রাসূলুল্লাহর সা. অনুসরণীয় দাম্পত্য জীবন আলী আহমাদ মাবরুর

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ সা.কে সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে চূড়ান্ত করেছেন। আল্লাহ এই প্রসঙ্গে বলেন,
‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী।’ (সূরা আল আহজাব: ৪০)
এই প্রেক্ষিতেই, আল্লাহ তাকে মানবতার জন্য আদর্শ হিসেবে স্থাপন করেছেন। আল্লাহ বলেন,
“যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।” (সুরা আল আহজাব : ২১)
এই কারণে, এটি মোটেও অস্বাভাবিক নয় যে, রাসূলের সা. জীবনী তার সমসাময়িক সবার কাছে, তার সঙ্গী সাথীদের কাছে, কিংবা প্রতিপক্ষের কাছে, যুবক বা বৃৃদ্ধ, নিকটবর্তী বা দূর সম্পর্কীয়- সবার কাছেই খুব স্পষ্ট ও দৃশ্যমান ছিল। তারা প্রত্যেকেই নবীজির সা. জীবনের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জানতেন। রাসূলের সা. যাপিত জীবনের কোনো কিছুই তাদের অজানা ছিল না। আর ব্যক্তিগত জীবনের যে বিষয়গুলো বাইরের মানুষদের জানার সুযোগ কম ছিল, সেগুলো আমরা আবার নবীজির সা. স্ত্রীগণ তথা উম্মুল মুমিনিনদের মাধ্যমে অবগত হয়েছি।
আমরাও উম্মত হিসেবে রাসূলের সা. ব্যক্তিগত জীবন সম্বন্ধেও অনেক কিছু জানতে পারি। কিভাবে তিনি খেতেন, পানি পান করতেন, সফরে কিভাবে যেতেন, ঘরে থাকা অবস্থায় তিনি কিভাবে সময় পার করতেন, জেগে থাকলে কী করতেন, ঘুমুলেই বা কী আমল করতেন- এভাবে নিত্যদিনের প্রতিটি কাজ সম্বন্ধে আমরা জানার সুযোগ পাই। আমরা অনেকেই মনে করি, সেলিব্রেটি তারকাদের নিয়েও অনেক ধরনের তথ্য আমরা জানি। তবে বাস্তবতা হলো, রাসূলের সা. জীবনের মতো এতটা উন্মুক্তভাবে আর কোনো সেলিব্রেটির জীবনকে আমরা জানতে পারি না। নবীজির সা. জীবনের অনেক ছোটখাটো বিষয়ও আমরা অবলীলায় জানতে পারি।
একটি উন্নত জীবনগাথা
আল্লাহ তায়ালা অনেক বিবেচনা করেই তাঁর শেষ নবী ও রাসূলকে বাছাই করেছেন। এই মানুষটির ভেতর ও বাহিরকে তিনি বিশুদ্ধ করেছেন, তার কথা ও কাজকে পরিমার্জিত করেছেন, তার শরীর ও অন্তরকে নিষ্কলুষ করেছেন। যখনই আমরা তার জীবনী পড়বো, তখন তার জীবনের একেকটি ঘটনাপ্রবাহ আমাদের মনে তার বিষয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাকে আরো অনেক বাড়িয়ে দেবে।
নবীজির সা. ব্যবহার, আচার আচরণ এবং যেভাবে তিনি অপর মানুষদেরকে মূল্যায়ন করতেন, তাদের সাথে মেলামেশা করতেন, তা খুবই চমকপ্রদ। আমরা নবীজিকে সা. যত বেশি আবিষ্কার করতে পারবো ততবেশি তার ভালোবাসায় আবিষ্ট হয়ে যাবো। নবীজির সা. ওপর ঈমান আনার অন্যতম একটি শর্ত হলো তার জন্য আপনার হৃদয় কুঠরিতে একটি সম্মানজনক অবস্থান বরাদ্দ রাখা এবং আন্তরিকভাবেই তার জন্য গভীর ভালোবাসা অনুভব করা।
একটি উৎকৃষ্ট ভালোবাসা
রাসূল সা. তাঁর যুবক বয়সে মক্কায় হযরত খাদিজাকে রা. বিয়ে করেন। সে সময় মা খাদিজার রা. বয়স ছিল ৪০ বছর বা তার অল্প কিছু বেশি। হযরত খাদিজা রা. যতদিন জীবিত ছিলেন রাসূল সা. দ্বিতীয় কোনো মহিলাকে আর বিয়ে করেনি। রাসূলের সা. সকল সন্তানের মা ছিলেন এই খাদিজা রা.। আর কোনো স্ত্রীর গর্ভে রাসূলের সা. আর কোনো সন্তান হয়নি।
রাসূল সা. উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাকে রা. অনেক বেশি ভালোবাসতেন। রাসূল সা. প্রথম খাদিজাকে রা. চেনার বা জানার সুযোগ পান যখন তিনি এই মহীয়সী নারীর অধীনে চাকরিতে যোগদান করেন। উল্লেখ্য, হযরত খাদিজা রা. সিরিয়া অঞ্চলে ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য হযরত মুহাম্মাদকে সা. নিয়োগ দেন। তখনও অবশ্য তিনি নবুওয়াত লাভ করেননি। সিরিয়ায় ব্যবসা করে নবীজি সা. যখন ফিরে আসেন এবং গোটা ব্যবসার প্রতিবেদন অত্যন্ত সততার সাথে খাদিজার রা. সামনে উপস্থাপন করেন। খাদিজা রা. তখনি লক্ষ্য করেন যে, এই মানুষটি খুবই সৎ ও নীতিবান। সিরিয়া সফরটি হযরত খাদিজার রা. খুবই সফল, সার্থক ও বরকতময় হয়। তাই তিনি হযরত মুহাম্মাদ সা. কে নিজের স্বামী হিসেবে বেছে নেন। (ইবনে ইসহাক: সিরাতে রাসূলুল্লাহ)
স্বস্তিকর স্মৃতিগুলো
হযরত খাদিজার রা. ইন্তেকালের পরও রাসূল সা. কখনোই তাকে ভুলতে পারেননি। তিনি সবসময় খাদিজার রা. বিষয়ে ভালো ভালো কথা বলতেন। কখনো কখনো সেই প্রশংসার মাত্রা এত বেশি হয়ে যেতো যে, হযরত আয়েশা রা. রীতিমতো তাকে ঈর্ষা করতে শুরু করতেন। হযরত খাদিজা রা. যখন জীবিত ছিলেন তখন আয়েশার রা. বয়স খুবই কম ছিল। আয়েশার রা. সাথে রাসূলের সা. যখন বিয়ে হয়, তখন মা আয়েশার রা. বয়স ছিল ৭ বছর। আর আয়েশার রা. ৯ বছর বয়সে তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু হয়। রাসূল সা. যখন ইন্তেকাল করেন তখন হযরত আয়েশার রা. বয়স ছিল ১৮-১৯ বছর। এরপরও রাসূলের সা. মুখে খাদিজার রা. প্রশংসা শুনতে শুনতে উম্মুল মুমিনিন আয়েশার রা. মনেও ঈর্ষা তৈরি হতো। (বুখারি : ৩৮১৬-১৮)
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সা.-এর অন্য কোন স্ত্রীর প্রতি এতটুকু ঈর্ষা করিনি যতটুকু খাদিজাকে রা. করেছি। অথচ আমি তাঁকে দেখিনি। কিন্তু নবী সা. তাঁর কথা বেশি সময় আলোচনা করতেন। কোন কোন সময় বকরি যবেহ করে গোশত্রে পরিমাণ বিবেচনায় হাড়- গোশতকে ছোট ছোট টুকরো করে হলেও খাদিজাহ রা.-এর বান্ধবীদের ঘরে পৌঁছে দিতেন। আমি কোনো কোনো সময় ঈর্ষা ভরে নবীজিকে সা. বলতাম, মনে হয় খাদিজা রা. ছাড়া দুনিয়াতে যেন আর কোনো নারী নাই। উত্তরে তিনি সা. বলতেন, হ্যাঁ। তিনি এমন ছিলেন, এমনই ছিলেন। তাঁর গর্ভে আমার সন্তানাদি জন্মেছিল। (বুখারি – ৩৬১৮)
একটি দুর্লভ বিশ্বস্ততা
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন খাদিজার বোন হাওয়ালা বিনতে খুয়াইলিদ, রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য অনুমতি চাইলেন। (দু’বোনের গলার স্বর ও অনুমতি চাওয়ার ভঙ্গি একই রকম ছিল বলে) নবীজির সা. মনে খাদিজার অনুমতি চাওয়ার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। তিনি কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়েন। একটু পর তিনি স্বাভাবিক হলে বলেন, ‘হে আল্লাহ! এতো দেখছি হাওয়ালা! ‘আয়েশা রা. বলেন: এতে আমার ভারী ঈর্ষা হলো। আমি বললাম, কুরাইশদের সেই প্রবীণ নারীর কথাই আপনি বারবার আলোচনা করেন। অথচ আল্লাহ তো আপনাকে উত্তম স্ত্রী দান করেছেন।
‘আয়েশা রা. এর এ কথার জবাবে নবীজি সা. মন খারাপ করেন। তিনি বলেন, ‘তুমি ভুল বললে, আল্লাহ তার চেয়ে উত্তম কোনো নারীকে আমার জীবনে দেননি। তার মধ্যে অনেক গুণ ছিল যা অনেকের মাঝে নেই। আর আল্লাহ কেবলমাত্র খাদিজার রা. সাথেই আমাকে সন্তান দান করেছেন।” রাসূলের সা. এই স্পষ্ট মন্তব্যের পর হযরত আয়েশা রা. নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং বলেন, ‘যিনি আপনাকে সত্যের বাহকরূপে পাঠিয়েছেন তাঁর কসম, ভবিষ্যতে আমি তাঁর (খাদিজা) সম্পর্কে উত্তম মন্তব্য ছাড়া আর কোনো কিছু বলবো না।” (বুখারি – ৩৮২১)
স্ত্রী খাদিজার রা. প্রতি রাসূলের সা. বিশ্বস্ততার কিছু নমুনা
রাসূল সা. সবসময় পুরনো সম্পর্ককে ধরে রাখতেন : রাসূল সা. প্রায়শই বলতেন, “ওয়াদা পালন করা ঈমানের একটি বহিঃপ্রকাশ।’ খাদিজার রা. ইন্তেকালের পরও রাসূলের সা. মনে তার প্রতি ভালোবাসা ছিল জীবন্ত ও সক্রিয়। রাসূল সা. এই সম্পর্কটি নিয়ে স্বস্তি অনুভব করতেন এবং অন্যন্য মানুষের সামনেও এই সম্পর্কটিকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতেন। রাসূল সা. বলতেন, ‘আমি খাদিজার পবিত্র ভালোবাসায় সিক্ত।’ তিনি সবসময় হযরত খাদিজার রা. সাথে তার সম্পর্ককে আল্লাহর পক্ষ থেকে নেয়ামত হিসেবে বিবেচনা করতেন। খাদিজার রা. প্রতি নিজের ভালোবাসাকে অন্যান্য সাহাবিদের সামনে প্রকাশ করতেও রাসূল সা. লজ্জাবোধ করতেন না। স্ত্রী খাদিজার রা. প্রতি বিশ্ব নেতা মুহাম্মাদ সা. বিশ্বস্ততা এবং ভালোবাসার যে মডেল রেখে গেছেন তা অনুসরণ করা বর্তমান সময়ে খুব বেশি প্রয়োজন।
সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে: উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নতুন বিবাহিত দম্পতি প্রথম দিকে আনন্দে ও স্বস্তিতেই সময় কাটায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন সেই আনন্দটি আসলে টিকে থাকে? শুরুতে যেমন ছিল, সম্পর্কটা কি তেমন মধুময় থাকে, নাকি সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ তিক্ত হয়ে যায়, নানা ধরনের বিতর্ক ও বিবাদ শুরু হয়ে যায়।
বৈবাহিক জীবনটা বরাবরই দায়িত্বশীলতার। মুসলিম পরিবারগুলো তখনই সার্থক ও সফল হয় যদি সেখানে সমঝোতা, বোঝাপড়া ও ভ্রাতৃত্ববোধটি টিকে থাকে। স্বামী বা স্ত্রীর উচিত একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে সততা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে জিইয়ে রাখা। বর্তমানে মিডিয়া সব কিছুকে উন্মুক্ত করে দেয়ায় মানুষ এখন শারীরিক আকর্ষণকে বড়ো করে দেখছে। নাটকে ও সিনেমাতেও শরীরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যে, একটি দম্পতি পরস্পরের প্রতি আকর্ষণ অনুভব না করে বরং স্ক্রিনের মানুষগুলোর প্রতি বেশি আকর্ষণ বোধ করছে। প্রতিটি মুসলিম দম্পতির উচিত তাদের নিজেদের মধ্যকার সম্পর্ককে হেফাজত করা। আল্লাহ এই বৈবাহিক চুক্তিটিকে ‘পবিত্র চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাই এ সম্পর্ককে ধারণ করা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্বের আওতায়ও পড়ে। যদি এভাবে বিষয়টিকে বিবেচনা না করা হয় তাহলে, বৈবাহিক সম্পর্কগুলো অকার্যকর হয়ে যাবে। দাম্পত্য সম্পর্কটি নষ্ট হয়ে প্রাথমিকভাবে নিছক দুটো নারী ও পুরুষের শারীরিক সম্পর্কের সূচনা হবে। আর চূড়ান্ত পরিণতিতে গোটা বিষয়টাই একটা খেল-তামাশায় পরিণত হবে।
এ কারণে যে কোনো যুগল বিয়ে করার আগে তাদের আগে বিবাহ সংক্রান্তে ইসলামের মৌলিক চেতনাগুলো শিখে নেয়া দরকার। তাহলে তারা মায়া, মমতা, শ্রদ্ধাবোধ, সমঝোতা, বোঝাপড়া, ধৈর্য এবং পারস্পরিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।
দাম্পত্য জীবনের কিছু জরুরি বিষয়
কখনো বিষন্নতা অনুভব করবেন না : রাসূলের সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির ১০ম বর্ষে, অর্থাৎ মদিনায় হিজরতের বছর কয়েক আগের বছরটিকে নবীজির সা. জীবনের শোকের বছর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কষ্ট ও দুঃখ মানুষের জীবনেরই অংশ। মানুষ নানা ধরনের যন্ত্রণা ও প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই জীবন যাপন করে। অন্যদিকে, আল্লাহর রহমত ও করুণাও মানুষের অতি নিকটবর্তী। স্বাভাবিকভাবে জীবন খুবই সুন্দর। এই সুন্দর জীবনেও যখন কঠিন সময় অবতীর্ণ হয়, তখন সেই পরিস্থিতিকেও ধৈর্য ও প্রসন্নতার মধ্য দিয়েই মোকাবেলা করতে হয়। তাহলে এই কষ্টের সময়টাও সুখকর মুহূর্তে পরিণত হতে পারে। যখন একটি অসুস্থ ও বিষন্ন হৃদয়কে স্বস্তি ও প্রশান্তির মধ্য দিয়ে চিকিৎসা করা হয়, তখন জীবন আবারও আনন্দময় হয়ে ওঠে। আস্তে আস্তে সেই প্রতিকূল সময়গুলো জীবন থেকে হারিয়ে যায়।
নবুওয়াতের ১০ম বছরে গিয়ে নবীজির সা. জীবনে একসাথে দুটো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। প্রথমত, এই বছরই তার প্রিয়তমা স্ত্রী, উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজা রা. ইন্তেকাল করেন। হযরত খাদিজা রা. শুধুমাত্র রাসূলের সা. স্ত্রী ছিলেন না, বরং ছিলেন আরো বেশি কিছু। বৈবাহিক জীবনে হযরত খাদিজা রা. রাসূলের সা. বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য স্ত্রী এবং সঙ্গিনী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি সবসময়ই নবীজিকে সা. সুপরামর্শ দিতেন, সাধ্যানুযায়ী সহযোগিতাও করতেন। রাসূল সা. যখন নবুওয়াত লাভ করলেন এবং প্রথমবারের মতো যখন তার ওপর ওহি নাজিল হলো, তখন হযরত খাদিজাই রা. প্রথম মানুষ হিসেবে রাসূলের সা. সকল কথা বিশ্বাস করেছিলেন এবং তার ওপর ঈমানও এনেছিলেন।
আয়েশ্ ারা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে প্রায়ই খাদিজার কথা উল্লেখ করতে দেখেছি। আল্লাহ্ তায়ালা তার রাসূলকে খাদিজা রা.-এর জন্য জান্নাতে স্বর্ণ নির্মিত একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেখানে কোনো উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা থাকবে না। কোনো ধরনের বাজে শব্দও সেখানে শোনা যাবে না। (মুসলিম-২৪৩২, ইবনে মাজাহ-১৯৯৭)
সুবহান আল্লাহ! কী অদ্ভুত সুন্দর সুসংবাদ। এই প্রাপ্তির চেয়ে বড়ো প্রাপ্তি একজন মানুষের জন্য আর কী হতে পারে।
বিয়ে হলো উত্তাল তরঙ্গের মাঝে ভাসমান জাহাজের মতো : বৈবাহিক জীবন শুরুতে বেশ স্বস্তিদায়কই থাকতে পারে। কিন্তু সময় যত যায়, নানা ধরনের সমস্যা ও সঙ্কট জীবনে আসতে শুরু করে। ফলে, স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে একটু একটু করে দূরত্ব তৈরি হয়। অনেকের ক্ষেত্রেই বৈবাহিক সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত একটি কাগুজে সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু থাকে না। স্বামী আর স্ত্রী, তাদের পথও হয় আলাদা ও সমান্তরাল। দিনে দিনে ব্যবধান যেন আরো বাড়ে। অথচ রাসূলের সা. হযরত খাদিজার রা. সংসারটি মোটেও এমন ছিল না। বরং তাদের বাড়িটি যেন ছিল জান্নাতের একটি টুকরা যেখানে সবসময় সীমাহীন শান্তি ও সন্তুষ্টি বিরাজ করতো। মিষ্টভাষী আচরণ, পরস্পরের প্রতি প্রশান্ত দৃষ্টি, আর ধৈর্যই হলো যে কোনো সফল দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি। পরিবার মানেই হলো অনেকগুলো দায়িত্ববোধের অনুভূতি এবং প্রাসঙ্গিক অনেকগুলো দায়িত্ব পালনের একটি স্থান। এখানে বাচ্চা কাচ্চা, ঘর গৃহস্থালির কাজ, সাংসারিক অন্যান্য কাজ, ঘোরাঘুরি এবং আরো অনেকগুলো বিষয়কে নিয়মিতভাবে দেখভাল করতে হয়। যদি একটি দম্পতি স্থির, অবিচল, পরিণত না হয়, তাহলে তাদেরকে নিয়মিত বিরতিতে সঙ্কটে পড়তে হয়।
প্রায়শই অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে শুনা যায়। তারা একজন অপরজনের কাছ থেকে অনেক কিছু না পাওয়ার কথা বলে, অথচ নিজেরা কী দিতে পেরেছে তা নিয়ে পর্যালোচনা করে না। আমার মতে বিয়ে হলো একটি ভাসমান জাহাজ যাকে নানা ধরনের পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে চলতে হয়। জাহাজের সারেং যদি একটু অমনোযোগী বা অসর্তক হয়, তাহলে তার ভুলের কারণে জাহাজ ডুবেও যেতে পারে। সংসারের ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। তাই সংসারকে শান্তিপূর্ণভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শান্তির চর্চা করতে হয়। আর আলহামদুলিল্লাহ, হযরত খাদিজার রা. সংসারে তা ভালোভাবেই ছিল।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক : দাম্পত্য সম্পর্ককে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। শারীরিক সম্পর্কনির্ভর দাম্পত্য সম্পর্ক দ্রুতই নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে, শরীরের আবেদন কমে গেলে সম্পর্কটা আর ইতিবাচকভাবে কাজ করে না। কিন্তু এই সম্পর্কটাই যদি মনের দিক থেকে অগ্রসর হয়, তাহলে তা বরং অনেক দূরদর্শী ও সুন্দর হয়ে ওঠে। মনের দিক থেকে মিল থাকলে একটি সম্পর্কে সত্যিকারের ভালোবাসা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক সহানুভূতি ও ক্ষমার পথ সুগম হয়। সম্পর্ক কোনো দড়ির মতো নয়, যা স্বামী বা স্ত্রী দুজনের দিকে শুধু টেনেই যাবে। স্ত্রী শুধু চেয়ে যাবে, আর স্বামী শুধু দোষারোপ করে যাবে- এমনটাও কাম্য নয়। সম্পর্ক এ জায়গায় পৌঁছে গেলে দাম্পত্য জীবন তার সৌন্দর্য হারায়, অনেকক্ষেত্রে তাদের সন্তান-সন্ততিও পথভ্রষ্ট হয়ে যায়।
আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও পরিপূর্ণ করার জন্য আমাদের উচিত নবীজির সা. সাংসারিক মডেলকে অনুসরণ করা। রাসূল সা. এমন একজন শিক্ষক- যার কাছ থেকে শেখার কোনো শেষ নেই। তিনি তার স্ত্রীদের সাথে কিভাবে ব্যবহার করেছেন, কিভাবে সম্পর্ককে ধরে রেখেছেন, তা থেকেও আমরা শিখতে পারি। রাসূল সা. আমাদেরকে এমন একটি দাম্পত্য সম্পর্ক দেখিয়ে গেছেন যা সব ধরনের ঝামেলা ও সংকট থেকে মুক্ত। রাসূলের সা. সাংসারিক জীবন ছিল মার্জিত, স্বার্থপরতা মুক্ত। তাদের সংসারে তারা সবসময় অপরের চাওয়াটাকেই আগে অগ্রাধিকার দিতেন এবং পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করতেন।
আমরা যদি আমাদের রাগ ও প্রতিক্রিয়াকে কিছু কিছু মুহূর্তে একটু সংযত রাখতে পারি তাহলে আমাদের সংসারটি হয় শান্তিপূর্ণ। স্বামী বা স্ত্রী- কারোই তার পার্টনারের ওপর মাত্রাতিরিক্ত খবরদারি করার মানসিকতা রাখা ঠিক নয়। রাগের সময় পরস্পরের বিরুদ্ধে কটু শব্দ, অপমান এবং নির্মম সমালোচনা যেন না হয়ে যায়, সেই ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি। মানুষ মাত্রই ভুল করে বসতে পারে। আবেগের বশবর্তী হয়ে অন্যায় কিছুও করে বা বলে বসতে পারে। সেক্ষেত্রে যিনি ভুল করবেন তার উচিত অনুশোচনা করা এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করা। পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে নিয়ে আসার অনেক উপায় আছে। তাই স্বামী বা স্ত্রী- যিনি খারাপ ব্যবহারের শিকার হোন না কেন, তিনি যেন তার মান-মর্যাদা ফিরে পান, সেই বিষয়েও পরস্পরকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।
বারবার বলা বা চাপাচাপি করা : উপরের হাদিসটির কথা চিন্তা করুন। যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ তায়ালা তার রাসূলকে খাদিজা রা.-এর জন্য জান্নাতে স্বর্ণ নির্মিত একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যেখানে কোনো উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা থাকবে না। কোনো ধরনের বাজে শব্দও সেখানে শোনা যাবে না।
এখানে জান্নাতের প্রাসাদটি দুটি বিষয় থেকে মুক্ত বলে জানানো হয়েছে। একটি হলো উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আর দ্বিতীয়টি হলো বাজে শব্দ ও গোলমাল। এরকম বলার কারণ হলো, মূলত এই দুটি সঙ্কটের কারণেই একটি দাম্পত্য সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। একে অপরের প্রতি দাবি ছেড়ে কখনোই কথা বলে না, যদিও তারা প্রত্যেকেই নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলোকে ভালোভাবেই জানে। বস্তুগত জীবনের নানা প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি, একজন স্বামী নানা ধরনের কাজে জড়িত থাকতে পারে। এইসব ব্যস্ততার কারণে একজন স্বামীর সক্ষমতা ও পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অন্য দিকে, একজন স্ত্রী অনেক সময় মাসিক বা অন্য কোনো কারণে শারীরিকভাবে অস্বস্তিতে থাকতে পারেন। অথবা গর্ভধারণের সময় তিনি মানসিক পীড়নে বা অস্থিরতায়ও থাকতে পারেন। এই রকম সময়গুলোতে, একজন স্ত্রীর বাড়তি যত্ন এবং কোমল ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে, যখন একজন স্ত্রী উদ্বিগ্নতায় বা মানসিক অন্য কোনো সঙ্কটের ভেতর দিয়ে যায়, তখন তার কাছে তার স্বামীর মানসিক সমর্থনটি অনেক বেশি জরুরি বলেই অনুভূত হয়। যদি কোনো নারী একজন তাকওয়াবান নারীকে তার মডেল হিসেবে নির্ধারণ করতে চায় অথবা পরকালে সম্মান পেতে চায়, তাহলে তার জন্য সর্বোৎকৃষ্ট মডেল বা আদর্শ হলেন হযরত খাদিজা রা.। অন্য দিকে, যদি কোনো তাকওয়াবান পুরুষ তার জন্য স্বামী হিসেবে কাউকে মডেল বা আদর্শ হিসেবে পেতে জায় তাহলে তার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ হলেন জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.।
একজন নারী যিনি অসংখ্য পুরুষকে শিক্ষা দিয়েছেন
রাসূলের সা. সাহাবিদের সবাই হযরত আয়েশার রা. উচ্চতর সম্মান ও মর্যাদা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন। তিনি শুধু রাসূলের সা. স্ত্রী ছিলেন না, বরং খুবই প্রিয়তম একজন মানুষ ছিলেন। আনাস রা. থেকে বর্ণিত। নবী সা. বলেছেন: সমস্ত খাদ্যের মধ্যে ‘সারিদের’ (আরবের উন্নত খাবার) যেমন মর্যাদা আছে, তেমনি স্ত্রীলোকের মধ্যে ‘আয়েশা রা.-এর মর্যাদা আছে। (বুখারি : ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৯২১)
হযরত আয়েশা রা. রাসূলের সা. অসংখ্য হাদিস মুখস্থ করেছিলেন। তিনি একজন বিদুষী নারী ছিলেন। আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাদের রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীদের- নিকট কোনো হাদীসের অর্থ বুঝা কষ্টসাধ্য হলে ‘আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করে তার কাছ থেকে সঠিক বিষয়টা জেনেছি। (তিরমিজি-৩৮৮৩, মিশকাত-৬১৮৫)
রাসূলের সা. প্রিয়তম স্ত্রী হওয়ার জন্যই আল্লাহ হযরত আয়েশাকে রা. সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের বিরাট এক উৎস। তিনি ছিলেন হাদিসের সর্বোচ্চতম বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজন। তিনি অনেক সাহাবিকেও দ্বীনি বিষয়ক তথ্য প্রদান করে বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। এরকম সাহাবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আব্দুল্লাহ বিন উমর রা., আবু হুরায়রা রা. এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.।
কেন রাসূল সা. হযরত আয়েশাকে রা. বিয়ে করেছিলেন
সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করা রাসূলের সা. কখনোই উদ্দেশ্য ছিলো না। তারপরও আয়েশার রা. মত একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলেন, যিনি আলহামদুলিল্লাহ অনেক বেশি সুন্দরী ছিলেন। যদি রাসূল সা. সুন্দরী মেয়ের জন্য আগ্রহী হতেন তাহলে কুরাইশরা তাকে যেকোনো গোত্রের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকেই দেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু রাসূল সা. প্রথমে বিয়ে করেছিলেন হযরত খাদিজাকে রা. আর তার মৃত্যুর পরই রাসূল সা. হযরত আয়েশাকে রা. বিয়ে করেছিলেন। হযরত আয়েশাই রা. ছিলেন রাসূলের সা. একমাত্র স্ত্রী যাকে নবীজি সা. কুমারী অবস্থায় বিয়ে করতে পেরেছিলেন।
রাসূলের সা. বাসভবন
রাসূল সা. ও মা আয়েশা রা. যে বাসায় থাকতেন তাতে কোনো ধরনের জাঁকজমকতা ও বিলাসিতা ছিল না। রাসূলের সা. বাসাটি আকৃতিতে ছিল খুবই ছোট। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালে তার মাথা সিলিংয়ে লেগে যেতো। নবী সা. এর স্ত্রী ‘আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সা. এর সামনে ঘুমাতাম, আমার পা দু’খানা তাঁর কিবলার দিকে ছিল। তিনি সিজদায় গেলে আমার পায়ে মৃদু চাপ দিতেন, তখন আমি পা দু’খানা গুটিয়ে নিতাম। আর তিনি দাঁড়িয়ে গেলে আমি পা দু’খানা প্রসারিত করতাম। তিনি বলেন, সে সময় ঘরগুলোতে বাতি ছিল না। (বুখারি : ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৩৭৫)
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। ‘উরওয়া রা. কে বলেন যে, আল্লাহর রাসূল সা. সালাত আদায় করতেন আর তিনি ‘আয়েশা রা. আল্লাহর রাসূল সা. ও তাঁর কিবলার মধ্যে পারিবারিক বিছানার উপর জানাযার মত আড়াআড়িভাবে শুয়ে থাকতেন। (বুখারি : ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৩৭৬)
রাসূল সা. এর বাসাটি ছিল ছোট্ট, এবং বাসার ভেতরে আসবাবপত্রও ছিল খুবই সাদামাটা। কিন্তু এগুলোর মধ্যে মায়া জড়ানো ছিল। জ্ঞানের স্পর্শ আর উষ্ণতাও ছিল। নবীজি সা. এবং হযরত আয়েশা রা. ছিলেন সুখ আর ভালোবাসার উত্তম নিদর্শন। মানুষ কেন মনে করে যে, সুখ শান্তি সবই অলংকারে বা বিলাসী পোশাক বা গাড়িতেই লুক্কায়িত রয়েছে? দামি প্রাসাদ, সম্পদ বা সমৃদ্ধ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট মানেই সুখ নয়। এই বিষয়গুলো হারাম নয়। তবে, আমাদেরকে মাথায় রাখতে হবে যে, প্রকৃত সুখ সেই অন্তরেই থাকে যা আল্লাহর জিকির ও আনুগত্যে পরিপূর্ণ।
সংসারের ক্ষেত্রে যে মতপার্থক্যগুলো হয় সেগুলোকে আমাদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। কারণ বর্তমানে অনেক সংসারে যে সমস্যা রয়েছে, তার একটি বড়ো কারণ এই মতবিরোধ। এই মতবিরোধ থেকেই পরবর্তীতে দূরত্ব তৈরি হয়। সেখান থেকে বিবাহ বিচ্ছেদ, গোটা সংসারটাই ভেঙে যায়। স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কটি তাকওয়ার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া উচিত। একটা সমস্যা যখন শুরু হয় তখন তা ছোটই থাকে, কিন্তু যদি তাৎক্ষণিকভাবে এই সমস্যাকে সমাধান করা না যায় তা একসময় মহীরুহ আকার ধারণ করে।
এই কারণে, আমাদের সবাইকে জানতে হবে যে, কিভাবে সুন্দর করে সহাবস্থান করতে হয়। কিভাবে মনকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হয় এবং কিভাবে গর্ব ও আত্ম-অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হয়। কোনো একটি সংসারে যদি স্ত্রী গৃহিণী হয়, তাহলে তার যাবতীয় সমস্যা ও চাহিদাকে পূরণ করা স্বামীর দায়িত্ব। আবার স্ত্রীর দায়িত্ব হলো সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করা। তাই আপনি কোনো কারণে বা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে যদি দেরি করেন আর আপনার স্ত্রী যদি তার জন্য আপনার সমালোচনা করে বা রাগ করে তাহলে তাকে দোষ না দেয়াই উচিত। আপনি স্ত্রীর ওপর চড়াও না হয়ে বরং তার জায়গাটিকে বোঝার চেষ্টা করতে পারেন। আবার স্ত্রীরও উচিত স্বামীর বিভিন্ন কার্যক্রমের বিষয়ে বিবেচনা করা কিংবা কিঞ্চিৎ ছাড় দেয়ার মানসিকতা রাখা।
আপনি কতটুকু ধৈর্য রাখতে পারবেন যদি সারাদিন আপনাকে আপনার বাচ্চাদের পোশাক পাল্টাতে হয়, পরিষ্কার রাখতে হয়, ন্যাপকিন পাল্টাতে হয়, তাদেরকে খাওয়াতে হয়, বাসার সবার রান্না করতে হয়, সাংসারিক সব কাজ করতে হয় আবার সংসারের অন্যান্য ঝামেলাও সামলাতে হয়। আল্লাহ মহিলাদেরকে এমন ধরনের ধৈর্য নেয়ামত হিসেবে দান করেছেন যা তিনি পুরুষদেরকে দেননি। পুরুষেরা অনেক যুদ্ধ করতে পারে কিন্তু তারা একটি সন্তান লালন পালন করতে পারে না, তাদেরকে জন্ম দিতে পারে না।
নারীদের বিষয়ে সচেতনতা
রাসূলের সা. সুন্নাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি নারীদের সাথে খুবই সম্মানের সাথে ব্যবহার করতেন। তার স্ত্রী বা অন্য যেকোনো মহিলাকেই তিনি প্রচণ্ড সম্মান করতেন। তিনি ছিলেন নারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। আরবে এর আগে নারীদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করার ঐতিহ্য ছিল। রাসূল সা. তা বিলুপ্ত করেন। নারীদের সাথে কোনো ধরনের বাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। পুরুষদেরকে নির্দেশ দেন যাতে তারা তাদের ঘরণীদেরকে সম্মান করে এবং তাদের ওপর কোনো ধরনের জুলুম না করে।
ইয়াস ইবনু ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু আবু যুবাব রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : তোমরা আল্লাহ্র দাসীদেরকে মারবে না। অতঃপর ‘উমার রা. রাসূলুল্লাহ সা. নিকট এসে বললেন, মহিলারা তাদের স্বামীদের অবাধ্য হচ্ছে। এরপর তিনি সা. তাদেরকে মৃদু শাসন করার অনুমতি দিলেন। অতঃপর অনেক মহিলা এসে নবীজিকে সা. এর স্ত্রীদের কাছে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করলো। তখন নবীজি সা. বললেন: মুহাম্মাদের পরিবারের কাছে অনেক মহিলা তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে এসেছে। সুতরাং যারা স্ত্রীদেরকে প্রহার করে তারা তোমাদের মধ্যে উত্তম নয়। (আবু দাউদ : ২১৪৬)
আরেকটি হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম যে নিজের পরিবারের কাছে উত্তম। আর আমি তোমাদের চেয়ে আমার পরিবারের কাছে অধিক উত্তম। (ইবনে মাজাহ-১৯৭৭)
শেষ কথা
একজন নারী তার স্বামীকে সমর্থন ও সহযোগিতা করে এবং তাকে সুপরামর্শ প্রদান করে। এক কথায়, সে হলো সংসার নামক রাজ্যের রানী। এই কারণে, স্বামীর কাছ থেকে সম্মান পাওয়ার হক ও অধিকার তার রয়েছে। যদি স্ত্রী কোনো ভুল করে, তাহলে তার আরো অন্য অনেকগুলো ভালো কাজের কথা চিন্তা করে স্বামীর এই ছোটখাটো ভুলগুলো ক্ষমা করে দেয়া উচিত।
অন্যদিকে, স্ত্রীকেও স্বামীর অধিকার পূরণের বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। তাকে গৃহকর্তার সম্মান দিতে হবে। স্বামী যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা রাখেন, তা মানতে হবে। এভাবে পরস্পর যদি পরস্পরের প্রতি সম্মান রাখতে পারে তাহলে একটি সংসার সৌহার্দ্য, ভারসাম্য, সুখ ও প্রশান্তির মধ্য দিয়েই অগ্রসর হতে পারে।
স্বামী ও স্ত্রী উভয়কেই তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হতে হবে। মুসলিম উম্মাহর সমৃদ্ধির জন্য এমন ঘর বেশি বেশি দরকার যেখানে তাকওয়ার চর্চা হয়। যেকোনো ধরনের বিপদ বা বিপর্যয়ও একটি তাকওয়াবান দম্পতি সহজে সুন্দরভাবে মোকাবেলা করতে পারে। তাকওয়ার অনুশীলনের পাশাপাশি, স্বামী ও স্ত্রীকে পরকালের জন্য প্রস্তুতিও নিতে হবে। তাদেরকে নিয়মিতভাবে কুরআন অধ্যয়ন করতে হবে। সুন্দর সুন্দর ইসলামিক আলোচনা শুনতে হবে। তাহলে তারা নিজেদের ঈমানকে সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং আল্লাহর রহমতে একটি সুখী ও সুন্দর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ইসলামকে অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
গ্রন্থ সহায়িকা:
উম্মুল মুমিনিন (অখণ্ড), প্রকাশনায়: প্রচ্ছদ প্রকাশনী
প্রকাশিতব্য গ্রন্থ: ইন দ্য কোম্পানি অব দ্য প্রোফেট (রাসূলুল্লাহর সা. সান্নিধ্যে): সালমান আল আওদাহ।
লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply