ফেরেশতারা যাদের জন্য দু’আ করেন -আলী আহমাদ মাবরুর

‘ফেরেশতা’ মূলত একটি ফার্সি শব্দ। আরবির ‘মালাকুন’ (একবচন) ও ‘মালাইকা’ (বহুবচন)-এর প্রতিশব্দ এটি। কুরআন ও হাদিসে ‘মালাইকা’ শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে বার্তাবাহক। আল্লাহ সৃষ্টিজগতে নানা কাজে ফেরেশতাদের নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে তাঁদেরকে আল্লাহর বিশেষ বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহর বাণী ও নির্দেশনা তাঁর প্রেরিত নবী-রাসূলদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব পালন করেন ফেরেশতারা।

ফেরেশতা আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি। আল্লাহ তায়ালা নূর বা আসমানি জ্যোতি থেকে তাদের সৃষ্টি করেছেন। তারা আল্লাহর অতি সম্মানিত ও পুণ্যবান সৃষ্টি। তারা সবসময় আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকেন। তারা পুরুষও নন, নারীও নন। আল্লাহর হুকুমে ফেরেশতারা বিভিন্ন আকার ও রূপ ধারণ করতে পারেন। মানুষের মতো রক্ত-মাংসের সৃষ্টি না হওয়ায়, তাদের কামনা-বাসনা, পানাহারের প্রয়োজনীয়তা ও ঘুম-বিশ্রাম কিছুই নেই।
আল্লাহ পাক আল কুরআনে ফেরেশতাদের সম্পর্কে বলেন, “বরং তারাতো সম্মানিত বান্দা। তারা আগ বাড়িয়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁরই (একমাত্র আল্লাহর) আদেশে কাজ করে। তাদের সামনে এবং পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। তারা শুধু তাদের জন্য সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তাঁর ভয়ে ভীত।’ (সূরা আম্বিয়া : ২৬-২৮)
‘আল্লাহ তাদের যে নির্দেশ দেন, তা তারা লঙ্ঘন করে না এবং তাদেরকে যে নির্দেশ দেয়া হয় তা তাঁরা পালন করে।’ (সূরা তাহরিম : ৬)
‘আকাশ এবং জমিনে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদতে অহঙ্কার করে না এবং অলসতাও করে না। তারা রাত-দিন তার পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না।’ (সূরা আম্বিয়া : ১৯-২০)
“নিশ্চয়ই যারা তোমার পরওয়ারদিগারের সান্নিধ্যে রয়েছেন, তারা তাঁর ইবাদত করার বিষয়ে অহঙ্কার করে না এবং স্মরণ করে তাঁর পবিত্র সত্তাকে। আর তাঁকেই সেজদা করে।’ (সূরা আরাফ : ২০৬)
ফেরেশতারা যেহেতু মানুষের কাজকর্মগুলোকে রেকর্ড করেন, মানুষের বিষয়ে আল্লাহর কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেন, শাস্তি দেয়ার বা পুরস্কার প্রদানের সুপারিশ করেন, তাই তারা কাদের বিষয়ে সন্তুষ্ট থাকেন আর কাদের শাস্তির কামনা করেন তা আমাদের জন্য জানা জরুরি। মুমিন বান্দাদের জন্য ফেরেশতাদের দু’আ করার বিষয়টি নিশ্চিত করে আল্লাহ পাক বলেন, ‘যারা আরশ বহনে রত এবং যারা তার চারপাশ ঘিরে আছে, তারা তাদের রবের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্রশংসার সাথে এবং তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, হে আমাদের রব! আপনার দয়া ও জ্ঞান সর্বব্যাপী। অতএব যারা তওবা করে এবং আপনার পথ অবলম্বন করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। হে আমাদের রব! আপনি তাদেরকে স্থায়ী জান্নাতে দাখিল করুন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের পিতা মাতা, পতি-পত্নী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকে। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় এবং আপনি তাদেরকে শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সেদিন আপনি যাকে শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন, তাকে তো অনুগ্রহই করবেন, এটাই তো মহা সাফল্য।’ (সূরা মুমিন : ৭-৯)
এ পর্যায়ে আমরা সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করবো যে, কারা সেই সৌভাগ্যবান বান্দা যাদের জন্য ফেরেশতারা নিরন্তর দু’আ করে যান।
অজু থাকা অবস্থায় ঘুমানো ব্যক্তি :
ঘুমানোর পূর্বে অজু করা একজন নেককার বান্দার উত্তম অভ্যাসগুলোর একটি। অজুর মাধ্যমে বাহ্যিক পবিত্রতার পাশাপাশি মানসিক প্রফুল্লতাও লাভ করা যায়। আর ফেরেশতাগণ ঐ ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, যারা অজুু অবস্থায় নিদ্রা যাপন করেন। রাসূল সা. বলেছেন, “যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (অজু অবস্থায়) ঘুমায় তার সাথে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকে। তারপর সে ব্যক্তি ঘুম থেকে জেগে ওঠার সাথে সাথেই সে ফেরেশতা আল্লাহ তায়ালার কাছে দু’আ করতে থাকেন এই বলে যে, হে আল্লাহ! আপনার এ বান্দাকে ক্ষমা করে দিন, কেননা সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছিল।’ (ইবনে হিব্বান-৩/৩২৮-৩২৯)
রাসূল সা.-এর প্রতি দরুদ পাঠকারী :
“যে ব্যক্তি রাসূল সা.-এর ওপর দরুদ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তার ওপর সত্তর বার দয়া করেন ও তাঁর ফেরেশতারা তার জন্য সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। অতএব বান্দারা অল্প দরুদ পাঠ করুক বা অধিক দরুদ পাঠ করুক (এটা তার ব্যাপার)।” (ইবনে হিব্বান)
রোগী দেখতে যাওয়া ব্যক্তির জন্যও ফেরেশতারা দু’আ করবেন :
পরিচিত কেউ অসুস্থ হলে তাকে দেখতে যাওয়া সামাজিক দায়িত্বেরই অংশ। সামাজিক জীব হিসেবে আমরা অনেকেই এ দায়িত্ব পালন করে থাকি। কিন্তু সামাজিকতা পালনের পাশাপাশি এ কাজটি ভীষণ রকম নিয়ামতপূর্ণ একটি কাজ যা আল্লাহ তায়ালা খুবই পছন্দ করেন। ফেরেশতাগণও বেশ উচ্ছ্বসিত থাকেন। রাসূল সা. বলেছেন, “যে কোনো মুসলিম তার অপর মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, আল্লাহ তায়ালা তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তারা দিনের যে সময় সে দেখতে যায় সে সময় থেকে দিনের শেষ পর্যন্ত সে ব্যক্তির জন্য ফেরেশতারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং সে রাতের যে সময় দেখতে যায় সে সময় থেকে রাতের শেষ পর্যন্তÍ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।” (ইবনে হিব্বান-২৯৫৮)
মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনাকারী :
জাগতিক কাজের ব্যস্ততা আল্লাহর কাছে মন খুলে দু’আ করার সময় ও মন-মানসিকতাও নষ্ট করে দিয়েছে। আর পরস্পরের পেছনে আমরা এতটাই লেগে আছি, এত বেশি সমালোচনায় মুখর থাকছি যে অপরের জন্য দু’আ করার মতো দৃষ্টিভঙ্গিও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এ সম্পর্কে উম্মু দারদা রা. বলেন, নিশ্চয়ই রাসূল সা. বলেছেন : কোনো মুসলিম যদি তার অনুপস্থিত মুসলিম ভাইয়ের জন্য দু’আ করে অথবা ক্ষমা চায় তবে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের কল্যাণার্থে দু’আ করে তখন সে নিযুক্ত ফেরেশতা বলে, আমিন। অর্থাৎ- হে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্য অনরূপ (অর্থাৎ তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তায়ালা তোমাকেও তা-ই দান করুন)। (মুসলিম-২০৯৪)
উত্তম জ্ঞান প্রদান :
ফেরেশতাগণ তাদের জন্যও দু’আ করেন, যারা মানুষকে কল্যাণকর ও উত্তম বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- “নিশ্চয়ই মানুষকে ভালো কথা শিক্ষা দানকারীর প্রতি আল্লাহ তায়ালা দয়া করে থাকেন এবং ফেরেশ্তাগণ, আসমান- জমিনের অধিবাসীগণ এমনকি গর্তে থাকা পিঁপড়া ও পানির মাছেরাও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে।” (তিরমিজি-২৮২৫)
রোজার নিয়তে সাহরি খাওয়া :
শরিয়তের পরিভাষায় রোজা বা সিয়াম পালন করার উদ্দেশ্যে শেষ রাতে পানাহার করাকে সাহরি বলা হয়। ইসলামী বিধানমতে, এটি সুন্নত হলেও প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া অর্জন এবং আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য এর গুরুত্ব ও ফজিলত অপরিসীম। হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন, নবীজি সা. বলেন, তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত রয়েছে। (বুখারি-১৮০১)। হযরত আমর ইবনুল আস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আমাদের রোজা আর আহলে কিতাবদের রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া আর না খাওয়া। (মুসলিম)।
কল্যাণের পথে দানকারী :
জান্নাতে যাওয়ার একটি সহজ ও পরিচিত উপায় হলো আল্লাহর রাস্তায় দান ও সাদাকা করা। আল্লাহর প্রতি বান্দার ঈমান প্রকাশিত হয় তার দান-সাদাকার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনের একেবারে শুরুতে মুত্তাকিদের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কিছু গুণাবলির কথা বলেছেন। তার মধ্যে একটি হলো মুত্তাকিরা জাকাত প্রদান করবে, দান-সাদাকা করবে। আল্লাহ বলেন, “যারা অদেখা বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামাজ প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে।” (সূরা বাকারা : ৩)
রাসূল সা. বলেছেন, “প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন, একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানকারীর সম্পদ বাড়িয়ে দিন। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! যে দান করে না তার সম্পদকে বিনাশ করে দিন।” (বুখারি-১৪৪২)
প্রথম কাতারে সালাত আদায়কারী :
নামাজে প্রথম কাতারে যারা নামাজ আদায় করেন, তাদের জন্য ফেরেশতারা দু’আ করেন। বিষয়টি বেশ স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। নামাজ হলো মুমিনের মিরাজ। সত্য ও মিথ্যার পার্থককারী। নামাজের বিষয়ে তারাই সিরিয়াস থাকবেন যারা আল্লাহর হক আদায়ে তৎপর থাকবেন। প্রথম কাতারে নামাজ পড়তে হলে একজন মানুষকে অন্য সবার আগে মসজিদে যেতে হয়। এমনকি আজানেরও আগে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। সেক্ষেত্রে নামাজের প্রস্তুতিও তাকে আগে থেকেই নিতে হয়। ফলে ফেরেশতারা তার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন এবং তার জন্য দু’আ করেন। হযরত বারা রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেছেন, “প্রথম কাতারের নামাজিদেরকে নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করেন ও ফেরেশতারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।” (ইবনে হিব্বান)
নামাজের জন্য মসজিদে অপেক্ষারত ব্যক্তি :
যারা প্রথম কাতারে নামাজ পড়েন বা দ্বিতীয় কাতারে, তারাই এ দু’আ পাওয়ার মতো সৌভাগ্যবান হতে পারেন। অজু অবস্থায় সালাতের জন্য অপেক্ষারত মুসল্লিদের জন্য ফেরেশতাগণ দু’আ করেন। হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত- রাসূল সা. বলেছেন, “তোমাদের মাঝে কোনো ব্যক্তি যখন অজু অবস্থায় নামাজের অপেক্ষায় বসে থাকে সে যেন নামাজ আদায়েই রত রয়েছে, অথচ তখনও জামায়াতের নামাজ শুরুই হয়নি। তার জন্য ফেরেশতারা দু’আ করতে থাকে এই বলে যে, হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! আপনি তার ওপর দয়া করুন।” (মুসলিম-৬১৯)
নামাজের স্থানেই বসে থাকা :
আমরা নামাজ পড়ে সালাম ফিরিয়েই বের হওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে যাই। একজনের ওপর দিয়ে আরেকজন চলে যায়। অনেকে জুতো সংগ্রহ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। অথচ ফরজ নামাজ আদায়ের পর অনেকগুলো ইবাদত পালনের অবকাশ রয়েছে। রাসূল সা. নিজে ফরজ নামাজ আদায় করার পর নামাজের স্থানেই বসে থাকতেন। পরবর্তীতে আরো লোকজনের সাথে কথা বলতেন। তাদেরকে দ্বীনি শিক্ষা প্রদান করতেন। আবু দাউদে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “সালাতে তাকবিরে তাহরিমা অনেকগুলো হালাল বিষয়কে (যেমন- কথা বলা, স্থান ত্যাগ করা সহ নামাজের বাইরের কাজকর্ম) হারাম করে দেয়। আর ঐ হারাম বিষয়গুলো আবারও হালাল হয়ে যায় সালামের মাধ্যমে।” অর্থাৎ সালাম ফিরানোর পর নামাজের স্থান ত্যাগে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

তবে সালামের পর ঐ একই স্থানে বসে তাসবিহ পাঠ অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ একটি কাজ। সালাম ফিরানোর পর সালাতের স্থানে বসে থাকা যেহেতু নামাজের অংশ নয়, একজন বান্দা হয়তো দুনিয়াবি অন্য কোনো কাজকে বাদ দিয়েই সেখানে থাকেন। তাই এ বাড়তি সময়টাকে আল্লাহও অনেক পছন্দ করেন। নামাজের স্থানে অবস্থানকারী ব্যক্তির জন্যও ফেরেশতাগণ দু’আ করে থাকেন।
কাতারের ডান দিকে নামাজ পড়া :
প্রিয়নবী সা. জামায়াতের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে প্রথম কাতারে নামাজ আদায় এবং কাতারের ডান দিকে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। এ ঘোষণার ফলে নামাজের প্রতি উম্মতে মুসলিমার আগ্রহ-উদ্দীপনা ও উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। মানুষ প্রথম কাতারে এবং ডান দিকে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে। আল্লাহ তায়ালা জামায়াতের প্রথম কাতার এবং কাতারের ডান দিকের ওপর রহমত বর্ষণ করেন। তাঁর ফেরেশতাগণও প্রথম কাতারের এবং কাতারের ডানদিকের লোকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাসূল সা. বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সেসব মানুষের প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা রহমতের দু’আ করেন, যারা কাতারের ডান পাশে সালাত আদায় করে।’ (আবু দাউদ-৫৭৮)
কাতারের মাঝখানে খালি জায়গা পূরণ করা :
কাতারের শূন্যস্থান পূরণ না করলে নামাজও পরিপূর্ণভাবে আদায় হয় না। নামাজ আদায়ের সময় প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করা যাবে না। আমরা যদি নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অলসতা ও কার্পণ্য প্রদর্শন করি, তাহলে আখিরাতে আমাদেরকে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। নামাজে আলস্য প্রদর্শন করা মুনাফিকের কাজ। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে, তিনি তাদের ধোঁকায় ফেলে শাস্তি দেন এবং তারা যখন সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, লোক দেখানোর জন্য, তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।’ (সূরা নিসা : ১৪২)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘অতত্রব দুর্ভোগ সেসব সালাত আদায়কারীর যারা নিজেদের সালাত আদায়ে অমনোযোগী।’ (সূরা মাউন : ৪-৫)।
নামাজে আমিন বলা :
জামায়াতে নামাজ পড়ার সময় ইমাম সাহেব যখন সূরা ফাতিহা পড়া শেষ করেন, তখন ফেরেশতারা সমস্বরে আমিন বলে ওঠেন। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যদি কোনো ইমাম বলেন ‘গায়রুল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দল্লিন’, তখন উপস্থিত ফেরেশতাগণ সবাই একসাথে আমিন বলে ওঠেন। নামাজরত ব্যক্তির ‘আমিন’ বলা যদি ফেরেশতার আমিন উচ্চারণের সঙ্গে মিলে যায় তাহলে ওই ব্যক্তির জীবনের আগের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারি ও মুসলিম)
যারা ফজর ও আসরের নামাজ জামায়াতে আদায় করেন :
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয। আমরা যদি আল্লাহর দিদার লাভ করতে চাই তবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সঠিকভাবে আদায় করতে হবে। এই নামাজগুলো জামায়াতে পড়ার ওপর বিশেষভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে নামাজ আদায় করার তাগিদ দিয়ে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।’ (সূরা বাকারা : ৪৩) রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘জামায়াতে নামাজের ফজিলত একাকী নামাজের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি।’ (বুখারি)।

রাসূলুল্লাহ সা. সারা জীবন জামায়াতের সঙ্গেই নামাজ আদায় করেছেন। এমনকি ইন্তেকালপূর্ব অসুস্থতার সময়ও জামায়াত ছাড়েননি। সাহাবায়ে কেরামের পুরো জীবনও সেভাবে অতিবাহিত হয়েছে। (বুখারি-৬২৪) নামাজের জামায়াতে শামিল হওয়ার ব্যাপারে এশা, ফজর ও আসর নামাজের জামায়াতের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হযরত ইবনে ওমর রা. বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কেউ যদি এশা ও ফজরের জামায়াতে উপস্থিত না হতো, তবে আমরা মনে মনে ভাবতাম, হয়তো সে মুনাফিক হয়ে গেছে।’ (তাবারানি, ইবনে খুযায়মা)
প্রতিদিন দান করা :
মুত্তাকি বান্দারা বিশ্বাস করে যে তাদের হাতে যে অর্থ সম্পদ আছে, তার মালিক তারা নয়। বরং আল্লাহ পাক তাদেরকে দয়া করে এই অর্থ প্রদান করেছেন। তাই তারা এই রিজিক পেলেই তা থেকে কিছু অংশ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে। রিজিকের উৎস আল্লাহ তায়ালা- এই বিশ্বাস রাখা ঈমানের একটি অংশ। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে দান-সাদাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে ৭০টির বেশি আয়াত নাজিল করেছেন। দান সাদাকা হলো একটি বরকতময় বীজের মতো- যার প্রতিটি দানা থেকে অসংখ্য নতুন গাছের জন্ম হয়। আল্লাহ বলেন, “যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।” (সূরা বাকারা : ২৬১)
আমাদের অনেকেই দান-সাদাকা করেন কিন্তু তা রামাদান মাসের মতো বিশেষ কোনো মাসে। কিংবা বিশেষ কোনো দিনে। কিন্তু দান-সাদাকা হলো প্রতিদিন পালন করার মতো একটি ইবাদত- এমনকি তা খুব অল্প পরিমাণে হলেও। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, প্রতি সকালে মানুষ যখন ঘুম থেকে ওঠে দু’জন ফেরেশতা আসেন। তাঁদের একজন বলেন, ‘হে আল্লাহ! খরচকারীর ধন আরো বাড়িয়ে দিন।’ আর দ্বিতীয়জন বলেন, ‘হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন।’ (মুসলিম-২২২৬)
জিকিরকারীর জন্য ফেরেশতাগণ দু’আ করেন :
জিকির মানে হলো আল্লাহকে স্মরণ করা। জিকিরের মাধ্যমে আমরা অন্তরের ভালোবাসা প্রকাশ করি। আমরা যাকে ভালোবাসি, আমাদের মন অবচেতনভাবেই তার কথা ভাবতে শুরু করে। যেকোনো দুনিয়াবি বা মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়ে থাকে। যাকে আপনি যত বেশি ভালোবাসবেন, তার কথা তত বেশি আপনার মনে পড়বে। একইভাবে একজন বিশ্বাসী বান্দার মনেও আল্লাহর জন্য যে ভালোবাসা সুরক্ষিত থাকে তা প্রকাশিত হয় জিকিরের মাধ্যমে। আল্লাহর সাথে আমাদের যে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক তার সেতুবন্ধ ঘটায় এই জিকির। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, “কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ঈমানদার তাদের ভালোবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।” (সূরা বাকারা : ১৬৫)

হাদিসেও এমন কিছু আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে যাতে ফেরেশতাদের দু’আ পাওয়ার সৌভাগ্য নিশ্চিত হয়। এমন একটি আমল হচ্ছে সকালে ও সন্ধ্যায় সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করা। হজরত মাকাল বিন ইয়াসার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি সকালবেলা তিনবার পড়বে ‘আউজুবিল্লাহিস সামিয়িল আলিমি মিনাশ শাইতানির রাজিম’। তারপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াত তিলাওয়াত করবে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা সে ব্যক্তির জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করেন; যারা ওই ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দু’আ করতে থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। আর এ সময়ের মধ্যে যদি লোকটি মারা যায়, তাহলে সে শহীদের মৃত্যু লাভ করে। আর যে ব্যক্তি এটি সন্ধ্যার সময় পড়বে, তাহলে তার একই মর্যাদা রয়েছে। অর্থাৎ মাগরিব থেকে সকাল পর্যন্ত সময়ের জন্য ৭০ হাজার ফেরেশতা গুনাহ মাফের জন্য দু’আ করে, আর সে সময়ে মারা গেলে শহীদের সওয়াব পাবে। (তিরমিজি-৩০৯০)
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সেই সৌভাগ্যবান বান্দাদের মধ্যে শামিল করুন, যাদের জন্য সম্মানিত ফেরেশতাগণ আল্লাহর কাছে দু’আ করেন, তাদের ক্ষমা করে দেয়ার জন্য সুপারিশ করেন। আমিন।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক

SHARE

Leave a Reply