মুমিনের হৃদয়ে হজ এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

মুমিন হৃদয়ে সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষার ইবাদত হলো হজ। শারীরিক ও আর্থিক দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর হজ ফরজ হলেও হজ পালনের আকাক্সক্ষা লালন করেন সবাই। মুসলমানমাত্রই বায়তুল্লাহ তথা আল্লাহর ঘর নিজ চোখে দেখা এবং সেই ঘর তাওয়াফের তীব্র বাসনা পোষণ করেন। যে কাবাঘরের দিকে মুখ করে প্রতিদিন নামাজ আদায় করেন সেই ঘরকে সরাসরি সামনে রেখে নামাজ আদায় এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজেকে সমর্পণ, তাঁর ঘরের সামনে বসে তাঁরই কাছে প্রার্থনার অনুভূতিই আলাদা! এ জন্য অনেকে হজে যাওয়ার জন্য অর্থ সঞ্চয়ও করেন। অবশেষে আজন্ম লালিত ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে হজে গমন করেন।
হজে যাওয়ার পর তার মুুখের অন্যতম ভাষা হয়ে দাঁড়ায়- ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…’ অর্থাৎ হে আল্লাহ আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি তোমার দরবারে হাজির…! এভাবে একজন হাজী কাবা তাওয়াফ, সাফা মারওয়া সাই, মিনা, মুজদালিফা ও আরাফাতের ময়দানে অবস্থানসহ অন্যান্য কার্যাদির মাধ্যমে হজ পালন করেন। আর এভাবেই তার আজন্ম লালিত বাসনা পূরণ করেন। নিজেকে মহান আল্লাহ তায়ালার ঘনিষ্ঠ করার আধ্যাত্মিক দীক্ষা নিয়ে ফেরেন।

ইসলামের মূল স্তম্ভসমূহের পঞ্চমটি হলো হজে বায়তুল্লাহ। ঈমান, নামাজ, জাকাত ও রোজার পরই হজের অবস্থান। হজ মূলত শারীরিক ও আর্থিক উভয়ের সমন্বিত একটি ইবাদত। তাই উভয় দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর হজ পালন করা ফরজ। অর্থাৎ হজ আদায়ে সক্ষম এমন শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচাপাতি ও আসবাবপত্রের অতিরিক্ত হজে যাওয়া-আসার ব্যয় এবং হজ আদায়কালীন সাংসারিক ব্যয় নির্বাহে সক্ষম এমন সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর হজ আদায় করা ফরজ। হজ প্রত্যেক মুসলমানের উপর সারা জীবনে একবারই ফরজ হয়। একবার ফরজ হজ আদায়ের পর পরবর্তী হজগুলো নফল হিসেবে গণ্য হবে।
হজ যেহেতু একবারই ফরজ তাই যার উপর হজ ফরজ হয়েছে সে যদি মৃত্যুর আগে যে কোনো বছর হজ আদায় করে, তবে তার ফরজ আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু হজ বিধানের মৌলিক তাৎপর্য, তার যথার্থ দাবি ও আসল হুকুম হচ্ছে হজ ফরজ হওয়ার সাথে সাথে আদায় করা। বিনা ওজরে বিলম্ব না করা। কারণ বিনা ওজরে বিলম্ব করাও গুনাহ। আল্লাহ তায়ালা ও তার রাসূল ফরজ হজ আদায়ের প্রতি এমনভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন যে, কেউ যদি এই হজকে অস্বীকার করে বা এ বিষয়ে কোনো ধরনের অবহেলা প্রদর্শন করে তবে সে আল্লাহর জিম্মা থেকে মুক্ত ও হতভাগ্যরূপে বিবেচিত হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (বায়তুল্লাহ) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে এ গৃহের হজ করা ফরজ। আর কেউ যদি অস্বীকার করে তাহলে তোমাদের জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিজগতের প্রতি মুখাপেক্ষী নন।” (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)
হজ করার শক্তি-সামর্থ্য ও অর্থ-বিত্ত থাকার পরও যে ব্যক্তি হজ করে না তার সম্পর্কে হাদীস শরীফে কঠোর হুমকি প্রদান করা হয়েছে। ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, “যে ব্যক্তি হজ করার সামর্থ্য রাখে, তবুও হজ করে না সে ইহুদি হয়ে মৃত্যুবরণ করলো, কি খ্রিস্টান হয়ে তার কোনো পরোয়া আল্লাহর নেই।” (তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৫৭৮)

হজ আদায়ের ফজিলত

হজে মাবরূরের প্রতিদান হলো জান্নাত : আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “এক উমরা আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহর ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। আর হজে মাবরূরের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” (বুখারী-১৭৭৩; মুসলিম-১৩৪৯)
হজ ও ওমরাহকারীর দোয়া কবুল করা হয় : জাবির রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “হজ ও ওমরাহকারীগণ আল্লাহর প্রতিনিধিদল। তারা দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল করা হয় এবং তারা কিছু চাইলে তাদেরকে তা দেয়া হয়।” (মুসনাদে বাযযার-১১৫৩; মাজমাউয যাওয়াইদ-৫২৮৮; তাবারানি-১৭২১)
হজ-পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মুছে দেয় : আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি হজ করে আর তাতে কোনোরূপ অশ্লীল ও অন্যায় আচরণ করে না তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।” (তিরমিযী : ৮১১)
সর্বোত্তম আমল হজে মাবরূর : হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সা.কে জিজ্ঞাসা করা হলো, “সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিজ্ঞাসা করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, হজে মাবরূর বা কবুল হজ।” (বুখারী-২৬; মুসলিম-৮৩)
হাজীদের গুনাহ মাফ হয় এবং তারা যাদের গুনাহ ক্ষমা চায় তাদেরকে মাফ করা হয় : আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা হাজীদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং হাজী যাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তাদেরকেও ক্ষমা করেন।”
(মুসনাদে বাযযার-১১৫৫; তবারানি সগীর-১০৮৯)

হজ ও ওমরার জন্য খরচ করার ফজিলত : বুরাইদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, “হজের জন্য খরচ করা, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার মতই, যার সওয়াব সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।” (মুসনাদে আহমাদ-২৩০০০)

হজ ও ওমরাহ পালনকালে মৃত্যুবরণকারীর ফজিলত : ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত- এক ব্যক্তি আরাফাতের ময়দানে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাথে সফররত ছিলেন। হঠাৎ তিনি বাহন থেকে নিচে পড়ে গেলেন। এতে তার ঘাড় মটকে গেল এবং তিনি মারা গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন, তাকে বরইপাতা সিদ্ধ করা পানি দিয়ে গোসল দাও, তার দুই কাপড় দিয়ে তাকে কাফন পরাও। তাকে সুগন্ধি লাগিও না এবং তার মাথাও আবৃত করো না। কেননা তাকে কিয়ামতের দিন তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় উঠানো হবে। (বুখারী-১২৬৭; মুসলিম-১২০৬)
তালবিয়া পাঠ ও উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠের ফজিলত : আবু বকর সিদ্দিক রা. হতে বর্ণিত- নবী কারীম সা.কে জিজ্ঞেস করা হলো, “কোন হজ সর্বোত্তম? তিনি বললেন, যে হজে উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করা হয় এবং কোরবানি করা হয়।”
(তিরমিযী-৮২৭; ইবনে মাজাহ-২৯২৪)

বায়তুল্লাহ তাওয়াফের ফজিলত : ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি যথাযথভাবে সাতবার বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করে এবং দুই রাকাত সালাত আদায় করে তার একটি গোলাম আজাদ করার সমান সওয়াব হয়। তাওয়াফের প্রতি কদমে আল্লাহ তার একটি করে গুনাহ মাফ করেন, একটি করে নেকি লেখেন এবং দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।”
(মুসনাদে আহমদ-৪৪৬২; সুনানে তিরমিযী-৯৫৯)

হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানি স্পর্শ করার ফজিলত : ইবনে ওমর রা. বর্ণনা করেন-আমি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছি, “হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানির স্পর্শ পাপসমূহকে মুছে দেয়।” (সুনানে তিরমিযী-৯৫৯)

ইয়াওমে আরাফার ফজিলত : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, নবী করীম সা. বলেছেন, “আরাফার অধিবাসীদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করেন এবং তাদেরকে বলেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখো, তারা এলোমেলো চুলে, ধুলোমলিন অবস্থায় আমার কাছে এসেছে।” (মুসনাদে আহমদ-৭০৮৯; তাবরানি-৫৭৫)

পবিত্র হজ আয়োজন হবে সীমিত আকারে

বিভিন্ন দেশের মুসলিম যারা বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাস করছেন ওইসব সীমিত সংখ্যক হাজীদের নিয়েই এবারের হজ অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এ বছর সীমিত আকারে পবিত্র হজ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার।
সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেয়া হয়। ঘোষণায় বলা হয়, শুধু সৌদি আরবে বসবাসরতরাই এবারের হজে অংশ নিতে পারবেন। সৌদি আরবের হজ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিভিন্ন দেশের মুসলিম যারা বর্তমানে সৌদি আরবে বসবাস করছেন ওইসব সীমিতসংখ্যক হাজীদের নিয়েই এবারের হজ অনুষ্ঠিত হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিশ্বজুড়ে করোনভাইরাসের সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে। এমনকি এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন বা প্রতিষেধক বের হয়নি। এই অবস্থায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো হাজীর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সে জন্যেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
মার্চ মাসের শুরুতেই কাবা চত্বর করোনাভাইরাসের জীবাণুমুক্ত করার জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। মানুষবিহীন কাবার ছবি দেখে অনেকেই তাদের কষ্টের কথা নানাভাবে ব্যক্ত করেছেন। ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হজ ও কাবা বন্ধ হওয়ার ঘটনা আগেও অনেকবার ঘটেছে।
সর্বশেষ ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের ৩১ জুলাই। একদল ইরানি হাজী কাবা চত্বরে ইসরাইল-আমেরিকা বিরোধী বিক্ষোভ করলে সৌদি পুলিশ আর ন্যাশনাল গার্ড তাতে বাধা দেয়। এরপর সংঘর্ষে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। তখন কাবার তাওয়াফ বন্ধ করা হয়। এর আগে ১৯৭৯ (২০ নভেম্বর) সালে জুহাইমান আল ওতাইবি তার এক শিষ্যকে ইমাম মাহদি দাবি করে কাবাঘর দখল করে নেয়। সে সময় প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত কাবা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ছিল। কোনো তাওয়াফ অনুষ্ঠিত হয়নি।
ইতিহাসের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’তে বলা হয়েছে, ৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় একটি রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ সময় মক্কায় হজযাত্রীদের ব্যবহৃত উটগুলো পানির অভাবে মারা যায়। সেবারও হজ বন্ধ ছিল।
যুদ্ধ-বিগ্রহ ও মহামারীর কারণে বিভিন্ন সময় হজ বাতিল হয়েছিল।
সর্বশেষ সংবাদে জানা যায়, এবার সীমিত আকারে হজ পালনের ব্যবস্থা করা হবে। সেটাও হবে দুঃখজনক একটা ঘটনা। কেননা অনেক মুসলমান দীর্ঘদিন যাবৎ প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবারের হজে অংশ নেয়ার জন্যে। এ সংবাদে তারা ব্যথিত হবেন। আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলাম অবাস্তব কোনো ধর্ম নয়। ইসলাম মানুষের সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু চাপিয়ে দেয় না।
এই করোনার সময় দেশে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পথে বসেছেন। অনেক মানুষ চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু পথযাত্রী। এমন অনেক পরিবার আছে যারা কারও কাছে হাত পাততে পারছে না কিন্তু অভাব তার ঘরে লেগে আছে। আমরা যারা অর্থবান অথবা হজের নিয়ত করেছি কিন্তু যেতে পারছি না তারা চাইলেই এমন দুর্যোগের সময় মানবতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারি।
আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবানদের ওপর হজ অবশ্য পালনীয় একটি বিধান। তবে যাদের হজে অথবা ওমরায় যাওয়ার সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই অথবা যেকোনো কারণে হজে যেতে পারছেন না তাদের জন্যও দয়াবান আল্লাহ এমন কিছু পথ বের করে দিয়েছেন; যেগুলো দ্বারা দুর্বল বান্দারা মকবুল হজের অথবা ওমরাহর সওয়াব পেয়ে যেতে পারে। প্রিয় নবী সা. আমাদের সেসব রকমারি পথ বা আমল বাতলিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন হাদীসে।

১. মাতা-পিতার সেবা এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা
হজরত আনাস ইবনে মালিক রা. বর্ণনা করেন, “জনৈক ব্যক্তি নবীজি সা.-এর নিকট এসে বলল, আমি জিহাদে অংশগ্রহণ করতে চাই, কিন্তু আমার সেই সামর্থ্য ও সক্ষমতা নেই। নবীজি প্রশ্ন করলেন, তোমার মাতা-পিতার কেউ কি জীবিত আছেন? লোকটি বলল, আমার মা জীবিত। প্রত্যুত্তরে নবীজি বললেন, তাহলে মায়ের সেবা করে আল্লাহর নিকট জিহাদে যেতে না পারার অপারগতা বা ওজর পেশ কর। এভাবে যদি করতে পার এবং তোমার মা সন্তুষ্ট থাকেন তবে তুমি হজ, ওমরাহ এবং জিহাদের সওয়াব পেয়ে যাবে। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং মায়ের সেবা কর।” (মাজমাউয যাওয়াইদ-১৩৩৯৯)
আর একটি বিষয় আছে যা এই করোনার প্রেক্ষাপটে মিলে যায়। তা হচ্ছে- হাসান আল-বসরি (রহ.) বলেন, “তোমার ভাইয়ের প্রয়োজন মেটানো তোমার বারবার হজ করার থেকে উত্তম।’’ অর্থাৎ এই ভাই বলতে অন্য মানুষের উপকারের কথা বলা হয়েছে।

২. ইশরাকের নামাজ পড়া
ফজরের নামাজ আদায়ের পর মসজিদে সূর্যোদয় পর্যন্ত অবস্থান করা। আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা. বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করলো, এরপর দুই রাকাত নামাজ আদায় করলো, সে ব্যক্তি হজ ও ওমরাহর সওয়াব নিয়ে ফিরলো।’’ (তিরমিজি-৫৮৬)

৩. মসজিদে নামাজের জামাতে হাজির হওয়া
সাহাবি আবু উমামা রা. বর্ণনা করেন, নবীজি সা. ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি মসজিদে গিয়ে জামাতের সঙ্গে ফরজ নামাজ আদায় করল সে যেন হজ করে এলো। আর যে ব্যক্তি নফল নামাজ আদায় করতে মসজিদে গমন করল সে যেন ওমরাহ করে এলো।” (তাবারানি-৭৫৭৮)

৪. দ্বীন শিখা বা শিখানোর উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়া
এটা অনেক বড় সওয়াবের কাজ। হযরত আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, “যে ব্যক্তি মসজিদে গেল কোনো ভালো কথা শিখা বা শিখানোর উদ্দেশ্যে, সে পরিপূর্ণরূপে হজ আদায়কারী একজন ব্যক্তির ন্যায় সওয়াব লাভ করবে।” (তাবারানি-৭৪৭৩)

৫. ফজরের নামাজ আদায় করে মসজিদে সূর্যোদয় পর্যন্ত অবস্থান করা
হজরত আনাস ইবনে মালিক রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেন, “যে ব্যক্তি জামাতের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করল, তারপর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে বসে আল্লাহর জিকির করল, এরপর দু’রাকাত নামাজ আদায় করল, সে ব্যক্তি হজ ও ওমরাহর সওয়াব নিয়ে ফিরল।” (সুনানে তিরমিজি-৫৮৬)

৬. রমজানে ওমরাহ পালন করা
সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. ইরশাদ করেন, “রমজানে ওমরাহ আদায় করলে আমার সঙ্গে হজ আদায়ের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে।” (বুখারী-১৭৮২)

৭. নামাজের পর আল্লাহর জিকির করা
হজরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, “দরিদ্র লোকেরা রাসূল সা.-এর নিকট এসে বলল, সম্পদশালী ব্যক্তিরা বেশি সওয়াব এবং জান্নাত নিয়ে যাচ্ছে! আমরা যেমন নামাজ পড়ি; তারাও পড়ে! আমরা যেমন রোজা রাখি; তারাও রাখে! উপরন্তু তাদের রয়েছে অতিরিক্ত সম্পদ; ফলে তারা হজ করতে পারে, ওমরাহ করতে পারে, জিহাদে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং সদকাও দিতে পারে! নবীজি তাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদের এমন একটি আমল শিখিয়ে দিব না; যা করতে পারলে তোমরা অগ্রগামীদের স্তরে পৌঁছে যাবে এবং যারা তোমাদের পেছনে তারা তোমাদের স্তরে পৌঁছতে পারবে না, তোমরা হবে শ্রেষ্ঠতম মানব, তবে অন্য কেউ এটি করলে সেও তোমাদের মতো হয়ে যাবে। আমলটি হলো, প্রত্যেক নামাজের পর তেত্রিশবার করে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার পাঠ করবে।” (বুখারী-৮০৭)

৮. মসজিদে কুবায় নামাজ আদায়
রাসূল সা. ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি নিজ ঘরে পবিত্রতা অর্জন করল, তারপর মসজিদে কুবায় এসে কোনো নামাজ আদায় করল, সে ওমরাহর সওয়াব হাসিল করল।” (ইবনে মাজাহ-১৪১২)

হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদত যা পূর্বেই বলা হয়েছে। ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা অবশ্য কর্তব্য, যদি তার পক্ষে সম্ভব হয়। হজ পালনের শর্ত হলো : প্রাপ্ত বয়স, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তি স্বাধীনতা, আর্থিক সচ্ছলতা, পথের নিরাপত্তা এবং ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবারের সদস্যবৃন্দের ভরণ-পোষণের নিশ্চয়তা। মহিলাদের ক্ষেত্রে স্বামী অথবা মুহরিম বা অবিবাহযোগ্য কোনো আত্মীয়কে সহযাত্রী করা আবশ্যক।
যে কোনো ধরনের বিপদ-আপদ, অসুখ-বিসুখের সম্মুখীন হওয়া বা মৃত্যুর ডাক এসে যাওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই হজ ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব করলে পরে সামর্থ্য হারিয়ে ফেললে বা মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ্ তাআলার নিকট অপরাধী হিসেবেই তাকে হাজির করা হবে। এ জন্যই হাদীস শরীফে হজ ফরজ হওয়া মাত্র আদায় করার তাগিদ ও হুকুম প্রদান করা হয়েছে।
হযরত ইবনে আব্বাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি হজ করার ইচ্ছে করে, সে যেন তাড়াতাড়ি তা আদায় করে নেয়। কারণ যে কোনো সময় সে অসুস্থ হয়ে যেতে পারে বা বাহনের ব্যবস্থাও না থাকতে পারে অথবা অন্য কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।” (ইবনে মাজাহ্-২৮৮৩)
অন্য এক হাদিসে ইবনে আব্বাস রা. বলেন, নবী কারীম সা. ইরশাদ করেছেন, ফরজ হজ আদায়ের ব্যাপারে তোমরা মোটেও বিলম্ব করো না। কারণ তোমাদের কারো জানা নেই তোমাদের পরবর্তী জীবনে কী ঘটবে।” (মুসনাদে আহমদ-২৮৬৭)
শুধু তাই নয়, এক সময় বায়তুল্লাহ্ উঠিয়ে নেয়া হলে মানুষ হজ করতে পারবে না এই আশঙ্কার কারণেও আল্লাহর রাসূল উম্মতকে তাড়াতাড়ি হজ আদায় করার হুকুম প্রদান করেছেন। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, তোমরা হজ ও ওমরাহর মাধ্যমে এই (বায়তুল্লাহ্) গৃহের উপকার গ্রহণ কর। কেননা তা ইতঃপূর্বে দু’বার ধ্বংস হয়েছে। তৃতীয়বারের পর উঠিয়ে নেওয়া হবে।”
(ইবনে খুযাইমা-২৫০৬)
মোট কথা, হজ পালন করার সৌভাগ্য আল্লাহ প্রদত্ত এক বিশেষ অনুগ্রহ। শুধু অর্থ-সম্পদ ও শারীরিক সামর্থ্য থাকলেই হজপালনের সৌভাগ্য হয় না। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হজ পালন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply