বাইতুল হিকমাহ ও কিছু কথা -এবনে গোলাম সামাদ

আবু আল-আব্বাস ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসী খেলাফত, যা চলেছিল খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত। আব্বাসী বংশের দ্বিতীয় খলিফা আল-মুনসুর ৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন বাগদাদ শহর। রাজধানী দামেস্ক থেকে সরিয়ে আনা হয় বাগদাদে। আব্বাসী খলিফারা সিরিয়া দখল করেন। সিরিয়া থাকে না উমাইয়া খেলাফতের অধীন। বাগদাদ শহর হয়ে ওঠে ইসলামী সভ্যতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। অর্থাৎ মুসলিম সভ্যতা একদিকে বিকশিত হতে থাকে স্পেনের করডোভা শহরকে নির্ভর করে। অন্যদিকে বিকশিত হতে থাকে প্রধানত বাগদাদ শহরকে নির্ভর করে। আব্বাসী খেলাফতের সপ্তম খলিফা আবু আল-আব্বাস আব্দুল্লাহ ইবনে হারুন-আল-রশিদ (৭৮৮-৮৩৩ খ্রি:) বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাইতুল হিকমাহ’। আমরা সাধারণভাবে আবু আল-আব্বাস আব্দুল্লাহ ইবনে হারুন-আল-রশিদকে এখন বলি আল-মামুন। কারণ তিনি খলিফা হয়ে আল-মামুন নাম গ্রহণ করেন। আরবীতে বাইতুন মানে হলো গৃহ। আর হিকমাহ মানে হলো জ্ঞান। আমরা বাংলায় বাইতুল হিকমাহকে বলতে পারি ‘জ্ঞান-গৃহ’। এখানে আল-মামুন বিভিন্ন ভাষা থেকে আরবী ভাষায় গ্রন্থ অনুবাদের ব্যবস্থা করেন। এখানে স্থাপন করেন একটি মানমন্দির জ্যোতির্বিদ্যা চর্চার জন্য। এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার ভার তিনি প্রদান করেন মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খারেজমীকে। আমরা এখন একে সাধারণভাবে খারেজমী নামেই ডাকি। ইনি ছিলেন একজন নামকরা গণিতবিশারদ। ইনি জন্মসূত্রে আরব ছিলেন না; ছিলেন পার্সিক। কিন্তু গণিতের বই লিখেছেন আরবী ভাষায়। ইনিই প্রথম বীজগণিতের গ্রন্থ রচনা করেন। গ্রন্থটির নাম ‘আল-জাবের ও-আল-মুকাবালা’। বইটি ল্যাটিনে অনূদিত হয় আলজাবরা নামে। জাবের মানে সমীকরণ স্থাপন। যা থেকে এসেছে ইংরেজি Algebra এবং ফরাসি Algebre নামটি। ইংরেজিতে নামটি সরাসরি আসেনি; এসেছে ফরাসি ভাষার মাধ্যমে। আল খারেজমী তাঁর বইতে প্রথম ব্যবহার করেন যোগ (+), বিয়োগ (-) এবং সমান (=) চিহ্নের ব্যবহার। তিনি সংখ্যা লিখন পদ্ধতিতে বিশেষভাবে ব্যবহার করেন শূন্য (০)। শূন্যের ব্যবহার প্রথম কোথায় আরম্ভ হয়, তা নিয়ে আছে বিতর্ক। কেননা, এখন দেখা যাচ্ছে যে, মধ্য-আমেরিকার (বর্তমান গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাস) মায়াদের মধ্যেও ছিল শূন্যের ধারণা এবং তারাও সংখ্যা লিখত শূন্য ধরে দশমিক পদ্ধতিতে (Ashly Montagu in : Man His first Million Years. p. 164. The New Americam Library, New York 1958.)। আগে যেমন মনে করা হতো, পশ্চিম ভারতে গুজরাট অঞ্চলে শূন্যের ধারণার উদ্ভব হয়েছিল এবং তা গিয়েছিল বাগদাদে।

এখন আর তা অনেকেই মানতে চাচ্ছেন না। আমরা এই বিতর্কের মধ্যে যেতে চাই না। শুধু বলতে চাই যে, খারেজমী এই ধারণাকে করেছিলেন গণিতজ্ঞদের মধ্যে জনপ্রিয়। বাগদাদ থেকে এই ধারণা যায় করদোবায়। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা ইউরোপে। আমরা বলেছি করদোবা ছিল উমাইয়া খেলাফতের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু উমাইয়া আর আব্বাসী খেলাফত দু’টি স্বতন্ত্র খেলাফত হলেও আরবি ভাষার মাধ্যমে এই দুই খেলাফতের পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে সহজেই হতে পারত ভাবের আদান প্রদান। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলমানরা আসতেন মক্কায় হজ করতে। হজ করতে এসে তাদের মধ্যে হতে পারত ভাবের আদান প্রদান। এভাবে আরবী ভাষা ও হজব্রত পালনের মধ্যে দিয়ে মুসলিম বিশ্বে সভ্যতার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে একটি ঐক্য গড়ে উঠেছিল। আর এই কারণেই একে এখন চিহ্নিত করা হচ্ছে মুসলিম সভ্যতা বলে। বাংলাদেশ ছিল বাগদাদ থেকে অনেক দূরে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক স্বাধীন সুলতান বাগদাদের খলিফাকে মেনেছেন খলিফা হিসাবে। তাদের মুদ্রিত টাকায় তাদের নামের সাথে উৎকীর্ণ করা হয়েছে বাগদাদের খলিফার নাম। অর্থাৎ বাংলাদেশের সুলতানরা নিজেদের ভেবেছেন মুসলিম বিশ্বের একজন। তারা নিজেদের ভাবেননি মুসলিম সভ্যতার বাইরে। বাংলা ভাষায় হিসাব কথাটা এসেছে আরবী ভাষা থেকে। খাতা শব্দটা এসেছে ফারসি ভাষা থেকে। সুলতানি আমল থেকে খাতাপত্রে হিসাব লেখা শুরু হয়। আগেও নিশ্চয় এদেশের মানুষ হিসাবপত্র রেখেছেন। কিন্তু তারা লিখতেন তালপাতা ও ভূর্জপত্রে। কাগজ নির্মাণের কৌশল এদেশে নিয়ে আসেন তুর্কি মুসলমানরা। তালপাতা ও ভূর্জপত্রে সংখ্যা লিখে হিসাব করা সহজ ছিল না। কিন্তু সুলতানি আমল থেকে এদেশে হিসাবপত্র রাখা এবং করা হয় অনেক সহজ।

ইংরেজি ভাষায় Almanaq (আল-মানাক) ও ফরাসি ভাষায় Almanach শব্দ হসেছে আরবী ভাষা থেকে লাতিন অনুবাদের মাধ্যমে। আল-মানাক বলতে বুঝায় এমন পুঞ্জিকাকে, যাতে থাকে বছরের বিভিন্ন সময়ের নক্ষত্ররাজির বর্ণনা। ইংরেজি ভাষায় Algol (আলা-গোল), Aldebran (আল-দেবরান) এবং Bootes (বুতেস) প্রভৃতি আকাশের নক্ষত্রের নাম এসেছে আরবী ভাষা থেকে। এ থেকে বুঝা যায় আরবি জ্যোতির্বিদ্যার অগ্রগতির কথা। আরব মুসলমানগণ এ সময় নানা দেশে ব্যবসা করতে গিয়েছেন। দিক নির্ণয় করেছেন আকাশের নক্ষত্র দেখে। নক্ষত্রের অবস্থান থেকে অনুমান করেছেন ঋতু পরিবর্তন। ইংরেজি ভাষায় Chemistry (কেমিস্ট্রি) এবং ফরাসি Chimie (সিমি) শব্দ এসেছে আরবী আলকেমি শব্দ থেকে। আরব মুসলমান বিশ্বে রসায়নবিদ্যায় ঘটেছিল বিশেষ উন্নতি। আরব রসায়নবিদরা আবিষ্কার করেছিলেন নাইট্রিক ও সালফিউরিক এসিড তৈরির কৌশল। ইংরেজিতে Alcohol (অ্যালকোহল) ও ফরাসি ভাষায় অষপড়ড়ষ (আলকোল) শব্দ এসেছে আরবী আল-কোহল শব্দ থেকে। আল-কোহল মাদকদ্রব্য। কিন্তু অ্যালকোহলে অনেক জৈব বস্তু দ্রবীভূত করে তাদের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানো যায়। অ্যালকোহল ভালো দ্রবণ। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর শেষভাগে ইব্ন হাইয়ান জাবের নামে একজন রসায়নবিদ খুব খ্যাত হয়ে ওঠেন। ইনি রোগ নিবারণের জন্য ওষুধ প্রস্তুতে সমর্থ হন। ইনি জন্মসূত্রে আরব ছিলেন না। ছিলেন পার্সিক। চিকিৎসাবিদ্যায় আরব মুসলিম বিশ্বে ঘটেছিল প্রভূত উন্নতি। আবু বকর মুহাম্মদ বিন জাকারিয়া আল-রাজি (৮৬৫-৯২৫ খ্রি:) ছিলেন একজন বিখ্যাত চিকিৎসক। ইনি চোখের অসুখ ও গুটিবসন্ত রোগের ওপর বই লিখে গিয়েছেন। ইনি আরব ছিলেন না। ছিলেন পারসিক। জন্মেছিলেন বর্তমান ইরানের রাজধানী তেহরানের কাছে রাই নামক জায়গায়। কিন্তু বই লিখেছেন আরবী ভাষায়। মুসলিম বিশে^র আর একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক ছিলেন আবু আলী ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি:)। জন্মসূত্রে ইনিও আরব ছিলেন না। ছিলেন তাজিক। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যার বই লিখেছিলেন আরবীতে। ইনি কেবল চিকিৎসকই ছিলেন না, ছিলেন নিসর্গবিদ, দার্শনিক ও কবি। কবিতা লিখেছেন ফারসিতে। দর্শনের বইও লিখেছেন ফারসিতে। এর লেখা চিকিৎসাবিদ্যার বই লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়, যা পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ইউরোপের বিভিন্ন চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষালয়ে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে। ইনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন রোগীদের সেবাশুশ্রƒষার ওপরে। বলেছেন, ছোঁয়াচে রোগীদের পৃথক হাসপাতালে রাখতে। বলেছেন কোনো রোগ কোনোখানে মহামারীর আকারে দেখা দিলে পানি ফুটিয়ে পান করতে।

মুসলিম বিশ্বে বিজ্ঞানের বই রচিত হয়েছে প্রধানত আরবী ভাষায়। ওমর খৈয়াম কবিতার বই লিখেছেন ফারসি ভাষায়। তাঁর মাতৃভাষা ছিল ফারসি। কিন্তু তিনি আবার ছিলেন খ্যাতনামা গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ। তিনি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যার বই লিখেছেন আরবীতে। ফারসি ভাষাই এ সময় যথেষ্ট জোরালো ছিল। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা হয়ে উঠেছিল আরবী। মুসলিম বিশে^ যে কেবল এ সময় আরবী ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে, তা অবশ্য নয়। আরবী ভাষায় রসসাহিত্যের চর্চাও হয়েছে যথেষ্ট। ইংরেজি ভাষায় গধমধুরহব (ম্যাগাজিন) শব্দটা এসেছে আরবি ভাষা থেকে। আরব বিশে^ই প্রথম শুরু হয় হাতে লিখে সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ। আমি এসব কথা নিয়ে আলোচনা করছি, কারণ আমাদের দেশে অনেকেই বুঝাতে চাচ্ছেন যে, মুসলমানরা হলেন ধর্মান্ধ। তাদের হাতে সংস্কৃতি চর্চা বিপন্ন হতে বাধ্য। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। আমি মনে করি, আমাদের সরকার বাইতুল হিকমাহর মতো যদি একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, তবে সেটা হবে একটি উত্তম কাজ। বাংলা ভাষায় উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক রচিত হচ্ছে প্রয়োজনের অনুপাতে খুবই কম। বিদেশি ভাষা থেকে নানা বিষয়ে উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদ করলে ছাত্ররা হবেন তার দ্বারা বিশেষভাবে উপকৃত।
লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply