রাসূলুল্লাহ সা. -এর প্রশিক্ষণ রাশেদুল ইসলাম

সপ্তম কিস্তি

(পূর্ব প্রকাশের পর)

দৈহিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধির প্রশিক্ষণ
মানুষ মহান আল্লাহর সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। এজন্য মানুষের প্রতি মহান আল্লাহর অনুগ্রহও অপরিসীম। এ অনুগ্রহ ভালোবাসার। আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়ার্দ্র ভালোবাসার। তবে এ ভালোবাসা একপাক্ষিক নয়। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মানুষকে ভালোবাসতে হয় স্বয়ং আল্লাহকে। মাধ্যম দু’টি; মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলিইহিস সালাম এবং মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা। এ বিনিময় মূলত ইবাদতের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আল্লাহ নির্ধারিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পথ অনুযায়ী মুমিনের প্রতিটি পদক্ষেপ ইবাদত। যে ইবাদতের বাস্তবতা মুমিনকে হৃদয় এবং বাহ্যিকভাবে সুখী করে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধের দিকে নিয়ে যায়।
মহান আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে নেয়ার অর্থ দুনিয়া বিমুখতা নয়। অনেকের ধারণা বা অনুমান, আল কুরআনে আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনকে সংক্ষিপ্ত হিসেবে উল্লেখ করার মাধ্যমে দুনিয়াবি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে থাকতে বলা হয়েছে। এখানে বিশেষভাবে খেয়াল করতে হবে যে, দুনিয়া এমন কোনো জায়গা নয়, যেখানে ¯্রষ্টার সমস্ত সৃষ্টি কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়। সম্পর্ক মানেই পরস্পরের সাথে হক জড়িত। আর এসব হক আদায় না করার মানেই কোনো না কোনো সৃষ্টি অসুবিধার মধ্যে থাকবে।
আল্লাহ আমাদের জন্য তথা মানুষের জন্য তাঁর জমিন প্রশস্ত করেছেন। এ জমিনে বিচরণের জন্য সক্ষমতা প্রয়োজন। ব্যক্তির গঠনগত দিকে বিবেচনায় কর্মপরিধিও গণ্ডিবদ্ধ থাকে। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব দেন না। আল্লাহ বলেন- “আল্লাহ কারোর ওপর তার সামর্থ্যরে অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা চাপান না। প্রত্যেক ব্যক্তি যে নেকি উপার্জন করেছে তার ফল তার নিজেরই জন্য এবং যে গোনাহ সে অর্জন করেছে, তার প্রতিফলও তারই ওপর বর্তাবে।” (সূরা বাকারাহ : ২৮৬)
যেহেতু আল্লাহ প্রত্যেকের সক্ষমতা বিবেচনায় কর্ম নির্ধারণ করেছেন, সেহেতু নির্ধারিত পরিধিতে এই কর্ম সম্পাদনের জন্য জবাবদিহিতাও যে হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু আমরা মানুষরা জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং জ্ঞানের সঠিক ধারণা থেকে বিরত থাকার কারণে কর্ম সম্পাদনের জরুরিয়ত থেকে বরাবর গাফেল। বিশেষ করে দুনিয়াকে কারাগার বিবেচনার জন্য নির্ধারিত হাদিসকে আমরা অত্যধিক কঠোরতার সাথে বিবেচনা করতে গিয়ে নিজেকে গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলি। যার দরুন দুনিয়ার কল্যাণগেুলো থেকে দূরে থাকি।
সৌন্দর্য-সৌষ্ঠব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
আরবের মরুভূমিতে মানুষের স্বাভাবিক জীবন ছিলো সুশ্রীহীন। সুনির্দিষ্ট প্রভাবশালী মহলই শুধু জাঁকজমকভাবে চলতো; আজকের দুনিয়ার হিন্দুত্ববাদের ধরন দেখলে কিছুটা চাক্ষুষ বোঝা যায়। হিন্দুরা যেমন জাত ভেদে জীবনাচার নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তেমন। জাহেলিয়াতের যুগে আল্লাহ এমন এক অনন্য দ্বীন পাঠালেন, যার দিকনির্দেশনা প্রত্যেক মানুষকে মর্যাদাবান করেছে। মানুষকে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য-সৌষ্ঠবকে ঔদাসীন্যের দৃষ্টিতে দেখার পরিবর্তে তা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেছেন- “হে মুহাম্মাদ! তাদেরকে বলে দাও, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সৌন্দর্য সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো কে হারাম করেছে? আর আল্লাহর দেওয়া পবিত্র জিনিসগুলো কে নিষিদ্ধ করেছে? বলো, দুনিয়ার জীবনেও এ সমস্ত জিনিস ঈমানদারদের জন্য, আর কিয়ামতের দিনে এগুলো তো একান্তভাবে তাদেরই জন্য হবে। এভাবে যারা জ্ঞানের অধিকারী তাদের জন্য আমার কথাগুলো আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বর্ণনা করে থাকি।” (সূরা আরাফ : ৩২)
মহান আল্লাহর আনুগত্যকারী অনেক মানুষ এখনো মনে করেন, আখিরাতের জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার মানে দুনিয়ার সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থেকে দূরে থাকা। এক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনকে পরীক্ষাগার হিসেবে নসগত বর্ণনাকে হাজির করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। এক কথায়, দুনিয়া বিমুখতাপূর্ণ জীবন পরিচালনা করেন। এটা যে কত মূর্খতাপূর্ণ চিন্তা ও ধারণা, তা বলে শেষ করা যাবে না। খ্রিষ্টান ধর্মের যাজকগণ এমন চিন্তা লালন করেন এবং তাদের ভক্তকুলকে তার শিক্ষা দেন। মহান আল্লাহ যেখানে সমস্ত সৃষ্টিকুলকে মানুষের জন্য এবং প্রত্যেক সৃষ্টি পারস্পরিক সুবিধার জন্য বানালেন, সেখানে নিজেকে দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, সৌন্দর্য-সৌষ্ঠব থেকে দূরে থাকার অর্থ দাঁড়ায়, একে অপর থেকে দূরে থাকা। কেউ কারো কাজে না লাগা। অথচ বিপরীতে আল্লাহ অনন্য এক নজির উল্লেখ করলেন- “একবার যখন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাকে (কারুনকে) বললো, অহঙ্কার করো না, আল্লাহ অহঙ্কারকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আল্লাহ তোমাকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা দিয়ে আখেরাতের ঘর তৈরি করার কথা চিন্তা করো এবং দুনিয়া থেকেও নিজের অংশ ভুলে যেয়ো না। অনুগ্রহ করো যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করার চেষ্টা করো না। আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা কাসাস : ৭৬-৭৭)
আল্লাহ এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন কারুনের ব্যাপারে। কারুন শুধুমাত্র দুনিয়ার সুখকে প্রাধান্য দিয়েছিলো। অথচ খোদায়ী পন্থা হলো, একজন মুমিন দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় দিকের কল্যাণ মহান আল্লাহর নিকট থেকে চেয়ে নিবে। আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য অবারিত নিয়ামত রেখেছেন, শুধু নির্ধারিত সীমার মধ্যে থেকে বান্দাকে তা গ্রহণ করতে হবে।
দুনিয়ার মানুষ এবং ব্যক্তি নিজের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে। কেউ চাইলেই তা এড়াতে পারে না। আল্লাহ তো মানুষকে মর্যাদাবান করেছেন তাঁর সীমারেখার ব্যাপারে উদাসীনতার জন্য নয়। বরং, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসারে এক মানুষ অপর মানুষের প্রতি এবং বক্তি নিজ শরীরের প্রতি যত্ন নিবে। বিষয়গুলো খুব সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা সাব্যস্ত।
মহান আল্লাহ বলেন- “এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল। তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য। তোমরা নেকির হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)
পরস্পরের কল্যাণ কামনা করাই যথেষ্ট নয়, বরং কেউ ভুল পথের দিকে যেতে থাকলে কিংবা ভুল বেছে নিয়ে থাকলে তাকে সতর্ক করতে হবে। বিষয়টি মাত্র একটি হালকা পদক্ষেপ হিসেবে নয়, শক্ত পদক্ষেপে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সংস্কারমূলক পদ্ধতিতে এগোতে হবে। ক্রমধারা অবলম্বন করে টার্গেটের মন থেকে ভুলগুলো দূর করতে হবে। একই পদ্ধতি নিজের শরীরের জন্য নিতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘আবদুল্লাহ ইবনু আমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে বললেন: আমাকে কি এ খবর জানানো হয়নি যে, তুমি সারা রাত সালাতে কাটাও। আর সারা দিন সিয়াম পালন কর। তিনি বললেন: তুমি (এরকম) করো না। রাতের কিছু অংশ সালাত আদায় কর, আর ঘুমাও। কয়েক দিন সাওম পালন কর, আর কয়েকদিন ইফতার কর (সাওম ভঙ্গ কর)। তোমার উপর তোমার শরীরের হক আছে। তোমার উপর তোমার চোখের হক আছে। (বুখারি : ইফা-২৫১৭)
এখানে শরীরের হক সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছেন, যার জন্য রোজা পালন করা কষ্টসাধ্য বা দুঃসাধ্য। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে রুখসাত দিচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে দুগ্ধগ্রহণ করছে এমন শিশুর দুধের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হলে মায়ের রোজা না রাখার অনুমতি আছে। এমনকি ব্যক্তি নিজেই যদি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকে, তাহলেও এই হাদিস অনুসারে তাকে রোজা না রাখার সুযোগ দিচ্ছে ইসলাম। এখানে এ কথা সুস্পষ্ট হচ্ছে যে, স্বাস্থ্যগত সমৃদ্ধি জীবন পরিচালনার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
একজন মানুষকে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য আজকালকার যুগে নানাবিধ ব্যায়াম, ডায়েট চার্ট ফলো করতে দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাভাবিক জীবন পরিচালনা করেছেন। যাতে করে মিতব্যয়িতা-মিতাচারের মাধ্যমে সহজ জীবন নিশ্চিত করেছেন, পাশাপাশি শারীরিকভাবে খুব স্বাভাবিক রোগবালাই থেকে মুক্ত থেকেছেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশিক্ষণ ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম পদ্ধতি
ইসলাম কারো মনের ওপর কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয় না। দীর্ঘ দিনের লালিত যাপিত জীবনকে হঠাৎ করে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ছেড়ে আসার জন্য চাপ দেয় না। এটা ইসলামের নীতি নয়। ইসলামের নীতি হলো, লাগামহীন জীবন পরিচালনা থেকে বের হয়ে বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং সে অনুযায়ী কুরআনিক পন্থায় নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজেকেই করা। এই নিয়ন্ত্রণ পরিপূর্ণভাবে করার জন্য মূল প্রশিক্ষণের বয়স মানুষের ছোট সময় থেকে। পারিবারিক শিক্ষা একটি মাধ্যম, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বেই মুসলিম পিতা-মাতা এ ব্যাপারে সচেতন করে থাকেন। যার প্রভাব হৃদয়ে গেঁথে নেয়া সহজ হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য যে প্রশিক্ষণ নীতিমালা রেখে গেছেন, তার অনুসরণ একজন মানুষকে আগা-গোড়া পরিপূর্ণ করে। অন্তর্গত পরিশুদ্ধির সাথে বুদ্ধিগত পরিপূর্ণতা একজন ব্যক্তিকে সঠিক বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করে। শরীরগত সক্ষমতা তাকে সেই সিদ্ধান্তের শতভাগ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে। আমাদের সামনে আমাদের প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম এবং বিশেষ করে খোলাফায়ে রাশেদার ব্যক্তিগত এবং সামষ্টিক জীবন তার উৎকৃষ্ট নমুনা।
(সমাপ্ত)
লেখক : সম্পাদক, ছাত্র সংবাদ

SHARE

Leave a Reply