রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ -মো. রাশেদুল ইসলাম

২য়
কিস্তি

শুরুতেই পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাইছি- লেখাটি ধারাবাহিকভাবে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করতে বিলম্ব হওয়ার জন্য। আসলে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে লেখা শুরু করার পূর্বে যে পরিমাণ অধ্যয়ন করা প্রয়োজন ছিলো, তাতে বেশ ঘাটতি অনুভব করছি বিধায় সময় কিছুটা লেগেই যাচ্ছে। বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর অনন্য প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ছোট্ট প্রবন্ধে লিখে ফেলার দুঃসাহস করাটা যে বড়ই দুঃসাহসিক, এটা লেখা শুরু করার পূর্বে বুঝতে পারিনি। এজন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ইতঃপূর্বে হয়ে যাওয়া ভুলগুলোর জন্য এবং আগত ভুলেরও।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে চিন্তা করার পূর্বেই আমাদের একটি বিষয়ে পরিষ্কারভাবে জেনে রাখা জরুরি, মানব প্রশিক্ষণের ইসলামী পদ্ধতি হলো- জীবনের কোনো বিশেষ দিক বা বিভাগ শুধু নয়, বরং মানুষের গোটা জীবনকেই ইসলাম তার আওতায় নিয়ে আসে। তার মানে, আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতা বলে যাই সীমাবদ্ধ করা হোক না কেন, সকল কিছুই ইসলামী ব্যবস্থার আওতাধীন। একইভাবে মানুষের জৈবিক, আধ্যাত্মিক জীবন, তার চিন্তা ও কর্মতৎপরতা ইসলামের গণ্ডির ভিতর একাকার হয়ে যায়।
আমরা একটি বিষয় অনেক সময় মনে ধারণ করতে পারি না। তা হলো- ইসলামী পরিবেশের বাইরে বেড়ে ওঠা মানুষদের ইসলামের ভিতর সহজেই ধারণ করা! মহান আল্লাহ কিন্তু সমস্ত মানুষকেই (ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরাসহ) জন্মগতভাবেই তাঁর ফিতরাতের উপর তথা ইসলামের উপরেই দুনিয়াতে প্রেরণ করে থাকেন। একথা স্বীকৃত যে, মানব জীবনের শুরুটা সত্যের ওপর হয়ে থাকে। সত্য থেকে বের হওয়া না হওয়া নিজ স্বাধীনতার অধীন। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি, যার ওপর তিনি মানব সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল ধর্ম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।’ (আল কুরআন-৩০:৩০) আবু হুরায়রাহ রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘প্রত্যেক সন্তানই ইসলামী ফিতরাতের বা প্রকৃতির ওপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার মাতা-পিতা তাকে ইয়াহুদি, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে।’ মাতা-পিতা সন্তানকে মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত করে ফেললেও ব্যক্তিকে আল্লাহ জ্ঞানের স্বাধীনতা এবং বিবেক দ্বারা বিচার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা দান করেছেন। (আল কুরআন-৬:১৩২, ৭:১৫৫, ১০:৪১, ১৯:১২, ৩৪:৩৭, ৪২:৩০) এ বিষয়টি হৃদয়ের অলিগলিতে স্থান দিয়ে ইসলামের গণ্ডির ব্যাপকতাকে বুঝে আমরা এর বৈশিষ্ট্য সামনে রাখতে পারি।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
মহান আল্লাহর এই জমিনের সকল মানুষকে সকল সময়ে পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়ার নিমিত্তে ইসলামের যে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, তা ব্যাপক ও বিস্তৃত। আমরা সংক্ষিপ্তভাবে চারটি পয়েন্টে এই অনন্য ও ব্যাপক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে পারি।

১. যাবতীয় ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণা ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটন : রাসূলুল্লাহ সা. গোটা বিশ্ব মানবতার জন্য এমন এক শিক্ষাপদ্ধতির প্রসার করেছিলেন, যেখানে একাধারে উম্মতকে স্বচ্ছ-সঠিক জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন এবং সব ধরনের ভ্রান্ত ধারণা-বিশ্বাস ও কুসংস্কারের মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে কাজ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “(তাদের এ কর্মপদ্ধতির কারণ হচ্ছে এই যে) তারা বলে- জাহান্নামের আগুন তো আমাদের স্পর্শও করবে না। আর যদি জাহান্নামের শাস্তি আমরা পাই তাহলে তা হবে মাত্র কয়েক দিনের। তাদের মনগড়া বিশ্বাস নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে তাদেরকে বড়ই ভুল ধারণার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।” (সূরা আলে ইমরান : ২৪)
এ মুশরিকরা (তোমাদের এসব কথার জবাবে) নিশ্চয়ই বলবে, “যদি আল্লাহ চাইতেন তাহলে আমরা শিরকও করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও শিরক করতো না। আর আমরা কোন জিনিসকে হারামও গণ্য করতাম না।” এ ধরনের উদ্ভট কথা তৈরি করে করে এদের পূর্ববর্তী লোকেরাও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, এভাবে তারা অবশেষে আমার আজাবের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এদেরকে বলে দাও, “তোমাদের কাছে কোন জ্ঞান আছে কি? থাকলে আমার কাছে পেশ করো। তোমরা তো নিছক অনুমানের ওপর চলছো এবং শুধুমাত্র ধারণা ও আন্দাজ করা ছাড়া তোমাদের কাছে আর কিছুই নেই।” (সূরা আনআম : ১৪৮)
মুগীরা ইবনে শু’বা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা.-এর সময় যে দিন (তাঁর পুত্র) ইবরাহিম রা. ইন্তেকাল করেন, সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। লোকেরা তখন বলতে লাগলো, ইবরাহিম রা. এর মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সা. বললেন: কারো মৃত্যু অথবা জন্মের কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। তোমরা যখন তা দেখবে, তখন সালাত (নামাজ) আদায় করবে এবং আল্লাহর নিকট দুয়া করবে। (বুখারি : ইসলামিক ফাউন্ডেশন-৯৮৬)
মোটকথা রাসূলুল্লাহ সা. জ্ঞান অর্জনের ব্যাপারে মানুষকে যেমন উৎসাহিত করেছেন, ঠিক তার পাশাপাশি জ্ঞানের নামে কুসংস্কার, প্রতারণা, ভুল ধারণা ইত্যাদিরও মূলোৎপাটন করেছেন।

২. উপকারী ও কল্যাণকর সকল প্রকার জ্ঞানার্জনে উৎসাহ দান : জাগতিক জ্ঞান ও কলাকৌশল অর্জন করার একটি দ্বীনি দিকও রয়েছে। এমনকি এসবও দ্বীনি গণ্ডির মধ্যেই গণ্য হবে। অর্থাৎ উপকারে আসে এমন সকল প্রকার জ্ঞানার্জনে ইসলাম সবসময় উৎসাহ দেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার যুগে মুসলমানদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তিতে সর্বোচ্চ পারদর্শিতা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, “আর তোমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া তাদের মোকাবিলার জন্য জোগাড় করে রাখো। এর মাধ্যমে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে, নিজের শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদেরকে তোমরা চিনো না। কিন্তু আল্লাহ চেনেন। আল্লাহর পথে তোমরা যা কিছু খরচ করবে, তার পূর্ণ প্রতিদান তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হবে এবং তোমাদের প্রতি কখনো যুলুম করা হবে না।” (সূরা আনফাল : ৬০)
ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য উপকারী এবং কল্যাণকর, এমন সকল ধরনের জ্ঞানার্জন, এর বিকাশ এবং চর্চার প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. উৎসাহ প্রদান করেছেন। এমনকি এরকম জ্ঞানের উৎস এবং অবস্থান যাইহোক না কেন, তা অর্জনের জন্য বলেছেন।
যায়িদ ইবনু সাবিত রা. থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে ইয়াহুদিদের লেখা (ভাষা) শিখার আদেশ দিলেন। আমি তদনুযায়ী ইয়াহুদিদের লেখা শিখলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! ইয়াহুদিরা আমার পক্ষ হতে সঠিক লিখবে বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। বর্ণনাকারী বলেন, পনেরো দিন যেতে না যেতেই আমি তাদের লেখা আয়ত্ত করে ফেললাম। তিনি চিঠিপত্র লেখানোর ইচ্ছা করলে আমি লিখে দিতাম এবং তার নিকট চিঠিপত্র এলে আমি তা তাঁকে পড়ে শুনাতাম। (সুনান আবু দাউদ : তাওহিদ-৩৬৪৫)
যুদ্ধবন্দীদেরকে কোন সেবা গ্রহণের বিনিময়ে মুক্তি দেওয়ার দৃষ্টান্তও বদর যুদ্ধের সময় দেখ যায়। কুরাইশ বন্দীদের মধ্যে যাদের আর্থিক মুক্তিপণ দেয়ার ক্ষমতা ছিল না তাদের মুক্তি দেয়ার জন্য নবী সা. শর্তারোপ করেছিলেন যে, তারা আনসারদের দশজন করে শিশুকে লেখাপড়া শিখিয়ে দেবে। (মুসনাদে আহমাদ, তাবকাতে ইবনে সাদ, কিতাবুল আমওয়াল)
এক কথায় উম্মাহর উপকার এবং কল্যাণের পথে প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অবস্থান ছিলো প্রিয় নবী সা.-এর।

৩. জ্ঞানভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তি সৃষ্টি করা : ইসলামের অন্যতম একটি মূলনীতি হচ্ছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে সত্য বিষয়কে মেনে নেয়ার ব্যাপারে দিকনির্দেশ করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিবকে পূর্বতন সকল ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার বিপরীতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ধীরে ধীরে। জ্ঞানগত বুদ্ধিবৃত্তি যার উপর প্রতিষ্ঠিত তার মৌলিক রূপরেখা কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ঘোষণা হিসেবে; নির্দেশ হিসেবে। মহান আল্লাহ বলেন, “অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোনো জ্ঞানই নেই। তারা কেবলই বদ্ধমূল ধারণার অনুসরণ করছে। আর ধারণা কখনো জ্ঞানের প্রয়োজন পূরণে কোন কাজে আসতে পারে না।” (সূরা নাজম : ২৮)
“আর যে কিতাবটি আমি আমার বান্দার ওপর নাযিল করেছি সেটি আমার কিনা- এ ব্যাপারে যদি তোমরা সন্দেহ পোষণ করে থাকো তাহলে তার মতো একটি সূরা তৈরি করে আনো এবং নিজেদের সমস্ত সমর্থক গোষ্ঠীকে ডেকে আনো- এক আল্লাহকে ছাড়া আর যার যার চাও তার সাহায্য নাও, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে এ কাজটি করে দেখাও।” (সূরা বাকারাহ : ২৩)

৪. ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের লক্ষ্যে জ্ঞানার্জন করা : মহান আল্লাহ কুরআনে অতীতের নবী-রাসূলদের যুগের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তা মূলত জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ হিসেবে। বিশেষ করে ইউসুফ আলাইহিস সালামের স্বপ্নে ব্যাখ্যার কাহিনী আমাদের জানা আছে। সেখানে পনেরো বছরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।
আল্লাহ বলেন, “ইউসুফ বললো- তোমরা সাত বছর পর্যন্ত লাগাতার চাষাবাদ করতে থাকবে। এ সময় তোমরা যে ফসল কাটবে তা থেকে সামান্য পরিমাণ তোমাদের আহারের প্রয়োজনে বের করে নেবে এবং বাদ বাকি সব শীষ সমেত রেখে দেবে। তারপর সাতটি বছর আসছে বড়ই কঠিন। এ সময়ের জন্য তোমরা যে শস্য জমা করবে তা সমস্ত এ সময়ে খেয়ে ফেলা হবে। যদি কিছু বেঁচে যায় তাহলে তা হবে কেবলমাত্র সেটুকুই যা তোমরা সংরক্ষণ করবে। এরপর আবার এক বছর এমন আসবে যখন রহমতের বৃষ্টি ধারার মাধ্যমে মানুষের আবেদন পূর্ণ করা হবে এবং তারা রস নিংড়াবে।” (সূরা ইউসুফ : ৪৭-৪৯)
অনেকেই মনে করেন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা আল্লাহর উপর ভরসা থেকে মানুষকে গাফেল করে ফেলে। উপরের আয়াত থেকে আমরা কিন্তু এই চিন্তার বিপরীত কিছু দেখতে পাচ্ছি। আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সা.-এর হিজরতে প্রস্তুতির বিষয়ে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে আরো চমৎকার পরিকল্পনা দেখতে পাই। আকাবার প্রথম শপথ, দ্বিতীয় শপথ এবং চূড়ান্তভাবে হিজরত সুপরিকল্পিত ছিলো। এই বিষয়গুলোর তথ্য তুলে ধরে উপস্থাপন যে জরুরি নয়, এ ব্যাপারে সকল দ্বীন অনুসরণকারীই আমার সাথে একমত হবেন।
ইসলামী চিন্তা প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর নির্ভরশীল। একজন দ্বীন অনুসরণকারী ব্যক্তি আজই আগামীকালের, জীবনকালেই মৃত্যুর, ইহকালেই পরকালের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
অনন্য এসব বৈশিষ্ট্যকে ভিত্তি করে আরবের জাহেলি যুগে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত এক অনন্য শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বিশ্ব জাহানের সরওয়ার শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.। যার অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীগণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণে দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। (চলবে)
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply