ভুল বোঝাবুঝি, অপপ্রচার ও নির্মম সমালোচনার মুখে মজলুম ইসলামী নেতৃত্ব -সা’দ শারীফ

আনসার সাহাবিরা সবাই মনোক্ষুণœ। ক্ষুব্ধ হয়ে তারা রাসূলুল্লাহর (সা.) একটি বণ্টননীতির সমালোচনা করছেন। ঘটনাটা হুনায়ুন যুদ্ধের অব্যবহিত পরে তায়েফ অভিযান-পরবর্তী গনিমত বণ্টনকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধে মুসলিম সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১২ হাজার। বিপুল পরিমাণ গনিমতের ভেতর ছিলো ৬ হাজার যুদ্ধবন্দী, ২৪ হাজার উট, ৪০ হাজারেরও বেশি বকরি এবং ৪ হাজার উকিয়া চাঁদি তথা ১ লাখ ৬০ হাজার দিরহাম; যার ওজন ছিলো প্রায় ৬ কুইন্টাল। রাসূল (সা.) তায়েফ অভিযান তুলে নেয়ার পর জেরানা নামক জায়গায় হজরত মাসুদ ইবনে আমর গিফারী (রা)-এর নিয়ন্ত্রণে রাখা সমুদয় গনিমত বণ্টনের কাজ শুরু করলেন। উল্লেখ্য, ১২ হাজার সৈন্যের ভেতর ২ হাজার ছিলো মক্কা বিজয়-পরবর্তী নবদীক্ষিত মুসলিম ও মুয়াল্লাফাতুল কুলুব। রাসূল (সা.) এ সকল নও মুসলিমদের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ গনিমত বণ্টন করে দিলেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারবকে দিলেন ১০০ উট ও ৪০ উকিয়া তথা ৬ কিলো রূপা। আবু সুফিয়ান বললেন আমার পুত্র ইয়াজিদ? রাসূল (সা.) তাকেও অনুরূপ দিলেন। আবু সুফিয়ান বললেন আমার পুত্র মুয়াবিয়া? রাসূল (সা.) তাকেও অনুরূপ দিলেন। অর্থাৎ আবু সুফিয়ান ও তার ২ পুত্রকেই দিলেন ৩০০ উট আর ১৮ কিলো রূপা। হাকেম ইবনে হাজামকে ১০০ উট আবার চাইলে আরো ১০০ উট দেয়া হলো। সাফওয়ান ইবনে উমাইয়াকে ৩ বার ১০০ করে ৩০০ উট দেয়া হলো। হারেস ইবনে কালদাকে ১০০ উট; এভাবে উনার রক্তের আত্মীয়সহ মক্কা বিজয়-পরবর্তী ইসলামে দীক্ষিতদের মধ্যেই রাসূল (সা.) বেশির ভাগ মাল বণ্টন করে দিলেন। এই দৃশ্য দেখে আনসার সাহাবিরা কষ্ট পেলেন, মন খারাপ করলেন, নিজেদের ভেতর কানাঘুষা শুরু করলেন। পারস্পরিক বলাবলি করছিলেন রাসূল (সা.) নিজের কওমের সাথে মিশে গেছেন, আত্মীয়দের পেয়ে তাঁর দুঃসময়ের বন্ধু মদিনার আনসারিদের কথা ভুলে গেছেন। আশঙ্কা হচ্ছে তিনি আর কখনো মদিনায় ফিরবেন না বরং রক্তের আত্মীয়দের সাথে মক্কায় থেকে যাবেন।
আলোচনার মধ্যে একজন আনসারি সাহাবি হজরত সা’দ ইবনে উবাদার মনে হলো কথাগুলো আমি রাসূল (সা.)কে গিয়ে জানাই। রাসূল (সা.)কে গিয়ে বলা হলো যে আনসারিরা আপনার গনিমত বণ্টন নিয়ে মনোক্ষুণœ, তারা সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছেন। তারা বলছেন আপনি নিজ কওম ও আরব গোত্রদের মধ্যে সব বণ্টন করেছেন, আনসারদের কিছুই দেননি। তারা লক্ষ্য করছে সঙ্কটের সময় যারা পলায়ন করছিলো আজ তাদের হাত পরিপূর্ণ আর তখন যারা বীরত্বের সাথে লড়াই করে পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করলো আজ তাদের হাত খালি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হে সা’দ তুমিও কি তাই মনে করো?’ উত্তর এলো ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ আমি তো আমার গোত্রেরই একজন।’ শুনে রাসূল (সা.) খুব কষ্ট পেলেন এবং বললেন: ‘সবাইকে ডাকো।’ আনসারিরা এলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, “হে আনসাররা! তোমরা খুব তুচ্ছ একটা বিষয়ে নাখোশ হয়েছো। সামান্য মালের বিনিময়ে আমি কিছু লোকের মনে প্রবোধ দেই যাতে তারা ঈমান আনে। তোমরা কি এতে খুশি নও যে লোকেরা সামান্য দুনিয়াবি গনিমত নিয়ে মক্কায় থাকুক আর তোমরা স্বয়ং রাসূলুল্লাহকে নিয়ে মদিনায় ফিরে যাও?”
রাসূলের এ কথা শুনে সবাই এত বেশি কাঁদলেন যে তাদের দাড়ি ভিজে গেলো। আর তারা বললেন আমাদের অংশে রাসূল (সা.) থাকবেন এতেই আমরা সন্তুষ্ট।
(ঘটনা বর্ণনায় আর রাহিকুল মাখতুম এ বর্ণিত মতকে গ্রহণ করা হয়েছে)
উপরোক্ত ঘটনা থেকে কয়েকটি বিষয় উপলব্ধি করা যায়-
১. ওহি দ্বারা পরিচালিত রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বও এখানে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। যাদের দ্বারা এই কাজটি হয়েছে তারা ছিলেন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও দুঃসময়ের সাহায্যকারী বন্ধু। ঘনিষ্ঠজনের সমালোচনাই তো কষ্ট দেয় বেশি।
২. গনিমতের মালিক আল্লাহ ও তার রাসূল (সা.) (সূরা আনফাল-২)। গনিমত বণ্টনে রাসূলের এই ইখতিয়ার সম্পর্কে সাহাবিরা জানা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক এই বণ্টন তাদেরকে সাময়িক কষ্ট দিয়েছিলো।
৩. একজন সাহাবি এটি রাসূল (সা.)কে অবহিত করলে দ্রুত রাসূল (সা.) এ সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগ নিলেন।
৪. প্রকৃত বিষয়টি উপলব্ধির সাথে সাথে সাহাবিরা অনুতপ্ত হয়ে কাঁদলেন, ভুল বুঝতে পারলেন এবং রাসূলের সিদ্ধান্তে খুশি থাকলেন।
এটা শুধু একটা ঘটনার বিশ্লেষণ। প্রতিনিয়ত এ চ্যালেঞ্জটি স্বয়ং রাসূল (সা.)কে গ্রহণ করতে হয়েছে। উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা (রা) যখন ভয়ানক অপপ্রচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন তখন মুমিনদের একটি দল এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন আর প্রায় সবাই দ্বিধা-সংশয়ে পড়ে চুপ থেকেছিলেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্ত নিয়েও প্রাথমিকভাবে সাহাবিরা প্রচণ্ড মনোক্ষুণœ ছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল (সা.)কে মজলুম হতে হয়েছে এবং সবরের পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভুল বোঝাবুঝি দূর হলে সব ক্ষেত্রেই আবার নেতৃত্বের সিদ্ধান্তকে পারফেক্ট মনে হয়েছে। আর সেটি ছিলো সরাসরি ওহি দ্বারা পরিচালিত নেতৃত্ব। রাসূলের পরেও এক এক করে সব খলিফা ও যুগে যুগে সকল নেতৃত্বকে অপপ্রচার ও ভুল বোঝাবুঝির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
নেতৃত্বকে সব যুগেই এক্ষেত্রে মজলুম হতে হবে। নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত যে ভুল হয় না তা নয় কিন্তু অনেক সময় সিদ্ধান্ত ভুল হোক আর না হোক ভুল বোঝাবুঝি কিন্তু ঠিকই হয়। ইসলামী নেতৃত্বের অনেক সিদ্ধান্ত স্বীয় কর্মীর কাছে অনেক সময় ভুল মনে হয়। তীব্র সমালোচনা হয়; এটিকে আমি স্বাভাবিক বলতে চাই। সমালোচকদের উদ্দেশে নয় বরং আমাদের বক্তব্য বিশেষভাবে তাদের প্রতি যারা প্রিয় নেতৃত্বকে সমালোচিত হতে দেখে নীরবে কষ্ট পান এবং ব্যাখ্যা তালাশ করেন।
প্রিয় বন্ধুগণ, আপনার এই কষ্ট পাওয়াকে শ্রদ্ধা করে বলতে চাই আপনার মত আমিও কষ্ট পাই। একটু বুঝতে চেষ্টা করতে হবে যেখানে ওহি দ্বারা পরিচালিত নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত হওয়া সত্ত্বেও সমালোচনা, অপপ্রচার আর ভুল বোঝাবুঝি থেকে মুক্ত ছিলো না সেখানে কিভাবে আমরা একটি সাধারণ নেতৃত্বকে সমালোচনাহীন দেখতে চাই; যেখানে সিদ্ধান্ত ভুল হওয়ার আশঙ্কাও তো থাকে।
বাস্তবতা হলো নীতিনির্ধারকগণ প্রচুর ডিসকাশনের মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্ত নেন, সিদ্ধান্ত নেয়ার ইখতেয়ার তো তাদেরই। সিদ্ধান্ত যেটাই হোক সেটা সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতেই পারে। এটা নীতিনির্ধারকগণ অনেক ক্ষেত্রে জানা সত্ত্বেও নিরুপায় ও মজলুম হয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। আবার সব সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা সব পর্যায়ে সময় হওয়ার আগে ওপেনও করা সম্ভব হয় না। কোন কোন ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা রক্ষা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এটা কখনো সম্ভব না একটি বিবৃতি দিতে হলে বা প্রতিনিয়ত সেনসেটিভ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে হাজার লক্ষ কর্মীর পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। পরামর্শ যতই আসুক সবসসয় সবাই সব সিদ্ধান্তে খুশি থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।

তাহলে করণীয় কী?
করণীয় হলো নেতৃবৃন্দকে কখনো কখনো মজলুম থাকতে হবে, সবর করতে হবে। তাদেরকে মজলুম হওয়ার এ সুন্নাহ পালন করতে দিন আপনিও মজলুম হন, সবর করুন; আপনার মজলুম নেতার জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করুন। আর সমালোচনাকে ভালোভাবে নিন, সমালোচনার যুক্তিসঙ্গত অংশগ্রহণ করা আর অহেতুক সমালোচনার ক্ষেত্রে সবর করা নেতৃত্বের দায়িত্ব। নিঃসন্দেহে নেতৃত্ব তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন আছেন। এ ক্ষেত্রে রাসূলের নীতিমালা দেখে মনে হয় ভুল বোঝাবুঝি দূর করার ক্ষেত্রে তিনি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হলে নিতে দেরি করতেন না অন্যথা আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় সবর করতেন। আসুন আমরাও ব্যাপারটিকে সবরের পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর উত্তম ফয়সালার জন্য অপেক্ষা করি।
আরেকটি বিষয় হলো পরামর্শ দেয়ার এখতিয়ার সবার থাকলেও সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার নেতৃত্বের; নীতিনির্ধারকগণের। নীতিনির্ধারকগণ সবাই একমত না হলে এ সিদ্ধান্তের এখতিয়ার যিনি প্রধান শুধুই তার। পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে তবে অধিকাংশের পরামর্শের আলোকে সবসময়ই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এই বাধ্যবাধকতা শরিয়ত নেতার প্রতি সবসময় আরোপ করে না।
মূল কথা হলো সবর আর মধ্যপন্থাই সর্বোত্তম পন্থা। রাসূলের একটি বক্তব্য বলে শেষ করি আশা করি উপকৃত হওয়া যাবে এ কথা স্মরণ করার মাধ্যমে-
“যখন নেতৃত্বের কোন সিদ্ধান্ত অপছন্দনীয় মনে হয় অনুসারীরা যেন সবর করে।”
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply