বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসী এবং রিসালায়ে নুর -আলী আহমাদ মাবরুর

বিংশ শতকে মুসলিম বিশ্বে যে কয়জন বড় মানের শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় সংস্কারক আবির্ভূত হয়েছিলেন তুরস্কের বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসী তার মধ্যে অন্যতম। তার গোটা জীবন, সংগ্রাম এবং সাধনা আমাদের জন্য প্রেরণাদায়ক। নুরসীকে তুরস্কের ইসলামের পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার জীবনের অনন্যসাধারণ কাজটি হলো রিসালায়ে নুর (ইংরেজিতে বলা হয় দ্য বুক অব লাইট)। মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে যেভাবে সাইয়্যেদ নুরসী তার রিসালায়ে নুরে পর্যালোচনা করেছেন, তা অন্য কোন বইতে আমরা সেভাবে আর পাই না। এই গ্রন্থে আমাদের চারিপাশের প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াতকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। রিসালায়ে নুর হলো সেই অসাধারণ সৃষ্টি যা বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসীকে আজও চির অম্লান করে রেখেছে।
নুরসী তার জন্মভূমি তুরস্কে উস্তাদ বদিউজ্জামান হিসেবেই বেশি পরিচিত। তিনি এমন একজন বিদ্বান ছিলেন যিনি শুধুমাত্র ইসলামের বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনাই নয় বরং একই সঙ্গে আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (সায়েন্স অব ন্যাচার বা ন্যাচারাল সায়েন্স) এবং এর অগ্রগতি সম্বন্ধেও দক্ষ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক, ধর্মীয় সংস্কারক, শিক্ষাবিদ এবং মানুষের মুক্তি সংগ্রামের লড়াকু একজন সৈনিক। তার শিষ্য বা ছাত্র কয়জন কিংবা কতজন মানুষ তার কাজ থেকে উপকৃত হয়েছে তার কোন সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায় না। কেননা তুর্কি নামক জাতিটির আজকের এই উত্থানের পেছনেও বদিউজ্জামান এবং তার রচনাবলির ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। প্রচন্ড ধরনের প্রতিকূল একটি ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশে থেকেও পুরোটা জীবন জুড়েই তিনি ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে কাজ করে গেছেন। শত নির্যাতনেও তিনি আপস করেননি বরং সার্থকতার সাথে একটি সফল আন্দোলনের সূতিকাগার রচনা করার জন্য নিজ জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।
উস্তাদ বদিউজ্জামান ১৮৭৭ সালে তুরস্কের পূর্বাঞ্চলের বিটলিস নামক জেলার অধীনে নুরস্ নামক একটি গ্রামে জন্ম নেন। এই নুরস্ গ্রামে জন্ম নেয়ার কারণেই তার নামের শেষে নুরসী শব্দটি যোগ হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন সাইয়্যেদ অর্থাৎ রাসূলের (সা.) বংশধর। পিতার দিক থেকে বিচার করলে তার আদি পুরুষ ইমাম হাসান (রা.) আর মায়ের দিক থেকে তার আদি পুরুষ ইমাম হোসাইন (রা.)।
৯ বছর বয়স পর্যন্ত নুরসী তার পরিবারের সাথেই ছিলেন। সেই সময়ে তার পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় বড় ভাই মোল্লা আব্দুল্লাহর কাছে। আব্দুল্লাহও ইসলাম সম্বন্ধে খুব ভালো জ্ঞান রাখতেন। পরে নুরসী খুব অল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন মাদ্রাসায় তৎকালীন সময়ের প্রসিদ্ধ আলেমদের সান্নিধ্যে থাকার সুযোগ পান। ফটোগ্রাফিক মেমোরি (একবার পড়লেই সেটাকে মনে রাখার ক্ষমতা), উৎকর্ষ মানের বুদ্ধিমত্তা এবং অদম্য সাহসের কারণে নুরসী অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। আশপাশের মানুষও তার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভার জন্য তাকে সমীহ করতে শুরু করে। তৎকালীন সময়ের অটোম্যান আলেমরা শিশু-কিশোরদের জন্য যে সিলেবাস বা কারিকুলাম নির্ধারণ করেছিলেন নুরসী মাত্র তিন মাসের মধ্যে তার পুরোটাই আত্মস্থ করে ফেলেন। তার প্রতিভা দেখে তার শিক্ষক মোল্লা ফেতুল্লাহ তাকে বদিউজ্জামান বা যুগের বিস্ময় নামে অভিহিত করতে শুরু করেন। তার মেধা ও মুখস্থ বিদ্যার কদর করতেন পূর্বতুরস্কের প্রায় সব আলেমই। সেই সময় পর্যন্ত ইসলামিক বিজ্ঞানের ওপর যে ৯০টি রচনাবলি ছিল বদিউজ্জামান নুরসী তার সবটাই বেশ কম সময়ের মধ্যে মুখস্থ করে ফেলেন। অথচ সাধারণভাবে তৎকালীন যে কোন সাধারণ ছাত্র এই একই কোর্সটি সুসম্পন্ন করতে গড়ে ১৫ বছর সময় নিতেন।
নিজ এলাকার পড়াশোনা শেষ করার পর নুরসী চলে যান ভ্যান নামক পূর্ব তুরস্কের একটি প্রদেশে। সেই সময়েই নুরসী প্রথমবারের মতো বুঝতে পারেন যে, বর্তমান সভ্যতার ক্রীড়নকেরা আধুনিক বিজ্ঞানের যে নানা দিক আবিষ্কার করেছেন সেগুলো আসলে মুসলমানদেরকে ভালোভাবে জানতে হবে। কেননা বিজ্ঞানের উৎকর্ষতাকে ভিত্তি করে যদি ইসলামের বার্তা মানুষের কাছে না পৌঁছানো যায় অর্থাৎ ইসলামকে যদি বিজ্ঞানময় হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা না যায় তাহলে ইসলামের দাওয়াতি কাজ করে খুব একটা সফল হওয়া যাবে না। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বিজ্ঞানের নানা শাখা ও নানা অগ্রগতিকে আরো গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেন। এবারও বেশ অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি গণিতশাস্ত্র, প্রাণিবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, মহাকাশ বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভুগোল এবং দর্শনের ওপর বেশ দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি ভ্যান প্রদেশে জীবনের যে ১৫টি বছর পার করেন তার পুরো সময়টাই তিনি স্থানীয় উপজাতি ও গ্রামবাসীদের শিক্ষক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। তিনি সেই এলাকায় একটি মাদ্রাসা চালু করেন স্থানীয়ভাবে যার নাম দেয়া হয়েছিল হরহর। এই ১৫ বছর সময়ের মধ্যেই, নুরসী যুক্তিবিদ্যা বিশারদ ইসমাইল গেলেনবেভির বুরহান নামক বইটির উপর একটি নিরীক্ষাধর্মী বিশ্লেষণও রচনা করেন।
ইউরোপীয় আধুনিক বিজ্ঞান এবং ইসলামের প্রথাগত বিজ্ঞানের মধ্যে একটি সমন্বয় সাধন করার উদ্দেশ্যে উস্তাদ নুরসী এই উভয় ধারার বিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেই অনুভূতি থেকেই তিনি পূর্ব তুরস্কে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। যার নাম দেয়া হয়েছিল ‘মেদরেসেত-উজ জেহরা’। এই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য তার সরকারের সমর্থন দরকার ছিল। সরকারি মহলের কাছ থেকে এই সহযোগিতা পাওয়ার অভিপ্রায়েই নুরসী ইস্তাম্বুলে গমন করেন। ইস্তাম্বুলের ফাতিহ এলাকার যেই বাড়িতে নুরসী সেই সময়ে থাকতেন তার দরজায় তিনি একটি পোস্টার লাগিয়ে রেখেছিলেন। সেখানে লেখা ছিল ‘এখানে সব সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়, সব প্রশ্নের উত্তরও এখানেই মিলে যায়- যদিও এখানে কেউ কোনো প্রশ্ন করে না।’
ধীরে ধীরে ইস্তাম্বুলের আলেমদের সাথেও নুরসীর পরিচয় হয়। তারা নুরসীর কাছে নানা ধরনের জিজ্ঞাসা নিয়ে আসতেন, নুরসীও তার বেশ সুন্দর করে উত্তর দিয়ে দিতেন। তাই নুরসীর ব্যাপারে তারা সকলেই সন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে চারিদিকে নুরসীর বেশ সুনামও ছড়িয়ে পড়ে। আসলে নুরসী তার ঘরের দরজায় সেই পোস্টারটি লাগিয়েছিলেন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য আর তার সেই কৌশল বেশ কাজেও দিয়েছিল। কিন্তু যেই সরকারি মহলের সহযোগিতা পাওয়ার আশায় তিনি ইস্তাম্বুলে এসেছিলেন, তা তিনি পাননি, ফলে তার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নও তখন পূরণ হয়নি। ইস্তাম্বুলের ক্ষমতাসীন খেলাফত সেই সময়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট এবং বিংশ শতকের শুরুতে হুট করে সৃষ্ট হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলাতেই ব্যস্ত ছিলেন। তাই নুরসীর ডাকে তারা সাড়া দিতে পারেননি। আর এর পরপরই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং তারও পরে তুরস্কে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে পরিস্থিতি পুরোই পাল্টে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে নুরসীকে তার বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটি স্থগিত করতে হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই নুরসী তার ঐতিহাসিক গ্রন্থ রিসালায়ে নুর লেখার কাজে হাত দেন। এই বইটিতে ইসলামের বৈজ্ঞানিক চেতনাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সকল প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন। ফলে যেই উদ্দেশ্যে তিনি ‘মেদরেসেত-উজ-জেহরা’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন তার অনেকটাই এই রিসালায়ে নুরের মাধ্যমেই পূরণ হয়ে যায়।
ইস্তাম্বুলে নুরসী আরো বেশ কিছুটা সময় অতিবাহিত করেন। সেই সময়গুলোতে তিনি আসলে রাজনৈতিক ময়দানে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করার মধ্য দিয়ে ইসলামের খেদমত করতে চেয়েছিলেন। ইস্তাম্বুল থেকে আবার ভ্যানে ফিরে আসার পর তিনি স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে ইসলাম সম্বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে চেষ্টা করেন। তিনি গ্রামবাসীকে সেই সময়ে যেই বিষয়গুলো সম্বন্ধে শিক্ষা দিতেন সেগুলোকে পরবর্তীতে এক জায়গায় করে তিনি ‘আল মুনাজারাত’ নামক একটি বইও রচনা করেন। এরপর নুরসী চলে যান দামেস্কে। সেখানে তিনি উমাইয়াদ মসজিদে বেশ কিছু খুতবা প্রদান করেন। সেই খুতবাগুলো পরবর্তীতে ‘দ্য দামেস্কাস সারমন’ নামক একটি বইতে সন্নিবেশিত হয়েছে। নুরসী এরপর যোগ দেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। তিনি ছিলেন একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার। আর ব্যাটালিয়নের অধিকাংশ সদস্যই ছিল তার ছাত্র। তুরস্কের পূর্বাঞ্চলকে রাশিয়ান দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত রাখার জন্য তিনি সেই যুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের দিনগুলোতে যখন চারিদিকে গোলাগুলির বিকট শব্দ তখনও ট্রেঞ্চে বসে তিনি শ্রুতিলিখন এবং অনুলিখনের মাধ্যমে ‘সাইনস অব মিরাকুলাস ইনিমিটেবিলিটি’ বা ‘ইশারাত আল ইজাজ’ নামক একটি বই রচনা করেন যা পবিত্র কুরআনের পর্যালোচনা ও ভাষ্য হিসেবে আজও সবর্জন স্বীকৃত হয়ে আছে।
রাশিয়ার সেনারা যখন বিটলিস অঞ্চলটি দখল করে নেয়, তখন তারা নুরসীকে আহত অবস্থায় আটক করে এবং তারা তাকে সাইবেরিয়াতে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে একটি কারাগারে নুরসী আড়াই বছর বন্দী ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়টাতে তিনি কাজ করার মত বা কিছু লেখার মত অবস্থায় ছিলেন না, পরিবেশও ছিলো না তেমন। কিন্তু সেই প্রতিকূলতার মধ্যেও নুরসী তার সহযাত্রী অন্যান্য বন্দীদের মাঝে নিয়মিতভাবে ধর্মীয় আলোচনা করতেন।
একদিন রুশ জেনারেল নিকোলাস বন্দিশিবির পরিদর্শনে এলে সকল বন্দী দাঁড়িয়ে নিকোলাসকে সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু বদিউজ্জামান নুরসী না দাঁড়িয়ে বসে থাকলেন। রুশ জেনারেল তাকে জিজ্ঞেস করলেন- বোধ হয় তুমি আমাকে চিনতে ভুল করেছো? নুরসী বসেই উত্তর দিলেন- তোমাকে চিনবো না কেন! তুমি নিকোলাস। রুশ জেনারেল ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললো- যদি তুমি জেনে-বুঝে আমাকে সম্মান প্রদর্শন না করে থাকো, তাহলে তুমি রাশিয়ার ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করেছো। এই কথা শুনার পর ইসলামী আন্দোলনের বিপ্লবী নায়ক বদিউজ্জামান নুরসী নির্ভীক কণ্ঠের এমন সাহসী উচ্চারণের কথা শুনে বন্দিশিবিরে বন্দীরা পুরোপুরি স্তম্ভিত হয়ে গেল। রাগে-ক্ষোভে অপমানে রুশ জেনারেল নিকোলাসের চেহারা লাল বর্ণ হয়ে উঠলো। প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো নিকোলাসের চোখে। এই পরিস্থিতিতে বন্দী শিবিরের অন্যান্য বন্দীরা ভাবলো এখনই বোধ হয় নুরসীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করার জন্য নেয়া হবে। কিন্তু উস্তাদ নুরসীর চোখে মুখে ছিল না কোন ভীতির চিহ্ন। তিনি চিন্তাহীন চিত্তে দুনিয়া ও আরশের মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ধ্যানে মগ্ন হয়ে গেলেন। রুশ জেনারেল নিকোলাস রাগান্বিত হয়ে নুরসীকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দিয়ে প্রস্থান করলেন।
মৃত্যুদন্ডের আদেশেও নুরসীর মুখের স্নিগ্ধ হাসির সামান্যতম কমতি ছিল না। তিনি দৃপ্ত পায়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার বেদির দিকে এগিয়ে চললেন। রুশ জেনারেল আশ্চর্য হয়ে অপলক দৃষ্টিতে সৌম্য-শান্ত সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটু পরে তাকে হত্যা করে হবে- এটা জানার পরও নুরসীর মুখে ফুটে ছিল স্বর্গীয় হাসি। তারপর উস্তাদ নুরসী মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চাইলেন। অন্যদিনের চেয়ে তিনি তুলনামূলক দ্রুততার সাথে নামাজ আদায় করলেন। রুশ জেনারেল অবাক হয়ে নামাজের ভেতরে উস্তাদ নুরসীর একাগ্রতা লক্ষ করছিলেন। নামাজ আদায়ের এই দৃশ্য রুশ জেনারেল নিকোলাসের মনে ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে। অবশেষে নিকোলাস সাইয়্যেদ নুরসীর মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে দিলেন। আর সাইয়্যেদ বদিউজ্জামান নুরসীকে বললেন যে ইসলাম তোমাকে এতটা নির্ভীক ও আত্মমর্যাদাশীল করেছে, আমি সেই ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
শেষ দিকে অবশ্য নুরসী কারাগার থেকে মুক্ত হন এবং সেইন্ট পিটার্সবার্গ, ওয়ারশ এবং ভিয়েনাকে পাড়ি দিয়ে তিনি ১৯১৮ সালের ২৫ জুন আবারও ইস্তাম্বুলে এসে পৌঁছান। এর পরপরই সেখানকার প্রশাসন তাকে দারুল হিকমাতে ইসলামিয়া নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোম্যান সা¤্রাজ্য পরাজিত হয়। এর পরপরই সা¤্রাজ্যের বিশাল একটি এলাকা ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান এবং গ্রিকদের হাতে চলে যায়। ফলশ্রুতিতে দখলদারদের হাত থেকে তুরস্ককে মুক্ত করার অভিপ্রায়ে দেশজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। সেই যুদ্ধে নুরসী ‘কুভা-ই-মিল্লিয়ে’ বা ন্যাশনাল ফোর্সকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন, উৎসাহ প্রদান করেন। আংকারায় থাকা সরকারও নুরসীর এইসব কাজে খুশি হয়ে তাকে আংকারাতে আমন্ত্রণ জানায়। আমন্ত্রণ পেয়ে নুরসী আংকারায় গেলে সেখানে তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তবে নিজে ভালো সংবর্ধনা পেলেও আংকারার প্রশাসনিক ব্যক্তিদেরকে দেখে নুরসী মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি লক্ষ্য করেন যে, পার্লামেন্টে যেসব ডেপুটি কাজ করছেন তাদের অধিকাংশই ধর্ম সম্বন্ধে খুবই অসচেতন এবং ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে তাদের তেমন একটা আগ্রহও নেই। এমনকি তাদের অধিকাংশই নিয়মিত নামাজও আদায় করে না।
এই পরিস্থিতি দেখে নুরসী তাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য দেন যাতে তিনি নামাজের গুরুত্ব ও ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এর পর দেখা যায় যে, পার্লামেন্টের অনেক ডেপুটি নামাজ পড়তে শুরু করেছেন। কিন্তু নুরসীর এই কার্যক্রম এবং পার্লামেন্ট ডেপুটিদের ওপর তার এই প্রভাব সেক্যুলার নেতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে অসšুÍষ্ট করে তোলে। নুরসীকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে আতাতুর্ক তাকে প্রথমে পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার এবং গোটা পূর্ব তুরস্কের ধর্মীয় প্রকল্পগুলোর প্রধান হওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু নুরসী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরই তিনি আধ্যাত্মিক চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯২৪ সালে যখন অটোম্যান খেলাফতের পতন হয় তখন কুর্দিস্তান থেকে শায়খ সাইয়্যেদেও বিদ্রোহ নামক একটি বিদ্রোহের উত্থান হয়। যদিও এই বিদ্রোহে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না তথাপি এই বিদ্রোহে মদদ দেয়ার অভিযোগেই নুরসীকে ১৯২৫ সালে ইস্তাম্বুলে নির্বাসনে পাঠানো হয়। ইস্তাম্বুল থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বুরদুর নামক একটি এলাকায়। এর পর তাকে নেয়া হয় ইসপার্তায়। একটা পর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক ইসপার্তার বারলা নামক একটি গ্রামে গৃহ অন্তরীণ করে রাখা হয়। গৃহবন্দী রাখার কারণে প্রশাসন যেমন তার ওপর নজরদারি করতে সক্ষম হয় এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষগুলোর সাথেও তার মেলামেশাটি নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়।
১৯২১ সালের আগ পর্যন্ত নুরসীর যেই জীবন, তখন তিনি কিছুটা হলেও বিশ্বরাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বিশ্লেষকরা এই সময়টাকে ‘সাইয়্যেদের প্রথম অধ্যায়’ নামে অভিহিত করেছেন। আর ১৯২১ সালের পরের থেকে জীবনের বাকি অংশটিকে তারা ‘সাইয়্যেদের দ্বিতীয় অধ্যায়’ নামে সংজ্ঞায়িত করেছেন। জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়টিতেই বদিউজ্জামান নুরসী অন্যসব বৈষয়িক বিষয়াদি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে কুরআনের সাধনায় ব্যস্ত করতে শুরু করেন। এই সময়েই তার অনবদ্য সৃষ্টি রিসালায়ে নুর গ্রন্থটিও তিনি রচনা করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নুরসী আসলে মুসলমানদের ঈমান সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বিশেষ করে নাস্তিকতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাবে মুসলমানদের ঈমান যেভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে পড়ছিল তাকে প্রতিরোধ করে ঈমানের দৃঢ়তা বৃদ্ধি করার জন্য তিনি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তার এই ধরনের কার্যক্রমের জন্য তিনি বার বার কারাবন্দী হয়েছেন, নির্বাসনে গিয়েছেন। তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে কয়েকবার। আর সবশেষে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা চালানোর মিথ্যা অভিযোগে তার বইগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে প্রশাসন।
বারলাতে সাইয়্যেদ নুরসী দীর্ঘ ৮টি বছর নির্বাসনে ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি রিসালায়ে নুরের তিন-চতুর্থাংশ রচনা করতে সক্ষম হন। তার এই বইটিতে গোটা তুরস্কে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তিনি একটি নতুন ধরনের কৌশল আবিষ্কার করেন। আজ অবধি এই ধরনের কৌশল দ্বিতীয়টি আর কোথাও দেখা যায়নি। তিনি শর্ত আরোপ করেন যে, যারাই তার ছাত্র হতে চাইবে তাদেরকে তার লেখা এই রিসালায়ে নুরের একটি কপি আরবি অক্ষরে লিখে দিতে হবে। সেই সাথে নতুন আরেকজন লোককেও খুঁজে নিয়ে আসতে হবে যেও কিনা একটি কপি লিখবে। অর্থাৎ একজন ছাত্রকে দিয়ে তিনি দু’টি কপি লিখিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ইসপার্তা এবং বারলাতে তার যত ছাত্র ছিল, তারা সবাই তার ডাকে সাড়া দিয়ে রিসালায়ে নুরের একটি অনুলিপি লিখে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রিসালায়ে নুরকে তারা গোপনে বিতরণ করতেও শুরু করেন। এভাবে শুধু বারলা বা ইসপার্তা নয়, একটা সময়ে গোটা তুরস্কেই রিসালায়ে নুর ছড়িয়ে পড়ে।
রিসালায়ে নুরের এই জনপ্রিয়তায় ক্রুদ্ধ হয়ে প্রশাসন সাইয়্যেদ নুরসীকে বারলা থেকে ইসপার্তায় স্থানান্তর করে। এরপরও তারা ক্ষান্ত হয়নি। বরং তাকে আরো ১২০ জন ছাত্রসহ ‘এসকিসেহির’ নামক একটি কারাগারে প্রেরণ করে। তাদের বিরুদ্ধে সরকারের পতন ঘটাতে নতুন সংগঠন তৈরি করার অভিযোগ আনা হয়। লম্বা একটি সময় পর ‘এসকিসেহির’ কারাগার থেকে নুরসী মুক্তি পান। এরপর তাকে আবারও কাস্তামনু প্রদেশে নির্বাসনে পাঠানো হয়। সেখানেও তিনি ৮টি বছর নির্বাসনে পার করেন। নুরসীকে থামানোর এত চেষ্টার পরও তার রিসালায়ে নুরের লেখা এবং বিতরণকে বন্ধ করা যায়নি। প্রতিটি ছাত্র নতুন নতুন ছাত্রকে দিয়ে একটার পর একটা অনুলিপি সৃষ্টি করতে থাকে। ফলে একদিকে যেমন নুরসীর শিষ্য সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে ঠিক তেমনিভাবে গোটা আনাতোলিয়ার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে নুরসীর রিসালায়ে নুরও পৌঁছে যায়।
১৯৪৩ সালে সাইয়্যেদ নুরসী এবং তার ১২৬ জন ছাত্রকে ডেনিজলির হাইকোর্টে পাঠানো হয়। আংকারার দক্ষ একদল শিক্ষাবিদ এবং বিচারপতিদেরকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করে দেয়া হয় যারা রিসালায়ে নুরের প্রতিটি তথ্য পর্যালোচনা করেন। তাদের পর্যবেক্ষণে তারা বইটিতে কোনো ক্ষতিকর কিছু পাননি বলে জানান। এর পরই ১৯৪৪ সালে নুরসীকে সকল অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়। বিচার চলাকালীন সময়ে নুরসী ৯টা মাস জেলে ছিলেন। এই সময় তাকে তার কোন ছাত্রের সাথে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি। এবারও বেশ কয়েক দফা তার ওপর বিষ প্রয়োগ করা হয়। নুরসীকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় এমিরদাগে, সেখান থেকে আফইয়োনে। তবে যতই নির্বাসনে বা কারাবরণে নেয়া হোক, নুরসী এক মুহূর্তের জন্যও তার কাজ বন্ধ করেননি।
পরবর্তী সময়ে অবশ্য প্রশাসন তার বইগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ১৯৫০ সালে তুরস্কে বহুদলীয় প্রথা চালু হওয়ার পর প্রথম নির্বাচনেই ডেমোক্রেটিক পার্টি বিজয় লাভ করে। এর পরই আসলে নুরসী এবং তার শিষ্যরা কিছুটা হলেও স্বাধীনতা ভোগ করতে শুরু করেন। সারাটি জীবন কুরআনের চর্চায় লিপ্ত থাকার পর ১৯৬০ সালের ২৩ মার্চ ২৫ রমজান উস্তাদ বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসী ইন্তেকাল করেন। পরের দিন উলু মসজিদে লক্ষ লক্ষ মানুষ তার জানাজায় অংশ নেয়। তারপর তাকে হালিলুর রহমান নামক মসজিদ সংলগ্ন গোরস্থানে দাফন করা হয়। এর ঠিক দুই মাস পর তুরস্কে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় যার পরপরই তুরস্কে নতুন করে এক অন্ধকার অধ্যায়ের সূচনা হয়। একদল পথভ্রষ্ট সেনাকর্মকর্তা ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই আবারও উস্তাদ নুরসীর কবরকে আক্রমণ করে। তারা এই মহান কুরআন সাধকের মৃতদেহ সেই গোরস্থান থেকে উঠিয়ে নেয় এবং অজানা একটি জায়গায় নিয়ে যায়- যার পরবর্তী গন্তব্য সম্বন্ধে নিশ্চিতভাবে কিছু আর জানা যায়নি।
মৃত্যুর আগ দিয়ে বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসী তার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছাত্র এবং রিসালায়ে নুর রচনার নেপথ্যের অন্যতম সহযোগী সাইয়্যেদ আহমেদ হুসরেভ এফেন্দিকে তার পরবর্তী দায়িত্বশীল হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যান- যার একমাত্র দায়িত্ব হবে নুরসীর মৃত্যুর পর রিসালায়ে নুরের এই প্রকল্পটিকে পূর্বের গতিতেই অব্যাহত রাখা।
নুরসী যতদিন জীবিত ছিলেন, তখনই হুসরেভ এফেন্দি তার ঘনিষ্ঠ মহলে ‘উস্তাদ আল থানি’ বা দ্বিতীয় গুরু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হুসরেভ এফেন্দি ছিলেন খুবই দক্ষ একজন ক্যালিওগ্রাফি শিল্পী। নুরসী জীবিত থাকা অবস্থায় হুসরেভ এফেন্দি ততদিন রিসালায়ে নুর অনুলিপিকরণ এবং বিতরণের মূল দায়িত্বে ছিলেন। সকল ছাত্রের মধ্যে নুরসী একমাত্র তাকেই রিসালায়ে নুরে কোন ধরনের সংযোজন, সংশোধন বা বিয়োজনের অধিকার দিয়েছিলেন। আর তিনি সেই দায়িত্ব অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছিলেন। বিশেষ করে নুরসী যতদিন জেলে ছিলেন, তিনি তখন রিসালায়ে নুর নামক প্রকল্পটি যোগ্যতার সাথেই অব্যাহত রাখতে পেরেছিলেন।
উস্তাদ নুরসীর ইন্তেকালের পর হুসরেভ এফেন্দি আগের মতই তার কাজ অব্যাহত রাখেন। তিনি রিসালায়ে নুরের মূল চেতনা রক্ষার ব্যাপারে একটুও আপস করেননি। বরং রিসালায়ে নুরকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারে এবং গোটা তুরস্কের মানুষের ঈমান ও আমলকে সুরক্ষা এবং তা আরো মজবুত করার ব্যাপারে তিনি কার্যকর উদ্যেগ গ্রহণ করেন। এ ছাড়াও উস্তাদ নুরসীর দিকনির্দেশনা মুতাবিক তিনি কুরআনের একটি তাফসির কপিও প্রস্তুত করেন। কুরআনের এই নতুন ধারার তাফসিরের নাম দেয়া হয় ‘তেভাফুকলু কুরআনে কারীম বা দ্য কুরআন ইন কনগ্রুয়াস অ্যালাইনমেন্ট’। উল্লেখ্য, কুরআন পড়তে পড়তেই উস্তাদ নুরসী একটা সময় আবিষ্কার করেন যে দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর সকল নাম, সিফাতি নামগুলো যেমন আল্লাহ, রব এবং কুরআন এবং কুরআনের অন্য সব শব্দ, একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত। হয় একই পৃষ্ঠায় একটি শব্দের সাথে সম্পর্কিত শব্দগুলোকে পাওয়া যায় বা অন্য কোনো পৃষ্ঠায়। কুরআনের শব্দগুলোর এহেন মিল ও সাদৃশ্যকে উস্তাদ নুরসী কুরআনের আরেকটি মোজেজা হিসেবে সনাক্ত করেন।
যাহোক, উস্তাদ বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসীর ইন্তেকালের পর হুসরেভ এফেন্দির হাত ধরেই পরবর্তীতে তুরস্কে হায়রাত ফাউন্ডেশনের জন্ম হয় যারা আজ অবধি উস্তাদ বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসীর কার্যক্রম ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করছে এবং বিশ্বজুড়ে নুরসীর আবিষ্কার ও চেতনাকে বিশেষ করে রিসালায়ে নুরকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি করে যাচ্ছে।
এবার আসা যাক, রিসালায়ে নুর প্রসঙ্গে। রিসালায়ে নুর মহাগ্রন্থ আল কুরআনের উপর অনন্যসাধারণ একটি গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হয়ে আছে। ইসলামিক ধর্মতত্ত্বের ওপর বিগত ২০০ বছরে যতগুলো পুস্তক রচিত হয়েছে রিসালায়ে নুর তার মধ্যে অন্যতম। এতদিন পশ্চিমের অনেক জায়গাতেই অবশ্য রিসালায়ে নুর তেমন একটা পরিচিত ছিল না। এমনকি অনেক মুসলমানও এই বিষয়ে ততটা অবগত ছিলেন না, তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে এখন পাল্টাচ্ছে। মোট ১৩০টি অধ্যায়ে এই বইটি বিভক্ত এবং মোট পাতার সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। ধর্মতত্ত্ব, ধর্মদর্শন এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের ব্যাপারে যেসব প্রশ্ন তোলা হয় তার অনেকগুলোই পাওয়া যাবে এই বইটিতে। রিসালায়ে নুরটি রচনা করা হয় ১৯২৬ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে। রিসালায়ে নুর নিয়মিত অধ্যয়ন করেন এমন পাঠকেরা দাবি করেন যে, রিসালায়ে নুরের অধ্যয়ন তাদের মধ্যকার ঈমানের দৃঢ়তাকে মজবুত করেছে, আধ্যাত্মিক শক্তিকে বলিষ্ঠ করেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাকেও শানিত করেছে। রিসালায়ে নুর অধ্যয়নে বিবেকের কাছে তারা আরো পরিষ্কার হয়েছেন, আল্লাহ তায়ালার প্রতি আত্মসমর্পণের মাত্রাও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইসলামকে আরো গভীরভাবে জানার আকাক্সক্ষাও তৈরি হয়েছে বলে এই পাঠকেরা জানান।
পাঠকদের মতে রিসালায়ে নুর কোন সাধারণ গ্রন্থ নয় বরং এটি ইসলামের শরিয়তের নির্দেশিত ইবাদতের একটি পদ্ধতি বা মেথোডোলোজি নিরূপণ করেছে। আর রিসালায়ে নুরের বিষয়বস্তু কোনদিনই সেকেলে হবে না, এটা এতটাই প্রাসঙ্গিক যে বর্তমান সামাজিক ও বৈশ্বিক কাঠামোতেও বইটা একই রকম জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে। রিসালায়ে নুরকে আবার গতানুগতিক তাত্ত্বিক কোনো বই হিসেবেও বিবেচনা করা যাবে না বরং এটা ভীষণ রকমের ব্যবহারিক একটি বই। রিসালায়ে নুর গ্রন্থটিতে অনেকগুলো ‘কেন’ এবং ‘কিভাবে’ প্রশ্নের উত্তরও মিলবে। বইটিতে মহাবিশ্বের গঠন ও পরিচালনা নিয়েও ইসলামের ব্যাখ্যাগুলোকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষ করে অসীমতা বা ইনফিনিটি বা কন্টিজেন্সি বিষয়ে বিজ্ঞান যেসব বিতর্ক উত্থাপন করেছে তারও উত্তর এই বইটিতে পাওয়া যাবে।
কুরআনের বিভিন্ন কালামকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে রিসালায়ে নুর আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একক নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতাকে প্রমাণ করেছে। শেষ বিচারের দিন এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থান নিয়ে যারা সন্দেহ পোষণ করেন তারাও তাদের কৌতূহল মিটাতে পারবেন এই বইটি থেকে। যারা নবী মোহাম্মাদ (সা.) সত্যিকারভাবেই আল্লাহর রাসূল কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখান তারাও খুব স্পষ্ট উত্তর এই বইটি থেকে পেয়ে যাবেন। একইসঙ্গে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, পৃথিবীর সৃষ্টি, বিবর্তনবাদ প্রভৃতি বিষয়ে ইসলামের অবস্থান ও মূল্যায়নও বইটিতে পাওয়া যাবে।
একই সঙ্গে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তরও মিলবে রিসালায়ে নুরে। বিশেষত সাধারণ প্রচলিত জ্ঞানের বাইরে ঐশ্বরিক জ্ঞান কিভাবে একজন মানুষকে পরিণত করে কিংবা বৈষয়িক জীবন দর্শন কিংবা অল্পে তুষ্ট হয়ে জীবন ধারণ করার ব্যাপারে অথবা আল্লাহর নেয়ামতকে ব্যবহার করার মাধ্যমে কিভাবে আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা যায় তার কিছু উপায় এই বইটিতে পাওয়া যাবে। বয়স হয়ে গেলে অনেকেই হীনমন্যতায় ভুগেন, হতাশ হয়ে পড়েন কিন্তু এই বইটিতে প্রবীণদের নিয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে যে, বয়স্ক হওয়াও আল্লাহ তায়ালার একটি নেয়ামত এবং তাই সেই বয়সে পৌঁছে হতাশা নয় বরং তৃপ্তি নিয়ে বেঁচে থাকা দরকার।
পাশাপাশি, মুসলমানরা কেন সভ্যতার বিনির্মাণে এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লো, ইসলামে নারীদের কি অবস্থান বা সম্মান নির্ধারণ করা হয়েছে, কিংবা হুদুদের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কি, দাস প্রথা নিয়ে ইসলামের বক্তব্য কি- সেগুলোও জানা যাবে এই রিসালায়ে নুর থেকে। আমরা কিভাবে অন্য ধর্মের মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করবো কিংবা কিভাবে তাদের সাথে সহাবস্থান করবো সেই প্রক্রিয়া সম্বন্ধেও এই বইটি থেকে আমরা ধারণা পাবো। এক কথায় বলতে গেলে উস্তাদ বদিউজ্জামান সাইয়্যেদ নুরসী রচিত এই রিসালায়ে নুর বা বুক অব লাইটটি প্রকৃতার্থেই আলোকময় একটি বই, যা আলোর দিশারি হয়ে মুসলমানদেরকে আলোর পথে নির্দেশনা দেবে বহুযুগ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা, যিনি এই বইটি লিখেছেন, যারা এর অনুলিপি রচনা করেছেন কিংবা যারা প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তিগতভাবে বইটিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি যেন তাদের সবাইকে তাদের পরিশ্রমের এবং আত্মত্যাগের উত্তম জাজা দান করেন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply