রথচাইল্ড ফ্যামিলি ইহুদিদের ক্ষমতাধর উৎস । কৃষিবিদ মো: রাকিব হাসান

রথচাইল্ড ফ্যামিলি ইহুদিদের ক্ষমতাধর উৎস । কৃষিবিদ মো: রাকিব হাসানইসরাইল বিশ্বের চতুর্থ শক্তিশালী দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিশেষ করে পররাষ্ট্রনীতিতে ইহুদি লবি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে বলে ধারণা করা হয়। ইহুদি লবির প্রধান কাজ হচ্ছে ইসরাইলের তথা ইহুদিদের সর্বাধিক স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করা। আর এই স্বার্থের জন্য যে পরিবারটি কাজ করে যাচ্ছে তা হল সেই রথচাইল্ড পরিবার।
সারা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি পরিবার- রথ চাইল্ড ফ্যামিলি। মেয়ার আমসেল রথ চাইল্ড নামের ইহুদি ও তার পাঁচ ছেলে মিলে এই পরিবার প্রতিষ্ঠা করেন। আমেরিকান ডলার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পাউন্ড-নোট ছাপানো, বিতরণ, বিলি সব কিছুর নিয়ন্ত্রণ এই পরিবারের হাতেই রয়েছে। এই পরিবারই ১৭৬০ সালে বিশ্বের প্রথম আধুনিক ব্যাকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। দুনিয়ার সকল ব্যাংক এই রথ চাইল্ড ব্যাংকের কাছে নির্ভরশীল। কারণ, পৃথিবীর রিজার্ভ স্বর্ণের বেশির ভাগ দখল তাদের হাতে। এই জন্য রথচাইল্ড ব্যাংককে বলা হয় ‘ব্যাংক অব দ্য ব্যাংকস, দ্য গভর্নমেন্ট অভ দ্য গভর্নমেন্টস।’

রথচাইল্ড পরিবারের ইতিহাস

রথচাইল্ড পরিবারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই পরিবারের প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি মায়ার আমসেল বাউয়ার। ১৭৪৪ সালে এক জার্মান ইহুদি পরিবারে তার জন্ম হয়। তার বাবার নাম ছিল মোজেস আমসেল বাউয়ার। বাবা পেশায় ছিলেন একজন মহাজনী ব্যবসায়ী ও স্বর্ণালঙ্কার। ছোটবেলা থেকেই ছেলেকে সুদি ব্যবসা শিক্ষা দিতে শুরু করেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মায়ারের ব্যবসার হাতেখড়ি হয় বাবা মোজেসের জার্মানির ফ্রাংকফুর্টে ইহুদি স্ট্রিটের দোকানে। ১৭৫৫ সালে মারা যান মোজেস। এরপর হ্যানোভারের একটি ব্যাংকে কাজ শুরু করেন মায়ার। অসাধারণ কৌশল আর মেধা কাজে লাগিয়ে অল্প সময়েই হয়ে যান প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র পার্টনার। পরে আবার ফ্রাংকফুর্টে ফিরে বাবার ব্যবসা পুনরায় কিনে নিয়ে নিজের নাম বদলে রাখেন রথচাইল্ড। যা এখন মানুষ রথচাইল্ড ফ্যামিলি নামে চেনে। ব্যস, সেই থেকে শুরু। আর পেছনে ফিরতে হয়নি মায়ার রথচাইল্ডকে।
হ্যানোভারে কাজ করার সময় ইউরোপের প্রায় প্রতিটি রাজপরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। ওপেনহাইমারে কাজ করার সময় মায়ার রথচাইল্ডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে জেনারেল ভন এস্টর্ফের সাথে। জেনারেল ভন ছিলে জার্মানির প্রিন্স উইলিয়ামের ঘনিষ্ঠজন। উইলিয়ামের বিরল মেডেল ও কয়েন সংগ্রহের বাতিক আছে জেনে মায়ার বেশ কিছু বিরল মেডেল ও কয়েন দিয়ে উইলিয়ামের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। এভাবেই মায়ার কিছু দিনের মধ্যেই ইউরোপের প্রায় প্রতিটি প্রাসাদ ও রাজকীয় পরিবারের সাথে ব্যবসা শুরু করে। তবে তার সবথেকে ঘনিষ্ঠ প্রশ্রয়দাতা ছিলেন উইলিয়াম।
উইলিয়াম এর কারবার ছিল ইউরোপের বিভিন্ন রাজকীয় পরিবারকে যুদ্ধে সৈন্য সরবরাহ করা। উইলিয়াম ছিল বিশাল ধনসম্পদের মালিক। সেই আড়াইশ বছর আগে তার সম্পদ ছিল প্রায় ২০ কোটি। হঠাৎ কোন এক কারণে উইলিয়ামকে ডেনমার্ক পালিয়ে যেতে হয়। তখন তিনি রথচাইল্ডকে দিয়ে যান ৬০ হাজার পাউন্ড, যার তৎকালীন মূল্যমান প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। বুদ্ধিমান মায়ার রথচাইল্ড ওই ৬০ হাজার পাউন্ড দিয়ে তার চার ছেলেকে ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে পাঠিয়ে দেয় মার্চেন্ট ব্যাংক খুলতে। এভাবে শুরু হয় রথচাইল্ড পরিবারের সমগ্র ইউরোপকে ব্যাংকের মাধ্যমে কিনে রাখা। ১৭৬০ সালে সারা বিশ্বে প্রথম আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তন করে এই মায়ের রথচাইল্ড ও তার ৫ ছেলে। আর এখানে সার্থকতা পায় ‘রথ চাইল্ড ফ্যামিলি’।
ইউরোপের সর্বত্র ব্যাংকিং বা সোজা ভাষায় ঋণ ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য আনে রথ চাইল্ডের চার ছেলে। ইউরোপের ঐ সময়কার সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহরগুলো ছিল নেপলস (ইতালি), প্যারিস (ফ্রান্স), ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া) ও লন্ডন (ইংল্যান্ড)। আর মায়ার রথচাইল্ড তার এক ছেলেকে রেখে দেয় ফ্রাংকফুর্টে তার অন্যান্য ব্যবসা দেখভালের জন্য। এই ৫টি শহর থেকে ইউরোপের সমস্ত রাজকীয় পরিবারের সাথে রথচাইল্ডরা ব্যবসা গড়ে তোলে। রথচাইল্ডরা বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাদেরকে উচ্চ সুদে ঋণ, বন্ড ইত্যাদি দিত।

ইহুদিবাদকে সমগ্র দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা করতে রথচাইল্ড পরিবারের রহস্যময় ভূমিকা

১. ইউরোপের পাঁচটি শহরের রাজপরিবারের সাথে রথচাইল্ড পরিবার ব্যবসা শুরু করে। উপায়টি খুব সোজা। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে। রথচাইল্ড পরিবার দুই পক্ষের রাজাকেই চড়া সুদে ঋণ, বন্ড ইত্যাদি দিবে এবং যেই পক্ষই হারুক বা জিতুক সেই ঋণ শোধ করতে হবে। শোধ করতে না পারলে জমি জমা, ধন সম্পদ বন্ধক রেখে আরো উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। কি অভিনব ব্যবসা! এখানেই তারিফ করতে হয় রথচাইল্ড ফ্যামিলির। যুদ্ধে যেই রাজাই জিতুক না কেন, তা নিয়ে রথচাইল্ডের মাথা ব্যথা নেই। কারণ টাকাতো তাদের পরিবারের হাতেই আসবে।
উইলিয়ামের দিয়ে যাওয়া ওই তিন মিলিয়ন ডলারের ব্যাপারটাও মজার। ব্রিটিশ সাজের জেনারেল হেস, উইলিয়ামকে ওই টাকা দেন তার সৈন্যদের বেতন হিসাবে। যেটা প্রিন্স উইলিয়াম মেরে দেয় এবং পরে উইলিয়ামের থেকে ওই টাকাটা মেরে দেয় মায়ার রথচাইল্ড। মায়ার ওই টাকার একটা অংশ দিয়ে তার বড় ছেলে নাথান রথচাইল্ডকে লন্ডনে পাঠায় ব্যবসা করতে।
নাথান লন্ডনে গিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে সোনা কিনে এবং নাথান লর্ড ওয়েলিংটনের সাথে ব্যবসায় চার ধাপে বিপুল লাভ করে। আর এদিকে নেপোলিয়নের ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্য ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের লড়াই তখন তুঙ্গে। নেপোলিয়ন হুমকি দিচ্ছে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের ভিত্তি ভেঙে দিবে। যেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ছিল রথচাইল্ড ফ্যামিলির ব্যাংকিং ব্যবসা। কিন্তু এ নিয়ে রথচাইল্ডদের কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। কিছুদিন পরে দেখা গেল ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ জাহাজগুলো পরস্পরের নৌ ও অন্যান্য ব্যবসার পথ আটকে রেখেছে। তখন কেবল একটা কোম্পানি যাতায়াত করছে। তাহল রথচাইল্ড ফ্যামিলির। হ্যাঁ ঠিকই ভাবছে দুই পক্ষেরই অর্থের জোগানদাতা রথচাইল্ড পরিবার। লন্ডনে নাথান রথচাইল্ড ও প্যারিসে জেকব রথচাইল্ড।
২. আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক একটি ব্যাংক, যারা ডলার ছাপায়, আমেরিকানদের থেকে ট্যাক্স সংগ্রহ করে এবং সেই ট্যাক্সের টাকাই সরকারকে ধার দেয় দেশ চালানোর জন্য। আর এই ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কিন্তু একটি বেসরকারি ব্যাংক। এটি কে চালায় জানেন? এই ইহুদি রথচাইল্ড পরিবার। এরা যদি একবার চায়, তাহলে ডলারের মানের পতন ঘটিয়ে পুরো আমেরিকার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিতে পারে। ঠিক অনুরূপ ব্রিটিশ পাউন্ডের ক্ষেত্রেও। এই কারণেই কোন ব্রিটিশ বা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ইহুদিদের ঘাঁটাতে সাহস পায় না।
৩. এই পরিবারই ঠিক করে দেয় আমেরিকার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবে। ২য় বিশ্বযুদ্ধে হলোকাস্ট ঘটিয়ে ইহুদিদের জন্য ইসরাইলরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পেছনেও রথচাইল্ড পরিবারের বড় ভূমিকা আছে। আমেরিকাকে ব্যবহার করে অবৈধ ইসরাইলরাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার পেছনেও এরা কলকাঠি নাড়ায়। কেউ জানে না এই পরিবারের কী পরিমাণ সম্পত্তি অর্থ রয়েছে। সেই ১৭৬০ সাল থেকেই এই পরিবার কঠোর গোপনীয়তা আর বংশের নিয়ম কানুন মেনে আসছে। মেয়ার রথ চাইল্ডের মারা যাওয়ার আগে উইলে স্পষ্ট করে উল্লেখ করে গিয়েছিলেন যে, তাদের ব্যবসা কোনোভাবেই পরিবারের বাইরে যাবে না ও পরিবারের বড় ছেলেই হবে ব্যবসার প্রধান। বংশের রক্তের বিশুদ্ধতার জন্য বাইরের কাউকে বিয়ে করা যাবে না, তাদের বিয়ে হবে শুধুমাত্র কাজিনদের মধ্যে। পরিবারের যারা ব্যবসার সাথে সরাসরি জড়িত থাকবে না, তারাও ব্যবসার লাভের একটা ভাগ পেতে থাকবে।
৪. আড়াইশ বছর ধরে তাদের পারিবারিক এই নিয়ম একইভাবে চলে আসছে। এঁদের টার্গেট হলো, বিশ্বের অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে ধীরে ধীরে সকল ধর্মকে ধ্বংস করে ইজরাইলকেন্দ্রিক একমাত্র বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার মাধমে প্রতিষ্ঠিত করবে সেই প্রাচীন কিংডম অব হেভেন। অনেকে এটাকে পড়হংঢ়রৎধপু ঃযবড়ৎু বলে, আবার অনেকে এটা সত্য বলেও মেনে নেয়। ফ্রেন্স রেভুলেশন, ওয়াটার লু যুদ্ধ, ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ তৈরি- সব কিছুর পেছনেই এই পরিবারের হাত রয়েছে।
৫. ১৯১৯ সালের ২৯ মার্চ বলশেভিক বিপ্লব বিষয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যম টাইমস অব লন্ডন এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বলশেভিক বিপ্লবের ব্যাপারে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপারটি হচ্ছে- এর নেতাদের একটি বিরাট অংশই রুশ নয়। বিপ্লবের মূলে ভূমিকা রাখা ২০ থেকে ৩০ নেতার মধ্যে ইহুদির হার ৭৫ ভাগের কম হবে না। ভøাদিমির লেনিন নিজেও ইহুদি।’ তবে পরে নাকি রুশদের সঙ্গে আর মিলে থাকা সম্ভব হয়নি রথচাইল্ডের। কারণ বিপ্লবের সময় কথা ছিল, কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না সরকার। পরে সে কথা রাখেনি বলশেভিক সরকার।
৬. ইসরাইলরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে রথচাইল্ডের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইসরাইলকে যাতে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয় সে জন্য ৩৩তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হেনরি এস ট্রুম্যানকে ২০ লাখ ডলার দিয়েছিল তারা। নির্বাচনী প্রচারণা তহবিলের নামে দেয়া হয়েছিল ওই অর্থ। পরে যুক্তরাষ্ট্রই ইসরাইলকে প্রথম স্বীকৃতি দেয়। চীনের মাও সে তুংয়ের বিপ্লবেও অর্থ দিয়েছিল রথচাইল্ড!
৭. উনিশ শতকের শুরুর দিক থেকেই মূলত ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি আর রাজনীতির নিয়ন্তা হয়ে ওঠে রথচাইল্ড। ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতা হন এই পরিবারের লিওনেল রথচাইল্ড। মিসরের সুয়েজ খাল নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্রিটিশ সরকারকে রাজি করাতে পারেন তিনি। আর এ জন্য যুক্তরাজ্যকে ৪০ লাখ পাউন্ড ঋণদানেও সমর্থ হন। তখন থেকে রাজনীতিও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিতে শুরু করে এই পরিবার।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পরিবার

পৃথিবীতে সব থেকে ধনী ব্যক্তি কে? বিল গেটস? ওয়ারেন বাফেট? নাকি ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ? প্রতি বছর ফোর্বস ম্যাগাজিন এ নিয়ে তালিক প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের তালিকায় প্রথম স্থানে আছে Amazon এর সিইও জেফ বেজোস। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১১২ বিলিয়ন ডলার। সেই তালিকায় যথাক্রমে বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট এরা। কিন্তু একটি নাম নেই সেই তালিকায়। একটি নাম বললে ভুল হবে আসলে। বলতে হবে একটি পরিবারের নাম। পরিবারটির নাম রথচাইল্ড।
বলা হয়ে থাকে, পৃথিবী সমগ্র সম্পদের চার ভাগের তিন ভাগ অংশের মালিকানা নাকি এই পরিবারটির হাতে। বিশ্বের ধনীদের তালিকায় এই পরিবারের কারোর নাম নেই কারণ বাইরের কেউ জানেই না এই পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ কী। একমাত্র পরিবারের লোকেরাই বলতে পারে তারা মোট কতটুকু সম্পদের অধিকারী। রথচাইল্ড পরিবার বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য পরিবার হওয়ার পাশাপাশি সম্ভবত সবচেয়ে রহস্যময় পরিবারও বটে।

ইউরোপের অর্থনীতি রথচাইল্ড পরিবারের  হাতে এলো যেভাবে

ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ সাম্রাজ্য তখন মুখোমুখি। ওয়াটার লুতে দুই পক্ষ সমগ্র শক্তি নিয়োগ করে যুদ্ধ করছে। যুদ্ধের ফলাফলের উপর নির্ভর করছে কে নিয়ন্ত্রণ করবে পৃথিবীজুড়ে (ভারতের খনিজ, কাপড়, মসলা; বার্মার রুবি; আফ্রিকার সোনা ও ডায়মন্ড; তেল, তুলা, দাস ব্যবসা ইত্যাদি) অর্থনীতি। রথচাইল্ড যুদ্ধের দুইপক্ষেরই অর্থ জোগান দিচ্ছে, নানা রকম খবর সংগ্রহ করছে, যুদ্ধের প্রতিদিনের ফল লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বন্ড এর দাম ওঠা নামা করাচ্ছে। যুদ্ধও একটা ব্যবসা যেটা আমরা অনেকেই বুঝি না। এখন থেকে না, বহু আগে থেকেই যুদ্ধ এক ধরনের ব্যবসা।
জুন ১৫, ১৮১৫ রথচাইল্ডের স্পাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ খবর নিয়ে এলো নাথানের কাছে, খবরে চোখ বুলিয়ে নাথান দ্রুত ফিরে গেলেন লন্ডনে। পরদিন সকালে নির্বিকারভাবে বিক্রি করতে শুরু করলেন ব্রিটিশ বন্ড। স্টক এক্সচেঞ্জে মহামারী লেগে গেলো। অনেকে মনে করল রথচাইল্ড নিশ্চয় কিছু একটা জানে, ব্রিটিশরা হেরে গেছে।
অল্প সময়ের ভিতরে পানির দামে সব বিক্রি হয়ে গেলো। এইবার, এক্সচেঞ্জ বন্ধ হওয়ার একটু আগে রথচাইল্ডের নির্দেশে তার সমস্ত লোক চুপ চাপ পানির চেয়েও কম দামে সমস্ত কন্সাল কিনে নিলো। নাথানের লন্ডন ফেরার ২০ ঘণ্টা পরে জানা গেলো ব্রিটিশদের জয়ের কথা। একদিনেই নাথানের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে গেলো ২০ গুণ। নাথান রথচাইল্ডের হাত দিয়ে প্রথমে ব্রিটিশ অর্থনীতি ও পরে সমগ্র ইউরোপের অর্থনীতি চলে এলো একটি মাত্র পরিবারের হাতে।
ব্রিটিশদের হাতে ভালো রকম মার খাওয়ার পরে ফ্রেঞ্চ অর্থনীতি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ফ্রেঞ্চ সরকার ধার করতে শুরু করে ব্যাংকের কাছ থেকে। সরকারি বন্ড বিক্রি ও টাকা সংগ্রহের কাজে রথচাইল্ডের প্যারিস ব্রাঞ্চকে ইচ্ছে করেই বাইরে রাখে তারা। আভিজাত্যের অহমিকায় অভ্যস্ত ফ্রেঞ্চ এরিস্টোক্রেটরা রাস্তার ক্ষাত রথাচাইল্ডদের পাত্তা দিতে চায়নি। হয়ত শত্রুপক্ষের অর্থ জোগানের ইস্যুটাও ছিলো।
এরিস্টোক্রেটদের মন জোগাতে রথচাইল্ডরা অভিজাত পার্টি, উপহার, শিল্পকলার কেনাকাটা ইত্যাদি করেও যখন পাত্তা পাচ্ছিলো না তখন একটা খেলা খেললো। ১৮১৮ সালের অক্টোবরে তারা দ্রুত কিনে নিতে শুরু করলো ওউভ্রার্ড আর বেয়ারিং ব্রাদার্সের সরকারি বন্ড। ফলে বন্ডের দাম বেড়ে গেলো বহুগুণে। এরপর হঠাৎ করেই ৫ই নভেম্বর ১৮১৮তে তারা একসাথে সব বন্ড বাজারে ডাম্প করাতে ফ্রেঞ্চ অর্থনীতির বারোটা বেজে গেলো। এইবার ফ্রেঞ্চ রাজা বাধ্য হলেন রথচাইল্ডদের কাছে মাথানত করতে। পৃথিবীর দুটো প্রধান অর্থনীতি, ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ, চলে গেলো হাউজ অফ রথচাইল্ডের হাতের মুঠোয়।
ইউরোপের তথাকথিত মোনার্কি বা রাজপরিবারগুলো কেবল নামেই স্বাধীন রইলো। অর্থনৈতিক সমস্ত নিয়ন্ত্রণ মোটামুটি নিয়ে নিলো রথচাইল্ড ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো। এরাই ঠিক করে দিতে লাগলো কে ক্ষমতায় থাকবে আর কে ক্ষমতায় থাকবে না। পলিটিকস, যুদ্ধ, শান্তি, রাজতন্ত্র, কমিউনিজম সবই আসলে নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু করলো যার হাতে টাকা অর্থাৎ রথচাইল্ড ও তাদের এলাইদের হাতে।

রথচাইল্ড পরিবারের সম্মানস্বরূপ
১. পৃথিবীর একমাত্র ট্রিলিয়নিয়ার ফ্যামিলি এই রথচাইল্ড ফ্যামিলি। বিশ্বের ক্ষমতাবান এই পরিবারের সদস্যদের সম্মানার্থে ১৫৩টি পতঙ্গ, ৫৮টি পাখি, ১৮টি স্তন্যপায়ী, ১৫টি উদ্ভিদ ও ২টি সরীসৃপের বৈজ্ঞানিক নামকরণ করা হয়েছে বলে বলা হয়। যেমন- প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম Ornithoptera Rothschildi
২. ইসরাইলের বিভিন্ন রাস্তাঘাটের নাম এই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে রাখা।
সেই ১৭৬০ থেকে এই পরিবারটি কঠোর গোপনীয়তা ও নিয়মকানুনের কারণে আজও টিকে আছে প্রভাবের সাথে। প্রতিষ্ঠাতা মায়ার রথচাইল্ড মারা যাওয়ার আগে উইলে স্পষ্ট উল্লেখ করে গেছেন যে, তাদের ব্যবসা কোনোভাবেই পরিবারের বাইরে যাবে না ও পরিবারের বড় ছেলেই হবে ব্যবসার প্রধান। এমনকি বংশের বিশুদ্ধতা রক্ষা করতে তাদের পরিবারের কোনো সদস্যের বিয়ে পরিবারের বাইরে দেয়না বলে শোনা যায়। বর্তমানে পরিবারটি ঠিক কি পরিমাণ সম্পদের মালিক তা কেউ জানে না। আর পরিবারের সদস্যদের নামে সরাসরি ব্যবসার পরিমাণ কম। তারা বিভিন্ন কোম্পানির নামে সারা বিশ্বে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং ব্যবসা, তেল ব্যবসা, টুরিস্ট বিজনেসসহ আরো অনেক ব্যবসার মালিক তারা। বলা হয় অনেক রাষ্ট্রীয় ব্যাংকও তাদের কাছে জিম্মি। তাদের পরিবারের ক্ষমতা এতটাই যে, বলা হয় কখনো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধলে এই পরিবারের ইন্ধনে বাধবে। এবং এর থেকে ফায়দা লুটবে রথচাইল্ড পরিবার।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply