মুসলিম উম্মাহর ঈদ আনন্দ -আশিক রাব্বি

দুটি ঈদ মুসলমানদের জীবনে নিয়ে আসে আনন্দের ফল্গুধারা। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরের ব্যাপ্তি ও প্রভাব মুসলমানদের জীবনে বহুদূর বিস্তৃত। পূর্ণ একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদ উৎসব মুসলিম জাতির প্রতি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক বড় পুরস্কার। মুসলিম উম্মাহর প্রত্যেক সদস্য আবেগ, ভালোবাসা ও মমতায় পবিত্র ও অনাবিল আনন্দ উৎসবে একাকার হয়ে যায়। এই আনন্দের আমেজ এত বিশাল যে, তা কোনো ভূখণ্ডে বা কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি নির্মল আনন্দের অনুপম আয়োজন হওয়ার কারণে সারা বিশে^র মানুষ আত্মশুদ্ধির আনন্দে পরস্পরের মিলবন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হন এবং আনন্দ সমভাগাভাগি করেন। সমাজের গরিব-দুঃখীদের আত্মার অনুভূতি বুঝতে চেষ্টা করে। তাদের মুখে হাসির ঝিলিক ফোটানোর চেষ্টা করে। সুতরাং উৎসবের এই আনন্দমুখর পরিবেশে অসহায়-গরিবদের দান-খয়রাতের মাধ্যমে তাদেরকেও শামিল করে নেওয়া, ইসলামের বিশ্বজনীনতা ও ব্যাপকতার প্রমাণ বহন করে। নির্মল এই ঈদ-আনন্দে মহান রবের দরবারে সব মুসলমান অত্যন্ত বিনীতভাবে নিজেকে উজাড় করে দেয়।

ঈদের প্রচলন যেভাবে শুরু হয়

আল্লাহ রাববুল আলামিন মুসলিম উম্মাহর প্রতি নিয়ামাত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. যখন মদিনাতে আগমন করলেন তখন মদিনাবাসীদের দুটো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন এ দু’দিনের কী তাৎপর্য আছে? মদিনাবাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা জাহেলি যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন তিনি বললেন : ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দিয়েছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ-১১৩৪) শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দুটো দিন ছিল আল্লাহ তায়ালা তা পরিবর্তন করে এমন দুটো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তাঁর জিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে শালীন আমোদ-ফুর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ গ্রন্থে ইবনে জারীর রা. বর্ণনা মতে, দ্বিতীয় হিজরিতে রাসূলুল্লাহ সা. প্রথম ঈদ পালন করেছেন।
মুসলমানরা এই খুশিতে সকল হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে একে অপরকে পরম আনন্দে জড়িয়ে নেয় বুকে। এই উৎসবে খুশির বন্যায় ভাসে বিশ্ব মুসলিম। এ যেন এক নতুন পৃথিবী। এই দিনে ধনী-গরিবের মধ্যে থাকে না কোনো ভেদাভেদ। এটিই তো হওয়া উচিত প্রকৃত মুসলমানের নীতি ও আদর্শ। এই দিনটিতে বিশ্বের ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে দাঁড়ানোর শিক্ষা পায়। এ দিনটি কেবল আনন্দের বার্তাই বয়ে আনে না, বরং এর মধ্য দিয়ে প্রসারিত হয় ইসলামে বর্ণিত বিশ্বব্যাপী সাম্যের জয়গান। দীর্ঘ এক মাস সংযমী থেকে পরিশুদ্ধ হৃদয়ে কলুষমুক্ত জীবন, পরিবার ও সমাজ গঠনের অঙ্গীকারে সারা বিশ্বের মুসলমানেরা একে অপরের ভাই ভাইয়ে পরিণত হয়।
ঈদ শান্তি, সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের অনুপম শিক্ষা দেয়। মানুষের আনন্দময় সত্তার জাগরণ ঘটায়। মুসলিম উম্মাহকে সাম্য, মৈত্রী ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে। ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় ও ইনসাফের শিক্ষা দেয়।’
মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে বান্দা যে মহান রবের দরবারে রোজা, তারাবি, রহমত, মাগফিরাত, নাজাত, শবে কদরের মতো হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাতের প্রাপ্তি- এসব নিয়ামাতের কারণে বান্দার মনে যে আনন্দের জোয়ার সৃষ্টি হয়, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ঈদের দিনে। তাই মুমিনের ঈদ মানে নিয়ামাতপ্রাপ্তির আনন্দ, মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মহা-আয়োজন।

ঈদের দিনে করণীয় কাজসমূহ

ঈদ আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামাত। কিন্তু আমরা এ দিনকে নিয়ামাত হিসাবে গ্রহণ করি না। এ দিনে অনেক কাজ আছে যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী হতে পারি এবং ঈদ উদযাপনও একটি ইবাদাতে পরিণত হতে পারে। এদিনের করণীয় কাজগুলো হতে পারে-
১. ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায় : আমাদের দেশের অনেকেই ফজরের নামাজ আদায় করে না। ঈদের জন্য ফজরের নামাজ জামায়াতে পড়ার গুরুত্বও দেয় না। অথচ ফজরের নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘যদি তারা ইশা ও ফজর নামাজের মধ্যে কী আছে তা জানতে পারতো তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও এ দুটি নামাজের জামায়াতে শামিল হতো।’ (বুখারি-৬১৫)
২. ঈদের সালাত আদায় : ঈদের দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঈদের সালাত আদায় করা। প্রকৃতপক্ষে একজন ঈমানদার বান্দাহ সালাত আদায়ের মাধ্যমে বেশি আনন্দিত হয়ে থাকে। হাদিসে এসেছে, ‘নবী কারিম সা. ঈদুল ফিতরের দিনে বের হয়ে দু রাকাত ঈদের সালাত আদায় করেছেন। এর পূর্বে ও পরে অন্য কোন নামাজ আদায় করেননি।’ (বুখারি-৯৮৯)
৩. ঈদের দিন গোসল করা : ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন। কেননা এ দিনে সকল মানুষ সালাত আদায়ের জন্য মিলিত হয়। ইবনে উমার রা. থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে, ‘তিনি ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।’ (সুনানে বায়হাকি-৫৯২০)
৪. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : আর ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হলো সুন্নাহ এর অন্তর্ভুক্ত। আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘সুন্নাত হলো ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।’ (সুনান আততিরমিযী : ৫৩৩) উভয় পথের লোকদেরকে সালাম দেয়া ও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার জন্য যে পথে যাবে সে পথে না ফিরে অন্য পথে ফিরে আসা।
৫. ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ : ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা এবং ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নাত। বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, ‘নবী কারিম সা. ঈদুল ফিতরের দিনে না খেয়ে বের হতেন না, আর ঈদুল আজহার দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে খেতেন না।’ (তিরমিজি-৫৪৫)
৬. তাকবির পাঠ করা : তাকবির পাঠ করার মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা হয়। তাকবির হলো : আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার। ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
৭. নতুন বা পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা : ঈদে উত্তম জামা-কাপড় পরিধান করে ঈদ উদযাপন করা। এ দিনে সকল মানুষ একত্রে জমায়েত হয়, তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত হলো তার প্রতি আল্লাহর যে নিয়ামাত তা প্রকাশ করণার্থে ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায়স্বরূপ নিজেকে সর্বোত্তম সাজে সজ্জিত করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘আল্লাহ রাববুল আলামিন তাঁর বান্দার উপর তাঁর প্রদত্ত নিয়ামাতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’ (আল জামে-১৮৮৭) ইবনুল কায়্যিম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন : ‘নবী কারিম সা. দু ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ (যাদুল মায়াদ)
৮. ঈদের খুতবা শ্রবণ করা : ঈদের খুতবা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়ে থাকে। আব্দুল্লাহ বিন সায়েব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি নবী কারিম সা. এর সাথে ঈদ উদযাপন করলাম। যখন তিনি ঈদের সালাত শেষ করলেন, বললেন : আমরা এখন খুতবা দেব। যার ভালো লাগে সে যেন বসে আর যে চলে যেতে চায় সে যেতে পারে।’ (আবু দাউদ-১১৫৭)
৯. দোয়া ও ইস্তেগফার করা : ঈদের দিনে আল্লাহ তায়ালা অনেক বান্দাহকে মাফ করে দেন। মুয়ারিরক আলঈজলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ঈদের এই দিনে আল্লাহ তায়ালা একদল লোককে এভাবে মাফ করে দিবেন, যেমনি তাদের মা তাদের নিষ্পাপ জন্ম দিয়েছিল। নবী কারিম সা. ইরশাদ করেন, ‘তারা যেন এই দিনে মুসলিমদের জামায়াতে দোয়ায় অংশ গ্রহণ করে’ (লাতাইফুল মায়ারিফ)।
১০. ফিতরা আদায় করা : রমাদান মাসে সিয়ামের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণার্থে এবং অভাবগ্রস্তদের খাবার প্রদানের উদ্দেশ্যে ঈদের সালাতের পূর্বে নির্ধারিত পরিমাণের যে খাদ্যসামগ্রী দান করা হয়ে থাকে, শরিয়তের পরিভাষায় তাকেই জাকাতুল ফিতর বা ফিতরা বলা হয়ে থাকে। হাদিসে এসেছে, ‘রাসূল সা. ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে ফিতরা আদায় করার আদেশ দিলেন।’ (বুখারি-১৫০৩)
১১. ইয়াতিম ও অভাবীকে খাবার খাওয়ানো : ইয়াতিমের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদেরকে খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়া। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল কুরআনে এসেছে, তারা খাদ্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, ইয়াতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে (সূরা দাহর : ৮)
১২. আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া : ঈদের সময় বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেওয়া ও তাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার বিশেষ সুযোগ তৈরি হয়। এ সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে আখেরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি-৬১৩৮)
১৩. প্রতিবেশীর খোঁজ-খবর নেওয়া : ঈদের সময় প্রতিবেশীর হক আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতিম, মিসকিন, প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ (সূরা নিসা : ৩৬)
১৪. মনোমালিন্য দূর করা : জীবন চলার পথে বিভিন্ন পর্যায়ে কারো কারো সম্পর্কের অবনতি হতে পারে। ঈদের সময় পারস্পরিক মনোমলিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ নয় যে তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে দেখা সাক্ষাৎ হলে একজন অন্য জনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ঐ ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যে প্রথম সালাম দেয়।’ (মুসলিম-৬৬৯৭)
১৫. সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা : ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা যেখানে সুস্থ বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. বর্ণনা করেন : ‘রাসূলুল্লাহ সা. ঈদের দিন আমার ঘরে আগমন করলেন, তখন আমার নিকট দু’টি ছোট মেয়ে গান গাইছিল, বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। ইতোমধ্যে আবু বকর রা. ঘরে প্রবেশ করে এই বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজির ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর কথা শুনে বললেন : মেয়ে দুটিকে গাইতে দাও হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদের দিন।’ (বুখারি-৯৫২)

ঈদে বর্জন করা প্রয়োজন

ঈদ মুসলিম জাতির গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। আর আমাদের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। আমরা ঈদ পালনে অনেকে ইসলাম সমর্থন করে না এমন সব সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত হচ্ছি, যা আমাদের বর্জন করা দরকার। ঈদে বর্জনীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো :
১. ঈদের দিন সিয়াম পালন : ঈদের দিন সিয়াম পালন করলে ঈদের দিনের কাজসমূহ যথাযথ পালন করা যাবে না। সেজন্য হাদিসে ঈদের দিন সিয়াম পালন করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ এসেছে। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত আছে, ‘রাসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসলিম-২৭৩০)
২. বিজাতীয় আচরণ প্রদর্শন : বিজাতীয় আচরণ মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদে, চাল-চলনে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে অমুসলিমদের অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে মুসলমানদের অনেকেই। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ বিন আমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সাদৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ-৪০৩৩)
৩. নারী-পুরুষ বিপরীত বেশ ধারণ : পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন ও সাজ-সজ্জার ক্ষেত্রে পুরুষ নারীর বেশ ধারণ ও নারী পুরুষের বেশ ধারণ হারাম। ঈদের দিনে এ কাজটি অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয়। হাদিস থেকে জানা যায়- ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলে কারীম সা. পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন।’ (আবু দাউদ-৪০৯৯)
৪. গান-বাজনা করা, অশ্লীল সিনেমা ও নাটক দেখা : ঈদ উপলক্ষে বিশেষ নাটক, সিনেমা ও বিভিন্ন গান বাজনা- যা ইসলাম অনুমোদন করে না, তা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : ‘আমার উম্মতের মাঝে এমন একটা দল পাওয়া যাবে যারা ব্যভিচার, রেশমি পোশাক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল (বৈধ) মনে করবে।’ (বুখারি-৫৫৯০)
৫. বেহুদা কাজে সময় ব্যয় করা : অনেকে বেহুদা কাজে ঈদে রাত জাগরণ ও দিনে বেহুদা কাজে সময় নষ্ট করে থাকে। সেজন্য বেহুদা কাজে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকা দরকার। আল কুরআনে মুমিনের গুণাবলি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আর যারা অনর্থক কথা-কর্ম থেকে বিমুখ থাকে।’ (সূরা মুমিনুন : ০৩)
৬. জামায়াতের সাথে ফরজ সালাত আদায়ে অলসতা করা : ঈদের আনন্দে এমনভাবে উদাসীন থাকেন যে, ফরজ সালাত আদায়ে অলসতা করেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের সালাতে অমনোযোগী।’ (সূরা মাউন : ৪-৫)
৭. বেগানা নারীদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ : দেখা যায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে এই গুনাহের কাজটা ঈদের দিনে বেশি করা হয়। নিকট আত্মীয়দের মাঝে যাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ শরিয়ত অনুমোদিত নয়, তাদের সাথে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করা হয়। উকবাহ ইবনে আমের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সা. বলেন : ‘তোমরা মহিলাদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে। মদিনার আনসারদের মধ্য থেকে এক লোক প্রশ্ন করল হে আল্লাহর রাসূল! দেবর-ভাসুর প্রমুখ আত্মীয়দের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? তিনি উত্তরে বললেন : ‘এ ধরনের আত্মীয়-স্বজন তো মৃত্যু।’ (বুখারি-৫২৩২)
৮. অপচয় ও অপব্যয় করা : ঈদের কেনাকাটা থেকে শুরু করে এ উপলক্ষে সব কিছুতেই অপচয় ও অপব্যয় করা হয়। অথচ কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা কোনভাবেই অপব্যয় করো না, নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাঈল : ২৬-২৭) আরো বলা হয়েছে, ‘এবং তোমরা খাও, পান করো এবং অপচয় করো না।’ (সূরা আরাফ : ৩১)
৯. ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা : অনেকে এ দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করে থাকেন, যা রাসূলুল্লাহ সা. ও সাহাবায়ে কিরাম থেকে সাব্যস্ত হয়নি। অতএব ঈদের দিনকে কবর জিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট করা যাবে না। এজন্য রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে এমন ইবাদাত করল যাতে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই তা পরিত্যাজ্য হিসাবে গণ্য হবে।’ (মুসলিম-৪৫৯০)
১০. জুয়া খেলা ও আতশবাজি করা : এগুলো শরিয়তবিরোধী কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সূরা মায়িদাহ : ৯০)
১১. মানুষকে কষ্ট দেয়া : ঈদের দিনে অনেকে এমন কাজ করেন যা মানুষকে কষ্ট দেয়। যেমন, রাস্তা আঁকিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়া, এমন আনন্দ করা যাতে অন্যরা কষ্ট পায়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘মুসলিম ঐ ব্যক্তি যার হাত ও জিহবা থেকে অন্যরা নিরাপদ।’ (বুখারি-৬৪৮৪)
১২. ঈদের সালাত আদায় না করে কেবল আনন্দ ফুর্তি করা : অনেকে ঈদের আনন্দে মাতওয়ারা হয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিধান, সেমাই, ফিরনি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ঈদের সালাত আদায় করার কথা ভুলে যান। অথচ এই দিনে ঈদের সালাত আদায় করা হচ্ছে মূল করণীয়।

পৃথিবীর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী, ধর্মানুসারী ও মুসলমানদের মাঝে মৌলিক পার্থক্য হলো, ইসলাম অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর উৎসব-আনন্দে যেসব বেহায়াপনা, বেলেল্লাপনা, উলঙ্গপনার ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হয় সেগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে। তাই ইসলামের উৎসবে নোংরা, বিশ্রী ও অমানবিক কোনো চিত্র নেই এবং তার অনুমতিও নেই। এসব গর্হিত কাজ ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ঈদ মুসলমানদের জীবনে শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবই নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদাত যার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা খুঁজে পায়, সকল ভেদাভেদ ভুলে যায় এবং সর্বশ্রেণী ও সকল বয়সের নারী-পুরুষ ঈদের জামাতে শামিল হয়ে মহান রবের শোকর আদায়ে নুয়ে পড়ে।
মুসলমানরা যখন ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তখন তাদের মুখে স্লোগান থাকে- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা বড়, আল্লাহ তায়ালা শ্রেষ্ঠ, আল্লাহ তায়ালা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ তায়ালা বড়, আল্লাহ তায়ালা শ্রেষ্ঠ, প্রশংসা শুধু তারই জন্য।
ঈদ ধনী-দরিদ্র, সুখী-অসুখী, আবালবৃদ্ধবনিতা সব মানুষের জন্য ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস। পরস্পরের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের শিক্ষা দেয়। মহান সৃষ্টিকর্তার দরবারে আমাদের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা হলো জগতের সব মানুষের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। পৃথিবী সর্বপ্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানিমুক্ত হোক! সন্ত্রাসের বিভীষিকা দূর হোক! আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধন দৃঢ়তর হোক! আগামী দিনগুলো সুন্দর ও সৌন্দর্যমণ্ডিত হোক! হাসি-খুশি ও ঈদের আনন্দে ভরে উঠুক প্রতিটি প্রাণ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সংযম, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ পরিব্যাপ্তি লাভ করুক- এটাই হোক ঈদ আনন্দের ঐকান্তিক কামনা।
লেখক : কলামিস্ট ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply