মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল । ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল । ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলামদ্বীন ইসলামের সার্বজনীনতা, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের আদর্শ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার আহ্বান পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষের কাছে একে গ্রহণীয় করে রেখেছে। এ দ্বীন আদর্শগতভাবে মানুষে মানুষে কোন মৌলিক পার্থক্য স্বীকার করে না। এমন সর্বজনীন আবেদন ও সাম্যের আদর্শ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। স্থান-কাল ভেদে রীতি-প্রথায়, আচার-ব্যবহারে, পোশাক-পরিচ্ছদে এবং খাদ্যাভ্যাসে বহু তারতম্য পরিলক্ষিত হলেও তাওহিদপন্থী হিসেবে বিশ্বের সর্বত্র তারা ‘মুসলিম’ নামে পরিচিত। কিছু মৌলিক বিশ্বাস ও বাহ্যিক আচরণে তাদের বিশিষ্টতা ও স্বকীয়তা সর্বজনবিদিত। তথাপি প্রাথমিক যুগ থেকেই রাজনৈতিক কারণে মুসলমানদের মধ্যে যে বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, পরবর্তীকালে ধর্মীয় বিভেদে রূপ নেয়।

খারিজি সম্প্রদায়
ইসলামে প্রথম রাজনৈতিক বিভেদ চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা) এর সময় থেকে শুরু হয়। মদিনা রাষ্ট্রে বারো বছর স্থায়ী শাসন পরিচালনার (৬৪৪-৬৫৬) পর এক প্রচণ্ড বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে তৃতীয় খলিফা উসমান (রা) ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন শাহাদাত বরণ করেন। ঐতিহাসিক জোসেফ হেল লিখেছেন, উসমান (রা) এর হত্যা ছিল গৃহযুদ্ধের বিপদসঙ্কেত স্বরূপ (ঞযব গধৎফবৎ ড়ভ ঙংসধহ ধিং ধ ংরমহধষ ভড়ৎ পরারষ ধিৎ)১ এর ফলে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি নষ্ট হয়। মুসলিম জাহান বনু হাশেম ও বনু উমাইয়া এই দুই পক্ষে বিভক্ত হয়ে আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। উষ্ট্রের ও সিফফিনযুদ্ধ এবং কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাবলি উসমান (রা) এর শাহাদাতেরই পরিণতি। উমাইয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং পতনের পরও এই দ্বন্দ্বের শেষ হয়নি। ওয়েল হাউসেন যথার্থই বলেছেন, গৃহযুদ্ধের ফটক খুলে যায়, যা আর কখনো বন্ধ হয়নি।২ এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে বিভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক দল এবং ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল।

আলী (রা)-এর রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ
এক ঘোরতর অরাজক পরিস্থিতিতে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত আলী (রা)-এর ওপর। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাহাবাদের অনুরোধে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু উমাইয়াদের নেতা মুআবিয়া উসমান হত্যার বিচারের দাবি উত্থাপন করলে এক বিভ্রান্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়।
হযরত আলী (রা) মদিনা থেকে কুফায় চলে যান। তারপর ৬৫৭ সালের সিফফিন প্রান্তরে হযরত আলী ও আমির মুআবিয়ার মধ্যে এক প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে হযরত আলী যখন নিশ্চিত বিজয়ের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখন মুআবিয়ার সেনাপতি আমর ইবন আল-আস যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য এক কৌশল অবলম্বন করেন। তাঁর সৈন্যরা বর্শার অগ্রভাগে কুরআনের পাতা বিদ্ধ করে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়, এবং সালিসির (হুকম) মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসার প্রস্তাব দেয়। হযরত আলী এ কৌশলের কথা বুঝতে পারলেও নিজ সৈন্যদের চাপে সালিসির প্রস্তাব মেনে নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ ঘোষণা করেন।
আলীর (রা) দলের বেদুঈন সৈন্যদল যুদ্ধ বিরতির পর অন্যভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করলো। তারা বললো খিলাফতের প্রশ্নে মানুষের সালিসি গ্রহণযোগ্য নয়। ‘লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কেউ সিদ্ধান্তের মালিক নয়)-এ ধ্বনি দিতে দিতে তারা ১২০০০ লোক আলীর মূল বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে হারুরা নামক স্থানে শিবির সংস্থাপন করে। এরাই ‘খারিজি’ বা দলত্যাগী নামে পরিচিত।
আরবিতে ‘খারিজি’ শব্দটি ‘খাওয়ারিজ’ (খারাজ-এর বহুবচন) হতে এসেছে, যার অর্থ দলত্যাগী। আর. এ. নিকলসন বলেন, ‘খারিজি বলতে সেই একটি দলকে বোঝায় যারা আল্লাহর নামে অবিশ্বাসীদের পক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন। ইসলামের ইতিহাসে খারিজিরাই প্রথম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তারা দুমাতুল জান্দাল৩ এর সালিসি রায়কে অত্যন্ত পাপজনক মনে করে তা প্রত্যাখ্যান করে।

খারিজিদের উত্থান ও ক্রমবিকাশ
কে. শাহারাস্তানির মতে, আবুজর আল গিফারীর নেতৃত্বে ইসলামের প্রথমদিকে খারিজিরা এ আন্দোলন শুরু করেছিল। অপরদিকে, আধুনিক গবেষকগণ মনে করেন যে, তার মতো একজন সাধু ব্যক্তির পক্ষে এ আন্দোলন পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। দুমাতুল জান্দালের সালিসের পর আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব আল রাশিবী নামক নেতার নেতৃত্বে হযরত আলী (রা)-এর ১২,০০০ সমর্থক তার দল ত্যাগ করে হারুরা নামক স্থানে একত্রিত হয়। খলিফার সাথে তাদের সম্পর্কচ্ছেদ করে তার দল ত্যাগ করায় এ অসন্তুষ্ট গোষ্ঠীকে খারিজি বলা হয়। ইতিহাসে তারা হারুরি/(ঐধৎঁৎরঃবং) নামেও পরিচিত।৪ তাঁরা মূলত একটি উগ্র ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

খারিজিদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতবাদ

ধর্মীয় মতবাদ
খারিজিদের মতে, নিয়মিতভাবে নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ধর্মীয় কর্তব্য পালন না করা মুসলমান কাফের বলে গণ্য হবে। ধর্মদ্রোহিতার অপরাধে পরিবারবর্গসহ তাদের হত্যা করা উচিত। যদি এরূপ লোক খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হন তবে তাকে অপসারণ করে হত্যা করা উচিত বলে তারা মত প্রকাশ করে। এ. জে. ওয়েনসিঙ্ক এ সম্পর্কে বলেন, ‘খারিজিদের মতানুযায়ী যদি কেউ গুরুতর পাপ করে সে আর মুসলমান থাকবে না। দুনিয়ায় তারা আল্লাহর রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা করে এবং এজন্য যুদ্ধকে তারা পবিত্র মর্যাদা দান করে।”
খারিজিদের পুরনো একটি ধর্মনীতি ছিল, কর্ম ব্যতীত শুধু ধর্মবিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই। যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) করে, তারা তাকে মুমিন বলতে অস্বীকার করে এবং মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগী) বলে ঘোষণা করে।
এ. জে. ওয়েনসিঙ্ক বলেন, ‘খারিজিদের বর্ণনা মতে যারা গুরুতর পাপ করবে তার আর বেঁচে থাকার অধিকার থাকবে না। কোনো ব্যক্তি কবিরা গুনাহ করে যদি তওবা না করে মৃত্যুবরণ করে তবে তার জন্য সে অনন্তকাল ধরে জাহান্নামের আগুনে পুড়তে থাকবে।’ তাদের মতে, ‘একটি মাত্র অন্যায় কাজ একজন মুসলমানকে ইসলামের বাইরে বের করে দেয়।’

ধর্মীয় গোঁড়ামি সম্পর্কিত মতবাদ
খোদা বকস্ বলেন, ‘কোনো কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে খারিজিরা ধর্মের ব্যাপারে গোঁড়া ছিল।’ খারিজিরা লঘুচিত্ততাকে নিরুৎসাহিত করত। এজন্য তারা কুরআন শরিফের সূরা ইউসুফকে গ্রহণ করত না। খারিজিদের মতে, ‘তাওহিদের অনুসারী কিছু গোনাহের কাজ সংঘটিত হয়ে গেলে সে চির জাহান্নামি বলে গণ্য হবে। এরা হাদীস বলে কিছু মানতে চাইত না। কুরআনের অংশ বিশেষের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এবং অন্যান্য আয়াতের সাথে উহার সামঞ্জস্যের চিন্তা না করে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার মানসে যখন যা ইচ্ছা মন্তব্য পেশ করে নিজেদের দাপট দেখাত।’৫
চরমপন্থী আরাকিদের মতে, যে একবার কাফির হয়, সে পুনরায় ইসলামে প্রবেশ করতে পারে না। তাকে স্ত্রী ও সন্তানসহ হত্যা করতে হবে। সকল অ-খারিজি মুসলমানকে তারা ধর্মত্যাগী মনে করে। খারিজি আন্দোলনের প্রথম থেকেই ধর্মীয় হত্যার প্রয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে অমুসলিমদের প্রতি খারিজিদের আশ্চর্য সহনশীলতা লক্ষণীয়। খারিজিদের অনেকে মনে করে যে, ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানরা কালিমাকে এভাবে পরিবর্তন করে- ‘হযরত মুহাম্মদ আরববাসীর জন্য আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ; কিন্তু আমাদের জন্য নয়’ তবে তাদেরকে তারা মুসলিমদের সমকক্ষ বলে স্বীকার করে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কঠোরতার সঙ্গে খারিজিরা নৈতিক কঠোরতারও পক্ষপাতী। তাদের মতে, ইবাদত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য দৈহিক পবিত্রতার সঙ্গে মানসিক পবিত্রতাও অপরিহার্য। শুধু বিশ্বাসের কোন মূল্য নেই তাদের এ নীতি থেকে আরেকটি নীতি বেরিয়ে আসে, তা হলো মানুষের কর্মের স্বাধীনতা এবং আপন কর্মের দায়িত্ব গ্রহণ। সম্ভবত মুতাযিলারা তাদের কাছ থেকে শেষোক্ত নীতি গ্রহণ করেছিল। সাধারণভাবে খারিজিগণ মুসলিম ধর্মীয় মতামতের (আকায়িদ) ক্রমবিকাশে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিশেষ এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
ডি বি ম্যাকডোনাল্ড-এর মতে, ‘খারিজিদের মতে মুসলমানরা যদি কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে তবে খলিফার কোনো প্রয়োজন হবে না।’ খলিফা হযরত আবু বকর (রা) ও খলিফা হযরত ওমর (রা) কে খিলাফতের ন্যায্য খলিফা বলে মনে করত। ড. মফিজুল্লাহ কবির লিখেছেন, ‘খারিজিরা হযরত আবু বকর ও হযরত উমরকে, হযরত উসমানকে প্রথম ছয় বছরের জন্য এবং হযরত আলীকে সিফফিনের যুদ্ধ পর্যন্ত খলিফা বলে মানতো।৬ অন্তিম বিশ্লেষণে খারিজিগণ হযরত ওসমান ও হযরত আলীকে খলিফা বলে মনে করত না। তারা হযরত আলী ও মুয়াবিয়াকে অবৈধ নিরঙ্কুশ শাসক বলে মনে করতেন। এ প্রসঙ্গে খোদা বকস্ বলেন, ‘তারা আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কেই অবৈধ শাসক হিসেবে ঘোষণা করে।’

খলিফা নির্বাচন সম্পর্কিত মতবাদ
খারিজিদের মতে, খলিফাকে সমগ্র মুসলিম জাহান কর্তৃক নির্বাচিত হতে হবে এবং তাদের নিকট তিনি দায়বদ্ধ থাকবেন। অন্যকথায় খারিজিরা গণতান্ত্রিক পন্থায় খলিফা নির্বাচনের পক্ষপাতী ছিলেন। তাদের মতে মুসলিম জাতির সার্বজনীন ভোটে খলিফাকে নির্বাচিত হতে হবে। কুরাইশ বংশ বা কোন নির্দিষ্ট বংশের জন্য খেলাফতের কারো বিশেষ দাবি নাই তিনি পুরুষ হোন বা নারী হোন কিংবা দাসী হোন; বংশ খিলাফাত লাভের প্রতিবন্ধক নয়। খলিফা পদ কোনো ব্যক্তির বা গোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তারা অত্যন্ত গণতন্ত্রমনা ছিলেন। তারা যোগ্য ব্যক্তি হলে যেকোনো মুসলমান, হাবসী ক্রীতদাস, এমনকি নারীও খলিফা হতে পারবে বলে তারা মনে করত। এ প্রসঙ্গে ডি. বি. ম্যাকডোনাল্ড বলেন, ‘তাদের মতাদর্শ ছিল প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক। খলিফা সমগ্র মুসলিম জাহান কর্তৃক নির্বাচিত হবেন এবং প্রয়োজনে তাকে অপসারণও করা যাবে। তাকে কোনো বিশেষ পরিবার বা গোত্রের হতে হবে না; তিনি একজন দাসও হতে পারেন যদি তার মাঝে মুসলিম রাজ্য শাসনের গুণাবলি বজায় থাকে।’

সাধারণের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি
খারিজিরা সাধারণ মুসলমানদের প্রতি কঠোর মনোভাব পোষণ করতেন। তাদের মতে, যারা খারিজি মতের সাথে একমত নয় তারা ধর্মদ্রোহী বা কাফের। যারা এ মতকে সমর্থন করবে না তাদের হত্যা করা উচিত, এমনকি তাদের সপরিবারে হত্যা করা উচিত। খারিজিদের গণতান্ত্রিক নীতি সম্পর্কে খোদা বকস্ বলেন, ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে খারিজিরা ইসলামের সঠিক ধারক, ধর্মীয় ক্ষেত্রে গোঁড়া ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক বলে মনে হয়। তারা প্রথম দিকে ধর্মীয় ধারণাকে কেন্দ্র করেই রাজনীতির মঞ্চে আসীন হয়েছিল। খলিফা নির্বাচন ও অমুসলিমদের প্রতি মনোভাব পর্যালোচনা করলেও তাদের একটি গণতন্ত্রী দল হিসেবেই অনুমিত হয়। কিন্তু আধুনিক গবেষকগণ খারিজিদের অন্যান্য সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শ পর্যালোচনা করে তাদেরকে চরমপন্থী (গড়ংঃ ভধহধঃরপ) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। খারিজি বিদ্রোহ ও নাহরাওয়ানের যুদ্ধ খলিফা হযরত আলী (রা)-এর দল ত্যাগকারী খারিজিগণ হযরত আলী (রা) ও মুয়াবিয়া উভয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং ইরাক ও ইরানে ব্যাপক গোলযোগ সৃষ্টি করে। এ সময় খারিজিরা দজলা নদী পার হয়ে আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাবের নেতৃত্বে বাগদাদের নিকটবর্তী নাহরাওয়ান নামক স্থানে প্রায় ৪,০০০ খারিজি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মতের বিরোধী মুসলমানদের হত্যা, গৃহে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের ঘটনা শুরু করে। আলী (রা) প্রথমে এ আন্দোলনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেননি। তিনি মনে করেন যে, সিরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযানকালে তারা আবার তার সাথে যোগদান করবে। কিন্তু আলী (রা) খারিজিদেরকে যুদ্ধে যোগদানের জন্য আহ্বান করলে তারা যুদ্ধে যোগদান করেনি। বসরার ৬০,০০০ যোদ্ধার মধ্যে মাত্র ৩,০০০ খলিফার সঙ্গে যোগদান করেনি। কুফা থেকেও কিছুসংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে অবশেষে মোট ৬৫,০০০ সৈন্যবাহিনীসহ আলী (রা) সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। তিনি সংবাদ পেলেন যে, খারিজিরা দেশের মধ্যে অত্যাচার ও দস্যুবৃত্তি চালাচ্ছে। আলী (রা) তার গতিপথকে পরিবর্তিত করে দজলা নদী পার হয়ে খারিজিদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। তিনি নাহরাওয়ানের কাছে এসে খারিজিদের কাছে আনুগত্য দাবি করেন। কিন্তু খারিজিরা তাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। অবশেষে খলিফা খারিজিদেরকে সিরিয়া অভিযানে যোগদান করার অথবা নীরব থাকার জন্য বিভিন্ন প্রলোভন দেখালে ৫০০ জন খারিজি নিকটবর্তী পারস্য শহরে নীরব ভূমিকা গ্রহণ করে এবং অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু ১,৮০০ জন খারিজির একটি দল কিছুতেই যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করল না। তারা যুদ্ধ করে পরাজিত হলো (৬৫৯ খ্রি.)। খারিজি সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এখানেই লোপ পেলে তা মুসলিম রাষ্ট্রে শান্তির সহায়ক হতো। এরপর খারিজি মতবাদ বিভিন্ন স্থানে প্রসার লাভ করে। বসরা এবং কুফায় তারা গোপনে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। পরবর্তী বছর বহু খারিজিরা অপ্রত্যাশিতভাবে আলী (রা)-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়। বহুসংখ্যক খারিজি হত্যার পরও তাদের দল ভেঙে যায়নি। খারিজিরা সুবিধাবাদী ছিল। প্রয়োজনমতো তারা যেকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে মিলিত হতো বলে ইতিহাসে তারা কোনো স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেনি।

খারিজিদের বিভিন্ন উপদল
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মতবাদ প্রদানের কারণে খারিজিদের মাঝে কতকগুলো দলের সৃষ্টি হয়েছিল। এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো ১. নাফি-বিন-আজরাক প্রতিষ্ঠিত আজরাকি সম্প্রদায় ২. নাজদ-বিন-আমর প্রতিষ্ঠিত নাজদিয়া সম্প্রদায় ৩. আবদুল্লাহ ইবনে ইবাদ প্রতিষ্ঠিত ইবাদিয়া সম্প্রদায় এবং ৪. যায়েদ-বিন-আফসার প্রতিষ্ঠিত সাফারিয়া বা সুফরিয়া সম্প্রদায়।

আলী (রা)-এর শাহাদাত বরণ
খারিজিরা পবিত্র কাবা গৃহে একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, মুসলিম জাহানের ঐক্য রক্ষার্থে একই সঙ্গে তারা আলী, মুআবিয়া ও আমরকে হত্যার মাধ্যমে অপসারণ করবে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী আবদ আর-রাহমান ইবন মুলজাম নামক এক ব্যক্তি ৬৬১ সালের ২৪শে জানুয়ারি ভোরবেলা কুফার মসজিদে হযরত আলী (রা)কে বিষাক্ত ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত করে। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি (১৭ রমজান ৪০ হিজরি) তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তার শাহাদাতের সাথে সাথেই খোলাফায়ে রাশেদীনের পবিত্র শাসনকালের পরিসমাপ্তি ঘটে। নির্দিষ্ট দিনে আমর ইবনুল আস মসজিদে হাজির হননি এবং মুয়াবিয়া সামান্য আহত হলেও তার হাত থেকে রক্ষা পেলেন।৭ এখানে উল্লেখ্য আল বোরাক ইবনে আব্দুল্লাহ মুয়াবিয়া (রা)কে এবং আমর ইবনে বকর আত তামিমি আমর ইবনুল আস (রা)কে হত্যার চেষ্টা করেছিল। তারা আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব আল রাশিবীকে তাদের খলিফা নির্বাচিত করে এবং আলী ও মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তোলপাড় করে। তারা আলী ও তার পুত্রদের আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস আবু আইয়ুব আনসারী প্রমুখ যারা ও ত্যাগ করেননি তাদের কাফির আখ্যা দেয় অনুরূপভাবে ওসমান আয়েশা যোবায়ের প্রমুখ এবং মুয়াবিয়া এবং আমর এবং যারা মুয়াবিয়াকে সমর্থন করেন তাদেরকেও তারা কাফের আখ্যা দেয়। যারা তাদের অনুসরণ করত না তাদেরকেও তারা কাফির বলতো এবং হত্যা-ই তাদের চরম শাস্তি বলে বিবেচনা করত। যে কোন প্রকার পাপ কাজকেই তারা কুফরি বলে মনে করত।৮

খারিজি সম্প্রদায়ের পরবর্তী অগ্রগতি
হযরত আলীর খিলাফতের পর উমাইয়াদের আমলে খারিজিদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। তারা কোন ওমাইয়া খলিফাকে খলিফা বলে স্বীকার করেনি। তাদের মতবাদ অমান্য করলে তারা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে এবং আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করত।৯ মুআবিয়ার বিচক্ষণ রাজনৈতিক তৎপরতা এ আন্দোলন প্রশমিত রাখলেও খারিজিদেরকে নির্মূল করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। খারিজিরা গেরিলা কৌশল অবলম্বন করে লড়তে থাকে। তাদের অশ্বারোহীদের ক্ষিপ্রগতি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। তারা হঠাৎ বের হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো, অতর্কিতে অরক্ষিত নগরাদি আক্রমণ করতো। কিন্তু সরকারি সৈন্য আসার আগেই সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে সটকে পড়তো। প্রথম ইয়াযিদের মৃত্যুর পর গৃহযুদ্ধের সুযোগে তাদের আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে। নেতার নামানুযায়ী তারা আরাকি, ইবাদিয়া ও সুফরিয়া প্রভৃতি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আযরাকিরা ছিল ভয়ানক হিং¯্র দুর্ধর্ষ। হাজ্জাজের সময় খারিজিদেরকে কঠোর হস্তে দমন করা হয়। উমাইয়া বংশের শেষ খলিফাদের সময় খারিজি তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। এসব বিদ্রোহ দমন করা হলেও খারিজিদের বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ সৃষ্টির কারণে উমাইয়াদের রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের শান্তি ও শৃঙ্খলা নষ্ট হয় এবং আব্বাসীয় বিপ্লব সহজে রাজ্যের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ লাভের সুযোগ পায়। আব্বাসীয়দের আমলে খারিজি আন্দোলন মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেও মেসোপেটেমিয়া ছাড়া অন্যত্র তারা বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারেনি। এরপর তারা কেবল একটি ধর্মসম্প্রদায় হিসেবে বিদ্যমান থাকে। পূর্ব-আরব, উত্তর আফ্রিকা এবং পূর্ব-আফ্রিকার উপকূলে তারা সক্রিয় থাকে। ইবাদিয়াগণ পূর্ব-আফ্রিকার উপকূলের প্রথমে রাজনীতিতে এবং ধর্মীয় বিতর্কে অংশগ্রহণ করে। তারা আজ পর্যন্ত সেখানে বিদ্যমান। খারিজিরা প্রধানত আরব উপদ্বীপ ও ইরাক সীমান্তবর্তী বেদুঈন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের নিরঙ্কুশ সাম্যের আদর্শ কিছু পারসিক মাওয়ালিকে তাদের আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট করে। খারিজিদের মধ্যে প্রধান-অপ্রধান প্রায় বিশটি মতামতের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। খারিজিগণ একদিকে শিআদের বংশানুক্রমিক ইমামত দাবি অপরদিকে মুরজিয়াদের। রাজনৈতিক ঔদাসীন্য নীতির ঘোরতর বিরোধী। আপোসহীন সাম্যে বিশ্বাসী খারিজিদের মতে, নীতিবান ও ধর্মপরায়ণ একজন নিগ্রো ক্রীতদাসও ইমাম নির্বাচিত হতে পারে। ইমাম সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হলে তাকে পদচ্যুত ঘোষণা করা যায়।
খারিজি আন্দোলন মূলত সংগ্রামী গণআন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এবং খারিজিরা সৎকর্মে আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধ নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক যুদ্ধবিগ্রহ ও হত্যার নীতি অবলম্বন করলেও তাদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীর অভাব ছিল মনে করা ভুল হবে। তাদের ধ্যান-ধারণার মৌলিকতা অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করে। আব্বাসীয় খিলাফতের প্রথমভাগে বহু পণ্ডিত ব্যক্তি খারিজি মত পোষণ করতেন। এর ফলে খারিজিদের পক্ষে সমাজের উচ্চ শ্রেণীর সঙ্গে মেলামেশা করতে কিংবা রাজানুগ্রহ লাভ করতে অসুবিধা হতো না। খারিজিরা কাব্য ও বাগ্মিতার চর্চা করতো। হারুন আর-রশীদের রাজত্বকালে খারিজি বিদ্রোহী ওয়ালিদের ভগ্নি ও সহযোদ্ধা লায়লার কবি-খ্যাতি ছিল। খারিজি নেতাদের খুতবা (বক্তৃতা) ও কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানেও খারিজিদের কিছু ক্ষুদ্র সম্প্রদায়, উমান, জাঞ্জিবার, পূর্ব-আফ্রিকা ও উত্তর আফ্রিকায় বিদ্যমান। এরা মধ্যমপন্থী ইবাদি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। এরা অ-খারিজিদেরকে সমাজচ্যুত বলে মনে করে না কিংবা হত্যার নীতিতে বিশ্বাস করে না। অপরপক্ষে তারা বহু শতাব্দী ধরে বৃহত্তর মুসলিম সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। খারিজিদের উগ্রবাদী নীতি আধুনিককালে বোকো হারাম, আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড দ্যা লিভ্যান্ট) আইএসআইএস (ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া বা দামেস্ক), আল শাবাব (সোমালিয়া; পুরো নাম হারকাত আল শাবাব আল মুজাহিদিন), আল কায়েদা প্রভৃতি উগ্রবাদী সংগঠনকে প্রভাবিত করেছে বলে কোন কোন বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ করেছেন।

(চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

1. “With the murder of Othman, say the Arabs, the door of trouble was opened, never to close again” – Joseph Hell, The Arab civilization, translated by Khuda Bakhsh p.56
2. The senus gate of civil war was opened and never again closed. J.Well Hausen, Anab Kingdom and its Fall, p.si.
৩. স্থানটির নাম ইতিহাসে আযরূহ (Adhruh) বলেও উল্লেখ রয়েছে। J. Well Hausen, Anab Kingdom and its Fall, Khayet 1963,p.no.83৮৩
৪. শাহরাস্তানি, কিতাবুল সিলাল ওয়া নিহাল, কায়রো, ১৯৬১, পৃষ্ঠা ১./৮৬।
৫. আবু মুহাম্মদ আলীমুদ্দীন, ইসলামে বিভিন্ন দল ও উহার উৎস, আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ কর্তৃক পশ্চিম ধানমন্ডি থেকে প্রকাশিত, অক্টোবর ২০০৫, পৃ.৬৭
৬. ডক্টর মফিজুল্লাহ কবির মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ, জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, প্যারীদাস রোড, ঢাকা, জুলাই ২০০১
৭. হাসান আলী চৌধুরী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি আইডিয়াল বুকস, ঢাকা, ২০১৬ পৃ: ১৯১
৮. তেলআবিব ১৯৩৫ পৃষ্ঠা ২/১৬৮
৯. আত্মার আবি কিতাবুর রসূল আল মুলক কায়রো সংস্করণ পৃষ্ঠা ৮/১৫০

SHARE

Leave a Reply