রমাদান পরবর্তী এগারো মাসে করণীয় -মুহাদ্দিস ডক্টর এনামুল হক

রমাদানের পরে আরবি বর্ষপঞ্জির দশম মাস শাওয়াল। এটি হজের তিন মাস তথা শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের মধ্যে প্রথম মাস। এ মাসের প্রথম তারিখে রমাদানের বা ঈদুল ফিতর এবং সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। রমাদান-উত্তর ঈদুল ফিতর, সাদাকাতুল ফিতর, হজের সংশ্লিষ্টতাসহ এ মাসটি তার অবস্থান ও মর্যাদার কারণে ইসলামী জীবনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রমাদানে মাসব্যাপী যারা সিয়াম সাধনা করেছেন তাদের জন্য এ মাসে বাড়তি সুসংবাদ রয়েছে। তা হলো শাওয়াল মাসের ৬টি সিয়াম। সহীহ হাদিসে এসেছে, আবু আইয়ুব আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে নর-নারী রমাদান মাসে সিয়াম পালন করলো, তারপর শাওয়াল মাসে ছয় দিন সিয়াম পালন করলো, সে যেন সারা বছর সিয়াম পালন করলো। (মুসলিম-২৮১৫, তিরমিজি-৭৫৯)।
ভালো ও মন্দ কর্মের প্রতিদান প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে ব্যক্তি একটি সৎকাজ করবে, তাকে দশগুণ প্রতিদান দেয়া হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একটি পাপ করবে, তাকে শুধু এক পাপের সমান বদলা দেয়া হবে। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না।” (সূরা আনআম : ১৬০) উক্ত আয়াতে প্রত্যেক সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যদিও তা সর্বনিম্ন পরিমাণ। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কৃপায় আরো বেশি দিতে পারেন।
দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা ফরজ। কোনো বান্দা এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা তাকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের বিনিময় দান করার অঙ্গীকার করেছেন। আনাস ইবন মালিক রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন, আমার ওপর দিনরাত পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়েছে। এরপর আমি মূসা (আ)-এর কাছে ফিরে এলাম। তিনি আমাকে বললেন, তোমার প্রতিপালক তোমার উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত! তিনি বললেন, তোমার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যাও এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করো। শেষে আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে মুহাম্মাদ! যাও দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হলো। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত তথা দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। (বুখারি-৩৪২, ১৫৫৫, ৩০৩৫, ৩১৬৪, ৭০৭৯, মুসলিম-৪২৯, ৪৩৩)
হাদিসে এসেছে, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেক নেক আমলের প্রতিদান দশগুণ হতে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। (মুসলিম-২৭৬৩, মুসনাদে আহমাদ-৯৭১৪, ১০১৭৫, ১০৫৪০)
অপর হাদিসে এসেছে, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তখনো কাজটি সম্পাদিত হয় না তখন তার একটি নেকি লেখা হয়। আর যখন সে একটি কাজটি সম্পন্ন করা হয়, তখন তার জন্য দশগুণ হতে সাতশত গুণ সাওয়াব লেখা হয়। আর যে ব্যক্তি কোনো খারাপ কাজের ইচ্ছা করে, কাজটি সম্পাদিত না করা পর্যন্ত কিছুই লেখা হয় না। যখন সে কাজটি সম্পন্ন করা হয়, তখন একটি খারাপ কাজের একটিই গুনাহ লেখা হয়। (মুসলিম-৩৫৪, বুখারি-৬১২৬)
উল্লেখ্য যে, ছয়টি সিয়াম শাওয়াল মাসে পালন করতে হয়। তবে ঈদুল ফিতরের পরের দিন থেকেও আরম্ভ করা যায়। শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম নারী-পুরুষ সবার জন্যই সুন্নত ও অনেক সাওয়াবের আমল। মাসের শুরু-শেষ কিংবা মাঝামাঝি সব সময়ই রাখা যায় এ সিয়ামগুলো। একনাগাড়ে অথবা মাঝে গ্যাপ রেখে পৃথকভাবেও রাখা যায়। শাওয়াল মাসে শুরু করে শাওয়াল মাসে শেষ করলেই হলো। শাওয়াল মাসটি হজ ও জিয়ারতের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেই বিশেষভাবে পরিচিত। এ মাসে মানাসিকে হজ ও জিয়ারতে গমনকারী আল্লাহর বান্দাগণ নিজেদেরকে এর জন্য প্রস্তুত করার কাজে মনোনিবেশ করে থাকেন।

রমাদান-পরবর্তী এগারো মাসের অব্যাহত আমল
রমাদান-পরবর্তী এগারো মাসে নফল সিয়াম ও সালাতসহ অন্যান্য নেক আমল আদায় করাও খুবই উপকারী এবং একজন মু’মিন বান্দা-বান্দীর জন্য অবশ্য পালনীয়। যেমন-

কুরআন ও হাদিস অধ্যয়ন : কুরআন নাজিলের কারণে রমাদানের যাবতীয় আমলের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা এসেছে। আল্লাহ বলেন, রমাদান মাস, যে মাসে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, আর এটি মানবজাতির জন্য হিদায়াত বা পথের দিশা, হিদায়াতের সৎপথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটি পাবে, তার উচিত এ মাসের সিয়াম রাখা। (সূরা বাকারা : ১৮৫) সে কারণে আমরা রমাদান মাসে কুরআনের তাফসির স্টাডি, তরজমা অধ্যয়ন, তিলাওয়াত, খতমে কুরআন, গুরুত্বপূর্ণ আয়াত ও সূরা মুখস্থ করার চেষ্টা করি। যেহেতু কুরআনুল করিম বান্দার জন্য জান্নাতের সুপারিশ করবে এবং হুজ্জাত বা দলিল হিসেবে আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হবে। সেহেতু আমাদের নিরন্তর সে প্রচেষ্টা। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, সিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে, আয় রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ হতে বিরত রেখেছি, অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবে, আয় রব! আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি (সে আমাকে তিলাওয়াত করেছে)। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। রাসূল সা. বলেন, অতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসনাদে আহমাদ- ৬৬২৬)
আবু মালিক আল আশআরী রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,——এবং কুরআন তোমার পক্ষে দলিল হবে নতুবা তোমার বিপক্ষে নালিশ পেশ করবে। (মুসলিম-৫৫৬, ইবনে হিব্বান-৮৪৪)
অতএব রমাদানের পরেও সারা বছর কুরআনের সাথে আমাদের তায়াল্লুক ও মুলাঝামাত থাকা দরকার। প্রতিদিন ২-৩টি করে আয়াতের তিলাওয়াত, ব্যাখ্যা, তাফসির স্টাডি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা দরকার। সালাতে তিলাওয়াতকৃত সূরা ও আয়াতসমূহের অর্থ এবং মর্মার্থ উপলব্ধি করার প্রচেষ্টা করা অতীব প্রয়োজন। এতে ঈমানী তরকি বৃদ্ধি পাবে এবং আল্লাহর নৈকট্যলাভ সহায়ক হবে। কুরআনুল করিমের ব্যাখ্যা হাদিস। মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা.-এর বিশাল হাদিসের ভাণ্ডার হতে প্রতিদিন ২-৩টি হাদিস অধ্যয়নে জ্ঞানের পরিধি সমৃদ্ধ হবে। প্রতিদিনের কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নের জযবা আমাদের ঈমান, তাকওয়া, ইখলাস, তাওয়াক্কুল, ইহসানসহ মৌলিক মানবীয় গুণাবলি অর্জনে মু’মিনে কামিল ও ইনসানে কামিলে উন্নীত করবে।

ফরজ সালাত আদায় : রমাদানকে ইবাদতের মৌসুম বলা যায়। রমাদানে প্রতিটি মসজিদে মুসল্লিদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ার মত। রমাদানের পরেও পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায়ের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। সে হাদিসে এসেছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, মহান আল্লাহর নিকট ঐ আমল প্রিয় যে আমল পরিমাণে কম হলেও স্থায়িত্ব বেশি। (বুখারি-৫৫২৩, ৬০৯৯, মুসলিম-১৮৬৩, ১৮৬৬)

তাহাজ্জুদসহ নফল সালাত : রমাদান মাসে সাহরি করতে শেষ রাতে জেগে আমরা সাধারণত তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের চেষ্টা করেছি। সারা বছরে প্রতি রাতের শেষাংশে মহান আল্লাহ প্রথম আসমানে এসে ফরিয়াদকারীর ফরিয়াদ শুনেন ও তা মঞ্জুর করেন এবং ক্ষমাপ্রার্থীকে ক্ষমা করেন। আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আল্লাহ তায়ালা প্রতিরাতে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং রাতের তৃতীয়াংশ পর্যায়ে আল্লাহ তায়ালা বলতে থাকেন, তোমাদের কার কী ফরিয়াদ আছে? প্রার্থনা করো আমি তা মঞ্জুর করবো। তোমাদের কারো কিছু চাওয়ার থাকলে তাদের তা আমি দিয়ে দেই। তোমাদের কেউ ইস্তিগফার করলে তাকে ক্ষমা করা হয়। (বুখারি-১০৯৪, ৫৯৬২, ৭০৫৬, ইবনে হিব্বান-৯২০)
অতএব ফরজ সালাত আদায়ের পাশাপাশি তাহাজ্জুদসহ নফল সালাত আদায়ে যত্নবান হবার চেষ্টা করবো। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “তোমরা সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করো। সালাত প্রতিষ্ঠা করা অবশ্যই কঠিন কাজ, কিন্তু যারা আল্লাহকে ভয় করে তারা ব্যতীত। (সূরা বাকারা : ৪৫)।
মহানবী সা. যেকোনো সঙ্কট, সমস্যা বা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন, আল্লাহর দরবারে ধরনা দিতেন। হাদিসে এসেছে,
আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, গাযওয়ায়ে বদরের প্রাক্কালে (সালাতরত অবস্থায়) নবী সা. বলেন, আয় আল্লাহ! তোমার জাত ও ইজ্জতের কসম করে বলছি, আমি তোমার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করার জন্য প্রার্থনা করছি। আয় আল্লাহ! তুমি যদি চাও (কাফিররা জয়লাভ করুক) তাহলে তোমার জমিনে তোমার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না। আবু বকর রা. তার হাত ধরে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে। তখন রাসূল সা. এ আয়াত পড়তে পড়তে বের হলেন, শিগগিরই দুশমনরা পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে (সূরা কামার : ৪৫)। (বুখারি-২৭৫৮, ৩৭৩৭, ৪৫৯৪, ৪৫৯৬, মুসনাদে আহমাদ-৩০৪২)
অতএব রমাদানের পরেও অব্যাহতভাবে তাহাজ্জুদ, চাশত, ইশরাক ও আওয়াবিনসহ নফল সালাতের আমল অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট হতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার। পাশাপাশি মহান আল্লাহর দরবারে কাতরকণ্ঠে দোয়া-ফরিয়াদ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা দরকার। নিজ ও পারিবারিক সমস্যার সমাধানের জন্য, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের আন্দোলনের সফলতার জন্য, ইসলামী আন্দোলনের মজলুম নেতৃবৃন্দ ও তামাম বিশে^র নির্যাতিত মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া অব্যাহত রাখা। নিজের আপনজনের মধ্যে যারা ইন্তেকাল করেছেন, তাদের মাগফিরাত কামনাসহ দোয়া নিয়মিত আমলের অনুষঙ্গ হিসেবে জারি রাখা।

নফল সাওম পালন : শাওয়ালের ছয় সিয়ামের পাশাপাশি মহররমের সাওম পালন করা। সহিহ হাদিসে এসেছে, রমাদানে সিয়ামের ফরজ হবার পূর্বে রাসূলুল্লাহ সা. আশুরার সাওম রাখতেন ও সাহাবাদের রাখতে নির্দেশ দিতেন।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, রমাদানের পরেই সর্বোত্তম সাওম হলো আল্লাহর মাস মহররমের সাওম। (মুসলিম-২৮১২, আবু দাউদ-২৪৩১)
আবার মহররমের আশুরার সাওমের ফজিলত প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, আবু কাতাদা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, …….. মহররমের আশুরার সাওম বিগত এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা হবে। (মুসলিম-২৮০৩, ইবনে হিব্বান-৩৬৩২)
প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে আইয়্যামে বিজের সাওম। এ সিয়ামের মাধ্যমে সারা বছর সিয়ামের সাওয়াব আল্লাহ তায়ালা দিবেন।
প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের আইয়্যামে বিজের সিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সারা বছর সিয়ামের সাওয়াব দিবেন। (বুখারি-১৮৮০, ইবনে হিব্বান-৩৬৩৮, ৩৬৫৫, ৩৬৫৬)
আবার আরাফার সাওম সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, আবু কাতাদাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. কে আরাফার সাওম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, আরাফার সাওম পালন করলে বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে থাকে। এক বর্ণনায় বিগত দুই বছর ও আগামী দুই বছরের গুনাহ মাফ করা হয়ে থাকে। (মুসলিম-২৮০৩, ২৮০৪, মুসনাদে আহমাদ-২২৫১৭, ২২৫৮৯, ২২৬৫০, ২৪৯৭০)
অনুরূপভাবে প্রতি সোমবার ও বৃস্পতিবারের সাওম পালনে রাসূলুল্লাহ সা. গুরুত্বারোপ করেছেন। হাদিসে এসেছে, আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. সোমবার ও বৃহস্পতিবারের সিয়ামের প্রতি খুবই খেয়াল রাখতেন। আবু হুরাইয়া রা.-এর বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা. সোমবার ও বৃহস্পতিবার সাওম রাখতেন। জিজ্ঞেস করা হলো ইয়া রাসূল সা. আপনি তো সোমবার ও বৃহস্পতিবারে সাওম রাখছেন! তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তায়ালা সোমবার ও বৃহস্পতিবারে প্রত্যেক মুসলিমের গুনাহ মাফ করেন। (ইবনে খুযাইমা-২১১৯, তিরমিজি-৭৪৫)

নফল দান-সাদাকা : রমাদান মাসে অবারিত সওয়াবের ভাগী হয়ার জন্য আমরা অকাতরে দান-সাদাকা করে থাকি। মহানবী সা.ও এ মাসে অধিক পরিমাণে দানের হাত সম্প্রসারিত করতেন। হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. অধিক দানশীল ছিলেন। বিশেষ করে রমাদান মাসে তাঁর দানশীলতা অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেত, যখন জিবরাইল (আ) তার সাক্ষাতে আসতেন। রমাদানের প্রতি রাতেই জিবরাইল (আ) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন। নিশ্চয়ই তাঁর দানশীলতা প্রবহমান বাতাসের চেয়েও অবারিত ছিলো। (বুখারি-৬, ১৮০৩, ৩০৪৮, ৩৩৬১, ৪৭১১, মুসলিম-৬১৪৯) হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, দান-সাদাকা বিপদ-আপদ দূরীভূত করে। (উমদাতুল ক্বারী শরহিল বুখারি, ৩৩ খণ্ড-৯০৬৫)
দান-সাদাকা ৭০টি বালা-মুসিবত হটিয়ে দেয়। তন্মধ্যে কুষ্ঠব্যাধি ও দুরারোগ্য ব্যাধি। (শুয়াবুল ঈমান-৩৫৫৬) আবার অন্য হাদিসে এসেছে, আনাস ইবন মালিক রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, দান-সাদাকা মহান রবের ক্রোধ প্রশমিত করে এবং খারাপ মৃত্যু হটিয়ে দেয়। (শুয়াবুল ঈমান-৩৩৫১, ৮০১৯, ৮৫৭৬)
সমূহ বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত হতে হিফাজত থাকার জন্যই সারা বছর অব্যাহতভাবে দান-সাদাকা করা অত্যাবশ্যক।

যিকর, তাওবা, ইস্তিগফার : রমাদান মাসের মত সারা বছর সার্বক্ষণিক তাওবা-ইস্তিগফার, আল্লাহর যিকর করা মু’মিনের অপরিহার্য কর্তব্য। শাফায়াতের কাণ্ডারি মুহাম্মদ সা. প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ইস্তিগফার করতেন। হাদিসে আছে, আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সা. কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে ৭০ বার “আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি” বলে মাফ চাই। (বুখারি-৫৯৪৮, ইবনে হিব্বান-৯২৫) অন্য বর্ণনায় প্রতিদিন ১০০ বারের অধিক তাওবা ইস্তিগফার করতেন। আবু বুরদা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, আমি প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে ১০০ বার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে মাফ চাই। (মুসলিম-৭০৩৩, তিরমিজি-৩২৫৯) অথচ তাঁর পূর্বের ও পরের সকল অপরাধ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা। মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমার আগে ও পরের যাবতীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন। তোমার ওপর তাঁর অনুগ্রহ ও অনুদানও পুরোপুরি দিবেন এবং সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেন।” (সূরা ফাতহ : ২)
মুয়াজ ইবন জাবাল রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞেস করা হলো আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, তোমার জিহবা আল্লাহ যিকরে রত থাকবে, এমতাবস্থায় তুমি ইন্তেকাল করবে। (শুয়াবুল ঈমান-৫১৬, ইবনে হিব্বান-৮১৮)

মানবিক সহায়তা : মু’মিন জীবনের অপরিহার্য কর্তব্যের নাম একে অপরের সুখে দুঃখে সমভাগী হওয়া। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যেকোনো পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা। দুস্থ, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা দেওয়া সারা বছরের জন্য ও সবসময়ের জন্য। মহানবী সা. এর ওপর প্রথম ওহি অবতীর্ণের পর খাদিজা রা.-এর গৃহে ভীতবিহবল হয়ে আসলে তাঁকে যে সব কথায় সান্ত¡না দেওয়া হয়, তন্মধ্যে মানুষের বিপদে মানবিক সহায়তা কথা বলা হয়েছে। (বুখারি-৩, ২১৭৫)

কল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতা ও অন্যায়-গর্হিত কাজ বর্জন : ভালো-কল্যাণমূলক ও তাকওয়ার কাজে সহযোগিতা করা এবং পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনের কাজ বর্জন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নির্দেশ। আল্লাহ বলেন, তোমরা ভালো-কল্যাণকর ও তাকওয়ার কাজে পারস্পরিক সহযোগিতা করো এবং পাপাচার ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না। (সূরা মায়িদা : ২) রমাদানের পরেও সারা বছর কল্যাণমূলক জনহিতকর ও তাকওয়ার কাজে সর্বদা সহযোগিতা করার আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। অতএব পার্থিব সাময়িক বাহবা, তৃপ্তিলাভ বা নফসে আম্মারার প্ররোচনায় ক্ষণিক মজা গ্রহণের নিমিত্তে অন্যায়-গর্হিত কাজ ও সীমালঙ্ঘনের কাজ বর্জনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা অনেকে ১০/২০/৩০/৪০ বা ততোধিক বছর ধরে সিয়াম পালন করে আসছি। অথচ আমাদের আমল, আখলাক, চরিত্র-নৈতিকতা বা দ্বীনি অনুভূতিতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয় না। আমরা প্রতি রমাদানে যদি একটি করে অন্যায় ও গর্হিত কাজ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম, আর একটি করে কল্যাণকর ও তাকওয়ার পর্যায়ে পড়ে এমন আমল অবলম্বন করতে পারতাম। তাহলে আমাদের জীবনে অনেক ভালো আমলের সমাহার ঘটতো এবং অন্যায় ও গর্হিত কাজ একেবারেই জিরো পর্যায়ে নেমে যেত। পরিকল্পিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এমনটি না করার কারণে আমরা রমাদানের পূর্বে যেমন থাকি, রমাদানের পরেও সে রকমই রয়ে যাই। তাহলে রমাদানে আমাদের কী অর্জন হলো!
মহান রাব্বুল আলামিন ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের প্রতি বান্দাদেরকে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন। আল কুরআনের ৩১টি সূরার বিভিন্ন আয়াতে এর বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আর যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত তোমাদের প্রতি না থাকত, তাহলে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্তদের শামিল হতে। (সূরা বাকারা : ৬৪)।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, আর আল্লাহ তায়ালা যাকে চান স্বীয় রহমতে নির্দিষ্ট করে নেন এবং আল্লাহ অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। (সূরা বাকারা : ১০৫)। অন্যত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, “নিশ্চয় যারা ঈমান আনে এবং যারা হিজরত করে ও আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তারাই এমন লোক যাদের ব্যাপারে আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করা যায়, আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা বাকারা : ২১৮)।
মহান আল্লাহ আরো বলেন, “অতএব যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে এবং তাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে স্বীয় অফুরন্ত রহমত ও অনুগ্রহের মাঝে দাখিল করবেন এবং তাদেরকে পরিচালিত করবেন সরল সঠিক পথে। (সূরা নিসা : ১৭৫)। উপর্যুক্ত পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, রমাদানের একটি মাস একসাথে একযোগে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর প্রশিক্ষণের ফল্গুধারার আদলে সারা বছর এমনকি আমৃত্যু সেসব আমলের ধারাবাহিকতা জারি রাখা খুবই হিতকর ও আল্লাহ পাকের কুদরত এবং নৈকট্য ধন্য হওয়ার খুবই উপযোগী। এ ব্যাপারে সকলেরই আন্তরিক ও মনোযোগী হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক সমঝ ও আমলের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বিজুল দারুল হুদা কামিল ¯স্নাতকোত্তর মাদরাসা বিরামপুর

SHARE

Leave a Reply