বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস -মতিউর রহমান আকন্দ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আইন অমান্য আন্দোলন
প্রথম গোলটেবিল বৈঠক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বর্জন করেছিল। শুধু বর্জনই করেনি, তারা ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করে রীতিমত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাধীনতার ঘোষণার হিম্মত দেখানোর কারণে জওহরলাল নেহরু পুরো জাতির নিকট জাতীয় বীর হিসেবে গণ্য হন। ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। মি. গান্ধী লবণ আইন অমান্য আন্দোলন শুরু করে ভারতে ব্রিটিশ সরকারকে বিব্রত করে তোলেন।
গান্ধী ও অন্যান্য ভারতীয় নেতৃবৃন্দ দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেন এবং বিপ্লবীদের অহিংস আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চালান। পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম ধাপ হিসেবে গান্ধী ও কংগ্রেসের নেতৃত্বে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে গান্ধী লবণ আইনের প্রতি মনোযোগ দেন। লবণ আইন অনুযায়ী লবণ উৎপাদন এবং বণ্টনের ওপর ব্রিটিশ সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল। ১৯৩০ সালের ২ মার্চ গান্ধী লর্ড আরউইনের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে তাকে হুঁশিয়ার করে দেন যে, ১১ মার্চ তিনি ও তার আশ্রমের অন্যান্য সদস্য লবণ আইন অমান্য করবেন। লর্ড আরউইন ছিলেন ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান। গান্ধীকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। তার পরবর্তী কার্যক্রম না দেখে তিনি তাকে গ্রেফতার করতে আগ্রহী ছিলেন না। ১২ মার্চ ভাইসরয় আরউইনকে আরো একদিন সময় দিয়ে গান্ধী ও তার ৭৮ জন অনুসারী আহমেদাবাদের উপকণ্ঠে সবরমতি নদীর তীরে অবস্থিত আশ্রম ত্যাগ করেন এবং সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত ২ শ’ মাইল দীর্ঘ লংমার্চ শুরু করেন। গান্ধী ঘোষণা করেন যে, তিনি আরব সাগর থেকে এক মুষ্টি লবণাক্ত পানি সংগ্রহ করে আইন ভঙ্গ করবেন। গান্ধীর এ লংমার্চ দৃশ্যত ব্যর্থ হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বিস্ময়কর। পশ্চিম ভারতের প্রতি সারা পৃথিবীর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত হয়। চলার পথে হাজার হাজার লোক তার সঙ্গে যোগ দেয়। ২৪ দিন পর ৬ এপ্রিল তিনি আরব সাগরের উপকূলে ডান্ডি নামে ছোট গ্রামে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে তিনি সমুদ্র থেকে এক মুঠো লবণাক্ত পানি হাতে তুলে নেন। ভারতের কোটি কোটি মানুষ তাকে অনুসরণ করে। কংগ্রেস বেআইনিভাবে বিপুল পরিমাণ লবণ বিক্রির আয়োজন করে। প্রতিটি বড় বড় শহরে জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার মানুষ এ জনসভায় যোগদান করে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া: দ্য ফ্রি এনসাইক্লোপিডিয়া/ পলাশী থেকে একাত্তর-সাহাদত হোসেন খান)
১৯৩০ সালে গান্ধীর লবণ আন্দোলনে ও গণ-অসহযোগ আন্দোলনে নারীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। এটা ছিল এ আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ২০-এর দশকে যে অসহযোগ হয়েছিল তাতে খুব কমসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু এ বছর অগণিত স্বাধীনতাকামী নারী প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেমে পড়েন। নারীদের অংশগ্রহণ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে। আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে নেহরু লিখেছেন, ‘হিমবাহ যেভাবে একের পর এক ঝর ঝর করে অপ্রতিরোধ্যভাবে নেমে আসে, সেভাবে নারীরা শুধু ব্রিটিশ প্রশাসনেই ঢুকে পড়েনি, সমাজের উচ্চ-মধ্য ও নি¤œ পর্যায়Ñ সর্বস্তরে নারীরা শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। অসহযোগের সময় সরকারি নির্দেশ ও পুলিশের লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে কৃষক, শ্রমিক, ধনী-গরিব সব শ্রেণীর নারীরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।’
নারীদের পাশাপাশি এ আন্দোলনে শিশুদেরও একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। ১৯৩০-এর মার্চ মাসে ‘বানর সেনা’ নামে একটা বিচ্ছু বাহিনী গঠিত হয়। এ শিশু সংগঠনটির নেতৃত্ব দেন তরুণ বয়সী ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৩০-এর বসন্তকালে দেশজুড়ে এক সপ্তাহের ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়। এ সময় ইন্দিরা ১৫ হাজারের বেশি শিশুর এক ঐতিহাসিক মিছিলে নেতৃত্ব দেন। তাদের সমাবেশ দেখতে প্রায় অর্ধলক্ষ লোক সমবেত হয়েছিল।
নারী শিশুদের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে আন্দোলন ব্যাপক রূপ লাভ করে। হাজার হাজার কংগ্রেস সদস্য স্বেচ্ছায় কারাবরণ করে। কারাগার বোঝাই হয়ে ওঠে। গভীর হতাশা থেকে ভাইসরয় আরউইন ১৯৩০-এর এপ্রিলে আন্দোলন স্তিমিত করার জন্য দেশজুড়ে দমন-পীড়ন ও ধরপাকড় অভিযান শুরু করেন। ভারতীয় নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়। সরকারের নির্দেশে কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটিকে নিষিদ্ধ এবং এর নেতাদের একের পর এক গ্রেফতার করা হয়। জওহরলাল নেহরুকে দিয়ে গ্রেফতার অভিযান শুরু হয় এবং গান্ধীকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে এ অভিযান শেষ হয়। তবুও আন্দোলন অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। লবণ তৈরির অভিযোগে ১৪ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশে রামপুরে একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য যাত্রা শুরু করার পর নেহরুকে গ্রেফতার করা হলো। আদালত তাঁকে ৬ মাসের জেল দিলে তাঁকে নৈনি জেলে পাঠানো হয়। নেহরু পরিবারে তখন নেমে আসে ভয়াবহ দুর্যোগ। ৫ মে গ্রেফতার করা হয় মি. গান্ধীকে। ৩০ জুন বন্দী করা হয় মতিলাল নেহরুকে। সঙ্গে ছিলেন সৈয়দ মাহমুদ। বেআইনি ঘোষিত কংগ্রেসের নেতৃত্ব দেয়ার কারণে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের ৬ মাস কারাদন্ড হয়।
১৯৩০ সালের ৮ সেপ্টেম্বর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মতিলাল জেল থেকে ছাড়া পান। এরপর তিনি চলে যান মুশুরিতে। ১১ সেপ্টেম্বর ছাড়া পান জওহরলাল নেহরু। তিনি মতিলালকে দেখতে মুশুরি গিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর আবারও গ্রেফতার হন। এবার তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও খাজনা বন্ধে জনগণকে উসকে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। এবার তাকে আড়াই বছরের জেল ও জরিমানা অনাদায়ে আরো ৫ মাসের কারা ভোগের নির্দেশ দেয়া হয়। এ কারাদন্ডের ঘোষণায় সারাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সব মিলিয়ে নেহরুকে ৭ বছর জেল খাটতে হয়। বন্দিজীবনে তিনি ইন্দিরার কাছে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। চিঠিতে জেলখানার কারাপ্রকোষ্ঠকে তিনি ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ বলে উল্লেখ করেন। ১৯৩০ সালের অক্টোবরে তাকে নৈনি জেলে ৩ বছরের জন্য নেয়া হয়। নেহরু তার ‘টুওয়ার্ড ফ্রিডম’Ñ বইয়ে কারাগারের বর্ণনা দিয়েছেন:
“সাত বছর পর আমি পুনরায় কারাগরে ফিরিয়া আসিলাম; কারাজীবনের পূর্বস্মৃতি অনেকাংশে অস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। এ প্রদেশে নৈনি সেন্ট্রাল জেল অন্যতম বৃহৎ কারাগার। এখানে আমি নিঃসঙ্গ কারাবাসের এক অভিনব অভিজ্ঞতা লাভ করিলাম। জেলের বৃহৎ প্রাচীরের মধ্যে ২৩০০ কয়েদি হইতে আমাকে পৃথক করিয়া এক ক্ষুদ্র স্থানে রাখা হইল। পনের ফিট উঁচু বৃত্তাকারে ঘেরা স্থানÑপরিধি প্রায় একশত ফিট হইবে। ইহার মধ্যস্থলে এক বিবর্ণ, কুৎসিত চারটি সেল-ওয়ালা দালান। আমাকে পাশাপাশি দুইটি সেল দেওয়া হইলÑ একটি বাসের, অপরটি ¯œানাগাররূপে ব্যবহার করিবার জন্য। অপর দুইটি সেল কিছুকাল খালি ছিল।
বাহিরের কর্মব্যস্ততা ও উত্তেজনার পর এখানে আসিয়া আমি নিঃসঙ্গ ও অবসন্ন বোধ করিতে লাগিলাম। আমি পরিশ্রান্ত ছিলাম, প্রথম দুই-তিন দিন খুব নিদ্রা গেলাম। তখন গ্রীষ্মকাল আরম্ভ হইয়াছে, আমি বাহিরে শয়ন করিবার অনুমতি পাইলামÑ সেলের বাহিরের প্রাচীর ও দালানের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ স্থানে শয়নের ব্যবস্থা হইল। আমার খাটখানি শক্ত করিয়া শিকল দিয়া বাঁধিয়া দেওয়া হইল, কি জানি আমি যদি উহা লইয়া পালাইয়া যাই অথবা যাহাতে আমি দেওয়াল টপকাইবার মই হিসেবে উহা ব্যবহার করিতে না পারি, সেই জন্যই এই সাবধানতা অবলম্বিত হইয়াছিল।”
নৈনি জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় নেহরু সিদ্ধান্ত নেন ইন্দিরার নিকট ধারাবাহিকভাবে চিঠি লিখবেন। এর আগে জেলে বসে লেখা চিঠি ‘লেটার্স ফ্রম এ ফাদার টু হিজ ডটার’ নামে বই আকারে বের হয়। জওহরলাল কারাজীবনের দ্বিতীয় ধাপে কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে লেখা চিঠিসমূহ নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি’ নামক একটি বই যা ইন্দিরাকে লেখা চিঠির একটি সঙ্কলন। ১৯৬টি চিঠি ৯৭০ পৃষ্ঠার বইয়ে স্থান পায়। ৩ বছর ধরে জেল থেকে নেহরু ইন্দিরার কাছে লেখা চিঠিতে বিশ্ব ইতিহাস সম্পর্কে তার অর্জিত জ্ঞান তুলে ধরেন। চিঠির মাধ্যমে তিনি ইন্দিরাকে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক জ্ঞান সরবরাহ করেন। (সূত্র : ইন্দিরা-ক্যাথরিন ফ্রাঙ্ক ; টুওয়ার্ড ফ্রিডম- পন্ডিত জওহরলাল নেহরু)
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের ওপর জেল জুলুম-নির্যাতন সত্ত্বেও জনগণ দমে যায়নি। সরকার আন্দোলনকারীদেরকে কঠোর হস্তে দমন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এমতাবস্থায় সরকারের সাথে একটি আপস নিষ্পত্তিতে উপনীত হবার জন্য স্যার তেজবাহাদুর সাপ্রু, ভূপালের নবাব হামীদুল্লাহ্ খান, শ্রীনিবাস শাস্ত্রী এবং শ্রী জয়াকর প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মি. গান্ধীর সাথে আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় একটি আপসের ক্ষেত্র তৈরি হয়। বড়লাটের সাথে গান্ধীজির সরাসরি আলাপ আলোচনার পর কংগ্রেস দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করতে সম্মত হয়।

গোলটেবিল বৈঠক
১৯২৯ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড-এর উদ্দেশে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি চিঠি লিখেন। চিঠিতে তিনি সাইমন কমিশনের সমালোচনা করেন। তিনি ভারতের প্রতিনিধিদের মতামত গ্রহণের জন্য একটি বৈঠক আয়োজন করার আহ্বান জানান। ব্রিটিশ সরকার তার এ আহ্বানের যৌক্তিকতা মেনে নেয়। তারা উপলব্ধি করে যে, আলোচনা ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ১৯২৯ সালের ২৯ অক্টোবর ভারতের বড় লাট লর্ড আরউইন ভারতীয় সমস্যা সম্পর্কে আলোচনার উদ্দেশ্যে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক আহ্বানের ঘোষণা দেন। সাইমন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৩০ সালে লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক আহূত হয়। কংগ্রেস এ বৈঠকে যোগদান করা থেকে বিরত থাকে। যেহেতু এ ধরনের একটি বৈঠকের জন্য জিন্নাহ আগ্রহী ছিলেন তাই তিনি বৈঠকে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কংগ্রেসের আন্দোলন চলতে থাকা অবস্থায় গোলটেবিল বৈঠক হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ কংগ্রেসের আন্দোলনকে তাদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে বিবেচনা করেন। মোট ৮৯ জন প্রতিনিধি গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেন। এর মধ্যে ব্রিটিশ প্রতিনিধি ছিলেন ১৬ জন এবং ১৬ জন ছিলেন ভারতের দেশীয় রাজ্যের প্রতিনিধি অবশিষ্ট ৫৭ জন ছিলেন কংগ্রেস ছাড়া অন্যান্য দল। যেমন- মুসলিম লীগ, হিন্দু মহাসভা, হরিজন প্রভৃতির প্রতিনিধি। মুসলিম নেতৃবৃন্দের গোলটেবিল বৈঠকে যারা আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন তারা হলেন: মাওলানা মুহাম্মদ আলী, মি. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মি. এ কে ফজলুল হক, স্যার মুহাম্মদ ইসমাইল, আগা খান, স্যার আবদুল কাইয়ুম, স্যার আবদুল হালিম গজনবী, স্যার আকবর হায়দারী, স্যার মুহাম্মদ শফি, স্যার শাহ নওয়াজ ভুট্টু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। মুসলিম সদস্যগণ লন্ডনে পৌঁছে মহামান্য আগা খানকে তাঁদের নেতা নির্বাচিত করেন। বৈঠকের তারিখ ঘোষণার সাথে সাথে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি ঘরোয়া বৈঠক করেন।
গোলটেবিল বৈঠক প্রায় দুই মাসকাল বৈঠক স্থায়ী হয়। মাওলানা মুহাম্মদ আলী ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়ে বৈঠকে যোগদান করেন। তিনি অসুস্থ অবস্থায় আসনে উপবেশন করেই তাঁর নব্বই মিনিটব্যাপী দীর্ঘতম ভাষণ দান করেন। তার সে জ্বালাময়ী ভাষণ যেমন একদিক দিয়ে ছিল একটি উচ্চাঙ্গের সাহিত্য, তেমনি অপর দিক দিয়ে ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অবদান। তিনি স¤্রাট পঞ্চম জর্জের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে, কঠোর ভাষায় ব্রিটিশ সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। ভারতের স্বাধীনতা তাঁর কাছে ছিল জীবনের সর্বাপেক্ষা প্রিয়তম বস্তু। তিনি তাঁর বক্তৃতার এক পর্যায়ে অতি আবেগময় কণ্ঠে বলেন, “আমি ভারতের স্বাধীনতার সারাংশ নিয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে চাই। যদি তোমরা স্বাধীনতা না দাও, তাহলে তার পরিবর্তে এখানে আমার জন্য রচনা করো সমাধি। কারণ একটি গোলামির দেশে ফিরে যাওয়ার চেয়ে একটি স্বাধীন দেশে মৃত্যুবরণকে আমি শ্রেয় মনে করি।”
তাঁর এ আন্তরিকতাপূর্ণ উক্তি ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হতে মোটেই বিলম্ব হলো না। তাঁকে আর তাঁর প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে আসতে হয়নি। ভারতের স্বাধীনতা হয়নি, হয়েছে তাঁর জীবনের অবসান লন্ডনের বুকেই ক’দিন পরে।
মাওলানা মুহাম্মদ আলী বারবার কারাবরণ করে এবং দীর্ঘদিন কারাগারে অতিবাহিত করে একেবারে ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর অকস্মাৎ মৃত্যু ভারতের কোটি কোটি নর-নারীকে শোকসাগরে নিমজ্জিত করে। ১৯৩০ সালে ৪ঠা জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং এ নিদারুণ দুঃসংবাদ তড়িৎগতিতে সারা মুসলিমবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর সুধীসমাজ মর্মাহত হয়ে ভারতের এ সিংহপুরুষের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে তারবার্তা প্রেরণ করতে থাকেন।
মাওলানা মুহাম্মদ আলীর অন্তিম ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মৃতদেহকে পরাধীন ভারত ভূমিতে না এনে বায়তুল মাক্দাসে অবস্থিত খলিফা ওমরের মসজিদ প্রাঙ্গণে কবরস্থ করা হয়।
দেশপ্রেমিক, কবি ও সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বাগ্মী মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহরের মৃত্যুতে ভারতবর্ষের রাজনীতিক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা আর পূরণ হয়নি। তবে লন্ডন যাত্রাকালে তাঁকে যখন স্ট্রেচারের সাহায্যে বোম্বাই বন্দরে জাহাজে তোলা হয়, তখন অনেকেই অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, “ভারতে আপনার স্থলাভিষিক্ত কে হবে।” তখন তিনি বলেছিলেন, “তোমাদের জন্য মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ রইলো।” তাঁর এ অন্তিম ইচ্ছাও পূরণ হয়েছিল। পরবর্তীকালে মুসলমানদের আশা-আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন হয়েছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
(সূত্র : বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস- আব্বাস আলী খান)
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply