ভর্তিযুদ্ধ স্বল্প সময়ে স্বপ্নপূরণ -রাশেদুল ইসলাম

অ্যাকটিভ একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ইতোমধ্যে বারোটি বছর যারা অতিক্রম করেছেন, তাদের জন্য আমার এই লেখা। যারা জীবন নিয়ে স্বপ্ন বুনতে কঠোর পরিশ্রমকেই বেছে নেন সবসময়। এই বেলায় উচ্চমাধ্যমিক রেজাল্টও হাতে চলে এসেছে। কাক্সিক্ষত রেজাল্ট সঙ্গে করে এবার ফাইনালি ছুটে চলতে হবে সঠিক লক্ষ্যপানে।
হাতে সময় খুব কম। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার তারিখও নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। তাই বলেতো আর ক্যালেন্ডারের পাতা গুনলে চলবে না! স্বল্প সময়ে অধিক পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বপ্ন পূরণ করতে হবে।
এই স্বপ্ন পূরণের পথে চলার শুরুতে আমাদের ভাবতে হবে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি বিষয়। আমি কী জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাই-
সার্টিফিকেট অর্জন করে চাকরির মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য?
সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করার জন্য?
প্রথম বিষয়টির প্রতি ঝোঁক প্রবণতা সমাজের অধিকাংশ মানুষের। কারণ, তাদের মূল্যায়নটা শুধু নিজের কাছে। মহান আল্লাহর দেয়া দায়িত্বকে তারা দায়িত্ব হিসেবে উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহ যে মানুষের কল্যাণের জন্যই আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, এটা বুঝতে হবে এবং সে লক্ষ্যেই নিজেকে তৈরি করতে হবে।
আল্লাহ বলেছেন- তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে।
(আল কুরআন ৩:১১০)
তাই বলে কি দুনিয়ার কল্যাণকর বিষয়ের প্রতি পা বাড়ানো চলবে না! আলবৎ; সে উদ্যোগও বৈধ।
আল্লাহ বলেছেন-আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে- হে পরওয়ারদেগার! আমাদেরকে দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করো এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করো এবং দোজখের আজাব থেকে রক্ষা করো। এদেরই জন্য নিজেদের উপার্জিত সম্পদের অংশ রয়েছে। আর আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (আল কুরআন ২:২০১-২০২)

অর্থাৎ, দুনিয়ার কল্যাণকর সবকিছু পেতে হলে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। ক্যারিয়ার গঠনের উদ্দেশ্য হবে মানবতার কল্যাণে ভূমিকা পালন করা। একজন মুসলিম তরুণ হিসেবে মানবতার কল্যাণে অবদান রাখার জন্যই মেধার বিকাশ ঘটাতে হবে।
রাসূল (সা.) বলেছেন-যে ব্যক্তির জ্ঞান (দ্বীন ও মানবতার) কল্যাণে আসে না, তা কৃপণ মনের মতো- যা থেকে আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় হয় না। (আহমদ)

এইটুকু আলোচনার পর আমরা বর্তমান সংক্ষিপ্ত সময়ে করণীয় সম্পর্কে কিছু পয়েন্টে কথা বলবো। যেহেতু আমাকে সফল হতেই হবে, তাই অ্যাডভান্স চিন্তা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। আগ্রহী ও সচেতন ছাত্র হিসেবে নি¤েœাক্ত বিষয়গুলো খেয়াল করার পরামর্শ রাখছি-
দায়িত্বানুভূতি ও সেলফ মোটিভেশন : নিজেকে গঠন করা, নিজের মেধা যোগ্যতার বিকাশ ঘটানো সচেতন ব্যক্তির অপরিহার্য দায়িত্ব। এই চিন্তা মাথায় থাকলে সফলতা আসবেই। রাসূল (সা.) বলেছেন- তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)
আমাকে মথায় রাখতে হবে যে, আল্লাহ আমাকে মেধা-যোগ্যতা দিয়েছেন, তার বিকাশের দায়িত্ব আমার নিজেরই। এই অনুভূতি নিয়ে এগোতে থাকলে মেধা কাজে লাগিয়ে সামনে যাওয়ার আগ্রহ সবসময় জারি থাকে। যাতে করে সেলফ মোটিভেটেড ওয়েতে চলা সম্ভব হয়। দায়িত্বানুভূতি ও সেলফ মোটিভেশন না থাকলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। আমি যে লক্ষ্যপানে ছুটছি, তাতে বিজয়ী হওয়ার জন্য ছুটছি নাকি হেরে যাওয়ার শঙ্কাও মনে দানা বাঁধে মাঝে মাঝে? এক্ষেত্রে উত্তর নেগেটিভ হওয়া ক্ষতিকর। সমাজে কিছু ছাত্র আমরা দেখতে পাই, যারা নিজের কাজ নিজে করতে পারে না, সিদ্ধান্ত নিয়ে দিতে হয় অন্যকে। এই কিসিমের ছাত্রদের আত্মবিশ্বাস কম থাকে। আত্মবিশ্বাস কম নিয়ে পরীক্ষার ময়দানে নামার মানে, ময়দানে পা রাখার আগেই হেরে যাওয়া। ভর্তি পরীক্ষার আগে সময় কম পাওয়াটা অনেকের আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণ হয়। সুতরাং দায়িত্বানুভূতি ও সেলফ মোটিভেশন জরুরি।
লক্ষ্য স্থির করা : আমাদের দেশে বিজ্ঞান বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থীরা মেডিক্যাল, প্রকৌশল বা ভালো কোন বিজ্ঞান বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। আসলে অধিকাংশের ঠিকানা হয় বিবিএ, কলা এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে। আর এসব অনুষদের বিষয়গুলোও যে আকর্ষণীয়, তা অনেকই বিশ্বাস করতে চায় না। তাই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেগুলোয় আমার পক্ষে উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব, সেসব বিষয়কে টার্গেট বানানো। এজন্য একটা লক্ষ্য তালিকা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই বাবা-মা অথবা পাশের বাসার আঙ্কেলের কথা শুনে নিজের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে থাকে। এটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নিজের পছন্দের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি।
প্রবল ইচ্ছা : আমার বেইজ দুর্বল, আমি উপযুক্ত নই, এতো মেধাবীর ভিড়ে আমি কী করে টিকবো- এসব মনে কাজ করলে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব নয়। সফলতার জন্য প্রবল ইচ্ছা প্রয়োজন। হিটলার, স্ট্যালিন, মুসোলিনির ইতিহাস আমাদের জানা। জীবনের অন্যান্য অংশের মতো ভর্তি পরীক্ষাতেও থাকবে জয়-পরাজয়। আমি সর্বাত্মক চেষ্টা করে পরীক্ষা দিয়েও ব্যর্থ হতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে উঠে পুনরায় চেষ্টা করার মধ্যেই সফলতার মূলমন্ত্র নিহিত। কোনো কারণে নিজের প্রথম পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে সময় নষ্ট না করেই দ্বিতীয় পছন্দকে পাওয়ার জন্য লেগে পড়তে হবে। হাল ছেড়ে দেয়া চলবে না। অনেকেই অন্য বন্ধুদের ভালো প্রস্তুতি এবং সাফল্য দেখে হতাশ হয়ে নিজের আত্মবিশ্বাসের বারোটা বাজিয়ে দেয়। তাই জেনে রাখা জরুরি, বিফল হয়তো হবো। কিন্তু খোঁড়া পা নিয়েও যে যোদ্ধা লড়াই করতে জানে, বিজয়টা হয়তো তার জন্যই লেখা থাকবে। এ জন্য প্রবল ইচ্ছাটা জরুরি।
স্বাস্থ্য সচেতনতা : বলা হয় ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। বাস্তবে তাই। অনেক ভালো ছাত্রকেই ভর্তি পরীক্ষার সময় ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখেছি। যার দরুন তারা নিজেকে শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারে না। তাই সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়মিত রাখা। প্রচণ্ড গরম এবং বর্ষার সিজন এখন। ভাইরাসজনিত অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়বে, বিশেষ করে খাবার পানির ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। খাবার এবং ঘুমের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। পড়াশোনা বেশি করলে খাবারের চাহিদা বাড়ে, বেশি খেলে ঘুম বেশি হবে। আবার এতো কম ঘুমানো চলবে না, যাতে ব্রেইন কম কাজ করা শুরু করে। দৈনিক ছয়-আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম এসময় খুবই দরকার।
কঠোর পরিশ্রম ও সময় ব্যবস্থাপনা : ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতির একটা বড় অংশ হলো বিগত বছরের প্রশ্ন চর্চা করা। বিগত বছরের প্রশ্নে বারবার চোখ বোলালেই একটা মানসিক প্রস্তুতি নেয়া হয়ে যাবে। সারকথা হচ্ছে বার বার পড়া। অনেক সময় এমন হতে পারে যে, মাথায় কিছু থাকছে না। এ সময় আত্মবিশ্বাস রাখাটা জরুরি। ভেঙে না পড়ে আবারো পড়া। শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার উদ্যোগ রাখতে হবে। এ বছর কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় লিখিত পরীক্ষার উদ্যোগ নিলেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা হয় বহুনির্বাচনি প্রশ্নের মাধ্যমে। আর এতে প্রতি প্রশ্নোত্তরের জন্য সময় থাকে এক মিনিটেরও কম। তাই সময় ব্যবস্থাপনা জরুরি। দিনের শুরুতে আজকের দিনের সমস্ত প্ল্যান ডায়েরিতে টুকে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আজকের দিনটিকে গতকালের চেয়ে উন্নত করার চেষ্টা : গতকালের চেয়ে আজকের পড়াশোনা ও পরীক্ষাগুলোয় উন্নতি আনার চেষ্টা করা। অনেক পরীক্ষার্থীকেই দেখা যায় প্রথম অধ্যায়টা খুব মন দিয়ে পড়ছে; কিন্তু শেষের দিকের অংশটুকু আর পড়া হয়নি। তাহলে দেখা যাবে কোন অধ্যায় বা টপিকই দুর্বল থাকবে না। এভাবে সামনের দিকে এগোতে হবে ক্রমবর্ধমান গতিতে। একজন মুসলিম হিসেব প্রত্যেকদিনই পূর্ববর্তী দিনের চেয়ে উত্তম করতে সচেষ্ট থাকতে হয়।
রাসূল (সা.) বলেছেন- যার দু’টি দিন একই রকম হয়, নিঃসন্দেহে সে ক্ষতিগ্রস্ত।
(সুনানে দাইলামি)
প্রতিযোগিতা : ভর্তি পরীক্ষা একটু বেশিই প্রতিযোগিতামূলক, তবে এটা অসম্ভব কিছু নয়। এটা মাথায় রাখতে হবে যে, আমি কারো প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কম প্রস্ততি নিলে সে কিন্তু ঠিকই আমাকে ফেলে জায়গা করে নেবে। এ জন্য মনোবল ঠিক রেখে সর্বোচ্চ রেজাল্টের টার্গেটে পড়াশোনা করতে হবে। আগামী যে ক’দিন হাতে আছে, তার সবটুকু কাজে লাগিয়ে প্রস্তুতি নিলে কোনো একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিঃসন্দেহে পাওয়া যাবে।
আল্লাহর সাহায্য কামনা : আমার প্রস্তুতি যতো ভালোই থাকুক না কেন; আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনকিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। জীবনের লক্ষ্য পৌঁছার জন্য মহান রবের দরবারে বিনীতভাবে প্রার্থনা করতে হবে। হজরত মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন- ‘হে আল্লাহ, আমার বক্ষ সম্প্রসারিত করো, আমার কাজ সহজ করে দাও’, ‘হে আল্লাহ, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দাও’।
পরিশেষ
আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির মর্যাদাকে যথোপযুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের গড়ার জন্য এই উদ্যম। বাবা-মা, শিক্ষকমণ্ডলী এবং সুন্দর সমাজপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করার এটাই মোক্ষম সময়। আমাদের একটু অলসতা বা দুর্বলতা মানেই তাদের সকলের স্বপ্ন ভেঙে দেয়া। আর তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয়ার মাধ্যমে আমার দুনিয়া ও আখিরাতের সকল কল্যাণ নিঃশ্বেষ হয়ে যাওয়া। এ জন্য স্বপ্ন বাস্তবায়নের এই মৌসুমে নিজেকে সচেতন করার উদ্যোগী হওয়ার আহবান রাখছি। আজ এ পর্যন্তই।

লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply