বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান । আব্দুর রহিম

বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান । আব্দুর রহিমসর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাগ্রন্থ আল কোরআন নাজিলের সূচনা বাক্যগুলোই ছিলো-
“পড়! তোমার রবের নামে। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আলাক থেকে। পড়! তোমার রব তো বড়ই মেহেরবান। যিনি মানুষকে কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা সে জানতো না।” (সূরা আল আলাক : ১-৫)
মূলত দিশেহারা মানুষকে সঠিক পথে আনার জন্য মহান রাব্বুল আলামিন প্রথমেই যে পদ্ধতি শিখিয়েছেন তাহলো জ্ঞানার্জন। তিনি মানুষকে সৃষ্টিকর্তার আনুগত্য শিকার করার পাশাপাশি তার প্রদত্ত জ্ঞানগুলো সর্বোত্তম চর্চার আদেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মহান রবেব জিকির করার পাশাপাশি জ্ঞানার্জন করাও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সৃষ্টিকূলের সর্বোত্তম আদর্শ মহানবী (সা)-এর বাণীও এমনটিই সাক্ষ্য দেয়।
হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলূল্লাহ (সা) বলেছেন, জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।” (ইবনে মাজাহ, মেশকাত : ২০৭)
সুস্পষ্টভাবে ইসলাম সর্বদা মুসলিম তথা সঠিক পথের মানুষদের সর্বদা জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দেয়। বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রেরণা ও প্রয়োজন তাদেরকে জ্ঞানার্জনে বাধ্য করেছে। মানব সৃষ্টির আদিকাল থেকেই মহান আল্লাহ মানুষকে যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন তা যথাযথভাবে আত্মস্থ করেই মুসলিমরা যুগে যুগে জ্ঞানপিপাসু বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। এ বিষয়ে বিখ্যাত ইতিহাসবিদগণও একমত। মূলত মুসলিমরা ধর্মপালনের স্বার্থে মহাকাশ, চন্দ্র, সূর্য ইত্যাদি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত হন। এ ছাড়া গণিত ও রসায়নে তাদের প্রয়োজনীয়তা ছিল অত্যধিক। কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী চন্দ্র মাস গণনা, নামাজের ওয়াক্ত নির্ণয়ের জন্য তারা চাঁদ ও সূর্য নিয়ে গবেষণা করেন। এক্ষেত্রে মহাকাশের অন্যান্য জ্যোতিষ্ক তাদের কৌতূহলের কারণ হয়। এ ছাড়া ইসলামের মৌলিক বিধান ফারায়েজের আইন ও ব্যবসার মতো সুন্নতি কাজের জন্য তাদের গণিত শেখার প্রয়োজন হয়। এতে কেউ কেউ গণিতের অন্তঃস্তরের প্রতি আকর্ষিত হয়ে গবেষণা শুরু করে। পাশাপাশি জীবন বাঁচানো ও সুস্থ থাকার তাগিদে চিকিৎসাবিজ্ঞানও এর সাথে সম্পর্কিত রসায়নে মুসলিমরা উৎসাহী হয়।
ইসলাম ও আরবি সভ্যতার ইতিহাস বইতে ‘ওস্তাবলি বোঁ’ লিখেছেন –
“ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগারের অস্তিত্ব ছিলো না অনেক মুসলিম দেশে তখন প্রচুর বই ও পাঠাগার ছিলো। বাগদাদের বায়তুল হিকমায় ৪০ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলি পাঠাগারে ৩০ লক্ষ বই ছিলো। অপর দিকে মুসলমানদের সময় কেবল স্পেনেই বছরে ৭০-৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো।”
ড. মরিস বুকাইলির, “The Bible, The Quran and The science” বইতে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। যখন খ্রিষ্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছিলো তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বহুসংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে ৪ লাখ বই ছিল। ইবনে রুশদ তখন সেখানে গ্রিক, ভারতীয়, পারস্য দেশীয়দের বিজ্ঞান পাঠদান করাতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন।
অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে মুসলিমরাই ছিল সারা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সর্বেসর্বা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মুসলিম
মুসলিমবিশ্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চর্চা ও গবেষণা প্রাচীন যুগ থেকেই। মহানবী (সা)-এর সময়ে যুদ্ধের ময়দানে অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয় প্রথম বারের মতো। হযরত আলী (রা) ছিলেন অন্যতম শল্যচিকিৎস্যক ও জ্ঞানী। চিকিৎসাশাস্ত্রে কুরআনের কথা উল্লেখ করে জার্মান পণ্ডিত ড. কার্ল অপিতজি তার “Die medizineim koran” গ্রন্থে দেখিয়েছেন কুরআনের ৯৭টি সূরার ৩৫৫টি আয়াতে মানবদেহের সব সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান দেয়া আছে যা মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্ম দেয়। এছাড়া শ্রেষ্ঠতম হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরিফের ‘তিব্বুন নববী’ অধ্যায়ে ৮০টি পরিচ্ছেদে কয়েক শ’ হাদিস রয়েছে যার সবই চিকিৎসাবিজ্ঞানের অমূল্য সম্পদ। নবীর পরবর্তী যুগের দিকে যদি তাকাই-
মিসরের গভর্নরের উপদেষ্টা ইয়াহইয়া আননাহযি প্রথম আরব চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি হিপোক্রিটিস ও গ্যালেনের গ্রন্থসমূহের ওপর গবেষণাধর্মী পুস্তক প্রণয়ন করেন। খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের উদ্যোগে বিশ্বের সর্বপ্রথম চিকিৎসাবিজ্ঞান বিষয়ক গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয় সিরিয়ার দামেস্কে। সে যুগে ‘Medical এনসাইক্লোপিডিয়া’ ও বিখ্যাত ‘কিতাবুল উসুল আত তিব্ব’ রচিত হয়।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক উজবেকিস্তানের বুখারার সন্তান আবু আলী হুসাইন ইবনে সিনা। (৯৮০-১০৩৭) ‘আলকানুন ফিত তিব্ব’ রচনা করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করেন। ড. ওসলারের মতে এ গ্রন্থটি চিকিৎসাশাস্ত্রের বাইবেল। তার এ বই এখনও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। তার রচিত অন্যান্য ১৫টি বইয়ে তিনি বিভিন্ন রোগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি তার বইয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একসাথে বেঁধে ফেলেছেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী হিসেবে জ্ঞাত আল রাযি (৮৬৫-৯২৫ খ্রি.) ছিলেন তার সময়কার সবচেয়ে পণ্ডিত ব্যক্তি। তার অস্ত্রোপচার পদ্ধতি ছিলো সর্বোত্তম। তার শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে ‘আল জুদাইরি ওয়াল হাসবাহ’ চিকিৎসকদের আশ্চর্যান্বিত করে। এ ছাড়া ১০ খণ্ডে বিভক্ত ‘আল মানসুরি’ গ্রন্থটি আল রাযিকে সারা বিশ্বের কাছে অমর করে রেখেছে। তিনি হাম, শিশু চিকিৎসা, বসন্ত, নিউরো সাইকিয়াট্রিক, অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, মনোবিজ্ঞান, বিষজ্বর সম্পর্কে মতবাদ দেন। পরবর্তীতে মধ্যযুগে আল বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮) চিকিৎসাজগতের রাজত্ব করেন। তিনি একইসাথে চিকিৎসক, ভূগোলবিদ, দার্শনিক ও শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ‘আল উসতাদ’ (মহামান্য শিক্ষক) নামে খ্যাতি অর্জন করেন। ভূগোল বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থ ‘আল আছারুল বাকিয়্যাহ আনিল কুরআনিল খালিয়্যাহ’ তৎকালীন ভূগোলবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পৃথিবীর প্রথম গোলাকার মানচিত্র তার অঙ্কিত। এ ছাড়াও বিখ্যাত ‘আলজামি’ ও ‘কুল্লিয়াত’ গ্রন্থের লেখক ইবনে রুশদ সর্বোপরি স্মরণীয় একটি নাম।

বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান । আব্দুর রহিমপদার্থবিজ্ঞানে মুসলিম
বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক না কেন যেকোনো সময়ের গবেষণায় মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান শাখা পদার্থবিজ্ঞানও মুসলিম বিজ্ঞানীদের পদচারণা থেকে বাদ যায়নি। এর কোন্দরে কোন্দরে রয়েছে মুসলিম বিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ছাপ। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্বে যখন ইউরোপে অনুসন্ধিৎসার পুনরুজ্জীবন ঘটে তখনই যেসব অগ্রসরদের নাম আসে তাদের একজন হলেন ইবনে আর হাইথাম (৯৬৫-১০৩৯)। তিনি আলোকতত্ত্বের ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। তার সহযোদ্ধা ছিলেন আল হাজেন বা হাসান ইবনে হায়সাম। টলেমি ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা যখন বস্তু ও আমাদের দর্শনক্ষমতা নিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত ও ভুল ব্যাখ্যায় জর্জরিত তখন আল হাজেন তার ‘Book of optics’ (ল্যাটিনে De aspectibus)) এর মাধ্যমে তাদেরকে আলোর দিশারি দেখিয়ে বলেন বস্তু থেকে আমাদের চোখে আলো আসে বলেই আমরা দেখতে পাই। তার দর্শিত পথেই পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা উত্তল লেন্সের আধুনিক তত্ত্বের সন্ধান পান।
রজার বেকন, নিউলার্ডো, কেপলারের গবেষণা অনেকাংশেই যার আবিষ্কারের ওপর নির্ভরশীল তিনি আর কেউ নন চক্ষুবিজ্ঞানী হাসান ইবনে হায়থাম। ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, বায়ুমণ্ডলের ওজন, চাপ ও তাপের কারণে জড়পদার্থের ওজনের তারতম্য তার মতবাদ। নিউটনের বহু আগেই তিনি অভিকর্ষজ বলের ধারণা দেন বলে মনে করা হয়। তার রচিত ৭ খণ্ডের ‘আল কিতাব আল মানাযির’ (১০১৫) প্রকাশের ১০০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে UNESCO২০১৫ সালকে আন্তর্জাতিক আলোকবর্ষ ঘোষণা করে যার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি তার নামে উৎসর্গ করা হয়। তিনি কায়রোতে ফাতেমীয় খলিফা আল হাকিমের সান্নিধ্যে বিশ্ববাসীকে তার গবেষণালব্ধ জ্ঞান শিক্ষা দেন। জীবদ্দশায় তিনি ২০০-এর অধিক বই রচনা করলেও ৫৫টি কেবলমাত্র সংরক্ষিত আছে। তার সম্মানে চাঁদের বুকে একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে। সৌরজগতের একটি গ্রহাণূর নাম (Astroid 59239 Al Hazen)। ২০০৩ সালে ইরাকি ১০,০০০ দিনারের নোটে তার ছবি যুক্ত ও ইরাকে UN weapon inspector এর প্রজেক্ট তার নামে নামকরণ করা হয়। প্রকৃতির ইতিহাস সম্পর্কে যে বিখ্যাত এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে বায়ুকলের ধারণা পাওয়া যায় তার লেখক আল মাসুদী (৮৯৬-৯৬৫) বাগদাদের ইউসুফ ইবনে ওমরের কারণে আজকের এ উন্নত কাগজের উৎপত্তি। তিনি প্রথম তুলা থেকে কাগজ তৈরি করেন। এছাড়া জলের গভীরতা, সমুদ্রের স্রোত আব্দুল মাজিদ, কম্পাস ইবনে আহমদ তৈরি করেন।
রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের ১০০০ বছর পূর্বে আব্বাস ইবনে ফারনাস ৮৫২ সালে বিমানের ধারণা দেন। তিনি একবার স্পেনের কর্ডোভার এক মসজিদের মিনারের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়েন। তার এ উদ্ভট কর্মকাণ্ড প্যারাসুটের জন্ম দেয়। এরপর ৮৭৬ সালে ৭০ বছর বয়সে তিনি একই কাজ করেন পাহাড়ের এক চূড়া থেকে। এ সময় তিনি বাতাসে প্রায় ১০ মিনিট ভেসে নিরাপদে মাটিতে অবতরণ করেন। তার নামে বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও চাঁদের একটি আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের নামকরণ করা হয়েছে।

রসায়নে মুসলিমরা
মুসলমানদের গৌরবোজ্জ্বল অর্জন বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো রসায়নেও প্রচুর। তাদের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় প্রয়োজনে জ্ঞানার্জনের পথে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কৌতূহল তাদের মনে জন্ম নেয়। প্রাচীন মিসরীয় রসায়নচর্চা ‘আল কিমিয়া’ থেকে রসায়নের উৎপত্তি হয়। রসায়নকে বিজ্ঞানের অনন্য শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন আবু আব্দুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান (রা)। এরপর এ অনন্য শাখাটি মুসলিমদের হাত ধরে ক্রমশ উন্নতি লাভ করেছে। পরিস্রবণ, ভস্মীকরণ, বাষ্পীভবন, দ্রবণ পদ্ধতি তার আবিষ্কার। তিনি তার গ্রন্থে ইস্পাত তৈরি, ধাতুর শোধন, লোহার বার্নিশ, চুলের কলপ, লেখার কালি, কাচ, ওয়াটার প্রুফ আস্তরন, কাপড় ও চামড়ার রং ইত্যাদি প্রস্তুতকরণ প্রণালী বর্ণনা করেন। ৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে এ মনীষী প্রয়াত হন। তাকে রসায়নের ‘জনক’ হিসেবেই অনেকে চিহ্নিত করতে পছন্দ করেন।
‘Theology of Aristotle’ এর অনুবাদের জন্য বিখ্যাত আবু ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি ছিলেন খলিফা মামুনের সময়কার খ্যাতনামা রসায়নবিদ, দার্শনিক, চিকিৎসক। তিনি নিউপ্লেটোনিজমের উদ্ভাবক। তার জীবদ্দশায় অনধিক ৩৬৫টি গ্রন্থ রচনা করেন। বহু ভাষাবিদ এ বিজ্ঞানী প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের মতবাদ সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। এ ছাড়াও জুননুন মিসরি ও ইবনে আব্দুল মালিক আল কাসি রসায়নের উন্নতিতে অগ্রপথিক। সোনা, রূপাসহ বিভিন্ন মূল্যবান ধাতু সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করেন জুননুন মিসরি। আর আলকাসি রচিত ‘আইনুস সানাহ ওয়া আইওয়ানুস সানাহ’ (essence of the art & aid of worker) তাকে বিশ্ববাসীর কাছে অমর করে রেখেছে।

গণিতশাস্ত্রে মুসলিম
বিজ্ঞান ও ভৌত জগতের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে উপাদান তা হলো গণিত। মুসলিমরা ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাকাত সম্পর্কিত ধর্মীয় বিধান মানার খাতিরে গণিত নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। শূন্য থেকে অসীম পর্যন্ত গণিতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে মুসলিমদের পদচারণার চিহ্ন। ১ এর পর ০ দিলে যে ১০ হয় এ ধারণাটির জন্ম দেন ‘আবু জাফর মোহাম্মদ মুসা আল খাওয়ারেজমি’ (৭৮০-৮৫০) তিনি গণিতশাস্ত্রের জনক হিসেবে অধিক পরিচিত। Algebra-এর আবিষ্কারক তিনি। তার রচিত ‘হিসাব ওয়াল জাবর ওয়াল মুকাবালাহ’ যা ইউরোপীয়দের কাছে ‘আল জাবের’ নামে পরিচিত, গাণিতিক সমীকরণ ও রাশি সম্পর্কে ধারণা দেয়। গ্রন্থটি ল্যাটিন ভাষায়ও অনূদিত হয়। তার রচিত ‘কিতাবুল হিসাব আল আদাদ আল হিন্দ’ নামক পাটিগণিত বিষয়ক গ্রন্থ দ্বারা অনেকেই প্রভাবিত হয়। তিনি algarithm I tan এর table  আবিষ্কার করেন।
ঘন নির্ণয়ের সমীকরণ ও পাটিগণিতের জন্য ‘কিতাবুল জিবার ওয়াল মুকাবালা’ রচনা করেন ওমর খৈয়াম (১০৪৮-১১২২)। তিনি রুট আবিষ্কার করেন। ‘The middle books of geomtry and astronomy’ লিখেছেন নাসির উদ্দিন তুসি (১২০১-১২৭৮)। এ ছাড়া গণিতের + – ÷ x ইত্যাদি চিহ্নগুলো আবিষ্কার করেন আবুল হাসান ইবনে আলি কালাসাদি। রেনেসাঁদের trigonometry এর অতি সুন্দর ব্যাখ্যা দেন মুহাম্মদ ইবনে জাবির আল হারানী ওয়াল বাত্তানি। tan এর অনুপাত তার আবিষ্কার। সুতরাং গণিতের একেবারে গোড়ার দিক থেকে মুসলমানরা এর উন্নতিতে অবদান রেখেছে।

আধুনিক বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান
ক্রমাগত যুগের পরিবর্তনের ধারায় হয়তো মুসলিমদের গৌরব কমতে শুরু করেছে। কিন্তু তাদের বর্জন করে বিজ্ঞানের অগ্রসর অসম্ভব। আজ সারা বিশ্বের বিজ্ঞান ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের দখলে। সমাজ পরিবর্তনের ধারায় হয়তো তারা অনেক অবদান রাখছে। কিন্তু সঙ্কটপূর্ণ এ যুগেও মুসলিমদের জ্ঞান চর্চা থেমে নেই। বায়ু দিয়ে যন্ত্র চালনা, পানি দিয়ে ও সৌরশক্তি দিয়ে হেলিকপ্টার চালনার মতো বড় বড় আবিষ্কার মুসলিম বিজ্ঞানীরা করেছেন। সম্প্রতি পাটের জিনোম আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে বাঙালি মুসলিম বিজ্ঞানীর হাতে। আবিষ্কারের ধারা চলমান থাকলেও সঠিক পরিচর্যা ও জাতীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মুসলিমরা ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে।
মহান আল্লাহ বলেন, “যে জানে আর যে জানে না তারা কি কখনো এক হতে পারে?”
মূলত ধর্মীয় অনুসরণ থেকেই জ্ঞানার্জনের অনুভূতি জন্মে। মানুষ ধর্মের সংস্পর্শে এসেই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা খুঁজে পায়। ইসলামকে বাদ দিয়ে যেমন সঠিক জীবনযাপন সম্ভব নয় তেমনি কুরআনের জ্ঞানের বাইরে বিজ্ঞান খোঁজা কঠিন। যে মানুষের পথ প্রদর্শনের সূচনাই ‘পড়’ শব্দ দিয়ে তাদের জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন থাকাই কাম্য।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ

SHARE

Leave a Reply