বাংলাদেশের টিকে থাকার লড়াইয়ে ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের ভূমিকা -সরদার আবদুর রহমান

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে প্রতিবেশী সা¤্রাজ্যবাদী শক্তি ছিনতাই করে তার কৃতিত্বকে একান্ত তার নিজের বলে চালাতে বরাবর অপচেষ্টা করে এসেছে। তাদের এই দাবিকে এদেশীয় রাজনীতিক-বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ সমর্থনও জুগিয়েছে নানা আকারে-প্রকারে। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই মানসিকতার প্রবল বিরোধী ছিল। ঐতিহাসিক ৭ই নভেম্বর সেই বিরোধিতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একেকটি তারিখ সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ঘটনাবলির বৈশিষ্ট্য ও তাৎপর্যের কারণে। ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা ২৬ মার্চ কিংবা ১৬ ডিসেম্বর অথবা ১৫ আগস্ট- এসব তারিখের অন্তর্ভুক্ত। তেমনি ৭ নভেম্বরও ইতিহাসের অমর স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। একাধারে বহু সংখ্যক প্রেক্ষিত-প্রেক্ষাপটের সমাহার এবং সে সবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সামষ্টিক বিস্ফোরণ ঘটে সেই দিন। সংক্ষেপ করতে গেলে তা দাঁড়ায় যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে একটি করদরাজ্যে পরিণত করার অবিরাম ষড়যন্ত্রের চাল চালা হচ্ছিল। দেশে একটি গণতন্ত্রহীন পরিবেশ তৈরি করতে একদলীয় শাসনের জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল জাতির ওপর। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। অর্থনীতি হয়েছিল সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ হতো রাজনৈতিক অসাধু চক্রের কলকাঠিতে। বাক, চিন্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিলুপ্ত হয়। আইনের শাসন ছিল নির্বাসিত। বন্দুকের নলই হয়ে উঠে ক্ষমতা ও আধিপত্যের চাবিকাঠি। শিষ্টের দমন ও অশিষ্টের প্রতিপালন হয়ে উঠে রাজনীতি ও সমাজের ক্ষমতাবানদের নীতির অংশ। দুর্নীতি, আত্মসাৎ, লুটপাট, দখল, অপরহণ, গুম, ছিনতাই প্রভৃতি কর্মকাণ্ডের মহোৎসবের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় দেশ। একজন নেতা এবং একটি দল ছাড়া অন্যকোনো রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব ছিল অসহ্য। এই সার্বিক ও সর্বগ্রাসী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ যেন রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সময়ই যেন সমাধানের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে- হয়েছেও তাই।

১৯৭৫ সালের ঘটনাবলিকে যে যার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করবে- এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ৭ নভেম্বরের বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রাখার কিংবা মূক হয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। সেদিন রাজধানীর রাজপথে সর্বস্তরের জনতার স্বতঃস্ফূর্ত স্রােতের উচ্চারিত শ্লোগানকে অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। দেশকে গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ ঘটানোই শুধু নয়, শুধু একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে জনগণের ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারই নয়, আরো আরো অনেক বড় বিষয় সেদিনের প্রেক্ষিতকে যৌক্তিক করে তোলে। এ কথা পুরনো ও মধ্য প্রজন্মের জানা বিষয় যে, ’৭৫-এর ৭ নভেম্বর ঘটেছিল সিপাহি জনতার অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থান। যা ছিল জাতীয় সংহতির বিমূর্ত ও অম্লান রূপের প্রকাশ। এর সঙ্গে আরো যুক্ত ছিল, বাংলাদেশী চেতনা, সংস্কৃতি ও আদর্শকে এ দেশের আপমর জনসাধারণ আজীবন লালন করে এসেছে নিজেদের মধ্যে। তাকে তারা কিভাবে নষ্ট হতে দিতে পারে? তাই সেদিনের সেই ঐতিহাসিক পটভূমিতে সিপাহি-জনতাকে দেখা গিয়েছিল একাকার হতে- আপন সত্তাকে অটুট রাখবে বলে। ’৭৫-এর ঐদিন কি ঘটেছিল কেন ঘটেছিল- এ প্রশ্নের জবাব অনেকের জানা থাকতে পারে। তবে কী ঘটেছিল এ প্রশ্ন এখানে গৌণ। কিন্তু কেন ঘটেছিল এর জবাব দিতে গেলে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের বিষয়টি অবশ্যই এসে যায়। ঘটনা পরম্পরার ব্যাখ্যায় অমিল থাকাও স্বাভাবিক। কিন্তু একটি সর্বসম্মত ও স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তনের গতিধারাকে কখনোই অস্বীকার করা যায় না। এর সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাখ্যা দেয়া এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার। বস্তুত একটা সুবশিাল পটভূমি রচিত হয়েছিল বলেই এই পরিবর্তনের সূচনা হয়। কেননা মাত্র সাড়ে তিন বছর আগেই গোটা জাতি সর্বস্ব বাজি রেখে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছিল।

১৯৭২ সালের ১৩ মার্চ রচিত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। ৪ নভেম্বর তা চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত এবং ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু পরবর্তী বছরেই জনগণের বিবেকের প্রতিনিধি এই সংবিধানের ওপর দিয়ে পরিবর্তনের ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। এক বছরেই দু’টি এবং পরবর্তী বছরে আরেকটি সংশোধনী আনা হয় এতে। একটি বৃহৎ সংশোধনী আনা হয়- যা ‘চতুর্থ সংশোধনী’ নামে কুখ্যাত। এতে প্রথমত, দায়িত্বশীল সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার প্রবর্তন করা হয়। দ্বিতীয়ত, সকল রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করে একদলীয় রাজনীতি-ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি থেকে প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়টুকু উড়িয়ে দিয়ে জনগণের সার্বিক মৌলিক অধিকারের ভিত্তিমূল ধ্বংস করে দেয়া হয়। সংক্ষেপে, একটি ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য তথাকথিত এই চতুর্থ সংশোধনী ছিল মূলত সার্বিকভাবে দায়ী। মূলত জাতির ওপর সেই সংশোধনী চাপিয়ে দেয়া ছিল একটা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, ’৭৫-এর পটভূমিতে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত তা ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। এই চক্রান্তের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে মনে করেই জাতি সেদিন উল্লাসের সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়েছিল নিঃসঙ্কোচে। এর পরের ঘটনা অত্যন্ত স্পষ্ট। জাতি বহুকাক্সিক্ষত একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বহু ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যেও দেখা যায় আশার আলো। কিন্তু ঘরে বাইরে সক্রিয় ষড়যন্ত্রীরা জনসাধারণকে শান্তিতে থাকতে দিতে রাজি নয়। তাই যাকে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যমণি হিসেবে মেনে নিয়ে গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো সেই নেতৃত্ব প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে পৃথিবীর বুক থেকে সরিয়ে দেয়া হলো।

কী ছিলো পটভূমিতে?
দেশ স্বাধীন হওয়ার পরের সময়ের সাড়ে তিন বছরের শাসনকালের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এর প্রায় পুরোটাই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে ভরপুর। এগুলো তালিকাভুক্ত করলে নিম্নরূপ দাঁড়াবে :
১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করে ক্ষমতাসীনরা প্রথমেই ভারতের সঙ্গে একটি ‘দাসখতমূলক’ তথাকথিত মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ি ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। ভারতের অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশ অন্য কোন দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক চুক্তি করতে পারবে না বলে এতে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশকে কার্যত ভারতের করদরাজ্যে পরিণত করা হয়।
ভারতের আগ্রাসী তৎপরতা ও বাংলাদেশে লুটপাট চালানোর প্রতিবাদ করায় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অনেককেই কারাগারে প্রেরণ করে ভারতের সেবাদাসের পরিচয়ের স্বাক্ষর রাখে তারা।
দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বাকশাল’ নামক একমাত্র দল রেখে গণতন্ত্র হত্যার সাংবিধানিক ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে। একদলীয় শাসনের প্রবর্তন ও একটি স্বৈরশাসনের সূচনা করা হয়। দেশের বিচারব্যবস্থার স্বাধীন অস্তিত্বও ধ্বংস করা হয়।

সরকারের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৪টি দৈনিক রেখে আর সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা হয়। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ ও বাকস্বাধীনতা হরণের প্রথম নির্মম দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। শত শত সাংবাদিক ও কর্মী বেকার হয়ে যায়। কোন কোন সাংবাদিককে পেটের দায়ে রাস্তার পাশে ফল বিক্রেতার পেশা নিতে হয়।
দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেয়া হয়। ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষ ও কুকুরের মধ্যে টানাটানি করতে দেখা যায়। বস্ত্রের অভাবে মহিলাদেরকে মাছ ধরার ছেঁড়া জাল পরে লজ্জা নিবারণ করার ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হতে দেখা যায়। বিদেশীরা বাংলাদেশকে একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে পুরো দেশকেই লজ্জায় ফেলে দেয়। দ্রব্যমূল্য ছিল মধ্য ও নিম্নবিত্তের নাগালের বাইরে। লবণ ৬০ টাকা সের দরেও বিক্রি হতে দেখা যায়।
দেশ দুর্নীতির অতলে তলিয়ে যায়। ‘দুর্নীতি’ দলের নেতাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ‘কম্বল চোর’ পরিচয় তাদেরকে দীর্ঘদিন বহন করতে হয়। কম্বল চুরি এতোটাই কেলেঙ্কারির কারণ হয়ে দাঁড়ায় যে, তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান চিৎকার দিয়ে বলে উঠেন, ‘দেশে সাড়ে সাত কোটি কম্বল এলো- কিন্তু আমারটা গেল কই।’ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও আক্ষেপ করে বলতে হয়েছে, ‘অন্য দেশ পায় সোনার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি।’ আরো বলতে হয়, ‘বিদেশ থেকে যা কিছু ভিক্ষা করে আনি চাটার দল সব চেটে পুটে খেয়ে ফেলে।’

ভারতকে একতরফাভাবে ফারাক্কা বাঁধ চালুর অনুমতি দেয়া হয়। যার অভিশাপে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা আজ এক চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের শিকার।
সরাসরি দলের নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বাহিনী এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণে আধা সামরিক রক্ষীবাহিনী গঠন করে বিরোধী সকল কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়। রক্ষীবাহিনীর প্রধানও করা হয় দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতাকে। এই দুই বাহিনী গোপনে ও প্রকাশ্যে বহু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে হত্যা করে।
দেশ থেকে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। তা সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ফলে দেশে ইসলামী রাজনৈতিক দলসমূহ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। ইসলামী প্রতিষ্ঠানসমূহ বিপন্ন হয়ে পড়ে।
আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার কবর রচনা করা হয়। হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, ব্যাংক ডাকাতি, লুটপাট, জবর দখল, ছিনতাই, পরীক্ষায় নকল, সাধারণ চুরি-ডাকাতি প্রভৃতিসহ ছোট বড় এমন কোন অপরাধ ছিল না যা সংঘটিত হতো না। এর সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দলীয় বাহিনীর লোকেরা জড়িত থাকতো।
উপরোক্ত তালিকার প্রতিটি বিষয় বিশ্লেষণ ও তথ্যের বিস্তার ঘটালে এক ভয়ানক চিত্র প্রকাশ পাবে। রক্ষীবাহিনী, লালবাহিনী, মুজিববাহিনী প্রভৃতি সে সময়ের সৃষ্টি এবং এসব বাহিনীর তাণ্ডব ছিল ‘বর্গী’ যুগের আধুনিক সংস্করণমাত্র। প্রতিপক্ষের প্রতি হুঙ্কার ছেড়ে বলা হতো, ‘লাল ঘোড়া দাবড়ায়া দিব।’

আজকের আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এককালের অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী ন্যাপ নেত্রী থাকাকালে শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৩-এর নির্বাচন উপলক্ষে মুজিব সরকারের মূল্যায়ন করে মতিয়া চৌধুরী ৩ মার্চ ঢাকার এক জনসভায় বলেন, ‘গত এক বছরে অবাধ লুটতরাজ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর রিলিফ চুরির বিশ্ব রেকর্ড ভঙ্গ করে আওয়ামী লীগ এবার ‘বঙ্গবন্ধুকে’ একমাত্র পুঁজি করে জনতার কাছে ভোট চাইতে এসেছে। একদিকে মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে আজো ‘সামনে আছে জোর লড়াই বঙ্গবন্ধু অস্ত্র চাই’ বলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চলেছে। এর নাম কি গণতন্ত্র?’ আজকের সিপিবির সাধারণ সম্পাদক তৎকালীন ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ১৯৭৩ সালের ৩ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে এক জনসভায় ডাকসুর আজীবন সদস্যপদ থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের বহিষ্কারের কথা ঘোষণা করেন এবং সদস্যপদ বই থেকে সংশ্লিষ্ট পাতাটি জনসভায় ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলেন। সেলিম ডাকসুর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রদত্ত ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রত্যাহার করে সাবধান করে দেন যে, ‘সংবাদপত্র, টিভি ও বেতারে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে আর ‘জাতির পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’ ব্যবহার করা চলবে না।’ তিনি বাড়িতে ও দোকানে টাঙানো শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি নামিয়ে ফেলার আহ্বান জানান। (কথামালার রাজনীতি : রেজোয়ান সিদ্দিকী)। বিপরীতে, ‘বঙ্গবন্ধুকে জাতির পিতা না বললে জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলা হবে’- এমন হুঙ্কার দেয়া হয়।

সে সময়ের শাসনকালের চিত্র জ্বলজ্বল করছে ইতিহাসের পাতায়। এ প্রসঙ্গে সাবেক আওয়ামী বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ভাষাসৈনিক ও বিশিষ্ট রাজনীতিক অলি আহাদ তাঁর ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ শীর্ষক গ্রন্থে বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তার কিছু অংশ উল্লেখ করা হলো :
“কলঙ্কময় অধ্যায় : ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠা : … পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে গণপরিষদ গঠন করা হয়েছিল। গণপরিষদে ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর গৃহীত সংবিধানটি সত্যায়ন করেন। গৃহীত এই সংবিধান মোতাবেক ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পরিতাপের বিষয় নির্বাচন অবাধও হয় নাই; সুষ্ঠুও হয় নাই। ১৯৭৩ সালের মার্চের এই সাধারণ নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্ষমতার মারাত্মক অপব্যবহার হয়, চরম দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ ও দলীয় বাহিনীর যথেচ্ছ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও ঢালাও হুমকির সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তিন শতটি আসনের মধ্যে দুই শত তিরানব্বইটি আসন দখল করেন। ইহা তাহার দ্বারা সাংবিধানিক গণতন্ত্র, নীতি ও আদর্শ তথা ঘোষিত রাষ্ট্রীয় আদর্শসমূহ লঙ্ঘনের জ্বলন্ত উদাহরণ। ইহার ফলে সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিক পথে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা সম্বন্ধে মারাত্মক সন্দেহের উদ্রেক হয়। বস্তুত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের সর্বগ্রাসী উৎকট ক্ষমতালোভ ও তজ্জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জঘন্য অপব্যবহারের মানসিকতা দেশ ও জাতিকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে নিক্ষেপ করে। এই সব পরিদৃষ্টে দেশী পত্রিকাগুলোতে তো বটেই ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধকালীন অবস্থায় যেসব বিদেশী পত্র-পত্রিকা বাংলাদেশের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল, তাহারাও মুজিব সরকারের নিন্দা ও সমালোচনামুখর তথ্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করিতে থাকে। এবং এই সব শাসকগোষ্ঠীর নাভিশ্বাসের কারণ হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কঠোর সমালোচনার পটভূমিকায় একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী বলে দেশে একদলীয় শাসন প্রবর্তন করেন এবং ২৫ জানুয়ারিতে নিজেই একনায়কসুলভ শাসনপদ্ধতির প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত হন। ইহার ফলাফল অবশ্যই শুভ হয়নি। এক সামরিক অভ্যুত্থানে ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে শেখ মুজিবুর রহমান স্বীয় বাসভবনে পরিবার পরিজনসহ নিহত হন।” (পৃ: ৫৪৭ ও ৫৪৮)।

“দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি : এদিকে জীবনযাত্রায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য মুজিব সরকারের ভ্রান্তনীতির দরুন সাধারণ ক্রেতার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। এক টাকার গামছার দাম হয় পঁয়ত্রিশ টাকা, তিন টাকার লুঙ্গি পনেরো টাকা বা কুড়ি টাকা, দশ আনা বা বারো আনা সেরের চাল হয় দশ টাকা, আট আনা সেরের আটা হয় ছয়/সাত টাকা, দুই আনা সেরের কাঁচা মরিচ হয় চল্লিশ/পঞ্চাশ টাকা, তিন/চার টাকা সেরের শুকনা মরিচ হয় আশি/নব্বই টাকা, আট আনা সেরের লবণ চল্লিশ/পঞ্চাশ টাকা, পাঁচ টাকা সেরের নারিকেল তৈল হয় চল্লিশ/পঞ্চাশ টাকা, এক টাকা সেরের মসুর ডাল হয় আট/নয় টাকা, সাত টাকার লাঙ্গল ত্রিশ/চল্লিশ টাকা, ছয় টাকার কোদাল ত্রিশ টাকা, এক শত সাত চল্লিশ বা দেড় শত টাকা ভরি সোনা এক হাজার টাকা, পনেরো টাকার কাফনের কাপড় আশি-নব্বই টাকা, দেড় টাকার কাঁচা সাবান আট/নয় টাকা। অর্থাৎ জীবন যাত্রার সার্বিক সঙ্কট মানুষকে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করে। মুদ্রাস্ফীতি ও কালো টাকা মুজিব সরকারের ব্যর্থতার কারণে ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছিল, আর উহাই হইয়া দাঁড়াইয়াছিল সর্বগ্রাসী দুর্নীতির মূল কারণ। দুর্নীতি দমন আইন ও বিধি ছিল বটে; কিন্তু তাহা যেন সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে। মুজিব সরকারের শাসন দৃষ্টে যে কাহারো মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, শাসক, শাসকের অনুগ্রহভাজন ও বিত্তবানদের জন্য এক প্রকার আইন এবং শাসিত জনতা ও বিত্তবানহীনদের জন্য অন্য আইন।” (পৃ: ৫৪৬ ও ৫৪৭)

অলি আহাদ আরো লেখেন, “ইহাদের এই ব্যক্তি পূজার মানসিকতায় উৎসাহী হইয়া শেখ মুজিব একদলীয় শাসন টেকসই করার নিমিত্তি যে কোন ধরনের সমালোচনা স্তব্ধ করিবার অসৎ প্রয়াসে ১৯৭৫ সালের ১৭ জুন সংবাদপত্র (ডিক্লারেশন বাতিল ) অর্ডিন্যান্স জারি করেন এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত চারটি দৈনিক পত্রিকা ব্যতীত সকল দৈনিক পত্রিকা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ২৩ জুন (১৯৭৫) সারাদেশকে একষট্টি জেলায় বিভক্ত করিয়া ১৬ জুলাই তারিখে একষট্টিজন গভর্নর নিয়োগ করেন। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের সর্বাত্মক অবাধ দুর্নীতি, রাহাজানি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুণ্ঠন, পাচার, গুম, খুন দেশবাসীকে অতিষ্ঠ করিয়া তোলে। সরকারের ব্যর্থ প্রশাসনিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক পলিসি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভারতীয় অর্থনীতির জোগানদার অর্থনীতিতে পরিণত করে, দেখা দেয় এক বিষময় ফল। পণ্যদ্রব্যের মূল্য ক্রেতা-সাধারণের আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া যায়। ক্ষেত-খামারে, কল-কারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হয়। ফলে কারখানার কাঁচাপাটের গুদামে শুরু হয় অগ্নিসংযোগ ও স্যাবোটেজ। সর্বত্র দেখা দেয় ভোগ্যপণ্যের তীব্র অভাব; ১৯৭৪ সালের শেষার্ধে দুর্ভিক্ষ, অনাহারে মৃত্যুবরণ করে অসংখ্য দেশবাসী। বিরোধী কণ্ঠকে বিনা বিচারে আটকের নিমিত্তে বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণয়ন ও ইহার যথেচ্ছ ব্যবহারেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হইয়া শেখ মুজিব দেশব্যাপী ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং তদানুসারে জরুরি আইন প্রণয়ন করা হয়। এভাবে নিজ বুদ্ধির দোষে, নিজ কর্মদোষে শেখ মুজিব ও তাহার আওয়ামী লীগ সমগ্র বাঙালি জনতার দুশমনে পরিণত হইতে থাকেন। যে মুজিব ১৯৬৯-৭০, ’৭১ ও ’৭২ সালে ছিলেন বাঙালির নয়নমণি, তিনিই ১৯৭৩-৭৪ সালে পরিণত হলেন বাঙালির চোখের বিষ। একদা যিনি ছিলেন জনতার কাতারে, তিনি ক্ষমতা কায়েম ও কায়েমি স্বার্থ বজায় রাখার অদম্য স্পৃহায় ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী সংযোজন দ্বারা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়া এক দলের এক নেতা হিসেবে রাজনৈতিক মঞ্চে আবির্ভূত হলেন। তাহার নিজস্ব ক্ষমতার লোভ ও একশ্রেণীর মেরুদণ্ডহীন নেতা ও রাজনৈতিক কর্মী, নীতিহীন বুদ্ধিজীবী ও চরিত্রহীন টেন্ডলের যোগসাজশে বাংলার সর্বত্র নগরে, বন্দরে, কল-কারখানায়, গ্রামে-গঞ্জে, ক্ষেতে-খামারে দিল্লির দাসেরা আওয়াজ উঠাইতে থাকেন: এক নেতা এক দেশ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ!” (পৃষ্ঠা ৫৬৬ ও ৫৬৭)।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের আরেক বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও প্রখ্যাত সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর বিখ্যাত ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ গ্রন্থে যে বিশ্লেষণ দিয়েছেন তা থেকে কিছু উদ্ধৃতিও নিম্নে দেয়া গেল :
আওয়ামী নেতৃত্বের ভ্রান্তনীতি
কিন্তু দেশের দুর্ভাগ্য এই যে, শেখ মুজিব এই উদারতার পথে না গিয়ে উল্টা পথ ধরিলেন। এই সব প্রবীণ ও দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ানকে পার্লামেন্টে ঢুকিতে না দেবার জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করিলেন। জনাব আতাউর রহমানকে হারাইবার জন্য আওয়ামী নেতৃত্ব যে পন্থা অবলম্বন করিলেন, সেটাকে কিছুতেই নির্বাচন প্রচারণার সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক নীতি বলা যায় না। বরঞ্চ আমার বিবেচনায় সেটা ছিল খোদ আওয়ামী লীগের জন্যই আত্মঘাতী। তার মতো ধীর স্থির অভিজ্ঞ গঠনাত্মক চিন্তাবিদ পার্লামেন্টের অপজিশন বেঞ্চের শুধু শোভা বর্ধনই করেন না, সরকারকে গঠনমূলক উপদেশ দিয়া এবং গোটা অপজিশনকে পার্লামেন্টারি রীতি-কানুনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিয়া পার্লামেন্টারি পদ্ধতিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া থাকেন। এমন একজন ব্যক্তিকে পার্লামেন্টে ঢুকিতে না দেবার সর্বাত্মক চেষ্টা যে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ কেন করিলেন তাহা আজও বুঝিতে পারি নাই। কারণ এমন চেষ্টা যে মনোভাবের প্রকাশ, সে মনোভাব পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সাফল্যের অনুকূল নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের মতো অভিজ্ঞ ও প্রবীণ পার্লামেন্টারি নেতা কিছুতেই এমন আত্মঘাতী নীতির সমর্থক হইতে পারেন না। যদি খোদা-না খাস্তা শেখ মুজিব কোনও দিন তেমন মনোভাবে প্রভাবিত হন, তবে সেটা হইবে দেশের জন্য চরম অশুভ মুহূর্ত। কিন্তু আমি দেখিয়া খুবই আতঙ্কিত ও চিন্তাযুক্ত হইলাম যে নির্বাচন চলাকালে আওয়ামী নেতৃত্ব অপজিশনের প্রতি যে মনোভাব অবলম্বন করেছিলেন, সেটা সাময়িক অবিবেচনাপ্রসূত ভুল ছিল না।” (পৃ: ৬২৬ ও ৬২৯)।

উপরোক্ত বিবরণ ও বর্ণনা আওয়ামী লীগের ভেতরের হাতে গোনা বিবেচক মানুষদের মূল্যায়ন। এ ছিল কেবল রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার চিত্র। কিন্তু আড়ালে-অন্তরালে ছিল আরো ভয়ানক চিত্র। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, ঐতিহ্যগত ও চরিত্রগত চিরকালীন বৈশিষ্ট্যগুলোকে উৎপাটিত করার এক ভয়ানক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এই সঙ্গে দেশকে অন্য একটি দেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চিত্রের প্রতিফলন এই দেশের মানুষের মধ্যে ঘটানোর চেষ্টায় মেতে উঠে একটি চিহ্নিত মহল। সময়ের তীব্র কশাঘাত সে সময়ে আপতিত না হলে এই স্বাধীন দেশটি পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে বিরাজমান থাকতো কি না- সে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ ছিল। বলা বাহুল্য যে, ৭ই নভেম্বরের পশ্চাৎচিত্রও ছিল এটিই। ’৭২-’৭৫-এর পরিস্থিতির বিবরণ জানার পর ৭ নভেম্বরকে কে অস্বীকার করতে পারে?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গ্রন্থ রচয়িতা

SHARE

Leave a Reply