রাসূল সা. এর অনুপম জীবনাচরণ । ড. মোবারক হোসাইন

রাসূল সা. এর অনুপম জীবনাচরণ । ড. মোবারক হোসাইনউত্তম আচার-আচরণ ও চারিত্রিক মাধুর্যতার দ্বারা মানুষের মাঝে যতটা প্রভাব বিস্তার করা যায় তা অন্য কিছুতেই সম্ভব নয়। রাসূল সা. তাঁর উত্তম আখলাক ও সুনিপুণ ব্যবহার দ্বারা সর্বকালের অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। তাঁর অসাধারণ চারিত্রিক মাধুর্য ও অনুপম ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব: ২১) অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আম্বিয়া: ১০৭) তৎকালীন অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগে তিনি অবিস্মরণীয় ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয়-নম্রতা, সত্যনিষ্ঠতা প্রভৃতি বিরল চারিত্রিক মাধুর্য দিয়েই বর্বর আরব জাতির আস্থাভাজন হতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সা.। সমগ্র সৃষ্টির জন্যই তিনি আল্লাহর রহমত। এ বিশ্বে তাঁর মত অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব, অনুপম চরিত্র, মধুর স্বভাবের মানুষ কেউই আসেননি। তাঁর অনুপম জীবনাচরণ, চারিত্রক সৌন্দর্য ও মাধুর্যতার কিছু আকর্ষণীয় দিক তুলে ধরা হলো-

কোমল ও নমনীয় ব্যবহার: রাসূল সা. এতই কোমল ও নমনীয় ব্যবহারের অধিকারী ছিলেন যে তাঁর পবিত্র সংশ্রব কিংবা সামান্যতম সুদৃষ্টির কারণেও অনুসারীরা তাঁকে প্রাণাধিক ভালোবাসত এবং মনে-প্রাণে গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করত। তাঁর কোমল ব্যবহার সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা) বলেন, ‘নবী করিম সা. কঠোর ভাষী ছিলেন না, এমনকি প্রয়োজনেও তিনি কঠোর ভাষা প্রয়োগ করতেন না। তাঁর মধ্যে আদৌ প্রতিশোধ প্রবণতা ছিল না। মন্দের প্রতিবাদ তিনি মন্দ দিয়ে করতেন না, বরং মন্দের বিনিময়ে তিনি উত্তম আচরণ করতেন। সব বিষয়েই তিনি ক্ষমাকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি এতটা বিনয়ী ও নম্র ছিলেন যে কথা বলার সময় কারও মুখণ্ডলের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে কথা বলতেন না। কোনো অশোভন বিষয় উল্লেখ করতেন না।’ ইবরাহিম ইবনে মুহাম্মদ (রা) থেকে বর্ণিত, ‘আলী (রা) যখন রাসূল সা.-এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতেন তখন বলতেন, তিনি যখন পথ চলতেন তখন পা তুলে এমনভাবে চলতেন যে, মনে হতো তিনি যেন উঁচু স্থান হতে নিচে অবতরণ করছেন।’ (শামায়েলে তিরমিযি: ৯৩) তাঁর চরিত্র ছিল সর্বোত্তম মানবিক গুণাবলীতে বিভূষিত। তিনি মানবতার সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি সব সময় সকল মানুষের সাথে বিনম্র আচার-আচরণ করতেন। সকলকেই তিনি তাঁর অমায়িক ব্যবহার দ্বারা আকৃষ্ট করতেন। তাঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে বিমোহিত হতেন।

সদা হাস্যোজ্জ্বল ও সদালাপী: তিনি সব সময় মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন ও সদালাপ করতেন। তাঁর মধুর বচনে সবাই অভিভূত হতো। আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলুল্লাহ সা. মুচকি হাসতেন।’ (শামায়েলে তিরমিযি : ১৬৯) অপর একটি হাদীস, আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চেয়ে অধিক মুচকি হাস্যকারী ব্যক্তি কাউকে দেখিনি।’ (শামায়েলে তিরমিযি: ১৬৮) তাঁর অভিভাষণ শুনে জনসাধারণ অশ্রু সংবরণ করতে পারত না। তিনি জনগণকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ‘দয়ালু প্রভু আল্লাহর ইবাদত করো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য প্রদান করো, সালামের বহুল প্রচলন করো এবং এসব কাজের মাধ্যমে বেহেশতে প্রবেশ করো।’ একদা এক ব্যক্তি নবী করিম সা.-কে ইসলামে সবচেয়ে ভালো কাজ কোনটি প্রশ্ন করলে তিনি উত্তরে জানালেন, ‘অভুক্তকে খাওয়ানো আর চেনা-অচেনা সবাইকেই সালাম করা।’ (বুখারি ও মুসলিম)

মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন: পৃথিবীতে উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার হলেন মা। রাসূল সা. ছোট বয়সেই তাঁর মাকে হারান। তবে তিনি মাতৃতুল্য সবাইকে মায়ের মতো সম্মান করতেন। রাসূল সা. তাঁর দুধমাতা হালিমা (রা)-কে কিরূপ সম্মান প্রদর্শন করতেন এ ব্যাপারে একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আবু তুফাইল (রা) বলেন, ‘আমি রাসূল সা.কে আল-জিইরানা নামক স্থানে গোশত বণ্টন করতে দেখেছি। আবু তুফাইল (রা) বলেন, ‘তখন আমি যুবক ছিলাম এবং উটের হাড় বহন করছিলাম। এ সময় এক মহিলা এলেন। তখন রাসূল সা. ওই মহিলার সামনে তাঁর গায়ের চাদর বিছিয়ে দিলেন। তিনি তাঁর ওপর বসলেন। আমি বললাম, ইনি কে? সাহাবীরা বললেন, ইনি হলেন তাঁর দুধমাতা।’ (সহীহ মুসলিম: ৫১৪৪)

অধীনস্থদের সাথে আচরণ: তিনি তাঁর অধীনস্থ কাজের লোকদের সঙ্গে যে ব্যবহার করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। তাদের ভাই বলে স্বীকৃতি দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের মতো সঙ্গত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘তারা হচ্ছে তোমাদের ভাই ও তোমাদের খাদেম। মহান আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। অতএব তোমাদের যার অধীনে তার ভাই আছে, তাকে তাই খাওয়ানো উচিত যা সে নিজে খায় এবং তাকে তাই পরানো উচিত যা সে নিজে পরে। সামর্থ্যরে বাইরের কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ো না। আর এ ধরনের কাজের বোঝা তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে তবে তাদের সাহায্য করো।’ (সহীহ বুখারি: ১৩৬০) তিনি কখনো কোনো কাজের লোককে কষ্ট দেননি। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, ‘আমি একটানা দশটি বছর রাসূল সা.-এর সেবায় নিয়োজিত ছিলাম। এই সুদীর্ঘ সময়ে রাসূল কখনোই আমার প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করে উফ শব্দটুকু উচ্চারণ করেননি। আমার কোনো কাজ দেখে কখনো বলেননি, তুমি এ কাজ করলে কেন? কিংবা কাজ না করলে কখনো বলেননি, তুমি এ কাজ করলে না কেন? (সহীহ বুখারি: ৫৬৯১) এ জন্যই মহানবীর চরিত্রকে মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

উদারতা ও মহানুভবতা: রাসূল সা. ছিলেন উদারতা ও মহানুভবতার মূর্তপ্রতীক। উদারতায় সুশোভিত ব্যক্তির জন্য তিনি রহমতের দোয়া করেছেন। এরশাদ করেছেন, ‘বেচাকেনা ও অন্যের প্রয়োজন পূরণে উদার-সহনশীল ব্যক্তিকে আল্লাহ দয়া করুন।’ (সহীহ বুখারি) রাসূল সা.কে যখনই দুই কাজের একটি বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হতো, তিনি অবশ্যই অপেক্ষাকৃত সহজটি বেছে নিতেন- যদি না সেটি গুনাহের কাজ হয়। জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা) বলেন, ‘রাসূল সা. ছিলেন সহজপন্থী লোক।’ ইমাম নববি (র) বলেন, ‘অর্থাৎ সহজ স্বভাব এবং মহৎ চরিত্রের লোক ছিলেন। স্বভাব-সরল সূক্ষ্মদর্শী ব্যক্তি ছিলেন। মহানবী সা.-এর জীবনের নানান কাজ-কর্মের মাঝে এ উদারতা ও কোমলতা ফুটে ওঠে, যা দৃশ্যমান হয় তাঁর ইবাদত ও লেনদেনে এবং সঙ্গী-স্বজন ও শত্রু-মিত্রের সঙ্গে তাঁর আচরণ এবং আখলাকে। বুখারি, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে জাবের (রা)-এর ভাষ্যে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমরা রাসূল সা. এর সঙ্গে জাতুর রিকা অভিযানে ছিলাম। সুপরিসর ছায়া ছড়ানো এক বৃক্ষের নিচে আমরা রাসূল সা.কে রেখে (নিজেদের মতো বিশ্রামের জন্য) গেলাম। এরই মধ্যে এক মোশরেক এসে তরবারিসহ তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে গেল। সে তাঁকে বলল, কে আপনাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ’। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাত থেকে তরবারিটি পড়ে গেল। রাসূল সা. সেটি হাতে তুলে নিলেন। এবার তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে কে বাঁচাবে আমার হাত থেকে?’ সে বলল, আপনি উত্তম গ্রহণকারী হয়ে যান। জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই?’ সে বলল, না। তবে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনার বিরুদ্ধে আমি লড়াই করব না এবং এমন লোকদের সঙ্গীও হবো না, যারা আপনার সঙ্গে লড়াই করে। এ কথা শুনে নবী সা. লোকটিকে ছেড়ে দেন।’ বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি তারপর নিজের সঙ্গীদের মাঝে ফিরে যায়। তাদের গিয়ে বলে, ‘আমি তোমাদের কাছে এসেছি শ্রেষ্ঠতম মানুষের কাছ থেকে।’ রাসূল সা. লোকটিকে ইসলাম গ্রহণে জবরদস্তি করেননি। কৃতকর্মের জন্য তাকে শাস্তিও দেননি। ফলে লোকটির হৃদয়ে ইসলাম প্রবেশ করে। তিনি স্বজাতির কাছে ফিরে যান। আল্লাহ তার মাধ্যমে অনেক মানুষকে হেদায়েত দান করেন।

দাস-দাসীদের সাথে সদাচরণ: দাস-দাসীদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন অত্যন্ত দয়াশীল। তিনি তাঁর ক্রীতদাস জায়েদ বিন হারেস (রা)কে মুক্ত করে দিয়ে পালকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। জায়েদ বিন হারেস (রা) রাসূল সা.-এর চরিত্রে এমন মুগ্ধ ছিলেন যে, তাঁর বাবা ও চাচা তাকে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি রাসূল সা.-এর সঙ্গ ছেড়ে তাদের সঙ্গে যেতে রাজি হননি। দাস-দাসীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে রাসূল সা. অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করতেন। কোনো সাহাবী দাস-দাসীদের সঙ্গে অসদ্ব্যবহার করলে তিনি তাকে ভর্ৎসনা করতেন এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দিতেন। আল্লাহ তায়ালা তাদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তাই যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন নিজে যা খায় তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরিধান করে, তাকেও তা-ই পরায়। তাদের ওপর এমন কাজ চাপিয়ে দিও না, যা তাদের জন্য অধিক কষ্টদায়ক। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সহযোগিতা করবে।’ (সহীহ বুখারি : ৩০)

শিশুদের প্রতি স্নেহ ও মমতা: প্রিয়নবী ছোটদের অনেক ভালবাসতেন, অনেক আদর করতেন। তিনি শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, কোলে তুলে নিতেন। তাদের জন্য দু‘আ করতেন। শিশুরাও নবীজীকে অনেক আপন মনে করত। তাঁকে ঘোড়া বানিয়ে খেলা করত। কাঁধে চড়ত, পিঠে চড়ত। তুমি যদি নবীজীকে দেখতে তুমিও তার কোলে উঠতে চাইতে, নবীজী তোমাকেও আদর করে কোলে তুলে নিতেন। আনাস ইবনু মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা.-এর চাইতে শিশুদের প্রতি বেশি দয়াশীল আর কাউকে আমি দেখিনি। (সহীহ মুসলিম: ৫৯২০) নবীজী নিজে যেমন শিশুদের আদর করতেন, তাঁর উম্মতকেও বলে গেছেন- শিশুদের আদর করতে। হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, ‘নবী কারীম সা. তাঁর নাতি হাসানকে চুমু খেলেন। সেখানে আকরা ইবনে হাবিস নামে এক সাহাবী বসা ছিলেন। হাসানকে চুমু খাওয়া দেখে তিনি বললেন, আমার দশটি সন্তান রয়েছে। আমি তাদের কাউকে চুমু খাইনি। নবীজী তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, যে দয়া করে না, তাঁর প্রতিও দয়া করা হবে না।’ (সহীহ বুখারী: ৫৬৫১, সহীহ মুসলিম: ৬৫)

যুবকদের প্রতি মমত্ববোধ: যুবকদের বেয়াদবিপূর্ণ কথা শুনেও রাসূলুুল্লাহ সা. তাদের ধমক দিতেন না। বরং তাদের অত্যন্ত কোমল ভাষায় উপদেশ দিতেন ও বোঝানোর চেষ্টা করতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন। তাঁর হিকমতপূর্ণ আচরণে বিপথগামী যুবকরাও সুপথে ফিরে আসত। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা বর্ণনা করে হযরত আবু উমামা (রা) বলেন, একদিন এক যুবক রাসূল সা.-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে ব্যভিচার করার অনুমতি দিন!’ এ কথা শুনে লোকেরা তাকে ধমক দিয়ে বলল, থামো, থামো! (এ কী বলছ তুমি?)। কিন্তু রাসূল সা. তাকে বললেন, ‘আমার কাছে এসো। সে তাঁর কাছে এসে বসলে তিনি তাকে বললেন, তুমি কি নিজ মায়ের জন্য তা পছন্দ করো? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, তাহলে লোকেরাও তো তাদের মায়েদের জন্য তা পছন্দ করে না। অতঃপর তিনি বললেন, তাহলে তুমি কি তোমার মেয়ের জন্য তা পছন্দ করো? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, তাহলে লোকেরাও তো তাদের মেয়েদের জন্য তা পছন্দ করে না। অতঃপর তিনি বললেন, তাহলে তুমি কি তোমার বোনের জন্য তা পছন্দ করো? সে বলল, না, আল্লাহর কসম! আল্লাহ আমাকে আপনার জন্য কোরবান করুন। তিনি বললেন, তাহলে লোকেরাও তো তাদের বোনেদের জন্য তা পছন্দ করে না।… অতঃপর তিনি তাঁর বুকে হাত রাখলেন এবং তাঁর জন্য দোয়া করে বললেন, হে আল্লাহ! তুমি তার গোনাহ মাফ করে দাও, তার হৃদয়কে পবিত্র করে দাও এবং তাকে ব্যভিচার থেকে রক্ষা করো।’ বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর সেই যুবক আর ব্যভিচারের দিকে ভ্রুক্ষেপও করেনি। (মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ১৬৫৫)

শিক্ষাদানে কোমলতা: রাসূল সা. পাঠদানের সময় থেমে থেমে কথা বলতেন। যেনো তা গ্রহণ করা শ্রোতা ও শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হয়। খুব দ্রুত কথা বলতেন না যেনো শিক্ষার্থীরা ঠিক বুঝে উঠতে না পারে আবার এত ধীরেও বলতেন না যাতে কথার ছন্দ হারিয়ে যায়। বরং তিনি মধ্যম গতিতে থেমে থেমে পাঠদান করতেন। হযরত আবু বকর (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমরা কি জানো- আজ কোন দিন? …এটি কোন মাস? …এটি কী জিলহজ নয়?…এটি কোন শহর?’ (সহীহ বুখারি: ১৭৪১)

বিধবা ও এতিমদের প্রতি দরদ: ইসলামপূর্ব যুগে এতিম ও বিধবাদের কোনো অধিকার সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। বাবা মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অসহায় সন্তানদের প্রতি শুরু হতো অত্যাচার-অবিচার ও জুলুম-নিপীড়ন। তাদের অধিকার দেওয়া তো হতোই না, বরং এতিম শিশুদের জন্য বাবার রেখে যাওয়া সম্পদ কেড়ে নেওয়ার জন্য শুরু হতো ষড়যন্ত্র। অনুরূপভাবে স্বামী মারা যাওয়ার পর বিধবা স্ত্রী মানুষের কটু কথার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। স্বামীহারা অসহায় নারী অপমান ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে জীবন-যাপন করত। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, বিধবা ও অসহায়দের যারা অভিভাবক হবে এবং দায়-দায়িত্ব পালন করবে তাদের সম্পর্কে রাসূল সা. বলেন, ‘বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারীর মতো।’ হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, আমার ধারণা রাসূল সা. এও বলেছেন যে, ‘(বিধবা ও অসহায়দের তত্ত্বাবধানকারীর মর্যাদা) ওই ব্যক্তির মতো, যে অলসতা না করে সারা রাত জেগে ইবাদত করে এবং ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন রোজা রাখে।’ (বুখারি ও মুসলিম) অন্য হাদীসে আছে- ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো এতিমের মাথায় হাত বুলাবে যেসব চুলের ওপর দিয়ে তাঁর হাত অতিক্রম করবে এর প্রতিটির বিনিময়ে তার জন্য সওয়াব লেখা হবে।’ (মুসনাদে আহমদ, তিরমিজি)

পরিবারের জন্য আন্তরিকতা: আমাদের রাসূল সা.-এর বাস্তব জীবনী ছিলো মার্জিত, প্রীতিময়, ভালোবাসাপূর্ণ আবেগঘন ও হাসি রসিকতার। তাঁর একাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও কারো কাছ থেকে এমন কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি যে, তিনি তাদের সাথে কর্কশ রূঢ় ব্যবহার করেছেন। তিরমিযি শরীফের এক হাদীসে রাসূল সা. নিজেই বলেন, ‘তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে যে তার পরিবার পরিজনের কাছে সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবার পরিজনের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিযি) তাঁর পরিবার থেকে শুনে নেওয়া যাক তিনি কেমন ছিলেন, কিরূপ ছিল স্ত্রীদের সাথে তাঁর আচার ব্যবহারের সীমারেখা। বুখারি শরীফের এক বর্ণনায় রয়েছে হযরত আমরাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আয়েশা (রা)কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূল সা. ঘরে অবস্থানকালে কী করতেন? জবাবে তিনি বললেন, রাসূল সা. ছিলেন একজন মানুষ। পোশাকের মধ্যে তিনি উকুন তালাশ করতেন, ছাগল দোহন করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পন্ন করতেন। আর ইবাদতের সময় হলে উঠে চলে যেতেন।’ (শামায়েলে তিরমিযি: ২৬৩) এর থেকে আমরা বুঝতে পারি উম্মাহাতুল মুমিনদেরকে তিনি সদা সর্বদা ঘরোয়া কাজের বিষয়ে প্রচুর সাহায্য করতেন। শুধু এতোটুকু নয়। স্ত্রীদের সাথে হাসি রসিকতা করতেন যাতে পূর্ণ ভালোবাসার সৃষ্টি হয়। হযরতের একাধিক স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন তাদের খোঁজ-খবর নিতেন। হযরত আয়েশা (রা)-এর সাথে রাসূল সা. দৌড় প্রতিযোগিতার কথাতো সকলের কাছেই প্রসিদ্ধ। একজন স্বামী আর স্ত্রীর মাঝে কতোটা মধুময় সম্পর্ক হলে খেলা করে! একবার রাসূল সা. হারতেন অন্যবার জিততেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ সাংসারিক জীবন সুখী ও ছন্দময় করে তুলেন।

সাদাসিধে জীবনযাপন: সৃষ্টির সেরা মানুষ হয়েও তিনি বিলাসিতামুক্ত অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। রাসূল সা. গাছের লতা-পাতা দিয়ে তৈরি করা বিছানায় ঘুমাতেন। এতে তাঁর শরীর মুবারকে দাগ হয়ে যেত। সাহাবারা ভালো কোনো বিছানার ব্যবস্থা করার আবদার জানালে তার প্রতি-উত্তরে তিনি বলতেন, ‘আমার দুনিয়ার প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই। আমি দুনিয়াতে একজন পথচারী ছাড়া আর কিছুই নই। যে পথচারী একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে একটু পরে সেটা ছেড়ে চলে যায়।’ (তিরমিজি: ২৩৭৭)

সাহাবীদের প্রতি দরদ: রাসূল সা. সাহাবীদের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত কোমল হৃদয়। আল্লাহর হুকুম হদ, কিসাস ইত্যাদি পালনের ব্যাপারে কঠোর হলেও ব্যক্তিগত কারণে কারও সাথে কখনও কঠোর ব্যবহার করেননি। তাই সাহাবীরা রাসূল সা.কে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভে নিজেদের ধন্য মনে করতেন। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগী ও কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতেন তাহলে তাঁরা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।’ (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)

জীব-জন্তুর প্রতি অনুকম্পা: রাসূল সা.-এর অনুকম্পা শুধুমাত্র মানবজাতির প্রতিই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জীব-জন্তু ও জড়পর্দাথের প্রতিও ছিল বিশেষ মায়া। রাসূল সা.-এর কতিপয় বাণী এবং তদ্বিষয়ে কিছু আলোচনাতে এটি সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এক হাদীসে নবী সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি বৃক্ষরোপণ করল অথবা কোন ফসল উৎপাদন করল, আর উক্ত বৃক্ষের ফল বা ফসল কোন মানুষ বা কোন চতুষ্পদ জন্তু বা কোন হিংস্র জন্তু বা কোন পাখি ভক্ষণ করল তাহলে সে ব্যক্তির জন্য উহা সাদকাহ হিসেবে পরিগণিত হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ : ১৫২৩৫) উক্ত হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, কারো রোপণকৃত বৃক্ষ হতে কোন ফল বা উৎপাদিত ফসল হতে কোন ফসল যদি কুকুর, শৃগাল, বিড়াল বা এ জাতীয় কোন পশু বা কীটপতঙ্গ খায় তাহলে সে জন্যও সে সওয়াব পাবে। কাজেই মানুষের উচিত রাস্তার মোড়ে মোড়ে এ নিয়তে ফলদার গাছ লাগানো। জীবকে কষ্ট দেয়া অমানবিক ও গর্হিত কাজ বলে রাসূল সা. সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘একজন স্ত্রীলোক একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। অতঃপর অনাহারে বিড়ালটি মারা যায়। এ অপরাধে স্ত্রীলোকটিকে শাস্তি দেয়া হয় এবং জাহান্নামি বলে ঘোষণা দেয়া হয়। সে উহাকে বেঁধে রেখেছিল, অথচ তাকে আহারও করায়নি, পানও করায়নি। অপরপক্ষে তাকে ছেড়ে দেয়নি, যাতে সে জমিনের লতা-পাতা খেয়ে বাঁচত।’ (সহীহ মুসলিম : ৫৯৮৯) রাসূল সা.-এর যুগে ভ্রমণের জন্য একমাত্র যানবাহন ছিল জন্তু। জন্তুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়াও অমানবিক। তাই রাসূল সা. কোন জন্তুর ওপর আরোহণ করত কারো সাথে কথা বলে বা অন্য কোন প্রয়োজনে সময় নষ্ট করে জন্তুকে কষ্ট না দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। রাসূল সা. বলেন, ‘তোমরা সুস্থ অবস্থায় এ সমস্ত পশুদের ওপর আরোহণ কর এবং সুস্থ অবস্থায় এদেরকে ছেড়ে দাও। আর তোমরা সেগুলোকে চেয়ারে পরিণত কর না।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৫৬৭৯) পশুদেরকে অভুক্ত রাখা এবং তাদেরকে দুর্বল ও কৃশকায় করে তোলাও সমীচীন নয়। এ ব্যাপারে সাহল ইবনুল হানযালিয়্যাহ আল আনসারী (রা) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘একদা রাসূল সা. একটি উটের নিকট দিয়ে গমন করছিলেন। তিনি দেখলেন ক্ষুধায় উটটির পেট পিঠের সাথে লেগে গেছে। এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. বললেন- এসব নির্বাক পশুদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। এরা কথা বলতে পারে না এবং প্রয়োজন ব্যক্ত করতে পারে না, এরা যখন আরোহী বহনের যোগ্যতা রাখে তখন তাদের পিঠে আরোহণ কর এবং সুস্থ অবস্থায় তাদেরকে ছেড়ে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৫৪৮ ও ২৫৫০)

রাসূল সা.-এর ন্যায়পরায়ণতা: ন্যায়পরায়ণতা মানব চরিত্রের এক উৎকৃষ্ট ও অত্যাবশ্যকীয় বিশেষ গুণ। প্রিয় নবী সা. এ গুণ ও চরিত্রের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। হাদীস ও ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে এ সম্পর্কে বহু ঘটনাবলি উল্লিখিত রয়েছে। একদা মাখযুমিয়্যাহ নাম্মী জনৈকা নারী চুরি করল। সে ছিল অভিজাত পরিবারের সদস্য। তাই সাহাবাদের কারো কারো নিকট তার ওপর হাত কর্তনের মত দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা কঠিন মনে হলো। তখন উসামা বিন যায়েদ (রা) তাদের প্রতিনিধি হয়ে রাসূল সা.-এর কাছে এসে তার ব্যাপারে সুপারিশ করলেন। জবাবে রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক অবধারিত দণ্ডবিধি মওকুফের ব্যাপারে সুপারিশ করছো হে উসামা! আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেব।’ (সহীহ মুসলিম: ৩১৯৬) অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে- আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব বদর যুদ্ধে বন্দী হয়েছিলেন। তিনি রাসূল সা.-এর চাচা হওয়ার সুবাদে আনসারগণ বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করলেন। কিন্তু রাসূল সা. বললেন, ‘না, তাঁর জন্য এক দিরহামও ছাড় দিয়ো না।’ এ-দ্বারা রাসূলের লক্ষ্য হচ্ছে, যাতে সবার সাথে সমান আচরণ হয়, কোনভাবেই স্বজনপ্রীতি প্রকাশ না পায়।

মানবকল্যাণই রাসূল সা.-এর মূলমন্ত্র: মানুষের কল্যাণ সাধনই ছিল মহানবী সা.-এর জীবনের মূলমন্ত্র। আল্লাহপাক তাঁকে মানুষের নবী করে মানবকল্যাণের পরিপূর্ণ আদর্শরূপে প্রেরণ করেছেন। বস্তুত তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম পথিকৃৎ, তিনি বিশ^মানবতার শ্রেষ্ঠতম আদর্শ। ‘হে নবী, আমি তোমাকে পাঠিয়েছি সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে। আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে।’ (সূরা আহজাব : ৪৫-৪৬) রাসূল সা.-এর চরিত্র কত মহান ছিল তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিম্নোক্ত ঘোষণা থেকে বুঝা যায়, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল।’ (সূরা নিসা: ৮০) এমনকি আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে, আল্লাহকে পেতে হলে, রাসূল সা.-কে ভালোবেসে তাঁকে অনুুসরণ করেই তা করতে হবে। অন্য কোন পথে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বল, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’। (সূরা আলে ইমরান : ৩১) জারীর ইবনু আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূল সা. বলেছেন, যে লোক মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না (কিয়ামতের দিন) আল্লাহও তাঁর প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন না।’ (সহীহ মুসলিম : ৫৯২৪)

সহনশীলতা, নম্রতা ও ধৈর্যশীলতা: পৃথিবীর সকল মানুষের মধ্যে রাসূল সা.-এর ধৈর্য, সহনশীলতা ও নম্রতার প্রকাশ ছিল সবচেয়ে বেশি। রাসূল সা. হকদারের ন্যায়সঙ্গত হক আদায় ও তার সহায়তার নিমিত্তে ন্যায়ের মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। যেন তারা তাদের হক বুঝে পায় ও তা গ্রহণ করে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নবী সা.-কে ন্যায় ও সত্যের পথে আদেশ ও নিষেধের যে আদর্শ দান করেছেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। আমরা নবী সা.-এর ঘরে কোন কঠোরতা, জবরদস্তি ও জুলুম-অত্যাচারের আশঙ্কা করি না। আশঙ্কা নেই সেখানে কোন সীমালঙ্ঘন ও লুটপাটের। আয়েশা (রা) বলেন, ‘রাসূল সা. এক জিহাদের ময়দান ব্যতীত তাঁর হাত দিয়ে কাউকে মারেননি, এমনকি তাঁর স্ত্রী ও খাদেমকেও না। তাঁকে কোন ব্যাপারে প্রতিশোধ নিতে দেখিনি, তবে কেউ আল্লাহর বিধানের অবমাননা করলে তিনি আল্লাহর হকের জন্যই প্রতিশোধ নিতেন।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৫৭১৫) আনাস (রা) বলেন, ‘আমি রাসূল সা.-এর সাথে চলছিলাম, তাঁর গায়ে ছিল মোটা ঝালর যুক্ত নাজরানি চাদর। অতঃপর এক বেদুইন তাকে ধরে সজোরে টানতে লাগল, আমি তাকিয়ে দেখি তাঁর ঘাড়ে জোরে টানের চোটে চাদরের ঝালরের দাগ লেগে গেছে। তারপর বেদুইন বলে উঠল: হে মুহাম্মাদ! তোমার কাছে যে সম্পদ আছে, তা আমাকে দেয়ার আদেশ দাও। তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসলেন ও তাকে দেয়ার আদেশ দিলেন।’ (মুসলিম: ২৩২৮) কতই না সুন্দর তাঁর আচরণ এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের চিত্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নমনীয়তা এবং উপকারী ও কল্যাণজনক বিষয়কে বুঝান ও অন্যায় অকল্যাণকে প্রতিকার করাই ছিল তাঁর কর্ম। মূর্খ বেদুইন সাহাবী যাদের আদব-কায়দা সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান নেই তাদের সঙ্গেও রাসূল সা. অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন। এরূপ এক বেদুইন সাহাবীর সঙ্গে রাসূল সা.-এর আচরণ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ‘একদিন এক বেদুইন মসজিদের ভেতর প্রস্রাব করা আরম্ভ করলে, সাহাবীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। অতঃপর নবী সা. বললেন, তোমরা তাকে বারণ করো না, ছেড়ে দাও এবং প্রস্রাবের জায়গায় এক বালতি পানি ঢেলে দাও। নিশ্চয়ই তোমরা সহজতা আরোপকারী হিসাবেই প্রেরিত হয়েছ, কঠোর হয়ে প্রেরিত হওনি।’ (সহীহ বুখারি: ৬১২৮)

দাওয়াতি কাজে রাসূল সা.-এর ধৈর্য: দাওয়াতি কাজে রাসূল সা. যে ধৈর্য, তাঁর অনুসারী দাবিদারদের জন্য অপরিহার্য হলো সে অনুযায়ী তাঁর আদর্শ মতো চলা এবং নিজেকে অধৈর্যের মুখে ঠেলে না দেয়া। আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘একবার তিনি নবী সা.-কে জিজ্ঞেস করলেন, উহুদের দিনের চেয়ে কঠিন কোনদিন কি আপনার ওপর এসেছিল? তিনি বললেন, আমি তোমার কওম হতে যে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, তাতো হয়েছি। তাদের হতে অধিক কঠিন বিপদের সম্মুখীন হয়েছি, আকাবার দিন যখন আমি নিজেকে ইব্নু ‘আবদে ইয়ালিল ইবনে ‘আবদে কলালের নিকট পেশ করেছিলাম। আমি যা চেয়েছিলাম, সে তার জবাব দেয়নি। তখন আমি এমনভাবে বিষন্ন চেহারা নিয়ে ফিরে এলাম যে, কারনুস সাআলিবে পৌঁছা পর্যন্ত আমার চিন্তা দূর হয়নি। তখন আমি মাথা ওপরে উঠালাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম এক টুকরো মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। আমি সেদিকে তাকালাম। তার মধ্যে ছিলেন জিবরাইল (আ)। তিনি আমাকে ডেকে বললেন, আপনার কওম আপনাকে যা বলেছে এবং তারা উত্তরে যা বলেছে তা সবই আল্লাহ শুনেছেন। তিনি আপনার নিকট পাহাড়ের ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। এদের সম্পর্কে আপনার যা ইচ্ছে আপনি তাকে হুকুম দিতে পারেন। তখন পাহাড়ের ফেরেশতা আমাকে ডাকলেন এবং আমাকে সালাম দিলেন। অতঃপর বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ সা.! এসব ব্যাপার আপনার ইচ্ছাধীন। আপনি যদি চান, তাহলে আমি তাদের ওপর আখশাবাইন (দু‘টি কঠিন শিলার পাহাড়)কে চাপিয়ে দিব। উত্তরে নবী সা. বললেন, বরং আশা করি মহান আল্লাহ তাদের বংশ থেকে এমন সন্তান জন্ম দেবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে আর তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।’ (সহীহ বুখারী: ৩২৩১)
বর্তমানে অনেকেই দাওয়াতি কাজে তাড়াহুড়া করে থাকে এবং অতি দ্রুত এ কাজের ফলাফল পেতে চায়। ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, আমি যেন রাসূল সা.-কে কোন এক নবীর ঘটনা বর্ণনা করতে দেখছি তিনি বলেন, ‘সে নবীর সম্প্রদায় তাঁকে মেরে রক্তাক্ত করে দিয়েছে, তিনি মুখমণ্ডল থেকে রক্ত মোছা অবস্থায় বলছে, হে আল্লাহ! তুমি আমার সম্প্রদায়কে ক্ষমা করে দাও। কেননা তাঁরা বুঝে না।’ (সহীহ বুখারী: ৬৯২৯)

রাসূল সা.-এর সামাজিকতা: মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সামাজিকতা ও পারস্পরিক আচরণ কেমন হবে তার যথাযথ পদ্ধতি রাসূল সা. দেখিয়ে গেছেন। রাসূল সা. রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দের ব্যাপারে সর্বদা যত্নশীল ছিলেন। এক আবু লাহাব ছাড়া অন্য চাচারা ঈমান না আনলেও নবীজির সাথে অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক রাখতেন। আবু তালেব যদিও ঈমান আনেননি কিন্তু নবীজির জন্য সর্বস্ব দিয়ে সাহায্য করেছেন। যেখানে ইবরাহিম (আ)-এর পিতা আজর ইবরাহিমকে ঘরছাড়া করেছেন নমরুদের সাথে সহযোগিতায় আগুনের কুণ্ডলীতে নিক্ষেপ করার ব্যবস্থায় নিয়োজিত সেখানে রাসূলের চাচা আবু তালেব কাবাঘরের দায়িত্ব ত্যাগ করেছেন মুহাম্মদকে ত্যাগ করেননি। তিন বছর শিয়াবে আবু তালিবে বন্দী অবস্থায় গাছের পাতা খেয়ে অনাহারে ছিলেন। বিনিদ্র রজনী রাসূল সা.-কে পাহারাদারি করেছেন এর দৃষ্টান্ত দ্বিতীয়টি পাওয়া কঠিন। নিশিথ রাতে মিনার উপত্যকায় মদিনাবাসীর সাথে আকাবার বায়াত অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সে সময় খঞ্জর হাতে রাসূলের পাহারাদারিতে দণ্ডায়মান। সে ব্যক্তিটি রাসূলের চাচা হামজার ছোটভাই আব্বাস তখনও ছিলেন মুশরিকদের মধ্যে। আবার চাচা আবু তালিবের আর্থিক কষ্ট লাঘব করতে চাচাতো ভাই আলীর দায়িত্ব ছোট থেকেই রাসূল গ্রহণ করেছেন। হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদ সা. তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা)-কে হেরা পাহাড়ে ঘটে যাওয়া অহি ও জিবরাইল-সংক্রান্ত সব কথা বলেন ও ভয়ার্ত চিত্তে বললেন, “আমি আমার জীবন সম্পর্কে আশঙ্কা করছি।”
খাদিজা (রা) সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, “আল্লাহর শপথ! তা কখনও হতে পারে না, তিনি আপনাকে অপদস্থ করবেন না। ১. আপনি আত্মীয়াতার বন্ধন সংরক্ষণ করেন, ২. আপনি দুস্থ মানুষের বোঝা হালকা করেন, ৩. নিঃস্বদের আহার করান, ৪. অতিথিদের সেবা করেন, ৫. সত্যের পথে নির্যাতিতদের সাহায্য করেন।” (সহীহ বুখারি) নবুওয়তের দায়িত্ব পালনের পরও আত্মীয়তার বিষয়ে অনেক হাদীস উল্লেখ করেছেন আর নির্দেশ অবতীর্ণ হয়েছে কুরআনুল কারিমে, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যার নামে তোমরা অধিকার দাবি কর আর সতর্ক থাক আত্মীয়তার অধিকার ও সম্পর্কের বিষয়ে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখেন।’ (সূরা নিসা: ১) রাসূল সা. নির্দেশ দিয়েছেন- ‘সাবধান রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়তা ছিন্নকারীরা জান্নাতে যাবে না।’ (সহীহ বুখারি) অপর একটি হাদীসে এসেছে- “আত্মীয়তার সম্পর্ক তথা ‘রেহেমকে’ আল্লাহ আরশের সাথে লটকিয়ে রেখেছেন যে তা ঠিক রাখবে সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবে, যে বিচ্ছিন্ন করবে সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন বিনষ্ট করবে।” (সহীহ বুখারি)

পরিশেষে, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ সা. ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্র ও মাধুর্যের অধিকারী। শত্রু-মিত্র, ধনী-গরিব, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ এক কথায় সর্বশ্রেণীর মানুষ তাঁর উত্তম চরিত্র ও আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ ছিল। কুরআন, হাদীস এবং ইতিহাসের পাতায় এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কোরআনে রাসূল সা.-এর উত্তম চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়ে এরশাদ করেন- ‘আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা কালাম: ৪) আমাদের প্রত্যেকের উচিত রাসূল সা.-এর আদর্শ মোতাবেক জীবন ধারণ করা। মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অনুপম জীবনাদর্শকে আমাদের সামগ্রিক জীবনে চলার পথের পাথেয় করুন। আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply