post

যেখানেই ছাত্র, ইসলামের আহ্বান পৌঁছানোর লক্ষ্যে সেখানেই আমরা

রাজিবুর রহমান

০৮ মার্চ ২০২২

মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বানের কাজ বা দায়িত্ব সরাসরি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নির্দেশিত। বিশ্বাসীদের জন্য দাওয়াতি কাজের গুরুত্ব বোঝা ও তদনুযায়ী কাজ করার জন্য একটি আয়াতই যথেষ্ট হতে পারে। “তোমরা আল্লাহর দিকে মানুষকে হিকমাহ ও সুন্দরতম উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করবে, আর বিতর্ক করবে উত্তম পন্থায়”। (সূরা নাহল : ১২৫)

এখানে আল্লাহ তায়ালা দাওয়াতি কাজের মৌলিক তিনটি উসুল বা মূলনীতি আমাদের জানিয়েছেন। এই তিনটি মূলনীতির মধ্যেই রয়েছে দাওয়াতি কাজের সকল কৌশল ও পদ্ধতি।

হিকমাহ : ক্ল্যাসিক্যাল আরবিতে হিকমা অর্থ শত্রুতাকে বন্ধুত্ব দ্বারা জয় করা। সরল বাংলা অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা, পাণ্ডিত্য, দূরদর্শিতা। দাওয়াতি কাজে হিকমাহ বলতে দায়ীদের এমন কিছু বিশেষ গুণ ও দক্ষতা বোঝায় যা দিয়ে মানুষকে ইসলামের প্রতি সহজে আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ করা যায়।

সুন্দরতম উপদেশ : দায়ী আচরণে ও কথায় আন্তরিকতা ও শুভাকাক্সক্ষা স্পষ্ট হবে। কেবল যুক্তি প্রমাণ নয় আবেগ ও ভালোবাসা দিয়ে সত্য দ্বীনের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে নিরেট কল্যাণ কামনা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আপনি তার সামনে হাজির হননি। রাসূল সা. বলেছেন, দ্বীনের দাওয়াত সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, বিতশ্রদ্ধ করো না।

উত্তম পন্থায় বিতর্ক : কেবল মাত্র যুক্তিতর্কে জয়লাভের বিতর্ক নয়, হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ন্যায়সঙ্গত পন্থায় সত্য উপস্থাপন করতে হবে। প্রতিপক্ষের বা যার কাছে পৌঁছাতে চান তার কথা মনোযোগের সাথে শুনতে হবে এবং যৌক্তিক জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। উত্তর প্রদানকালে কখনোই গোঁজামিলের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে বিনয়ের সাথে সময় চেয়ে নিতে হবে। সতর্কতার সাথে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। কূটতর্কের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপনাকে থামানোর জন্য উদ্ভট প্রশ্ন করছে, এমন মনে হবে অবশ্যই এমন বিতর্ক পরিত্যাগ করতে হবে।

ছাত্রদের মাঝে দাওয়াত পৌঁছানোর গুরুত্ব

আল্লাহর দেয়া বিধানের আলোকে একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে আমাদের সামগ্রিক তৎপরতা। আমাদের কাজ কী? এককথায় বলতে গেলে সমাজের সর্বত্র সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালানো। সমাজের সামগ্রিক অধঃপতনের মূলীভূত কারণ হলো অসৎ নেতৃত্ব। আজকের ছাত্রই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব। সর্বক্ষেত্রে অসৎ নেতৃত্ব উৎখাত করে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আজকের ছাত্রদেরই আগামী দিনের নেতৃত্বের জন্য তৈরি করতে হবে। ছাত্রদের গড়ে তোলার জন্য প্রাথমিক কাজ হলো ব্যাপকভিত্তিক দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ করা। ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব, ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব, তথপ্রযুক্তি আসক্তি, ড্রাগ-আসক্তিসহ নানা কারণে ছাত্রসমাজের বৃহত্তর অংশ নৈতিক অধঃপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। কার্টুন ও গেমস আসক্তির ফলে শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা কঠিন হচ্ছে। কার্টুনের চরিত্রই তাদের আদর্শে পরিণত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাপকভিত্তিক দাওয়াতি কাজের বিকল্প নেই।

ছাত্র-অঙ্গনে দাওয়াতের ক্ষেত্র

দাওয়াতি কাজ মুমিনজীবনের মিশন। যেখানেই সুযোগ তৈরি হয়, সেখানেই দ্বীনের দাওয়াত প্রচারের কাজে মুমিন ব্যস্ত হয়ে যায়। যে সমাজে আমাদের বাস, যে ব্যক্তিদের সাথে আমাদের উঠাবসা-চলাফেরা সেই মানুষেরাই আমাদের দাওয়াতের ক্ষেত্র। বিশেষভাবে ছাত্র-অঙ্গনে দাওয়াত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নি¤েœাক্ত ক্ষেত্রেবিশেষ লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরিকল্পিতভাবে দাওয়াতি কাজ করা যায়।

১) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো ছাত্র-অঙ্গনে দাওয়াতি কাজের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। এখানে পরিকল্পিতভাবে দাওয়াতি কাজ করতে পারলে কম সময়ে অধিক সংখ্যক ছাত্রকে দাওয়াতের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। ক্লাস শুরুর আগে, ক্লাসের শেষে এবং বিশেষভাবে টিফিন পিরিয়ডে পরিকল্পিত ও টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কাজ করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে বিভিন্ন দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা যায়। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় খুব বেশি সংখ্যক ছাত্রের মাঝে দাওয়াত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত দাওয়াতি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নিয়মিত কিছু দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা গেলে বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে দাওয়াতের আওতায় আনা সম্ভব হবে। বিভিন্ন খেলাধুলা আয়োজন, সাধারণ জ্ঞান প্রতিযোগিতা, কুইজ প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন, বইপাঠ প্রতিযোগিতা, চা-চক্র, সাধারণসভা প্রভৃতি দাওয়াতি প্রোগ্রাম আয়োজন করা যেতে পারে।

২) খেলার মাঠ : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ছাত্রদের পছন্দের স্থান হলো খেলার মাঠ। প্রভাবশালী ও নেতৃত্বের গুণাবলিসম্পন্ন ছাত্রদের খেলার মাঠে বেশি পাওয়া যায়। ক্রমধারা অবলম্বন করে দাওয়াত পৌঁছানোর পূর্বে টার্গেটেড ছাত্রদের সাথে সম্প্রীতি স্থাপন করতে হয়। সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য খেলাধুলা নিঃসন্দেহে চমৎকার উপায়। ‘যত মাঠ তত টিম’ কর্মসূচির আওতায় সকল খেলার মাঠে দাওয়াত সম্প্রসারণে চেষ্টা চালানো প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে স্পোর্টিং ক্লাব গঠন করে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যায়।

৩) মসজিদ : মসজিদ দাওয়াতি কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সহজ ক্ষেত্র। মসজিদে আসা ছাত্ররা ইসলামী অনুশাসন মানার আগ্রহ নিয়েই নিয়মিত মসজিদে আসে। নামাজি এই ছাত্রদের ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আগ্রহী করা তুলনামূলক সহজ। নামাজের আগে-পরে পরিকল্পিতভাবে যোগাযোগ করে দাওয়াত পৌঁছানোর চেষ্টা করা যায়। মসজিদের পাঠাগার তৈরি, নিয়মিত হাদিস পাঠ ও দারসুল কুরআন বা দারসুল হাদিসের আসর আয়োজন করতে পারলে দাওয়াতি কাজে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

৪) পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী : তোমরা যারা ঈমান এনেছো, নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে আগুন থেকে রক্ষা করো। (সূরা তাহরিম : ৬) স্বজন-পরিজনদের মাঝে দাওয়াতি কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নির্দেশনা। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে আমরা অনেক সময় ব্যয় করি। তাদের মাঝে দাওয়াতি কাজের অনুভূতি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই দাওয়াতি কাজ করা যায়। পরিবার আত্মীয়-প্রতিবেশী সবার মাঝেই আমরা দাওয়াতি কাজ করবো। বিশেষত পরবর্তী প্রজন্মের দিকে বিশেষ দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন। আমাদের সহোদর ছোট ভাই ও ছোট বোন, চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুপাতো ছোট ভাইগণ, প্রতিবেশীদের মাঝেও আমাদের ছোট অনেক শিক্ষার্থী আছে। এদের সবার সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং সবার ওপরই আমাদের পজিটিভ প্রভাব অনেক বেশি। সচেতনতার সাথে একটু প্রচেষ্টা চালালে পরবর্তী প্রজন্মকে গড়ে তোলা সম্ভব।

৫) অনলাইন : তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে শিক্ষার্থীদের অনলাইনে সময় ব্যয়ে আগ্রহ ও প্রয়োজন বাড়ছে দিনে দিনে। শিক্ষার বিষয়বস্তুর ডিজিটালাইজেশন এবং বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য লাভে সহজতা অন্যতম কারণ বলে মনে হয়। এর বাইরে শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক সময় ব্যয় করে থাকে। যুগের প্রয়োজনকে সামনে রেখে অনলাইনে সামগ্রিক দাওয়াতি তৎপরতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্ট প্রস্তুত, প্রস্তুতকৃত কন্টেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো দরকার। এর বাইরে অনলাইন ছাত্রদের সাথে পরিচয় হয়ে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সম্প্রীতি স্থাপন ও ক্রমধারা অবলম্বন করেও নিয়মিত দাওয়াতি কাজ করা প্রয়োজন।

এসব ক্ষেত্র ছাড়াও আমরা সর্বত্রই দাওয়াতি কাজ করতে চাই। যেখানেই ছাত্র, ইসলামের আহ্বান পৌঁছানোর লক্ষ্যে সেখানেই আমরা। লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির