মতিউর রহমান মল্লিকের প্রবন্ধ সাহিত্য বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস – ড. নঈম আহমেদ

প্রবন্ধ একজন সাহিত্যিকের মননশীলতার প্রকাশ। প্রবন্ধে লেখকের চিন্তাধারা, অনুভব, দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়। মতিউর রহমান মল্লিক বাংলাদেশের সাহিত্যে একজন উল্লেখযোগ্য প্রাবন্ধিক। ইকবাল ও ফররুখ আহমদের মানস যে চিন্তাদর্শ দ্বারা গঠিত সে একই চিন্তাদর্শ দ্বারা গঠিত মতিউর রহমান মল্লিকের মানসও। মতিউর রহমান মল্লিক ৫৪ বছরের জীবনে তাঁর কর্মপরিধি বিস্তারিত হয়েছে নানা ভাবে, নানা মাধ্যমে, নানা পন্থায়। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক চেতনা বিনির্মাণের লক্ষ্যে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে উজাড় করে দিয়েছেন। তিনি এক বহুপ্রজ প্রতিভা, বহুমাত্রিক তাঁর অবদান। যে লক্ষ্যে তাঁর সৃষ্টিশীলতার উৎসারণ, অবদানের উপঢৌকন; সে লক্ষ্য তিনি কেন নির্ধারণ করেছেন, এ জবাবের মধ্যেই নিহিত আছে মতিউর রহমান মল্লিকের চিন্তাদর্শের স্বরূপ।
বাঙালি মুসলমান যখন তার স্বাতন্ত্র্য বোধকে মর্যাদাবোধের বিপরীত প্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যখন তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্যকে পশ্চাৎপদতা বলে ভাবতে শুরু করেছে, যখন তারা ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজা ধারণ করে নিজেদের ঐতিহ্যকে জলে অঞ্জলি দিয়েছে; সেই সুকঠিন সময়ে মতিউর রহমান মল্লিক যাত্রা শুরু করেছেন ঠিক উল্টো দিক থেকে। স্বজাতির শাশ্বত চিন্তাদর্শকে ধারণ করে, স্বাতন্ত্র্যবোধকে মর্যাদাবোধের প্রতীক বানিয়ে, ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে দীর্ঘ চার দশক এই কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন তিনি। কেননা বাঙালি মুসলমানদের সাংস্কৃতিক চেতনা বিনির্মাণের লক্ষ্যে এ লড়াইয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। কৈশোরেই মতিউর রহমান মল্লিকের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এ সত্য। ফলে তাঁর এই চার দশকের লড়াই ছিল অবিশ্রাম এবং সম্পূর্ণরূপে শঙ্কামুক্ত। তিনি জানতেন, তাঁর জাতিকে ধোঁকা দেয়া হচ্ছে এবং তাঁর মধ্যে এ আস্থাও ছিল যে, তাঁর জাতির সামনে যতই প্রগাঢ় পর্দা ঝুলিয়ে দেয়া হোক না কেন এ জাতি সে পর্দা উন্মোচন করবেই।
ঐতিহ্যের বন্ধন তাঁর প্রত্যয়কে দৃঢ় থেকে ক্রমাগত দৃঢ়তর করছে। তার সামনে ছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর পঙক্তি- ‘ভুল বুঝাইয়া ভেবেছো ভোলাবে আল্লাহর ফরমান?’ অতএব বাঙালি মুসলমানকে তার কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনে স্বকীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চেতনা বিনির্মাণের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করলেন। এই বিনির্মাণের লিখিত সোপান তাঁর ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’। এখানে কয়েকটি বিষয় আলোকপাত করেছেন প্রাবন্ধিক :
ক. সাহিত্যচিন্তা
খ. আদর্শনিষ্ঠ সাহিত্যিকের মূল্যায়ন
গ. সংস্কৃতির স্বরূপ
ঘ. সাহিত্য সংস্কৃতি আন্দোলনের পথরেখা নির্মাণ
সাহিত্যচিন্তা
প্রত্যেক মৌলিক ও মহৎ সাহিত্যিকের নিজস্ব চিন্তাধারা থাকে। সৃজনকর্ম, যাপিতজীবন ও মননকর্মের মাঝে সেই চিন্তার বিস্তার ও প্রকৃতি প্রকাশিত। মতিউর রহমান মল্লিকের সাহিত্যচিন্তা তাঁর সৃজন ও মননকর্মে স্পষ্ট। ‘নির্বাচিত প্রবন্ধে’ তাঁর সাহিত্যচিন্তার রূপরেখা উজ্জ্বলভাবে স্বতন্ত্র আঙ্গিকে প্রকাশ পেয়েছে।
প্রথম প্রবন্ধ ‘কবি-কবিতা : রাসূলে খোদা (সা.)-এর অনুরাগ ও উৎসাহ’ এবং দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘রাসূল (সা.) এবং তাঁর সাহিত্যদর্শন’ মূলত এই দু’টি লেখায় মতিউর রহমান মল্লিকের সাহিত্যাদর্শ বা সাহিত্যচিন্তা স্পষ্ট রূপ পেয়েছে। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর চিন্তার দিকগুলো বিন্যস্ত করতে পারি :
ক. ইসলামের সাহিত্য দর্শন মূলত তাঁর সাহিত্যদর্শন;
খ. রাসূল (সা.) সাহিত্যকে যেভাবে যে দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছেন তিনি সেইভাবে সাহিত্যকে দেখেছেন;
গ. মহান রবের একাত্মবাদ, মহিমা ও গুণাবলির প্রতি বিশ্বাস-আস্থা জ্ঞাপন ও প্রশংসা এবং আল্লাহর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে শয়তানি শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা কবিদের দায়িত্ব-কর্তব্য;
ঘ. রাসূলের সাহাবীরা যে পদ্ধতিতে সাহিত্য আন্দোলন করেছেন, কবি একই কায়দায় সাহিত্য আন্দোলন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ; তাওহিদ-রিসালাত-আখেরাতের ব্যাপারে প্রত্যয়দীপ্ত;
ঙ. রাসূল সা. কবি ও কবিতা ভালোবাসতেন, সন্তানদের কবিতা শিক্ষা দিতে বলেছেন এবং মসজিদে নববীতে কবির জন্য মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন, কবিরা মর্যাদাশীল ব্যক্তি হিসেবে গণ্য- এই বিবেচনাগুলো প্রথম তিনি বাংলা ভাষায় উত্থাপন করেন।
চ. সাহাবীরা যেভাবে ইসলামের শত্রুবাহিনীর প্রতি আক্রমণ করেছেন, প্রতিবাদ ঘোষণা করেছেন, প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন, ইসলামের মহত্ত্ব উচ্চারণ করেছেন, যুদ্ধের ময়দানে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছেন; একইভাবে কবি সাহিত্যের পথে চলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ;
ছ. কবি-সাহিত্যিক সমাজ হবে আদর্শের প্রতি আস্থাবান; আদর্শনিষ্ঠ জীবনের পথে নির্ভীক পথিক; আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন ও সাহসী কলমযোদ্ধা; সাহিত্যাদর্শ ও জীবনাদর্শের সমন্বয়ক এবং মহান চরিত্রের অধিকারী;
জ. কবি-সাহিত্যিক হবেন মানবমুক্তির জন্য নিবেদিত এবং মানবমুক্তির প্রশ্নে সঙ্কল্পবদ্ধ।
ঝ. জাতীয় জীবনের সব সঙ্কট, গণমানুষের সমস্যা, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, জাতীয় সংস্কৃতির শুদ্ধীকরণ, আর্তমানবতার পাশে দাঁড়াবে কবি-সাহিত্যিকগণ;
ঞ. প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পিয়াসী এবং সেই সৌন্দর্যের নির্মাতার কাছে আত্মসমর্পণ;
ট. সাহিত্যকে মানবতার মুক্তির সোপান হিসেবে বিবেচনা করা।
ঠ. কবি সাহিত্যাদর্শ ও সাহিত্যচিন্তা ড. মুহম্মদ ইকবাল ও কবি ফররুখ আহমদের চিন্তাধারা দ্বারা প্রাণিত ও প্রভাবিত।
এইভাবে কবি মতিউর রহমান মল্লিক সাহিত্য আন্দোলনের পথ ও পাথেয় নির্মাণ করেন। সাহিত্যকে শুধু সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানবতার মুক্তির উপায় রূপে তিনি দেখেছেন।

আদর্শনিষ্ঠ সাহিত্যিকের মূল্যায়ন
মতিউর রহমান মল্লিক নিজে যেমন ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ সাহিত্যিক; তেমনি বাংলা ভাষার আদর্শবান লেখকদের তিনি নতুন মূল্যায়নে সবার সামনে তুলে ধরেন। যেসব লেখক ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম ও মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সমাজ ও সাহিত্যে কল্যাণব্রতী হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন; তাদেরকে কবি আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং প্রবন্ধে তাদের মূল্যায়ন করেন।
ক. মুন্সি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ
মতিউর রহমান মল্লিক স্বজাতির মহান বন্ধু মুন্সি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহর সার্বিক অবদানকে স্মরণ করেন। প্রকৃতপক্ষে জাতির মহান বন্ধুরূপে তৎকালীন সমাজসেবক ও মনীষীরা মুন্সি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। এই বিষয়টি মতিউর রহমান মল্লিক নতুনভাবে আলোকপাত করেন। মুন্সি মেহেরুল্লাহর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শৈক্ষিক ও সাহিত্যিক অবদানকে নতুন মাত্রায় বিবেচনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে মেহেরুল্লাহর উপাধির যথার্থতা নির্ণয় করেন প্রাবন্ধিক। এই কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খ. ফররুখ আহমদ
কবি মতিউর রহমান মল্লিকের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ। প্রাবন্ধিক নিজস্ব মূল্যায়নে তুলে ধরেন: ফররুখ আহমদের কবিপ্রতিভার উত্থান চল্লিশের দশকে। চল্লিশের দশক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমিতে ক্রান্তিকালরূপে চিহ্নিত। এই সময়ে বাংলা, ভারতবর্ষ এবং সমগ্র বিশ্ব ভয়াবহ সঙ্কট, সংঘর্ষ ও রক্তপাতে উত্তাল। ইতিহাসের এক ঘোরতর সঙ্কটকালে পৃথিবীজোড়া যুদ্ধ, শহর-ভর্তি বুভুক্ষ-মানুষের মৃতদেহ, মন্বন্তর, ঘৃণ্যতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, আত্মঘাতী রক্তপাত, ছিন্নমূল উদ্ভ্রান্ত মানুষ, উচ্ছৃঙ্খল সমাজবন্ধন; এক কথায়, মানবিক মূল্যবোধ এবং মানব-সম্পর্কের এক শোচনীয় অমাবস্যায় বোবা দুঃস্বপ্নের জগৎ ছিলো। এই সময়ে রচিত কবিতা সে কারণে নানা দিক থেকে বিশেষত্বপূর্ণ। তিরিশের কবিদের থেকে এই দশকের কবিরা পৃথক হয়ে যায় মূলত বিষয়বস্তু নির্বাচন ও শব্দ চয়নের সাহসী আধুনিকতার গুণে।
কবি মতিউর রহমান মল্লিক জীবনাদর্শ ও সাহিত্যাদর্শের মাপকাঠি হিসেবে ফররুখ আহমদকে মূল্যায়ন করেন। তিনি মনে করেন: ফররুখ আহমদ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কবি ও মৌলিক কবিপ্রতিভা। সর্বোপরি তাঁর রচনাভঙ্গি, কাব্যভাষা অত্যন্ত মৌলিক ও সৃজনশীলতার পরিচয়ে সমৃদ্ধ। নতুন নতুন শব্দ, রূপক, প্রতীক, উপমার ব্যবহারে তিনি অদ্বিতীয়। কাজী নজরুল ইসলামের পর মুসলিম কবি হিসাবে ফররুখ আহমদই শ্রেষ্ঠ প্রতিভার দাবিদার। কবি ইসলামিক ভাবধারার অনুসারী হলেও তাঁর মতাদর্শ কখনই কবিসত্তাকে সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করতে পারেনি। সেজন্যে তাঁর কবিতায় মানবমুক্তির বাণী সোচ্চার হয়। ১৩৫০-এর দুর্ভিক্ষের পটে লেখা তাঁর বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতা আরো একবার চুয়াত্তরের বাংলাদেশে উচ্চারিত হয়। কবি ছিলেন একজন অনমনীয় ব্যক্তিত্ব এবং প্রখর আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। সেই ব্যক্তিত্ব এবং আত্মমর্যাদা বোধকে অক্ষুণ্ন রাখার জন্য তাঁকে আমৃত্যু দুঃসহ দারিদ্র্য সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু কখনও কর্তৃত্বের দয়ার কাছে হাত পেতে নিজেকে খাটো করেননি। ১৯৫৮ সালে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখে ক্ষমতার রোষানলে নিক্ষিপ্ত হন কবি। আবার ১৯৬৬ সালে দেশপ্রেমের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব দেয়া হলে কবি প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু কী আশ্চর্য, তাঁর এই মহৎ ত্যাগকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কবিকে অপমান করা হয়।
মতিউর রহমান মল্লিক সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন আদর্শিক কাব্যের প্রতি। তিনি তাকে এভাবে উপস্থাপন করেন: মানবমুক্তির পথে ফররুখ আহমদের আদর্শিক রূপকল্প ‘সিরাজাম মুনীরা’ (১৯৫২) কাব্যে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত। ‘সাত সাগরের মাঝি’তে কবির প্রবল রোমান্টিকতা দৃশ্যমান, ‘সিরাজাম মুনীরা’তে আদর্শিকতার জয়গান রণিত। মহাকবি ইকবালকে ‘সাত সাগরের মাঝি’ উৎসর্গ করা যেমন, মওলানা আবদুল খালেককে ‘সিরাজাম মুনীরা’ উৎসর্গ করাও তেমন তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সাত সাগরের মাঝি’তে যা ছিলো রূপক ও প্রতীক আশ্রয়ী; যেন তারই বাস্তব ভিত্তিভূমি রচিত হলো ‘সিরাজাম মুনীরা’য়। মূলত ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্য ‘সাত সাগরের মাঝি’র পরিপূরক; কবিভাবনার সঠিক উত্তরণ, যথার্থ ও সুস্পষ্ট পরিণতি বলে অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ‘সাত সাগরের মাঝি’র যাত্রা ঐতিহ্যের পথে; ‘সিরাজাম মুনীরা’র আবেদন ইতিহাস থেকে আহরিত জীবনাদর্শের মাধ্যমে; উভয় কাব্যের অভিপ্রায় একই: গণমানুষের মুক্তি।
মানবমুক্তি পণ নিয়ে তুমি ওঠো দুর্গম শিলা শিখরে,
প্রতি পাথরের প্রাকার পারাতে আহত তোমার রুধির ঝরে,
হে বীর! সেখানে পাথরের মত অটল তোমার পদক্ষেপ,
শিলা পার হয়ে পীড়িতের বুকে ঝর্ণাধারার দাও প্রলেপ।
মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীন এবং যুগে যুগে যে সকল ইসলামী সাধকের জন্ম হয়েছে, তাঁরা কেবল কোন একটি বিশেষ কাল বা অঞ্চলের জন্যই নয়, দেশ-কাল-পরিবেশ নির্বিশেষে সকল মানুষ, বিশেষত সকল মুসলমানের চিরসম্মানিত ও পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। মুসলমানদের প্রাত্যহিক কর্ম, চিন্তা-চেতনা ও সামাজিক আচার ও অনুষ্ঠানে তাঁদের অমলিন জীবনধারা অনুপ্রেরণা জোগায়। ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্য মহৎ জীবনাদর্শের সর্বজনীন আবেদনের সাথে সাথে কাব্যশিল্প হয়ে উঠেছে। কবি দূর অতীতের রোমান্টিক জগৎ থেকে বাস্তবের জীবন ও জগতে প্রবেশ করেছেন; যখন স্বদেশে আদর্শিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন প্রক্রিয়াধীন।
এইভাবে ফররুখ আহমদের কবিকীর্তি প্রাবন্ধিক প্রকাশ করেন অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে।
গ. অন্যান্য
উল্লিখিত লেখক ছাড়াও আরো বেশ কিছু সাহিত্যিক নিয়ে তিনি আলোকপাত করেন। জাতির শ্রেষ্ঠ জ্ঞানতাপস ও সাহিত্যিকের মধ্যে একজন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র কীর্তি মূল্যায়নে প্রাবন্ধিক মতিউর রহমান মল্লিক সচেষ্ট। তাঁর সাহিত্যিক ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা বিচারের ক্ষেত্রে মতিউর রহমান মল্লিক কয়েকটি বিবেচনার দিকে আলোকপাত করেন। এইভাবে মতিউর রহমান মল্লিক আমাদের যে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারা তা রচনার দিকে মনোনিবেশ করেন। কথাশিল্পী জামেদ আলীর কথাসাহিত্য নিয়েও রসজ্ঞ ও প্রাণবন্ত সমালোচনা করেন তিনি। এ ছাড়া মহাকবি আল্লামা ইকবালের কবিতা ও হাস্যরস নিয়েও মতিউর রহমান মল্লিক মূল্যায়ন করেন। সবমিলিয়ে বলা যায় যে, দেশের আদর্শনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্যিকদের মূল্যায়নের দায়িত্ব পালনে তিনি সফল।

সংস্কৃতির স্বরূপ
মতিউর রহমান মল্লিক সংস্কৃতির স্বরূপ, ধারা, বিবর্তন এবং গতিপথ আঁকার কাজটি করেছেন। মানুষের সংস্কৃতি ও ইসলামী সংস্কৃতি যে একই সেই বিষয়টির গভীরে আলোকপাত করেন। বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তিনি তুলে ধরেন নানা আঙ্গিকে। তাঁর সংস্কৃতি চিন্তায় কয়েকজন মনীষীর প্রভাব লক্ষণীয়। শেখ আবুল কাসেম মিঠুন এ-বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন : তিনি দার্শনিক কবি শহীদ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহ রা.-এর ভক্ত ছিলেন। অন্যদিকে দার্শনিক মহাকবি আল্লামা ইকবালের কাব্যপ্রতিভার অনুসারী ছিলেন। তিনি মাওলানা মওদূদীর বিশ্বখ্যাত তাফহীমুল কোরআন এবং তাঁর বিপুল ভাণ্ডার থেকে অফুরন্ত জ্ঞান আহরণ করেন। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সালের মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি পাকিস্তান সৃষ্টি পর্যন্ত সাহিত্য সংস্কৃতি ক্ষেত্রের ইতিহাস তাঁর সামনে ছিেেলা। [শেখ আবুল কাসেম মিঠুন, প্রেক্ষণ, কবি মতিউর রহমান মল্লিক সংখ্যা স্মরণ]
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি হিসেবে মানসলোকের ছাপ পড়েছে তাঁর চিন্তায় ও কাজে। বিভিন্ন পণ্ডিতের উদ্ধৃতিসহ ইসলামী সংস্কৃতির স্বরূপ নির্ণয়ে মতিউর রহমান মল্লিক যে-সমস্ত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন সেগুলো নিম্নে ধারা আকারে লিপিবদ্ধ করা হলো :
ক. ইসলামী মূল্যবোধ সক্রিয় থাকবে ইসলামী সংস্কৃতিতে;
খ. ইসলামী জীবনব্যবস্থার লক্ষ্য এবং ইসলামী সংস্কৃতির চূড়ান্ত লক্ষ্য একই;
গ. তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাত ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক উপাদান;
ঘ. বিশ্বাস ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি;
ঙ. ইসলামী সংস্কৃতির লক্ষ্য ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের মুক্তি;
চ. ইসলামের আদর্শ ইসলামী সংস্কৃতির মূলে কার্যকর;
ছ. ইসলামী সংস্কৃতি সর্বজনীন ও আন্তর্জাতিক;
জ. ইসলামী সংস্কৃতি সকল প্রকার পৌত্তলিকতা, অশ্লীলতা ও অবিশ্বাস থেকে মুক্ত;
ঝ. জাতি, গোত্র, বংশ, বর্ণ ও ভাষার পার্থক্য সত্ত্বেও ইসলামী সংস্কৃতির একটি বিশ্বজনীন রূপ আছে;
ঞ. ইসলামী সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে, বিচিত্রভাবে, মহৎভাবে, বাঁচতে শেখায়;
ট. মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস ইসলামী সংস্কৃতির অঙ্গ;
ঠ. মানুষের প্রাণশক্তি, গণশক্তি, গণতন্ত্রবাদ, সার্বজনীন ভ্রাতৃত্ব ও সমান অধিকার ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম শিক্ষা;
ড. ইসলামী সংস্কৃতি স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে সমন্বয় করে একটি স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী;
ঢ. সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার রক্ষায় ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম লক্ষ্য;
ণ. ইসলামী সংস্কৃতি মানেই সর্বমানবিক সংস্কৃতি।
বিভিন্ন মনীষীর মতামত, ইসলামের ইতিহাস, দেশের অপসংস্কৃতির বাস্তবতা এবং ইসলামী সংস্কৃতির স্বরূপ নির্ণয়ে মতিউর রহমান মল্লিকের অভিমত বাংলাদেশের সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তাঁর সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার ধারা অব্যাহত রাখার মধ্যে বাংলাদেশের গণমানুষের মুক্তি নিহিত।

সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনের পথরেখা নির্মাণ
মতিউর রহমান মল্লিক সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বরূপ নির্ণয়ের পর বাংলাদেশে সাহিত্য-সংস্কৃতি আন্দোলনে নেতৃত্বের গুণাবলি, দায়-দায়িত্ব-কর্তব্য ও গন্তব্যের যাত্রাপথ নির্ণয় করে দিয়েছেন। তাঁর নির্ণীত পথে দেশে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বিপ্লবের দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাক :
ক. পরিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে;
খ. সিদ্ধান্ত নেয়া বিষয়ের প্রতি দখল থাকা প্রয়োজন;
গ. মূল আদর্শের আলোকে চরিত্র গঠন করা দরকার;
ঘ. অব্যাহতভাবে সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা করা উচিত;
ঙ. বিশেষজ্ঞ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে;
চ. সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠনগুলোকে আন্দোলনমুখী সংগঠনে রূপান্তরিত করা;
ছ. সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে সমন্বয় সাধন করা
ছ. অধিকতর উদার পরিবেশ গড়ে তোলা;
জ. বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা ও অংশগ্রহণ করা;
ঝ. সংগঠনের ভেতরে আন্তরিকতাপূর্ণ ও নির্ভয় পরিবেশ তৈরি করা;
ঞ. পরিশ্রমী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী জনশক্তি গড়ে তোলা;
ট. জনগণের আস্থা অর্জন করা;
ঠ. মাটি-মানুষ-আদর্শ-সত্য ও সুন্দরের প্রকাশমূলক অনুষ্ঠান তৈরি করা;
ড. অপসংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন;
ঢ. পথসভা ও ভ্রাম্যমাণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা;
ণ. সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পত্রিকা প্রকাশ করা;
ত. সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য পুরস্কার প্রদান করা;
থ. কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা;
দ. কেন্দ্রীয় পাঠাগার গড়ে তোলা;
ধ. শিশু সংগঠন গড়ে তোলা;
ন. সাহিত্য-সাংস্কৃতিক বৃত্তি চালু করা।
এইভাবে মতিউর রহমান মল্লিক দেশে সত্যিকার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সৃষ্টি করে জনগণের মনোভাবের পরিবর্তন সাধন, সুস্থ বিনোদন প্রদান ও গণমানুষের মুক্তি ত্বরান্বিত করার মহান ব্রত হাতে নিয়ে ছিলেন।
বাংলাদেশে সুস্থ, সুন্দর ও ঐতিহ্যবাদী সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ধারা বিনির্মাণে মতিউর রহমান মল্লিকের অবদান অসামান্য।

লেখক : বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply