মুসলমানদের সংস্পর্শে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব -এম মুহাম্মদ আব্দুল গাফ্ফার

পৃথিবীতে মানুষের আগমন মহান রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছার শ্রেষ্ঠতম প্রতিফলন অবশ্যই। মানুষই বিশ্বের সেরা জীব এ কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন- “আদম সন্তানকে আমি শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেছি …।” (সূরা বনি ইসরাঈল : ৭০)। আল্লাহর সৃষ্টি এ শ্রেষ্ঠ জাতির দায়িত্ব হলো আল্লাহ নির্ধারিত বিধিবিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করে বিশ্বে খলিফা হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করা। যুগে যুগে আল্লাহর প্রেরিত আম্বিয়াকিরামগণের পদাঙ্ক অনুসরণ করে শয়তানের প্ররোচনায় ভ্রান্ত ও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত মানবগোষ্ঠীকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করা। এ মর্মে আল্লাহ বলেন “পৃথিবীতে তোমরাই সর্বোত্তম দল, তোমাদেরকে মানুষের হেদায়াত ও সংস্কার বিধানের জন্য কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত করা হয়েছে…।’ (সূরা আলে ইমরান : ১১০)।

মানুষ পৃথিবীর প্রচলিত ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা ও ভ্রান্ত পন্থাপদ্ধতির কবলে পড়ে মহান রাব্বুল আলামিনের দেয়া বিধান ত্যাগ করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয়ে নিপতিত হয়। যারা আল্লাহর দেয়া বিধান মেনে চলে তারাই কেবল কলুষমুক্ত থাকতে পারে। আল্লাহ বলেন “যে কেউ সঠিক পথ গ্রহণ করে তার এ সৎপথ প্রাপ্তি তার নিজের জন্যই কল্যাণকর, আর যে গোমরাহ হয়ে যায় তার এ গোমরাহির খারাপ পরিণাম তার ওপরই পড়বে…।” (সূরা বনি ইসরাইল : ১৫)। আল্লাহর ঘোষণা ও হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মানুষ আল্লাহর বিধান লঙ্ঘন করে নিজেরা তো নৈতিক অধঃপতনের অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করেই তদুপরি পৃথিবীতে তাগুতি শক্তির গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ হয়ে হা-হুতাশ করতে থাকে। মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর শ্রেষ্ঠ মাখলুকদেরকে উদ্ধারের নিমিত্তেই আম্বিয়ায়ে কিরামগণকে প্রেরণ করে থাকেন। নবী-রাসূলগণ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে একদল যোগ্য মুবাল্লিগ তৈরি করে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম মুবাল্লিগগণ অর্থাৎ ইসলাম প্রচারকগণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাওহিদের বাণী নিয়ে মানুষের দ্বারে উপস্থিত হন। মুসলিম মুবাল্লিগগণের সাথে সাথে মুসলমান শাসকগণ বিশ্বের বিভিন্ন এলাকা অধিকার করে সেখানে শরীয়তের প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তিতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিচারিক ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের প্রয়াস চালিয়ে যান। মূলত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলিম মুবাল্লিগগণের প্রচারণার ফলেই বিশ্বে ইসলামী রেনেসাঁর সূত্রপাত হয়েছিল। মুসলমান মনীষীগণ এ প্রচারের প্রেরণা লাভ করেছিলেন মহানবী সা.-এর ঐ ঘোষণা থেকে, ঘোষণাটি ছিল এই ‘বাল্লিগু আন্নি ওয়ালাও আয়াহ্’ অর্থাৎ তোমরা (মানুষের কাছে) পৌঁছে দাও আমার পক্ষ থেকে (যা শ্রবণ কর) যদি সেটা একটা বাক্যও হয়। (আল হাদীস)। রাসূলের সা. এ নির্দেশনাকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মুসলমান দ্বীন প্রচারকগণ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েন। তারই ধারাবাহিকতায় ভারত উপমহাদেশেও তাদের আগমন ঘটে। এসব মনীষীর প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় সারা ভারত বিশেষ করে বাংলায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর একটি বক্তৃতার উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে, তিনি চৌদ্দশত হিজরির পূর্তি উপলক্ষে দিল্লিতে একটি ডাকটিকিট প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ইসলাম একটি ভারতীয় ধর্ম, কারণ মুসলিম শাসকগণের এ উপমহাদেশে পদার্পণের বহু পূর্বে ইসলাম প্রচারকগণের মাধ্যমে এখানে ইসলামের আগমন ঘটেছিল। (সূত্র : ভারত বিচিত্রা)।

মুসলমান ধর্ম প্রচারক ও শাসকগণ বাংলায় আগমনের পূর্বে এখানকার সমাজব্যবস্থার চিত্র ছিল খুবই দুর্বোধ্য শ্রেণীবিন্যাসে বিভক্ত। বর্ণবৈষম্যের চরম পীড়াপীড়ি, উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ ও উচ্চশ্রেণী কর্তৃক সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র ও শূদ্রদের ওপর বিচিত্রমুখী অবিচারের স্টিমরোলার চলছিল। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আরজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটন তার ‘ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ’ গ্রন্থটিতে যে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তার মূল প্রতিপাদ্যই বাংলার নিপীড়িত ও অধিকারবঞ্চিত জনগোষ্ঠী একমাত্র বাঁচা তথা আত্মরক্ষার তাগিদে ইসলামের মহান সাম্য ও ন্যায়বিচারের প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে আল্লাহর দ্বীনের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। মুসলমানদের বাংলা অধিকারের পর ১২০৪ সাল থেকে কয়েক শত বছর পর্যন্ত লক্ষেèৗতি, পান্ডুয়া, তাণ্ডা ও গৌড় বাংলার রাজধানী হিসেবে পরিগণিত হয়। এসব নগরীর জৌলুস তথা জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্যের বর্ণনা পর্তুগিজ, চীনা ও অন্যান্য দেশের পর্যটকদের বর্ণনায় পাওয়া যায়। একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার যে, প্রাচীন বাংলা ছিল সাগর বক্ষ থেকে জেগে ওঠা একটি ব-দ্বীপ। দক্ষিণে সমুদ্র ও উত্তরে হিমালয় থেকে নেমে আসা জলধারার প্রভাবে এখানে হ্রদ সমতুল্য হাওর, বিল ও নদ-নদীর উপস্থিতি এ ব-দ্বীপটিকে করেছিল পৃথিবীর অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অর্ধজলমগ্ন সমৃদ্ধ একটি ভূমি অবশ্যই। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ছিল পেশায় মৎস্যজীবী ও নৌকায় পরিবহনযোগ্য পণ্যের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ভুক্ত জনগোষ্ঠী।

উত্তর ভারতীয় আক্রমণকারী সেনাপতিগণ নিজ এলাকায় ফিরে গেলে তথাকার সেনাধ্যক্ষগণ তাচ্ছিল্যের সাথে অভিযানে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের বলতো- তোমরা যুদ্ধ করে বাংলার কয়েকজন জেলেকেই পরাজিত করেছো মাত্র। যাহোক এ সময় বাংলায় আগত পর্যটকদের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা এ রকম। ১৪১৫ সালে একজন চীনা দূত লিখেন পাণ্ডুয়ায় মানুষেরা সাদা সুতির পাগড়ি এবং লম্বা সাদা সুতির জামা পরে। তারা তাদের পায়ে পরে স্বর্ণের সুতায় বোনা ভেড়ার চামড়ার তৈরি জুতা। অপেক্ষাকৃত কেতাদুরস্তরা তাতে নকশা করাকে সঠিক কাজ মনে করতো। ১৫০৮ সালের দিকে পর্যটক ভার্থেমা ‘গৌড়ে আমার দেখা’ বইয়ের বর্ণনায় সবচেয়ে ধনী সওদাগরদের দেখতে পান। ১০ বছর পর পর্যটক দুয়াতে বারবোসাও ধনী আরব, ইরানি, আবিসিনিয়া ও গৌড়ের ভারতীয়দের কথা উল্লেখ করে লিখেন সম্মানিত মুসলমানেরা গোড়ালি পর্যন্ত নামানো সূক্ষ্ম সুতি বস্ত্রের আলখেল্লা পরতো, তার নিচে কাপড়ের কোমরবন্ধ মাথায় সিল্কের টুপি, কোমরে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত খাপে ছোরা রাখতো। উপরে বর্ণিত সম্ভ্রান্ত ও ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ ছিলেন মুসলমান অভিজাত তথা আশরাফ (ভদ্র) শ্রেণীভুক্ত, তাদের মধ্যে শহুরে দরবেশ, ধর্মীয় কর্মকর্তা অর্থাৎ আলেম ওলামা এবং বিদেশী বংশোদ্ভূত সৈনিক ও প্রশাসকরাও ছিলেন। (সূত্র : ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটন)। এসব বর্ণনা থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে মুসলিম সভ্যতা তথা আচার অনুষ্ঠানই এ ব-দ্বীপের ছন্নছাড়া বিক্ষিপ্ত সমাজভুক্ত মানুষকে আধুনিক নগর সভ্যতাসহ রুচিশীল সামাজিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছিল।

সমাজে আলেম, ধর্মীয় নেতা ও রাজ প্রতিনিধিগণ সরকারি সম্পদ নষ্ট বা দায়িত্ব পালনে অবহেলাকারীগণ ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি হতে হবে এ অনুভূতি ছিল সবার মাঝে প্রবল। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক এম ইটন সাহেব তার দীর্ঘ আলোচনায় উল্লেখ করেছেন ‘মোল্লা মৌলভী এবং ভূ-স্বামীরা যদি সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ করে তবে তারা খোদার গজবে পতিত হবে। তাই গভর্নর এবং কাজীদের জন্য এটা বাধ্যতামূলক এবং প্রয়োজন যে, হাশরের দিন যাতে তারা আযাবে পতিত না হয় এজন্য এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধ করা। (ইসলামের অভ্যুদয় এবং বাংলাদেশ, রিচার্ড এম ইটন)। উল্লিখিত বর্ণনা থেকে এ কথা পরিষ্কারভাবে জানা গেল যে, মুসলমান আলেম, ওলামা, বিচারক, প্রশাসক ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের আচার ব্যবহার, চিন্তাচেতনা ও কার্যক্রমের প্রভাবে বাংলায় নবজাগরণের সৃষ্টি হয় যার অপ্রতিহত প্রবাহে এখানের অতিকলুষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কালিমণ্ডূপ অপসারিত হয়।

প্রাচীন ইতিহাসের উপকরণ সরবরাহকারী এ ভারত ছিল সংস্কৃতি অহমবোধ ও আত্মশ্লাঘায় পরিপূর্ণ। প্রখ্যাত ভারত তত্ত্ববিদ আল বিরুনী উল্লেখ করেছেন যে, ভারতীয়দের অবিচল বিশ্বাস ছিল যে, ভারতই শ্রেষ্ঠ, ভারতীয়রাই শ্রেষ্ঠ জাতি, ভারতীয় রাজপুরুষেরাই শ্রেষ্ঠ রাজন্যবর্গ, ভারতের ধর্মই শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞানই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান বিজ্ঞান। আল বিরুনী ভারতীয় বিদ্বানমণ্ডলীর সঙ্কীর্ণ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করে বলেন: জ্ঞান কার্পণ্য তাদের স্বভাব এমন ছিল যে, স্বজাতির নিম্নবর্ণ থেকেও শাস্ত্র জ্ঞান সযতেœ তারা লুকিয়ে রাখে। সুতরাং ভিন্ন জাতির কথা বলাই বাহুল্য। ভারত ছাড়াও যে আরও বহুদেশ ও জাতির শাস্ত্র জ্ঞান আছে এটা তাদের কল্পনারও বাইরে। ভারতের কুম্ভকর্ণ তথা বদ্ধদরজায় মুসলমান আরবগণেরই করাঘাত তাদের জন্য অভূতপূর্ব কল্যাণ বয়ে আনে। বড়ই দুঃখের বিষয় হলো মুসলমানদের আগমনে যে ভারত বৈচিত্র্যময় সাজে সজ্জিত হলো সেই ভারতের অমুসলিম ঐতিহাসিকগণ মুসলমানদের প্রতি কৃতজ্ঞতা তো স্বীকার করেই নাই বরং তাদের কৃতিত্বকে বিভিন্ন প্রকার অপব্যাখ্যায় রূপান্তরিত করেছে। তা সত্ত্বেও এম এন রায় খুশবুন্ত শিংয়ের মত গবেষকগণ ভারতে মুসলমানদের আগমনকে শুধু যুগান্তকারীই বলে নাই। শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের অভূতপূর্ব দ্বার উন্মোচন অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

প্রখ্যাত গবেষক গোপাল হালদার লিখেছেন ‘ইসলাম মধ্যযুগে যখন সুপ্তপ্রায় বৌদ্ধ ধর্ম ও ইউনানী খ্রিষ্টধর্ম নিশ্চিহ্ন করিয়া তুর্ক, তাতার, মোঙ্গল জাতিদের উহা নিজ পক্ষে টানিয়া লইল তখন ভারত বর্ষেও ইসলামের প্রবেশ ঠেকানো দুঃসাধ্য হইল… প্রবেশের পর বারবার তাহার জীবন যাত্রার ও সংস্কৃতির মধ্যে অনায়াসে তাহাদের স্থান হইয়া গিয়াছে। যে কথা বলতেছিলাম তাহলো এ উপমহাদেশের পূর্বাংশে যে ব-দ্বীপটি অবস্থিত তাই বাংলা নাম ধারণ করেছে। এখানেও অন্যান্য এলাকার মত ইসলামের সুমহান আদর্শের বন্যায় বিধৌত হয়েছে। এ সময় অনেক ধর্মপ্রচারক সুফি ভারতে আগমন করেন। তাদের চরিত্র মাহাত্ম্য, সরল জীবনধারা এবং ইসলামের শাশ্বত ও সাম্যবাদী জীবন ধারার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে মানুষ। মূলত ইসলামের তথা মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন এসব সুফি সাধকেরাই। ভারত থেকেই বাংলায় সুফিরা আগমন করেছিলেন। মুসলমানদের আগমন ভারত তথা বাংলার সংস্কৃতির বিবর্তনে বিপুল প্রভাব বিস্তার করে। বাহ্যিকভাবে এর ফলে সবকিছুই ওলট পালট হয়ে যায় এবং ভারতীয় সংস্কৃতি এবার এক বড় ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। এভাবে বাংলা ও ভারতে ইসলামের প্রাণশক্তিকে অগ্রাহ্য করার শক্তি কারো রইল না।

লেখক : সদস্য, দারুল ইসলাম ট্রাস্ট, সিরাজগঞ্জ

SHARE

Leave a Reply