বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শাসন ও শোষণের প্রকৃত রূপ -আহমেদ আফগানী

সম্রাট অশোক ও মৌর্য সাম্রাজ্যের কথা আমরা গত সংখ্যায় জেনেছি। তার মৃত্যুর পর মৌর্য সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন শাসক শাসন করতে থাকেন। বাংলা, বিহার, নেপাল এই অঞ্চল শেষ পর্যন্ত মৌর্যদের অধীনে ছিলো। মৌর্যদের শেষ শাসক ছিলেন বৃহদ্রথ।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫ অব্দে মৌর্য রাজবংশের শেষ রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে পুষ্যমিত্র রাজা হন। এই সূত্রে মৌর্য সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় শুঙ্গ-রাজবংশের শাসন। হর্ষচরিত মতে, সেনা পরিদর্শনকালে সেনাপতি পুষ্যমিত্র সম্রাট বৃহদ্রথকে হত্যা করে সিংহাসন অধিকার করেন। তাঁর পুরো নাম পুষ্যমিত্র শুঙ্গ। এই কারণে তার এবং তার উত্তরাধিকারদের রাজত্বকালকে শুঙ্গ রাজত্বকাল বলা হয়। পুষ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্যদের সেনাপতি থাকলেও তিনি ছিলেন একজন আর্য ও ব্রাহ্মণ। মৌর্যদের সাথে তার বিবাদের মূল কারণ তার ধর্মীয় পার্থক্য। শেষদিকের সব মৌর্য সম্রাটই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন যেটা আর্য তথা ব্রাহ্মণদের চক্ষুশূল ছিলো।১

শুঙ্গ সাম্রাজ্যের মাধ্যমেই শুরু হয় ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শাসন
শুঙ্গ সাম্রাজ্য প্রায় ১১০ বছর স্থায়ী হয়। এই সময়ে তারা একেশ্বরবাদী বৌদ্ধদের উপর ভয়ঙ্কর নির্যাতন করে। প্রায় সব ঐতিহাসিক মনে করেন পুষ্যমিত্র বৌদ্ধদের ওপর অত্যাচার করতেন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের মাধ্যমে এইসময় বৌদ্ধধর্মকে কাশ্মীর, গান্ধার ও ব্যাকট্রিয় অঞ্চলে তাড়িয়ে দেন। দিব্যবদান গ্রন্থের অশোকবদান, প্রাচীন তিব্বতী ঐতিহাসিক তারানাথের রচনা প্রভৃতি বৌদ্ধশাস্ত্রের মাধ্যমে বৌদ্ধদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী পাওয়া যায়। শুঙ্গ রাজারা বৌদ্ধ মঠ পুড়িয়ে দেন, বৌদ্ধস্তূপগুলি ধ্বংস করেন, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের নির্বিচারে হত্যা করেন এবং তাদের মাথার জন্য পুরস্কার ধার্য করেন।২
অশোকবদানে উল্লেখ রয়েছে, পুষ্যমিত্র চারশ্রেণীর সেনা সজ্জিত করেছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মকে ধ্বংস করার জন্যে তিনি কুক্কুতরম (পাটলিপুত্রে) যাত্রা করেছিলেন….। অতঃপর পুষ্যমিত্র সংঘরম ধ্বংস করলেন, সেখানকার সন্ন্যাসীদের হত্যা করলেন, এবং সেখান থেকে প্রস্থান করলেন….। কিছু সময় পর, তিনি শাকলে উপনীত হলেন এবং ঘোষণা করলেন যে ব্যক্তি তাঁকে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর মাথা উপহার দিতে পারবে তিনি তাকে পুরস্কৃত করবেন।” (দিব্যবদান গ্রন্থের অশোকবদান : ২৯৩)৩
ভারতীয় পৌরাণিক সূত্রও, যেমন, ভবিষ্য পুরাণের প্রতিসর্গ পর্বে মৌর্য যুগের পর ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের কথা বলা হয়েছে এবং সেখানে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধধর্মাবলম্বীকে হত্যার কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। এই সময়ে কাণ্বকুব্জ নামক সর্বশ্রেষ্ঠ এক ব্রাহ্মণ অর্বুদ পর্বতের শিখরে বলিযজ্ঞের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। বৈদিক মন্ত্রের প্রভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান (বলি) থেকে চারজন ক্ষত্রিয়ের আবির্ভাব হয়। (…) তারা অশোককে তাদের অধীনে রাখেন এবং সকল বৌদ্ধদের নির্মূল করেন। মনে করা হয়, সেখানে ৪০ লক্ষ বৌদ্ধ ছিলেন এবং তাদের সকলকে হত্যা করা হয়।৪
পুষ্যমিত্র ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের আধিপত্য এবং পশুবলি (যজ্ঞ) পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন বলে জানা যায়; এই পশুবলি অশোকের সময় থেকে নিষিদ্ধ ছিলো করেছিলেন। শুঙ্গ রাজবংশের সময় আর্যরা তাদের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলা অঞ্চলে দ্রাবিড় ও বৌদ্ধদের সকল পাঠশালা বন্ধ ও ধ্বংস করে। সেখানে তারা তাদের বিদ্যালয় স্থাপন করে। বাংলা থেকে একেশ্বরবাদের অনুসারীদের নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া শুঙ্গ আমল থেকে শুরু হয়।
দেবভূতি ছিলেন শুঙ্গ রাজবংশের শেষ সম্রাট। শুঙ্গ সম্রাট ভগভদ্রের পরে তিনি ৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সিংহাসন দখল করেন। দেবভূতি একজন দুশ্চরিত্র শাসক ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি বেদশাস্ত্র অনুসারে না চলে ইচ্ছেমত চলতেন। ফলে তার ব্রাহ্মণ মন্ত্রী বাসুদেব কাণ্ব তাঁকে হত্যা করে শাসনক্ষমতা দখল করেন। যার ফলে শুঙ্গ রাজবংশের শাসনের অবসান ঘটে ও কাণ্ব রাজবংশের শাসন শুরু হয়। শাসনের প্রকৃতি অনুসারে শুঙ্গ ও কাণ্ব রাজাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য ছিলো না। তারা উভয়েই ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলেন। কাণ্ব বংশে ৪ জন রাজা ছিলেন। তারা খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন। সাতবাহন শাসক দ্বারা তাদের পরাজয় হয়।
মৌর্য শাসনামলের সময় ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ভিত্তিক সামন্তরাজা সাতবাহনরা মৌর্যদের অনুগত ছিলো। অশোকের মৃত্যুর পর তারা স্বাধীনভাবে দক্ষিণ ভারত শাসন করতো। তাদের হাতে বাংলা দখল হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সালে এবং কাণ্বরা পরাজিত হয়। সাতবাহনের রাজারা নিজেদের ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্য দাবি করলেও তারা বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের ব্যাপারে ছিলো বেশ উদার।

কুষাণ সাম্রাজ্য ও বৌদ্ধধর্মের বিকৃতির ইতিহাস
চীনের উত্তর-পশ্চিম অংশে ইউ-চি নামে এক যাযাবর জাতি বাস করতো। হিউঙ-নু নামে অপর এক যাযাবর জাতির তাড়া খেয়ে তারা সির দরিয়া নদী তীরবর্তী অঞ্চলে এসে সেখান থেকে শকদের বিতাড়িত করে বসবাস করতে শুরু করে। কিন্তু হিউঙ-নুরা এই অঞ্চল থেকেও তাদের উৎখাত করায় তারা আবার শকদের যারা ইতঃপূর্বে তাদের তাড়া খেয়ে ব্যাকট্রিয়ায় বসতি স্থাপন করেছিল তাদের উৎখাত করে। পূর্বের সেই ব্যাকট্রিয়ার বর্তমান নাম বলখ। এটি বর্তমানে আফগানিস্তানের উত্তর দিকের একটি প্রদেশ।
ব্যাকট্রিয়ায় আসার পর ইউ-চিদের দলগত সংহতি বিনষ্ট হয় ও তারা পাঁচটি পৃথক শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়। কুষাণরা ছিল এই পাঁচ গোষ্ঠীর অন্যতম। চৈনিক ঐতিহাসিক সুমা-কিয়েনের মত অনুযায়ী কুজল কদফিসেস নামে জনৈক ইউ-চি ঐ পাঁচটি গোষ্ঠীকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করেন ও ভারতে প্রবেশ করে কাবুল ও কাশ্মীর দখল করেন। এই কুজুল কদফিসেস ছিলেন কুষাণ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। কুজুল কদফিসেস মারা গেলে তাঁর পুত্র বিম কদফিসেস রাজা হন।
কণিষ্ক ছিলেন কুষাণ বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁর সঙ্গে কুজুল ও বিম কদফিসেসের কী সম্পর্ক ছিল, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। অনেকে মনে করেন তাঁর সঙ্গে এই বংশের প্রথম দুটি রাজার সঙ্গে কোনো রক্তের সম্পর্ক ছিল না। কণিষ্কের আমলেই কুষাণ সাম্রাজ্য সর্বাপেক্ষা বেশি বিস্তার লাভ করে ও উত্তর ভারতের ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কণিষ্কের সিংহাসন আরোহণের তারিখ সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে অধিকাংশ পণ্ডিতই মনে করেন ৭৮ খ্রিস্টাব্দে “শকাব্দ” নামে যে বর্ষগণনা শুরু হয়, কণিষ্ক ছিলেন তার প্রবর্তক। এই সূত্র অনুসারে কণিষ্ক ৭৮ খ্রিস্টাব্দেই সিংহাসনে আরোহণ করেন।৫
কণিষ্কের শাসনের সময়ই বাংলা কুষাণদের অধিকারে আসে। হিউয়েন সাঙের মতে কণিষ্কের বিশাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পুরুষপুর বা বর্তমান পেশোয়ার এবং এর বিস্তৃতি ছিলো উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে সাঁচী ও পশ্চিমে সিন্ধু উপত্যকা থেকে পূর্বে বারাণসী পর্যন্ত।
বলা চলে সাতবাহন সাম্রাজ্য ও কুষাণ সাম্রাজ্যের মাঝামাঝি অবস্থান করেছে বাংলা অঞ্চল। ফলশ্রুতিতে কোনো সাম্রাজ্যেরই ভালো প্রভাব বিস্তার হয়নি এখানে। কেন্দ্রীয় শাসনের দুর্বলতার সুযোগে এখানে স্থানীয় জমিদার প্রথা চালু হয়েছে। কিছু অংশ প্রাচীন দ্রাবিড় গোষ্ঠী, কিছু বৌদ্ধরা ও কিছু অংশ ব্রাহ্মণ জমিদাররা শাসন করতো।
ভারতের ইতিহাসে কণিষ্কের স্থান ও গুরুত্ব অবশ্য কেবল মাত্র একজন কৃতী ও দক্ষ সেনানায়ক হিসাবে নয়। বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে ও ভারতীয় সংস্কৃতিতে তাঁর অবদানের জন্যই কণিষ্ক চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি নিজে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন ও পুরুষপুরে একটি বহতল চৈত্য নির্মাণ করেন। অশোকের পর তার সময়েই বৌদ্ধধর্ম পুনরায় রাজানুগ্রহ লাভ করে। এর ঢেউ পড়ে বাংলাতেও। শুঙ্গ ও কাণ্ব শাসনের সময় পালিয়ে যাওয়া বৌদ্ধরা আবার বাংলায় ফিরে আসে এবং বগুড়ার মহাস্থানগড় তথা পুন্ড্রনগরে পুনরায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে।৬
ভারতের বাইরে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে কণিষ্ক সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বৌদ্ধধর্ম খোটান, চীন, জাপান ও কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে কণিষ্ক ছিলেন দ্বিতীয় অশোক। বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হলেও কণিষ্ক অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল ছিলেন বলে ইতিহাসে স্বীকৃত।
সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে কণিষ্ক উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। বুদ্ধচরিত রচয়িতা অশ্বঘোষ, বৌদ্ধ দার্শনিক নাগার্জুন, বৌদ্ধ সাহিত্যিক বসুমিত্র, স্বনামধন্য চিকিৎসক চরক, স্থপতি এজেসিলাস রাজনীতিবিদ মাথর প্রভৃতি মনীষীগণ তাঁর রাজত্ব কালেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার, স্তূপ ও চৈত্য নির্মাণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তাঁরই সময়ে সারনাথ, মথুরা, গান্ধার ও অমরাবতীতে চারটি পৃথক শিল্পরীতির আবির্ভাব ঘটেছিল। তবে বৌদ্ধ ধর্মের বিকৃতিও ঘটে কুষাণদের সময়ে। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী কিছু কিছু বৌদ্ধ মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিছু বৌদ্ধ গোষ্ঠী বহু-ঈশ্বরবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়ে। কুষাণ আমলেই বুদ্ধের প্রতিমা তৈরির রীতি শুরু হয়।৭
কুষাণ আমলে মানবপুত্র বুদ্ধকে বসানো হয় ভগবানের আসনে। বুদ্ধের মূল দর্শনে আনা হয় দেবতা এবং মিথের সমষ্টি। বুদ্ধের দর্শন বিকৃতিতে যোগ হল স্বর্গ, নরক, জাতক, বুদ্ধের জন্ম মৃত্যুর নানা কাহিনী নিয়ে হাজারো মিথ। তৎকালীন মানুষ ধ্যান সাধনা পরিত্যাগ করে জাঁকজমকভাবে বুদ্ধের পূজায় লিপ্ত হলেন। শুরু হল মহাজন এবং তন্ত্রজান বুদ্ধ ধর্মের ধারনি, মঞ্জুশ্রী মূল কল্প, গুহ্য সমাজ, চক্র সংবর, তৎকালীন ব্রতশ্চারন, বলি পূজা, পুরশ্চরণ ইত্যাদি তপ-জপ ও তন্ত্র-মন্ত্রের প্রভাবে বৌদ্ধ ধর্ম আজকের রূপে এসে পৌঁছাল। যাতে হারিয়েছে গেছে বৌদ্ধ দর্শনের প্রকৃত সত্তা। সেখান থেকে উদ্ভব হয় স্তবিরবাদ এবং মহাসঙ্ঘবাদ। যে কারণে রচিত হয় বুদ্ধের নামে নানা সূত্র এবং পার্থক্য দেখা যায় সূত্র-পিটক এবং বিনয়-পিটকের মাঝে।৮
ধারণা করা হয় এই বিকৃতির কারণ বৌদ্ধদের কিছু পণ্ডিত ব্যক্তি যারা আর্য দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং ব্রাহ্মণদের সেরা মানুষ বা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ মনে করতেন। আর এসব পণ্ডিতরা কুষাণ সাম্রাজ্যের রাজাদের আনুকূল্য পেয়েছিলেন।
উত্তর ভারতে কুষাণরা ও দাক্ষিণাত্যে সাতবাহন রাজারা কিছুটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতকের মধ্যভাগে উভয় সাম্রাজ্যের পতন হয়। এর জন্য উল্লেখযোগ্য কারণ হলো শাসকদের ব্যর্থতা ও বৈদেশিক আক্রমণ। এরপর এই অঞ্চলে গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা হয়। গুপ্ত সাম্রাজ্যকে এদেশের বাহ্মণ্যবাদীরা ও বর্তমান প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে গুপ্ত যুগকে স্বর্ণযুগ বলা হয়। কিন্তু আসলে সেটা ছিলো একটি শোষণের যুগ।

শোষণের যে যুগকে স্বর্ণযুগ বলা হয়
গুপ্ত রাজারা আর্য তথা ব্রাহ্মণ্যবাদী ছিলো। এরা কুষাণ রাজাদের সামন্ত হিসাবে উত্তর প্রদেশে শাসন করতেন। গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শ্রীগুপ্ত। তিনি ২৭৫ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরোহণ করেন। গুপ্ত সাম্রাজ্য ২৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও মূলত ৩২০ খ্রিস্টাব্দেই এটি এই অঞ্চলে সাম্রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং কুষাণদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রথম চন্দ্রগুপ্ত। তিনি লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করে গাঙ্গেও উপত্যকায় নিজ প্রাধান্য স্থাপন করেন। তাঁর রাজ্য উত্তর প্রদেশের পূর্বাংশ, বিহার, এবং বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তিনি পুত্র সমুদ্রগুপ্তকে নিজ উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করে যান।
গুপ্ত রাজাদের মধ্যে সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী। তিনি ৩৮০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। শৌর্য-বীর্য, চারিত্রিক দৃঢ়তা ও সংস্কৃতির প্রতি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তিনি ভারত ইতিহাসে একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। তিনি ৩৩৫ সালে পিতৃ সিংহাসন লাভ করেন। তার আমলে নোয়াখালী ও কুমিল্লা (সমতট) অঞ্চল ছাড়া পুরো বাংলা গুপ্ত শাসনের অধীনে চলে আসে। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র এই রাজার প্রশংসা করেছে তাকে বলেছেন- বিজিগীষু, অর্থাৎ যে আশপাশের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে সেগুলো নিজের দখলে আনতে পারে। সমুদ্রগুপ্ত ছিলেন এমনই এক বিজিগীষু রাজা যিনি অনেক রাজার ও অনেক জাতের মানুষের সঙ্গে অনেক দিন ধরে যুদ্ধ করেন ও জয়লাভ করেন। সেই কাহিনি এলাহাবাদের একটি প্রকাণ্ড পাথরের থামে তিনি খোদাই করিয়ে রাখেন। সেটি আজও আছে।৯
সমুদ্রগুপ্তের পুত্র দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১২ খ্রিস্টাব্দ) গুপ্তবংশের প্রভাবশালী রাজা। নিজের মেয়ে প্রভাবতীর বিয়ে দেন মধ্যভারতের ব্রাহ্মণ বাকাটক রাজপুত্রের সঙ্গে, এতে জাতে ওঠাও হল আবার বাকাটকদের মধ্যে নিজের প্রভাব বিস্তার করাও হল। বাকাটক রাজপুত্রের মৃত্যুর পরে প্রভাবতীই বাকাটক রাণী হয়ে রাজত্ব করেন।১০
গুপ্ত আমলে কেন্দ্রীয় শাসন সারা রাজ্যে সমান ছিল না। রাজধানী থেকে যে অঞ্চল যত দূরে, শাসনব্যবস্থা সেখানে ততই শিথিল। রাজস্ব আদায় গুপ্তরা খুবই অত্যাচারী ছিলো। ফসলের এক-চতুর্থাংশ রাজস্ব বলে আদায় করা হতো। সৈন্যদল খুব শক্তিশালী ছিল, রাজকোষ থেকে প্রতিরক্ষা খাতে বিস্তর খরচ হত। যুদ্ধে রথ ক্রমে অপ্রচলিত হয়ে পড়ছিল, তার বদলে অশ্বারোহী সৈন্যই প্রাধান্য পাচ্ছিল। ঘোড়সওয়ার তীরন্দাজরাই এ সময়ে সৈন্যদলে যোদ্ধা ছিল। রাজার সৈন্যদল রাজ্যের যে অঞ্চল দিয়ে যাত্রা করত, সেই সব স্থানীয় লোকজনদের সৈন্যদল এবং ঘোড়াদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হত। সেনাপতি এবং উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম ও বিলাসের সব ব্যবস্থাই করতে হত সাধারণ গ্রামবাসীদের। রাজার সৈন্যদল ও কর্মচারীদের পরিচর্যা করতে হত জনগণের। চাষিদের আর্যদের ক্ষেতখামারে কাজ করতে হতো বাধ্যতামূলকভাবে এবং বিনা পারিশ্রমিক বা যৎসামান্য বেতনে।
গুপ্ত আমল ছিলো দ্রাবিড় নির্মূলের অন্ধকার যুগ। গুপ্ত আমলের পরে দ্রাবিড়রা তাদের জাতিসত্তা হারিয়ে ফেলে। জাতিসত্তার বিকাশধারা বইয়ে মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বলেন, বাংলায় দ্রাবিড়দের প্রতিরোধের ফলে দীর্ঘ দিন আর্য-প্রভাব ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয়। এরপর খ্রিস্টীয় চার ও পাঁচ শতকে গুপ্ত শাসনে আর্য ধর্ম, আর্য ভাষা ও আর্য সংস্কৃতি বাংলাদেশে প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গাড়ে।১১
তৃতীয় ও চতুর্থ শতক পর্যন্ত বাংলাদেশে আর্য বৈদিক হিন্দু ধর্মের কিছুই প্রসার হয়নি। ষষ্ঠ শতকের আগে বঙ্গ বা বাংলার পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ঢুকতেই পারেনি। উত্তর-পূর্ববাংলায় ষষ্ঠ শতকের গোড়াতেই ব্রাহ্মণ্য সমাজ গড়ে ওঠে। পঞ্চম ও অষ্টম শতকের মধ্যে ব্যক্তি ও জায়াগার সংস্কৃতি নাম পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে ড. নীহাররঞ্জন রায় অনুমান করেন যে, গুপ্ত আমলে বাংলার আর্যকরণ দ্রুত এগিয়ে চলছিল। বাঙালি সমাজ উত্তর ভারতীয় আর্য-ব্রাহ্মণ্য বর্ণ-ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছিল। অযোধ্যাবাসী ভিন প্রদেশী বাহ্মণ, শর্মা বা স্বামী, বন্দ্য, চট্ট, ভট্ট, গাঙি নামে ব্রাহ্মণেরা জেঁকে বসেছিল। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের নানা জায়গায় ব্রাহ্মণেরা এসে স্থায়ী বাসিন্দা হতে লাগলেন, এরা কেউ ঋগ্বেদীয়, কেউ বাজসনেয়ী, কেউ শাখাব্যয়ী, যাজুর্বেদীয়, কেউবা সামবেদীয়, কারও গোত্র কান্ব বা ভার্গব, বা কাশ্বপ, কারও ভরদ্বাজ বা অগস্ত্য বা বাৎসা বা কৌন্ডিন্য। এমনি করে ষষ্ঠ শতকে আর্যদের বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির ঢেউ বাংলার পূর্বতম প্রান্তে গিয়ে পৌঁছল”।১২
ঐতিহাসিক সুকুমারী ভট্টাচার্যের ‘প্রাচীন বাংলা’ বইয়ে সেসময়ের সমাজচিত্র, নারী ও ধর্মীয় বিদ্বেষ নিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা উল্লেখ করা হলো, এই সময়ে বহিরাগত আগস্তুক গোষ্ঠী বিজয়ী হলে যেমন সমাজে ‘ক্ষত্রিয়’ পরিচয় পাচ্ছিল, তেমনি প্রান্তিÍক দ্রাবিড় আদিবাসীরা ব্রাহ্মাণ্য সমাজে নিম্নবর্ণের মানুষ হিসাবে ঠাঁই পেয়েছিল। জাতি-উপজাতির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এদের মধ্যে নতুন নতুন গোষ্ঠীকে আঙ্গুত বা অস্পৃশ্য নাম দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ ভাবে এদের চণ্ডাল বলা হয়। পঞ্চম শতকে ফাক শিয়েন এ দেশের সমাজে বিপুল সংখ্যক চণ্ডাল দেখেছিলেন। এরা মাছ মাংস বিক্রি করত, অন্যান্য নিচু কাজ করত এবং সমাজে এদের ঠাঁই ছিল না; তাই এদের গ্রামের বাইরে থাকতে হত। শহরে এলে উচ্চবর্ণের মানুষ এদের ছোঁয়া বাঁচিয়ে রাস্তায় হাঁটত, যাতে এদের অশুচিতা কোনওভাবেই তাদের স্পর্শ না করে।১৩
সমাজে রাজা ও রাজন্যদের প্রসাদে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য প্রবল ছিল, দানে পাওয়া নিষ্কর জমিতে নিচু বর্ণের প্রজাদের কাছে খাজনা আদায় করে তাদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে ব্রাহ্মণরা নিজেদের প্রতিপত্তি ঘোষণা করত। দেশে এবং বিদেশে বাণিজ্যের দরুণ বৈশ্যদের হাতে বিস্তর টাকা জমত। ফলে সমাজে তাদের প্রতিপত্তিও যথেষ্ট ছিল। এ সময়ে নারী ও শূদ্রদের (দ্রাবিড়) বেদে কোনও অধিকার ছিল না। গুপ্ত যুগে সমাজ ক্রমশই রক্ষণশীল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নারী ও শূদ্রের স্বাধীনতা ক্রমে সংকুচিত হয়ে এল।
কৃষ্ণ-কেন্দ্রিক উপাসনার চল হওয়াতে আগে শূদ্র সম্প্রদায় বৈষ্ণব ধর্মে ধর্মাচরণে একটা অধিকার পেল, কিন্তু তাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণে শাস্ত্রকার পুরোহিতের নির্দেশ অনুসারে তাদের অধিকার নির্ধারিত হত। সংখ্যায় অর্ধেক হলেও নারীর অধিকার, সমস্ত শাস্ত্রে ক্রমশই খর্ব করার চেষ্টা হয়েছে। নানা কাহিনি ও তত্ত্বকথা শোনানো হল সাধারণ মানুষকে, যাতে দেখানো হয়েছে নারী স্বভাবত পাপিষ্ঠ, পুরুষের অধঃপতনের হেতু, তার প্রকৃতিই হীন, তার একমাত্র কর্তব্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির দাস্য। এই সময়ে রচিত নাটক অভিজ্ঞানশকুন্তলম-এ পড়ি, দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে অকারণে পরিত্যাগ করবার পর কণ্বের শিষ্য শার্ঙ্গরব রাজাকে বলছে: ‘এ তোমার স্ত্রী, একে ত্যাগ কর বা গ্রহণ কর (যা তোমার ইচ্ছা), কারণ স্ত্রীর ওপরে স্বামীর সর্বতোমুখী প্রভুত্ব আছে।’
শুধু প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ মেয়েরা অলংকার, সম্পত্তি ও জমির মালিকানা পেত; শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সজ্জন হলে যৌতুক ও অন্যান্য সম্পত্তিতেও নারীরা অধিকারও পেত। কিন্তু শাস্ত্র বলেছে, দেহ বা ধনের ওপরে নারীর কোনও অধিকার থাকবে না। ফলে নারীর নিগ্রহ শাস্ত্রসম্মত, পুরোপুরি মানুষের মর্যাদা না পাওয়াই গুপ্ত সমাজে নারীর অবস্থানের যথার্থ চিত্র।
মোটকথা মানুষে মানুষে বিভাজন করে নির্যাতন করে শোষণ করার অমানবিক সমস্ত প্রথা চালু হয়েছে গুপ্তযুগে। গুপ্ত যুগের শাস্ত্রে ও সাহিত্যে আবার নতুন করে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুজ্জীবনের এক সক্রিয় চেষ্টা চোখে পড়ে। যাগযজ্ঞ নতুন করে বিস্তর জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হত। বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবিক প্রভাবে বৈদিক ধর্ম যেটুকু প্রতিহত হয়েছিল সেই সব ক্ষতিপূরণ করে যজ্ঞ নতুন করে সমাজে এল। বিভিন্ন দেবতাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন দেবতার অভ্যুত্থান ঘটল, পূজার বিস্তার হল বৃহৎ গুপ্ত সাম্রাজ্যের পরিসরে।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট, গবেষক ও ইতিহাসবিদ

তথ্যসূত্র
১.বাংলাদেশের ইতিহাস (আদিপর্ব)/রমেশচন্দ্র মজুমদার/অনুশীলন/শুঙ্গ রাজবংশ/https://bit.lz/2L1sMzW/ অ্যাকসেস ইন ২৯ আগস্ট ২০১৯
২. Sarvastivada/P. 38–39
৩. The legend of King Aúoka : a studz and translation of the Aúokâvadâna / John Strong
৪. পুরাণ/ভবিষ্য পুরাণ/প্রতিসর্গ পর্ব/পৃ. ১৮/https://bit.lz/2UfCQas/ অ্যাকসেস ইন ২৯ আগস্ট ২০১৯
৫. প্রাচীন ভারত/সুকুমারী ভট্টাচার্য/কুষাণ সাম্রাজ্য/ https://bit.lz/2Zw30XLঅ্যাকসেস ইন ২৯ আগস্ট ২০১৯
৬. অনুশীলন/কুষাণ জাতি https://bit.lz/2zsucfx অ্যাকসেস ইন ২৯ আগস্ট ২০১৯
৭. বৌদ্ধদের ধর্মীয়, সামাজিক কুসংস্কার ও লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান/ড. জগন্নাথ বড়ুয়া //https://bit.lz/2PmlJVU// অ্যাকসেস ইন ২৯ আগস্ট ২০১৯
৮. প্রাচীন ভারত/সুকুমারী ভট্টাচার্য /গুপ্ত যুগ/ https://bit.lz/2lLseTH /অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
৯. Chandragupta II / Enczclopaedia Britannica / https://bit.lz/2ko9eKL / অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
১০. প্রাচীন ভারত / সুকুমারী ভট্টাচার্য / গুপ্ত যুগ / https://bit.lz/2lLseTH / অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
১১. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান / পৃ. ২৫
১২. বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব / ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় / পৃ. ১৩২
১৩. প্রাচীন ভারত/ সুকুমারী ভট্টাচার্য / গুপ্ত যুগ / https://bit.lz/2lLseTH / অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

SHARE

Leave a Reply