রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রশিক্ষণ -মো. রাশেদুল ইসলাম

৩য়
কিস্তি

জ্ঞানের উৎস বিবেচনায় কুরআন এবং সুন্নাহর বাইরের জ্ঞানের ব্যাপকতা যতো বিস্তৃতই হোক না কেন, তার দ্বারা মগজ ভর্তি করে রাখলেই প্রকৃত অর্থে জ্ঞানার্জন হতে পারে না। বরং এজন্য জ্ঞানার্জনকারীকে কিছু নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করতে হবে। আবার কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান আমাদেরকে সেই মূল্যবোধের চর্চাকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা মূল্যবোধ ধারণকারী ইসলামের অনুসারী জ্ঞানী ব্যক্তিকে অর্জন করতে হয়। দায়িত্বানুভূতি তার অন্যতম। জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব যেমন আমরা জানি। তেমন অর্জিত জ্ঞানের সংরক্ষণ, গভীরভাবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং এর অনুসন্ধানের মাধ্যমে আরো উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে হয়। একইসাথে জ্ঞানের আমলের ব্যাপারে সজ্ঞানে দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করতে হয়।
আবু বারযা আল-আসলামী রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: কোনো বান্দার পদদ্বয় (কিয়ামত দিবসে) এতটুকুও সরবে না, তাকে এ কয়টি বিষয় সম্পর্কে যে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ না করা হবে? কিভাবে তার জীবনকালকে অতিবাহিত করেছে; তার অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কি আমল করেছে; কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে এবং কী কী কাজে তার শরীর বিনাশ করেছে। (সুনান আত তিরমিজি : তাওহিদ-২৪১৭)

দায়িত্ব পালনে অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তিকে জ্ঞানের ব্যাপারে সততা ও আমানতদারি হতে হয়। মুমিনের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সত্যবাদিতা। মুমিনরাই যে সত্যবাদী আল্লাহ তায়ালা তা এভাবে বলেছেন, “মুমিন তো তারাই যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে অতঃপর তাতে কোনো সন্দেহে পতিত হয়নি এবং তাদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।” (সূরা হুজুরাত : ১৫)
জ্ঞানের অন্যতম নৈতিক দিক হলো আমানতদারি তথা বিশ্বস্ততা। আমরা জানি মুমিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও আমানতদারি। সততার সাথে আমানতদারিতার এক বিশাল সম্পর্ক রয়েছে। মুমিনের বিশ্বাস ও সততা তাঁকে আমানতদার হতে উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহ বলেন, “এবং যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।” (সূরা মুমিনুন : ৮)
জ্ঞানার্জন যেমন কর্তব্য, তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়াও দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন, “আর সমস্ত মুমিনের অভিযানে বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সংবাদ দান করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।” (সূরা তাওবাহ : ১২২)
একইভাবে জ্ঞানের আমানতদারিতা মানে এমন নয় যে, তা নিজ মগজে কুক্ষিগত করে রাখতে হবে। বরং একজন মুমিন অবশ্যই অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করবে প্রতিনিয়ত। এটি রাসূলুল্লাহর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেউ রাসূলুল্লাহ সা.কে প্রশ্ন করলে সহজ সরলভাবেই তিনি তার উত্তর দিতেন। একই পদ্ধতি সাহাবায়ে কেরামগণও অবলম্বন করেছেন। তাঁদের যে বিষয় জানা প্রয়োজন হতো নিঃসংকোচে তা জ্ঞানবান ব্যক্তির কাছ থেকে জেনে নিতে প্রশ্ন করতেন। অন্য কেউ কিছু জানতে চাইলেও আন্তরিকতার সাথে তাঁর জ্ঞাত সঠিক বিষয়টি বলে দিতেন। নিজের জ্ঞানে ঘাটতি থাকলেও তা নিয়ে কোনো ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতেন না।

আবু হুরায়রাহ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, কিয়ামতের (কিয়ামত) দিন প্রথমে এক শহীদ ব্যক্তির ব্যাপারে বিচার হবে। আল্লাহ তায়ালার সামনে হাশরের (হাশর) ময়দানে তাকে পেশ করবেন এবং তাকে তিনি তার সকল নিয়ামাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। অতঃপর তার এসব নিয়ামাতের কথা স্মরণ হয়ে যাবে। তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি এসব নিয়ামাত পাবার পর দুনিয়াতে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে কী কাজ করেছো? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার (সন্তুষ্টির) জন্য তোমার পথে (কাফিরদের বিরুদ্ধে) লড়াই করেছি, এমনকি শেষ পর্যন্ত আমাকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তোমাকে বীরপুরুষ বলবে এজন্য তুমি লড়েছো। আর তা বলাও হয়েছে (তাই তোমার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে)। তখন তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

তারপর দ্বিতীয় ব্যক্তি- যে নিজে জ্ঞানার্জন করেছে, অন্যকেও তা শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন পড়েছে, তাকে উপস্থিত করা হবে। তাকে দেয়া সব নিয়ামাত আল্লাহ তাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন। এসব নিয়ামাত তার স্মরণ হবে। আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এসব নিয়ামাতের তুমি কী শোকর আদায় করেছো? সে উত্তরে বলবে, আমি ইলম অর্জন করেছি, মানুষকে ইলম শিক্ষা দিয়েছি, তোমার জন্য কুরআন পড়েছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো, তোমাকে আলিম বলা হবে, ক্বারি বলা হবে, তাই তুমি এসব কাজ করেছ। তোমাকে দুনিয়ায় এসব বলাও হয়েছে। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং মুখের উপর উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

এরপর তৃতীয় ব্যক্তি- যাকে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন ধরনের মাল দিয়ে সম্পদশালী করেছেন, তাকেও আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত করা হবে। আল্লাহ তাকে দেয়া সব নিয়ামাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। সব তারও মনে পড়ে যাবে। আল্লাহ তাকে এবার জিজ্ঞেস করবেন, এসব নিয়ামাত পেয়ে তুমি কী আমল করেছো? সে ব্যক্তি উত্তরে বলবে, আমি এমন কোনো খাতে খরচ করা বাকি রাখিনি, যে খাতে খরচ করাকে তুমি পছন্দ কর। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো, তুমি খরচ করেছো, যাতে মানুষ তোমাকে দানবীর বলে। সে খেতাব তুমি দুনিয়ায় অর্জন করেছো। তারপর তার ব্যাপারে হুকুম দেয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (মিশকাতুল মাসাবিহ : হাদীস একাডেমি-২০৫)
জ্ঞানী ব্যক্তি নিজ জ্ঞানের ব্যাপারে কখনো অহঙ্কার করতে পারে না। আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিবকে জ্ঞানের ব্যাপারে অত্যন্ত বিনয় ও ন¤্রতা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে সামান্যই জ্ঞান দান করেন, তা তিনি এভাবে বলেছেন-
“তারা আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন: রূহ আমার পালনকর্তার আদেশ ঘটিত। এ বিষয়ে তোমাদেরকে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।”(সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫)
জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্য আত্মসম্মানবোধ এক বিশেষ নৈতিকতা। এ সম্মান মর্যাদা মহান আল্লাহ প্রদত্ত। কেউ চাইলেই তা পেতে পারে না। (সূরা মুনাফিকুন : ৮, ৩৫ ফাতির : ১০) এই মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তির বিশেষ দায়িত্ব হচ্ছে, অর্জিত জ্ঞানানুযায়ী আমল করা। এ ব্যাপারে একটি বিশেষ হাদীস হলো, আবু কাবশা আল-আনমারী রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সা.কে বলতে শুনেছেন, চার প্রকার মানুষের জন্য এই পৃথিবী। আল্লাহ তায়ালা যে বান্দাহকে ধন-সম্পদ ও ইলম (জ্ঞান) দিয়েছেন, আর সে এই ক্ষেত্রে তার প্রভুকে ভয় করে, এর সাহায্যে আত্মীয়দের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহার করে এবং এতে আল্লাহ তায়ালারও হক আছে বলে সে জানে, সেই বান্দার মর্যাদা সর্বোচ্চ।

আরেক বান্দাহ, যাকে আল্লাহ তায়ালা ইলম দিয়েছেন কিন্তু ধন-সম্পদ দেননি সে সৎ নিয়তের (সঙ্কল্পের) অধিকারী। সে বলে, আমার ধন-সম্পদ থাকলে আমি অমুক অমুক ভালো কাজ করতাম। এই ধরনের লোকের মর্যাদা তার নিয়ত অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। এ দু’জনেরই সওয়াব সমান সমান হবে।
আরেক বান্দাহ, আল্লাহ তায়ালা তাকে ধন-সম্পদ প্রদান করেছেন কিন্তু ইলম দান করেননি। আর সে ইলমহীন (জ্ঞানহীন) হওয়ার কারণে তার সম্পদ স্বীয় প্রবৃত্তির চাহিদা মতো ব্যয় করে। সে ব্যক্তি এ বিষয়ে তার রবকেও ভয় করে না এবং আত্মীয়দের সাথে সৌজন্যমূলক ব্যবহারও করে না। আর এতে যে আল্লাহ তায়ালার হক রয়েছে তাও সে জানে না। এই লোক সর্বাধিক নিকৃষ্ট স্তরের লোক।
অপর এক বান্দাহ, যাকে আল্লাহ তায়ালা ধন-সম্পদও দান করেননি, ইলমও দান করেননি। সে বলে, আমার যদি ধন-সম্পদ থাকত তাহলে আমি অমুক অমুক ব্যক্তির ন্যায় (প্রবৃত্তির বাসনামতো) কাজ করতাম। তার নিয়ত অনুসারে তার স্থান নির্ধারিত হবে। অতএব, এদের দু’জনের পাপ হবে সমান সমান। (তিরমিজি : তাওহিদ-২৩২৫)

এভাবে একজন জ্ঞানবান আমলদার ব্যক্তির সর্বশেষ নৈতিক দায়িত্ব হলো, জ্ঞানের ব্যাপক প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত থাকা। বর্তমান যুগে প্রকৃত জ্ঞান এবং জ্ঞানীর যেমন অভাব, তার চেয়ে বেশি ঘাটতি জ্ঞানের প্রচার-প্রসার। যে ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা.-এর শেষ ভাষণ ছিলো অতি স্পষ্ট। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের উপস্থিত লোকেরা অনুপস্থিত লোকদের নিকট অবশ্যই পৌঁছে দিবে।’ ইতিহাস সাক্ষী, রাসূলুল্লাহ সা.-এর সেই নির্দেশ সাথে করে বিদায় হজের ভাষণ শেষে সাহাবাগণ নিজ নিজ গন্তব্য ঠিক করে ছুটে গিয়েছিলেন; অনেকেই আর ফিরে আসতে পারেননি। জ্ঞান বিতরণ করতে করতে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে সমাহিত হয়েছেন।

জ্ঞানকেন্দ্রিক এসব নৈতিক বিষয় সামনে রেখে সাহাবায়ে আজমাইন তাঁদের পথ খুঁজে নিয়েছেন। ঐশী প্রশিক্ষণের দিক ধরে ধরে এগিয়ে গেছেন। তাঁরা পরিণত হয়েছেন সোনার মানুষে। দুনিয়ায় পেয়েছেন সম্মান-মর্যাদা ও বিজয়; একইসাথে আখিরাতে মহাপুরস্কার জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর গোটা জীবন থেকে উম্মাহর সার্বিক প্রশিক্ষণের যে কয়েকটি দিক আমরা দেখতে পাই তা হলো:
১. আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ।
২. বুদ্ধিবৃত্তির প্রশিক্ষণ।
৩. দৈহিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধির প্রশিক্ষণ।

এই তিনটি দিক নিয়ে আজকের সমাজে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে জাতিকে কেউ কেউ আত্মকেন্দ্রিক হতে উৎসাহিত করছে, কেউ কেউ উগ্রবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করছে আবার কেউ কেউ দুনিয়ামুখী হতে বুদ্ধি জোগাচ্ছে। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সা.-এর এই তিন দিক থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাহাবায়ে আজমাইনগণ যে বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজেদের গড়ে তুলেছিলেন; আজ তার বড় অভাব আমরা দেখছি। আমরা এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত ধারণা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।
[চলবে]
লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

SHARE

Leave a Reply