বাংলায় দিল্লির শাসনের সূত্রপাত মুসলিমদের হাতে আহমেদ আফগানী

বাংলায় দিল্লির শাসন প্রতিষ্ঠা হয় ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর হাত ধরেই। তিনি বিহার, বাংলা ও তদসংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নির্যাতিত মানুষের আহবানে সাড়া দিয়ে জয় করে নেন। এরপর তিনি দিল্লির শাসক সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের সাথে দেখা করেন এবং নিজেকে সমর্পণ করেন। কুতুবুদ্দিন খুশি হন এবং এই অঞ্চলের শাসনভার তার হাতে অর্পণ করেন। এরপর প্রায় একটানা ১৩৬ বছর দিল্লির অধীনে ছিল বাংলা।
বখতিয়ার খলজী একজন সুশাসক ছিলেন। তিনি তার রাজ্যকে কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করেন এবং সেগুলোর শাসনভার তার প্রধান অমাত্য ও সামরিক প্রধানদের ওপর ন্যস্ত করেন। তাদেরকে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা, রাজস্ব আদায় করা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং জনগণের পার্থিব ও নৈতিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি লখনৌতিতে রাজধানী স্থাপনের পর খুতবা পাঠ করেন এবং দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেকের নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। তিনি দিনাজপুর ও রংপুরের নিকট দুটি ছাউনি শহর নির্মাণ করেন। তার সময়ে প্রচলিত প্রশাসনিক বিভাগকে ইকতা এবং এর শাসনকর্তাকে মুকতা বলা হতো। তিনি বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন।১
কুতুবুদ্দিন আইবেক মধ্য এশিয়ার কোনো এক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন; তার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন তুর্কি। শিশুকালেই তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। তাকে ইরানের খোরাসান অঞ্চলের নিসাপুরের প্রধান কাজী সাহেব কিনে নেন। কাজী তাকে তার নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন এবং আইবেককে তিনি ভালো শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি আইবেককে ফার্সি এবং আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলেন। তিনি আইবেককে তীর এবং অশ্বচালনায়ও প্রশিক্ষণ দেন। আইবেকের প্রভুর মৃত্যুর পরে প্রভুর ছেলে আইবেককে আবারও এক দাস বণিকের কাছে বিক্রি করে দেন। কুতুবুদ্দিনকে এবার কিনে নেন গজনির গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ ঘুরি।২
মোহাম্মদ ঘুরির কোনো সন্তান না থাকায় তার প্রিয় সন্তানের মতো কুতুবুদ্দিন আইবেকই হন দিল্লির শাসনকর্তা। তিনিই প্রথম দিল্লিকে রাজধানীতে পরিণত করেন। তিনি মামলুক সালতানাতের প্রতিষ্ঠাতা। মামলুক সালতানাত ১২০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্য-এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক মামলুকদের উত্তর ভারতে নিয়ে আসেন। দিল্লি সালতানাত শাসনকারী পাঁচটি রাজবংশের মধ্যে মামলুক রাজবংশ প্রথম। এর শাসনকাল ছিল ১২০৬ থেকে ১২৯০ সাল পর্যন্ত। ঘুরি রাজবংশের প্রতিনিধি শাসক হিসেবে কুতুবুদ্দিন আইবেক ১১৯২ থেকে ১২০৬ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় তিনি গাঙ্গেয় অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করেন এবং নতুন অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
কুতুবুদ্দিন আইবেক দিল্লির প্রাচীন মুসলিম স্মৃতিস্থাপনাগুলোর নির্মাণ তিনি শুরু করেন। এর মধ্যে রয়েছে কুয়াত-উল-ইসলাম মসজিদ ও কুতুব মিনার। ১২১০ সালে তিনি পোলো খেলার সময় ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান। লাহোরের আনারকলি বাজারের কাছে তাকে দাফন করা হয়। এরপর শাসক হন আরাম শাহ। আরাম শাহ কুতুবুদ্দিনের সাথে কী সম্পর্কিত এই নিয়ে দ্বিমত আছে ঐতিহসিকদের মধ্যে। কেউ বলেছেন ভাই, কেউ বলেছেন ছেলে। যাই হোক আরাম শাহের ক্ষমতায় বেশিদিন ছিলেন না। চিহালগনি নামে পরিচিত ৪০ জন অভিজাত ব্যক্তির একটি দল আরামশাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এবং তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বাদাউনের গভর্নর শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশকে আমন্ত্রণ জানায়। ১২১১ সালে ইলতুৎমিশ আরামশাহকে দিল্লির নিকটে জুদের সমতল ভূমিতে পরাজিত করেন।
ইলতুৎমিশ দক্ষ শাসক ছিলেন। তিনি মুলতানের নাসিরউদ্দিন কাবাচা ও গজনির তাজউদ্দিন ইলদুজকে পরাজিত করে। এই দুজন দিল্লির প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তার শাসনামলে মোঙ্গলরা জালালউদ্দিন খোয়ারিজম শাহর খোঁজে ভারত আক্রমণ করে। ইলতুৎমিশ শত হাতে মোঙ্গলদের প্রতিহত করেন। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর ইলতুৎমিশ হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উত্তর ভারতে তার নিয়ন্ত্রণ মজবুত করেন। ১২৩০ সালে তিনি মেহরাউলিতে হাউজ-ই-শামসি নামক জলাধার নির্মাণ করেন। ১২৩১ সালে তিনি দিল্লিতে প্রথম মুসলিম সমাধি ‘সুলতান গারি’ নির্মাণ করেন।৩
ইলতুৎমিশের কন্যা রাজিয়া সুলতানা ছিলেন ভারতের প্রথম মুসলিম নারী শাসক। তিনি অভিজাত ব্যক্তিদের সাথে সমঝোতায় আসতে সক্ষম হন এবং সালতানাত পরিচালনায় সফল ছিলেন। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত জামালউদ্দিন ইয়াকুতের সাথে তার সহযোগিতার কারণে মধ্য এশিয়ার তুর্কীয় বংশোদ্ভূত অভিজাতরা তার বিরূপ হয়ে পড়ে। এ ছাড়া নারী স¤্রাজ্ঞীর শাসনকে তারা নেতিবাচক হিসেবে দেখতেন। ক্ষমতাশালী অভিজাত মালিক আলতুনিয়া তাকে পরাজিত করেছিলেন। রাজিয়া সুলতানা তাকে বিয়ে করতে সম্মত হয়েছিলেন। রাজিয়ার ভাই মুইজউদ্দিন বাহরাম চিহালগনিদের সহায়তায় সিংহাসন দখল করেন এবং রাজিয়া ও তার স্বামীর সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেন। পরাজিত হয়ে তারা কাইথাল পালিয়ে যান। তাদের সাথে থাকা অবশিষ্ট সৈনিকরা এরপর তাদের ত্যাগ করে। তারা দু’জনেই জাটদের হাতে ধৃত হন। ১২৪০ সালের ১৪ অক্টোবর তাদের হত্যা করা হয়। এরপর কিছুদিন বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্য দিয়ে যায়।৪
১২৪৬ সালে ইলতুৎমিশের আরেক ছেলে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ক্ষমতা দখল করেন। নাসিরউদ্দিন মাহমুদ ধার্মিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অধিকাংশ সময় তিনি নামাজ এবং দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা করতেন। তার অধীনস্থ গিয়াসউদ্দিন বলবন রাষ্ট্রীয় বিষয় দেখাশোনা করতেন। তিনি ও গিয়াসউদ্দিন বলবন দিল্লি সালতানাতে শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। প্রায় ২০ বছর শাসক থাকার পর নাসিরউদ্দিন মাহমুদের মৃত্যু হয়। তারপর ১২৬৬ সালে গিয়াসউদ্দিন বলবন শাসক হন। তিনি ১২৮৭ পর্যন্ত শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন।
গিয়াসউদ্দিন বলবন কঠোর হস্তে শাসন পরিচালনা করেন। তিনি চিহালগনিদের প্রভাব খর্ব করেন। ভারতে তিনি শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইচ্ছুক ছিলেন। বিশৃঙ্খল অঞ্চলগুলোতে তিনি অনেক চৌকি নির্মাণ ও সেনা মোতায়েন করেন। আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য তিনি সফল গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। এরপর আর উল্লেখযোগ্য মামলুক সুলতান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেননি। এরপর শুরু হয় দিল্লির দ্বিতীয় সালতানাত খিলজী রাজবংশ।
খিলজী সালতানাত
খিলজী রাজবংশ হলো মধ্য যুগের মুসলিম রাজবংশ যারা ১২৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতের বিশাল অংশ শাসন করত। জালাল উদ্দিন ফিরোজ খিলজী এর প্রতিষ্ঠাতা। খিলজী শাসনামল অবিশ্বাস, হিং¯্রতা এবং দক্ষিণ ভারতে তাদের শক্ত অভিযানের জন্য খ্যাত হলেও খিলজী শাসনামল মূলত ভারতে বর্বর মোঙ্গলদের বারবার অভিযান রুখে দেয়ার জন্য সুপরিচিত।
খিলজীরা ছিল দিল্লির মামলুক রাজবংশের সামন্ত এবং দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের সেনাপতি। বলবনের উত্তরাধিকারীদের ১২৮৯-১২৯০ সালে হত্যা করা হয় এবং এর পরপরই মামলুকদের মধ্যে ক্ষমতা নিয়ে কোন্দল শুরু হয়ে যায়। এই কোন্দলের মধ্যে জালালউদ্দিন ফিরোজ খিলজীর নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং মামলুকদের বংশের শেষ উত্তরাধিকারী ১৭ বছর বয়সী মুইজ উদ দিন কায়কোবাদকে অপসারণ করে তিনি দিল্লির সালতানাতে অধিষ্ঠিত হন।
জালালউদ্দিন খিলজী একজন প্রজাদরদি এবং বিনয়ী সুলতান ছিলেন। তুর্কি অভিজাতদের বিরুদ্ধাচরণ সত্ত্বেও তিনি ১২৯০ সালে দিল্লির মসনদে বসেন। জালাল উদ্দিনের এই আরোহণ সবাই মেনে নিতে পারেনি। তার ছয় বছরের শাসনে বলবনের ভাইপো মামলুকদের প্রতি অনুগত সামরিক অধিনায়কদের নিয়ে বিদ্রোহ করে। জালালউদ্দিন এই বিদ্রোহ রুখে দেন। তিনি তার ভাইপো জুনা খানকে সাথে নিয়ে মধ্য ভারতের সিন্ধু নদী তীরে মোঙ্গল বাহিনীকে সফলভাবে প্রতিহত করেন।
জালালউদ্দিন খিলজীর মৃত্যুর পর আলাউদ্দিন খিলজী (জুনা খান) দিল্লির মসনদে বসেন। তিনি ছিলেন জালাল উদ্দিন খিলজীর ভাইপো এবং জামাতা। আলাউদ্দিন খিলজী হিন্দু রাজ্য মহারাষ্ট্রের রাজধানী দেবগিরি অধিকার করেন।
আলাউদ্দিন খিলজী প্রায় বিশ বছর এই উপমহাদেশ শাসন করেন। তিনি ভারতের গুজরাটের রাজা কর্ণদেব, রণ-থম্ভোরের রাজপুত নেতা হামির দেব, মেবারের রাজা রতন সিং ও মালবের অধিপতি মহ্লক দেবকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে অভিযান প্রেরণ করেন। কাফুর দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র, বরঙ্গলের কাকতীয়রাজ প্রতাপ রুদ্র, দোরসমুদ্রের হোয়্সলরাজ তৃতীয় বল্লালকে পরাজিত করবার পর ভ্রাতৃবিরোধের সুযোগ নিয়ে পান্ড্য রাজ্য অধিকার করেন। এরপর তিনি রামেশ্বর পর্যন্ত অগ্রসর হন।
আলাউদ্দিন খিলজী অবশ্য দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো সরাসরি সা¤্রাজ্যভুক্ত না করে সেখানকার রাজাদের মৌখিক আনুগত্য ও করদানের প্রতিশ্রুতি নিয়েই করদ রাজ্যে (কর দিতে স্বীকৃত) পরিণত করেন। বিজেতা হিসাবে আলাউদ্দিন খিলজী ছিলেন দিল্লির সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আলাউদ্দিনের দৃঢ়তা ও তার অসম সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধকৌশলের কারণে তিনি ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে আছেন। এ ছাড়াও তিনি দু’বার ভারতের দিকে ধেয়ে আসা মোঙ্গল বাহিনীকে সফলভাবে প্রতিহত করেন।৫

আলাউদ্দিন খিলজী কয়েকটি কারণে বিখ্যাত
১. কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালীকরণ। যে কোনো নির্দেশ বা আইন অল্প সময়ের মধ্যে সারা রাজ্যে তিনি বাস্তবায়ন করতে পারতেন।
২. বাজারদর নিয়ন্ত্রণ। তার শাসনামলে তিনি ব্যবসায়ীদের জনগণের স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতেন। মজুদদারি ও প্রতারণা বন্ধ করেছেন। ব্যবসায়ীরা যাতে মূল্যের বেশি টাকা দাবি না করে, তার জন্য তিনি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। বিষয়টির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলে ‘শাহানা-ই-মান্ডি’ ও ‘দেওয়ান-ই-রিসালাত’ -এর উপর।
৩. জমি জরিপ ও রাজস্ব সংস্কার। দিল্লির সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম জমি জরিপ করে রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার করেছিলেন। দেশে যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে সেদিকেও তিনি নজর দেন। অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান দেয়া হতো। গুপ্তচরদের মাধ্যমে তিনি দেশের সমস্ত খবরাখবর রাখতেন। তিনি এক সুদৃঢ় ও কঠোর শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে দিল্লি সালতানাতকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।
৪. বর্বর মোঙ্গলদের রুখে দিয়েছিলেন তিনি। তাদের শোচনীয়ভাবে প্রতিহত করেছিলেন।
১৩১৫ সালের ডিসেম্বরে আলাউদ্দিন খিলজীর মৃত্যু হয়। এর পরপরই সা¤্রাজ্য জুড়ে বিশৃঙ্খলা, একে অপরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান, গুপ্তহত্যা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি মালিক কাফুর নিজেকে সুলতান দাবি করে বসে। কিন্তু আমিরদের সম্মতি থাকায় তিনি মসনদ ধরে রাখতে পারেননি এবং কয়েক মাসের মধ্যে তাকেও হত্যা করা হয়।
পরবর্তী তিন বছরে একের পর এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনজন সুলতান দিল্লির মসনদে বসেন। নানান গোলযোগের পর সেনাপ্রধান গাজী মালিক বিশাল বাহিনী নিয়ে দিল্লিতে অভ্যুত্থান ঘটান এবং দিল্লির মসনদ নিজ দখলে নেন। এরপর তিনি নিজের নাম বদলে গিয়াস উদ্দিন তুঘলক নাম ধারণ করেন এবং তুঘলক রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন।

তুঘলক সালতানাত
সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক প্রজাহিতৈষী ছিলেন। তিনি ভূমিকর হ্রাস করে উৎপন্ন ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগে নামিয়ে আনলেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় খরচে সা¤্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় কৃষিকাজে সেচের জন্য খাল খনন করেন। সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের অমর কীর্তি হচ্ছে তাঁরই নির্মিত তুঘলকাবাদ। পুরো শহরটি গোলাপি রঙের গ্রানাইট পাথর দ্বারা তৈরি করা হয়েছিলো। নিরাপত্তার জন্য শহরটি উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিলো। এই প্রাচীরগুলোকেও দেখলে অনেকটা দুর্গের মতো মনে হয়।
১৩২৩ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক তেলেঙ্গানার কাকতীয় রাজা প্রতাপ রুদ্রের বিরুদ্ধে একটি অভিযান চালান। কাকতীয় রাজ্যের রাজধানী ওয়ারঙ্গল দখল করে এর নাম রাখা হলো সুলতানপুর। পুত্র জুনাহ খানের নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যেও তিনি একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। সে সময় বাংলায় বিভিন্ন স্বাধীন সুলতানদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো। সুলতান গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে দিল্লি সালতানাতের অধীনে নিয়ে আসতে চাইলেন। ১৩২৪ সালে তিনি বাংলায় অভিযান চালান এবং সফল হন।৬
১৩২৫ সালে গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র উলুগ খাঁ জুনাহ খান দিল্লির রাজসিংহাসনে বসেন। ইতিহাসে তুঘলক বংশের এই শাসক মুহাম্মদ বিন তুঘলক নামেই বেশি প্রসিদ্ধ। ‘মুহাম্মদ বিন তুঘলক’ নামের মানে হচ্ছে তুঘলকের পুত্র মুহাম্মদ। ১৩২৫ সালে সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সিংহাসনে আরোহণের পর হিন্দুস্তান যেন এক নতুন যুগে প্রবেশ করলো। তিনি শাসনব্যবস্থায় অনেকগুলো সংস্কার নিয়ে আসেন, তা¤্রমুদ্রা প্রচলন করেন এবং রাজধানী স্থানান্তর করেন। মুহাম্মদ বিন মুহাম্মদ যুক্তি, দর্শন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞানে একজন পণ্ডিত ছিলেন এবং শারীরিক বিজ্ঞান এবং ঔষধবিজ্ঞানে তার ভালো ধারণা ছিল। এ ছাড়াও তার্কিশ, আরবি, ফার্সি এবং উর্দু ভাষা তার আয়ত্তে ছিল। মুলতানে জন্মগ্রহণকারী তুগলক বংশের এই শাসক সম্ভবত মধ্যযুগের সবচেয়ে শিক্ষিত, যোগ্য ও দক্ষ সুলতান ছিলেন। একমাত্র বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা তার শাসনামলের সমালোচনা করেন। আল্লামা গোলাম মর্তুজার মতো অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন ব্যক্তিগণ বিদ্বেষের কারণেই তিনি এমনটা লিখেছেন।
তার আমলেই বাংলা দিল্লি থেকে আলাদা হয়ে যায় শাহ-ই-বাঙ্গালাহর নেতৃত্বে। মুহাম্মদ বিন তুঘলক ১৩৫১ সাল পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার চাচাতো ভাই ফিরোজ শাহ তুঘলক দিল্লির ক্ষমতায় আসীন হন। এদিকে বাংলা, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নেপাল, আরাকানের অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত হয় বাংলা সালতানাত। ১৩৪২ সালে সেনাপতি শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ নিজেকে লখনৌতির সুলতান ঘোষণা করেন। তিনি অন্যান্য স্বাধীন রাজ্যসমূহও জয় করার মাধ্যমে নিজের শাসন সংহত করেন এবং ১৩৫২ সালে নিজেকে স্বাধীন বাংলার সুলতান ঘোষণা করেন। এজন্য তাকে শাহ-ই-বাঙ্গালাহ বলা হয়ে থাকে।
লেখক : ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট
তথ্যসূত্র :

১. বখতিয়ার খলজী / বাংলাপিডিয়া / https://bit.lz/2kcRpOO/ অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
২. ইতিহাসের ইতিহাস / গোলাম আহমেদ মোর্তজা / পৃ. ৬৬-৬৯
৩. মোগল সাম্রাজ্যের সোনালি অধ্যায় / সাহাদত হোসেন খান / পৃ. ২৪
৪. মোগল সাম্রাজ্যের সোনালি অধ্যায় / সাহাদত হোসেন খান / পৃ. ২৬
৫. তারিখ ই ফিরুজশাহী / জিয়াউদ্দিন বারানী / দিব্য প্রকাশ /
পৃ. ২০২-২১০
৬. তারিখ ই ফিরুজশাহী / জিয়াউদ্দিন বারানী / দিব্য প্রকাশ /
পৃ. ৩৩৭-৩৪০

SHARE

Leave a Reply