মকবুল আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ আমাদের প্রেরণা -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

একজন দার্শনিক ও মনোবিজ্ঞানী সফল মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন ‘একজন মানুষের সফল বা ব্যর্থ হওয়া তার ক্ষমতার ওপর যতটা না নির্ভর করে, তারচেয়ে বেশি তার দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। যারা সফল হয়, তারা সফল হওয়ার আগে থেকেই সফল মানুষের মতো আচরণ করেন। এই বিশ্বাসই একদিন সত্যে পরিণত হয়। আপনি যদি বিশ্বাস করেন যে আপনি অবশ্যই সফল হবেন, তবে আপনার ব্যবহারেও তা প্রকাশ পাবে। এবং আপনি নিজেই নিজের এই দৃষ্টিভঙ্গির সুফল দেখে অবাক হয়ে যাবেন।’ বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার, দায়ী ইলাল্লাহ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মরহুম মকবুল আহমাদ গত ১৩ এপ্রিল ২০২১, মঙ্গলবার বেলা ১টায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন…। ইসলামী আন্দোলনের এক কঠিন সময়ে তিনি কাণ্ডারির দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী নিবেদিতপ্রাণ এই দ্বীনের দায়ী শিক্ষকতার মাধ্যমে জীবন শুরু করেন। যোগ দেন সাংবাদিকতায়। তাঁর জীবন ছিল নিষ্কলুষ এবং পরিচ্ছন্ন। তাঁর গায়ে সাদা পাঞ্জাবির মতোই ছিলো চারিত্রিক ভূষণ।

মরহুম মকবুল আহমাদ সাহেব একজন কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ। তার থেকে বড় পরিচয় একজন সজ্জন, পরোপকারী, বিনয়ী, সদালাপী, নিরহঙ্কারী, সবরকারী, আত্মপ্রত্যয়ী, পরম আল্লাহ নির্ভরশীল মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন, সত্যের পথে অটল-অবিচল। কুরআনের ভাষায় “আশিদ্দায়ু আলাল কুফ্ফার রুহামাউ বাইনাহুম” এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি ছিলেন অসম্ভব সাহসী দুর্জয়ী। বৃদ্ধ বয়সে এই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী জালিম সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে মিথ্যা সাজানো নাশকতার মামলায়। তিনি দীর্ঘদিন কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন কিন্তু দ্বীনের এই রাহবার ছিলেন অটল ও মজবুত।

এই নিবেদিতপ্রাণ দায়ীর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো তিনি সবার মাঝে দাওয়াতি বই বিতরণ করতেন। রিমান্ড শেষে উনাকে যখন আদালতে আনা হলো, জানতে চাওয়া হলো স্যার আপনাকে রিমান্ডে কী জিজ্ঞাসাবাদ করেছে? তিনি হেসে বললেন তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে আমি তাদের জিজ্ঞাসা করেছি। আমি পুলিশ অফিসারদের বলেছি আপনারাতো মুসলমান। আপনারা নামাজ পড়েন? কুরআন পড়তে জানেন? আপনার বিবি পর্দা করেন? সন্তানেরা কুরআন পড়তে জানে? তারা অবাক হয়ে বলেছে, আমাদের আর এভাবে কোনোদিন কেউ বলেনি স্যার! আমি বলেছি আপনারা কুরআন-হাদীস পড়ার চেষ্টা করবেন। অবাক করার বিষয় এ কঠিন সময়েও তিনি দাওয়াত দিতে ভুলে যাননি।

মরহুম মকবুল আহমাদ ছিলেন সকলের কাছে একজন অভিভাবক। তিনি সবার খবর রাখতেন। আমার মেয়ে মারিয়ামের অসুস্থতার খবরে তিনি অনেক বেশি দোয়া করতেন। সাক্ষাতে অথবা ফোনে কথা হলে তিনি তার নাম ধরে খোঁজ নিতেন। আমাদের উপদেশ দিয়ে বলতেন মারিয়াম নাম কুরআনে বর্ণিত নাম, সবর করো। তিনি নতুন পরিচয় হওয়া ব্যক্তিদের ফোন নাম্বার কলেকশন করে ডায়েরিতে লিখে রাখতেন এবং বিভিন্ন সময় তাদের খোঁজ-খবর নিতেন।
আলহামদুলিল্লাহ, পরিবারকে তিনি ইসলামী আন্দোলনের পথে গড়ে তুলেছেন। সন্তানদের আন্দোলনে অগ্রসর করানোর ব্যাপারে পেরেশান ছিলেন। আমাদের সাথে সাক্ষাৎ হলেই উনার ছেলেদের এগিয়ে নিতে আমাদের বলতেন। তিনি ছিলেন অসম্ভব জ্ঞানপিপাসু। কোনো নতুন বই প্রকাশ হলেই তিনি তা সংগ্রহ করতেন। উনার লেখা প্রকাশিত একটি বইয়ে সামান্য কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। এখনো একটি পাণ্ডুলিপি আছে। ইনশাআল্লাহ তাও সময়মতো প্রকাশিত হবে।
২০১০ সালের জুনে জামায়াতের তৎকালীন আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে মকবুল আহমাদ ভারপ্রাপ্ত আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃতীয় আমীর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন শুরু করার ক্ষেত্রে যে কয়জন তাদের মেধা ও শ্রম সর্বোচ্চ বিনিয়োগ করেছেন মকবুল আহমাদ তাদের অন্যতম। জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে মকবুল আহমাদের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। সংগঠনকে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো ও সুস্থ সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি অবিশ্রান্তভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

জন্ম
অত্যন্ত সহজ সরল ব্যক্তিত্ব মকবুল আহমাদ ১৯৩৯ সালের ৮ই আগস্ট ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলার ওমরাবাদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম নাদেরুজ্জামান। তাঁরা ৫ ভাই ও ৩ বোন।

শিক্ষা ও ক্যারিয়ার
মকবুল আহমাদের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় পূর্বচন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি স্থানীয় দাগনভূঞা কামাল আতাতুর্ক উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নবম শ্রেণীতে তিনি জায়লস্কর উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং এই স্কুল থেকে ১৯৫৭ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল পরীক্ষায় তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। মাধ্যমিক পরীক্ষা পাসের পরে তিনি ফেনী কলেজে ভর্তি হন। তিনি এ কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এবং ১৯৬২ সালে বিএ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হন।

কর্মজীবন
এক বছর সরকারি চাকরি করার পর চাকরি ছেড়ে দেন এবং শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন। তিনি নিজ এলাকার শরিষাদী উচ্চবিদ্যালয়ে চার বছর এবং ফেনী সেন্ট্রাল উচ্চবিদ্যালয়ে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। ১৯৭০ সাল থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত তিনি তৎকালীন ফেনী মহকুমার দৈনিক সংগ্রামের প্রথম নিজস্ব সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের চিংড়ি মৎস্য উৎপাদনের উপরে তার বিশেষ প্রবন্ধ (বাংলাদেশের ‘কালো সোনা’ সৌদি আরবের ‘তরল সোনা’-কে ছাড়িয়ে যাবে) ৭০ দশকে দৈনিক সংগ্রামে ছাপার পর ব্যবসায়ী মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

ইসলামী আন্দোলন
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে ইসলামী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৬২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান এবং ১৯৬৬ সালে রুকন (সদস্য) হন। ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ফেনী শহর এবং এরপর থেকে ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তৎকালীন ফেনী মহকুমার, ১৯৭০-১৯৭১ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি নোয়াখালী জেলা জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য পদে ফেনী-সোনাগাজী নির্বাচনী এলাকা থেকে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর কাজ পুনরায় শুরু হলে তিনি কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইসলামী আন্দোলনের পতাকাবাহী জাতীয় পত্রিকা দৈনিক সংগ্রামের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত।
২০০৪ সাল থেকে তিনি কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীরের দায়িত্ব পালন করেছেন। একইসাথে ২০০৪ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশে ইসলামিক ইনস্টিটিউটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী সাহিত্য প্রকাশের প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রকাশনী বি. আই ট্রাস্টের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৃতীয় আমীর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।

পারিবারিক জীবন
১৯৬৬ সালে লক্ষ্মীপুর নিবাসী প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন ঢাকা আরমানিটোলা সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের হেড মাওলানা মরহুম ওহিদুল হকের কনিষ্ঠা কন্যা মুহতারামা সুরাইয়া বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তাদের তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। তারা সকলেই ইসলামী আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত।

সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সমাজসেবামূলক কাজের সাথেও জড়িত ছিলেন। নিজ গ্রামের যুবকদের নিয়ে ১৯৬২ সালে ‘ওমরাবাদ পল্লী মঙ্গল সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত এ সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এলাকার রাস্তাঘাট, পুল ও সাঁকো সংস্কার নির্মাণে এবং দরিদ্র লোকদের সাহায্য-সহযোগিতাকল্পে এ সমিতির সভাপতি হিসেবে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন।
তিনি ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ‘গজারিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার’ ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ ও ’৭৯ সালে তিনি ‘রাবেতা আলম আল ইসলামীর’ মেহমান হিসাবে দু’বার পবিত্র হজব্রত পালন করেন এবং জাপান ইসলামী সেন্টারের দাওয়াতে জাপান সফর করেন।
১৯৮৪ সালে তিনি ঢাকায় অবস্থিত জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ‘ফালাহ-ই-আম ট্রাস্টের’ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে স্থানীয় ‘সিলোনিয়া আঞ্জুমানে ফালাহিল মুসলিমিন ট্রাস্ট’ ও ‘ফেনী ইসলামী সোসাইটির’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সিলোনিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগেই সিলোনিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ ও ‘উম্মুল মোমেনিন মহিলা মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফেনী ইসলামিক সোসাইটির উদ্যোগে বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ফেনী শাহীন একাডেমী (কেজি ও হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তিনি ফেনী আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া ট্রাস্টের সদস্য এবং দাগনভূঞা সিরাজুম মুনিরা ট্রাস্টেরও সভাপতি ছিলেন। এর উদ্যোগে একটি এতিমখানা ও হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফালাহিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগেই ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফেনী জিলার মধ্যে প্রথম মানের মাদরাসা হিসাবে এ মাদরাসা বেশ সুনাম অর্জন করেছে।

সাহিত্যকর্ম ও দেশভ্রমণ
রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামীর মেহমান হিসাবে তিনি দুইবার হজ পালন করেন। তিনি জাপান ও কুয়েত (সাংগঠনিক প্রয়োজনে) সফর করেন। সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় ‘জাপান সফর- দেখার অনেক, শিখার অনেক’ এ বিষয় তার সফর অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি এবং আল্লাহর সাহায্যের উপযুক্ততা অর্জন, মোট দু’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর মকবুল আহমাদের ইন্তেকালে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল- বিএনপি, এলডিপি খেলাফত মজলিস, কল্যাণ পার্টি, জাগপা লেবার পার্টিসহ দল ও সংগঠন গভীর শোক প্রকাশ করেছে। তারা বলেছেন, মকবুল আহমাদ বর্তমান দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে আন্দোলন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জনঅধিকার, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারী গত ১৫ এপ্রিল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে লাইভে এসে বলেন- ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর মরহুম মকবুল আহমাদ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কোনো ক্ষতিকর ভূমিকায় ছিলেন না। তিনি মকবুল আহমাদের প্রশংসা ও তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। যা পরে হাজারিকা প্রতিদিন নিউজ বুলেটিন-ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়।

জয়নাল হাজারী বলেন, ‘মকবুল আহমাদ আমাদের ফেনী অঞ্চলের ভদ্রলোক, ফেনীর কৃতী সন্তান ছিলেন। তিনি এক সময় জামায়াতে ইসলামীর প্রধান (আমীর) ছিলেন। মকবুল সাহেব ইন্তেকাল করেছেন। তার জানাজায়ও তার জনপ্রিয়তা প্রমাণ হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তিনি ভদ্রলোক ছিলেন। মনে হয় জীবনে কারো সাথে কোনো দুর্ব্যবহার করেননি। পরহেজগার মানুষ ছিলেন। সৎ মানুষ ছিলেন। তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘যারা যেভাবেই নেন না কেন, আমি এই মানুষটাকে সৎ হিসেবেই বিবেচনা করি। এমনকি আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও তিনি কোনো ক্ষতিকর ভূমিকায় ছিলেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও ছিল না।’ ‘তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও কোনো মুক্তিযোদ্ধার বিরোধিতা করেননি। রাজাকারদের নেতৃত্ব দেননি। এরকমটাই শোনা গেছে, যোগ করেন জয়নাল হাজারী। এ সময় তিনি মকবুল আহমাদের সাথে ১৯৯৬ সালে নির্বাচনের কিছু স্মৃতিচারণ করেন। ওই নির্বাচনে মকবুল আহমাদও জয়নাল হাজারীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জয়নাল হাজারী বলেন, ‘যাই হোক। এ লোকটা (মকবুল আহমাদ) ভালো ছিলেন। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন। তাকে আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।’ (নয়া দিগন্ত)
জনাব মকবুল আহমদ এমপি, মন্ত্রী ছিলেন না, কিন্তু মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন তার থেকে অনেক বেশি। আল্লাহর দ্বীনের এই মর্দে মুজাহিদ ইন্তেকালের কিছু সময় আগেও মানবতার কল্যাণে কত পেরেশান ছিলেন! কর্তব্যরত চিকিৎসক লিখেছেন- “তিনি এখানে জীবন-মৃত্যুর মধ্যে বসেও অন্যদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কিভাবে তার পরিচিত কিছু লোকের আয়ের ব্যবস্থা করে তাদের পরিবারের দুর্দশা দূর করা যায় সেই আকাক্সক্ষা। নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য কোনো আক্ষেপ নেই। দিনে বেশ কয়েকবার তাকে ডাক্তার হিসেবে খুব কাছে থেকে দেখেছি প্রতিবারই মাথা নাড়িয়ে বলছেন, কোনো কষ্ট নাই। যেন প্রিয় রবের সাক্ষাতের ঘ্রাণ তার সব কষ্ট দূর করে দিয়েছে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সেই আজীবনের কাক্সিক্ষত মুহূর্তের জন্য। দুপুর ১২টায় দেখেছি তখন তার জাগতিক অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। সবাই বুঝতে পারছিলাম, আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, বাকিটা মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের অপেক্ষা। তখনও তিনি মাথা নাড়িয়ে বলছিলেন, আর কোনো কষ্ট নাই। এর কিছুক্ষণ পরই আল্লাহ তাকে কবুল করলেন।”

আল্লাহ তায়ালা তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। তিনি অনাগত ভবিষ্যতের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। দেশের জনগণ তাকে আজীবন স্মরণ রাখবে। ইসলামী আন্দোলনের জন্য তিনি যে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন তার জন্য শতাব্দী থেকে শতাব্দী তার জন্য দোয়া করতে থাকবে ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা।
সারাজীবন ইসলামী আন্দোলনের জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ করেছেন, সবসময় শহীদি মৃত্যু কামনা করেছেন, সেই মৃত্যু আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন হাসপাতালের বিছানায়, মহামারী আক্রান্ত হয়ে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৮২ বছর।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা: শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘চলে গেলেন ইসলামী আন্দোলনের এক বর্ণালি মুজাহিদ সাবেক আমীরে জামায়াত জনাব মকবুল আহমাদ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন…।

আজীবনের এই দায়ী ইলাল্লাহ জামায়াতে ইসলামীর কঠিনতম সময়ের কাণ্ডারি আমাদের জন্য রেখে গেলেন অনেক শিক্ষা এবং উদাহরণ। রাব্বুল আলামিন তার এই গোলামের তামাম জিন্দেগির সমস্ত ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে নেকিতে পরিণত করে দিন। তার নেক আমলগুলো কবুল করুন, শহীদ হিসেবে কবুল করে তাকে সম্মানিত করুন। মহান রবের কাছে আবেগ ও বুকভরা এ আকুতি।’
মহান মাবুদের দরবারে কায়মনোবাক্যে ফরিয়াদ জানাই আমরা যতটুকু আমাদের এই মুরুব্বির কাছাকাছি ছিলাম সাহচর্য পেয়েছিলাম তার অসমাপ্ত কাজ আমরা এগিয়ে নিতে পারি। হে আরশের মালিক তোমার এই প্রিয় বান্দাকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমাদের জান্নাতে একত্রিত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন॥
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply