বিজয়ের একক সুবিধাভোগীদের পৈশাচিক যাতনায় মানবতার আর্তনাদ -রাশেদুল ইসলাম

আমরা যখন মুসলিম কমিউনিটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ বলবো, তখন ভেবে চিন্তে বলা দরকার। নব্বই ভাগেরও বেশি সংখ্যক মুসলিমকে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ বললে ভুল হতে পারে। তাই শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ না বলে শতকরা পরিমাণ বলা জরুরি। তাহলে প্রকৃত চিত্র উপস্থাপিত হবে। যদিও ইদানীং জাতি বা ধর্মকে উপেক্ষা করার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে। এবং এ পাঁয়তারা নৈতিকতাহীন সমাজব্যবস্থার ধারক বাহকদের (পশ্চিমা নৈতিক দেউলিয়াত্ব গ্রহণকারী গোষ্ঠী) হাত ধরে আজ আমাদের দেশেও প্রবেশ করেছে। এজন্য ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কথা বলা আজ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এই মতাদর্শের পক্ষে স্বয়ং সরকারি তৎপরতা দৃঢ়। সাথে সরকারকে সক্রিয় সহযোগিতার জন্য তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা এবং তাদের প্রতি অহেতুক মৌন সমর্থনকারী পুথিগত বিদ্যাগ্রহণকারীরা।

ইসলামের মৌল ধারণা দানকারী পরিপূর্ণ কিতাব মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষা আরবি হওয়ার কারণেই শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষাভাষী মানুষ কুরআনকে বদ্ধ করে রাখার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে, তা নয়। কারণ, বর্তমান সভ্যতার উৎকর্ষ হয়েছে যে সকল ভাষার মাধ্যমে, তার বাহকরাও একই নীতি অবলম্বন করছে আজ পর্যন্ত। বিশেষ করে স্পেন-কর্ডোভার কথা উল্লেখ করতেই হয়। কুরআনের জ্ঞানকে সর্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার সকল আয়োজন থাকলেও তা দিন দিন ম্লান হয়েছে, নিজেদের তথা ইসলামী সভ্যতার ওপর আস্থার অভাব হওয়ার দরুন।

আজকের বাংলাদেশেও একই চিত্র দৃশ্যমান। ইসলামী সাহিত্যের অভাব নেই। তবুও আমরা ছুটছি পাশ্চাত্য সাহিত্যের কাছে। মুসলিম হয়েও থিওরি ধারণ করছি অমুসলিমদের। বস্তুবাদী সভ্যতার অগ্রগতিকে নিয়তি মনে করছি। সম্প্রতি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সিরাতুন্নবী সা. উপলক্ষে মাসব্যাপী যে বইমেলা আয়োজিত হয়েছিলো, তাতে বইপ্রেমীদের ভিড় খেয়াল করার মতো। প্রকাশকদের সমাপনী বক্তব্যে বই বিক্রির ব্যাপারে সন্তোষজনক কথা শোনা গেছে। কিন্তু বইয়ের প্রভাব কতটুকু সমাজে। এরকম বইমেলা তো প্রতি বছরই হচ্ছে। বইমেলার বাইরেও অনলাইন বুকশপ থেকে অনেক বই বিক্রয় হচ্ছে। দেশের শীর্ষ অনলাইন বই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান রকমারি ডটকমে ইসলামী বই সারা বছর জুড়ে ট্রেন্ডিং থাকে। নৈতিকভাবে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন কি দেখছি আমরা! বিপরীতে নৈতিকতা ছাপিয়ে পাশবিকতা স্থান পাকাপোক্ত করেছে সমাজে। কোমলমতি কিশোররা তাদের পরীক্ষার পূর্বে র‌্যাগ ডে পালন করছে। র‌্যাগ ডে সেলিব্রেশনের নামে যে পরিমাণ অশ্লীলতার চর্চা করা হচ্ছে, তা সমাজের বোদ্ধামহলের দৃষ্টিসীমার মধ্যেই হচ্ছে। তারা বাধা দিচ্ছে না। কারণ, এটাই প্রগতি, এটাই উন্নতির ছাপ। যে উন্নতি অগ্রগতি ক্রমশ মাদক ও খারাপ কাজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

স্বাধীন দেশের বিচারক ও নৈতিকতা
মিডিয়ায় একটি ধর্ষণ মামলার আসামিদের সবাইকে খালাসের ঘটনা জাতি দেখেছে। যাদের নাম উচ্চারণ করতেও ঘৃণা লাগছে। আসামিদের খালাস দিয়ে বিচারক বলেছেন, ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার পর যেন কোনো পুলিশ মামলা না নেয়। কারণ হিসেবে সেই ধর্ষিতা নারীদের চরিত্রকে সামনে এনেছেন। তারা সাধারণভাবেই যৌনকর্ম সম্পাদন করে থাকে বলে বিচারক রায়ে লিখেছেন। এই বিচারকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আইনমন্ত্রীসহ অনেক নারীবাদী সোচ্চার। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারককে সাময়িক বরখাস্ত করাও হয়েছে।
জাতির আজ কী নির্মম পরিণতি! বিচারকের ব্যাপারে বিচার হয়ে গেছে, তবে যে নারীরা নিয়মিতভাবে খারাপ কাজে নিয়োজিত, কিংবা যে আসামিরা ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক কাজে লিপ্ত হয়েছে, তাদের ব্যাপারে কোনো বক্তব্য নেই কারো। সেই ধর্ষকগোষ্ঠী এবং ধর্ষিতা নষ্টা নারীদের বাবা-মায়েদের কী একটুও আফসোস করতে দেখেছে কেউ? না, তারা আফসোস করবে না। কারণ, এটাই অগ্রগতি; স্বাধীন সত্তার বিকাশ।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে এগারো বছরের সাজা হয়েছে দুর্নীতির মামলায়। এই সাজার রায় তাকে উভয় সঙ্কটে ফেলেছে! এই রায়ের বিরোধিতা করে বিচারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললে বলতে হয়- বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা আসলেই প্রশ্নবিদ্ধ। তিনি নিজেও সেই ব্যবস্থার অংশ ছিলেন এবং অনেক মিথ্যা ও ফরমায়েশি রায় দিয়েছেন। বিজয়ের একক সুবিধাভোগীদের আজ্ঞাবহ হয়ে বিগত দশকে দেশের প্রথিতযশা আলেম রাজনীতিবিদদের অবাধে ফাঁসি দিয়েছেন। আজ তার ফলাফল জাতি দেখছে। তার রায় না মানা মানে পূর্বে দেওয়া নিজ রায়গুলোও মিথ্যা ছিলো। রায় মেনে নিলে তিনি দুর্নীতিবাজ প্রমাণিত হবেন। ফলে একজন অসৎ ব্যক্তি হিসেবে পূর্বে দেয়া রায়গুলো যে ভুল ছিলো, তা দিবালোকের মতো সত্য প্রমাণিত হয়।
আসলে তিনি বুঝতে পারেননি, এর নাম আওয়ামী শাসন। তাদের অনুগত হয়ে চলতে হবে, নইলে জেল-জুলুম। না মানলেও জেল-জুলুম। বিজয়ের সুফলভোগীরা এরকম আচরণ করবে। না পছন্দ হলে দেশ ছাড়া হও। দেশে থাকতে হলে কারাগারের জীবন বেছে নাও।

বিজয়ী সর্বনাশা শক্তির বিকাশ
স্বাধীনতার বিকাশ শুরু হয়েছে সত্তরের দশক থেকে। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন মানচিত্র পেয়েছিলো। যার বিকাশ হওয়ার কথা ছিলো নৈতিক মূল্যবোধের আলোকে। তার বিপরীতে ধ্বজাধারী শক্তির প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আজ বাংলাদেশের মালিক বনে গেছে তারা।
আমি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী শক্তির কথা বলছি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে এখনো প্রহর গুনতে হচ্ছে ক্ষুধিত মানুষকে; খাবারের আশায়। এই ক্ষুধিত মানুষ কি শুধু দরিদ্ররা? না, তা নয়। ক্ষমতার চোটে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা উপার্জন বাড়ানোর ধান্ধায় ভেজাল খাদ্য মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে। ভেজাল খাদ্য খেলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে, তার ভয়ে বিত্তবান মানুষরাও না খেয়ে নির্ভেজাল খাবারের আশায় প্রহর গুনছে। কিন্তু সুযোগ তো নেই! ভেজালমুক্ত খাবার জনগণের হাতে পৌঁছার সব রাস্তা তো বন্ধ। কারণ, খাবার মানুষের কাছে পৌঁছাবার সব মাধ্যম ক্ষমতাসীনদের দখলে। দেশটার মালিক যে তারা! ফলাফল হিসেবে ভেজাল খেয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকতে বাধ্য জাতি।
জাতির অধিকাংশ মানুষ আজ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। কেন জানি মনে হচ্ছে, এসব ভেজাল রোধে অপারগ মানুষ সরকারের তাঁবেদারিকে নিয়তি হিসেবে বেছে নিয়েছে। তা না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর শর্ট কোর্সে পরীক্ষা নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন মেনে নেবে? শিক্ষার্থীরা ভাবলেশহীন পন্থায় পথ চলবে, এটা তাদের ফিতরাত। তাই বলে বাবা-মা চুপচাপ বসে থাকবে, ভাবা যায় না। কিন্তু তাই তো দেখছি আমরা। শর্টকাট পদ্ধতির আড়ালে শিক্ষার্থীদের ক্ষতির খতিয়ান খতিয়ে দেখার কেউ নেই। গতিময় বিশে^ পাশের জনের খোঁজ নেবে কে! কেন নেবে!

বাংলাদেশের ব্রেইন হ্যাক
আহারে বাংলাদেশ। জিডিপি বাড়াতে সরকার ব্যস্ত হয়ে পড়েছে টেকনিক্যাল পন্থায়। নাম তার ডিজিটাল বাংলাদেশ। জাতির মেধাশূন্যতার পরিণতি নিয়ে ভাববার সময় কোথায়। বস্তুবাদী বিশ্বের নাগরিক হিসেবে নিজেকে অন্যদেশের কাছে মাথা নুইয়ে করজোড়ে অন্ন নিবেদন করে দিনাতিপাত করাই লক্ষ্য। নিজ পেট পুরলেই বিজয়ের জমকালো উৎসব করতে হবে যে। কারণ, বিজয়ের মালিকানার মালা তো গলে পরে আছে!
এদিকে ডিজিটালের ফাঁদে ফেলে ব্রেইন হ্যাক করে বিদ্যা-বুদ্ধি ও সম্পদ চুরি করার বিপরীতে অপারগ বিজয়ী শক্তির মুখচোরা ভাব সম্পন্ন সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যার জাহির চলছে। কারণ, সে তো বিজয়ের স্বত্বাধিকারী। একটি দেশ চলছে প্রায় বিশ কোটি মানবসম্পদ নিয়ে। সে দেশের মেধা হেফাজতে থাকবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। ট্রান্সমিশন ডিভাইস পেয়ে গেছি, বিরোধী মতের কর্মকাণ্ড জানার সুবিধা পুরোটা নিবো এবার। গর্দভের ব্রেইন হ্যাক হবে, তাতো জানতো না। বিজয়ের মালিকদের যে বেইন হ্যাক হতে পারে, তাতো সত্য হতে পারে না। এ ভাবনা অসত্য হবে, এটা কে জানতো। তবুও চলছে বাংলাদেশ। নিম্নমুখী ট্রেন্ডে। কলের গানের ট্রেন্ড চলছে। গানের লিরিক লিখিত হয়েছে চাটুকার বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা। যারা ব্রেইন হ্যাকের কবলে পড়ে লেজকাটা শেয়ালে পরিণত হয়েছে। তাদের মাধ্যমে বিজয়ের একক সুবিধাভোগীদের হাতে যেন হ্যাক হয়ে পড়েছে গোটা বাংলাদেশের ব্রেইন।

ভাইরাল বিশে^র নাগরিক যখন ভাইরাল বস্তু
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এখন মেটাভার্সের বিশে^ প্রবেশ করেছে। ইউনিভার্সকে ফিল করতে হবে চোখের মণির অতি সন্নিকটে। তাহলেই ভাইরাল বস্তুতে পরিণত হওয়া যাবে। ভাইরাল বিশে^র নাগরিক আজ ভাইরাল বস্তুতে পরিণত হয়েছে। নিজ দুনিয়াকে নিজ আবেগের চারপাশেই রাখতে হবে। মনুষ্য সমাজের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। নিজের প্রোফাইল বানাতে হবে রঙ লাগিয়ে। যে রঙে দুর্গন্ধ থাকলেও দূর করার চিন্তা করতে হয় না। কারণ, দুর্গন্ধময় না হলে তো ভাইরাল হওয়া যাচ্ছে না!
সমাজে নৈতিকতার অভাব হলে মানুষ লুকিয়ে অন্যায় করে। বর্তমানে জাতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নৈতিকতার অধঃপতনের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে অন্যায় মনোভাব পোষণ কিংবা অন্যায়-অনাচারমূলক কাজ সাবলীলভাবেই সরাসরি করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
মাদকের ব্যাপারে সরকারি লাইসেন্স এখন গৌণ। বেশ কিছুদিন আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সফর করে ফিরছিলাম। তখন আমি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। পথিমধ্যে গাড়ি থামিয়ে পুলিশি তল্লাশিতে আমার পাশের সিট থেকে একজন যুবককে নামিয়ে নেয়া হয়। তার ব্যাগে গাঁজা, ইয়াবার প্যাকেট এবং কয়েক বোতল ফেনসিডিল পাওয়া যায়। জেরা করার এক পর্যায়ে যুবক পুলিশকে বলে, এগুলো খাওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ খুব একটা কিছু বলা থেকে বিরত হয়ে যুবককে ছেড়ে দিয়েছিলো। আজ দেখা যাচ্ছে সেইসব যুবকরাই ভাইরাল হচ্ছে; সাহসিকতার কারণে!

মাফিয়াতন্ত্রের কবলে দেশ
ব্যবসা চাকরি অর্থনীতি কিংবা রাজনীতি, সবই আজ মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতের মুঠোয়। স্বাধীনতার শুরু থেকে সবকিছুর উপর নিয়ন্ত্রণ শুরু হয়েছিলো। আজো তার ধারাবাহিকতা দৃশ্যমান। মাফিয়াদের কোনো ধর্ম থাকে না। বিশেষ করে সত্যকে মিথ্যা হিসেবে, অনৈতিকতাকে নৈতিকতা হিসেবে উপস্থাপন করতে তাদের ভাবতে হয় না। জাজ্বল্যমান প্রমাণ হচ্ছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেনা মোতায়েন করা হয়েছিলো সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেয়ার লক্ষ্যে। সেনাবাহিনীর কাজ শুরু হওয়ার আগেই রাতের বেলা ভোট বাক্স ভোট ব্যালটে ভর্তি করা হয়। সেনাবাহিনী নির্বাচনের দিন সারা এলাকা ঘুরে সুষ্ঠু পরিবেশ পান। দিন শেষে চমৎকার নির্বাচনী ফলাফল পায় জাতি। কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট কাস্ট হয়। অসংখ্য আসনে পরাজিত প্রার্থী নিজ দলের পক্ষ থেকে কেন্দ্রে দেয়া এজেন্ট এমনকি নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে থাকা ভোটারের চেয়েও কম ভোট পেয়েছেন। কিন্তু কী করা যাবে। মাফিয়াতন্ত্র মিডিয়াকে কব্জা করেছে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের থাবায়। মিডিয়ার ক্ষমতা নেই সত্য তুলে ধরবার। তাহলে আর দেশে থাকারও অধিকার থাকবে না। অনেকের বেলায় হয়েছেও তাই। সত্য কথা বলেন, এমন মিডিয়াকর্মীকে দেশ ছাড়া করার পর তার পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দি করে নির্যাতন করা হয়েছে। দেশটার মালিকানা যে তাদের!

শিক্ষা কারিকুলাম থেকে ধর্ম শিক্ষাকে ঐচ্ছিক করা হয়েছে। এর বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিকরা কথা বললে তার প্রতিবাদে কতিপয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক মিডিয়ায় বলে, মাতৃভাষা নয় এমন ভাষা জোর করে শেখানো হবে কেন! তাদের প্রতি প্রশ্ন, ইংরেজি কি মাতৃভাষা? না। এমন প্রশ্ন আপনি করতে পারেন না। বিজয়ের একক সুবিধাভোগীরা যেহেতু এই কারিকুলাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, আপনার সন্তানদের জন্য বিষয়টি ক্ষতিকর হলেও আপনাকে তাতে সায় দিয়ে যেতে হবে। বরং পারলে আপনি মাফিয়াতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়ে গেলে স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচবার অধিকার লাভ করবেন। তা নাহলে গুম, খুন, অপবাদের শিকার হবেন, নিশ্চিত।

দলীয় স্কেল দিয়ে ইতিহাস নির্মাণ
ইতিহাসের নির্ধারিত গতিপথ থাকে। আমাদের দেশে ইতিহাস আলাদা করে নির্মাণ করা হয়। সত্য ঘটনাকে খুব অকাট্য মিথ্যার রঙে রাঙানো হয়। এ কাজটির নিপুণতা শৈল্পিকতায় বর্তমান ক্ষমতাসীনরা খুবই পারদর্শী। ত্রিশ লাখ মানুষ হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস নিয়ে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা বিভিন্ন সময় বক্তব্য দিলে তাকে কঠিন পরিণতির শিকার হতে হয়। সম্প্রতি গাজীপুর মহানগর মেয়র জাহাঙ্গীর এই বক্তব্য পেশ করার অপরাধে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক ছিলেন, এই রেকর্ড সবারই শোনা-জানা। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে বক্তব্য দিয়েছেন, বক্তব্যে সেটা বলেছেনও। তারপরও ঘোষণাপত্র থেকে এবং এ সংক্রান্ত ইতিহাস থেকে শহীদ জিয়ার নাম মুছে ফেলা হচ্ছে। এমনকি তার কবরটাও যেন ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায়, সে লক্ষ্যে মাঝে কবর স্থানান্তরের চিন্তা করেছে।

পুরো স্বাধীনতাযুদ্ধে দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বশেষে পুরুষ-মহিলা, শিশু-প্রৌঢ়-বৃদ্ধ সবাই যুদ্ধ করে আমাদের স্বাধীন পতাকা এনে দিয়েছেন। কিন্তু আজ একমাত্র একটি দল এই যুদ্ধের ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তবে আপনি যদি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমকে মেনে নিয়ে তাদের আনুগত্য প্রদর্শন করেন, তাহলে আপনাকেও নতুন করে পুরনো ইতিহাসে স্থান দিতে পারে একমাত্র আওয়ামী লীগই। তার দলিল বুঝে পেতে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে করা মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে হাস্যকর ঘটনা আপনারা ভুলে যাবেন না আশা করি। দলীয় স্কেলে ইতিহাসের নির্মাণ নিয়ে বর্তমানে আওয়ামী লীগের হর্তাকর্তাদের কোনো বিকার নেই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এসব জঘন্য বিষয়গুলোও যে ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে, তার চিন্তা হয়তো তারা করেনি।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকৃতকরণ
ইসলামের আবহে আবহমান কাল থেকে বাংলার মানুষ এবং পুরো ভারতীয় উপমহাদেশ পরিচালিত হয়েছে। এদেশের মানুষের মন মগজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতি। ইসলামের পরিপূর্ণ রূপ সম্পর্কে ধারণা অধিকাংশ মুসলিমের না থাকলেও ইসলামের আদলে চলার এই চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে, এটা ভাবতেও চায় না বাংলাদেশের মুসলমানরা। তারই আলোকে মানুষ মসজিদে যায় জামায়াতে নামাজ আদায় করতে। আল্লাহ ও রাসূল সা. এবং ইসলামের স্বার্থ বিনষ্ট হবে, এমন পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। টুপি-দাড়িওয়ালা কিংবা পর্দানশীন মা-বোনদের প্রতি আলাদা শ্রদ্ধার পরিবেশ নিশ্চিত করে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সেভাবে গড়ার উদ্যোগ নেয়। ইসলামের অমান্য করে অন্যায় পরিবেশে সম্পৃক্ত হওয়াকে মন থেকে ঘৃণা করে। এটাই এই জনপদের বাস্তবতা। দুঃখজনকভাবে বর্তমান সরকার এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সভ্যতা সংস্কৃতি থেকে ইসলামী ধারা সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় থেকেছে এবং যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করেছে।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থেকে বেরুনোর উদ্যোগ আওয়ামী লীগের আজন্ম স্বপ্ন। ১৯৭২ সাল থেকেই চেষ্টা করে আসছে। সম্প্রতি একজন মন্ত্রী সরাসরি ক্যাম্পেইনিং-এ নেমেছেন। ইসলামবিমুখ এরকম উদ্যোগ যে সভ্যতা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে দেশের সচেতন মুসলিম নাগরিকরা যখনই সোচ্চার হয়েছে, তখন তাদের উপর খড়গহস্ত হয়েছে। তাদের গুলি করে ফাঁসি দিয়ে হত্যা, গুম করা, নির্যাতন করা, কারাগারে বন্দি করে রাখার ঘটনা এখন মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে।
র‌্যাগ ডে, থার্টিফার্স্ট নাইট, ভালোবাসা দিবস, পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা তো আমাদের দেশের সংস্কৃতি ছিলো না। ইহুদি-খ্রিষ্টান-হিন্দু-বৌদ্ধদের সকল আচার-অনুষ্ঠান সুকৌশলে এবং ক্রমান্বয়ে আমাদের কোমলমতি শিশু-কিশোরদের মনে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষা কারিকুলামের মাধ্যমে তার প্রাতিষ্ঠানিকতা নিশ্চিত করছে। সম্প্রতি একটি ভাইরাল ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আপনারা দেখে থাকবেন। যেখানে একটি স্কুলের শিক্ষকদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা সবসময় শ্রদ্ধার পাত্র। কিন্তু মুসলিম শিক্ষকদের মুসলিম ছাত্রীরা হিন্দুদের মতো হাতজোড় করে মাটিতে মাথা নুইয়ে শুভেচ্ছা জানাবে, এটা তো নির্ঘাত শিরক (আল্লাহর সমকক্ষ বানানো)। এরকম অসংখ্য সংস্কৃতি আজ বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তরে প্রান্তরে নিশ্চিত করা হচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে মুসলিম সভ্যতায় বেড়ে ওঠা একটি জাতিকে চাতুরতার সাথে বিশ^বিখ্যাত নষ্ট সভ্যতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

নগ্ন প্রতিশোধপরায়ণ
আপনাকে আমার পছন্দ না, তাই আপনার আর বেঁচে থাকার অধিকার নেই। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা, তাই তাকে বিনা চিকিৎসায় মেরে ফেলতে হবে। তার দলকে মুছে ফেলতে হবে দেশ থেকে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এই দলের মতো করে কার্যক্রম পরিচালনা করে, এমন সকল দলকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে। এজন্য দলের শীর্ষ নেতাদের মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কারাগারে ফাঁসির অপেক্ষায় কিংবা আমরণ কারাদণ্ড দিয়ে রাখা হয়েছে অনেককে। আলেমসমাজ তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সকল শীর্ষ আলেমকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। এ এক অনন্য দুঃখজনক প্রতিশোধের খেলায় মেতে উঠেছে তারা।
এই যে তাদের নগ্ন প্রতিশোধপরায়ণতা, তার ব্যাপারে কেউ কথা বললে তাকেও মেরে ফেলা হয়। একজন সাংবাদিককে কারাগারেই হত্যা করা হয়েছে। সত্য তুলে ধরার অপরাধে অনেক সাংবাদিক এখনো কারাগারে রয়েছেন। তারা শেষ পর্যন্ত জীবিত বের হতে পারবেন কিনা, আজ তা অবিশ^াসের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। অসংখ্য সাংবাদিক এই রোষানলের তোপে গোপনে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয় যে মিথ্যা সাক্ষ্য এবং সরকারের নির্দিষ্ট চাপের মাধ্যমে চলেছে, তার গোপন অডিও এবং নথিপত্র ফাঁস হওয়ার পরও বিচার চলেছে, ফাঁসি হয়েছে এবং যারা ফাঁস কার্যের সাথে সম্পৃক্ত হিসেবে ধরা পড়েছেন, তাদেরও নির্মম পরিণতির শিকার হতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার এই অন্যায় কার্যক্রমগুলো বুক ফুলিয়ে করে। নিজেদেরকে অমুসলিম পরিচয় দিয়ে মুসলিমদের ধ্যান-ধারণার উপর আঘাত করলে মানা সহজ। কিন্তু ইসলামের ধারক বাহক হিসেবে নিজেদের প্রচার করে এহেন কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা ভাবা কঠিন।

স্বাধীনতার অর্জন সবার নয়, তা সত্য নয়
আপনি নদীর পানির হিস্যা নিয়ে কথা বলতে পারেন না। সীমান্তে দেশের নাগরিকের লাশ পড়ে থাকবে, চুপ থাকবেন। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে গাড়ি থেকে নিয়মিত চাঁদা নিবে, দেখবেন শুধু। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রাজপথে রাষ্ট্র সংক্রান্ত কোনো কথা বলবার অধিকার রাখবেন না। আপনি কোনো মতাদর্শ লালন করতে পারবেন, তা ইসলাম হোক কিংবা অন্যকোনো; তবে তা নামকাওয়াস্তে। নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে হেয় কিংবা কটাক্ষ করার প্রতিবাদ কিংবা ওএমএস-এর চাল মেরে খাওয়ার বিরুদ্ধে কথা বলবেন না। কারণ, আপনি স্বাধীনতার স্বপক্ষের একমাত্র দলিলধারী দলের অনুসারী না। অন্য কোনো দলে কিংবা এককভাবে কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতার পক্ষাবলম্বনকারী হতে পারে না। এটা এক দলের দেশ, মানতেই হবে আপনাকে।
আপনি না-মানাদের দলে অবস্থান নিতে চাইলে আপনাকে সোচ্চার হতে হবে। অশ্লীলতা-বেহায়াপনার চরম পরিণতি থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য আগামীর নৈতিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অগ্রসেনানীদের এগিয়ে আসতেই হবে। এ জাতির ভাগ্যাকাশের কালোমেঘ সরানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে শেষ রিসালাতের দাবি অনুসারে। আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়কার পরিবেশও এমনটাই ছিলো। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে ডাক দিয়েছিলেন অন্যায়-অনাচারের বিরুদ্ধে।
লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

SHARE

Leave a Reply