post

মুসলিম যুবসমাজের ক্যারিয়ার গঠন সময়ের অনিবার্য দাবি

আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

২২ মার্চ ২০২৩

আমরা আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র্যের দিকে তাকালে বিভিন্ন ধরনের ফল ফলাদি, গাছগাছালি, পাখ পাখালি ও নানা ধরনের কীটপতঙ্গ দেখতে পাই ; মানবসমাজের বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের জন্য আল্লাহ পাক এসব কিছু সৃষ্টি করেছেন। ফুল বাগানে হরেক রকম ফুল রয়েছে; একেকজন মানুষ একেক ধরনের ফুলের সুবাস পছন্দ করেন। নদীতে বিভিন্ন স্বাদের মাছ; জমিতে নানা ধরনের শস্য উৎপন্ন হয়। হয়তো এই সব কিছুর কোনো একটি কারো অপছন্দ বা অপ্রয়োজন হতে পারে কিন্তু তা অনেকেরই প্রয়োজন বলে আল্লাহ তায়ালা সব ধরনের জিনিস সৃষ্টি করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো একটি সমাজ পরিচালনার জন্য সমাজের বিভিন্ন সেক্টরে যোগ্যতা ও দক্ষতা সম্পন্ন মানুষ দরকার। এজন্য সমাজের একেকজন মানুষকে একেক ধরনের যোগ্যতা দিয়ে আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন।১ মানুষের বহুমুখী যোগ্যতার বিকাশ যে সমাজ যত কার্যকরভাবে করতে পারে সে সমাজ তত উন্নত। 


বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকা কেন বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে?

বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকাসহ পাশ্চাত্য বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে; দুনিয়াতে কর্তৃত্ব করছে। তারা জ্ঞান বিজ্ঞানে শীর্ষে; তথ্য ও প্রযুক্তিতে অনেক উন্নত। কেননা তারা তাদের প্রতিভাবানদের মেধা বিকাশে খুবই সিরিয়াস। তাদের বিজ্ঞানীরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জ্ঞান গবেষণায় লিপ্ত রয়েছে এবং নতুন নতুন আবিষ্কার করছে। আধুনিক কম্পিউটার, মোবাইল, টেলিফোন, উড়োজাহাজ প্রভৃতি বিজ্ঞানেরই অবদান। কিন্তু কারা এসব কিছু আবিষ্কার করছে। ড. জন এটানসফ ১৯৪২ সালে গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য বায়ুশূন্য টিউব ব্যবহার করে ছোট্ট একটি ইলেকট্রনিক কম্পিউটার আবিষ্কার করেন। টেলিফোন আবিষ্কার করেন বিজ্ঞানী গ্রাহাম বেল। উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন রাইট ব্রাদার্স (উইলবার রাইট ও তাঁর ছোট ভাই অলভিল রাইট)। এভাবে আধুনিক প্রযুক্তির আবিষ্কারকদের তালিকা তৈরি করলে দেখা যাবে অমুসলিম বিজ্ঞানীরাই এসব কিছু আবিষ্কার করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আল্লাহ পাক কি শুধু তাদেরকেই প্রতিভা দান করেছেন? আল্লাহ তায়ালা তো মুসলিম-অমুসলিম সবাইকে প্রতিভা দান করেছেন। মুসলমানগণ যখন এ প্রতিভা কাজে লাগিয়েছিল তখন জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানরাই শীর্ষে ছিল। অমুসলিমরা তখন জ্ঞানের জন্য মুসলমানদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতো। কিন্তু বর্তমানে আমরা ভিন্ন চিত্র লক্ষ করছি। এ প্রসঙ্গে খ্রিস্টানদের প্রাক্তন আর্কবিশফ Dr Lord Carey অতি সম্প্রতি বলেন, ‘although we owe much to Islam handing on to the west many of the treasures of Greck thought, the begining of calculus, aristotelian thought during the period known in the west as the dark ages, it is sad to relate that no great invention has come for many hundred years from Muslim countries. This is a puzzle; becuse Muslim people are not bereft of brilliant minds. They have much to contribute to the human family and we look forward to the close co-operation that might make this possible2.

ড. কেরি মুসলমানদের সমালোচনা করে উপরি উক্ত মন্তব্য করলেও এটা বাস্তব যে বর্তমানে মুসলমানেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে পাশ্চাত্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। এ পিছিয়ে থাকার কারণ এই নয় যে আল্লাহ পাক বর্তমান যুগের মুসলমানদেরকে প্রতিভা দান করেননি কিংবা অমুসলিমদের চেয়ে কম প্রতিভা দিয়েছেন। আল্লাহ পাক মুসলিম উম্মহকে শ্রেষ্ঠ জাতি (খায়রা উম্মাত) বলেছেন এবং মানুষ হিসাবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা কাউকে যোগ্যতার বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। যেহেতু তিনি মুসলিম উম্মাহকে শ্রেষ্ঠ জাতি বলেছেন এবং খিলাফতের দায়িত্ব দিয়েছেন। তাই এ কথা বলা যায় যে, তিনি এ দায়িত্ব পালনের উপযোগী মেধা ও যোগ্যতা তাদেরকে দান করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে মুসলমানেরা সামগ্রিকভাবে তাদের মেধা ও যোগ্যতা যথাযথভাবে কাজে  লাগাতে ব্যর্থ হওয়ার ফলেই অমুসলিমরা বিশ্ব নেতৃত্ব দিচ্ছে।

অতীতে যখন মুসলমানেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন ছিল তখন বিশ্ব নেতৃত্ব মুসলমানদের হাতেই ছিল। কিন্তু বর্তমানে মুসলমানেরা জ্ঞান বিজ্ঞানে পাশ্চাত্যের তুলনায় অনেক পিছিয়ে থাকার কারণে দুনিয়ার পরিচালক হওয়ার পরিবর্তে পরিচালিত; শাসক হওয়ার পরিবর্তে শাসিত। পাশ্চাত্যের কাছে ইসলামী নৈতিক চরিত্র না থাকলেও মৌলিক মানবীয় গুণাবলি ও দুনিয়া পরিচালনার যোগ্যতা তুলনামূলকভাবে বেশি রয়েছে।৩ তাই তারা বর্তমানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মুসলিম উম্মাহ যদি ইসলামী নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে বস্তুগত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে তাহলে দুনিয়ার কর্তৃত্ব মুসলমানদের হাতে আসবে ইনশাআল্লাহ। কেননা কোনো একটি সমাজ শুধু বস্তুগত চাকচিক্য দিয়ে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। সমাজের অস্তিত্ব নৈতিক শক্তির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। পাশ্চাত্যের কাছে বস্তুগত চাকচিক্য আছে। কিন্তু নৈতিক শক্তি নেই। এ কারণে পাশ্চাত্য সভ্যতা একটি ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতা। এই সভ্যতা বেশিদিন নেতৃত্বের আসনে আসীন থাকতে পারে না। কিন্তু তাদের চেয়ে উন্নত নৈতিকতা ও মানবিক যোগ্যতা সম্পন্ন কেউ না থাকলে তারাই কর্তৃত্ব করতে থাকবে।৪


জ্ঞান বিজ্ঞানে মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার ফল

১. আধুনিক প্রযুক্তি মানবতার অকল্যাণে ব্যবহার হচ্ছে : আধুনিক যুগ হচ্ছে তথ্য ও প্রযুক্তির যুগ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে এই তথ্য ও প্রযুক্তি যাদের হাতে রয়েছে তারা নিজেদের স্বার্থে কিংবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে আধুনিক প্রযুক্তি মানবতার কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণে ব্যবহার করছে। যার ফলে অনেক জনপদ ধ্বংস হচ্ছে; আশরাফুল মাখলুকাত বনি আদম তার নির্মম শিকার হচ্ছে। জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অ্যাটম রোম নিক্ষেপ, আফগান, ইরাক ও ফিলিস্তিনে আধুনিক মারণাস্ত্রের নির্মম প্রয়োগ তারই জ্বলন্ত প্রমাণ 

২. বিশ্বে অশান্তির আগুন জ্বলছে : বর্তমান বিশ্বে কী দেখা যায়? চারিদিকে শুধু অশান্তির দাবানল জ্বলছে। সবল মানুষেরা দুর্বল মানুষের উপর অত্যাচার করছে; তাদের সহায় সম্পদ লুণ্ঠন করছে। অনুরূপভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক দুর্বল রাষ্ট্রসমূহে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেননা যাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে তাদের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বীর হাতে তাদের মত তথ্য ও প্রযুক্তি না থাকার কারণে তারা শঙ্কাহীন চিত্তে দাপট দেখাচ্ছে; হুমকি ধমকি দিচ্ছে; আক্রমণ করছে; স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব লুণ্ঠন করছে। 

৩. বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নেই : জ্ঞান, বিজ্ঞান ও দক্ষতায় পাশ্চাত্য অনেক অগ্রসর আর মুসলমানেরা তাদের চেয়ে পিছনে থাকার কারণে বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য নেই। তাই তারা মুসলিম দেশে আগ্রাসন পরিচালনা করতে দ্বিধা করছে না। এভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম নির্যাতনের পিছনে মৌলিক কারণ হচ্ছে সমরশক্তিতে মুসলমানরা অমুসলিমদের তুলনায় একেবারেই দুর্বল। মুসলিম বিশ্ব ও পাশ্চাত্যের সমরশক্তির অনুপাত ৩:৯৭মাত্র।৫ মুসলিম বিশ্ব যদি জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের চেয়ে অগ্রসর হতো তাহলে পাশ্চাত্য শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে লিপ্ত থাকতো। বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধে তারা পরাজিত থাকলে সম্মুখ সমরেও তাদের পরাজয় সুনিশ্চিত ছিল।


মুসলিম উম্মাহ বিশ্ব নেতৃত্ব দিতে হলে ভিশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন

কুরআনের ভাষ্য অনুসারে মুসলমানেরা এমন এক আদর্শে বিশ্বাসী যা বিজয়ী আদর্শ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত থাকতে চায়। ঈমানের সাথে যোগ্যতা থাকলে আল্লাহ মুসলমানদের জাগতিক বিজয় দানের প্রতিশ্রুতি দান করেছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হচ্ছে বর্তমানে ইসলাম বিজয়ী আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠিত নেই। কিছু সংখ্যক ইহুদি গোটা বিশ্বে যে দাপট ও প্রভাব বিস্তার করে আছে তার তুলনায় মুসলমানদের সংখ্যা অনেক গুণ বেশি হলেও মুসলমানেরা বিভিন্ন স্থানে নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে।৬ এজন্য দুঃখ কিংবা অনুশোচনায় সময় ক্ষেপণ করার পরিবর্তে আমাদেরকে দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হবে; আল্ল­াহ প্রদত্ত প্রতিভা কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের হতাশ হওয়ার কারণ নেই। কেননা এক সময় আমরা জ্ঞান বিজ্ঞানে তাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলাম। তারা আমাদের কাছ থেকে জ্ঞান বিজ্ঞান শিখে আজকে উন্নতি লাভ করেছে। আমরা যদি নৈতিক শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারি তাহলে আমাদের হৃত গৌরব ফিরে পাব, ইনশাআল্লাহ।  

মুসলিম উম্মাহর হৃত গৌরব ফিরে পেতে হলে মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে ‘ভিশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা’ থাকতে হবে। বিশেষত মুসলিম তরুণ সমাজকে উক্ত ভিশনকে সামনে রেখে প্রতিভার বিকাশ সাধন করে জ্ঞান, বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।


মুসলিম তরুণ সমাজকে ক্যারিয়ার গঠনে

এগিয়ে আসতে হবে

যেকোন সমাজ বিনির্মাণে যুবসমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলে কারিম সা.-এর দাওয়াতে প্রথম পর্যায়ে যাঁরা সাড়া দেন তাঁদের অধিকাংশই যুবক ছিলেন। মুসলিম উম্মাহর গৌরবজনক অধ্যায় রচনার ক্ষেত্রে অতীতে যুবসমাজই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় বিপ্ল­ব সাধনে যুবসমাজই প্রধান নিয়ামক শক্তি ছিল। বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অনিয়ম মুক্ত উন্নত বাংলাদেশ উপহার দিতে হলে বাংলাদেশের যুবসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম নির্যাতন বন্ধ করে, সুন্দর শান্তিময় পৃথিবী উপহার দিতে হলে মুসলিম যুবসমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর এ লক্ষ্যেই মুসলিম তরুণ সমাজকে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে।  আজকের মুসলিম তরুণ সমাজকে কয়েকটি কথা মনে রাখতে হবে- 


১. জ্ঞান মুসলমানদের হারানো সম্পদ

খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় মুসলমানেরা শীর্ষে ছিল৭। ইমাম জাফর সাদিক, জাবির ইবনে হাইয়ান, ওমর খৈয়ম, আল বেরূনী, ইবনে সিনা, আল খাওয়ারেযেমী প্রমুখ বিজ্ঞানীর অবদানের কথা পাশ্চাত্যের লেখকরাও অস্বীকার করতে পারছে না। অবশ্য পাশ্চাত্যের লেখকরা সুপরিকল্পিতভাবে তাঁদের নাম বিকৃত করে উল্লে­খ করার কারণে অনেক পাঠকের কাছে তাঁদের আসল পরিচয় অস্পষ্ট।৮ এর ফলে অনেক মুসলিম পাঠকও বিভ্রান্ত হয়ে তাঁদেরকে পাশ্চাত্যের মনীষী বলে মনে করেন।  কেননা মুসলমানদের অতীত গৌরবজনক ইতিহাস অনেক মুসলমানই অবহিত নন। এ প্রসঙ্গে সাইয়েদ আশরাফ আলী Muslim Contribution to Science and Tecnology বইয়ের ভূমিকায় যথাথই লেখেছেন: ‘Most of the Muslims, indeed, do not know about the historic and stupendous contributions that the Muslims have made to science and Technology9’’

মুসলিম তরুণ সমাজকে মনে রাখতে হবে যে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবনে সিনা, জাবির হাসান বিন হাইসাম, রাযী১০ প্রমুখের বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদ ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যবই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল। মুসলমানেরাই প্রথম রাসায়নিক ঔষধ সমূহকে পিল ও মিকশ্চার হিসাবে ব্যবহার শুরু করে১১ এবং মুসলিম বড় বড় শহরে হাসপাতাল গড়ে তোলে। জাবির বিন হাইয়ান রসায়নশাস্ত্রের ভিত্তি রচনা করেন। ইবনে আল হাইসাম ছিলেন সর্বকালের একজন শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি সর্বপ্রথম জড়তত্ত্ব (Law of inertia), আলোর প্রতিসরণ তত্ত্ব প্রদান করেন। যা পরবর্তীকালে নিউটনের হাতে পুনরাবিষ্কৃত হয়। এ কথা সকলেই জানেন যে কম্পিউটারের আবিষ্কার অঙ্কশাস্ত্র নির্ভর। আলখারেযেমী প্রথম বস্তুর সংখ্যাতাত্ত্বিক পরিমাপ প্রণয়ন করেন। প্রখ্যাত কবি ওমর খৈয়াম নিউটনের বহু আগে বাইনোমিয়াল থিউরাম আবিষ্কার করেন। মুসলিম ভূগোলবিদ ইবনে হাক্কল সম্ভবত পৃথিবীর সর্বপ্রথম সম্পূর্ণ মানচিত্র প্রণয়ন করেন। আল বিরূনী১২, ইবনে বতুতা প্রমুখ মুসলিম মনীষীগণ ভূ-বিদ্যার প্রসারে যথেষ্ট অবদান রাখেন। আল ফরাবী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষাবিদ ও দার্শনিক। তিনি প্রায় ৭০টি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। আল কিন্দী গণিত, ভূগোল, ইতিহাস, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ৩৬৯টি গ্রন্থরচনা করেন। ইবনে খালদুনকে ইতিহাস, দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। ইবনে জারীর তাবারী বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক। তাঁর তারিখ আল রাসূল ওয়া আল মুলুক গ্রন্থটি বিশ্বের সর্বত্রই রেফারেন্স হিসাবে পঠিত হচ্ছে।  শিল্প, কলকারখানাতেও মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য। মুসলমানেরাই চামড়ার কাগজের পরিবর্তে তুলার তৈরি কাগজের প্রচলন করেন এবং এর ফলেই ইউরোপে মুদ্রণ শিল্পের বিকাশ সাধিত হয়।১৩ 

মুসলিম শাসকরা অতীতে জ্ঞান বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আব্বাসীয় খলিফা মামুন প্রায় ৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে বাগদাদে দারুল হিকমাহ নামে একটি বিজ্ঞান কেন্দ্র গড়ে তোলেন। গুস্তাব লি বোঁ (Gustab le bou) তাঁর ইসলাম ও আরবি সভ্যতার ইতিহাস বইতে লিখেছেন, ‘ইউরোপে যখন বই ও পাঠাগারের কোনো অস্তিত্ব ছিল না অনেক মুসলিম দেশে তখন প্রচুর বই ও পাঠাগার ছিল। সত্যিকার অর্থে বাগদাদের ‘বায়তুল হিকমাহ’ চল্লি­শ লক্ষ, কায়রোর সুলতানের পাঠাগারে দশ লক্ষ, সিরিয়ার ত্রিপোলি পাঠাগারে তিরিশ লক্ষ গ্রন্থ ছিল। অপর দিকে মুসলমানদের সময়ে কেবল স্পেনে প্রতি বছর ৭০ থেকে ৮০ হাজার বই প্রকাশিত হতো।’’১৪ এ প্রসঙ্গে ড: মরিস বুকাইলি তাঁর গ্রন্থ ‘The Bible, the Quran and Science’ উল্লে­খ করেন, ‘অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে ইসলাম জ্ঞান বিজ্ঞানকে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে ধরে। যখন খ্রিস্টীয় জগতে বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের উপর নিষেধাজ্ঞা চলছিল তখন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে বহুসংখ্যক গবেষণা ও আবিষ্কার সাধিত হয়। কর্ডোভার রাজকীয় পাঠাগারে চার লাখ বই ছিল। ইবন রুশদ তখন সেখানে গ্রিক, ভারতীয় ও পারস্য দেশীয় বিজ্ঞানে পাঠদান করতেন। যার কারণে সারা ইউরোপ থেকে পণ্ডিতরা কর্ডোভায় পড়তে যেতেন যেমন আজকের দুনিয়ার মানুষ তাদের শিক্ষার পরিপূর্ণতার জন্য আমেরিকায় যায়। আমরা আরব সংস্কৃতির কাছে বহুলভাবে ঋণী।’’১৫ বর্তমান মুসলিম তরুণ সমাজকে অতীত ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে এবং আপন আপন প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে।

মুসলিম তরুণ সমাজকে মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে হজরত মুহাম্মদ সা.-এর প্রতি প্রথম যে অহি নাযিল হয় তার প্রথম শব্দ ছিল, ‘ইক্রা অর্থাৎ পড়’। এই ‘পড়’ শব্দটির মাধ্যমে একথাই বুঝানো হয়েছে যে পড়া ছাড়া, জ্ঞান ছাড়া আল্লাহকে চেনা যায় না; আল্লাহর সৃষ্টি তত্ত্ব বুঝা যায় না; সৃষ্টিজগতে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব করা যায় না। আর পড়া শব্দটির সাথে ‘বি ইসমি রাব্বিকাল্লাজি খলাক¦’ অর্থাৎ পড় তোমার রবের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। এই বাক্য দ্বারা পড়ার মৌলিক দর্শন বাতলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সকল জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে আল্লাহকে জানা ও তাঁর কুদরাত বুঝাই মানুষের শিক্ষার মৌল উদ্দেশ্য হতে হবে। 

আল্লাহকে জানতে হলে পড়তে হয়; জ্ঞানার্জন করতে হয়। জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে কুরআনের মৌলিক জ্ঞানার্জন করা একজন মুসলমানের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত। কেননা কুরআনের মধ্যেই দুনিয়ার কল্যাণ ও আখিরাতে মুক্তির দিকনির্দেশনা আছে। দ্বিতীয়ত, কুরআনের নির্ভুল ব্যাখ্যা হিসাবে আল্ল­াহর রাসূলের সিরাত ও হাদিস পড়তে হবে। তৃতীয়ত, আকাইদ ও ফিকহ এর মৌলিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। কেননা ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ। চতুর্থত, ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে মৌলিক ধারণা থাকতে হবে। কেননা মুসলমানদের অতীত ইতিহাস জানা না থাকলে ভবিষ্যতের পথ রচনা করা কঠিন। পঞ্চমত, আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির প্রাথমিক জ্ঞান থাকতে হবে। ষষ্ঠত, জ্ঞান বিজ্ঞানের যেকোনো একটি শাখায় বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কেননা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি বিভাগে পারদর্শী হওয়া মুসলমানদের উপর ফরজ আল- কিফায়াহ। 

ইসলামের দাবি পূরণের উদ্দেশ্যে জ্ঞানের যে কোনো শাখায় বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য যে বিষয়েই পড়াশুনা করা হোক না কেন আল্ল­াহ তায়ালা সাওয়াব দান করবেন। আত্মপ্রতিষ্ঠা আর দ্বীনের প্রয়োজন পূরণের জন্য পড়াশুনার মধ্যে পার্থক্য এই যে, দ্বীনের জন্য সাধারণ যেকোনো বিষয় পড়াশুনা করতে যতটুকু সময়, শ্রম, অর্থ ব্যয় হয় আল্ল­াহ পাক এই জন্য প্রতিদান দেন। কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্যে কুরআন- হাদিস পড়লেও সওয়াব মিলে না। যেমন ভ্রান্ত আকিদা প্রচারের উদ্দেশ্যে কুরআন- হাদিসের জ্ঞান অর্জন করলে সওয়াব মিলবে না।১৬ 

উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হলো যে ইলম দুই প্রকার: উপকারী ইলম (অর্জনকারীর জন্য আখিরাতে উপকারী হবে) অনুপকারী ইলম (যা আখিরাতে কোনো কাজে আসবে না)। তাই প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীকে আখিরাতে উপকারে আসবে এমন ইলম অর্জন করার চেষ্টা। করা উচিত। ।


২. প্রতিভা আল্লাহ প্রদত্ত আমানত

আল্ল­াহ তায়ালা পরম অনুগ্রহ করে আমাদেরকে প্রতিভা দিয়েছেন; প্রতিভা আল্ল­াহ প্রদত্ত আমানত। এই আমানত যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।  অন্যথা আমরা ‘মেধা হত্যা- মেধা অপচয় ও মেধা খেয়ানতকারী’ অভিযোগে অভিযুক্ত  হতে হবে। আল্লাহ কাউকে অর্থ দিলে তা ইচ্ছে মতো ব্যবহার কিংবা অপচয় করা বৈধ নয় তেমনি আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা নষ্ট কিংবা অপব্যবহার করার সুযোগ নেই। আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা আল্লাহর দ্বীনের কাজে লাগানো সকলের নৈতিক দায়িত্ব। 


৩. প্রতিভা নষ্ট করা অপূরণীয় ক্ষতি

আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা নষ্ট করা শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়, এটা জাতিরও অপূরণীয় ক্ষতি। মনে করুন, কবি নজরুল, আল্লামা ইকবাল যদি তাঁদের প্রতিভা বিকাশে সচেষ্ট না হতেন এতে সমগ্র উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হতো; সমগ্র জাতি তাঁদের মহান অবদান থেকে বঞ্চিত হতো। এখন বলতে পারেন ইচ্ছে করলেই তো ইকবাল, নজরুল, মওদুদী, আলফে সানী, হাসানুল বান্না ও সাইয়েদ কুতুব হওয়া যায় না। হাঁ, ইচ্ছে করলেই যদি নজরুল, ইকবাল হওয়া যেতো তাহলে অনেকেই হয়ে যেতেন। এ কথা সত্য যে আল্লাহ কিছু মানুষকে বিশেষ অবদান রাখার জন্য বিশেষ যোগ্যতা দিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ পাক আপনাকে কোন যোগ্যতাই দেননি আপনার এ বদ্ধমূল বিশ্বাসের ভিত্তি কী? আল্লাহ পাক সকলকেই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অবদান রাখার মতো মেধা দিয়েছেন; আর সকলকেই আপন মেধার কিকাশ সাধনে সচেষ্ট হওয়া উচিত। অন্যথায় ব্যক্তি ও উম্মাহর অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।


৪. মেধা হত্যা অপরাধ

আমরা অন্যায়ভাবে পশু, পাখি ও জীব জন্তু হত্যা অপরাধ বলে বিশ্বাস করি। কেহ অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করলে দুনিয়ার আদালতে জবাবদিহি করতে হয়; হত্যাকারীর শাস্তির দাবিতে মিছিল হয়; সমাবেশ হয়। সাক্ষ্য প্রমাণে দোষী সাব্যস্ত হলে হত্যাকারী সাজা পায়। অন্যায়ভাবে কোনো প্রাণী হত্যা করা নিঃসন্দেহে মারাত্মক অপরাধ। অনুরূপভাবে মেধা হত্যা করাও বড় ধরনের অপরাধ। কেননা মেধা কারো ব্যক্তিগত সৃষ্টি নয়। প্রাণ যেমনিভাবে আল্লাহর দান; মেধাও আল্লাহ দান করেছেন। আল্লাহ যাদেরকে বুদ্ধি বিবেক দান করেননি তাদেরকে আমরা পাগল বলে ডাকি। আল্লাহ ইচ্ছে করলে আমাকে- আপনাকে পাগল করতে পারতেন। তিনি অনুগ্রহ করে আমাদেরকে বুদ্ধি বিবেক দিয়েছেন। তাই আল্লাহ প্রদত্ত বুদ্ধি-বিবেক যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু আফসোসের বিষয় অনেকেই প্রতিভা কাজে না লাগিয়ে প্রতিভা নষ্ট করেন। যারা এভাবে প্রতিভা নষ্ট করেন তারা শুধু ‘প্রতিভা নষ্টকারী নয়- তারা মেধা  হত্যাকারী।’ মেধা হত্যাকারীরা দুনিয়ার আদালতে জিজ্ঞাসিত না হলেও আল্ল­াহর আদালতে জিজ্ঞাসিত হবে।


৫. প্রতিভা আল্লাহর নিয়ামত- কিয়ামতে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হতে হবে

প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে যে প্রতিভা আল্লাহর বিরাট নিয়ামত। দ্বীন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ও উম্মাহর প্রয়োজনে ব্যবহার করার জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে মেধা দান করেছেন। মানুষ কোনো কাজে তার প্রতিভা ব্যবহার করে কিয়ামতের দিন  আল্লাহ এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেন: ‘এর পর অবশ্যই সে দিন তোমরা নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে’।১৭

আল্লাহ আমাদেরকে হাত, পা, চোখ, কান, নাকসহ কী সুন্দর অবয়বে সৃষ্টি করেছেন। আর আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আলো, বাতাস, পানিসহ কত কিছুই দিয়েছেন। পাহাড়, পর্বত, বন-বনানী, গাছ, গাছালি, পাখ-পাখালি, পশু পাখি সবই আল্লাহর নিয়ামত। কিন্তু আল্লাহ পাক যদি আমাদের মেধা দান না করতেন এসব কিছু মানব কল্যাণে ব্যবহার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। এই কারণে মেধা আল্লাহর বিরাট নিয়ামত। দুনিয়ার অন্য বস্তুর মতো প্রতিভা সম্পর্কেও আল্লাহ পাক জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। তাই আল্ল­াহ পাক আমাদের যাকে যে ধরনের প্রতিভা দান করেছেন তা কাজে লাগানোর জন্য সদা সর্বদা চেষ্টা করা দরকার। 


৬. সকলের প্রতিভা সমান নয়

আল্লাহ পাক সকলকে সমান প্রতিভা দান করেননি। অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদ আছেন যাঁরা প্রধানমন্ত্রী হয়ে অনেককে সাহিত্য পুরস্কার ; বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীসহ কৃতী মানুষদেরকে স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার প্রদান করেন। কিন্তু তাঁকে সাহিত্য রচনা করতে দিলে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিলে সাহিত্যচর্চা কিংবা শিক্ষকতা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হতো না। অথচ রাজনীতিবিদ হিসাবে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্ব যোগ্যতার সাথে পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ পাক তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে পুরস্কার প্রদানের যোগ্যতা দান করেছেন কিন্তু কবি, সাহিত্যিক হয়ে পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা দান করেননি। অনুরূপভাবে অনেক ঐতিহাসিক আছেন যাঁরা রাজা বাদশাহদের দোষত্রুটির বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা করে ইতিহাস লেখেন। কিন্তু তাঁর পক্ষে রাষ্ট্রপরিচালনা সম্ভব নয়। একজন ব্যক্তি ঐতিহাসিক, লেখক, কলামিস্ট হিসেবে মানুষের আস্থাশীল হতে পারেন কিন্তু রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর উপর মানুষের আস্থা নাও থাকতে পারে। এইভাবে প্রত্যেক মানুষের যোগ্যতা মূল্যায়ন করলে দেখা যায় আল্ল­াহ পাক সকলকে সমান প্রতিভা দান করেননি।


৭. সকলের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে

ইতঃপূর্বের আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে আল্ল­াহ পাক সকলকে সমান যোগ্যতা দান করেননি। তবে কিছু মানুষ আছে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী: বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন, রাজনৈতিক ময়দান, বক্তৃতা, লেখনী, শিল্প, সাহিত্য সকল ক্ষেত্রে অবদান রাখার মতো যোগ্যতা আল্ল­­াহ পাক তাঁদেরকে দান করেছেন। আবার কেউ কেউ আছেন শুধুমাত্র কোনো একটা বিশেষ ক্ষেত্রে অবদান রাখার মতো যোগ্যতা আছে। যেমন কোন কোন ছাত্র- ছাত্রী পড়াশোনায় রেজাল্ট ভালো করতে পারে না কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গন বা সাংবাদিকতায় ভালো করতে পারে। আবার কেউ মানুষের সাথে মিশতে পারেন। কিন্তু দুই এক লাইন লেখার যোগ্যতা নেই। আবার কেউ আছেন পড়াশোনায় ভালো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকতা কিংবা বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে যাবার মতো প্রতিভা আছে কিন্তু কারো সামনে কিছু বলার যোগ্যতা নেই। আবার কেউ আছেন উচ্চশিক্ষা নিয়ে আরও বেশি অবদান রাখার মতো যোগ্যতা আছে কিন্তু মানুষের সাথে মেশার যোগ্যতা নেই। এই যে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বহু ধরনের মানুষ রয়েছে তাদের সকলের প্রতিভার যথাযথ বিকাশের ওপরই সমাজ উন্নয়ন নির্ভরশীল। তাই আল্ল­াহ পাক যাকে যে ধরনের যোগ্যতা দিয়েছেন তা বিকশিত করার চেষ্টা করতে হবে; এটা সময়ের দাবি।


যোগ্যতা অর্জন সময়ের দাবি 

এই কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে মুসলিম তরুণ সমাজকে প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে হবে এবং বিভিন্ন সেক্টরে অবদান রাখার মতো যোগ্য হতে হবে। শুধু দেশ পরিচালনা নয় বিশ্ব পরিচালনার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে; এটা বর্তমান সময়ের অনিবার্য দাবি। কেননা-

১.যোগ্য লোকেরা ইসলামের উপকার বেশি করতে পারে: ইসলামের জন্য অবদান রাখতে হলে যোগ্যতা থাকা দরকার। হজরত উমর ফারুক রা. ইসলাম কবুল করার পর ইসলামে গতি সঞ্চার হয়। এর কারণ হচ্ছে জাহেলি জমানায় তিনি ছিলেন তাদের যোগ্যতাসম্পন্ন নেতা। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর নারায়ে তাকবির ধ্বনি দিয়ে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা পালন করেন। এইভাবে ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় হজরত হামজা, খালিদ বিন ওয়ালিদ-এর মত যোগ্য, সাহসী মুসলমানরাই ইসলামের বিজয় নিশান উড্ডীন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যোগ্য লোকেরা ইসলামের দাওয়াত কবুল করার পর দাওয়াতের শক্তি বেড়ে যায়। এই প্রসঙ্গে আল্ল­াহর রাসূল সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম ইরশাদ করেন, ‘জাহেলি যুগে তোমাদের মধ্যে যারা উত্তম ছিল, ইসলামেও তারা উত্তম প্রমাণিত হবে- যখন তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করবে।’  মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: ‘এ হাদিসে সেই সত্যের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। ... ইসলাম হজরত আবু বকর রা. ও হজরত উমরে মত লোক পেয়ে গেল। একদিকে তারা নিজেদের প্রতিভাবলে দাওয়াতের প্রাণ সত্তাকে নিজেদের মধ্যে এমনভাবে শুষে নিলেন যে, তাঁরা নিজেরাই দাওয়াতের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকার হয়ে গেলেন। অপর দিকে নিজেদের উন্নত নৈতিক ও চারিত্রিক যোগ্যতার কারণে তারা এতটাই শক্তির অধিকারী ছিলেন যে, এই দাওয়াতের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজ কায়েম করে তা পরিচালনা করেছেন এবং দুনিয়াকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলাম বাস্তব দিক থেকে এসব কিছু করতে চায়’।১৮ 

২. অযোগ্য লোকেরাই ইসলামের অপব্যাখ্যা করে- ভাবমূর্তিক্ষুণœ করে: ইসলাম সঠিকভাবে বুঝার যাদের যোগ্যতা নেই তারাই ইসলামের অপব্যাখ্যা করে। তারা ইসলামকে সুন্দরভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করতে পারে না; তাদের কারণে ইসলামের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়। এ প্রসঙ্গে মাওলানা রূমী মসনবীতে একটি চমৎকার গল্প তুলে ধরেন। তাঁর গল্পের সার কথা হলো: এক গ্রামে এক ব্যক্তি ছিল। তাঁর কথা ছিল কর্কশ, উচ্চারণ ছিল ভুল। তিনি প্রতিদিনই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আজান দিতেন। তাঁর কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনে গ্রামের মানুষের মধ্যে বিরক্তি আসতো। কিন্তু তিনি আজান দিতেন বলেই কেউ কিছু বলার সাহস পেতো না। গ্রামের সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিলো যে তাকে চাঁদা তুলে মক্কায় পাঠিয়ে দেওয়া হোক। তাহলে অন্তত কিছু দিন তার কর্কশ কণ্ঠস্বর শুনা যাবে না। সিদ্ধান্তানুসারে চাঁদা তোলে তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দিলো। এতে লোকটি ভীষণ খুশি হলো। মক্কা যাওয়ার পথে লোকটি এক মসজিদে উপস্থিত হয় এবং নামাজের ওয়াক্ত হতেই আজান দেয়। লোকটি আজান দিয়ে নামাজ শেষে মসজিদে বসে আছে। এমন সময় এক ইহুদি অনেক মিষ্টি নিয়ে হাজির হলো। লোকটি এতো মিষ্টি জীবনে দেখেনি তাই বেজায় খুশি হলো। লোকটি ইহুদিকে মিষ্টি আনার কারণ জিজ্ঞাসা করার পর ইহুদি প্রতি-উত্তরে জানায় আজ আমার পরিবারের সকলেরই ইসলাম কবুল করার কথা ছিল। কিন্তু আপনার আজানের কর্কশ স্বর শুনে সকলে মত পরিবর্তন করে ফেলে। এতে আপনি আমার পরিবারকে রক্ষা করলেন। তাই খুশিতে মিষ্টি এনেছি’।১৯ এই গল্প থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হলো অযোগ্য লোকেরা দ্বীনের উপকারের চেয়ে অপকার বেশি করতে পারে।

৩. সমাজ বিপ্ল­বের জন্য যোগ্যতা দরকার : কোনো একটি সমাজ পরিবর্তন করতে হলে যোগ্য লোক দরকার। যোগ্য লোকেরা সাধারণ মানুষদেরকে আন্দোলনে সমবেত করতে পারে; বিভিন্ন সন্দেহ, সংশয় ও প্রশ্নের জবাব দিতে পারে। আন্দোলকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারিত করতে পারে। ট্রেনের একটি ইঞ্জিনের পিছনে যেমনি অনেক বগি থাকে। তেমনি একজন যোগ্য মানুষের পিছনে অনেক সাধারণ মানুষ ছুটে চলে। তাই সমাজ বিপ্ল­বের জন্য যোগ্য ও দক্ষ কর্মীবাহিনী প্রয়োজন।

৪. সমাজ বিপ্ল­ব টিকিয়ে রাখতে হলে যোগ্য মানুষ দরকার : যেকোনো দেশে সমাজ বিপ্লব সাধন করার চেয়ে বিপ্লব টিকে রাখা কঠিন। দুনিয়ার অনেক দেশে বিপ্ল­ব সাধনের পরও তা যোগ্য লোকের অভাবে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। মাওলানা ইসলাহী এই প্রসঙ্গে রুশ বিপ্লবের উদাহরণ দিয়ে লেখেন, ‘রূশ বিপ্ল­ব শেষ হওয়ার পর যাদের হাতে ক্ষমতা আসে তারা মোটেই জানত না যে নিজেদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপনা কিভাবে চালাতে হবে। ফল হলো এই যে, আগুন ও রক্তের হোলি খেলা করে তারা যে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন করেছে তা নিজেরাও সামলাতে পারলনা। বরং তা সামলানোর জন্য সেই লোকদের ওপর ন্যস্ত করতে হলো যাদের কাছ থেকে তা ছিনিয়ে আনা হয়েছিল। এই গ্রুপটি জনতার হট্টগোলে প্রভাবিত হয়ে এই নতুন মতবাদের সামনে মাথানত করে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু নিজেদের মনের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ঘৃণা ও শত্রুতা লুকিয়ে রেখেছিল। এ কারণে তারা এই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে সম্পূর্ণরূপে মোনাফেকি পন্থায় ব্যবহার করেছিল এবং তাদের হাতে এই সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্ল­বের সেই পরিণতি হলো- যা কোনো বিপ্ল­বকে মোনাফেকি পন্থায় অবলম্বনকারীদের হাতে হয়ে থাকে।’২০

৫. যোগ্যতা ছাড়া কিছুই করা যায় না:  যে কোনো কাজ করতে যোগ্যতার দরকার হয়। ছোট খাটো কোনো কাজও যোগ্যতা অর্জন ছাড়া করা যায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে নামাজের ইমামতির জন্য ব্যক্তিকে কিছু যোগ্যতার অধিকারী হতে হয়; ইসলামী খেলাফত পরিচালনার জন্য খলিফার কিছু মৌলিক যোগ্যতা থাকতে হয়। বিচার করার জন্য বিচারকের কিছু মৌলিক যোগ্যতা থাকা অপরিহার্য। ফতোয়া দেওয়ার জন্য মুফতির যোগ্যতা থাকা দরকার।২১ ইসলামের মৌলিক বিষয়ে ইজতিহাদ করার জন্য ইজতিহাদ করার মত যোগ্যতা থাকতে হয়। অনুরূপভাবে সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সংশ্লি­ষ্ট যোগ্যতা থাকতে হয়। ডাক্তারি করার যোগ্যতা ছাড়া প্রেসক্রিপশন দেওয়া যায় না; প্রকৌশলী হওয়া ছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং করা যায় না। সাংবাদিকতার যোগ্যতা ছাড়া সংবাদপত্রে কাজ করা যায় না। প্রশাসনিক যোগ্যতা ছাড়া প্রশাসন এবং সাংগঠনিক যোগ্যতা ছাড়া সংগঠন চালানো যায় না। এইভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় সকল কাজের জন্য যোগ্যতা ও দক্ষতার দরকার হয়। 

একটি গল্প : এক মসজিদের ইমাম সাহেব অনুপস্থিত থাকায় উপস্থিত মুসল্লিরা তাদের মধ্যে লম্বা জামা গায়ে দেওয়া একজনকে জোর করে ইমাম নিযুক্ত করেন। তিনি প্রথম রাকাতে সূরা নাস পড়ে সেজদায় গিয়ে ভাবেন দ্বিতীয় রাকাতে কী পড়বেন। তাই মুসল্লিদেরকে সেজদায় রেখে বাজারে চলে যান। মুসল্লি­রা দীর্ঘক্ষণ সেজদায় পড়ে থাকে। জনৈক মুসল্লি মাথা একটু উঁচু করে দেখেন ইমাম সাহেব নাই। এরপর সকলের মধ্যে হইচই পড়ে যায়। সবাই ইমাম এর সন্ধানে বের হন। অবশেষে তাকে বাজারে পাওয়া আয়। তাকে প্রশ্ন করা হয় আপনি মুসল্লিদেরকে সেজদায় রেখে চলে আসলেন কেন? তিনি জবাব দেন ‘আমি বলেছিলাম আমার যোগ্যতা নেই। তোমরা জোর করে আমাকে ইমাম বানিয়েছো। আমি প্রথম রাকাতেই সূরা নাস পড়ে ফেলি। দ্বিতীয় রাকাতে কী পড়বো তা খুঁজে পাইনি বলেই তোমাদেরকে সেজদায় রেখে পালিয়ে এসেছি।’

এই গল্প থেকে জানা গেল যে যোগ্যতা না থাকার কারণেই তার  পক্ষে ইমামতি করা সম্ভব হয়নি। এটি একটি গল্প হলেও এ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। প্রথম শিক্ষা হচ্ছে: কাউকে কোনো দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার ঐ দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা আছে কি না তা দেখতে হয়। দ্বিতীয়ত, দায়িত্ব পালনের যে ধরনের যোগ্যতা থাকা দরকার তা না থাকলে ঐ ধরনের দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয়। 

৬. অযোগ্য লোকের হাতে কিছু নিরাপদ নয়: ইমামতির যোগ্যতা ছাড়া কেউ নামাজ পড়ালে নামাজ নষ্ট হয়; ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা ছাড়া শরিয়তের কোনো বিষয়ে মতামত দিলে সঠিক ফতোয়া পাওয়া যায় না। ডাক্তারির যোগ্যতা ছাড়া চিকিৎসা করলে রোগীর জীবন বিপন্ন হয়। ড্রাইভিং-এর যোগ্যতা ছাড়া গাড়ি চালালে যাত্রীদের জীবন নষ্ট হয়। অনুরূপভাবে সমাজ পরিচালনার যোগ্যতা ছাড়া সমাজের নেতৃত্ব কারো উপর অর্পিত হলে মানুষের দুঃখ দুর্দশা বাড়ে; তার পক্ষে সঠিকভাবে সমাজ পরিচালনা সম্ভব হয় না।

একটি বাস্তব উদাহরণ : পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে ‘একটি বাসের ড্রাইভারের পরিবর্তে হেলপার গাড়ি চালিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। ফলে গাড়িটি একটি গাছের সাথে ধাক্কা লেগে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। এতে অনেক প্রাণহানি হয়; প্রচুর আহত হয়।’ এই দুর্ঘটনার কারণ কি? নিশ্চয়ই সবাই বলবেন চালকের অযোগ্যতা। বাংলাদেশে অযোগ্য ড্রাইভারের কারণে প্রতিনিয়ত এই ধরনের অনেক সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। অনুরূপভাবে সমাজ পরিচালকদের অযোগ্যতার কারণে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

আরেকটি উদাহরণ : একটি কম্পিউটারে ভাইরাস দেখা দেওয়ার পর কম্পিউটার সম্পর্কে ধারণা নেই এমন একজন ব্যক্তি কম্পিউটারের বিভিন্ন পার্টস খুলে ভাইরাস চেক করতে আরম্ভ করে। কম্পিউটারের ভাইরাস কিভাবে সারতে হয় তার সেই জ্ঞান না থাকার ফলে কম্পিউটার খুলে পুরো কম্পিউটারই নষ্ট করে ফেলে। এর কারণ কী? নিশ্চয়ই সবাই বলবেন দক্ষতা ছাড়া কম্পিউটার ঠিক করতে চেষ্টা করায় কম্পিউটার নষ্ট হয়েছে। 

৭. অযোগ্য ব্যক্তিকে ভালোবাসা যায় কিন্তু দায়িত্ব দেওয়া যায় না : একজন শিশু নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার যোগ্যতা নাই বলেই অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে; তাকে সবাই ভালোবাসে কিন্তু কেউ কোনো দায়িত্ব দেয় না। অনুরূপভাবে একজন সৎ ব্যক্তিকে সবাই শ্রদ্ধা করে; ভক্তি করে; ভালোবাসে। কিন্তু সমাজ পরিচালনার যোগ্যতা ছাড়া সামাজিক দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতে চায় না। এই জন্য দেখা যায় অনেক কবি, সাহিত্যিক, খেলোয়াড়, শিল্পী, মসজিদের ইমামকে সবাই ভালোবাসেন কিন্তু নির্বাচনে দাঁড়ালে ভোট দেয় না। কয়েক কোটি ভক্ত আছে এমন ব্যক্তিরা ভোটে দাঁড়িয়ে কয়েক হাজার ভোট পাওয়ার ইতিহাস এই কথারই সাক্ষ্য বহন করে। ভালোবাসা ও দায়িত্ব দেওয়া এক কথা নয়।

৮. দায়িত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ খোঁজা হয়: অযোগ্য ব্যক্তিকে কেউ কোনো দায়িত্ব দিতে চায় না। ঘরের ইলেক্ট্রনিক কোনো কিছু নষ্ট হলে মেকারের কাছে নেওয়া হয়। ঘর নির্মাণ, পেইন্টিং, আসবাবপত্র তৈরির জন্য সংশ্লি­ষ্ট যোগ্যতা আছে এমন ব্যক্তিকে খোঁজা হয়। কারো যদি ফুলের বাগান থাকে বাগান পরিচর্যা করার উপযুক্ত ব্যক্তিকেই মালী নিয়োগ করা হয়।২২

উপরি উক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, যেকোনো দায়িত্ব পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা থাকা অপরিহার্য। এই কারণে চাকরির বিজ্ঞাপনে চাকরি প্রার্থীদের কী ধরনের যোগ্যতা থাকা দরকার তার উল্লে­খ থাকে। প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকলে চাকরির আবেদনও করা যায় না। আর স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক কারণে অযোগ্য লোককে চাকরি দিলে কোম্পানিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

(Endnotes)

সমাজের সব মানুষের মেধা ও যোগ্যতা সমান নয়।

Jonathon Petry.2004. The Daily delegraph. 26. March, 1page.

মাওলনা মওদূদী (রহ) এই বিষয়টি ইসলামী আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি বইতে চমৎকারভাবে আলোচনা করেছেন।

প্রাগুক্ত

হারুনুর রশীদ. ২০০৪. তথ্যসন্ত্রাস বাংলাদেশের অবস্থা. সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা. ১৫ মার্চ-২১ মার্চ. লন্ডন , পৃ-২১

এর কারণ মুসলিম তরুণ সমাজের কাছে স্পষ্ট।

এজন্য এই সময়কে বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদানের সোনালি যুগ বলা হয়।

এর ফলে মুসলিম তরুণ সমাজ তাদের অতীত গৌরবজনক ইতিহাস জানে না। তারা মনে করে পাশ্চাত্যই জ্ঞান বিজ্ঞানের জনক।

Bord of researchers 1996.  Muslim Contribution to Science and Tecnology. Dhaka: Islamic Foundation Bangladesh. p111.

১০ রাযী মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ৬০টি গ্রন্থ রচনা করেন।

১১ ওবায়দুল্লাহ.আ.জ.ম .২০০২. বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান.ডায়েরি ২০০২. ঢাকা : বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

১২ তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে কিতাব আল হিন্দ

১৩ আ.জম. ওবায়েদুল্লাহ এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেন

১৪ বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান 

১৫ প্রাগুক্ত 

১৬ উল্লে­খ্য অনেকেই মনে করেন দ্বীনি ইলম তথা কুরআন হাদিস পড়াই উপকারী ইলম। আর সাধারণ বিষয়াদি পড়াতে সাওয়াব নেই। বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়। হ্যাঁ, সহীহ নিয়তে কুরআন পড়া সাওয়াবের কাজ। কুরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতে কমছে কম দশ নেকি আছে। অন্য বিষয়াদির শুধু শাব্দিক উচ্চারণে সাওয়াব নেই। কিন্তু এ কথা মনে রাখতে হবে কেউ যদি অসত উদ্দেশ্যে কুরআন শেখে তাহলে সে সাওয়াব পাবে না। অনুরূপভাবে কেউ যদি দ্বীনের প্রয়োজন পূরণের জন্য সাধারণ বিষয়াদি পড়াশুনা করে সেও সাওয়াব পাবে। তাই আমাদেরকে দ্বীন এর প্রয়োজনে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যেই। জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় পারদর্শী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।।

১৭ (সূরা আত তাকাসুর-৮)।

১৮ ইসলাহী. আমিন আহসান. ১৯৯২. দাওয়াতে দীন ও তার কর্মপন্থা, অনুবাদ: মুহাম্মদ মূসা. ঢাকা: আধুনিক প্রকাশনী. পৃ- ৫৩

১৯ মাওলানা রুমী পৃ- ১৪

২০ ইসলাহী. পৃ-৫২

২১ যে কেউ যে কোনো বিষয়ে ফতোয়া দিতে পারে না।

২২ এই বিষয়ে মাওলানা মওদূদী (রহ) তাঁর ভাঙ্গা ও গড়া বইতে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির