রমাদান জীবন পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ -ড. কামরুল হাসান

পরিবর্তন মানবের সহজাত। অনিবার্য জীবনাংশ। সদা, সতত, প্রতিনিয়ত পরিবর্তনই জীবনকে অর্থবহ করে তুলবার অন্যতম নিয়ামক শক্তি। জীব ও জড়ের মাঝে পার্থক্য যেমনই হোক তাদের পরিবর্তন ও নতুন আঙ্গিক নিত্য ঘটনা। জড় বস্তুতে পরিবর্তন খুবই লক্ষণীয়। একটি ইমারতের শুরু থেকে নির্মাণ শেষাবধি কত ধরনের পরিবর্তন আমরা দেখি। স্থাপনার অবকাঠামো, প্রাচীর বেষ্টনী, আন্তঃসজ্জা ও বহিঃসজ্জা আরো কত কিছু। সৌন্দর্যে এক সময় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। কল্পনাতীত সৌন্দর্য ধারণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ঐ স্থাপনা। তবুও যেন তার পরিবর্তন আকাক্সক্ষা শেষ হয় না। চাই আরো পরিবর্তন, আরো সজ্জায়ন, পুনঃপরিবর্তন। প্রকৃতিতেও চলে পরিবর্তনের একই ধারা। যদিও তা বছরের সাথে তাল রেখে চলে প্রতিনিয়ত। গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা। তারপরেই শরৎ-হেমন্ত। এরপর আসে হাড় কাঁপানো শীতের আমেজ ও আবহ। প্রকৃতিতে শুষ্কতার ছোঁয়া। সবুজের আকাল, শ্যামলিমার খরা। তারপরে আর বেশি অপেক্ষা নয়। ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা। ক্রমশ সবুজাভ হতে থাকে প্রকৃতি। শ্যামল পত্র-পল্লব আর ঘন সবুজের দখলে চলে যায় প্রকৃতির সকল আয়োজন। এভাবেই শেষ হয় একটি বছর। পরিসমাপ্তি ঘটে প্রকৃতির এক বছর জীবনের সমুদয় কার্যক্রমের।

খরা আর কালবোশেখি দিয়ে শুরু করে শেষ হয় বসন্তের আনন্দ আমেজে। মানুষের জীবনেও এর ব্যতিক্রম বড় বেশি নেই। পরিবর্তন মানব জীবনের নিত্য সাথী। পরিবর্তন হতে পারে ইতিবাচক আবার তা হতে পারে নেতিবাচক। ইতিবাচক পরিবর্তনই কাম্য। অর্থাৎ উৎকর্ষ মানব জীবনই কাক্সিক্ষত। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে সম্মানীয় রূপে। সৃষ্টি জগতের মাঝে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা তার শক্তি, সাহস, আকার, আয়তন, বুদ্ধি, জ্ঞান এসব কারণে নয়। কারণ যদি শক্তির কথা বিবেচনা করি তাহলে সিংহ, ভল্লুক, অশ^সহ অনেক প্রাণীর নাম করা যাবে যারা মানুষ অপেক্ষা শক্তিমান। আর যদি সাহসের কথা বলি তবে বাঘ, ঘোড়া, উট প্রভৃতির নাম করা যায়। হাতি, তিমি, ডলফিনসহ আরো কত জানা-অজানা প্রাণী রয়েছে যারা আকারে মানুষের থেকে অতিকায়। আবার জ্ঞান-বুদ্ধিতেও মানুষ অন্য সকল প্রাণী অপেক্ষা মর্যাদাপ্রাপ্ত তাও সর্বদা জোর করে বলা যায় না। আবহাওয়া বার্তার বিষয়টি ভাবুন। আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে আমরা কিছুই বলতে পারতাম না। দীর্ঘদিনের চেষ্টা, প্রচেষ্টা, সাধনা, শ্রম বিনিয়োগের পরে এখন কিছুটা ধারণা করতে পারি। ঝড় বৃষ্টির পূর্বাভাস সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জ্ঞান পাবার চেষ্টা করি। তাও পূর্ণ বিশুদ্ধ বা নিশ্চিত নয়।

অথচ বাবুই পাখি সে বেশ আগে থেকেই বুঝতে পারে এ বছরের ঝড়-ঝাপ্টা কোনদিক হতে আক্রমণ করবে। সে চিন্তা মাথায় রেখে সে তার বাসা নির্মাণের সময় তার ঘরের মুখ নির্মাণ করে ঝড়ের উল্টো দিকে। আবার তার বাসার নির্মাণ খেয়াল করুন। কত উন্নত প্রকৌশল চিন্তা রয়েছে সেখানে। কোনো মানুষের দ্বারা কি এমন বুনন কৌশলে নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব? আমরা মনে করি অবশ্যই না! তাহলে মানুষের মর্যাদা কিসে? এ প্রশ্নের যে- কোনো উত্তরে খণ্ডিত মতবিরোধ থাকতে পারে। তবে স্বীকার্য যে, মূলত মানুষের মর্যাদা তার আত্মিক উৎকর্ষতায়, বোধ ও বিবেচনার উন্নয়নে, মননকে সর্বদা আল্লাহমুখী করার প্রয়াসে। যিনি সর্বদা কাজ করেন সচেতনতার সাথে, মন ও মগজকে ব্যাপৃত রাখেন আল্লাহর চিন্তায়, লালন করেন উন্নত বোধ ও বিবেচনার, আত্মা ও মননকে ব্যস্ত-সমস্ত রাখেন উৎকর্ষ চিন্তায় তিনিই আল্লাহ সচেতন। তিনিই প্রকৃত মানুষ। আর তিনিই হলেন আশরাফুল মাখলুকাত। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত এখানেই। জীবনকে উন্নত করতে পরিবর্তনের বিকল্প নেই। একটি ইতিবাচক পরিবর্তন চাই উৎকর্ষ জীবনের জন্য, বিশ^াসী মনের সযত্ন পরিচর্যার জন্য। চাই তা বারবার। প্রয়োজন যতবার পরিবর্তন চাই ততবার। তবে উৎকর্ষতাকে নিয়মিত ও সঠিক মাত্রার পরিচর্যার জন্য বার্ষিক একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা। এটির প্রয়োজন প্রাকৃতিক। তাই এর ব্যবস্থাও হওয়া চাই প্রাকৃতিকভাবে। মানুষের ¯্রষ্টা সর্বদা মানুষের কল্যাণপ্রত্যাশী। তাই মহান রাব্বুল আলামিন সে ধরনের ব্যবস্থা রাখবেন সেটিই প্রত্যাশিত। সৃষ্টি পরিকল্পনায় আল্লাহর বিধানের প্রতি দৃকপাত করলে এবং অল্প অনুধ্যানেই স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ মানুষের আত্মিক উৎকর্ষে, তার জীবন মানের কাক্সিক্ষত পরিবর্তনে যুৎসই ও অনন্য কর্মসূচির ব্যবস্থা রেখেছেন মানুষের জন্য। এই কর্মসূচির টাইম ফ্রেম অনেকটা দীর্ঘ, কায়িক বিবেচনায় কষ্টসাধ্যও। খুবই উপাদেয় ও ফলপ্রসূ কর্মসূচি। এই অনন্য কর্মসূচি আর কিছু নয় পবিত্র মাহে রমাদান। অর্থাৎ রমাদান মাসই আমাদের জীবনে আনে ইতিবাচক পরিবর্তনের মহাসুযোগ। কাক্সিক্ষত মাহেন্দ্র সুযোগ। জীবন উৎকর্ষতার প্রয়োজনে- সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের অবারিত ফুরসত। একজন নিষ্ঠাবান মানুষ চাইলেই রমাদানের কর্মসূচিকে স্বাগত জানিয়ে, ঐকান্তিকতার সাথে এগিয়ে গেলে উৎকর্ষতা প্রাপ্তি তার অনিবার্য।

হেদায়াতের সন্ধান সুনিশ্চিত। উভ-জাগতিক সফলতা তার পদচুম্বনে বাধ্য। চাই শুধু আল্লাহ সচেতন হওয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও এ শর্তারোপ করেছেন আল-কুরআনুল কারিমে। তিনি বলেছেন- লায়াল্লাকুম তাত্তাকুন অর্থাৎ রমাদানের কর্মসূচি থেকে উপাদেয় ফল লাভ করবেন কেবল তারাই যারা অতিমাত্রায় আল্লাহ সচেতন। ০২: ১৮১; আল্লাহর দেয়া এ তত্ত্ব নিছক কোনো দাবি নয়। বরং এটি ঐতিহাসিক সত্য। যুগ-যুগান্তরের ইতিহাস এ সাক্ষ্য দেয় যে, সকল যুগেই মানুষের নৈতিক উৎকর্ষতায় অব্যর্থ মহৌষধ হিসেবে কাজ করেছে রমাদানের কর্মসূচি। এ যেন উৎকর্ষ নৈতিকতার অব্যর্থ দাওয়াই। সে জন্যই সকল যুগের আল্লাহ-পাগল মানুষদের জন্য রমাদানের কর্মসূচি ছিল বাধ্যতামূলক। কারণ, এ কর্মসূচিতেই রয়েছে মানবীয় ও ধর্মীয় শিক্ষণ ও পদ্ধতির রিনিউ ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ আল্লাহ প্রবর্তিত শরিয়ত ব্যবস্থাপনার আর যত অনুষঙ্গ রয়েছে সে সবের ঝালাই তথা পুনঃ পরিষ্কারকরণ ব্যবস্থাপনা। ইতঃপূর্বে আল্লাহ সচেতন (মুত্তাকি) বান্দারা যত আমল করত সে সবের পুনঃ নিয়মিতকরণের মোক্ষম সুযোগ এনে দেয় রমাদান। তাই আমরা রমাদানের প্রশিক্ষণের সূচির সাথে সেনাবাহিনীর শীতকালীন মহড়ার তুলনা করতে পারে। বিষয়টি এমন- একজন সেনাবাহিনীতে রিক্রুট হবার পর কেন্দ্রীয়ভাবে তার একটা মেয়াদি প্রশিক্ষণ হয়। এরপর সে সেনাবাহিনীর নিয়মিত সদস্য হিসেবে দেশ রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখে। কিন্তু প্রতি বছরই সেনাবাহিনীর শীতকালীন মহড়া হয়ে থাকে। এ মহড়ায় সেনা সদস্যদের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক। কারণ দেশ রক্ষা ও আত্মরক্ষার নয়া নয়া কৌশল, শত্রুর মোকাবিলা ও যুদ্ধ প্রতিরোধে সক্ষমতা তৈরির জন্য এ অপরিহার্য বিষয়। নিয়মিত বার্ষিক প্রশিক্ষণ ব্যতীত যে-কোনো সেনাসদস্যই বাহিনী থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য। তেমনি রমাদানও নৈতিক উৎকর্ষ ও আত্মিক পরিশুদ্ধির বার্ষিক প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম।

এ প্রশিক্ষণে তার পুরনো সকল আমলের যাচাই-বাছাই-উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। সাথে সাথে ব্যক্তির আমল আখলাকেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। পুরো মাসের লাগাতার প্রশিক্ষণ তার অভ্যাসে পরিণত হবে। তার মাঝে নতুন ব্যক্তিত্বের বিকাশ হবে। আমল আখলাকে আরো স্বচ্ছতার জন্ম নিবে। ইবাদাতসমূহ আরো ঐকান্তিক, একাগ্র এবং আল্লাহর রাহে নিবেদিত হবে। জীবন মানের পরিবর্তনের শুভসূচনা হবে এই রমাদানে। রমাদান হবে প্রত্যেক বিশ^াসী অন্তরের পরিবর্তনের শুভলগ্ন। ১৪৪২ হিজরির এই রমাদানে আমাদের জন্য কাক্সিক্ষত পরিবর্তনগুলো কী হতে পারে? আমরা সে বিষয়ে আলোচনার পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিতে চাই- আর কোনো ভুল নয়, আর কোনো দেরি নয় এবারের রমাদানই আমার জীবনে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। জীবনকে রাঙিয়ে দেবে ইসলামের রঙে। এ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আমাকে নিতেই হবে। আল্লাহ বলেন- “আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে নিজেরাই।” ১৩: ১১; তাই পূর্বজীবনে মিশে থাকা ভ্রান্তি, ভ্রষ্টতা, অস্পষ্টতাকে পরিবর্তন করে স্বচ্ছ, স্পষ্ট, নিখাদ, নির্ভেজাল হেদায়াতের আলোতে জীবন ভরে তুলবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।
জীবন পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ এনে দিয়েছে রমাদান। এবারের রমাদান এসেছে আমাদের জীবনে অফুরন্ত সৌভাগ্যের সওগাত নিয়ে। আমাদের ভাগ্য অত্যন্ত সুপ্রসন্ন বলেই আমরা পেয়েছি মহিমান্বিত রমাদান। তাই উপেক্ষা বা অবহেলা নয় পুরোমাত্রায় কাজে লাগাই এবারের রমাদান। সতর্কতার সাথে লক্ষ রাখি নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে-

আমলকে অভ্যাসে পরিণত করুন
আমলকে প্রিয়তর ও প্রবৃদ্ধি করবার মাস রমাদান। বেশি বেশি আমল করবার মাসও এটি। দীর্ঘ ও ধারাবাহিক নেক আমলের সূতিকাগার হিসেবে রমাদানের বিকল্প নেই। ২৯-৩০ দিন লাগাতার ইফতার, সাহরি, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আমল নিয়মিত করবার সুযোগ এনে দেয় এ পবিত্র মাস। মনোবিজ্ঞানীদের ভাষ্য থেকে জানা যায়- কোনো কাজ ছয় থেকে একুশ দিন নিয়মিত করলে তা মনের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে যায় এবং তা অভ্যাসে পরিণত হয়। ফলে রমাদানের আমলসমূহ অভ্যাসে পরিণত করা অতীব সহজ। যে অভ্যাস আপনাকে নিয়ে যাবে আখিরাতের অনাবিল সাফল্যের শীর্ষে। কাজেই জীবনসূচি পরিবর্তন করুন এখনই। সকল নেক আমলকে অভ্যাসে পরিণত করার মাধ্যমে।

পরিবর্তনকে স্থায়ী করুন
রমাদান চায় জীবনের আমূল পরিবর্তন। ইতিবাচক পরিবর্তন। আপনি ইবাদাতকে অভ্যাস বানিয়েছেন। এবার তা স্থায়ী করুন। কোনো ভালো অভ্যাসই বর্জন নয়। রমাদানে শয়তানের বন্দিত্বের সুযোগ নিন। প্রতিটি সময়কে বরকতময় করুন। রমাদান পরবর্তী সময়েও শয়তানকে হতাশার নিগড়ে বেঁধে ফেলুন। আপনার পরিবর্তিত অভ্যাসকে স্থায়ী করুন। দেখবেন সফলতার হাতছানি কেবল আপনারই প্রতি।

রমাদানের আবেগ কাজে লাগান অন্য এগারো মাস
এ মাসে দিনের বেলায় আমরা অনেক বৈধ কাজ থেকে বিরত থাকি সন্তুষ্ট চিত্তে। শারীরিক ও জৈবিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ করি। ঝগড়া-ফাসাদ, কটু-কথা থেকে দূরে থাকি। ‘আমি রোজাদার’ এ চেতনা ও অভিব্যক্তিই আমার ঢাল হিসেবে কাজ করে। মানস পরিবর্তনের সত্যিই এ এক মোক্ষম সুযোগ। রমাদানের এ নির্মল আবেগ যদি আমি কাজে লাগাতে পারি বছরের অন্যান্য মাসেও তবেই পরিণত হতে পারব আমি একজন পরিবর্তিত উৎকর্ষ মানুষে। আসুন রমাদানের এ আবেগ সবাই কাজে লাগাই। সুন্দর পৃথিবী নির্মাণের এক একজন স্বপ্নপুরুষ হিসেবে কাজ করি।

সহজতর ইবাদাতে শুদ্ধ করি আপন মানস
রমাদানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মেয়াদ টানা ২৯-৩০ দিন। এ নেহাত কম সময় নয়। যেকোনো মনো-অসুস্থতার নিরাময়ে ফলপ্রদ হতে পারে। রমাদান ইবাদাতে ফিরিয়ে আনে শৃঙ্খলা। একই ইবাদাত, একসাথে, অনেক মানুষ আনন্দে সম্পন্ন করে। সত্যিই এ আল্লাহর অতি বড় নিয়ামত ও বরকত। তাই অন্য মাসের তুলনায় এ মাসে ইবাদাত করা অনেক সহজতর। সুতরাং সহজতর ইবাদাতের প্রাধিক্যে নিজেকে শুধরিয়ে নিন আপনিও। আত্মশুদ্ধ ব্যক্তির কাতারে নিজেকে শামিল করুন। বদলে ফেলুন নিজেকে রমাদানের বরকতে।

রমাদানের মর্যাদা ও পুরস্কার লাভে ধন্য হোন
রমাদানের সিয়ামব্রত বান্দার উপর চাপানো কষ্টকর কোনো বিধান নয়। ঐকান্তিকতা ও সচেতনতার সাথে সিয়াম পালনকারী আল্লাহর দরবারে মর্যাদা সিক্ত ও মহাপুরস্কারে অভিনন্দিত। এ মর্যাদা, সম্মান ও অভিনন্দন কেবলই রোজাদারের জন্য, অন্য কারো নয়। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন- ‘রোজা কেবলই আমার জন্য আমিই এর প্রতিদান দিব’। এ অপেক্ষা বেশি মর্যাদা আর কী হতে পারে?
অবগাহন করুন স্রােতের অনুকূলে,
হারিয়ে যান নেক ইবাদাতে
রমাদানের ইবাদাত সত্যিই আনন্দঘন। আমরা ইফতার করি সমভিব্যাহারে। সাহরি খাই একসাথে। তারাবিহতে যোগ দিই উৎসবমুখর পরিবেশে। কুরআন পাঠের প্রতিযোগিতা করি আনন্দের সাথে। যে যত পারি দান করি উদার হস্তে। ইবাদাতের এত আনন্দ পাওয়া যাবে আর কোন মাসে? তাই আসুন সতর্ক হই কল্যাণের এ মৌসুম যেন হাতছাড়া হয়ে না যায়। বছরের লাভজনক এ দিনগুলো যেন জীবন থেকে ফস্কে না যায়।
পরিবারের চেহারা পাল্টিয়ে দিতে, সমাজের বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনা চেঞ্জ করতে, রাষ্ট্রের গতি কল্যাণমুখী করতে সর্বোপরি নিজের নৈতিক উৎকর্ষের জন্য পরিবর্তনের রাস্তায় এগোতে হবে। আমাদের সম্মান ও মর্যাদার স্মারক রচনা করতে পরিবর্তনের সূচনা করতেই হবে। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা যদি হয় রমাদানে তবে সম্মানের পরিমাণ যাবে আরো বেড়ে। তাই পরিবর্তনের প্রস্তুতি স্বরূপ খেয়াল রাখুন রমাদান কারিমে। পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত একান্ত আপনার।

ঈমান, আকিদা সর্বদা গতিশীল, চলমান, স্থবির কিছু নয়। তাই উৎকর্ষতার নিমিত্তে আপনার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আপনাকে পৌঁছে দিবে শ্রেষ্ঠত্বের স্বর্ণ শিখরে। নতুবা শয়তান আপনাকে নিচুতার দিকে ধাবিত করবে অনায়াসে। পরিবর্তনের পথে আপনার দৃঢ় সিদ্ধান্ত রমাদানের প্রত্যাশিত। তার মানে আপনি হয় পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎকর্ষের শীর্ষে পৌঁছবেন, নতুবা ভ্রষ্টতার অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হবেন। অর্থাৎ- “আর যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব।” ২৯: ৬৯; আল্লাহর রাসূল সা. বলেন- ধ্বংস তার জন্য যে রমাদান পেয়েছে কিন্তু নিজেকে ক্ষমাযোগ্য করতে পারেনি।
হতে পারে এই রমাদান আপনার, আমার জীবনের শেষ রমাদান। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- আল্লাহ আমাদের কল্যাণ পিয়াসী বলেই আমরা রমাদান পেয়েছি। নতুবা তিনি আমাদেরকে রমাদান দিবেন কেন? তাই কালক্ষেপণ নয়; নয় কোনো মন্থরতা। পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এখনই। বদলে দিই জীবনকে, সমাজকে, বিশ^ব্যবস্থাকে। আলো ঝলমল হোক প্রতিটি প্রহর, বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চল।
রমাদানপ্রেমিক বন্ধুরা!
-আশাবাদী হোন, হতাশা ঝেড়ে ফেলুন।
-ইতিবাচক হোন।
-ভেঙে ফেলুন তমসার শিকল।
-হেদায়েতের আলোয় সমুজ্জ্বল করুন সমাজ।
-আত্মশুদ্ধির হিমেল পরশে মানসকে করুন ¯স্নিগ্ধ।
-রমাদানের নির্মল বরকতে বিশ্বাসী অন্তর হয়ে উঠুক আরো প্রোজ্জ্বল, আলোকময়।
-অতীব কল্যাণময়।
-রমাদানের কল্যাণাভা মূর্ত হোক বিশ্বের প্রতিটি প্রাণে।
ওয়ামা তাওফিকি ইল্লাহ বিল্লাহ্।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

SHARE

Leave a Reply