নেতিবাচক নয় ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন- মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

সাফল্য অর্জনের জন্য ইতিবাচক চিন্তা যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং তা লালন করা যে অত্যাবশ্যক সে সম্বন্ধে Think and Grow Rich by Napoleon Hill-এর বইয়ের মাধ্যমে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যার ইংরেজি প্রকাশকাল ১৯৩৭ সালে। পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ান হিল এবং ডব্লিউ ক্লেমেন্ট স্টোন আরও একটি বই রচনা করেন যাতে সরাসরি ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সাফল্য অর্জনের জন্য মুখ্য উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি একজন ব্যক্তিকে সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় করে তোলে। ইতিবাচক মানসিক ভঙ্গি দ্বারা এমন নির্দেশ বোঝায় যার মাধ্যমে আস্থা, সততা, আশা, সাহস, প্রত্যাশা, সৌজন্যতা, ধৈর্য, কৌশল, দয়ার মতো ভালো সাধারণ কিছু অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। একজন সাধারণ মানুষের জীবনেও সমস্যা থাকে, বাধা, দুঃখ, হতাশা, সম্পদের অভাব থাকে কিন্তু তারপরও ইতিবাচক চিন্তা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে ইতিবাচক কাজ করে জীবন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। জীবনে সমস্যা থাকবেই কিন্তু সমস্যার কারণে নেতিবাচক চিন্তা করে, ভয়ে ভীত না হয়ে, বসে না থেকে ইতিবাচক দিকগুলোকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মধ্যে এনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে ইতিবাচক মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
মানুষের স্বভাবগত অভ্যাস হলো নেতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। সমাজে প্রায়ই লক্ষ করা যায় ইতিবাচক দিকগুলোকেও অনেক সময় নেতিবাচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়। বিষয় যতই জটিল হোক না কেন প্রত্যেক বিষয়েরই ইতিবাচক দিক থাকে, সেটিকে ফুটিয়ে তোলে নেতিবাচক না বলাই শ্রেয়। কারো সাথে সাক্ষাৎ হলে নিজেকে ইতিবাচক ভূমিকায় উপস্থাপন করা আবশ্যক। সাক্ষাৎ করা ব্যক্তিটির জীবনে নিজের সুন্দর পরিচয়কে তুলে ধরে যার সাথে সাক্ষাৎ হবে তার জীবনে আমি ইতিবাচক ভূমিকায় হাজির হবো- এটাই আমার সাক্ষাতের মূল সার্থকতা। যার সাথে সাক্ষাৎ হবে তার সামনে নিজেকে ইতিবাচক ভূমিকায় উপস্থাপন কার্যকর সহায়ক শক্তি হিসেবে ফল দিতে পারে। অনেক সময় ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটোই সমান পর্যায়ের হয় তখন ইতিবাচক চর্চা নেতিবাচক বিষয়কে চাপা দিয়ে নেতিবাচকের বিরুদ্ধে বিজয়টা ছিনিয়ে আনা সম্ভব। চিন্তা এবং পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক চিন্তা কল্যাণ বয়ে আনে। কোনো একটি কাজ করতে গিয়ে কাজের নেতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য না দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে সেগুলোকেই সম্ভাবনা ধরে পরিকল্পিতভাবে সামনে এগোতে পারলে সাফল্য নিশ্চিতভাবেই ধরা দিবে। আর যদি নেতিবাচক চিন্তাই শুধু মনের ভেতর ঘুরপাক খায় তাহলে কাজে সফলতা তো দূরের কথা কাজ শুরু করাই কঠিন হবে। প্রতিটি কাজের শুরুতে কিংবা কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক চিন্তা কাজের ক্ষেত্রে বিরাট আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ইতিবাচক চিন্তা কাজের অর্ধেক আর বাকিটুকু পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে। ইতিবাচক চিন্তা একটি কার্যকর পরিকল্পনা তৈরির নিয়ামক শক্তি। ইতিবাচক চিন্তা ছাড়া যেমন কল্যাণ নিশ্চিত হয় না তেমনি নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে ঠেলে দেয়া ছাড়া পরিকল্পনার সুফল পাওয়া যায় না।
একটি বিষয়কে দুই ভাবে উপস্থাপন করা যায়। ইতিবাচক এবং নেতিবাচকভাবে। একটি গ্লাসে অর্ধেক পানি থাকা অবস্থায় ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুটো পদ্ধতিতেই তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির সামনে গ্লাসটিকে উপস্থাপন করা যায়। যদি বলা হয় অর্ধেক খালি কিংবা অর্ধেক পানিশূন্য গ্লাস টেবিলের ওপর রাখা আছে তাহলে এই খালি এবং শূন্যকে আবর্তন করে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির কাছে নেতিবাচক ধারণার জন্ম হয়। আবার যদি বলা হয় টেবিলে আধা গ্লাস পানি আছে তাহলে এটি পজেটিভ তথা ইতিবাচকই শোনায়। তখন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির সামনে এটি সম্ভাবনার বিষয় হয়ে দেখা দেয় যে অন্তত তৃষ্ণা নিবারণের জন্য তার সামনে আধা গ্লাস পানি রয়েছে। তেমনিভাবে একজন ছাত্র পড়ার টেবিলে বসেও ইতিবাচক চিন্তা লালন করতে পারে। যদি সে চিন্তা করে ৫টি বিষয়ের পড়া আগামীকালের ক্লাসের জন্য তৈরি করতে বসে দু’টি শেষ হয়েছে মাত্র, আরো ৩টি বাকি আছে, তাহলে তার চিন্তায় নেগেটিভিটি জন্ম নিবে। আর যদি সে এটি চিন্তা করে, আলহামদুলিল্লাহ দু’টি বিষয় আদায় হয়ে গেছে ৫টির চাপ থেকে ৩টিতে নেমে এসেছে। তার জন্য বাকি ৩টির পড়াও দ্রুত আদায় করা সম্ভব হবে। একজন পর্বতারোহী সর্বোচ্চ শৃঙ্গে আরোহণ করতে গিয়ে যদি হিসাব করেন ১০০ মাইল উঁচু শৃঙ্গ আরোহণ করতে গিয়ে ৩০ মাইল অতিক্রম করেছি মাত্র। তখন তার জন্য সামনে অগ্রসর হওয়া কঠিন হবে। কারণ আরো ৭০ মাইল পাড়ি দেয়ার নেতিবাচক দৃষ্টি জন্ম নিবে। কিন্তু যদি এটিই হিসাব করেন যে ১০০ শত থেকে ৩০ মাইলের দূরত্ব তিনি কমিয়ে আনতে পেরেছেন তাহলে তার ইতিবাচক এই চিন্তা অবশিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করতে তাকে সাহস জোগাবে। আর যদি চিন্তা করেন এখনো ৭০ মাইল অনেক দূর তাহলে তা তাকে হতাশায়ও ডুবাতে পারে। উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।
বিষয় যতই কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য হোক না কেন সাফল্য নির্ভর করে ইতিবাচক চিন্তার বিষয়টিকে গ্রহণের ওপর। যারা সমস্ত বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তার লালন করেন তারা সকল বাধা-বিপত্তি ঝড়-ঝঞ্ঝাকে মাড়িয়ে সাফল্যের মঞ্জিলে পৌঁছাতে সক্ষম হন। আর যারা নেতিবাচক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেন তাদের কাছে নেতিবাচক যে কোন বাধাই হোক না সেটা শস্য দানার তুল্য হলেও তা মূল প্রতিবন্ধক হিসেবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে সেই অবস্থায়ই কিভাবে প্রতিহত করে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় তার চেষ্টা করতে হবে। কারণ ইতিবাচক মানসিকতা রাখার ওপরই নির্ভর করবে সাফল্য। জীবন চলার পথে ইতিবাচক যতগুলো বিষয় আছে তার প্রতিই বেশি নজর দেয়া দরকার। ইতিবাচক দিক এবং কল্যাণকর গুণাবলিই চলার পথকে সহজ করে দিতে পারে। নেতিবাচক চিন্তা শুধুমাত্র ত্রুটি এবং অকল্যাণকর দিকগুলোকেই সামনে বেশি টেনে নিয়ে আসে। ফলে দোষগুলোই বেশিরভাগ চোখের সামনে ভেসে ওঠে আড়ালে থেকে যায় কল্যাণকর দিকগুলো। অনেক সময় কল্যাণকর কিংবা ইতিবাচক দিকগুলো নজরেই আসে না। মানুষের মধ্যে, প্রতিটি কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুটো দিকই আছে। কিন্তু যাদের স্বভাব শুধুমাত্র নেতিবাচক বিষয় চর্চা করা তারা সুশোভিত ফুলের মধ্যেও কাঁটার যন্ত্রণা খুঁজে বেড়ান।
ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দেয়ার অর্থ এই নয় যে নেতিবাচক দিকগুলোকে অগ্রাহ্য অথবা অস্বীকার করা হচ্ছে। বিষয়টি আদৌ সে রকম নয়। বরং নেতিবাচক বিষয়গুলোকে ইতিবাচকে রূপান্তরিত করাই ইতিবাচক দিকগুলোকে প্রাধান্য দেয়ার মূল টার্গেট। আমাদের কেউ কেউ আছেন সারাদিন শুধু নেতিবাচক চিন্তায় নিমজ্জিত থাকেন। এরা প্রতিটি কাজেরই নেতিবাচক খুঁত বের করতে ব্যস্ত। অথচ পুরো দিনকে কাজের সফলতায় সুসজ্জিত করার জন্য ইতিবাচক চিন্তা দিয়া কাজ শুরু করা প্রয়োজন। সামনে যা আসবে তা থেকে ইতিবাচক বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলেই চাপা পড়ে যেতে বাধ্য নেতিবাচক দিকগুলো। কাউকে পৌঁছানোর জন্য আপনার কাছে যদি এমন দু’টি সংবাদ থাকে যার একটি ইতিবাচক আরেকটি নেতিবাচক। তাহলে আপনি আগে কোনটি জানাবেন। নিশ্চয় আগে ইতিবাচক সংবাদটিই জানানো উচিত। শুরুতেই যদি নেতিবাচক সংবাদটি উপস্থাপন করে ব্যক্তির মনমানসিকতাকে দুর্বল করে ফেলেন তাহলে দেখবেন তার কাছে ইতিবাচক সংবাদটির আর মূল্যই থাকবে না। তবে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে ইতিবাচক সংবাদটি আগে দিয়ে পরে ইতিবাচক ভূমিকায় নেতিবাচক খবরটিকে উপস্থাপন করা। আপনজনের মৃত্যুর সংবাদের চাইতে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক সংবাদ আর কি হতে পারে। আমরা দেখি কেউ কেউ আপনজনের মৃত্যু সংবাদ তার প্রিয়জনকে সরাসরি বলে দেয়। ফলে হঠাৎ শোনা সবচেয়ে নেতিবাচক এই খবরে কেউ কেউ হার্টফেল তথা হৃদরোগেও আক্রান্ত হয়। কেউ কেউ শোকে বিহ্বল হয়ে মারাও যান। দেখুন নেতিবাচক সংবাদের প্রভাব কেমন মারাত্মক। অথচ নেতিবাচক খবরটিকেও ইতিবাচক ভঙ্গিতে উপস্থাপন করার সুযোগ আছে।
সমাজের চারপাশের পরিবেশ আমাদের প্রভাবিত করে। আমাদের দূরের বা কাছের মানুষের সাথে চলাফেরা, ওঠা-বসা, আচার আচরণ এমনকি কথাবার্তায় আমরা প্রভাবিত হই। অনেক সময় এতটাই প্রভাবিত হই যে, আমরা নিজেদের ভুলে যাই, নিজের চিন্তা-ভাবনার জলাঞ্জলি দেই। ভাবি হয়তো সেটাই সঠিক। প্রকৃতপক্ষে আমরা সবসময় সঠিক এবং নির্ভুল জিনিসটি বুঝতে পারি না। হয়তো পরিবেশই আমাকে সঠিক চিন্তার লালনে বাধা দেয়। আবার অনেক সময় নিজেদের চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেও আমরা প্রভাবিত হই। তাই যত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লালন করবো, যত ইতিবাচক চিন্তার লালনকারী মানুষের সাথে আমার চলাফেরা বা চিন্তার বিনিময় হবে ততোই আমরা ভালো রেজাল্ট পাবো। ইতিবাচক চিন্তার ফলে মানুষ তাঁর নিজেকে কল্যাণের দিকে পরিবর্তন করে। সমাজে একটি বিষয় খুবই প্রকট তা হলো- আমরা অন্যের নেতিবাচক গুণ, আচার-আচরণ এবং চিন্তাগুলোকেই বেশি লক্ষ করি, সেই সাথে তাদেরকে সেই অনুপাতেই বিচার করি। কিন্তু নিজের ভেতর লুকিয়ে রাখা নেতিবাচক চিন্তাগুলোকে ধ্বংস করি না। আমি আপনি যাকে নেতিবাচক দৃষ্টি দিয়ে মূল্যায়ন করি সেই মানুষের মধ্যে অনেক ইতিবাচক এবং ভালো গুণও রয়েছে সেগুলোকে আমরা খুব কমই নজর দিই। আমরা কি পারি না- অন্যের ইতিবাচক গুণগুলোকে মনে করিয়ে তাঁর প্রশংসা করতে। কারণ ভালো কাজের কিংবা ইতিবাচক গুণের জন্য যদি প্রশংসা পায়, তাহলে তাঁর ভেতরে আরও ইতিবাচক গুণের জন্ম হবে। সম্প্রতি একদল বিজ্ঞানী কিছু তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ পর্যালোচনা করে বলেছেন, তিনটি ইতিবাচক অনুভূতির বিপরীতে একটি নেতিবাচক অনুভূতি রয়েছে। সেই অনুপাতে ৩:১ হয়। এই অনুপাতই আমাদের ভবিষ্যতের চিন্তা-ভাবনার উৎস হিসেবে মনস্তাত্ত্বিকভাবে কাজ করে। মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, মানুষের ইতিবাচক অভ্যাসই পারে ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার জন্ম দিতে এবং ভালো কাজ করার মানসিক প্রেরণা দিতে। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা অসচেতন থাকি। যার ভেতরে নেতিবাচক দৃষ্টির লালন বেশি হয় তিনিই মূলত অন্যের নেতিবাচক বিষয়গুলোকে নিয়ে বেশি নাড়াচাড়া করেন। আমাদের সকলেরই উচিত নেতিবাচক নয়, সবসময় ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া।
লেখক : এমফিল গবেষক

SHARE

Leave a Reply