ভোলা ট্র্যাজেডি সম্প্রীতি নষ্ট করে লাভবান কারা? । ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

ভোলা ট্র্যাজেডি সম্প্রীতি নষ্ট করে লাভবান কারা? । ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অনেক সুনাম রয়েছে। এখানে নেই কোন বর্ণবিশেষ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, রক্তের হলিখেলা, জ্বালাও পোড়াও, মসজিদ মন্দিরে আক্রমণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা। যেখানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে এ জাতীয় ঘটনা ঘটছে অহরহ। আমাদের দেশে সকল ধর্মের লোকজন মিলে-মিশে বসবাস করছে দীর্ঘসময় ধরে। কিন্তু দেশে যখনই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তখনই কিছু ব্যক্তি সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে লম্ফ-ঝম্ফ করে। তাদের লক্ষ্য আল্লাহ এবং রাসূলকে গালি দিয়ে দাঙ্গা বাধিয়ে এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্পীতি নষ্ট করা। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ব্যবহার। এই ইস্যু বিশ্বকে আকৃষ্ট করে দ্রুত। বর্তমান সময়ে বিনাভোটের আওয়ামী সরকারের ছাত্রসংগঠন ‘ছাত্রলীগে’র চাঁদাবাজির কারণে সভাপতি-সেক্রেটারিরকে বহিষ্কার, বুয়েটে মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যা, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারির কারণে সরকারের ইমেজ এখন তলানিতে। ভারতের সাথে অসম চুক্তিতে নেই জনগণের সমর্থন। এ দিকে পানি সমস্যাতো দূরের কথা পানি দিয়ে মড়ার উপর যেন খাঁড়ার ঘা। এসব থেকে জনগণের চোখ আড়াল করতে কি ভোলা ট্র্যাজেডি?
তাছাড়া আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতও এখন বিশ্বদরবারে ইমেজ সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে। সম্প্রতি ভারতে গরুর গোশত খাওয়া ও রাখার অভিযোগে অনেক মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। বিজেপির নির্বাচনী ধ্বনি ‘জয় শ্রীরাম’ উচ্চারণ না করায় বিজেপির লোকদের মাধ্যমে মুসলমানদের হত্যা করার উদাহরণ রয়েছে। এই হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার সামান্য নমুনা। অথচ ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতায় বিমোহিত হয়ে আওয়ামী লীগ আমাদের সংবিধান থেকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থা সরিয়ে ফেলার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। হয়ত তাদেরকে একদিন আল্লাহর আদালতেই জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা থাকলেই যেমন জনগণ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী হয় না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ প্রতিবেশী ভারত। অপরদিকে সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস লিপিবদ্ধ থাকলেই দেশের নাগরিকরা সাম্প্রদায়িক হয় না, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মিলে-মিশে থাকা বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্য লালিত হয়ে আসছে এখানে। তাই রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ঘৃণ্য কৌশল হিসেবে ক্ষমতাসীনরা ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে ইসলামবিরোধী সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় দিয়ে আমাদের এই শান্তিপ্রিয় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ৯০ শতাংশ যে জন্মসূত্রে মুসলমান এ নিয়ে সম্ভবত কোনো বিতর্ক নেই। সেই দেশে অব্যাহতভাবে ইসলাম, কোরআন, হাদিস এবং মহানবী সা.-কে কটাক্ষ করার ফলে ইসলামবিদ্বেষ এখন এমপি-মন্ত্রী আর সরকারের কতিপয় ব্যক্তির এটি দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রাসূল সা.-এর বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে রাসূল সা.-এর মর্যাদা ক্ষুন্ন করা যাবে না। কারণ মুহাম্মদ সা.-এর সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহ তা’আলা নির্ধারণ করেছেন। বাতিলরা নবীকে নিয়ে যতই কটূক্তি এবং অবমাননা করেছে আল্লাহ ততই তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। আল্লাহ্ বলেন, “আর আমরা আপনার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করেছি।” (সূরা আল-ইনশিরাহ: ৪) ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। কিছু চেতনাধারী ব্যক্তি ভিনদেশীদের স্বার্থ হাসিলের জন্য অহরহ আল্লাহ, রাসূল সা. আর ইসলামকে কটাক্ষ করে বসেন তাদের বক্তৃতা, বিবৃতি, লেখনী, নাটক, আর অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। তাদের তৎপরতা দেখলে কারোই বুঝার বাকি থাকে না এরা আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করতে চায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর বিষয় হলো ‘ধর্ম’। মানুষ যা ধারণ করে তাই হচ্ছে ধর্ম। ধর্ম হলো সভ্যতার একটি অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়। সমাজের ভিত্তিমূল হিসেবেই আবির্ভূত। সভ্যতার সুপ্রভাতে ধর্মই ছিল সব নগর ও জনপদের সামাজিক আকর। ধর্মই নির্ধারণ করত নেতৃত্ব, শাসনকাঠামো, এমনকি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও। পৃথিবীর ইতিহাস মানেই, ধর্মের ইতিহাস। ধর্ম নিয়ে মানুষ পেয়েছে আত্মার পরিশুদ্ধি, জীবনযাত্রার আলোকিত সোপান এবং সামাজিক প্রশান্তি। ধর্ম সর্বত্রই রাজনীতির অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়েস্টফলিয়ন (westphelian)-এর তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে ধর্মকে বাদ দেবার প্রচেষ্টা এখন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রায় নিঃশেষ হতে চলেছে। অন্যদিকে ধর্ম জোরদার হচ্ছে। এডওয়ার্ড মরটিমার বলেন, ধর্ম ক্রমাগত আন্তর্জাতিক বিষয়াদির ওপর কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করছে। সুতরাং সেই ধর্মের সর্বশেষ, শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবিত করার যোগ্যতাসম্পন্ন্ ব্যক্তি সম্পর্কে কু-রুচিপূর্ণ বক্তব্য মুসলমানদের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে। ইসলাম এখনো জীবন্ত ধর্ম এবং এর অনুসারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ধার্মিক। ’৮০-এর দশকে যখন নাস্তিক সালমান রুশদি পবিত্র কুরআনকে ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ বা শয়তানের পদাবলি বলে অভিহিত করে, তখনো মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছে।
১৯৭৩ সালে দাউদ হায়দার নবী মুহাম্মদ সা.-কে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন, ‘মোহাম্মদ তুখোড় বদমাশ চোখে মুখে রাজনীতি’। তসলিমা নাসরিন ইসলামের বিধিবিধানকে গালি দিয়ে পরিচিতি অর্জন করেছেন। উভয়ই পশ্চিমাদের সহায়তা লাভ করেছেন। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ব্যাপক আন্দোলনের কারণ ছিল ইসলাম ও নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর সম্পর্কে অশালীন উক্তি ও অশ্লীল বক্তব্য। এদেশে নাস্তিক ব্লগারদেরও হঠাৎ করে বিখ্যাত হওয়ার খায়েশ জেগেছে। নাস্তিকরা ব্লগ, কবিতা, উপন্যাস এবং ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিখ্যাত হতে চায়।
ভোলা ট্র্যাজেডি সম্প্রীতি নষ্ট করে লাভবান কারা? । ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমসেই খায়েশ আর ঘৃণা থেকেই কি ভোলা সরকারি কলেজের ছাত্র ‘বিপ্লব চন্দ্র শুভ’ তার ফেসবুকে ইসলাম ধর্ম ও মহানবী সা. সম্পর্কে কটূক্তি করেছিল। সেটি হয়ত নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই কেবল বেরিয়ে আসবে। শুভ অবশ্য দাবি করে যে, তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অন্য কেউ এটা করেছে। আমরা মনে করি যদি আইডি হ্যাক করে অন্য কোন কুচক্রী মহল ও এটা করে থাকে তারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
অনেকেই মনে করেন ঘটনার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে সে তা অস্বীকার করার কৌশল নিয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে এলাকায় তার শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হলেও পুলিশ দু’জন ইমামসহ নেতৃস্থানীয়দের ‘আটক’ করে। এটা জেনে জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ বলছে তারা কাউকে গ্রেফতার করেনি। সংবাদপত্রে বলা হয়, ‘একপর্যায়ে জনতার একটি দল ইমামের সাথে থাকা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ দৌড়ে মসজিদের দোতলায় একটি কক্ষে আশ্রয় নেয়। বিক্ষোভকারীরা সেখানে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকলে একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছোড়ে। এসময় আহত হন বোরহানউদ্দিন আলিয়া মাদরাসার আরবির প্রভাষক, বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদের খতিব হাবিবুর রহমান জাজেরি। এতে জনতা তখন আরো ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশকে লক্ষ করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। পুলিশও গুলি ছোড়ে।’ পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হলেন। অনেকেই আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পুলিশ ও প্রশাসন যদি আরো ধৈর্য ধারণ করে পরিস্থিতির মোকাবেলা করত, তাহলে এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ প্রথমেই গুলি ছুড়েছে। প্রথাগতভাবে সতর্কীকরণ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ না করেই বেধড়ক গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ। এটি আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশের খেলাফ। গত প্রায় ১২ বছরে এই প্রবণতাই দেখা গেছে। ক্ষমতাবানরা যেন গুলি ছাড়া আর কিছুই বোঝেন না। এ ঘটনায় ‘শান্তিপূর্ণ মিছিলে এভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে নবীপ্রেমীদের শহীদ করে লাখো তৌহিদি জনতার কলিজায় আঘাত করা হয়েছে।’
এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানলে তার পরিণতি যে কী হতে পারে! ভোলার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এদেশের সব মানুষ ধার্মিক নাও হতে পারে, কিন্তু নিজের ধর্ম সম্পর্কে গভীর আবেগ পোষণ করেন। তিনি যে ধর্মেরই মানুষ হোন না কেন। একজন মুসলমান ধর্মের অনুশাসন পুরোপুরি মেনে চলতে না পারলেও তিনি ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। তা ছাড়া ভোলার মানুষের ধার্মিকতার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ভোলার মানুষ বিশ্বাস করেন, ইসলাম ও মহানবী সা.-এর ইজ্জত ও মর্যাদা রক্ষার জন্য যা করা হয়েছে তা যৌক্তিক ও ন্যায়সঙ্গত।
এ ছাড়া আওয়ামী শাসনামলে আরো কয়েকটি সংঘটিত ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে গোটা জাতিকে। লক্ষণীয় বিষয় আওয়ামী লীগ ৩০ জুন ২০১১ ইং তারিখ সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী গ্রহণ করে মূলনীতি থেকে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দেয়ার পরপরই মুহাম্মদ সা. ও ইসলামকে কটাক্ষ করার হিড়িক যেন আগের তুলনায় বাড়ছেই। এর প্রমাণ-
(ক) ১৪ জুলাই ২০১১ টুঙ্গিপাড়া উপজেলার জিটি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস দশম শ্রেণীর ক্লাসে দাড়ি রাখা নিয়ে সমালোচনাকালে হযরত মুহাম্মদ সা.-কে কে ছাগলের সাথে তুলনা করেন। পরে গোটা এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষক শঙ্কর বিশ্বাস এলাকা থেকে পালিয়ে যায়।
(খ) ২৬ জুলাই-১১ ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক মদন মোহন দাস মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. এবং পবিত্র হজ্ব নিয়ে কটূক্তি করেন। সহকর্মী শিক্ষকদের এক সভায় তিনি মন্তব্য করেন “একলোক সুন্দরী মহিলা দেখলেই বিয়ে করে। এভাবে বিয়ে করতে করতে ১৫-১৬টি বিয়ে করে। মুহাম্মদও ১৫-১৬টি বিয়ে করেছে। তাহলে মুসলমানদের মুহাম্মদের হজ্ব করার স্থান মক্কায় গিয়ে হজ্ব না করে ওই ১৫-১৬টি বিয়ে করা লোকের বাড়িতে গিয়ে হজ্ব করলেইতো হয়।”
(গ) ১লা আগস্ট ২০১০ বিশ্ব শান্তি পরিষদের প্রেসিডেন্ট পরিচয় দানকারী জনৈক দেবনারায়ণ মহেশ্বর পবিত্র কুরআনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। রিট আবেদনে তিনি দাবি করেন, “হজরত ইবরাহিম (আ) তার বড় ছেলে ইসমাইল (আ) কে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে আয়াত পবিত্র কুরআনে রয়েছে তা সঠিক নয়।” তিনি দাবি করেন, হযরত ইবরাহিম তাঁর ছোট ছেলে হযরত ইসহাক (আ)কে কোরবানি করতে নিয়ে যান। এ বিষয় সঠিক ব্যাখ্যা ও কুরআনের আয়াত শুদ্ধকরার জন্য দেবনারায়ণ মহেশ্বর আদালতের কাছে প্রার্থনা করেন। আদালত রিটখারিজ করে দেয়ার পর দেবনারায়ণের এই চরম হঠকারী ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে পুলিশ দেবনারায়ণ মহেশ্বরকে কর্ডন সহকারে এজলাস থেকে বের করে তাদের ভ্যানে প্রটেকশন দিয়ে আদালত এলাকার বাইরে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে যায়।
(ঘ) ২০১২ সালে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন উপলক্ষে ২৭ মার্চ সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ফতেহপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ‘হুজুর কেবলা’ নামক নাটক মঞ্চায়িত হয়। নাটকে হযরত মুহাম্মদকে সা. লোভী আখ্যায়িত করা হয়। এতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী নাটকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষুব্ধ হন। এ ঘটনায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা থানায় মামলাও করেন। এতে এক নাট্যকার, স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও এক সহকারী শিক্ষককে গ্রেফতারও করে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে চলতে থাকে চরম উত্তপ্ত অবস্থা।”
(ঙ) ৪ এপ্রিল-২০১২ রংপুর মেডিক্যাল কলেজে সকাল ১০টায় ৩৮ নম্বর ব্যাচেরওয়ার্ড সি গ্রুপের ক্লাসে পড়ানোর সময় চর্ম ও যৌন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা: এ কে এম নুরন্নবী লাইজু ছাত্রদের উদ্দেশে বলেন ‘তোমরা ওপরের (সিনিয়র) মেয়েদের দিকে নজর দেবে না, কারণ তাদের আগেই বিয়ে হয়ে যায়। সব সময় তোমরা নিচের মেয়েদের দিকে নজর দেবে। তাহলে কাজ হয়ে যাবে।’ এ সময় হাসান নামে এক ছাত্র দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন ‘স্যার আমাদের নবী হজরত মোহাম্মদ সা. তো হজরত খাদিজা (রা)-কে বিয়ে করেছিলেন। তিনি তো সিনিয়র ছিলেন।’ এর উত্তরে ওই চিকিৎসক তখন অত্যন্ত স্পর্ধা দেখিয়ে বলেন, ‘আরে নবী তো খাদিজাকে বিয়ে করেছে অর্থের লোভে। শুধু তাই নয়, তিনি তার পালক পুত্র জায়েদের স্ত্রী জয়নবকেও বিয়ে করেছেন। এজন্য আল্লাহর কাছে জোর করে ওহি নাজিল করে বৈধ করে নিয়েছে।’ এ ছাড়াও তিনি এক ছাত্রকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই বল, আল্লাহ কী আছে রে! তাহলে দুনিয়াতে এত ইসলামী দল কেন? এত হানাহানি কেন?’ এর আগের দিন সোমবার একই সময় ৩৯ নম্বর ব্যাচের ক্লাসের ওই শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন ‘এই আল্লাহ কি আছে? তার কী প্রমাণ আছে।’ এ ঘটনার প্রতিবাদে তিন দিন ধরে ডা: লাইজুকে চাকরিচ্যুত, গ্রেফতারও ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে তৌহিদি জনতা।
(চ) ২০০৯ সালের ২৮ মার্চ ‘সন্ত্রাস নিরসনে ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল বলেছেন, পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ রয়েছে, তার সবই ইসলামও মুসলমানদের মধ্যে (!)। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নেই। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানরা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়।
(ছ) ‘২০১১ সালের ২ জুন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অন্যতম নেতা মেজর জেনারেল (অব:) কে এম শফিউল্লাহ দাবি করেন, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, বিসমিল্লাহ ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি এ তিনটির বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।” তাহলে বলুন তো আল্লাহ, রাসূল সা. আর ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তির মূল হোতা কারা? এরা মুসলমান নামধারী ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লা পরা ইসলামবিদ্বেষী।
মহানবীর অবমাননা করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে বলেন, ‘আর তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছিল, পরিণামে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা করত তাই বিদ্রুপকারীদেরকে ঘিরে ফেলেছিল।’ (সূরা আম্বিয়া : ৪১) একবার ইবনে খাতাল রাসূলের প্রতি কটূক্তি করেছিল, সে জন্য রাসূল সা. তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. মক্কা বিজয়ের দিন মক্কায় প্রবেশ করে মাত্র মাথায় যে হেলমেট পরা ছিল তা খুললেন, এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি এসে বললো, ইবনে খাতাল (বাঁচার জন্য) কাবার গিলাফ ধরে ঝুলে আছে। রাসূল সা. বললেন, (ঐ অবস্থায়ই) তাকে হত্যা করো।’ (বুখারী : ১৮৪৬, মুসলিম: ৩৩৭৪)
ভোলা ট্র্যাজেডি সম্প্রীতি নষ্ট করে লাভবান কারা? । ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিমআনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নাসারা ছিল সে ইসলাম গ্রহণ করল এবং সূরা আল-বাকারা ও আলে ইমরান শিখল। সে নবী সা.-এর নিকট কেরানির কাজ করত। সে পুনরায় নাসারা হয়ে গেল এবং বলতে লাগল মোহাম্মদ আমি যা লিখি তাই বলে এর বাহিরে সে আর কিছুই জানে না। এরপর সে মারা গেল, তখন তার সাথীরা তাকে দাফন করল, সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাইরে পড়ে আছে, তখন নাসারারা বলতে লাগল, মোহাম্মদের সাথীরা এই কাজ করেছে; কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করেছিল। তখন তারা আরো গভীর করে কবর খনন করে তাকে আবার দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ বাইরে পড়ে আছে। তখন তারা বলল : এটা মোহাম্মদ এবং তার সাথীদের কাজ; কেননা সে তাদের ধর্ম ত্যাগ করে এসেছিল। তখন তারা আবার আরো গভীর করে কবর খনন করল এবং তাকে দাফন করল, আবার সকালে উঠে দেখল তার লাশ আবার বাইরে পড়ে আছে, তখন তারা বুঝল, এটা কোনো মানুষের কাজ নয়, তখন তারা তার লাশ বাইরেই পড়ে থাকতে দিল। (সহীহ বুখারী : ৩৪২১)
তাই প্রতিটি ঈমানদারের দায়িত্ব এর প্রতিবাদ করা, শাস্তির ব্যবস্থা করা, জাতিকে সতর্ক করা, ঐক্যবদ্ধ হওয়া, আল্লাহর নিকট বেশি বেশি ক্ষমা চাওয়া, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা, রাসূলের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, রাসূলের কটূক্তিকারীদের ঘৃণা করা, রাসূলের আদর্শ জাতির সামনে ব্যাপকভাবে তুলে ধরা, নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা খুবই জরুরি।
এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় বেশি। সরকারের অন্যতম কাজ হলো শিষ্টের লালন আর দুষ্টের দমন। অতএব সরকারের দায়িত্ব হলো যারা রাসূলের বিরুদ্ধে কটূক্তি করেছে তাদের সবাইকে এবং যারা তাদের সহযোগী তাদেরকেও গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করা। যারা আল্লাহকে অথবা আল্লাহর রাসূল সা.কে নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও ঠাট্টা-বিদ্রুপের মাধ্যমে বিরূপ মন্তব্য করে, ইসলামী আইনে তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এ ব্যাপারে কুর’আন-হাদীসের অকাট্য প্রমাণসহ ইসলামের সকল মাযহাব ও দল-মত নির্বিশেষে সকলেরই ইজমা রয়েছে। রাসূলের অবমাননাকারীদের উপযুক্ত শাস্তি না দেয়ার ফলে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যেকোন সভ্য সমাজে এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সরকারকে অনতিবিলম্বে রাসূলের অবমাননাকারীদেরকে মৃত্যদণ্ড শাস্তির বিধান করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
সরকার এই ঘটনার পেছনে প্রকৃত ‘ষড়যন্ত্র’ আবিষ্কার করুক তাই জনগণের প্রত্যাশা। কিন্তু বিরোধীদের দায়ী করার চেষ্টা হাস্যকর। যদি তাই হয় তাহলে গণমানুষের অনুভূতিকে আরো ক্ষুব্ধ ও তিক্ত হবে। সরকারের উচিত বিক্ষোভকারীদের সব দাবি মেনে নেয়া। পুলিশ চার-পাঁচ হাজার মানুষকে আসামি করে যে মামলা ঠুকেছে, তা অন্যায়, অগ্রহণযোগ্য ও উদ্দেশ্যমূলক। বিক্ষোভকারীদের ছয় দফা দাবি মেনে নেয়ার মধ্যেই শান্তি ও স্বাভাবিকতা নিহিত। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া প্রয়োজন। আহতদের চিকিৎসায় ও পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা শুধু নয় বরং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে এ ঘটনায় সেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি মন্দির ও কিছু বাড়িঘরে হামলার যে খবর প্রকাশিত হয়েছে তাতে গভীর শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে অনেকের মনে। তাহলে এই সবই কি একই পরিকল্পনারই অংশ। ভোলার ঘটনার কারণ যাই হোক না কেন আধিপত্যবাদী শক্তি এ ধরনের ঘটনাকে হাতিয়ার করে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে বলে অনেকে শঙ্কিত।
বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও সমাজচিন্তক ফরহাদ মজহার বাংলাদেশে অমুসলিম, বিশেষত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর যেকোনো প্রকার হামলা মূলত উপমহাদেশে নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদকে শক্তিশালী করে এবং বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) তৎপরতা ও অন্তর্ঘাতমূলক কাজের পথকে সুগম করে। তিনি বলেন, একটি শ্রেণী টুপি পরা কোর্তা পরা মুসলমানদের দাঙ্গাবাজ প্রমাণ করতে পাগল হয়ে ওঠে পড়ে লেগে গেছে। গুলি করে চারটি মানুষ হত্যা ও শতাধিক মানুষকে আহত করার কারণ খোঁজা বাদ হয়ে গেল। পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকাও বাদ হয়ে গেল। কোন পরিস্থিতিতে পুলিশ গুলি করল সেই আলোচনাও বাদ। ম্যাজিস্ট্রেট গুলির অর্ডার দিয়েছিল নাকি দেয়নি, সেটাও আমরা নিশ্চিত জানি না। কিন্তু এখন টেলিভিশনে ‘গুজব’ নিয়ে তর্ক চলছে। অভিযোগ করা হচ্ছে মুসলমানগুলো গুজব ছড়াল কেন? অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া পর্যন্ত সবুর করতে পারল না? তিনি বলেন, “মসজিদে পুলিশের ওপর শার্ট-প্যান্ট পরা কিছু ছেলের হামলার ভিডিও দেখেছি। তাদের রক্ষার জন্য আলেম, ওলামা, মুসল্লি ও মাদরাসার ছাত্রদের প্রাণপণ চেষ্টা দেখেছি, মাইকে মসজিদ আল্লাহর ঘর, এখানে হামলা করতে নিষেধ করার আহ্বান বারবার শুনেছি। ক্ষুব্ধ জনতার মধ্য থেকে ‘দরজা ভাঙা হচ্ছে পুলিশ পেটানো হবে’ এই চিৎকারও শুনেছি। আলেম ওলামা ও মাদরাসার ছাত্ররা দরজা ভেঙে ফেলা প্রাণপণ ঠেকানোর চেষ্টা করছেন দেখেছি।”
এখন প্রশ্ন উঠেছে তাহলে এটাই কি আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আসল রূপ? আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লা পরা একরকম ভণ্ডামি ছাড়া আর কি (?) কারণ রাষ্ট্র যদি ধর্মনিরপেক্ষই হয়, তাহলে মুহাম্মাদ সা. ও ইসলামকে কটাক্ষ করার আসল হেতু কী? এই শক্তির আসল উৎস-ই বা কোথায়? কে এদের আসল ইন্ধনদাতা? এই প্রশ্নটি আজ বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের। এটি কি ধর্মনিরপেক্ষতার বদৌলতে জাতির প্রাপ্য?
শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে আমাদের প্রিয় নবী সা.-কে নিয়ে কটূক্তি ও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও ব্লগে প্রিয় নবীকে নিয়ে এমনসব কথা লেখা হচ্ছে যা কোনো সামান্যতম ঈমানের অধিকারী মুমিনকেও নাড়া না দিয়ে পারে না। তাই আসুন আমাদের লিখনি, বক্তব্য, আলোচনা, খুতবাহ, জনসংযোগ, মিডিয়াসহ সর্বস্তরে শরীয়াহসম্মত বিভিন্ন উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার মাধ্যমে এ ধরনের অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করি।
এ দেশের ইসলামপ্রিয় জনতাকে অনেক সতর্ক থাকতে হবে। সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে। না বোঝে অন্যের পাতা ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। ইসলামী রাজনীতির সাথে যুক্তদের বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা বাদ দিয়ে নিজেদের শক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে। তাদেরকে স্বাধীনভাবে দাঁড়ানোর হিম্মত অর্জন করতে হবে। না হলে অনেক শহীদের রক্তে এই দেশ ভেসে যাবে; কিন্তু কিছুই অর্জিত হবে না। বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ঈমানী দায়িত্ব পালন করার তাওফিক দিন। দেশের জনগণকে স্বাধীনতা, সার্বভোৗমত্ব, ইসলাম, গণতন্ত্র পুররুদ্ধারের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply