পবিত্র রমজানে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি -উম্মে নাজিয়া

রমজান মাস আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে বিশেষ রহমতের মাস। এ মাস আমাদের জীবনে তাকওয়ার প্রশিক্ষণের সুযোগ এনে দেয়, সেই সাথে আমরা শিখতে পারি কিভাবে ভারসাম্যপূর্ণ এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন করা যায়, কিভাবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস করা যায়। এ মাসে পাকস্থলীকে বিশ্রাম দেয়া হয় এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের হয়ে যায়। রোজা একজন ব্যক্তির শরীর স্বাস্থ্য ভালো করে, কিন্তু খাবার সঠিক না হলে স্বাস্থ্য খারাপ করে দেয়। একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস একজন ব্যক্তির শরীরকে ধ্বংস করে দিতে পারে। শুধু মুখের স্বাদ বিবেচনা করে খাবার খাওয়া উচিত নয়, অতিরিক্ত খাওয়া পরিহার করা উচিত। মানুষের আত্মিক স্বাস্থ্যের জন্যও খাবার ভূমিকা রাখে।
রোজাদাররা অনেক সময় মাথা ধরা, পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, অবসন্নতা এবং রক্তে চিনির শূন্যতাতে ভোগে। যদি রমজানে আমরা সঠিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করি তাহলে আমাদের উক্ত সমস্যাগুলো থাকবে না।
রমজানের খাদ্য তালিকায় প্রথমে যেটা থাকে সেটি হলো খেজুর। এটি সহজে হজম করা যায়, ক্ষুধার তীব্রতা কমায়, চিনি এবং খাদ্যপ্রাণ সমৃদ্ধ খাবার।
রোজায় যে সমস্ত খাবার খাওয়া ঠিক নয় তার মধ্যে আছে ভাজাপোড়া খাবার (সমুচা, মুরগির ফ্রাই, পটেটো চিপস), অতিরিক্ত চিনি সমৃদ্ধ খাবার, খুব চর্বিযুক্ত খাবার ইত্যাদি। এ সময় বাহিরের তৈরি খোলা খাবার একদম পরিহার করা উচিত। নিম্নমানের তেল, বাসি-পচা মশলা এবং বিষাক্ত রং মিশিয়ে তৈরি করা বিভিন্ন খাবার যতই লোভনীয় হোক না কেন খাওয়া কখনই উচিত নয়। এসময় পেটে কোন সমস্যা হলে তার রোজা রাখা খুবই কষ্টকর হবে, সেই সাথে রোজা বাদ দিতে হতে পারে। রমজানে খাবারে বিশেষ কিছু নিয়ম অবশ্যই মানতে হবে। তাহলে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো যাবে। যেমন: খুব গরম খাবার এবং খুব ঠাণ্ডা খাবার একসাথে খাওয়া ঠিক নয়। দইয়ের সাথে টক ফল,/ গরম খাবার,/ মাছ খেলে হজমে ব্যাঘাত ঘটে। দইয়ের সাথে পুরী বা তেলে ভাজা খাবার খেলে শরীর দ্রুত মোটা হয়।
দুধের সাথে ভাজা-পোড়া,/ তেলে ভুনা খাবার,/ নোনতা খাবার/, টক ফল,/ মাসকলাইয়ের ডাল,/ কাঁচা সবজি,/ মুলা,/ ডিম/, মাংস হজমে খুব সমস্যা করে।
ঘি বা মাখনের সাথে মধু খাওয়া যাবে না। লেবু, মাল্টা এবং কলা একসাথে খাওয়া যাবে না। শাকের সাথে তিল খেলে ডায়রিয়া হবার সম্ভাবনা থাকে।
স্বাস্থ্যকর বিকল্প খাবার হতে পারে ভাপে সিদ্ধ শিঙ্গাড়া, সমুচা, রোল, আলুর চিপস, আগুনে গ্রিল করা মাংস, মাছ, চিকেন। সকল খাবার গ্রুপ থেকে খাবার থাকা উচিত যথা কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, কম চর্বিযুক্ত ফ্যাট, সবজি, ফল এবং পানি।
প্রচুর ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে, ফাইবার কোষ্ঠবদ্ধতা দূর করে। শেষ রাতের খাবারে নান রুটি, ভাত, সবজি, ডাল এবং ফল থাকতে পারে, সেই সাথে চর্বিহীন মাংসের ঝোল অথবা আগুনে ঝলসানো মাংস। ডাল এ মাসে নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ভালো। এ ছাড়া প্রতিদিন কিছু বাদাম খাওয়া প্রয়োজন যাতে ভিটামিন এ এবং ডি এর চাহিদা পূরণ করবে। প্রচুর তরল খেতে হবে। অনেকেই এ মাসে প্রয়োজনীয় পানি বা তরল খাবার ঠিক ভাবে খান না, কেউ কেউ প্রয়োজনীয় পানির পরিবর্তে জুস, কফি, চা বা কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে থাকেন, যা ঠিক নয়। খাবার আধঘণ্টা পর গ্রিন টি, হালকা আদা চা, স্যুপ, জুস খাওয়া যেতে পারে। ইফতারের আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর হাফ লিটার করে, এক ঘণ্টা পর পর তিন বার পানি খেতে হবে। সেহেরির পর পানি খাওয়ার সময় থাকে না। সুতরাং ইফতার এবং রাতের ঘুমের আগে পানি খাওয়া শেষ করতে হবে। একসাথে অতিরিক্ত পানি খাওয়া যাবে না। এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
খাবারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো পুষ্টি গ্রহণ, যাতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়, শরীর সুস্থ থাকে এবং আমরা ইবাদত ও জাগতিক কাজকর্ম করার জন্য শক্তি পাই। রান্নার ফলে খাদ্য যাতে সুস্বাদু এবং সুখাদ্য হয়। খাবারে কম তেল এবং কম মশলা ব্যবহার করতে হবে। সেদ্ধ ঝোল খাওয়া স্বাস্থ্যকর। এ মাসে যেহেতু খাবার সময় রাত, সুতরাং শাকজাতীয় খাবার বাদ দেয়া ভালো। তবে শাকের স্যুপ ইফতারিতে খাওয়া যেতে পারে। অনেকেই মনে করেন রোজা আছি সারাদিন খাওয়া হয় না, তাই দুনিয়ার যত খাবার আছে সবই খাব। অনেক মা বোন আছেন সেহেরি খেয়ে লম্বা ঘুম দেন, ওঠেন ১০-১১ টার দিকে। এরপর শুরু করেন রান্নার আয়োজন। কে কী খাবে, কার কী পছন্দ, সারাদিন খাওয়া হয়নি, কাজেই মন ভরে খেতেই হবে। সুতরাং ব্যাপক আয়োজন করতে হবে, যতই কষ্টসাধ্য হোক না কেন। ফলে খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং ইবাদত বন্দেগির সময় কম হয়ে যায়।
রমজান খাবার উৎসবের মাস নয়। এটি ইবাদতের উৎসবের মাস। এমনভাবে খাবার নির্বাচন করতে হবে যাতে সেটা সহজপাচ্য হয় এবং প্রচুর শক্তি পাওয়া যায়। রমজানে আরো খেয়াল রাখতে হবে, কোন হারাম খাবার কিংবা হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থের খাবারে রোজাও কবুল হবে না, দোয়াও কবুল হবে না।
অনেকে আছেন যারা রোজা রেখে সারাদিন ঘুমিয়ে কাটাতে চান। যেহেতু শেষরাতে ঘুম থেকে উঠেছি, তাই ঘুম খুব লম্বা হবে এটিও ঠিক না, তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। সব কাজ সন্ধ্যার মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করতে হবে এবং বিতরের নামাজের পর দ্রুত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। রমজান যেহেতু প্রশিক্ষণের মাস তাই অন্যান্য মাসের চেয়ে পরিশ্রম একটু বেশি হবে। এজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি থাকতে হবে। ফজরের পর কিছুটা ঘুমিয়ে নেয়া ভালো, তবে অর্ধবেলা কখনই নয়। এ ছাড়া হালকা ব্যায়াম, সাইকেল চালানো, হাঁটাচলা করতে হবে। রোজা আছি দেখে কিছু করতে হবে না, এ ধারণা ভুল। পৃথিবীতে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ আছে যারা রোজা রেখেও পরিশ্রম করে থাকে। আমরা স্বাভাবিকভাবে যেভাবে চলতাম সেইভাবেই চলতে হবে।
অনেক মানুষ বিশেষ করে যাদের সামর্থ্য আছে উনারা রমজান শুরু হবার পূর্বেই বিশেষ কেনা-কাটার আয়োজন করে থাকেন। কিভাবে সারা মাস খুব ভালোভাবে খাওয়া দাওয়া করা যাবে। উনারা ৩০ দিনের বাজার এবং রান্নার জন্য বিশেষ কর্মসূচি তৈরি করে থাকেন। ফলে বাজারমূল্য হঠাৎ করে বেড়ে যায়। মনে হয়, রমজান তো নয় কোন খাবার উৎসবের দিন আসছে। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে রমজান কোন খাদ্যাভ্যাসের উৎসব নয়, রমজান শারীরিক মানসিক এবং আত্মিক ইবাদতের প্রশিক্ষণের মাস। এখানে নিজের খাবারের প্রতি এত যত্ন আর চিন্তা সেখানে আশপাশে হাজারো মানুষ না খেয়ে আছে, তাদের জন্যও আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। নিজেরা একটু কম খেয়ে অভাবীকে খাবার দেবার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত তৃপ্তি আর শান্তি। রমজানে ইবাদতকে বেশি প্রাধান্য দিতে হবে, রান্নাকে নয়। রমজান মাসে সুযোগ আসে যখন আমরা যারা বছরের পাপের ক্ষমা লাভের সুযোগ পাই। এ মাসে আমাদের জীবন-যাপন প্রণালী বদলে ফেলে ভালো কাজ এবং ভালো অভ্যাস শুরু করতে পারি। রোজা থাকুক বা নাই থাকুক খাবার বিষয়গুলো একই থাকা উচিত। রান্নাঘরে প্রচুর সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, “মানুষের পেট পুরে খাবার খাওয়ার প্রয়োজন নেই, তার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট যাতে মেরুদণ্ড সোজা করে রাখা যায়, কিন্তু সে পেটপূর্ণ করে খায়, পেটের একাংশ খাবার, একাংশ পানীয়, একাংশ ফাঁকা থাকবে বাতাসের জন্য (ইবনে মাজাহ)।
নবী করিম (সা.) ইফতারিতে সাধারণত তাজা আজুয়া খেজুর খেতে পছন্দ করতেন। সেহরির সময় কোন কোন দিন নবী (সা.) তাহিরি (রুটি ও খেজুর) এবং পানি পান করতেন। কোন কিছু না থাকলে সামান্য খেজুর, দুধ এবং পানি পান করতেন। নবী (সা.) বলেছেন তোমরা সেহেরি খাও, এতে বরকত রয়েছে।
যখন খাবার না থাকত তখন শরবত দিয়ে ইফতার করতেন। সাধারণত যে খাবার সব জায়গায় পাওয়া যায় সেই খাবারই খেতেন। রমজান উপলক্ষে কোন বিশেষ রান্নার আয়োজন হতো না। হঠাৎ কোন কোন সময় মাংস, রুটি, কিছু মিষ্টি, স্যুপ, শাকসবজি, কাবাব খেতেন। তিনি রমজানেও অন্যান্য দিনের মতো সাধারণ খাবার খেতেন। নবীজি (সা.) রমজানে খাদ্য নয়, রোজার অন্তর্নিহিত কল্যাণের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন।
মানুষ এখন ওজন কমানোর জন্য কত চেষ্টা করছে কিন্তু আমাদের প্রিয় নবী (সা.) ১৪০০ বছর পূর্বেই তা দেখিয়ে গেছেন। নবীজি আমাদের পেট ভর্তি করে খাবার খেতে নিষেধ করেছেন, পেট পুরে খেলে ওজন বেড়ে যাবে, অলসতা এবং বিভিন্ন রোগব্যাধিতে মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। রমজান মানুষকে খাবারের প্রতি লোভ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। তবে রমজানের পরিমিত খাবার খেতে হবে যাতে খুব দুর্বল না লাগে এবং ইবাদতে ব্যাঘাত না ঘটে। অতএব খাদ্য তালিকা সেইভাবে প্রস্তুত করতে হবে। রোজা অনশন নয়, এটি প্রাকৃতিক নিয়ম। রোজা থাকলে পাকস্থলী বিশ্রাম পায়, ফলে মেটাবলিজম প্রক্রিয়ার দ্রুত হয় এবং ক্যালরি ভালোভাবে কাজে লাগে। রোজা ওজন কমানোর কোন বিষয় নয়, তবে রমজানের রুটিন মেনে চললে ওজন কম হবে। অনেকে মনে করেন রোজা রেখে স্লিম হওয়া যায়। এটিও ঠিক নয়। সব কাজের কর্মফল নিয়ত অনুযায়ী হবে। রোজা শুধুমাত্র আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য।
রমজানে পানাহার ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তার জন্য খাবারের প্রতি আসক্তি বা লোভ থাকা যাবে না। রমজান যেহেতু ত্যাগের মাস, ভোগের মাস নয়, সে জন্য আমরা সবাই সেই পরিমাণ খাবার খাব যাতে আমাদের শরীর সুস্থ থাকে এবং ইবাদতের শক্তি পাই।
সুতরাং রহমত, বরকত এবং মাগফিরাত এ মাসে শরীর-স্বাস্থ্য এবং মনকে ভালো রাখতে হলে অবশ্যই বিশুদ্ধ, পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply