বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় রাসূল সা.-এর গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

মানুষের কাছে সর্বাধিক আরাধ্য বিষয় শান্তি। ব্যক্তির অধিকারে যখন সব কিছু থাকে তখন সে একমাত্র শান্তি ছাড়া আর কিছুই কামনা করে না। এটি শুধু মানব জীবনের চাহিদা তা নয়, বরং মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীতে এটা প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটি পরিপূর্ণ মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে ক্ষেত্রে তিনি যেমন থিওরি প্রদান করেছেন, তেমনি তা বাস্তবায়নের জন্য ল্যাবরেটরি এবং শিক্ষকও প্রেরণ করেছেন। বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহান আল্লাহ বিভিন্ন আয়াত তথা থিওরি নাযিল করেছেন এবং তা প্র্যাকটিকাল করার জন্য হযরত মুহাম্মদ সা.কে প্রেরণ করেছেন। তাঁর মাধ্যমে মানুষ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, আসমান জমিন এবং সর্বোপরি বিশ্বব্যবস্থার সাথে শান্তিপূর্ণ যে অসাধারণ ব্যালান্স নির্ধারণ করেছেন তার বর্ণনা পবিত্র কুরআন ও হাদিসে ভরপুর। এর সবগুলো একত্রে জমা করা এ প্রবন্ধে সম্ভব নয়। তথাপি বিশ^ শান্তির জন্য কুরআনিক থিওরির কিছু উল্লেখ করার পূর্বে শান্তির পরিচয় জানা প্রয়োজন।
শান্তি বা Peace-কে একজন গ্রিক দার্শনিক The greatest good. বলে অভিহিত করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন: as a means to implement other social and individual goals. তবে Cheng and Kurtz বলেছেন: Peace is not simply lack of war or no violence; peace means the eradication of all facts of injustice. (কেবল যুদ্ধ এবং সন্ত্রাস না থাকার নাম শান্তি নয়, বরং শান্তি হচ্ছে অন্যায়ের সকল উপাদান বিলুপ্ত করণ।)

আল কুরআন ও আল হাদিসের আলোকে বিশ^শান্তি
মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ

রাসূল সা. বলেন-
عن أبي هريرة قال : قيل : يا رسول الله ، ادع على المشركين ، قال : ” إني لم أبعث لعانا ، وإنما بعثت رحمة ” . انفرد بإخراجه مسلم
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, বলা হলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদ-দুআ করুন। তিনি বললেন: নিশ্চয় আমি লানত করার জন্য প্রেরিত হইনি। বরং আমি রহমত হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছি।
আল্লাহ এরশাদ করেন-
ورَحمتي وسِعت كل شيء فسأكتبها للذين يتّقون ويؤتون الزكاة والذين هم بآياتنا يؤمنون الذين يتبعون الرسول النبي الأمي

কিন্তু আমার অনুগ্রহ সব জিনিসের ওপর পরিব্যাপ্ত হয়ে আছে ৷ কাজেই তা আমি এমন লোকদের নামে লিখবো যারা নাফরমানি থেকে দূরে থাকবে, যাকাত দেবে এবং আমার আয়াতের প্রতি ঈমান আনবে ৷
মহান আল্লাহ বলেন-
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا ۚ إِنَّ رَحْمَتَ اللَّهِ قَرِيبٌ مِّنَ الْمُحْسِنِينَ

দুনিয়ায় সুস্থ পরিবেশ বহাল করার পর আর সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না ৷ আল্লাহকেই ডাকো ভীতি ও আশা সহকারে ৷ নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীল লোকদের নিকবর্তী ৷
আল্লাহ বলেন-
تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ ۚ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَٰكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ ۗ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا
তাঁর পবিত্রতা তো বর্ণনা করছে সাত আকাশ ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যে যা কিছু আছে সব জিনিসই ৷ এমন কোনো জিনিস নেই যা তাঁর প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছে না, কিন্তু তোমরা তাদের পবিত্রতা ও মহিমা কীর্তন বুঝতে পারো না ৷ আসলে তিনি বড়ই সহিষ্ণু ও ক্ষমাশীল৷
মহান আল্লাহ বলেন-
وَالْأَرْضَ وَضَعَهَا لِلْأَنَامِ- فِيهَا فَاكِهَةٌ وَالنَّخْلُ ذَاتُ الْأَكْمَامِ -وَالْحَبُّ ذُو الْعَصْفِ وَالرَّيْحَانُ
মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلَّا أُمَمٌ أَمْثَالُكُم ۚ
ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল কোন প্রাণী এবং বাতাসে ডানা বিস্তার করে উড়ে চলা কোন পাখিকেই দেখ না কেন, এরা সবাই তোমাদের মতই বিভিন্ন শ্রেণী ৷
প্রাগুক্ত আয়াত এবং হাদিসের আলোকে দেখা যায় আল্লাহ তায়ালা বিশ^প্রকৃতি, জীবনের সাধারণ দিকসমূহ এবং পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল সকল প্রাণীর মধ্যকার সম্পর্ক এ সব কিছু মিলে পরিণত হয়েছে একই পরিবারে। এর সূচনাস্থল এক ও অভিন্ন। এদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে এক ঐক্য, নৈকট্য ও আত্মীয়তা। ফলে সেখানে বিনির্মাণ হয়েছে এক চিরশান্তিময় পরিবেশ। যা বিশে^র সকল স্থানে বিরাজমান।
আল কুরআনের আলোকে জানা গেলো মহান আল্লাহ সমগ্র বিশ^ জাহানকে শান্তিময় করার জন্যে অসংখ্য আয়াত নাযিল করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.কে প্রেরণ করেছেন। এখন একটু দেখা যাক আধুনিক থিওরিতে শান্তির আলোচনা কোন প্রকার হতে পারে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বর্তমান পৃথিবীতে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত বেশ কিছ পদ্ধতি রয়েছে।
১. Tolerance (সহনশীলতা),
২. Avoidence (এড়িয়ে চলা)
৩. ঘবমড়ঃরধঃরড়হ (আপসে মীমাংসা করা)
৪. গবফরধঃরড়হ (মধ্যস্থতা)
৫. অৎনরঃৎধঃরড়হ (সালিশি করা)
৬. অফলঁফরপধঃরড়হ (বিচারপূর্বক সিদ্ধান্ত)
৭. ঈড়বৎপরড়হ (দমন)
বর্তমানে জাতিসংঙ্ঘ নানা পদ্ধতি অবলম্বন করে দুনিয়ায় শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করছে। তাদের প্রচেষ্টাগুলোর অন্যতম পদ্ধতি হচ্ছে চৎবাবহঃরাব উরঢ়ষড়সধপু ধহফ গবফরধঃরড়হ, চবধপবশববঢ়রহম, চবধপব নঁরষফরহম, ঈড়ঁহঃবৎরহম ঞবৎৎড়ৎরংস, উরংধৎসধসবহঃ (নিরস্ত্রীকরণ)
মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর সময় এমন থিওরি আবিষ্কার হয়নি, তথাপি তিনি সমগ্র দুনিয়ায় শান্তির প্রতীক, শান্তির বাস্তবায়নকারী হিসেবে পৃথিবীর বুকে একমাত্র সর্বোত্তম মডেল হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। এবং প্রাগুক্ত সব আধুনিক থিওরি তাঁর কর্মে প্রয়োগ করেছেন। পৃথিবীর এমন কোন মনীষী নেই যারা এর স্বীকৃতি প্রদান করেননি। তার মধ্যে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পরে ব্রিটেনের প্রখ্যাত নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ (১৮৫৬-১৯৫০ খ্রি.) বলেছিলেন:
ও নবষরবাব ঃযধঃ রভ ধ সধহ ষরশব যরস বিৎব ঃড় ধংংঁসব ঃযব ফরপঃধঃড়ৎংযরঢ় ড়ভ ঃযব সড়ফবৎহ ড়িৎষফ, যব ড়িঁষফ ংঁপপববফ রহ ংড়ষারহম রঃং ঢ়ৎড়নষবসং রহ ধ ধিু ঃযধঃ ড়িঁষফ নৎরহম ঃযব সঁপয হববফবফ ঢ়বধপব ধহফ যধঢ়ঢ়রহবংং.
আমি বিশ^াস করি, যদি তাঁর মত ব্যক্তি আধুনিক বিশে^র একচ্ছত্র শাসক হতেন তাহলে তিনি সমস্যাগুলোর সমাধান এমনভাবে আনতেন যে বিশ^ বহুল প্রত্যাশতি শান্তি এবং সুখে ভরে উঠত।
বিশ^ব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে সব কার্যকারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাসূল সা. সেগুলো পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছেন, বিশ^বাসী তা অবলোকন করেছে। আধুনিক বিশে^ যারা শান্তি নিয়ে কাজ করছেন এবং যেসব কার্যকারণে শান্তি আসলে বিশ^ব্যাপী শান্তি আসবে মনে করেন, সে সকল স্থানে রাসূল সা.-এর অবদান কেমন ছিলো সেদিকসমূহ আলোকপাতকরা হলো।

১. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
রাসূলুল্লাহ সা.-এর রিসালাতের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমাজের সকল স্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। মহান আল্লাহ রাসূল সা. কে নির্দেশ প্রদান করে বলেন-
فَلِذَٰلِكَ فَادْعُ ۖ وَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ ۖ وَقُلْ آمَنتُ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ مِن كِتَابٍ ۖ وَأُمِرْتُ لِأَعْدِلَ بَيْنَكُمُ ۖ اللَّهُ رَبُّنَا وَرَبُّكُمْ ۖ لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ ۖ لَا حُجَّةَ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ ۖ اللَّهُ يَجْمَعُ بَيْنَنَا ۖ وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ
যেহেতু এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাই হে মুহাম্মাদ এখন তুমি সেই দীনের দিকেই আহবান জানাও এবং যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো সেভাবে দৃঢ়তার সাথে তা আঁকড়ে ধরো এবং এসব লোকের ইচ্ছা আকাক্সক্ষার অনুসরণ করো না ৷ এদের বলে দাও, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তার ওপর ঈমান এনেছি ৷ আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করি ৷ আল্লাহই আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব তিনিই৷ আমাদের কাজকর্ম আমাদের জন্য আর তোমাদের কাজকর্ম তোমাদের জন্য ৷ আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন বিবাদ নেই ৷ একদিন আল্লাহ আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন৷ তাঁর কাছেই সবাইকে যেতে হবে ৷”
আল কুরআনের নির্দেশনা অনুসারে তিনি সকলকে ন্যায়ানুগ সমাজের দিকে আহবান করেছেন। তিনি নিজেকে সকল স্থানে ন্যায়ের মানদ- হিসেবে উপস্থাপন করার পাশাপাশি অশান্তি, অন্যায়, জুলুম-নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, হানাহানি থেকে মানবতাকে রক্ষা করার জন্য নবুয়াত প্রাপ্তির আগেই মাত্র চৌদ্দ বা পনেরো বছর বয়সে হিলফুল ফুজুল নামে সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এর নামকরণের মাঝেই মানুষের ন্যায়বিচারের রূপরেখা বিদ্যমান। এ ব্যাপারে বলা হয়েছে-
কেননা তারা এই মর্মে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তাঁরা নিজেদের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবে। তাঁদের কোন ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্বল ব্যক্তির ওপর জুলুম করলে তা প্রতিহত করা হবে এবং কোন স্থানীয় লোক কোন বিদেশী অভ্যাগতদের হক ছিনিয়ে নিলে তা ফিরিয়ে দেয়া হবে।
তিনি মানবতার জন্য এসব কাজ করেছেন। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। তার নিকট ধনী গরিব, ছোট-বড়, মুসলিম-অমুসলিম কোন ভেদাভেদ ছিলো না। একবার মাখযুম গোত্রের সম্ভ্রান্ত এক মহিলা চুরি করলো তখন উসামা রা. তার ওপর শাস্তির বিধান কার্যকর না করার জন্য রাসূল সা.-কে সুপারিশ করলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন-

أتَشْفَعُ في حَدٍّ من حُدُود اللّه تعالى؟ ثم قام، فاخْتَطَبَ، ثم قال : “إِنَّما أَهْلَكَ الذين مِنْ قَبْلِكم أَنَّهم كانوا إِذا سَرَقَ فيهم الشَّرِيفُ تَرَكُوه، وإِذا سَرَقَ فيهم الضَّعِيفُ أقاموا عليه الحَدَّ، وايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فاطمةَ بِنْتَ محمدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَها”.

তুমি কি আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ করছো? অতঃপর তিনি দাঁড়ালেন এবং লোকদের উদ্দেশে খুতবায় বললেন, ‘হে মানুষেরা তোমাদের পূর্ববর্তীগণ ধ্বংস হয়েছে এ জন্য যে, যখন তাদের মাঝে মর্যাদাশীল কেউ চুরি করেছে তাকে ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতো তখন তার ওপর শাস্তি কায়েম করা হতো। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করতো আমি অবশ্যই তার হাত কেটে দিতাম।
একবার ক্ষেতে পানি সেচ দেয়াকে কেন্দ্র করে জনৈক ইহুদি ও মুসলমানের মধ্যে বিবাদ বাধে। মুসলমান ব্যক্তিটি এর বিচার দেন নবী কারীম সা.-এর নিকট। তার আশা ছিল নবী কারীম সা. তার পক্ষই রায় দেবেন, কারণ তিনি একজন মুসলমান। ন্যায়ের প্রতীক মুহাম্মদ সা. ঘটনা শ্রবণ করে ইহুদি সঠিক থাকায় তার পক্ষে রায় দিলেন। মুসলমান ব্যক্তিটি এ রায়ে সন্তুষ্ট হতে না পেরে পুনরায় বিচারের জন্য উমর রা. এর নিকট গেলেন। সব শ্রবণ করে উমর রা. তলোয়ার দ্বারা তার গর্দান উড়িয়ে দিয়ে বললেন, যে ব্যক্তি রাসূল সা.-এর ফায়সালা মানে না তার জন্য এটিই উত্তম ফায়সালা।
বানু নযীর যখন বানু কুরায়যার কোন ব্যক্তিকে হত্যা করতো তখন অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করত, আর যখন এর বিপরীত হতো তখন বানু কুরায়যাকে পূর্ণ রক্তমূল্য দিতে হতো। অতঃপর আল কুরআনের এ আয়াত নাযিল হলো-
فَإِن جَاءُوكَ فَاحْكُم بَيْنَهُمْ أَوْ أَعْرِضْ عَنْهُمْ ۖ وَإِن تُعْرِضْ عَنْهُمْ فَلَن يَضُرُّوكَ شَيْئًا ۖ وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
তখন নরাসূল সা. উভয় গোত্রের জন্য সমান রক্তপণ নির্ধারণ করলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত আর কেউ স্থাপন করতে পারেনি।

২. দারিদ্র্য দূরীকরণ
কোন ব্যক্তি সফলতার সাথে কোথাও শান্তি আনয়ন করতে সক্ষম হবে না যদি না সে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সফল হয়। রাসূল সা. সে ব্যাপারে শতভাগ সফল হয়েছেন। তিনি হিজরত করে মদিনায় আগমনের পর মদিনায় খুব অভাব অনটন লক্ষ করলেন। একদিকে আনসার সাহাবীগণ দরিদ্র অন্যদিকে মুজাজির সাহাবীগণ রিক্ত হস্ত। এ কঠিন ক্রান্তিলগ্নে তিনি এ কঠিন সমস্যার সমাধান যেভাবে করেছেন তা হলো-
ক. মুয়াখাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে: রাসূল সা. ৪৫ জন আনসার এবং ৪৫ জন মুহাজির মোট ৯০ জনের মাঝে মুয়াখাহ প্রতিষ্ঠা করেন। আল বালাজুরী তার আনসাব গ্রন্থে বলেছেন, এমন কোন আনসার ছিলেন না যার সাথে কোন মুহাজিরের মুয়াখাহ হয়নি। ময়াখার অনুপম একটি বর্ণনা এমন রয়েছে যে, সা‘দ ইবন আল বার মুহাজির আব্দুর রহমান বিন আওফকে বললেন, “আমার আমার যে সম্পত্তি রয়েছে আমি তা আমাদের মাঝে ভাগ করে নিতে চাই। আমার দু’জন স্ত্রী আছে, আপনি তাদের কাকে পছন্দ করবেন, দেখুন আমি তাকে তালাক দেব, যাতে আপনি যথাসময়ে তাকে বিয়ে করতে পারেন।” রাসূল সা. এরকম অসাধারণ সম্পর্ক বিনির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ক. মোটিভেশন: আহলে সুফ্ফায় যারা থাকতেন তাদের প্রধান খাবার ছিলো খেজুর। রাসূল সা. প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ খেজুর দিতেন খাবার জন্যে তখন তারা অনুযোগ করে বলতেন এ খাবারে তাদের পেট ব্যথা করে, কিন্তু আল্লাহর রাসূল তাদেরকে এ ছাড়া আর কোন খাবার দিতে পারতেন না। তিনি তাদেরকে সবর করার উপদেশ এবং সান্ত¡না প্রদান করতেন।
খ. অগ্রাধিকার প্রদান: মক্কার মুহাজিরগণ ছিলেন ব্যবসায় পারদর্শী কিন্তু মদিনার অর্থনীতি ছিলো কৃষি ও হস্ত শিল্প নির্ভর যার দক্ষতা মুহাজির সাহাবীদের ছিলো না। এজন্য তাদের অবস্থা খুব অসহায় হয়ে যায়। এমতাবস্থায় আনসারগণ তাদের ভাইদের দিকে নিঃস্বার্থভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন-
وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ ۚ
তারা যত অভাবগ্রস্তই হোক না কেন নিজেদের চেয়ে অন্যদের অগ্রাধিকার দান করে৷
আনসারদের উদারতা এতটাই বেশি ছিলো যে তারা নিজেদের খেজুর গাছগুলো মুহাজিরদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য রাসূল সা. এর কাছে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন, যদিও তাদের অনেকের আয়ের একমাত্র উৎস ছিলো এই খেজুর। নবী সা. আনসারদেরকে খেজুর বাগান নিজেদের মাঝে রেখে পরিচর্যা করার এবং উৎপন্ন খেজুর মুহাজিরদের মাঝে ভাগ করে নেয়ার পরামর্শ দেন।
গ. খাবার ভাগাভাগি করার মাধ্যমে : নবী করিম সা. দারিদ্র্য দূর করণের আরো একটি অমসাধারণ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি বলেছেন-
من كان عنده طعام اثنين فليذهب بثالث، ومن كان عنده طعام أربعة فليذهب بخامس أو سادس
যার কাছে দু’জনের খাবার আছে সেখানে তিনজন যাওয়া উচিত, আর যার কাছে চার জনের খাবার আছে তার কাছে পাঁচ অথবা ছয়জন যাওয়া উচিত।
এ ছাড়া যাকাত, ফিতরা, ‘উশর, ফাই, গনিমতসহ আরো অনেক পদ্ধতি অবলম্বন করার মাধ্যমে একমাত্র রাসূল সা. খাদ্য সঙ্কটের একটি ধীর অথচ দারিদ্র্যবিনাশী স্থায়ীপদ্ধতি সমাজে কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

৩. টেকসই পরিবেশ সৃষ্টি
টেকসই পরিবেশ আধুনিক বিশে^ শান্তি রক্ষার একটি উন্নতমানের পদ্ধতি। এ পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ^ব্যবস্থায় শান্তি আসতে পারে। এটা দু’ভাবে হতে পারে।
এক: নানা ধরনের হুমকি থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা। রাসূল সা. যখন মদিনায় হিজরত করেন তখন মুহাজির ও আনসারগণ ইহুদিদের সাথে সাতচল্লিশটি ধারা সংবলিত একটি চুক্তিনামা প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে মুসলিম এবং ইহুদিগণ একমত হয় যে, কেউ যদি মদিনায় আক্রমণ করতে আসে, তাহলে সম্মিলিতভাবে তাদের প্রতিহত করা হবে বলে ঐকমত্য পোষণ করে। এ ক্ষেত্রে নিজেরাই নিজেদের ব্যয় বহন করবে বলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ চুক্তির ৩৯ নং ধারায় বলা হয়-
এ চুক্তির আওতাধীন ব্যক্তিবর্গের জন্য মদীনা হবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
এর ৪৩ নং ধারায় বলা হয়-
কুরাইশ এবং তাদের সাহায্যকারীদের আশ্রয় দেয়া যাবে না।
দুই: নিজ হাতে পরিবেশকে অস্থিতিশীল করা। রাসূল সা. উন্নত এবং টেকশই পরিবেশ গড়ার জন্য গাছ লাগানোর জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন। আর পরিবেশের জন্য হুমকি সব কিছু পরিহার করতে বলেছেন। তিনি বলেন-
إِنْ قَامَتْ السَّاعَةُ وَبِيَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَفْعَلْ
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত: নবী করিম সা. বলেন, যদি কিয়ামত সংঘটিত হয় আর তোমাদের করো কাছে গাছের চারা থাকে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে যদি সুযোগ পায় তা যেন রোপণ করে নেয়।
গাছ নিধন না করার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন:
مَنْ قَطَعَ سِدْرَةً صَوَّبَ اللَّهُ رَأْسَهُ فِي النَّار
হযরত আবদুল্লাহ বিন হুবশী রা. থেকে বর্ণিত নবী সা. বলেন: যে ব্যক্তি কুল গাছ নিধন করল, আল্লাহ তায়ালা তার মাথাকে জাহান্নামের জন্য নির্ধারণ করবেন।
এ ছাড়াও বৈশি^ক উষ্মতা কমানো, অপচয় রোধ করা ও অন্যায়-অপকর্ম করার নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে টেকসই পরিবেশ গঠনের অসংখ্য নির্দেশনা দিয়েছেন।

৪. সংলাপ ও যোগাযোগ
নবী করিম সা. প্রথম ব্যক্তি যিনি সবার সাথে খুব বেশি যোগাযোগ রক্ষার তাকিদ দান করেছেন। পরস্পরের কাছে আসা, কাছে থাকা এবং সহযোগিতা করা এটা তারই আদর্শ। আধুনিক বিশে^ শান্তির থিওরি প্রবক্তাগণ তা গ্রহণ করেছেন। তিনি রোমের কায়সার, ইরানের শাহানশাহ খসরু পারভেজ, মিশরের প্রশাসক মুকাওকাস, ইয়ামামার প্রশাসক হাওযা ইবন আলী, দামেশকের হারিস ইবন আবী শামর গাসাসনীর নিকট সেই ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে এসব দাওয়াতনামা প্রেরণ করেন। এসব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে। তিনি সংলাপ এবং যোগাযোগ রক্ষার জন্য বলেছেন-
للمؤمن على المؤمن ست خصال: يعوده إذا مرض, ويجيبه إذا دعاه, ويشمته إذا عطس, و يتبع جناجه, وينصح له إذا غاب أو شهد.
একজন মুমিনের প্রতি আরেকজন মুমিনের ছয়টি হক রয়েছে। সে যখন রোগাক্রান্ত হবে তার কাছে যাবে, যখন সে দাওয়াত দিবে তা গ্রহণ করবে, যখন হাঁচি দিবে তার উত্তর দিবে, তার জানাজায় শরিক হবে এবং তার পেছনে এবং সামনে সৎ নসিহত করবে।
এ হাদিসের দ্বারা মানুষের সাথে সবসময় যোগাযোগ রক্ষার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। অন্য হাদিসে এসেছে-
و أصل من قطعني
আমি তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করি যে আমার সাথে ছিন্ন করে
তিনি কখনও কোন ব্যক্তির ওপর চাপ প্রয়োগ করে, জোর করে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন কিছু করেননি। সংলাপ ও যোগাযোগেরর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কোমল ভাষা ব্যবহার করেছেন। এজন্য কোন কোন ব্যক্তি তাঁর চিঠি পেয়ে আনন্দে বিগলিত হয়েছোন, কেউ বা ক্রন্দন করেছেন। তার এ দেখানো পদ্ধতির নিরিখে অষনবৎঃ ঋরহংঃবরৎ বলেন-
চবধপব পধহহড়ঃ নব শবঢ়ঃ নু ভড়ৎপব. ওঃ পধহ ড়হষু নব ধপযরবাবফ নু ঁহফবৎংঃধহফরহম.

৫. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান নিশ্চিত করা
অর্থাৎ একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান করা। শিক্ষার ব্যাপারে তিনি বলেন : ‘যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য বের হলো তার জন্যে মহান আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। তিনি বদ্ধ পানিতে প্রসাব করতে বা মল-মূত্র ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন, কেননা তাতে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। তিনি বলেন-
لَا يَبُولَنَّ أَحَدُكُمْ فِي الْمَاءِ الرَّاكِدِ، ثُمَّ يَغْتَسِلُ مِنْهُ
তোমাদের কেউ বদ্ধ পানিতে প্রসাব করবে না, যেখানে গোসল করে। হাদিস শরীফে আরো এসেছে- খোলা আকাশের নিচে, দরজা বন্ধ না করে রাসূল সা. ঘুমাতে নিষেধ করেছেন। ঘরের ভিতরে আগুন নিভিয়ে এবং ঘুমানোর স্থান ঝাড়– দিয়ে শয্যা গ্রহণ করতে বলেছেন। অন্যথায় স্বাস্থ্য হানিকর অনেক কিছু ঘটতে পারে। তিনি বলেছেন ‘স¦াস্থ্য রক্ষা এবং সুস্থতার জন্য পেটের তিন ভাগের একভাগ পানি, একভাগ খাবার এবং একাংশ খালি রাখতে। মানবতার জন্য মহান শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়ে পৃথিবী ব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে এসব মৌলিক ব্যাপারে যা বলেছেন দুনিয়ার আর কেউ কখনও তা বলেনি।
এ ছাড়া তিনি সমগ্র বিশে^ শান্তি স্থাপনের জন্য মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা প্রদান, নারীদের যথাযথ অধিকার সংরক্ষণ, জেন্ডার সমতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ, এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সংলাপের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে সমগ্র বিশে^ শান্তি প্রতিষ্ঠার স্থায়ী সমাধান প্রদানে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। এজন্য
তাঁর বিশ^াসের জন্য নির্যাতন সহ্য করার মানসিকতা, যারা তাকে বিশ^াস করতেন তাঁদের অত্যন্ত উন্নত চরিত্র, এবং তাঁকে নেতা হিসেবে স্বীকার করার দৃঢ়তা এবং তাঁর চূড়ান্ত অর্জন- সব কিছুই তার মৌলিক চারিত্রিক শুদ্ধতার নির্দেশক। এটা অবশ্য সত্য যে, মুহাম্মাদকে পাশ্চাত্যে যেভাবে ভুল বোঝা হয়েছে ইতিহাসের অন্য কোন মহৎ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তেমন হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের উচিত, মুহাম্মদের মৌলিক সততা এবং লক্ষ্য অর্জনের একাগ্রতা স্বীকার করা অতি জরুরি এবং অতীতের ভ্রান্তিগুলো সরিয়ে ফেলা জরুরি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক; আরবি বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply