেখেছে। আর তাকেও তওবাকারী বলা যাবে না, যে ব্যক্তি মদ পান, মাদকদ্রব্য বা হেরোইন সেবন ইত্যাদি ছেড়ে দিয়েছে দারিদ্রের কারণে। তেমনিভাবে তাকেও তওবাকারী বলা যাবে না, যে সামর্থ্যহীন হওয়ার কারণে গুনাহ করা ছেড়ে দিলো। যেমন মিথ্যা বলা ছেড়ে দিয়েছে তার কথায় জড়তা সৃষ্টি হওয়ার কারণে কিংবা যিনা করছে না যেহেতু সে সহবাস ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, কিংবা চুরি করা ছেড়ে দিয়েছে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে পড়ার কারণে। 

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ‘অনুতপ্ত হওয়াই হলো তওবা।’ (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, সহিহ আল জামে-৬৮০২)

তওবা করতে দেরি করা পাপ- যার জন্য তওবার প্রয়োজন সে যেন তাড়াতাড়ি তওবা করে। কারণ তওবা করতে দেরি করাটাই পাপ। আল্লাহর হক যা ছুটে গেছে তা যথাসম্ভব আদায় করা। যেমন জাকাত দেওয়া যা সে পূর্বে দেয়নি। কেননা এতে আবার দরিদ্র লোকজনের অধিকারও রয়েছে।

পাপের স্থান ত্যাগ করা- পাপের স্থানকে ত্যাগ করা যদি সেখানে অবস্থান করলে আবার সে পাপে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। যারা পাপ কাজে সহযোগিতা করে তাদেরকে পরিত্যাগ করা (১০০টি লোক হত্যাকারীর হাদিস থেকে গ্রহণ করা হয়েছে)। মহান আল্লাহ বলেন: ‘আন্তরিক বন্ধুরাই সেদিন একে অপরের শত্রুতে পরিণত হবে, মুত্তাকিরা ছাড়া।’ (সূরা যুখরুফ : ৬৭) খারাপ সাথিরা একে অপরকে কিয়ামতের দিন অভিশাপ দিবে। 

হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা- নিজের কাছে রক্ষিত হারাম জিনিসকে নষ্ট করে ফেলা। যেমন মাদক দ্রব্য, বাদ্যযন্ত্র, যেমন একতারা, হারমনিয়াম, অথবা ছবি, ব্লু ফিল্ম, অশ্লীল নভেল নাটক। এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। নবী করীম সা. বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট তওবা করবে গড়গড়া উঠার পূর্বে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।’ (আহমাদ, তিরমিজি, সহিহ আল জামে’-৬১৩২) অপর হাদিসে তিনি বলেন: ‘যে ব্যক্তি পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠার পূর্বে তওবা করবে, আল্লাহ তায়ালা তার তওবা কবুল করবেন।’ (মুসলিম)


সিজদাবনত হয়ে তওবার মাধ্যমে শুরু হোক নতুন বছর 

ইংরেজি বছর শেষে নতুন বছরের শুরুতে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ (১২টা ১ মিনিট) পালন করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। এ রাতে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অশ্লীলতা-নগ্নতা ও বেলেল্লাপনার বন্যায় মেতে উঠে অনেকে। মদ পান, ছেলে মেয়ের যৌন উন্মাদনাসহ বিভিন্ন অনৈতিক, কর্মকাণ্ড ও নোংরা অনুষ্ঠান করে ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করা হয়। যা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। রাসূল সা. এরশাদ করেন, ‘যদি তুমি খারাপ কাজ করো, আর তোমার খারাপ লাগে, ভালো কাজ করে ভালো লাগে তাহলে তুমি মুমিন। কিন্তু যদি খারাপ কাজ করে ভালো এবং ভালো কাজ করে খারাপ লাগে তাহলে তুমি মুমিন হতে পার না’। (মুসলিম-১৯২৭)। হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনারবীয় দেশে বসবাস করে, সে যদি সে দেশের মেহেরজান (নববর্ষ) উদযাপন করে এবং বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে এমনকি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন তাকে তাদের (কাফিরদের) সঙ্গে হাশর করা হবে’ (বায়হাকি মাজমুয়াতুত তাওহীদ-২৭০)। একজন ঈমানদার নর-নারীর প্রতিটি দিন-রাত প্রতিটি দিন-ক্ষণ তার জন্য মূল্যবান। থার্টি ফার্স্ট নাইটে আমাদের দায়িত্ব হলো এই রাতে অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনা করে আগামী বছরের কল্যাণ কামনা করত: সিজদাবনত হয়ে থাকা। তওবাহ, ইস্তেগফার, দোয়া- দরুদ, নফল নামাজসহ ইত্যাদি ভালো কাজের মধ্যে রাতটি অতিবাহিত করা।


মৃত্যুর জন্য ও মৃতদের জন্য করণীয়

১. নিজের ঋণ অথবা মা-বাবার কোনো ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা- রাসূলুল্লাহ সা. ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়।’ (ইবনে মাজাহ-২৪১৩)। আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা.-এর নিকট যখন কোনো ঋণী ব্যক্তির জানাযা উপস্থিত করা হতো, তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, ‘সে তার ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত মাল রেখে গেছে কি?’ যদি তাঁকে বলা হতো যে, সে তার ঋণ পরিশোধের মতো মাল রেখে গেছে। তখন তার জানাযার সালাত আদায় করতেন। নতুবা বলতেন, ‘তোমাদের সাথির জানাযা আদায় করে নাও’।

২. মা-বাবার অসিয়ত পূর্ণ করা- মা-বাবা শরিয়াহ সম্মত কোনো অসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব।  

৩. হজ বা উমরাহ করা- রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবি পরিশোধ করার অধিক উপযোগী।’ (বুখারি-১৮৫২)

৪. কুরবানি করা- মৃত মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানি করলে তার সাওয়াব দ্বারা তারা উপকৃত হবে। রাসূলুল্লাহ সা. ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। পশুটি জবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ তুমি এটি মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদির পক্ষ থেকে কবুল কর”। এভাবে তিনি তা দ্বারা কুরবানি করলেন। (মুসলিম-৫২০৩)

৫. দান-সদকা করা- নিজের জন্য ও পিতা-মাতার জন্য দান সদকা করা। কারণ মৃত্যু হলেই সম্পদ অপরের মালিকানায় চলে যায়। বেঁচে থাকতেই সম্পদকে দানের মাধ্যমে নিজের সম্পদে পরিণত করতে হবে। হজরত আয়েশা রা. বলেন: “এক ব্যক্তি রাসূল সা.-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। তাই কোন অসিয়ত করতে পারেননি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-সদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে সদকা করলে তিনি কি এর সাওয়াব পাবেন? রাসূল সা. বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।” (মুসলিম-২৩৭৩) 

৬. হজ-উমরাহ করা- মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ করলে তা আদায় হবে এবং মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আগমন করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার মা হজ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ সম্পাদন না করেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, ‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবি পরিশোধ করার অধিক উপযোগী’ (বুখারি-১৮৫২) 

৭. রোজা রাখা- মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা বৈধ হওয়ার দলিল হলো আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. বলেছেন: “যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ রোজা রাখবে।’’ (বুখারি-১৯৫২) 

৮. মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করা- মা-বাবার বন্ধুদের সাথে ভালো ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া, তাদেরকে হাদিয়া দেওয়া। এ বিষয়ে হাদিসে উল্লেখ আছে, আবদুল্লাহ ইবনে দীনার রা. আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আবদুল্লাহ রা.-এর এক বেদুঈনের সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আবদুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আবদুল্লাহ রা. বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রা.-এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভালো ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ।’’ (মুসলিম-৬৬৭৭)

৯. আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা- সন্তান তার নিজের ও তার মা-বাবার আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালোবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে।’ (সহিহ ইবনে হিববান-৪৩২)

১০. কাফফারা আদায় করা- সন্তান তার নিজের ও তার  মা-বাবার শপথের কাফফারা ও ভুলকৃত হত্যাসহ কোন কাফফারা বাকি  থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। 

১২. মান্নত পূরণ করা- সন্তান তার নিজের ও তার  মা-বাবার কোনো মান্নত থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। 

১৩. মা-বাবার ভালো কাজসমূহ জারি রাখা- সন্তান তার নিজের ও তার  মা-বাবার যেসব ভালো কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরি, মাদরাসা তৈরি, দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিসহ যে কাজগুলো করেছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। হাদিসে এসেছে, ‘ভালো কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে।’ (তিরমিজি-২৬৭০)। যে ব্যক্তি ইসলামের ভালো কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদের সওয়াব থেকে কোনো কমতি হবে না।’’ (মুসলিম-২৩৯৮)

১৪. মাঝে মাঝে কবর জিয়ারত করা- মৃত্যু ও আখিরাতের কথা স্মরণ করার নিয়তে কবর জিয়ারত করতে যাওয়া উচিত। হজরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী সা. তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কাঁদলেন এবং তাঁর সাথে যে সাহাবিগণ ছিলেন তারাও কাঁদলেন। অতঃপর তিনি বললেন, “আমি আমার মায়ের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম কিন্তু আমাকে সে অনুমতি প্রদান করা হয়নি। তবে আমি মায়ের কবর জিয়ারতের জন্য আবেদন জানালে তিনি তা মঞ্জুর করেন। অতএব, তোমরা কবর জিয়ারত কর। কেননা কবর জিয়ারত করলে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়।”

বুরাইদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, সাহাবীগণ কবর জিয়ারত করতে গেলে নবী সা. তাদেরকে এই দুয়াটি পড়তে বলতেন- ‘আস-সালামু আলাইকুম আহলাদদিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়াল মুসলিমিনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু লা লাহিকুনা আসআলুল্লাহু লানা ওয়া লাকুমুল আফিয়াতি।’

“কবর গৃহের হে মুমিন-মুসলিম অধিবাসীগণ, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ চাইলে আমরাও আপনাদের সাথে মিলিত হবো। আমি আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা কামনা করছি।” (মুসলিম)

১৫. ওয়াদা বাস্তবায়ন করা- সন্তান তার নিজের ও তার মা-বাবার কোনো ভালো কাজের ওয়াদা করে থাকলে সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। 

১৬. কোনো গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা- সন্তান তার নিজের ও তার মা-বাবার গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত থাকলে তা বন্ধ করবে বা শরিয়ত সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। 

১৭. মাফ চাওয়া- অতীতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর জুলুম করে থাকলে বা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে তার কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে। 

সদকায়ে জারিয়াহ রেখে যাওয়া-

১. পানির ব্যবস্থা করা (বিশুদ্ধ পানির জন্য ফিল্টার দিতে পারেন)

২. এতিমের/ বিধবার প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করা।

৩. অসহায় মানুষের বাসস্থান/কর্ম সংস্থান তৈরি করা।

৪. গরিব তালিবে ইলমকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। কুরআনের হাফেজ হতে সহায়তা করা।

৫. দাতব্য চিকিৎসালয় বা হাসপাতাল নির্মাণ, একটি হুইল চেয়ার বা বেড বা চেয়ার দান করা

৬. মসজিদ নির্মাণ। মসজিদে জায়নামাজ, ফ্যান, কিতাব, পাঠাগার গঠন ইত্যাদি হাদিয়া হিসেবে দেওয়া।

৮. রক্ত দান করা/ চিকিৎসায় সহযোগিতা করা।

৯. ফলদায়ক গাছ লাগানো (রাস্তার পাশের পড়ে থাকা জমিতে ফলের বীজ ছিটিয়ে দেওয়া)

[এই লেখাটি প্রস্তুত করতে অনলাইনে প্রকাশিত কয়েকজন ভাইয়ের লেখা থেকে সহযোগিতা নিয়েছি, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দান করুন। আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসূল সা.-এর নির্দেশ অনুসারে বেশ কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এখানে আসন্ন বছরের জন্য অনেক কাজের কথা বলা হলো। আসুন আমিসহ আমরা সকলে এ সকল কাজগুলো সম্পন্ন করে আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আল্লাহ তায়ালার মাগফিরাত কামনা করে এবং আখেরাতের সংরক্ষিত ৯৯টি রহমতের ভাগীদার হয়ে আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের সকলকে জান্নাতুল ফেরদাউসের মেহমান করেন-আমিন।]

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও ইসলামী চিন্তাবিদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির