বাংলাদেশে আরবি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা । মো: রফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশে আরবি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা১৮ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস। ১৯৭৩ সালের এ দিনটিতে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সভার ২৮তম অধিবেশনে আরবি ভাষাকে এর দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ২০১২ সালের অক্টোবরে জাতিসঙ্ঘের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো ১৮ ডিসেম্বরের এ ঐতিহাসিকতাকে ধারণ করে এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিভিন্ন আরব ও মুসলিমপ্রধান দেশসমূহে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে আরবি ভাষা চর্চার ব্যাপকতা থাকলেও তা বিশেষত ধর্মকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে এলিট ও পুঁজিপতি শ্রেণির আনুকূল্য লাভে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এ দেশে দিবসটির সাড়ম্বর উদযাপন খুব একটা চোখে পড়ে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এবারই প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগ দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করেছে। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। দিবসটি উপলক্ষে পাঠকদের উদ্দেশে বাংলাদেশে আরবি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে দু-একটি কথা বলা নিতান্তই বিধেয়।
পৃথিবীর ভাষাসমূহের মধ্যে নির্মোহভাবেই আরবিকে জ্যেষ্ঠতার মর্যাদা দেয়া যায়। কারণ আদি পিতা আদম (আ)-এর ভাষা ছিল আরবি। জান্নাতে তিনি আরবি ভাষাতেই মনের ভাব প্রকাশ করতেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালার একটি নির্দেশ প্রতিপালনে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি কিছুকাল আরবিবিচ্যুত ছিলেন। অতঃপর তওবা কবুল হলে তিনি ও আদি মাতা হাওয়া (আ) পুনরায় আরবি ভাষায় কথা বলার সুযোগ লাভ করেন। পরবর্তীতে আদম (আ)-এর সন্তানদের মধ্যে ভাষার পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটলেও তার সন্তানদের কোনো না কোনো একটি ধারা মূল আরবির চর্চা অব্যাহত রাখে। এভাবেই আমরা নূহ (আ)-এর সময়ে সংঘটিত মহা প্লাবন পর্যন্ত জুরহুম নামীয় একজন আরবিভাষীকে নূহ (আ)-এর নৌকায় দেখতে পাই। এর সাথেই নূহ (আ)-এর প্রোপৌত্র ইরাম ইবনে সামের কন্যার বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে আরবি ভাষাভাষী মানুষের নতুন বংশধারা বিকশিত হতে থাকে। ইতিহাসে এ বংশধারাই আরবে আরিবা নামে খ্যাত হয়ে আছে। এর পর ইয়ারুব ইবনে কাহতানের বংশধররা কাহতানি আরব বা আরবে মুতার্য়ারিবা এবং ইসমাইলি আরব বা মা’দ ইবনে আদনান ইবনে উদের বংশধর যারা আরবে মুস্তারিবা বলে ইতিহাসে পরিচিত। শেষোক্ত এ ধারার ভাষাকেই আল কুরআনে আরবি ই মুবিন বলা হয়েছে। এ ভাষাটিই আল কুরআনের ভাষা।
আল কুরআনের কারণে আরবি ভাষা আজ বিশ্বব্যাপী একই সমান্তরালে প্রবাহিত, একই ঐক্যে গ্রথিত। দুই হাজার বছরের প্রাচীন আরবিরই ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধি আজকের আধুনিক আরবি। এর একমাত্র কারণ হলো আল কুরআন। মধ্য-এশিয়া, পূর্ব-আফ্রিকা, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইউরোপের মোট ছাব্বিশটি দেশের জাতীয় ভাষা আরবি। এ ছাড়াও ইসরাইলের দ্বিতীয় অফিসিয়াল ভাষা আরবি। জাতিসঙ্ঘের ছয়টি দাপ্তরিক ভাষার মধ্যে আরবি অন্যতম। প্রায় পঞ্চাশ কোটি মানুষের ভাব-ভালোবাসা বিনিময়ের বাহন হলো এ আরবি ভাষা। পৃথিবীর ভূ-ভাগের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে মোট স্থলভাগের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়েই রয়েছে আরবি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অবস্থান। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর ভাষাকে অগ্রাহ্য করে যে কখনোই কোনোভাবেই প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় তা পৃথিবীর উন্নত জাতিসমূহ অনেক আগেই বুঝতে সক্ষম হয়েছিল বলেই আজ তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত। কারণ আরবদের জ্ঞানসাগরে অবগাহন করেই তাদের জ্ঞানচর্চার সূচনা। ইতিহাস এমনই সাক্ষ্য দেয়। কিন্তু আমরা এমনই হতভাগা জাতি যে আরবিকে ধর্মজ্ঞানেও যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হলাম। অথচ রাসূল সা. বলেন, তিন কারণে তোমরা আরবি ভাষাকে ভালোবাসো এক. আমি আরবি, দুই. কুরআনের ভাষা আরবি, তিন. জান্নাতের ভাষা আরবি। ধর্ম হিসেবে ইসলাম কবুল করলাম কিন্তু ধর্মের প্রাণ আরবি ভাষাকে ঠিক একইভাবে আলিঙ্গন করতে পারলাম না। ফলে ধর্ম পালন করলাম এমনভাবে যেন রাতের আঁধারে বনে জঙ্গলে জ্বালানির সন্ধানে সংশয়াকীর্ণ শঙ্কিত এক মানুুুুষ। যাকে যেকোনো সময় সাপ বিচ্ছু দংশন করতে পারে। আমরাও পদে পদে ধর্মের নামে প্রতারিত হতে থাকলাম। তাই তো উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন- তোমরা আরবি শেখো। আরবিই হলো তোমাদের দ্বীন। অপর দিকে অর্থনৈতিক গুরুত্ব দিয়ে আরবি না শেখার কারণে যুগের পর যুগ দুই আনার শ্রমিকই রয়ে গেলাম। হারালাম ইহকাল পরকাল দুই কালই। এইতো আমাদের বিধিলিপি! একে খণ্ডাতে হবে। দুই জগতের কল্যাণ চিন্তা করে আরবি আমাদের শিখতেই হবে।
আরবি বাংলাদেশে এসেছিল আরব বণিকদের হাত ধরে ইসলামের আগমনের অনেক পূর্বে। আরব বণিকেরা ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর হয়ে সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রামে জাহাজ নোঙর করে বাংলা, বার্মা ও চায়নায় তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত করেছিল ইসলামের আবির্ভাবের বহুকাল পূর্ব থেকেই। পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতকের প্রারম্ভকালে আরবদের মাধ্যমেই বাংলায় ইসলামের বিজয় সূচিত হয়। দলে দলে মানুষ ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হতে থাকে। তৎকালীন বাংলায় শুরু হয় আরবি চর্চার দ্বিতীয় যাত্রা। যার ফলে দৈনন্দিন ব্যবহৃত শব্দভাণ্ডারে যোগ হতে থাকে অনেক আরবি শব্দ। সঙ্গত কারণেই চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপভাষায় প্রায় পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি আরবি শব্দের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে আরবি শব্দের ব্যাপক প্রচলন বাংলা ভাষাকে ঋদ্ধ করে। অতঃপর মুসলিম শাসনামলে বাংলার অফিস আদালতের বিভিন্ন দপ্তর উপ-দপ্তরের নাম ও কার্যাদির নাম-শিরোনাম আরবি ভাষায় প্রচলিত হতে দেখা যায়। এ সময়ে শুধু বাংলায়ই নয় সারা পৃথিবীতেই আরবি ভাষার প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জ্ঞানবিজ্ঞানের একমাত্র বাহন ছিল আরবি ভাষা। ১৭৬৫ সালে ইংরেজরা দিল্লির সম্রাটের কাছ থেকে দেওয়ানি লাভ করলে এ অঞ্চলে আরবির গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। ইংরেজ শাসনের পূর্বে বাংলায় প্রতি চারশ জনের জন্য একটি করে মক্তব বা মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল। ম্যাক্স মূলারের বর্ণনা অনুযায়ী ইংরেজ শাসনামলের পূর্বে বাংলায় আশি হাজার মক্তব চালু ছিল। যে মক্তবগুলোতে কেবলমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা ও আরবি ভাষার পঠন পাঠনই চালু ছিল না অন্যান্য সামাজিক শিক্ষাও চালু ছিল। ইংরেজদের দুইশ বছরের শাসনে সাতশ বছরের মুসলিম শাসনের অনেক ঐতিহ্যিক সৌন্দর্য বিলীন হয়ে গেলেও বাংলাভাষায় আরবি ভাষার প্রভাব এখনো সমভাবে বর্তমান। কিন্তু আনুষ্ঠানিক আরবি চর্চা যে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে তা বোঝার জন্য বা বলার জন্য বোধ করি তেমন কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এ অবস্থায় আরবি শেখা না শেখার লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে পুনঃসিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে বলে আমরা মনে করি।
ইংরেজ শাসনের ফলে আমাদের সুবিধাবাদী মস্তিষ্ক ইংরেজ সংস্কৃতি এমনভাবে ধারণ করেছে যে আমরা আর আপন-আপনার বোধ বিবেচনার মধ্যে নেই। সেই লর্ড ম্যাকলের দম্ভোক্তিই আজ যেন সত্যে পরিণত হয়েছে। জাতিতে বাংলাদেশি মুসলমান কিন্তু মগজে মস্তিষ্কে যেন খাঁটি ইংরেজ। যারা একসময় একমুঠো সভ্যতা ভব্যতার কাঙাল ছিল, আজ তারা সভ্যতার মালিক-মহাজনকেই যেন সভ্যতা মানবতা শেখাতে চায়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আমরা বাংলাদেশি মুসলমানরা একই সাথে তিনটি সমৃদ্ধ ধারার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী-এক. ইসলামি, দুই. আরবীয়, তিন. বাঙালি সংস্কৃতি। তবে ইসলামের ছাঁচে ফেলে আরবীয় ও বাঙালি সংস্কৃতির যতটুকু গ্রহণযোগ্য আমরা ঠিক ততটুকুই গ্রহণ করতে চাই। এই গ্রহণ-বর্জনের নীতিটুকুই আমাদের সাংস্কৃতিক ভেদরেখার প্রকৃত মানদণ্ড। আর ইসলাম যেহেতু সকল ভালোকে সকল কল্যাণকে উদারভাবে গ্রহণ ও আত্তীকৃত করে তাই ভালোতে ভালোতে যেন সোনায় সোহাগা। আমাদের এই ভালোটুকুকে আবারো এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে জাতির আরো অধিকতর কল্যাণ সাধনের জন্য। তাই আসুন মনোনিবেশ করি আরবি চর্চায় যেমন করি বাংলা আর ইংরেজির বেলায়। তবেই শ্রমিকের খোলস মুক্ত হয়ে সাহেবের রাজটিকা কপালে ধারণ করতে পারবো। তবে আরবি চর্চার এ রাজপথ বাংলাদেশে এখন খুব একটা সুগম আর পুষ্প বিছানো নয়, অনেকটা কণ্টকাকীর্র্ণ। অভ্যন্তরীণ অবহেলা ও নির্লিপ্ততার পাশাপাশি যথাযথ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও গুরুত্বারোপের অভাব এ পথকে করেছে ক্রমশ আরো ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ সুযোগ সুবিধা পেলে এদেশে আরবি ভাষার ছাত্র, শিক্ষক ও গবেষকরা সমাজ ও রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত ইতিবাচক পরিবর্তন এবং নৈতিক মানদণ্ডে শুভ বোধে উত্তীর্ণ সর্বব্যাপী কল্যাণময় এক নতুন সমাজ কাঠামোর ভিত রচনা করতে পারতো।
আরবি ভাষা অধ্যয়নে আমরা নিশ্চিত ও সম্ভাব্য কী কী সুবিধা লাভ করতে পারি? এবং এর প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু? সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাক-
১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আল কুরআনের প্রকৃত ও চূড়ান্ত স্বাদ আস্বাদনের সুযোগ লাভ করা। আমরা যারা বাংলা অনুবাদ পড়ে আল কুরআনকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি তাদের এ চেষ্টার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উত্তম বিনিময় দান করুন। এ চেষ্টার মাধ্যমে আল কুরআনের হুকুম আহকাম সংক্রান্ত কিছু জ্ঞান হয়তো লাভ করা যায়, যদিও তা শতভাগ নিষ্কণ্টক নয়; ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়- আল্লাহ তায়ালার বক্তব্যের যে ব্যঞ্জনময়তা, তাল-লয়, সুর-লহরী, ছন্দময়তা, স্থান কালের মাত্রিকতা, বাক্যবিন্যাস, শব্দচয়ন, পূর্বাপরের জাদুময়তা, মহান আল্লাহ তায়ালার একান্ত নিজস্ব ভাষিক স্টাইল যা অদ্বিতীয় অবিকল্প এবং বক্তব্যের কাঠামোগত সৌন্দর্যের স্বাদ আস্বাদন করা কসি¥নকালেও সম্ভব নয়। এ কথা সহজেই অনুমেয় যে রাজভোগের প্রকৃত স্বাদ স্বীয় রসনা যোগেই লাভ করতে হয়, অন্যের কাছে গল্প শুনে সে স্বাদ অনুমান করা আদৌ সম্ভব নয়। মহান আল্লাহ তায়ালার বাণীবদ্ধ আরবি ভাষার জ্ঞান লাভ ব্যতীত তাই মানবজীবন একরকম বৃথাই বৈকি!
২. আরব তথা সারা বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বক্তা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.। তাঁর বক্তব্যই আল-হাদিস নামে পরিচিত। তাঁর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ভাষাগত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলেও আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের বিকল্প নেই। তিনি হলেন ভাব ও ভাষার, ধ্বনি ও আবেগের মধুময়তার প্রতীক। এ জন্যই তাকে বলা হয়েছে জামিউল কালিম ওয়াল মায়ানি। একটি দৃষ্টান্ত দিলেই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়- রাসূল সা. বলেছেন : “ইগতানিম খামসান কাবলা খামসিন, শাবাবাকা কাবলা হারামিকা ওয়া সিহ্হাতাকা কাবলা সাকামিকা ওয়া গিনাকা কাবলা ফাকরিকা ওয়া ফারাগাকা কাবলা শুগলিকা ওয়া হায়াতাকা কাবলা মাওতিকা।” অনুবাদ করলে এর সাদামাটা অর্থটা হয়তো অনুধাবন করা যাবে, কিন্তু রাসূল সা.-এর শব্দচয়ন ও বিন্যাসের যে সাংগঠনিক ঐক্য, বক্তব্যের যে ধ্বনিক ব্যঞ্জনা, দ্যোতনা ও গতিময়তা আরবি না জানলে, না বুঝলে সেটি কিভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হবে? ঠিক একইভাবে আমরা যখন রাসূলে আরবি সা.-এর বিদায় হজের ভাষণ শুনি আমরা যারা আরবি জানি বা বুঝি তারা এর ভাষিক, ধ্বনিক এবং বাগার্থিক এক কথায় এর সামগ্রিক স্বাদ উপভোগ করে আপ্লুত হই। আর যারা আরবি ভাষাজ্ঞানের ধার ধারেন না তাদের তো শুধু বৈষয়িক আবেদনটুকুর গুরুত্ব অনুধাবন করেই ক্ষান্ত থাকতে হয়। এ হলো আংশিক তৃপ্তি, পূর্ণাঙ্গ নয়। তাই পরিপূর্ণ তৃপ্তি ও স্বাদের পূর্ণাঙ্গতার জন্য আরবি ভাষায় পারঙ্গমতা অর্জনের বিকল্প নেই।
৩. ইসলাম প্রতিপালনে প্রতারিত হওয়া বা ভণ্ড পীরের কবল থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য আরবি ভাষার আশ্রয় ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ কুরআন হাদিস ছাড়াও ইসলামের সকল মৌলিক গ্রন্থাবলি রচিত ও সঙ্কলিত হয়েছে আরবি ভাষায়। সুতরাং একজন আরবি ভাষায় পারদর্শী মানুষ ইসলামের হুকুম আহকামের ব্যাপারে সংশয়াবিষ্ট হলে তিনি নিজেই মৌলিক সূত্রগুলোতে ঘুরে আসতে পারেন। প্রয়োজনে আরো কোনো উলিল আমর বা বিশেষজ্ঞের সাথে মতবিনিময় করেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তাতে দোষের কিছু নেই। কারণ একজন প্রকৃত জ্ঞানীই কেবল তাঁর না জানার পরিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল থাকেন।
৪. বর্তমানে আরব ও আরবি ভাষা এক উন্নত সাহিত্য সংস্কৃতি ও সভ্যতার তীর্থকেন্দ্র। এ ভাষার প্রাচীন ও আধুনিক সাহিত্য ভান্ডার একে অপরকে এমনভাবে আলিঙ্গন করে আছে যেন কেউ কারো থেকে তেমন দূরে নয়। অতীতকে ধারণ করেই বর্তমান এগিয়ে যাচ্ছে। অতীত ও বর্তমানের এ মেলবন্ধনই আরবি সাহিত্যকে দিয়েছে দুই হাজার বছরের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। সকল যুগের সাহিত্য থেকেই আজকের আধুনিক রসবোদ্ধা-রসতাত্ত্বিক সমভাবে রসসিক্ত হতে পারে। এটি আরবি সাহিত্যের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যার সবটুকু কৃতিত্ব কেবলমাত্র আল-কুরআনুল কারিমের। রসিকজনের পূর্ণক্ষুধা নিবৃত্ত করার খোরাক রয়েছে আরবি সাহিত্যে। প্রাচীনে আছে আকসাম বিন সাইফি, কুস বিন সায়িদাদের মত বাগ্মীদের বক্তৃতা। ইমরুল কায়েস, জুহায়ের বিন আবি সালমা, লবিদ বিন রাবিয়া, আনতারা, শানফারা, হাস্সান বিন সাবিত, কা’ব বিন জুহাইর, আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা, আলী বিন আবি তালিবদের (রা) মত কবি ও দার্শনিকদের কবিতা। উমাইয়া যুগের আখতাল, ফারাযদাক, জারির আজও যেন কাব্যতর্ক, বিষোদগার আর স্তুতিগাঁথায় বে-নজির বে-মেছাল। আব্বাসি যুগের আবুল আতাহিয়া, আবু নাওয়াছ, আল-মুতানাব্বি, আবুল আলা আল-মার্য়ারি প্রমুখ কবি ছাড়াও বহু গ্রন্থ প্রণেতা ও সাহিত্য সমালোচক আল-জাহিজ, বিশিষ্ট সাহিত্যিক ইবনুল মুকাফ্ফার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও রেনেসাঁ পূর্বকালে ইবনে কাছির, ইবনে খালদুনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। আধুনিককালে কবি স¤্রাট আহমদ শাওকি, নীল নদের কবি হাফিজ ইবরাহিম, কবি মারুফ আর রুসাফি, কবি বারূদী, কবি আহমাদ যাকি আবু শাদি, কবি খলিল জিবরান এবং কবি মাহমুদ দারবিশ’র নাম কাব্য জগতে সবিশেষ উল্লেযোগ্য। এ ছাড়াও নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম, সাহিত্য সমালোচক ত্বহা হুসাইন এবং মিসরের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক নোবেল বিজয়ী নাজিব মাহফুজ আধুনিক আরবি সাহিত্যের একেকটি ধ্রুবতারা। এসব কালোত্তীর্ণ শিল্প সাহিত্যের রস আস্বাদন শুধুমাত্র আরবি ভাষায় বিশেষ পারদর্শিতা ও পারঙ্গমতা অর্জনের ওপরই নির্ভরশীল।
৫. মধ্য যুগের জ্ঞান চর্চার একমাত্র বাহন ছিল আরবি ভাষা, এ কথা সর্বজনবিদিত। এ ভাষায় রচিত অনূদিত বহু গ্রন্থ জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখাকে ব্যাপৃত করেছিল। পরবর্তীতে পশ্চিমারা সেগুলোকে অনুবাদ করে জ্ঞান বিজ্ঞানের জগতে নবযুগের সূচনা করে। কিন্তু আমরা সেই কূপমণ্ডূকই রয়ে গেলাম। মধ্যযুগের যে জ্ঞানকোষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের আধুনিক, উত্তরাধুনিক যুগ সেই মূল উৎসকে বাংলায় রূপান্তর করে বাংলাভাষী জ্ঞান পিপাসু পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা আজ সময়ের দাবি। এ দাবিকে অগ্রাহ্য করা মানে হলো নিজেকে সময়ের কাছে মূল্যহীন করে তোলা। শুধু মধ্যযুগের আকর গ্রন্থগুলোই নয় বরং রসিক জনের তৃষ্ণা মেটাবার দায়িত্বও আছে আজকের আরবি পড়–য়াদের। বাংলা ভাষায় যখন ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পড়ি তখন এক ধরনের ভালো লাগার আবেশে জড়িয়ে থাকে মন। আবার যখন ‘লা নুই বেঙ্গলি’ পড়ি তখন আর এক ধরনের আবেগে আহ্লাদিত হই। আবার ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ পড়লে অকৃত্রিম এক স্বাদ যেন হৃদয়পটে লেগে থাকে বহুদিন। এই যে ভালো লাগা এই যে আবেগে আপ্লুত হওয়া সে তো অনুবাদের কারণেই। অথচ আমরা কালোত্তীর্ণ আরবি উপন্যাস, নাটক ও মহাকাব্যের যুতসই রসা কীর্ণ অনুবাদ পাচ্ছি না, যা আমাদেরকে মূলের মত ধরে রাখতে পারে। এ দীনতা আমাদের, এ দৈন্য ঘুচাতে হবে, এ থেকে আমাদেরকে মুক্ত হতেই হবে।
৬. আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি পূর্বসূরিদের হাত ধরে। এর পরিপূর্ণ এবং পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আরবি জানার কোন বিকল্প নেই সে কথা আমরা একটু আগেই বলেছি। এ অমিয় সুধা বাংলাভাষী মানুষের সামনে উপস্থাপন করবার জন্য আরবি শিক্ষিত দক্ষ মানুষদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং ইসলামের ইতিহাসের সকল আকর গ্রন্থগুলোকে বাংলায় ভাষান্তরিত করে ধর্মপ্রাণ জ্ঞানপিপাসু মানুষদের জ্ঞানের তৃষ্ণা কিছুটা হলেও মিটানো সম্ভব হবে। অতএব এ অঙ্গনে একদল প্রাজ্ঞ আরবি পণ্ডিত খুবই প্রয়োজন।
৭. বিশ্বায়নের এ যুগে মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো পৃথিবীব্যাপী তাদের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী বাজারজাত করণে ব্যস্ত। এ অঙ্গনে আমাদের এ ছোট্ট দেশটিও পিছিয়ে নেই। তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, কৃষিপণ্য ছাড়াও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বেভারেজ রফতানি করে আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছি। এই রফতানির তালিকায় মধ্য প্রাচ্যের অনেক আরব দেশও রয়েছে। যে সকল পণ্যসামগ্রী আমরা আরব দেশগুলোতে রফতানি করি সেগুলোর বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে মোড়কায়ন এবং বিপণনের সকল পর্যায়ে আরবি ভাষায় পারদর্শী দক্ষ জনবল কাজে লাগানো গেলে আরো ভালো ফলাফল আশা করা যায় বৈকি। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি ভেবে দেখতে হবে। কারণ আরবরা তাদের নিজের ভাষায় যোগাযোগ করাকেই বেশি পছন্দ করে। এ জন্য পর্যাপ্ত আরবি ভাষার জ্ঞান আবশ্যক।
৮. জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোই আমাদের এ পর্যন্ত প্রধান আশ্রয়। শুধুমাত্র সৌদি আরবেই চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী পঁচিশ লাখ পঞ্চান্ন হাজার বাংলাদেশি কর্মরত আছে। এ সংখ্যা বৈধ জনশক্তির হিসাবে, এর বাইরেও অবৈধভাবে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক সেখানে রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদেরকে অবহিত করেছে। এই অভিবাসীদের সিংহভাগই নির্মাণ ও কৃষি শ্রমিক। অথচ আরবি ভাষায় পারদর্শী দক্ষ জনশক্তি রফতানি করতে পারলে বিভিন্ন দাপ্তরিক ও ক্লারিক্যাল কাজগুলো আমরা আদায় করে নিতে পারতাম। একটু বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী হলে ভারতীয় তো দূরে থাক মিসরি এবং সুদানিদের জায়গাটাও আমরা নিয়ে নিতে পারতাম। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যোগ্য দক্ষ জনশক্তি রফতানিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন এবং ব্যক্তি নিজেও শুদ্ধ আরবি ভাষা আয়ত্ত করে কর্মক্ষেত্রে যোগাযোগ নৈপুণ্যতার পূর্ণ ব্যবহার করে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবেন। এক্ষেত্রে আরবি শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরা নিজেদের যোগ্যতাকে যাচাই করার সুযোগ নিতে পারেন।
৯. সারা পৃথিবীর দৃষ্টি এখন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আরব দেশগুলোর প্রতি। কেননা প্রতি নিয়ত আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাভারেজ পাচ্ছে এ অঞ্চলের দেশগুলো, বিশেষ করে মিশর, সিরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব, লিবিয়া, লেবানন ও কাতার। এ অঞ্চলগুলো থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত শতাধিক দৈনিক। যেমন মিসরের আল-আহরাম, আল-আখবার, আল-ইয়াওম, আল-জামহুরিয়াহ। সৌদি আরবের আল-বিলাদ, আল-ইকতিসাদিয়া, আল-জাজিরা, আল-মাদিনা, আন-নাদওয়া, আর-রিয়াদ, আল-ওয়াতান, আল-ইয়াওম, ওকায, আশরাক আল-আওসাত, আল-হায়াত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল-বায়ান, আল-ফারজ, আল-ইত্তিহাদ, আল-খালিজ, আল-ওয়াহদা, আল-ওয়াসিত, ইমারাত আল-ইয়াওম, আওরাক প্রভৃতি মধ্যপ্রাচ্যের উল্লেখযোগ্য দৈনিক পত্রিকা। এসব পত্রিকার বৈদেশিক সংবাদদাতা বা ফরেন এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অবারিত সুযোগ রয়েছে আরবি ভাষায় দক্ষ সাংবাদিকদের জন্য। এছাড়াও এসব পত্রিকার বিভিন্ন সংবাদ, সংবাদ বিশ্লেষণ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় অনুবাদ করে স্থানীয় মিডিয়াকে সরবরাহ করার কাজটিও খুবই লোভনীয় হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন একদল দক্ষ আরবি ভাষায় পারঙ্গম সাংবাদিক।
১০. এছাড়াও চলচ্চিত্র শিল্প ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া হতে পারে আরবি ভাষায় পারদর্শীদের জন্য এক উর্বর কর্মক্ষেত্র। বিভিন্ন আরবি নাটক উপন্যাসকে বাংলায় অনুবাদ করে নির্দেশক, পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় ট্রেনিং ও কলা কৌশল আয়ত্ত করা যেতে পারে। আর্টস বা কলার ছাত্রছাত্রীদের জন্য অভিনয়শিল্পও পেশা হিসেবে মন্দ নয়। অথবা অন্য যেকোনো আনুষ্ঠানিক ও দৈনন্দিন কাজের সাথে সহায়ককর্ম হিসেবে শুধুমাত্র অনুবাদক ধর্মী স্ক্রিপ্ট রাইটার হলেও দোষের কিছু নেই। এর জন্য প্রয়োজন শুধু কর্মস্পৃহা আর ভালো আরবি জানা।
১১. বাংলাদেশে আরবি শিক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হলো মাদ্রাসা। এছাড়াও কিছু সরকারি ও বেসরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আরবি পাঠ্যবিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অনুরূপভাবে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও উক্ত ডিগ্রিসহ আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি চালু আছে। পেশা হিসেবে আরবি বিষয়ের শিক্ষকতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মাদ্রাসাগুলোতে আরবি ও অন্যান্য ইসলামি বিষয়ের যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সে জন্য মাদ্রাসাগুলোতে এখন বাংলা, ইংরেজিসহ অন্যান্য সাধারণ বিষয়ের মত কুরআন, হাদিস, আরবি ও ফিকহসহ অন্যান্য ইসলামি বিষয়ের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ অপরিহার্য। এক্ষেত্রে আরবি বিষয়ের পাঠ দানের জন্য কেবলমাত্র সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যক্তিই অধিকতর যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিলে এদেশের আরবি ও ইসলামি শিক্ষায় কাক্সিক্ষত পরিবর্তন আসবে বলে আশা করি। বর্তমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী আরবির ছাত্রছাত্রীদের মাদ্রাসাসহ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ রয়েছে অবারিত। প্রয়োজন শুধু ভালো অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট আর আরবি ভাষায় কাক্সিক্ষত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন।
১২. সারা বাংলাদেশে প্রায় তিন লক্ষ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদে সমসংখ্যক ইমাম বা খতিব কর্মরত আছেন। যাঁরা ইসলামের খেদমতে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। ক্ষেত্র বিশেষে কেউ কেউ আবার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রেখেছেন নিজেকে। একজন ইমাম একাধারে মানুষের নৈতিক, আত্মিক ও ধর্মীয় উন্নয়নে যেমন ভূমিকা রাখেন তেমনিভাবে মানুষের ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাজনৈতিক জীবনেও সমভাবে প্রভাব বিস্তার করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো- এ অঙ্গনেও যোগ্যতম মানুষের অভাব লক্ষ্য করার মতো। অধিকাংশ মসজিদেই দেখা যায় জুমার খুতবাটা পর্যন্ত সেই সনাতনী পদ্ধতিতে বই দেখে দেখে ইমাম সাহেব শুধু রোবটিকভাবে আওড়ে যাচ্ছেন মাত্র। যেমন মুসল্লি তেমন ইমাম। মর্মার্থ উপলব্ধি সবারই সাধ্যাতীত। অথচ কর্তব্য হলোÑ ইমাম সাহেব দেশ রাষ্ট্র সমাজ বা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে সময়োপযোগী বক্তব্য দেবেন যাতে মহান আল্লাহর প্রশংসা, রাসূল সা.-এর প্রতি দরূদ এবং কুরআন-হাদিস অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এবং খুতবাটি হবে আরবি ভাষায়। তবে আরবিদুর্গম্য মুসল্লিদের কথা চিন্তা করে ইমাম সাহেব বাংলা ভাষায় তাঁর বক্তব্যের সারাংশটুকু খুতবার নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই মসজিদে সাধারণভাবে উপস্থাপন করবেন। একথা অনস্বীকার্য যে একটি ইতিবাচক তাওহিদি সমাজ বিনির্মাণে একজন যোগ্য ইমামের বিকল্প কিছু হতে পারে না। তাই সমাজ বদলের ব্রত নিয়ে গতানুগতিক ইমামতির ধারাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের দূরদর্শী ছাত্ররা।
১৩. সরকারি-বেসরকারি অনুবাদ সেন্টারগুলোতে আরবি ভাষার ছাত্রদের কাজের সুযোগ রয়েছে অবারিত। এসব অনুবাদ সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন ব্যক্তিগত, অফিসিয়াল ডকুমেন্ট ছাড়াও অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য সংক্রান্ত কাগজপত্রাদি অনুবাদের কাজ হয়ে থাকে। এছাড়াও অনেক সময় নামিদামি সব প্রকাশনা সংস্থা বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য ও বিখ্যাত বই অনুবাদের কাজ দিয়ে থাকে। এসব অনুবাদ সেন্টারেও আরবিতে দক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরা খণ্ডকালীন বা স্থায়ীভাবে কাজ জোগাড় করে নিতে পারে। অভিজ্ঞতা অর্জনের পর নিজের নামে লাইসেন্স করে একটি অনুবাদ সেন্টারের গর্বিত মালিক হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়।
১৪. বাংলাদেশের সকল চাকরিতে আরবির ছাত্রছাত্রীরা অন্যান্য সকল সাবজেক্টের মতোই সমান সুযোগ লাভ করে থাকে। যে সকল চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর পাসের শর্ত থাকে সে সকল চাকরিতে অন্যান্য সকল সাবজেক্টের মত আরবির ছাত্রছাত্রীরাও সমানভাবে আবেদন করতে পারে। সকল চাকরির পরীক্ষাতেই যেহেতু বাংলা, ইংরেজি, গণিত-সাধারণ জ্ঞান আবশ্যিক বিষয় হিসেবে থাকে তাই সংশ্লিষ্ট এই তিনটি ডিপার্টমেন্ট ছাড়া অবশিষ্ট অন্যদের জন্য তেমন কোনো বিশেষ সুবিধা থাকে না। তাই এখানে সকলকে নিজ নিজ যোগ্যতারই স্বাক্ষর রাখতে হয়। তাই এ ক্ষেত্রে আরবির ছাত্রছাত্রীদের আরবি বিষয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞানও সমান্তরালভাবে রাখতে হবে। তবেই সরকারি-বেসরকারি সকল চাকরির ক্ষেত্রেই সফলতা পদযুগল স্পর্শ করবে।
১৫. আরবির ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বাস করে রিজিক এবং সম্মানের চূড়ান্ত মালিক হলেন আল্লাহ তায়ালা। এই বিশ্বাসের ওপর অবিচল থেকেই তারা যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে থাকে নিরন্তর। এ জন্যই আমরা দেখতে পাই শেষ পর্যন্ত কেউই বেকার বা কর্মহীন থাকে না। আরবির সাথে সম্পৃক্ত সকলের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হলো নিজেকে দুনিয়া ও আখেরাতের যোগ্য করে গড়ে তোলা। এবং মহান আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী নিজের অংশটুকু পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে এ দুনিয়া থেকেই বুঝে নিতে হবে- ‘লা তানছা নাছিবাকা মিনাদ দুনিয়া’। ভুলে গেলে চলবে না।
পরিশেষে বলতে চাই আরবিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ আল্লাহ তায়ালা আরবিকে সহজ করে দিয়েছেন বিশ্ববাসীর জন্য। একই সাথে যুগপৎ আরবির দুই বৈশিষ্ট্য- সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ। তাই আরবির কাছে আসতে হবে ভালোবেসে, মন দিয়ে তাকে আঁকড়ে ধরতে হবে। বিশ্বকে জয় করতে হবে আরবিকে ভিত্তি করে, কারণ আরবি আরবের, আরবি আজমের। যার প্রমাণ মেলে ইবনুল মুকাফ্ফা, ইমাম গাজ্জালী, ইমাম বুখারী, আবুল হাসান আলী নদভী আর সুলতান যাওক নদভীর মতো আজমী মানুষদের সৃষ্টিকর্মে। তাই অগ্রগতি, উন্নয়ন আর আরব আজমের সম্প্রীতি- সহমর্মিতার প্রত্যাশায় এবারের আন্তর্জাতিক আরবি ভাষা দিবসের প্রতিপাদ্য হলো- ‘তা’যিযু ইনতিশারিল লুগাতিল আরাবিয়্যাহ’ অর্থাৎ আরবি ভাষার বিস্তৃতিকে ত্বরান্বিত ও শক্তিশালীকরণ। পৃথিবীর সর্বত্র আরবি ভাষাকে পৌঁছে দেয়ার এ মহতী ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।

লেখক : শিক্ষাবিদ

SHARE

Leave a Reply