মহামারী দুর্যোগ : মানবিক সঙ্কটে বাংলাদেশ ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ভয়াবহ রোগের খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তাকে মহামারী বলে আখ্যা দেয়া হয়। বর্তমানে করোনাভাইরাসকে বিশ্বব্যাপী মহামারী হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো একপ্রকারের প্রাকৃতিক ঘটনা, যাতে মানুষের আর্থ-সামাজিক ক্ষতি হয়ে থাকে। যদিও তা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবেই ঘটে থাকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কৃতকর্মের প্রভাবে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় এরকম ঘটনা ঘটে থাকে। সাধারণ ভাষ্যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম। এ রকম মহামারী ও দুর্যোগের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। মানবসভ্যতার সূচনা থেকেই দুর্যোগ ও মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছে মানবগোষ্ঠী। ঝড়. জলোচ্ছাস, পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাবসহ নানামুখী দুর্যোগ এবং ম্যালেরিয়া, যক্ষা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্ত প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের রোগে নানা সময়ে মহামারীর আকার ধারণ করেছে। মানবসভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে, দুর্যোগ-মহামারীর প্রাবল্য ততোই বেড়ে চলেছে। ধীরে ধীরে শহর, গ্রামে জনসংখ্যার ঘনত্ব, কলকারখানা, যোগাযোগ, বাণিজ্য প্রভৃতি বৈশ্বিক পরিবেশকে ভিন্নধারায় ঠেলে দিচ্ছে। ফলে পৃথিবী তার স্বকীয় ভারসাম্য হারিয়ে নানামুখী বিপর্যয়ের দিকে এগুচ্ছে। ইসলামী মূল্যবোধের অভাব, নৃশংসতা এবং ভয়ঙ্কর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মানবিক পরিবেশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধের মহামারী পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মহান আল্লাহ তায়ালা এ সবের মাধ্যমে আমাদের পরীক্ষার মুখোমুখি করছেন, ইতিহাস তার ধারাবাহিক সাক্ষী।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ
প্রাকৃতিক দুর্যোগের অন্যতম বিষয় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস এবং বন্যা। উপক‚লীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছরেই এর মুখোমুখি হয়ে থাকে। ফলে মৃত্যুমুখে পতিত হয় তীরভূমিতে অবস্থানকারী হাজার হাজার মানুষ, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় গবাদিপশুসহ বহু সম্পদ। ১৫৮৪ এবং ৮৫ সালে হারিকেন এবং বজ্রপাতসহ ঘূর্ণিঝড়ে বাকেরগঞ্জ অর্থাৎ বর্তমান পটুয়াখালী এবং বরিশাল জেলার নিকটবর্তী উপক‚লের ঘর ও নৌকা ধবংস করে। ১৮২২ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাসে বরিশাল, হাতিয়া দ্বীপ এবং নোয়াখালীতে আঘাত হানে। ১৮৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে কুতুবদিয়া দ্বীপ ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরের বছরে কলেরা মহামারীর আকার ধারণ করলে আরও ১৮,০০০ মানুষ মারা যায়। ১৯৬০ সালের ৯-১০ অক্টোবর তীব্র ঘূর্ণিঝড় পূর্ব মেঘনা নদীর মোহনার নিকটবর্তী নোয়াখালী, বাকেরগঞ্জ, ফরিদপুর ও পটুয়াখালীর চরজব্বার, চরআমিনা, চরভাটিয়া, রামগাতি, হাতিয়া ও নোয়াখালীর ৩,০০০ অধিবাসী মারা যায়।
১৯৬৬ সালের ১ অক্টোবর তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে স›দ্বীপ, বাকেরগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লায় ৮৫০ জন অধিবাসী ৬৫,০০০ গবাদিপশু মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে সমগ্র বাংলাদেশের উপক‚লীয় অঞ্চল চটগ্রাম, বরগুনা, খেপুপাড়া, পটুয়াখালী, চরবোরহানুদ্দিনের উত্তর পাশ, চরতাজুমুদ্দিন এবং মাইজদি ও হরিণঘাটা এর দক্ষিণ পাশ সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাব অনুসারে মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। গবাদিপশু মৃত্যু প্রায় ১০ লক্ষে, বাড়িঘর ৪ লক্ষ এবং ৩,৫০০ শিক্ষাকেন্দ্র বিধ্বস্ত হয়। ১৯৭৪ সালের ১৩-১৫ আগস্ট ঘূর্ণিঝড়ে খুলনা অঞ্চলের ৬০০ জন অধিবাসী মারা যায়। একই বছরের ২৪-২৮ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের নিকটবর্তী উপক‚লীয় অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেন ২০০ অধিবাসী। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর নিকটবর্তী উপক‚লীয় দ্বীপাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ে ৪৩ জন, চট্টগ্রাম, কুতুবদিয়ার নিকটবর্তী কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, টেকনাফ, উখিয়া, মইপং, সোনাদিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালী এবং নোয়াখালী অঞ্চলে ৩০০ জন মারা যায়।
১৯৮৫ সালের ২৪-২৫ মে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং উপক‚লীয় অঞ্চলে ১১,০৬৯ জন অধিবাসী, ১৩৫,০৩৩ গবাদিপশুর মৃত্যু, ৯৪,৩৭৯টি বসতবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪-৩০ নভেম্বরে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ে যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর এবং বরিশাল ও খুলনা অঞ্চলের উপক‚লীয় এলাকায় ৫,৭০৮ জন অধিবাসী ও সুন্দরবনে অসংখ্য বন্যপ্রাণী, ১৫,০০০ হরিণ ও ৯টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ৬৫,০০০ গবাদিপশুর মৃত্যু ঘটে। ১৯৯১ সালের ২৯-৩০ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড় ঝড়ের প্রভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের উত্তর উপক‚লে ভূমিধস হয়। জলোচ্ছ¡াসের উচ্চতা ৫-৮ মিটারে পৌঁছায়। ১৫০,০০০ জন অধিবাসী এবং ৭০,০০০ গবাদিপশু মারা যায়। ঘূর্ণিঝড়টিতে সম্পদের ক্ষতি হয় ৬০ বিলিয়ন টাকা। ১৯৯৪ সালে ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের নিকটবর্তী উপক‚লীয় অঞ্চলে ৪০০ জন অধিবাসীসহ প্রায় ৮,০০০ গবাদিপশু মারা যায়। ১৯৯৫ সালে ঘূর্ণিঝড়ে কক্সবাজারের অঞ্চলে ৬৫০ জন অধিবাসীসহ মারা যায় ১৭,০০০ গবাদিপশু। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে বাংলাদেশের দক্ষিণের উপক‚লীয় অঞ্চলের সাড়ে তিন হাজারের অধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপক‚লীয় অঞ্চল। ২০০৯ সালের আইলায় মারা যায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ভাগের ১৫ জেলার প্রায় ১৫০ জন অধিবাসী, ২ লক্ষ বসতবাড়ি ও ৩ লক্ষ একর জমির ফসল বিনষ্ট হয়। ২০১৩ সালের ঘূর্ণিঝড় ভিয়ারু বা মহাসেন-এর আঘাতে চট্টগ্রামে ১৭ জন মারা যায়। এ ছাড়াও ২০১৫ সালে ঘূর্ণিঝড় কোমেন, ২০১৬ সালের রোয়ানু এবং ডিয়ামুর আংশিক আঘাতে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়। এ ছাড়া ১৯৭৪ এবং ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় বিধ্বস্ত হয় উত্তরজনপদসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা। মানুষের মৃত্যু, গবাদিপশুর প্রাণহানিসহ ফসলের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়।

রোগ-ভাইরাসে মহামারী
বাতাসে এখন গুপ্তঘাতক করোনাভাইরাসের ছড়াছড়ি। এ মরণব্যাধি পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে ছোবল হানছে। প্রতিদিনই গাণিতিক হারে বাড়ছে এ রোগে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। এ রোগের ভয়াবহতায় কেঁপে উঠছে পৃথিবী। যে মানুষ, যে দেশ এতোদিন মানুষ মারার জন্য অস্ত্র বানিয়েছে, পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার করেছে সেই মানুষ আজ চরম অসহায় অবস্থার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতির বিস্তৃতি ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হিড়িক পড়েছে লকডাউন, সেনাবাহিনী নামানো এবং কারফিউ ও জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণার। দিশেহারা হয়ে উঠেছে পৃথিবীর মানবকুল। মানুষের মধ্যে এখন একটাই আতঙ্ক, ভাবনা ও আলোচনার বিষয় আর তা হচ্ছে করোনাভাইরাস। বাংলাদেশও এ ধরনের অবস্থার বাইরে নেই। দেশ-জাতি, ধর্ম-বর্ণ ও ভৌগোলিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে দুনিয়ার সব মানুষ মানুষ্যবোধ ও মানবতা বোধের জিকির তুলে সহায়তা-সহমর্মিতা প্রত্যাশা করছে। আর এ তাড়না থেকে ক্রমশ জেগে উঠছে মানবিক বিশ্ব গড়ে তোলার চিরন্তন স্বপ্ন।
প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবী দেখেছে মহামারী আকারে এ রকম অনেক রোগ প্রাদুর্ভাব ও ভয়াবহতা। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দে এথেন্স পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের সময় একটি রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে বর্তমান লিবিয়া, ইথিওপিয়া ও মিসর হয়ে গ্রিসের রাজধানী এথেন্স পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এ রোগে এ অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের মৃত্যু হয়। ৫৪১ সালে জাস্টিনিয়ান প্ল্যাগ রোগ মিশরে প্রথমে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। একাদশ শতাব্দীতে ব্যাকটেরিয়াজনিত কুষ্ঠরোগ ইউরোপে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ১৩৫০ সালে ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ’ নামের একটি রোগ মহামারী আকারে এশিয়া, পশ্চিমা বিশ্বসহ পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়। ১৬৬৫ সালে দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন নামের রোগে লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু হয়। ১৮১৭ সালে প্রথম কলেরা রোগে রাশিয়ায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। পরবর্তীকালে এ রোগ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে ভারতবর্ষে বিস্তার লাভ করে। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায় মহামারী আকার ধারণ করে। তখন সব মিলিয়ে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ মারা যায়। পরবর্তীতে আরও দেড়শ বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে কলেরা মহামারী আকারে দেখা দেয়।
১৮৫৫ সালে চীন থেকে তৃতীয় প্লেগ মহামারী দেখা দিয়ে ভারতবর্ষে ও হংকংয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগের মহামারীতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ মারা যায়। ১৮৮৯ সালে ‘রাশিয়ান ফ্লু’র সংক্রমণে সাইবেরিয়া, কাজাখিস্তান ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকা অঞ্চলে ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯১৮ সালে চীন থেকে স্প্যানিশ ফ্লু কানাডা হয়ে ইউরোপ, স্পেনের মাদ্রিদ ও উত্তর আমেরিকায় ৫০ কোটি মানুষ আক্রান্ত এবং ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়াতে মানবদেহে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয় জিকা ভাইরাস। এই ভাইরাস ডেঙ্গু জ্বরের কিছুটা মিল রয়েছে। গুটিবসন্ত বা স্মল পক্স ভ্যারিওলা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতো এবং এটি অত্যন্ত মারাত্মক এক ব্যাধি ছিল। ১৭৯৬ সালে গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কারের প্রায় ২০০ বছর পরও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে ভারতে। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশে গুটি বসন্ত মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ও প্রায় আড়াই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এখন এ রোগ অনেকটাই প্রশমিত। ১৯৫৭ সালে ‘এশিয়ান ফ্লু’র সংক্রমণে হংকং, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে সাড়ে ১১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৮১ সাল থেকে এইচআইভি বা এইডস রোগে এ যাবৎকাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ইউরোপ-আফ্রিকায় ইবোলা ভারাসে প্রাণ হারায় হাজার হাজার মানুষ। ২০১৪ ও ২০১৬ সালের মধ্য আফ্রিকায় এর প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১১ হাজার মানুষ মারা গেছে। ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে কঙ্গো, সুদান, গ্যাবন ও আইভরিকোস্টে এই ভাইরাসের প্রকোপ বেশি।
সার্স অর্থাৎ সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে দুবার এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আট হাজারের বেশি আক্রান্তের মধ্যে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়। ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলে ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। ২০১২ সালে মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স নামের ভাইরাস প্রথম সৌদি আরবে আবিষ্কৃত হয় এবং সেখানে আক্রান্তদের ৩৫ শতাংশ মারা গেছেন। করোনাভাইরাস গোত্রীয় বলে ভাইরাসটির নাম মার্স করোনা ভাইরাস।
চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এ আতঙ্কেও বাইরে নয়। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে শামিল হচ্ছে হাজারো বনি আদম। বেইজিংয়ের ‘চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স’ মনে করছে করোনাভাইরাসের উৎস হতে পারে বাদুড় ও সাপ। সার্স আক্রান্তদের মতোই করোনায় আক্রান্তদের জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা ফুলে যাওয়া কিংবা সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। পৃথিবীব্যাপী মহামারী ঘটাতে পারে এমন অসুখের তালিকায় নতুন রহস্যময় অসুখ ‘ডিজিজ এক্স’ এর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এটি এমন কোনো রোগ যা মানবজাতির কাছে এখনো অজানা, কিন্তু তা আন্তর্জাতিকভাবে মহামারীর রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে এ রোগটি মহামারী আকার ধারণ করবে, যাতে মানবজাতি বড় এক সংকটে পড়তে পারে।
বিপর্যয় রোধে মানবিক হবো
আল্লাহ তায়ালা এ ধরনের দুর্যোগ দেন মানুষকে পরীক্ষা করতে। মানুষ আল্লাহর খলিফা হিসেবে তাকে অন্যের দুঃখ-কষ্টের সময় নিজেকে উজাড় করে সেবার জন্য এগিয়ে যেতে হয়। সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ না করতে পারলে মানুষ ‘মানুষ’ নামের উপযুক্ততা থাকে না। তাই গর্তে লুকানোর চিন্তা না করে আমাদের উত্তীর্ণ হতে হবে মানবিকতার পরীক্ষায়। সাধ্যমতো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে মানবিক সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
হযরত উমর (রা)-এর শাসনামলে ১৮ হিজরি সনের শুরুতে সিরিয়ায় একটি মহামারী দেখা দিয়েছিল। হযরত উমর সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা করেছিলেন। তাবুক অতিক্রম করে জানতে পারেন মহামারীর খবর। সিরিয়ায় তখন আবু উবায়দা (রা)-এর নেতৃত্বে রোম সাম্রাজ্য মুসলমানদের বিজয় সূচিত হয়েছে। এ অবস্থায় হযরত উমর (রা) মুহাজির সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শে বসেন। মুহাজিররা দু’দলে ভাগ হয়ে যান। একদল আল্লাহর ওপর ভরসা করে মহামারী আক্রান্ত এলাকায় যাত্রা বহাল রাখার পরামর্শ দেন। অপর দল নিজ থেকে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে নিরুৎসাহিত করেন। বিতর্ক হয় দু’দলের মাঝে। হযরত উমর (রা) দু’দলকেই উঠে যেতে বলেন। পরদিন আনসারী সাহাবিদের পরামর্শসভা ডাকেন। আনসারিরাও দু’দলে ভাগ হয়ে যান। তাদের মাঝেও সৃষ্টি হয় তুমুল বিতর্ক। হযরত উমর (রা) তাদেরও উঠে যেতে বলেন। এরপর হযরত উমর কুরাইশের প্রবীণ অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। প্রবীণ কুরাইশরা সর্বসম্মতিক্রমে হযরত উমরকে সিরিয়া প্রবেশে বাধা দেন। তাদের যুক্তি ছিল যে, সেখানে বহু মানুষ মহামারীতে আক্রান্ত। যদি আমরাও আক্রান্ত হই তাহলে তাদের বিপদ বাড়বে বৈ কমবে না। বাইরে থেকে তাদের বিভিন্ন সাহায্য পাঠানোর পথও বন্ধ হয়ে যাবে। হযরত উমর তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। আবু উবাইদা (রা) উমর (রা)কে আপত্তি করে বলেন, হে আমীরুল মুমিনিন, আপনি কি আল্লাহর তকদির থেকে পলায়ন করছেন? উমর (রা) খুব রাগান্বিত হন। তিনি বলেন, হে আবু উবাইদা, তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এ কথা বলতো? অর্থাৎ তোমার কাছে আমি এ ধরনের কথা আশা করিনি। উমর বলেন, হ্যাঁ, আমরা এক তকদির থেকে আরেক তকদিরের দিকে যাচ্ছি। আমরা এখন যা করছি এটাও আল্লাহর তকদির। তার তকদিরের বাইরে নয়।
তিনি একটি উদাহরণ উপস্থাপন করেন। তুমি যদি তোমার বকরি নিয়ে চারণভূমিতে যাও, সেখানে দুটি ভূমির একটিতে শুকনো ঘাস আরেকটিতে তাজা ঘাস দেখতে পাও, এমতাবস্থায় তুমি শুকনো ঘাসের দিকে বকরি না নিয়ে সবুজ তাজা ঘাসের মাঠে বকরি নিয়ে গেলে কি এ কথা বলা যাবে যে, তুমি তকদির থেকে পলায়ন করছ? শুকনো ঘাসও আল্লাহর তকদির, সবুজ ঘাসও আল্লাহর তকদির। একটি গ্রহণ না করে অপরটি গ্রহণের স্বাধীনতা তোমার রয়েছে।
আব্দুর রহমান ইবন আওফ পরামর্শের সময় অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি ফিরে সব শুনে বললেন, এ বিষয়ে আমার কাছে নবীজীর একটি বিশেষ বার্তা আছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, কোথাও মহামারী দেখা দিলে তোমরা কেউ বাইরে থেকে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যারা পূর্ব থেকেই সেখানে আছে তারা যেন সেখান থেকে বের না হয়। হযরত উমর এ হাদীস শুনে খুব খুশি হলেন। [বুখারী শরীফ] মহামারী থেকে পালিয়ে কি বাঁচা যাবে মৃত্যু থেকে? মৃত্যু যেখানে আছে সেখানে পৌঁছে যাবেই। এ জন্যই মহামারী থেকে বাঁচতে নিজের অঞ্চল ছেড়ে পালিয়ে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তার একটি কারণ এও যে, আক্রান্ত মানুষের সেবা করতে লোকের প্রয়োজন হয়। বাইরে থেকে কেউ ঝুঁকি নিতে আসবে না। এ জন্য উপদ্রুত এলাকায় যারা সুস্থ থাকে তাদের উচিত নিজেদের উজাড় করে অসুস্থদের সেবা করে যাওয়া।
সিরিয়ার ঘটনায় হযরত আবু উবায়দা (রা)কে হযরত উমর (রা) চিঠি লিখেছিলেন, তোমাকে আমার বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। আমার চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমার কাছে চলে আসবে। আবু উবায়দা (রা) বুঝতে পারলেন, হযরত উমর (রা) তাকে মহামারী থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছেন। তিনি উত্তরে লিখলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আমি দুঃখিত, আপনার কথা রাখতে পারছি না। আমাকে আমার সৈনিকদের সঙ্গে থাকতে দিন। [তারিখে তাবারী] মূলত আবু উবাইদা (রা) তার অধীনস্থ সৈনিকদের মহামারীতে ফেলে একা বাঁচার চিন্তা করতে পারেননি। পঁচিশ হাজার মুসলমানের সঙ্গে হযরত আবু উবাইদাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তারপর হযরত মুআয সিরিয়াবাসীর নেতৃত্বে ছিলেন। তিনিও মারা যান একই মহামারীতে। এ মহামারীর নাম ছিল আমওয়াস। প্যালেস্টাইনের ছোট্ট গ্রামের নামে নামকরণ করা হয়েছিল মহামারীর।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারীতে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়েছে। বাংলাদেশও কার্যত অচল। টানা সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের কারণে রাজস্ব আদায়, আমদানি-রফতানি, প্রবাসী আয়সহ অর্থনীতির সব সূচক স্থবির হয়ে পড়ছে। কোভিড-১৯ পরবর্তী নতুন বিশ্বে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ধাক্কা কেমন হবে, তা মোকাবিলায় সরকারের কি করণীয় হবে এসব নিয়ে বেশকিছু জরিপ হয়েছে এরই মধ্যে। এসবে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে নিম্ন-আয়ের মানুষ। রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহপরিচারিকা, রেস্টুরেন্টকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, অটোচালক, কৃষক, জেলে, দোকানি, বিদেশফেরত মানুষ। এমতাবস্থায় মানবসেবার মাধ্যমেই আমরা সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারি। করোনাভাইরাসের ভয় না ছড়িয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করার সুচিন্তিত ভাবনা ভাবা উচিত আমাদের। ভয়কে জয় করতে হবে আমাদের। অনর্থক ভয়ে যারা ভীত হচ্ছে তাদের শান্ত করাও সুস্থ সুশীল মানুষের কর্তব্য।
পরিশেষে বলা যায়, রোগের ভাইরাস শুধু রুগ্নব্যক্তির দেহে সীমিত থাকে না, সেটি দ্রুত সময়ে অন্যদের দেহেও প্রবেশ করে। যে কোন রোগ এভাবেই ভয়ানক মহামারী ঘটায়। মানবিক বা চারিত্রিক রোগের ক্ষেত্রেও একই বিষয়। বাংলাদেশের মানবিক সমস্যাটিতে তাই শুধু পেশাদার খুনি বা সন্ত্রাসীদের রোগ নয়, বরং তাতে প্রবলভাবে আক্রান্ত সমগ্র দেশ। সমগ্র দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে সরকারি তহবিল তছরুপ, ঘুষ, ধোঁকাবাজি ও ফাঁকিবাজির রাজত্ব। দেশটির হাজার হাজার বিবেকহীন সন্ত্রাসী যেমন আনাচে কানাচে মানুষ খুন, টেন্ডার দখল, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলদখল, রাস্তার গাছকাটা, নদীদখল, বনদখল, জমিদখলসহ অবৈধ ক্ষমতা দখলের মহোৎসব চলছে। মানবিক মূল্যবোধের ধস নেমেছে দেশজুড়ে। অন্ধকারাচ্ছন্ন এমন পরিবেশে হাজির সংযমের মাস রমজান। ইসলামের অনুসারীরা এ মাসে রোজা রাখেন, গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ইফতার করেন। মসজিদে নামাজ পড়েন, বিশেষত তারাবির নামাজ। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মক্কা-মদীনা মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও তারাবির নামাজ ঘরে আদায় করতে হচ্ছে। ইবাদতের পর্ব যেভাবেই সম্পাদন করার সুযোগ আসুক না কেন সহীহ নিয়তে মহান আল্লাহর কাছে রুজু হতে হবে। নিজেদের অপকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা, আমাদের আত্মশুদ্ধির পথ প্রশস্ত করো এবং ঈদের আগেই এ মহামারীর কবল থেকে আমাদের মুক্তি দাও।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply