post

রক্তপিচ্ছিল পথ বেয়ে ৪৬ বছর

মঞ্জুরুল ইসলাম

০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

স্বাধীনতা পরবতীসময়ে শাসকগোষ্ঠীর সীমাহীন নির্যাতন-নিপীড়ন-শোষণে পুরো দেশ শোচনীয় পরিস্থিতিতে উপনীত হয়। রাজনৈতিক কার্যকলাপ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দকে জেলের অন্ধকার কুঠুরীতে নিক্ষেপ করে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। সর্বত্র হত্যা ও ত্রাসের রাজত্ব করা হয়। সমস্ত পত্র-পত্রিকা বন্ধ ঘোষণা করে বাকশাল গঠন করা হয় এবং সেখানে যোগ দেওয়ার জন্য আমলা, সাংবাদিক, স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীবৃন্দ, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিদের উপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল। নৈতিক সাহস ও মানবিক মূল্যবোধ বাংলাদেশে সর্বপ্রকারের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছিল। সবখানে আতঙ্ক আর উদ্বেগ। গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের অবস্থাও দুর্দশার শেষ প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছিল। একদিকে অভাব, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নির্মম দারিদ্র্য, অন্নের জন্য হাহাকার; অপরদিকে উদ্ধত স্বৈরাচারের উলঙ্গ আস্ফালন এবং বিলাসিতা মানবতাকে লাঞ্চনার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। জাতির এই সংকটকালীন পরিস্থিতি হতে মুক্তি লাভের অল্প দিনের মধ্যেই ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ঈমানদ্বীপ্ত একদল জিন্দাদিল মর্দে মুজাহিদের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয়েছিল তাওহীদের ঝান্ডাবাহি কাফেলা, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের। সেই হতে শহীদি কাফেলার পথ চলা শুরু। গুটি গুটি পায়ে বাল্য কৈশোর পেরিয়ে আজ ৪৬ বছরের টগবগে যুবকে পরিণত হয়েছে প্রিয় সংগঠনটি। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য সৎ ও যোগ্য লোক তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিলো না। ছিলো না দেশ পরিচালনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য। ছাত্ররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ হলেও তাদেরকে দেশগঠনের উপযোগী করে তোলার কোনো পথ তখন ছিলো না। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠা ছিলো তৎকালীন সময়ের এক অনিবার্য দাবি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এ ধরনের একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনিবার্য করে তোলে। এমতাবস্থায় দেশগঠনের জন্য সৎ, যোগ্য, মেধাবী, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের বিকাশ এবং ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের মহান ও পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমার সূচনা। 

প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাহাড়সম ষড়যন্ত্র, জুলুম নির্যাতন ও নানামুখী অপপ্রচারের শিকার হয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। কোনো আদর্শবাদী দল ষড়যন্ত্র, নির্মম নির্যাতন ও ঘৃণ্য অপপ্রচারে সাময়িক অসুবিধায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে এর যাত্রা অব্যাহত থাকে মঞ্জিলের দিকে। ছাত্রশিবিরকে তার যাত্রাপথে এ পর্যন্ত হাজারও বাধা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে। ছাত্রশিবির যখন দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আদর্শিক সৌন্দর্যের মাধ্যমে দেশের জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে চলছিল ঠিক তখনই আদর্শিক লড়াইয়ে পরাজিতরা ঘৃণ্য পথে শিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর নানামুখী নির্যাতন চালিয়ে তাদের বুলন্দ আওয়াজকে স্তিমিত করতে উদ্যত হয়। যখন খুন, গুম ও নির্যাতন করে এর গতি পথ শ্লথ করা যাচ্ছে না ঠিক তখন অপপ্রচারকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে অবলম্বন করে নিয়েছে পরাজিতরা। শিবিরকে বলা হয়েছে চেতনায় রাজাকার, রগকাটা, মৌলবাদী, অনাধুনিক ও স্বাধীনতাবিরোধী, সন্ত্রাসী, নাশকতাকারী ইত্যাদি! এসব অপপ্রচার চালাতে গণমাধ্যম ও প্রশাসনকে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে সরকার ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ছাত্রশিবিরের দুর্দমনীয় উত্থানে ভীত হয়ে ছাত্রশিবিরের নিরপরাধ নেতাকর্মীদেরকে নাশকতার অভিযোগে অহরহ গ্রেফতার করে বোমা নাটক, অস্ত্র উদ্ধার নাটক সাজানো হয়েছে, যা ইতিহাসের এক জঘন্যতম মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। এমন অপপ্রচার অভিযুক্ত দলের পক্ষে প্রচারের সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কারণ এমন ঘটনা যখন সাজানো হয় তখন ভুক্তভোগীদের আদর্শিক দৃঢ়তা আরও বেড়ে যায়, তারা তাদের যাত্রাপথে এগিয়ে যেতে আরও তীব্র শক্তি অনুভব করে। যারা এমন হটটক নিউজ পায় তারা উৎসুকের সাথে এমন খবরের আসল সত্য জানতে চেষ্টা করে, এ ক্ষেত্রে যুবকরাই উৎসুক হয়ে থাকে বেশি। শিবিরের বিরুদ্ধে প্রচারিত ঘৃণ্য ঘটনার অন্তরালে ডুবে আসল সত্য জানতে গিয়ে উৎসুকরা নিজেরা ছাত্রশিবিরের সমর্থক হয়ে যায়, তারা বুঝতে পারে এমন অসত্য প্রচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আর যারা অসত্য ঘটনাকে রঙ রস মিশিয়ে প্রচার করার কাজে ব্যস্ত তারাও জানে এটি মিথ্যা, এ কাজ করা তাদের জন্য ঠিক নয়। কিন্তু তাদের বিবেকবোধ লোপ পেয়েছে, তাই তারা মিথ্যাকে সত্যের প্রলেপে প্রচার চালাতে মোটেও দ্বিধা বোধ করে না। এসব মিথ্যা অভিযোগে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা মোকদ্দমায় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে। শহীদ করা হয়েছে সংগঠনের প্রথম দুই কেন্দ্রীয় সভাপতি মীর কাসেম আলী ও কামারুজ্জামানসহ শত শত নেতাকর্মীকে। ছাত্রশিবির কর্মীদেরকে গ্রেফতার করতে গিয়ে অসংখ্য সন্দেহভাজন সাধারণ ছাত্রকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা কখনোই ছাত্রশিবিরের সাথে যুক্ত ছিল না। তারা মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করে। সময়ের ব্যবধানে ভিন্নমতের ছাত্ররাও ছাত্রশিবির সম্পর্কে অবগত হয় এবং অনেকে শিবিরে যোগ দিতেও দেখা গেছে। আলহামদুলিল্লাহ! ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে বাতিল শক্তি যে সকল অভিযোগ এনেছে তা বারবার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শত শত সাথীর লাশ কাঁধে নিয়ে, নির্যাতন নিপীড়নের স্টিম রোলারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আদর্শের প্রতি অবিচল আস্থার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে কাফেলাটি। শত ষড়যন্ত্র, বিরামহীন প্রোপাগান্ডা আর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মাঝেও বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্বের বুকে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা বিরল।

শিক্ষা নিয়ে এখন জাফর ইকবাল গংদের ষড়যন্ত্র জাতির সামনে পরিষ্কার। জাতিকে কখনো নাস্তিক্যবাদের দিকে ধাবিত করার অপচেষ্টা কখনোবা মুশরিকি পৌত্তলিকতার পথে পরিচালিত করার ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রতিবাদে সব সময় সরব ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রশিবির। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার শিক্ষাব্যবস্থায় নানারকম নিপীড়ণ চালিয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে অনৈসলামিক উপাদানের অন্তর্ভুক্তিকরণ, দেরিতে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, দলীয়করণ, ইতিহাস বিকৃতি ও জাতিকে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ ধুয়া তুলে বিভক্ত করার গভীর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে শিবির সবসময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে। মিছিল, মিটিং, ছাত্রধর্মঘট, সমাবেশ বিক্ষোভ, ঘেরাও, লিফলেট, প্রচারপত্র বিতরণ ইত্যাদি কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে শিক্ষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে ভূমিকা পালন করেছে এ সংগঠন। বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা বরাবরই অবহেলিত। সাধারণ প্রতিষ্ঠান ও মাদরাসার মধ্যে বিরাট ব্যবধান করে রাখা হয়েছে সবসময়। শিবির তার জন্মলগ্ন থেকেই মাদরাসা শিক্ষার এ বৈষম্য দূর করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিবছর এর ধারাবাহিতা অক্ষুন্ন রয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সমৃদ্ধ প্রকাশনা বিভাগ আধুনিক রুচিসম্মত এবং সামাজিক চাহিদানির্ভর বিভিন্ন প্রকাশনা সামগ্রী প্রকাশ করে সৃজনশীল প্রকাশনায় অনন্য ভূমিকা পালন করছে। তথ্যবহুল দাওয়াতি কার্যক্রম, উপহার আদান-প্রদান এবং সুস্থ বিনোদন চর্চায় শিবিরের প্রকাশনা সামগ্রী অনন্য। এই প্রকাশনা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে- নববর্ষের চার প্রকারের তথ্যবহুল, গবেষণালব্ধ ও বৈচিত্র্যময় ক্যালেন্ডার; চার প্রকার ডায়েরি; বিভিন্ন বিষয়ে বহু রকমের কার্ড, ভিউকার্ড, স্টিকার, মনোগ্রাম, চাবির রিং ইত্যাদি প্রকাশনা সামগ্রী ছাত্রসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে একটি অকৃত্রিম সৌন্দর্যের প্রতীক। শিবিরের ক্যালেন্ডার, ডায়েরি দেশ ও বিদেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। বিজ্ঞানসামগ্রী প্রকাশনায়ও ছাত্রশিবির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিয়মিতভাবে। দেশে বিজ্ঞানশিক্ষার পশ্চাৎপদতা দূর করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ করেছে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিদ্যার ওপর রেফারেন্স বই ও চার্ট পেপার। এ বইগুলো এসএসসি/দাখিল, এইচএসসি/আলিম ও ডিগ্রির প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অনন্য ও অপরিহার্য শিক্ষাসহযোগী উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ, প্রয়োজন এবং একাডেমিক শিক্ষার যথার্থ তথ্য উপকরণ দিয়েই এই Understanding Science Series প্রকাশিত হয়েছে। অপসং-স্কৃতির সয়লাব থেকে ছাত্র ও যুবসমাজকে রক্ষা করে তাদেরকে ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে হলেও প্রয়োজন পরিশীলিত সংস্কৃতির আয়োজন। এ প্রয়োজনীয়তা থেকে সাহিত্য ও সাং-স্কৃতিক অঙ্গনে ছাত্রশিবিরের রয়েছে জোরালো পদচারণা। একটি দেশের রাজনৈতিক বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। এ দেশে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে শিবিরের রয়েছে নিজস্ব সাহিত্য সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।