মঞ্জিলে পৌঁছার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা -মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাত

দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি টিক টিক শব্দ জীবন থেকে একেকটি মুহূর্ত হারিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়ে যায়। বহতা নদীর কলকল ছলছল শব্দ ও সময়ের স্রােতে সময় হারিয়ে যাওয়ার সঙ্কেত দিয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। এভাবেই সময়ের স্রােতধারায় হারিয়ে যায় কাল বছর। একটি প্রচলিত প্রবাদ বাক্য আছে Time and tide wait for none- ‘সময় এবং নদীর স্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না।’ আমি আপনি থমকে যেতে পারি, কিংবা ব্যাটারি ডাউন হলে ঘড়ির কাঁটা আটকে যেতে পারে। কিন্তু সময় কখনো থমকে যায় না আটকে থাকে না। সেই শাশ্বত চিরন্তন বাস্তবতা হিসেবে আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে একবিংশ শতাব্দীর আরো একটি বছর ২০২১ সাল। অতিক্রান্ত হওয়া শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ এ বছরটি মনে হয় যেন চোখের পলকেই সময়ে গতিধারায় আমাদের মাঝ থেকে বিলীন হয়ে গেল।

দিন মাস বছর বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি আছে যেগুলো বিলীন হয় না, মুছে যায় না। নতুন বছরে নতুন সূর্য উদিত হয়েছে, শুভ্র সকালের সোনালি অজেয় ¯িœগ্ধ পরিবেশও হয়তোবা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এ ¯িœগ্ধতার পরশ বহু হৃদয়কে স্পর্শ করে না। দুঃখ যাতনার সাগর পাড়ি দিতে দিতে যাদের প্রভাত হয়েছে, তাদের জন্য নতুন আর পুরাতন বছরের ব্যবধান একই। শুধুমাত্র ২০২১ সাল কেন, বিগত একযুগ ধরে যারা জেলজুলুম নির্যাতন আর নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাদের জন্য নির্যাতন আর নিষ্পেষণের জাঁতাকল প্রতিনিয়ত বরাদ্দ ছিল, তাদের নতুন আর পুরাতন বছর সমান কথা। বিগত একযুগ ধরে এদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মী সুধী সমর্থকদের ওপর নির্যাতনের যে স্টিম রোলার চালানো হয়েছে ইতিহাসের পাতায় তা কালের সাক্ষী হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। সেসব স্মৃতি যখন ভেসে উঠে তখন অবলীলায় চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, হৃদয়ে সৃষ্টি হয় ক্ষত। কতো মা তার আদরের সন্তান হারিয়েছেন, বোন হারিয়েছেন তার প্রিয় ভাইটিকে। কতো মায়ের কোল থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে রাতের আঁধারে ক্রসফায়ারের গেমে হত্যা করা হয়েছে, সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের কাছ থেকে পিতাকে কেড়ে নিয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যা করা হয়েছে নৃশংভাবে আহত আর জেল জুলুমের শিকার লাখের পরিসংখ্যান নাইবা উল্লেখ করলাম।

ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেশপ্রেমিক ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে বিদায় করে ইসলামী আন্দোলনকেই স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ এত কিছুর পরও রক্ত পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে এদেশের ইসলামী আন্দোলন তার মঞ্জিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই ইনশাআল্লাহ।
বিগত বছরগুলোর স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে এ কথা দৃঢ়ভাবে হৃদয়ে ঘোষিত হয়েছে- যে ইসলামী আন্দোলনে শামিল হয়েছি এ আন্দোলনের পথ এমনই। এ আন্দোলনের পথ রক্ত পিচ্ছিল হয়, কখনো তা মসৃণ হয় না। এ পথে চলতে গেলে আন্দোলনের কর্মীদেরকে মুখোমুখি হতে হয় জুলুম নির্যাতনের। মুখোমুখি হতে হয় ঘনঘোর অমানিশার। এ পথের প্রতিটি পথিক তা জেনে শুনেই এই পথে পা বাড়ায় কিন্তু কখনো ভীত হয় না, কিংবা পিছুও হটে না। বরং হিম্মত নিয়ে দৃঢ়পদে সম্মুখে এগিয়ে যায়। ইসলামী জাগরণের কবি মরহুম মতিউর রহমান মল্লিকের ঐতিহাসিক গানের লাইনটি মনে পড়ছে- আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করে, কেন বেছে নিলে এই পথ? কেন ডেকে নিলে এ বিপদ? জবাবে তখন বলি, মৃদু হেসে যাই চলি, বুকে মোর আছে হিম্মত। সত্যিকার অর্থে এ আন্দোলনের নেতাকর্মীরা হিম্মত ও সাহস নিয়ে ভয়কে জয় করেন। মৃদু হেসে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেন তবু তারা মঞ্জিলের লক্ষ্য থেকে একচুলও পিছু হটেন না। কারণ এ আন্দোলনের কর্মীরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করেন- বাধাবিপত্তি যাই হোক না কেন মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি হচ্ছে- তিনি তার দ্বীনকে বিজয়ী করবেনই। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন আমার রাসুলদের ব্যাপারে আমার এই ফয়সালা পূর্ব থেকেই স্থির হয়ে আছে যে, তারা অবশ্যই সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, এবং এ পথের পথিকরাই বিজয়ী হবে। (সূরা সাফফাত : ১৭১-১৭৩)। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আরো ঘোষণা করা হয়েছে যে তারা ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায় আল্লাহর নূরকে, অথচ আল্লাহ তাঁর নূরকে পরিপূর্ণ উদ্ভাসিত করবেনই, কাফিররা তা অপছন্দ করলেও। আল্লাহতো সেই মহান সত্তা, যিনি তার রাসূলকে হিদায়াত এবং সত্যদ্বীন দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাকে অন্যসব দ্বীনের ওপর বিজয়ী করার উদ্দেশ্য, মুশরিকরা তা অপছন্দ করলেও। (সূরা সফ : ৮-৯)।

নতুন বছর কেমন যাবে আমরা তা জানি না। নতুনের সাথে যেহেতু পথ চলতেই হবে সেহেতু পুরাতন বছরগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ধৈর্য এবং প্রজ্ঞার সাথে নতুন পথ বলতে হবে। আমাদের পথ চলার দিশারি বিশ^মানবতার মুক্তিদূত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সা.। যাতনার এ সময়ে তাঁর জীবনদর্শন আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তিনিই এ আন্দোলনের সিপাহসালার। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে তাঁকে অনুসরণের নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূলের জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব : ২১)।
যাকে অনুসরণ করলে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ অনুসরণ করা হয় সেই রাসূল সা.-এর জিন্দেগির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, রাসূল সা. মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছাতে গিয়ে বহু ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হয়েছেন তারপরও মঞ্জিলের পথ থেকে তিনি পিছু হটেননি। রাসূল সা.-এর চলার পথে কাঁটা বিছানা হয়েছে, পাগল, কবি, গায়ক বলে নোংরা ভাষায় গালি দিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়েছে, তায়েফে পাথরের আঘাতে দেহ মুবারক থেকে রক্ত ঝরানো হয়েছে, শিয়াবে আবি তালিবে সাড়ে ৩ বছর অবরুদ্ধ রেখে বন্দী করা হয়েছে, নিজ জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, ওহুদের ময়দানে দাঁত মোবারক শহীদ করা হয়েছে। এত নিপীড়নের পরও রাসূল সা. দ্বীনের বিজয় এনে দিয়েছেন, মঞ্জিলে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর প্রিয় হাবিব বা বন্ধু হওয়ার পরও এতো ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছেন। সুতরাং রাসূল সা.-এর পথের পথিক যারা তারা কখনো বাধাবিপত্তি পরোয়া করেন না। মঞ্জিলের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। বরং পথ যত রক্ত পিচ্ছিলই হোক না কেন মঞ্জিলের পথে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। রাসূল সা. আঘাত পেয়ে নীড়ে ফিরে আসেননি, বাধা পেয়ে এ পথ থেকে সরে যাননি, বন্দী হয়ে দমে যাননি, তাহলে এ পথের পথিকেরা দমে যাবেন কিভাবে? বরং নতুন উদ্যমে মঞ্জিলের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবেন দুর্বার গতিতে এটিই এ পথের পথিকদের আসল পরিচয়।

রাসূল সা.-এর পথ ধরে, তার সাহাবারাও মঞ্জিলের পথে অটল এবং অবিচল ছিলেন। শত জুলুম নির্যাতনের মুখোমুখি হয়ে সাহাবায়ে আজমায়িনরা মঞ্জিলের পথ থেকে একচুলও পিছু হটেননি। এ পথের পথিক হওয়া আল্লাহর রাসূলের সাহাবাদেরকে মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে রশি দিয়ে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। নামাজরত অবস্থায় উটের পচা নাড়িভুঁড়ি চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। জ¦লন্ত কয়লার ওপর শুইয়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হয়েছে, যে কয়লা নিভেছে শরীরের চর্বি গলে গলে, উফ! কী নির্মমতা! হজরত বেলাল রা. খাব্বাব রা. থেকেই সাহাবাদের জীবনীর দিকে তাকালে আমরা এমন দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। শুধু পুরুষ সাহাবারাই নির্মমতার শিকার হননি এবং সুমাইয়া রা.-এর গোপনাঙ্গে বর্শা দিয়ে আঘাত করে শহীদ করা হয়েছে। এমন পাশবিকতা নির্মমতার পরও মঞ্জিলের পথ থেকে তাঁরা একচুলও সরে যাননি। বরং তারা দ্বীনের পথে ছিলেন অটল এবং অবিচল।

সাড়ে চৌদ্দশত বছর পেরিয়ে গেলেও হেরার পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য জুলুম নির্যাতন এখনো অব্যাহত আছে, আবু জাহেল নেই কিন্তু তার উত্তরসূরিরা আছে, পাল্টেছে তাদের নির্যাতনের ধরন, কিন্তু উদ্দেশ্য একই, মঞ্জিলের পথ থেকে দূরে রাখা, ভীতি প্রদর্শন করা। একবিংশ শতাব্দীর এ সময়ে কেউ কেউ আছেন একটু বিপদে পড়লেই ভয় পেয়ে যান। আঘাত পেলেই মঞ্জিলের পথ থেকে দূরে সরে যান। জেল জুলুমের শিকার হলেই দ্বীনি আন্দোলন থেকে পিছু হটে যান। মঞ্জিলের বাগানে পৌঁছার চাইতে দূরে সরে গিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যান। অথচ যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যায় ভিতু কাপুরুষরা ছাড়া কেউ মঞ্জিলের এই পথ ছেড়ে পালিয়ে বেড়ায় না। কারণ আল্লাহ বলেছেন, দ্বীনের এ পথ ছাড়া আল্লাহর কাছে আর কোনো কিছুই গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ বলেন যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করতে চাইবে, তার থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না, আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন। (সূরা আলে ইমরান : ৮৫)

কেউ কেউ যুক্তি দাঁড় করিয়ে জানতে চান এভাবে আর কত? কবে আসবে মুক্তি? কবে আসবে প্রশান্তি? কোনো এক ঘটনার পর আবার ফেসবুকের ইনবক্সে একজন কর্মী পরিচয় দিয়ে লিখেছেন, ভাই এভাবে আমরা আর কত মার খাবো? প্রিয় কর্মী ভাইটিকে সান্ত¡না দিয়ে বলেছিলাম, দ্বীনি আন্দোলনের বিজয়ের পথ তো এমনই। মঞ্জিলে পৌঁছাতে হলে যে বহু বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিতে হবে আমাদের। সেদিন কর্মী ভাইটিকে বিংশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহর ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, বইয়ের ইসলামী বিপ্লবের পদ্ধতি পয়েন্টটি পড়তে বলেছিলাম। সেখানে তিনি লিখেছেন, এ আন্দোলনে বিজয়ী হতে হলে শুধু আন্দোলন সংগ্রামে অবতীর্ণ হলেই হবে না বরং আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি আন্দোলনের নেতকর্মীদেরকে মার খেয়ে খেয়ে জীবন দিতে হবে, পরীক্ষার চুল্লিতে দগ্ধ হয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত হবে, আল্লাহর রাসূল সা. এবং তার সাহাবার এমন দৃষ্টান্তইতো আমাদের সামনে রেখে গেছেন। অথচ আমরা মঞ্জিলে পৌঁছাতে চাই, চূড়ান্ত বিজয় চাই, কিন্তু জীবন বিলিয়ে দেয়া কিংবা পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রশ্নে পিছু হটে যাই। মহান আল্লাহ বলেছেন তিনি অবশ্যই অবশ্যই তার বান্দাদের পরীক্ষা করবেন, এই পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার সুসংবাদ তাদের জন্য যারা ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবে। আল্লাহ বলেন, “আর অবশ্য অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা নেবো ভয় ভীতি দিয়ে। ক্ষুধা অনাহার দিয়ে, এবং অর্থসম্পদ জান প্রাণ ও ফল ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে, তবে সুসংবাদ দাও সবর অবলম্বনকারীদের।” (সূরা বাকারা : ১৫৫) মহান আল্লাহ আরো বলেন- “মানুষ কি ধারণা করে নিয়েছে যে আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের কোনো পরীক্ষা করা হবে না?” (সূরা আনকাবুত : ২)

মহান আল্লাহ বান্দাদের মাঝে কখনো সুসময় কখনো দুঃখ কষ্ট যাতনা দিয়ে পরীক্ষা এজন্যই করতে চান যেন তিনি সত্যিকার মুমিন কারা তা জানতে পারেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি দুঃখ পেয়ে থাকো, তবে অনুরূপ দুঃখতো তোমাদের প্রতিপক্ষরাও পেয়েছিল। মানুষের মাঝে সেই সুসময় দুঃসময় দিনগুলোর আমরা আবর্তন ঘটাই যাতে আল্লাহ জানতে পারেন সত্যিকার ঈমানদার কারা, এবং তোমাদের মাঝ থেকে কিছু লোককে শহীদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৪০)
এ আয়াতের আগের আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন মুমিনরাই বিজয়ী হবে। আল্লাহ বলেন, তোমরা হতাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৯)
কেউ কেউ আরো বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করেন, আল্লাহ কি এত জুলুম দেখছেন না। তার জবাবও মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ দিয়ে রেখেছেন। ‘তোমরা জালিমদের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে আল্লাহকে গাফেল মনে করো না। তিনি তাদের অবকাশ দিচ্ছেন ঐদিন পর্যন্ত যেদিন তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে যাবে। (সূরা ইবরাহিম : ৪২)
আল্লাহ আরো বলেন- আল্লাহ জালিমকে পছন্দ করেন না (্সূরা আলে ইমরান : ৫৭) অন্যত্র তিনি বলেন- জালিমরা যখন আযাব ভোগ করতে থাকবে তখন তাদের শাস্তি আর হালকা করা হবে না এবং তাদেরকে কোনো অবকাশও দেয়া হবে না। (সূরা নাহল : ৮৫)

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আল্লাহ জালিমকে যদি পছন্দ না-ই করে থাকেন তাহলে দৃশ্যমান দেখায় তা জালিমকেই বিজয়ীর হাসি হাসতে দেখছি। বহু বছর ধরেই তো জালিম তার জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আল্লাহর ঘোষণা হবেই আল্লাহ জালিমকে ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। অবকাশ দেন তার বোঝা ভারী করবে কিন্তু কোনো জালিমই রেহাই পায় না। কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন আল্লাহ যদি মানুষকে তার জুলুমের জন্য পাকড়াও করতেন, তাহলে পৃথিবীর বুকে কোনো জীবকেই রেহাই দিতেন না। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত তাদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর যখন তাদের নির্ধারিত সময়টি এসে উপস্থিত হয় তখন তারা কিছুক্ষণও আগপাছ করতে পারে না। (সূরা নাহল : ৬১)
পথ যতই রক্তপিচ্ছিল হোক না কেন অটল এবং অবিচল থেকে বিজয়ী হওয়াই আমাদের লক্ষ্য সে জন্য বন্ধুর পথ হলেও তা আমাদের পাড়ি দিতে হবে। হতে হবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কোনো এক শিক্ষাশিবিরে একজন কর্মী আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন আমরা তো আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য নিস্বার্থভাবেই কাজ করছি আমাদের উদ্দেশ্য শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টি তাহলে সেই আল্লাহই কেন আমাদের জেল জুলুমের শিকারে পরিণত করবেন? রিমান্ড নির্যাতনের শত দুঃখ কষ্টও আমাদের কেন সইতে হবে? আমরা তো আল্লাহর জন্যই কাজ করছি। এভাবে মাঝে মধ্যেই অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন। সত্যিকার অর্থে এসবের মাধ্যমে যে আল্লাহ তার বান্দাহকে যাচাই করে থাকেন। প্রশ্নকারী ভাইটিকে বলেছিলাম, ধরুন- কে মেধাবী আর কে মেধাবী নয় তা কি পরীক্ষা ছাড়াই যাচাই করা সম্ভব? নাবিকদের মধ্যে কে দক্ষ আর কে দক্ষ নয় তা কি উত্তাল তরঙ্গের ঢেউ কিংবা ঝড় তুফানবিহীন সজোরে নৌচালনা ছাড়াই বাছাই করা সম্ভব? যদি উত্তর হয় ‘না’ তাহলে বলবো মঞ্জিলের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কিংবা দ্বীনি আন্দোলনের জন্য আপনি দক্ষতা পরীক্ষা ছাড়া কিভাবে বাছাই করা সম্ভব? আপনার ঈমান কতটুকু মজবুত। আপনি কতটুকু অটল ঈমানের অধিকারী তা কি পরীক্ষার চুল্লিতে প্রমাণিত না করেই বাছাই করা সম্ভব? সে জন্যই আল্লাহর ঘোষণা অবশ্যই অবশ্যই আমি তোমদের পরীক্ষা করবো? (সূরা বাকারা : ১৫৫)

বছর যায় স্মৃতি ভেসে ওঠে। কতশত স্মৃতির সাথে দুঃখ কষ্ট যাতনার স্মৃতিগুলোও রোমাঞ্চিত হয়। দেখতে দেখতে আরো একটি বছর অভিশপ্ত হয়ে গেল। বহু রক্ত পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে। ঘাত-প্রতিঘাতের পথ মাড়িয়ে নতুন বৎসরের পথচলা শুরু হয়েছে। দ্বীনি আন্দোলনের এ প্রাণের পথিকদের জন্য সামনের দিনগুলো কেমন যাবে তা আমরা জানি না। আল্লাহ চাইলে নতুন বছর হতে পারে জুলুমের যবনিকাপাতের বছর। আবার আল্লাহ যদি চান তার বান্দাহদের আগামী দিনের জন্য আরো মজবুত করে গড়ে তুলবেন তাহলে পরীক্ষা আরো চলতে পারে গতিও বাড়াতে পারে। কিন্তু মঞ্জিলের পথ থেকে আমরা কখনো পিছবা হবো না বা সরে যাবো না। বরং প্রতিটি পরিস্থিতিকেই আমাদের জন্য পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে সেই পরীক্ষায় সহজে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফিক কামনা করবো। সাথে সাথে বেশি বেশি এ দোয়া করবো যেন বিপদ আপদ মুসিবতে পড়লে হিদায়াতের পথ থেকে ছিটকে না যাই। আল্লাহ আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব, হিদায়াতের আলো জ্বালার পর আমাদের হৃদয়গুলোকে বাঁকা করে দিয়োনা, আর আমাদের দান করো তোমার নিকট থেকে রহমত নিশ্চয়ই তুমি মহান দাতা। (সূরা আলে ইমরান : ৮)

পরিশেষে শহীদ আবদুল মালেক (রহ)-এর একটি বক্তব্য তুলে ধরছি যিনি বলেছিলেন শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও আমরা আমাদের মঞ্জিলের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যাবো। তিনি বলেছেন, “আমরা তো জেনে বুঝে এ পথে এসেছি। এই পথ থেকে ফিরে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে অনেক দূর পথ পেরিয়ে এসেছি।
কিন্তু সামনের দিকে তাকালে মনে হবে আমাদের আরো অনেক পথ চলতে হবে। এই পথ চলতে গিয়ে যদি আমরা দ্রুতগামী কোনো বাহন পাই তাহলে সেটাতে সওয়ার হয়েই মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছাবো যদি তেমনটা না পাই তাহেল স্লোথ গতির কোনো বাহন হলেও আমরা সেই মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো। যদি কোনো বাহনই না পাই তাহলে পায়ে হেঁটে মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো। এই পথ চলতে গিয়ে বাতিল শাহি যদি আমাদের পা দুটো কেটে ফেলে তাহলে আমরা হাতের ওপর ভর করে মঞ্জিলে পৌঁছার চেষ্টা করবো। বাতিল শক্তি যদি আমাদের হাত দুটোও কেটে ফেলে তাহলে আমরা আমাদের শরীরের ওপর ভর করে মঞ্জিলের দিকে এগিয়ে যাবো। এই পর্যায়ে বাতিল শক্তি যদি ধড় থেকে আমাদের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে তাহলে আমরা আমাদের চোখ দিয়ে সেই মঞ্জিলের দিকে চেয়ে থাকবো। বাতিল শক্তি যদি আমাদের চোখ দুটোও তুলে নেয় তাহলে আমরা আমাদের মন দিয়ে ধ্যান করবো যে কখন আমরা আমাদের মঞ্জিলে পৌঁছাব। এরপরও আমরা বাতিলের সামনে কখনো মাথানত করবো না।” ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবদুল মালেকের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই- পথ যতই রক্ত পিচ্ছিলই হোক না কেন, মঞ্জিলে পৌঁছাতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply