রাসূল সা.-এর হিজরত ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা -প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ

‘হিজরত’ শব্দের সাধারণ অর্থ হচ্ছে পরিত্যাগ কিংবা পরিবর্জন, ছেড়ে দেয়া, বর্জন করা, রেখে দেয়া, ত্যাগ করা ইত্যাদি। কিন্তু ইসলামী পরিভাষায় হিজরত বলতে বুঝায়, দ্বীন ইসলামের খাতিরে নিজের দেশ ছেড়ে এমন স্থানে গমন করা যেখানে গেলে উদ্দেশ্য পূর্ণ হতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে রাসূল সা.-এর মদিনায় হিজরত অত্যন্ত তাৎপর্যময়, যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী ঘটনা। হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর জীবনে যতগুলো ঘটনা ঘটেছিল তন্মধ্যে হিজরত বা দেশত্যাগ ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তিনি প্রথম যে সংগ্রামটি করে জয়ী হয়ে ইসলামকে রক্ষা করেছিলেন তাহলো হিজরত। হিজরত তিনি নিজের ইচ্ছায় বা স্বেচ্ছায় করেননি। তার জীবন, শিশু ইসলামের জীবন যখন বিপন্ন নবদীক্ষিত মুসলমানদের জীবন যাপন আরবের কাফেরদের অত্যাচারে জর্জরিত, নিষ্পেষিত এবং হুমকির মুখে তখন তিনি মহান আল্লাহর আদেশে হিজরত করেন। প্রথমে অস্থায়ীভাবে তিনি মুসলমানদেরকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন এবং পরে স্থায়ীভাবে নিজেসহ মদিনায় হিজরত করেন। ঐতিহাসিক জোসেফ হেল যথার্থই বলেছেন: “হিজরত বিশ্বনবীর জীবন ও কর্মে নতুন গতিপথ তৈরি করে। ইসলামের ইতিহাসে বৃহৎ দিগন্তের উন্মোচন করে। এটি দ্বীন ও মানবতার বৃহত্তম স্বার্থে ত্যাগ ও বিসর্জনের এক সাহসী পদক্ষেপ।”
মহানবী সা. ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবুওয়াত লাভ করেন। এরপরের ইতিহাস সবার জানা। মানুষকে পথ-নির্দেশনা দেয়ার গুরুদায়িত্ব পেয়ে তিনি দাওয়াত ও তাবলিগের ময়দানে নেমে পড়েন। মানুষকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করা শুরু করেন। কিন্তু এর ফলে কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হন তিনি। এমনকি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা পর্যন্ত বিরোধিতা শুরু করেছিলেন। ফলে তিনি গোপনে তিন বছর দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য হন। পথে-প্রান্তরে তাঁকে ও তাঁর সাথীদেরকে নিদারুণভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত এমনকি নির্মম আঘাত করা হতো। এরপরও অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসিকতার সঙ্গে মহানবী সা. তার মিশন এগিয়ে নিতে থাকেন। মক্কার কাফের-মুশরিকরা ইসলামের উদীয়মান আলো নির্বাপিত করতে সব রকম উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। নবী মুহাম্মাদ সা. এবং তার অনুসারীরা চরমভাবে নিগৃহীত ও নিপীড়িত হতে থাকলেন। সামাজিকভাবেও বয়কট করা হয়। অনেক পুরুষ ও নারী সাহাবিকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে করতে তপ্ত মরুভূমিতে প্রকাশ্যে হত্যাও করা হয়। এমনকি আশৈশব আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত সমগ্র আরবজুড়ে পুণ্যবান হিসেবে স্বীকৃত নবী মুহাম্মাদকে সা. হত্যা করে ইসলামের আলো চিরতরে নিস্তব্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
যেসব মুসলমান মক্কায় কাফিরদের হাতে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছিল, নবীজি তাদেরকে মদিনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। এটা টের পেয়ে কাফিররা মুসলমানদের ওপর জুলুমের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয় এবং তারা যাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য সব ধরনের চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুসলমানেরা তাদের ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততির জীবন বিপন্ন করেও নিছক দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করাকেই পছন্দ করে। কোনো ভয়-ভীতিই তাদেরকে এই সঙ্কল্প থেকে বিরত রাখতে পারেনি। এভাবে নবুয়্যতের ত্রয়োদশ বছরের শুরু পর্যন্ত বহু সাহাবী মদিনায় হিজরত করেন। কুরাইশরা যখন দেখতে পেল যে, মুসলমানরা একে একে মদিনায় গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং সেখানে ইসলাম ক্রমশ প্রসার লাভ করছে তখন তারা ইসলামকে চিরতরে খতম করে ফেলার উপায় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগল।
মক্কার কাফেররা একদিন সর্বশেষ নীতিনির্ধারণের উদ্দেশ্যে তাদের ‘নদওয়া’ গৃহে সব গোত্রপতিরা মিলিত হলো। সভায় আবু জাহ্ল বললো, ‘প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে যুবক নির্বাচন করা হবে, তারা সবাই একযোগে মুহাম্মাদ সা.-এর ওপর হামলা করে তাঁকে হত্যা করে ফেলবে। ফলে তার রক্তপণ সব গোত্রের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যাবে। আর বনু হাশিম গোত্র সবার সঙ্গে একাকী লড়াই করে কিছুই করতে সক্ষম হবে না।’ সমবেত সবাই এ সিদ্ধান্তের ওপর সমর্থন ব্যক্ত করে। তারা জঘন্যতম কাজটা সম্পন্ন করতে প্রত্যেক গোত্রের শক্তিশালী যুবকদের নির্বাচন করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলেন, ‘স্মরণ করো, কাফিররা তোমাকে বন্দি বা হত্যা করার জন্য কিংবা নির্বাসিত করার চক্রান্ত করে। তারা চক্রান্ত করে; আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী।’ (সূরা আনফাল : ৩০)
কাফিরদের সব নীলনকশা ও কূট-পরিকল্পনা মহান আল্লাহ নস্যাৎ করে দেন। রাতেই আল্লাহ তায়ালা ওহির মাধ্যমে এই চক্রান্তের কথা তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দেন। তাঁর প্রিয় নবী সা.কে তিনি হিজরতের আদেশ দেন। হিজরতের নির্দেশ পাওয়ামাত্রই প্রিয়নবী সা. নিজের ঘরে ও নিজের বিছানায় আপন চাচাতো ভাই হজরত আলী রা.-কে রাখেন। যাতে কাফিররা এটা মনে করে যে, মুহাম্মাদ এখনও নিজ ঘরেই আছে। আর এই সুযোগে রাসূলেখোদা মক্কা ত্যাগ করতে সক্ষম হবেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও যুবক আলী রা. অত্যন্ত আনন্দচিত্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। হযরত আলীর প্রশংসায় নাজিল হয় সূরা বাকারার এই আয়াত: ‘আর মানুষের মাঝে এমন লোক রয়েছে যে আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজের জীবনবাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।’ (সূরা বাকারা : ২০৭)
নবীজির নির্দেশে হযরত আলী রা. ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছুটা রাত্রি হয়ে আসলে চল্লিশ জন ঘাতক নবীর গৃহকে ঘিরে ফেলল। তারা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে ঘরের ভেতর সব কিছু স্বাভাবিকভাবে লক্ষ্য করে ভাবল- শয্যায় যে ব্যক্তি ঘুমিয়ে রয়েছেন তিনিই স্বয়ং নবী। এক ফাঁকে কাফিরদের চোখে ধুলো দিয়ে মহানবী সা. ঘর থেকে বেরিয়ে যান। ভোর হওয়ার পর অবরোধকারী মুশরিকরা উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে রাসূলের কক্ষে প্রবেশ করল। তখন হযরত আলী রা. গা থেকে চাদর সরিয়ে তাদের প্রশ্ন করলেন, “তোমরা কী চাও?” তারা বলল, “মুহাম্মাদকে চাই। তিনি কোথায়?” আলী রা. বললেন, “তোমরা কি তাঁকে আমার কাছে আমানত রেখে গিয়েছিলে যে, আমার কাছে তাঁর অবস্থান জিজ্ঞাসা করছ? তিনি এখন ঘরে নেই।” এ কথা শুনে তাদের চেহারা ক্ষোভে লাল হয়ে গেল এবং ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করায় চরমভাবে অনুতপ্ত হলো। তাদের পূর্ব পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে তারা রাসূলকে ধরতে নতুন পরিকল্পনা নিলো। তারা মদিনা যাওয়ার সকল পথ বন্ধ করে দিল এবং এসব পথে প্রহরী নিয়োগ করল। পায়ের চিহ্ন দেখে অবস্থান শনাক্ত করতে পারদর্শী ব্যক্তিদের ডেকে আনা হলো। যে ব্যক্তি মহানবীর অবস্থান সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিতে পারবে অথবা মুহাম্মাদকে যে জীবিত বা মৃত ‘নদওয়া’ গৃহে হাজির করতে পারবে, তাকে ১০০ উট পুরস্কার দেয়া হবে।
ওদিকে প্রিয়সঙ্গী আবু বকর রা.কে নিয়ে মহানবী সা. মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। এ ছাড়াও আবু বকর রা.-এর গোলাম আমের ইবনে ফুহাইরা এবং পথনির্দেশক আবদুল্লাহ ইবন আরিকত দুয়ালি ছিলেন। ২৭ সফর বৃহস্পতিবার মোতাবেক ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর মক্কা মুকাররামা থেকে ইয়াসরিবের উদ্দেশে রওনা করেন। এটি বায়আতে আকাবার তিন মাস পর। কুরাইশদের একদল মক্কার উত্তর দিকে মদিনার পথে নবীকে ধরার কাজে নিয়োজিত হলো। অথচ নবী সা. তাদের বিভ্রান্ত করতে মদিনার পথের ঠিক বিপরীতে মক্কার দক্ষিণের সওর পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন। মক্কার প্রসিদ্ধ পদচিহ্ন ও চেহারাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আবু কারাস রাসূলের পায়ের চিহ্নের সঙ্গে পরিচিত ছিল। সে ওই পদচিহ্ন লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে যেতে সওর পর্বত পর্যন্ত পৌঁছল। কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। একদম গুহার কাছাকাছি গিয়েও তারা ফিরে আসে। হযরত আবু বকর রা. এ অবস্থা দেখে খুব বিচলিত হয়ে পড়লেন। তখন মহানবী সা. তাঁকে সান্ত¡না দিয়ে বললেন, ‘তুমি চিন্তা করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।’ (সূরা তাওবা : ৪০)। সওর গুহায় থাকাকালে হযরত আবু বকর রা.-এর কন্যা মহানবী সা.-এর খাবার দিয়ে যেতেন। এ সম্পর্কে মহানবী সা.-এর জীবনী লেখক ইবন হিশাম বলেছেন, ‘রোজ সন্ধ্যায় হযরত আবু বকর রা.-এর কন্যা হযরত আসমা রা. বাড়ি হতে খাবার পাকিয়ে গুহায় নিয়ে আসতেন।’
রাসূল সা. তিন দিন মক্কার সওর গুহায় গোপন থাকার পর সোমবার প্রথম রবিউল আউয়াল আবার রওনা দেন। ২৩ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোতাবেক ৮ রবিউল আউয়াল মদিনার পার্শ্ববর্তী কোবায় পৌঁছান তিনি। এর তিন দিন পর হজরত আলী রা. কুবায় এসে মহানবী হযরত মুহম্মদ সা.-এর সাথে মিলিত হলেন। কুবাতেই মহানবী সা. একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৪ দিন কুবায় থেকে একদিন মহানবী সা. ভরদুপুরে মদিনায় পৌঁছেন। মদিনার মানুষের মাঝে তখন আনন্দ-উচ্ছ্বাসের জোয়ার নেমে আসে। তারা প্রিয়নবী সা.-কে বরণ করে নিতে বিভিন্ন রকমের কবিতা আবৃত্তি করে। হৃদয়োৎসারিত উষ্ণতা দিয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষকে অভ্যর্থনা জানায়। শিশু-কিশোর ও যুবকরা তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর উদ্দেশে এগিয়ে এলো। শিশুরা নবীজির উদ্দেশে গান গেয়ে মদিনার আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলল। তারা যে গানটি গেয়েছিল তা ছিল এ রকম-
তালাআল বাদরু আলাইনা, মিন সানিয়্যাতিল ওয়াদা
ওজাবাশ শুকরু আলাইনা, মা দা’আ লিল্লাহি দা….
হিজরত শুধু মহানবী সা.-এর জীবনের পরিবর্তন আনেনি, ইসলামের ইতিহাসেও এটা বিরাট পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। অবমাননা অত্যাচার ও নিরাশার দিনগুলো শেষ হয়ে বিজয়ের যুগ শুরু হয়। এতদিন ধরে মহানবী সা. মক্কায় তাঁর দেশবাসী কর্তৃক লাঞ্ছিত ও অবহেলিত হয়ে আসছিলেন। তবে মদিনায় এসে তিনি শুধু সম্মানিত অতিথি হিসেবে সংবর্ধিত হলেন না কালক্রমে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সভাপতি ও প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। হিজরতের মতো ঘটনা সংঘটিত না হলে ইসলাম মক্কার পৌত্তলিকদের মধ্যে স্বল্প পরিচিত একটি ধর্ম হিসেবে হয়তো সীমাবদ্ধ থাকত। মহানবী সা. মদিনায় আগমনের পর হতে ইসলাম দিন দিন শক্তি লাভ করতে লাগল। অধিকাংশ মদিনাবাসী ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে এর ভিত্তি দৃঢ় করেছিলেন। পরবর্তীকালে ইসলাম যে আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করেছিল তা হিজরতের ফলেই সম্ভব হয়েছিল। ইসলাম তথা বিশ্বের ইতিহাসে হিজরতের প্রত্যক্ষ ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী। মদিনায় ধর্ম প্রচারের সাথে সাথে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও নীতি মক্কাতে অবতীর্ণ হলেও এটা মদিনাতে হিজরত করার পর একটি সংগঠিত ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
হিজরত মহানবী সা.-এর কার্যপদ্ধতিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছিল। মহানবী সা. মক্কাতে নবী ও রাসূল ছিলেন পক্ষান্তরে মদিনায় তিনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। হিজরতের পর মদিনাকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ঘোষণা করা হয়। ফলে মদিনার গুরুত্ব দেশ বিদেশে বৃদ্ধি পায়, তেমনি বিভিন্ন গোত্র নিজেদের স্বার্থ ভুলে গিয়ে ইসলামের খাতিরে এক জাতিতে পরিণত হয়। সকলেই ভাই ভাই এ ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি বৃহৎ মুসলিম সমাজ গড়ে উঠেছিল যার নিকট পরবর্তীকালে পরাক্রমশালী রোম ও পারস্য সা¤্রাজ্য মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়। মদিনায় আগমনের পর রাসূল সা. সবচেয়ে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল একটি মসজিদ নির্মাণ করা। তিনি যেখানে অবস্থান করছিলেন, তার কাছেই দুই ইয়াতিমের কিছু অনাবাদি জমি ছিল। নগদ মূল্যে তাদের কাছ থেকে ওই জমিটি কিনে তার ওপর মসজিদ নির্মাণ করেন যা মসজিদে নববী নামে পরিচিত। মসজিদে নববীর নির্মাণকাজ শেষ হলে একদিন হযরত সা. আনসারদের মধ্যে থেকে এক ব্যক্তি এবং মুহাজিরদের ভেতর থেকে এক ব্যক্তিকে ডেকে বললেন, ‘আজ থেকে তোমরা পরস্পর ভাই।’ এভাবে ৭৪০ জন সাহাবিকে জোড়ায় জোড়ায় ভ্রাতৃত্ব-বন্ধনে চুক্তিবদ্ধ করেন। এই জোড়াগুলো বেছে নেয়া হয়েছিল স্বভাবগত মিল, বৈশিষ্ট্য এবং তাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের মাত্রা বা ঘনিষ্ঠতার প্রবণতা অনুযায়ী।
হিজরত মহানবী সা. এবং নবদীক্ষিত মুসলমানদের জন্য এক চির কল্যাণকর দিক। নবদীক্ষিত মুসলমানরা যদি প্রথমে আবিসিনিয়ার এবং পরে মদিনায় স্থায়ীভাবে হিজরত না করতো তাহলে তাদের জীবন ও সম্পদ হুমকির মধ্যে পড়তো। হয়তোবা জীবন নিঃশেষ হয়ে যেত। ইসলাম এতো সহজে বিস্তার লাভ করতো না। হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর ইসলামী রাষ্ট্র সমাজব্যবস্থা গঠন করতে খুবই কষ্টকর হতো। আল্লাহর অশেষ রহমতে হিজরত হওয়ার ফলে মহানবী সা. ইসলামকে মদিনায় ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং শক্তি সঞ্চয় করে নিজ মাতৃভূমি মক্কাকে জয় করে বিজয়ীর বেশে রক্তপাতহীনভাবে ফিরতে পেরেছিলেন। সুতরাং এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হিজরত ছিল তৎকালীন মুসলমানদের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা, যার মাধ্যমে ইসলামের নৈতিক মূল্যবোধ, ধর্মের দৃঢ়তা, এবং নবদীক্ষিত মুসলমানদের আনুগত্য প্রমাণের বহিঃপ্রকাশ।
প্রিয়নবী সা.-এর হিজরতেরই স্মৃতিবহন করে আসছে আরবি হিজরি সন। হিজরতের সময়কে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে ইসলামে হিজরি সন গণনা শুরু হয়। হজরত উমর রা.-এর খেলাফত আমলে ১৭ হিজরিতে হিজরি ক্যালেন্ডার চালু হয়। তিনিই সর্বপ্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন।
লেখক : প্রফেসর; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়,
সদস্য-সচিব; শত নাগরিক, রাজশাহী

SHARE

Leave a Reply