মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল – ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

কাদারিয়া সম্প্রদায়
জাবরিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব। কাদারিয়া নামটি ‘কদর’ শব্দ হতে উদ্ভূত হয়েছে। এখানে এর অর্থ শক্তি, ক্ষমতা বা মর্যাদা। এ সম্প্রদায়ের প্রবক্তারা মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীন শক্তিতে বিশ্বাস করে। কাদারিয়ারা যুক্তি প্রদর্শন করে যে, সবকিছুই যদি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী সম্পন্ন হয়, তাহলে মানুষকে তার কার্যকলাপের জন্য দায়ী করা যায় না। মানুষ নৈতিক জীব এবং সেই কারণে তার নিজস্ব কার্যকলাপের জন্য দায়ী করা যায় না। মানুষ নৈতিক জীব সেই কারণে তার নিজস্ব কার্যকলাপের ওপর তার কদর বা শক্তি রয়েছে। এই ‘কদর’-এ বিশ্বাসী বলেই তাদেরকে কাদারিয়া বলা হয়। তারা মত পোষণ করে যে, কোনরূপ বাধ্যবাধকতা ছাড়া মানুষের কাজ করার স্বাধীন ক্ষমতা রয়েছে। পক্ষান্তরে জাবরিয়া সম্প্রদায় বিশ্বাস করে যে, কার্যের ওপর মানুষের কোন ক্ষমতা নেই; মানুষের প্রত্যেকটি কার্য সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। এভাবে তারা আল্লাহকে মানুষের প্রত্যেকটি দুষ্কর্মের শরিক করে। কিন্তু কাদারিয়া সম্প্রদায় আল্লাহকে মানুষের দুষ্কর্মের শরিক করে না। তারা মানবিক দায়িত্ববোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। এই দায়িত্ববোধ ন্যায়সঙ্গতভাবে মানুষের কর্মের স্বাধীনতার ওপর নির্ভরশীল।

কাদারিয়া সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (Origin and Development of the Qadariyyah)

শাহারাসতানী (রহ) বলেছেন; কাদারিয়া সম্প্রদায় নিজেদেরকে ‘আসহাবুল আদল ওয়াত তাওহিদ’ নামে পরিচয় দেয়। আবার কাদারিয়া ও আদলিয়া নামেও পরিচিত হয়। এ সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটে উমাইয়া শাসনামলের প্রথম দিকে। ফাতহুল মুনহিম গ্রন্থকার বলেছেন; কথিত আছে কাবাঘরে আগুন লাগার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই নতুন চিন্তাধারা সূচনা হয়। তখন জনৈক ব্যক্তি মন্তব্য করে, এটি আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী ঘটেছে। অন্যরা বলে, আল্লাহ এরূপ পরিকল্পনা নিতে পারেন না। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাদারিয়া মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় উমাইয়া শাসক গোষ্ঠীর নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্বে অত্যাচার নির্যাতন ও নির্মম রক্তপাত চলছিল। পরিণামে নাগরিক সাধারণের মধ্যে শুধু একটি সাধারণ অনুভূতি সঞ্চারিত হতে থাকে। স্বাধীনচেতা আরবগণ এ অবস্থা সহ্য করতে পারলেন না। তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অসন্তোষ ও ক্ষোভ। তারা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট কতগুলো প্রশ্নের উত্তর দাবি করেন :
তোমরা কেন এই বর্বরোচিত কাজ করো?
এসব কি ইসলামের পরিপন্থী নয়?
তোমরা কি মুসলমান নও?
রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের উত্তর ছিল:

আমরা যা কিছু করি তার জন্য আমরা দায়ী নই। আল্লাহই সবকিছু করান। ভালো-মন্দ তারই ক্ষমতা। ভালো-মন্দ সবকিছুর মূলে শক্তি হিসেবে কাজ করেন স্বয়ং আল্লাহ। কথিত আছে যে, একদিন মাবাদ আল জুহানি তার সহচর আতা ইবনে ইয়াসারকে নিয়ে হাসান আল বসরির কাছে যান এবং বলেন; হে আবু সাঈদ, এসব শাসক মুসলমানদের রক্তপাত করে, নানা রকম জঘন্য কাজ করে এবং বলে যে, তাদের সব কাজ আল্লাহর নির্দেশেই হচ্ছে। উত্তরে নাকি হাসান বসরি বলেছিলেন; তারা আল্লাহর শত্রু তারা মিথ্যাবাদী।১
কাদারিয়াদের মতে, মানুষ তার সব অশুভ কর্মের জন্য দায়ী। এগুলোর দায়িত্ব আল্লাহর ওপর আরোপ করা ঠিক নয়। এ মত পরিচিত ছিল কদরবাদ নামে; এবং এ থেকেই আদি মুতাযিলাদের বলা হতো কাদরিয়াপন্থী অর্থাৎ আল্লাহর ন্যায়বিচারের সমর্থক। মানুষকে তার নিজের কৃতকর্মের জন্য দায়ী করে তারা আল্লাহর ন্যায়বিচারের সমর্থন করেন। জাবরিয়াদের নিয়ন্ত্রণাধীন মতের বিরোধিতা করে কাদারিয়ারা আল্লাহর সর্বশক্তিমত্তার সঙ্গে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতার কোন বিরোধ নেই বলে ঘোষণা করেন। নিজেদের এ মতের সমর্থনে তারা আল কোরআনের বেশ কিছু আয়াত উদ্ধৃত করে দেখান আয়াতগুলো হচ্ছে;

১. যে ভালো কাজ করে, সে তা করে নিজের কল্যাণেই, আর যে মন্দ কাজ করে তার প্রতিফল সে নিজেই ভোগ করবে। তোমার প্রভু তার বান্দাহদের প্রতি বিন্দুমাত্র জালিম নন।২
২. যে কেউ কামাই করবে পাপ, সে তার কামাই করবে নিজেরই বিরুদ্ধে। আল্লাহ তো মহাজ্ঞানী প্রজ্ঞাময়।৩
৩. মহাকাশ এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর, যাতে করে যারা বদ আমল করে তাদের মন্দ প্রতিফল দিয়ে দেন, আর যারা নেক আমল করে তাদের শুভ প্রতিফল দান করেন।৪
৪. কোন বোঝা বহনকারী অপরের (পাপের) বোঝা বহন করবে না।৫
৫. বলো: আল্লাহ ফাহেশা কাজের নির্দেশ দেন না।৬

কাদারিয়া মতবাদের সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মাবাদ আল জুহানি। তিনি উমাইয়া শাসকদেরকে পাপাচারী, কর্তৃত্ববাদী, পরিবারতান্ত্রিক বলে অভিহিত করেন, ফলে উমাইয়া শাসক আবদুল মালিক (শাসনকাল ৬৮৫-৭০৫ খ্রি.)-এর নির্দেশে ৬৯৯ খ্রিস্টাব্দে তাকে হত্যা করা হয়।
মাবাদ আল জুহানির পর গাইলান আল দিমাশকি অনুরূপ প্রচার করেন। তিনি এও প্রচার করেন যে, প্রত্যেক মুসলমানের উচিত মানুষকে ন্যায়কর্ম করার এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেয়া। গাইলানের এ নতুন মত উমাইয়া শাসনের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকি বলে বিবেচিত হয় এবং এ অজুহাতে হিশাম ইবনে আবদুল মালিক (শাসনকাল ৭২৪-৭৪৩)-এর আদেশে ৭২৯ খ্রিস্টাব্দে গাইলানকেও হত্যা করা হয়।
মাবাদ ও গাইলানের মৃত্যু তাদের প্রচারিত মতাদর্শকে আরও পরিচিত করে তোলে এবং এসব মত ক্রমবর্ধমান স্বীকৃতি লাভ করতে থাকে। কথিত আছে যে, উমাইয়া শাসক দ্বিতীয় মুয়াবিয়া (শাসনকাল ৬৮৩-৬৮৪) তৃতীয় ইয়াজিদ (৭৪৪ খ্রি.) কাদারিয়া মতবাদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও উমাইয়া শাসন আমলে কাদারিয়া আন্দোলন প্রসার লাভ করেনি, করতে পারেনি। কাদারিয়াদের বিরুদ্ধে রক্ষণশীলদের আক্রমণের শক্তি বৃদ্ধি পায় বিশেষত এই অভিযোগের পর যে, তাদের মতের পেছনে গ্রিক দর্শন ও খ্রিস্টীয় চিন্তাধারা কার্যকর ছিল। আল শাহরাস্থানির মতে; ধর্মবিশ্বাসের কেন্দ্রীয় বিষয়াদি (উসুল) নিয়ে সপ্তম শতাব্দীর শেষের দিকে ধ্যান-ধারণা গ্রিক দার্শনিকদের দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

কাদারিয়া সম্প্রদায়ের মৌলিক বিশ্বাস (Fundamental Beliefs of the Qadariyyah)

১. মানুষের স্বাধীনতা সম্পর্কিত: কাদারিয়াগণ মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তারা মনে করে, মানুষের ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা রয়েছে। মানুষ নিজেই তার কর্মের নিয়ন্তা এবং তার কর্মের জন্য নিজেই দায়ী। মানুষ তার অশুভ কর্মের জন্য দায়ী। শাসকরা তাদের স্বৈরতান্ত্রিকতা, বংশতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদের বাড়াবাড়ির জন্য দায়ী। এগুলোর দায়িত্ব আল্লাহর ওপর আরোপ করা ঠিক নয়। মানুষকে তার কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
২. আল্লাহর পবিত্রতা সম্পর্কিত: কাদারিয়াগণ মনে করেন, মানুষের সমুদয় কাজ সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ সার্বভৌম ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাদের মতে মানুষ ভালো কাজ করলে আল্লাহ পুরস্কার দেবেন এবং মন্দ কাজ করলে শাস্তি দিবেন। তাদের মতে হলো মন্দ ইচ্ছ ও কর্মের সম্পর্ক আল্লাহর প্রতি প্রযোজ্য হতে পারে না। এর সম্পর্ক মানুষের সাথে।
৩. কবিরা গুনাহ সম্পর্কিত: কাদারিয়া সম্প্রদায়ের মতে, কবিরা গোনাহকারী হলো ফাসেক। অর্থাৎ সে মুমিনও নয় আবার কাফেরও নয়।
৪. মানুষের নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কিত: কাদারিয়াগণ মানুষের নৈতিক দায়িত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। মানুষের মধ্যে নীতিবোধ ও কর্তব্যবোধ রয়েছে।
৫. মিরাজ সম্পর্কিত: কাদারিয়া সম্প্রদায় মিরাজ অস্বীকার করে। তাদের মতে, মিরাজ সত্য নয়। কারণ মানুষের পক্ষে মহাশূন্য, শত আসমান, জান্নাত-জাহান্নাম প্রভৃতি ভ্রমণ করা সম্ভব নয়।

কাদারিয়াদের দল-উপদল
আবদুল কাহের আল-বাগদাদি (রহ) আলফারুক বাইনাল ফিরাক গ্রন্থে কাদরিয়া সম্প্রদায়ের ২২টি দল-উপদলের কথা উল্লেখ করেছেন। আল মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থের রচয়িতা আল শাহরাস্থানির বলেছেন কাদারিয়া সম্প্রদায় মোট ২২টি দলে বিভক্ত। বিভিন্ন গবেষকের মতানুসারে কাদারিয়াদের উপদলগুলো হচ্ছে-
১. ওয়াসিলিয়্যাহ ২. আল আমরাবিয়্যাহ ৩. আস সুমামিয়্যাহ ৪. আল মারিসিয়্যাহ ৫. আল মামারিয়্যাহ ৬. আন নাজ্জামিয়্যা ৭. আল হিশামিয়্যা ৮. আল মিরদারিয়্যা ৯. আল জাফারিয়্যা ১০. আল ইসকাফিয়্যা ১১. আল হুযালিয়্যা ১২. আল আসওয়ারিয়্যা ১৩. আশ শাহহামিয়্যা ১৪. আল জুববাইয়্যা ১৫. আল বাহশামিয়্যা ১৬. আল খাবিতিয়্যা ১৭. আল খাইয়্যাতিয়্যা ১৮. আল কাবিয়্যা ১৯. আল বিশরিয়্যা ২০. আল জাহিযিয়্যা ২১. আল হিমারিয়্যা ২২. আসহাবু সালেহ কুব্বা।
পরিশেষে বলা দরকার যে, স্বাধীন ইচ্ছা প্রসঙ্গে কাদারিয়া-জাবরিয়া বিতর্ক বিষয়ে খুব বেশি প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায় না। আর এ জন্যই এ বিতর্ক সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ আলোচনাও সম্ভব নয়। তবে এটুকু বলা যায় যে, মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা সমর্থনের ফলে কাদারিয়াদের অনেকে উমাইয়া শাসকদের হাতে প্রাণ হারান এবং অন্যান্য অনেকে পরবর্তী প্রধান সম্প্রদায় মুতাযিলাদের সঙ্গে মিশে যান।৭

সূত্র :
১. ড. আমিনুল ইসলাম, মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, আগস্ট ২০০৮, পৃ.৭৬।
২. সূরা ৪১ হা মিম আস সাজদা : আয়াত ৪৬।
৩. সূরা ৪ আন নিসা : আয়াত ১১১।
৪. সূরা ৫৩ আন নাজম : আয়াত ৩১।
৫. সূরা ৫৩ আন নাজম : আয়াত ৩৮।
৬. সূরা ৭ আন আরাফ : আয়াত ২৮।
৭. ড. আমিনুল ইসলাম, মুসলিম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, আগস্ট ২০০৮, পৃ.৭৭।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply