লক্ষ্য অর্জনের পথে মু. রাজিফুল হাসান

(গত পর্বের পর)
১.৮. ওহুদে হলো মুনাফিকি উন্মোচন : কুরাইশদের বদরে পরাজয়ের এক বছর হতে চলেছে। তাদের মাঝে পুরো বছরজুড়ে ছিল প্রতিশোধের স্পৃহা আর প্রস্তুতির মহড়া। বদরের পরাজয়ের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্পৃহাকে জাগ্রত রাখতে নেতৃবৃন্দসহ ৩১৩ জন স্বজন হারানোর শোক প্রকাশে প্রচলিত কান্নাকাটি আর বিলাপ করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছে তারা। এমনকি মুক্তিপণ দিয়ে যুদ্ধবন্দীদের ফেরত আনতেও বিলম্ব করেছিল ক্রোধান্বিত কুরাইশ কাফেররা। কেননা পরাজয়ের শোক প্রকাশে বিলাপ আর বন্দীদের দ্রুত মুক্তির প্রক্রিয়া মুসলমানদের আনন্দের কারণ হবে, এটি ছিল তাদের ধারণা। তাই বদরের পরাজয়ে প্রতিশোধের স্পৃহা বুকে নিয়ে কুরাইশদের নেতা আবু সুফিয়ান শপথ করে বলেছিল : ‘মুহাম্মদের ওপর আরেকটি হামলা চালিয়ে উপযুক্ত প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত স্ত্রী সঙ্গমজনিত অপবিত্রতা দূর করার জন্য গোসলের পানি মাথায় লাগাব না।’
আর আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা বদর যুদ্ধে হারানো পিতা, চাচা এবং ভাইয়ের প্রতিশোধ নিতেও ছিল বদ্ধপরিকর। হিন্দা পিতার হত্যাকারী হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবকে হত্যা করে তার কলিজা চিবিয়ে খাওয়ার জন্য আলাদাভাবে ওয়াহশিকে ভাড়া করেছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে দিতে আবু ইযযা ও মোসাফা ইবনে আবদে মানাফ জুমাহি নামক দুই আরব কবিকে নিয়োগ করে কুরাইশরা। যাদের দায়িত্ব ছিল নিজেদের আত্ম-অহঙ্কার আর বংশীয় গৌরবকে তুলে ধরে বিভিন্ন গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা।
প্রতিশোধের যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বদর যুদ্ধের সময় আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে মক্কায় নিরাপদে ফিরে আসা বাণিজ্য কাফেলার সকল সম্পত্তি জমা করে কুরাইশরা। এ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বদরে নিহত কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সন্তানগণ এই বলে প্রস্তাব রাখে যে, ‘এ কুরাইশগণ মুহাম্মদ, তোমাদের বিরাট ক্ষতি সাধন করেছে এবং তোমাদের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের হত্যা করেছে। এবার এই কাফেলার যাবতীয় সম্পদ দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করো, তাহলে আশা করি আমরা আমাদের হারানো লোকদের উপযুক্ত প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারব।’
অতঃপর সকলে প্রস্তাবে সম্মতি জানালো। তাদের এই প্রস্তুতি সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “নিঃসন্দেহে যেসব লোক কাফের, তারা ব্যয় করে নিজেদের ধন-সম্পদ, যাতে করে বাধাদান করতে পারে আল্লাহর পথে। বস্তুত এখন তারা আরো ব্যয় করবে। অতঃপর তাই তাদের জন্য আক্ষেপের কারণ হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত তারা হেরে যাবে। আর যারা কাফের তাদেরকে দোজখের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।” (সূরা আল আনফাল : ৩৬)
প্রতিশোধ গ্রহণের সেই কাক্সিক্ষত যুদ্ধের প্রস্তুতিকে আরো শাণিত করতে অকুরাইশদের জন্যও যুদ্ধে অংশগ্রহণ উন্মুক্ত করে দেয় কুরাইশরা। যেন কেননা ও তিহামাবাসীর যে সকল লোক মুসলিমবিদ্বেষী, তাদেরকে কুরাইশদের পতাকাতলে একত্রিত করতে পারে। উল্লেখ্য, কেননা ও তিহামা গোত্র দুটি ছিল কুরাইশদের সহযোগী গোত্র।
বছরজুড়ে এসকল প্রস্তুতির মাঝেই মুসলমানদের সাথে তিনটি সামরিক অভিযানে মুখোমুখি হয় কুরাইশরা। এগুলোর প্রথমটি হলোÑ আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সাওয়ীব অভিযান। যে অভিযানে কুরাইশরা মদিনার উপকণ্ঠে কিছু খেজুর গাছ কেটে ফেলে এবং কিছু আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তাছাড়া এক কৃষক আনসারি সাহাবী ও তার আরও এক মিত্রকে হত্যা করে নিজেরা অদৃশ্য হয়ে চলে আসে। দ্বিতীয়টি- বাহরাইনের সামরিক অভিযান, যেখানে আসলে কোনো যুদ্ধই সংঘটিত হয়নি। তৃতীয়টি- কারাদা অভিযান, যেখানে জায়েদ ইবনে হারিসার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া অভিমুখে চলা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলাকে পরাভূত করে। অতঃপর কাফেরদের সকল পণ্যসমগ্র মুসলমানরা জব্দ করে নিয়ে যায়।
এসকল অভিযানে সামগ্রিকভাবে মুসলমানরাই লাভবান হয়। তাই পরাজয়ের গ্লানি মুছতে এবং সর্বশেষ কারাদা অভিযানে পণ্যসামগ্রী হারানোর ব্যথায় প্রতিশোধের জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছিল কুরাইশরা। আর এভাবেই বদরের বড় পরাজয়ের পর এক বছর পূর্ণ না হতেই আরেকটি বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে কুরাইশ বাহিনী।
কুরাইশদের এই বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩ হাজার। যেখানে প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান এবং অশ্ব বাহিনীর প্রধান খালিদ বিন ওয়ালিদ। আর যুদ্ধের পতাকা ছিল বনি আব্দুদ্ দার গোত্রের নিকট। তাছাড়া ১৫ জন সুন্দরী রমণীকেও নেয়া হয় কুরাইশদের কাফেলায়। যাদের নেতৃত্বে ছিল সেনাপতি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা। এসকল মহিলাদের নিরাপত্তা প্রদান এবং সম্মান রক্ষার্থে পুরুষ যোদ্ধারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ এবং বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যুদ্ধ করবে, এটাই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তাছাড়া যুদ্ধের মাঠে পুরুষ যুদ্ধাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করা ছিল এসকল নারীর অন্যতম দায়িত্ব।
এদিকে মক্কায় কুরাইশদের এই যুদ্ধ প্রস্তুতির এবং মদিনা অভিমুখে তাদের যাত্রা করার বিষয়টি নজরদারিতে রাখছিলেন রাসূল (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা)। উল্লেখ্য, তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। হযরত আব্বাস (রা) দ্রুততার সহিত দূত প্রেরণ করে চিঠির মাধ্যমে রাসূল (সা.)কে কুরাইশদের প্রস্তুতি ও যাত্রার বিষয়টি অবহিত করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত আব্বাস (রা) এর দূত মক্কা থেকে মদিনার মধ্যবর্তী ২৫ কিলোমিটার পথ মাত্র ৩ দিনে অতিক্রম করেছিলেন। যা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে কষ্টসাধ্য ছিল।
চিঠির বিস্তারিত জেনে রাসূল (সা.) পত্রপাঠক উবাই ইবনে কাব (রা)কে চিঠির বিষয়বস্তু গোপন রাখার নির্দেশ দেন এবং নেতৃস্থানীয় আনসার ও মুহাজিরদের সাথে পরামর্শ করে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এসকল পদক্ষেপের মাঝে ছিল :
১. এখন থেকে মুসলমানদের সাথে সার্বক্ষণিক অস্ত্র রাখা। এমনকি নামাজের সময়ও অস্ত্র দূরে সরিয়ে না রাখা।
২. আকস্মিক হামলা মোকাবেলায় মদিনার প্রবেশদ্বারে ছোট পরিসরে কয়েকটি সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ।
৩. শত্রুদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখতে মদিনার বাহিরের রাস্তায় কয়েকটি ছোট আকারের বাহিনী প্রেরণ এবং
৪. রাসূল (সা.)কে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিতে কয়েকজন আনসারির সমন্বয়ে একটি সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ করা হয়। প্রতিপক্ষের প্রস্তুতি আর মদিনা অভিমুখে যাত্রার কথা জেনে অনাকাক্সিক্ষত যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় মুসলমানদের এই প্রস্তুতি ছিল দূরদর্শী আর সদা সতর্ক এক বাহিনীর বাস্তবিক স্বাক্ষর। এই প্রস্তুতি গ্রহণ আরো সাক্ষ্য বহন করে যে, মুসলমানগণ কোন সমস্যাকেই ছোট করে দেখেনি বরং সময়ক্ষেপণ না করে প্রতিরোধের প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ ছিল তাদের অন্যতম মূলনীতি। তাছাড়া এই পদক্ষেপগুলো মুসলিম সৈনিকদেরকে নিকট ভবিষ্যতে কাফেরদের সাথে হতে যাওয়া ওহুদ যুদ্ধের মোকাবেলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছিল। এটি যেন ছিল এক জটিকা প্রশিক্ষণ।
এ দিকে কুরাইশ বাহিনী এগিয়ে এসে মদিনার কাছাকাছি ওহুদ পর্বতের নিকটবর্তী আয়নায় নামক স্থানে অবস্থান করে। আর এ খবর বার্তা সংগ্রহকারীদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় রাসূল (সা.)-এরনিকট। কুরাইশদের সর্বশেষ অবস্থানের সংবাদ পেয়ে রাসূল (সা.) মজলিসে শূরার বৈঠক ডাকেন। বৈঠকের শুরুতেই রাসূল (সা.) বলেন: ‘আমি একটি ভালো স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, আমার একটি গরু জবাই করা হয়েছে। আর আমার তরবারির ধারালো প্রান্তে যেন ফাটল ধরেছে। আরো দেখলাম, আমি একটা সুরক্ষিত বর্মের ভেতরে হাত ঢুকিয়েছি।’
অতঃপর রাসূল (সা.) স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বললেন: ‘গাভী জবাই এর মানে হলো- আমার কিছু সাহাবী শহীদ হবে; তলোয়ারের ধারালো প্রান্ত ফাটল ধরার মানে হলো- আমার পরিবারভুক্ত এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার আলামত; আর নিরাপদ বর্ম হলো- মদিনা শহর।’
অতঃপর রাসূল (সা.) যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে তার নিজের অভিমত ব্যক্ত করে বলেন: ‘তোমরা যদি মনে করো মদিনায় অবস্থান করবে এবং কুরাইশরা যেখানে অবস্থান নিয়েছে, সেখানেই থাকাকালে তাদের যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দেবে, তাহলে সেটা করতে পারো। তারপরও যদি ওরা ওখানে অবস্থান করে তাহলে সেটা তাদের জন্য খুবই খারাপ অবস্থান বলে প্রমাণিত হবে। আর যদি তারা মদিনায় প্রবেশ করে তাহলে মদিনায় বসেই আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবো। এতে মুশরিকদের তাদের তাঁবুতে অবস্থান কোন কাজে আসবে না। যদি তারা মদিনায় প্রবেশ করতে চায় তাহলে মুসলমানরা মদিনার অলিগলি প্রবেশপথে তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। মহিলারা ছাদের ওপর থেকে তাদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করবে।’
মূলত রাসূল (সা.) মদিনায় থেকেই যুদ্ধ করতে চাচ্ছিলেন। মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলুলের মতও ছিল মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ না করা। তবে তার এই অভিমত যুদ্ধে প্রতিরক্ষায় কৌশলগত সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না বরং মদিনায় যুদ্ধ অভ্যন্তরে যুদ্ধ হলে- সে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে পারবে, যা হয়তো কেউ বুঝতেও পারবে না। এটাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।
কিন্তু কিছু সংখ্যক সাহাবী যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণের অপেক্ষায় যারা ছিলেন উদগ্রীব, তারা বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল, শত্রুর মোকাবিলার জন্য আমাদেরকে মদিনার বাইরে নিয়ে চলুন। ওরা যেন মনে করতে না পারে যে, আমরা দুর্বল কিংবা কাপুরুষ হয়ে গেছি।’ অতঃপর তরুণ সাহাবীদের মতের পক্ষে রাসূল (সা.)-এর চাচা হযরত হামজা (রা) বলেন: ‘সেই পবিত্র সত্তার শপথ, যিনি আপনার ওপর কুরআন নাযিল করেছেন। মদিনার বাইরে কাফেরদের সাথে খোলা ময়দানে যুদ্ধ করার আগে আমি কখনো খাবার মুখে তুলবো না।’
সাহাবীদের এই বক্তব্য শুনে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, মদিনাতেই অবস্থান নিন, বাইরে যাবেন না। আল্লাহর কসম আমরা মদিনার বাইরে গেলেই শত্রুরা আমাদের ক্ষতি বেশি করতে পারবে। আর শত্রুরা যদি মদিনায় প্রবেশ করে আক্রমণ চালায়, তাহলে আমরা শত্রুদের অধিকতর বিপর্যয় ঘটাতে পারবো। অতএব হে আল্লাহর রাসূল, কাফিররা যেমন আছে ওদেরকে তেমনি থাকতে দিন। তারা যদি ওখানে থেকে যায় তাহলে ওই জায়গাটা তাদের জন্য জঘন্যতম অবরোধস্থল বলে সাব্যস্ত হবে। আর যদি তারা মদিনায় প্রবেশ করে তাহলে আমাদের পুরুষরা তাদের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে এবং স্ত্রী ও শিশুরা ওপর থেকে তাদের প্রতি পাথর নিক্ষেপ করবে। আর যদি ফিরে যায় তাহলে যেমন এসেছিল তেমনি ফিরে যাবে।’ দিনটি ছিল জুমার দিন। নামাজ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) সাহাবীদেরকে জিহাদে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন: ‘ধৈর্য ও এবং দৃঢ়পদ থাকার মাধ্যমে জয়লাভ করা যেতে পারে। তা ছাড়া শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার জন্য মুসলমানদের নির্দেশনা দেন।’ আসর নামাজের সময় হলে মুসলমানরা সমবেত হতে থাকে। নামাজ শেষে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘরে প্রবেশ করেন এবং যুদ্ধের বর্ম পরিহিত অবস্থায় তলোয়ারসহ যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে সকলের সামনে হাজির হন। এদিকে সাদ ইবনে মায়ায (রা) এবং ওসায়দ ইবনে হোযায়ম (রা) উপস্থিত সাহাবীদের উদ্দেশে বললেন: ‘আপনারা নবী করীম (সা.)কে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে যাচ্ছেন। বিষয়টি আপনারা তার ওপরই ছেড়ে দিন।’
এ কথা শুনে সকলেই লজ্জাবোধ করেন এবং অনুতপ্ত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)কে বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা আপনার মত পছন্দ করিনি, এটা আমাদের উচিত হয়নি। আপনি যদি মদিনাতে অবস্থান করতে চান, তবে তাই করুন।’ জবাবে রাসূল (সা.) বললেন: ‘না, তা আর হয় না। কোন নবী যখন অস্ত্র পরিধান করে নেন, তখন তা খুলে ফেলা তাঁর জন্য সমীচীন নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর এবং শত্রুদের মধ্যে ফয়সালা না করে দেন।’ এখানে একটি বিষয় খেয়াল করার মত যে, রাসূল (সা.) নবী হওয়া সত্ত্বেও নিজের মতকে কোরবানি দিয়ে সংখ্যাধিক্য সাহাবীদের মতকে প্রাধান্য দিলেন। যার মাধ্যমে এটি প্রতীয়মান হয় যে, পরামর্শের ভিত্তিতে (শূরার) সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইসলামের একটি অপরিহার্য অংশ।
অতঃপর ১০০০ জনের সৈন্যবাহিনী নিয়ে রাসূল (সা.) যুদ্ধের রওনা হলেন। শায়খান নামক স্থানে পৌঁছার পর রাসূল (সা.) মুসলিম বাহিনীর সৈন্যদের যাচাই-বাছাই করেন। যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সী এমন কিছু সংখ্যক সাহাবীকে ফেরত পাঠানো হয়। তবে সাহাবীদের অনুরোধে রাফে ইবনে খাদিজ (রা) ও হযরত সামুরা ইবনে জুনদুবকে (রা) নেয়া হয়।
উল্লেখ্য যে, বয়স কম হওয়ার কারণে ৮ জন সাহাবীকে ফেরত পাঠানো হয়। তারা হলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা), হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা), হযরত ওসায়দ ইবনে যহির (রা), হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা), হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (রা), হযরত উসামা ইবনে আউস (রা), হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা), হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা আনসারি (রা), হযরত সাদ ইবনে হেব্বা (রা)। রাফে ও সামুরাকে নেয়ার কারণ ছিল, তাদের যুদ্ধের নেয়ার পক্ষে সাহাবীদের মতামত। রাফের বিষয়ে বলা হয়েছিল, ‘রাফে ভালো তীরন্দাজ।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা.) তাকে অনুমতি দেন। তখন সামুরার বিষয়ে সাহাবীরা বলল: ‘সামুরা মল্লযুদ্ধে রাফেকে পরাজিত করতে পারে।’ অতঃপর রাসূল (সা.) তা দেখতে চাইলেন। তখন দু’জনের মাঝে মল্লযুদ্ধ হলো। সামুরা রাফেকে পরাজিত করলো। তখন রাসূল (সা.) সামুরাকেও যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন।
শারীরিক শক্তি আর বয়সের উপযুক্ততাকে মানদণ্ড ধরে কিছু সাহাবীকে যুদ্ধযাত্রা হতে ফিরিয়ে দেয়ার মাঝেও কিছু হিকমত ফুটে ওঠে। এক দিক বিবেচনায় এসকল সাহাবীদের যুদ্ধে না নিয়ে গিয়ে যেমন অনাকাক্সিক্ষত ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে ভবিষ্যতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য তাদেরকে করা হয়েছিল সংরক্ষিত। এসকল সাহাবীর পরবর্তী জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাদের কেউ ভূমিকা রেখেছিল রণাঙ্গনে সেনাপতি হিসেবে, আবার কেউ দ্বীনের জ্ঞান সংরক্ষণের অগ্রপথিক হিসেবে।
সায়খানের রাত্রি যাপন করে ভোর হওয়ার পূর্বেই পুনরায় যাত্রা শুরু করে মুসলিম বাহিনী। মাওত নামক জায়গায় গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে তারা। যেখান থেকে কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান ছিল একেবারেই নিকটে। এমন নিকটে যে দুই বাহিনী একে অন্যকে দেখতে পাচ্ছিল। সেখানে পৌঁছে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই প্রায় ৩০০ লোক নিয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হয়। এ সময় সে বলছিল: ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) ওদের কথা শুনলেন, আমার কথা শুনলেন না। হে জনতা, আমি বুঝি না আমরা কিসের জন্য এতগুলো লোক এখানে প্রাণ দেবো।’
এ কথা বলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই তার গোত্রের মুনাফিক ও সন্দেহপরায়ণ লোকদের নিয়ে মুসলিম বাহিনী থাকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এ সময় আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারাম তাদের পিছু পিছু গেলেন এবং বললেন, ‘আমি তোমাদেরকে দোহাই দিচ্ছি। তোমাদের মুসলমান ভাইদেরকে এবং আল্লাহর নবীকে উপস্থিত শত্রুর হামলার মুখে ফেলে যেও না।’ তারা বললো, ‘যুদ্ধ হবে মনে করলে তোমাদের রেখে যেতাম না। আমাদের মনে হচ্ছে যুদ্ধ হবে না।’
অতঃপর তারা যখন কিছুতেই রণাঙ্গনে ফিরে আসতে রাজি হলো না তখন আবদুল্লাহ বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমনরা, আল্লাহ তোমাদেরকে দূর করে দিন। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে তোমাদের মুখাপেক্ষী রাখবেন না। আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট।’ অথচ এই মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাই হলো সেই ব্যক্তি যিনি প্রতি জুমায় জনগণের সামনে রাসূল (সা.)-এর ভাষণের পূর্বে বলতো: ‘হে জনমণ্ডলী, এই যে আল্লাহর রাসূল তোমাদের সামনে উপস্থিত। তার দ্বারা আল্লাহ তোমাদের শক্তি ও সম্মান বৃদ্ধি করেছেন। সুতরাং তোমরাও তাকে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান কর এবং তাঁর কথা শোনো ও মেনে চল।’
মূলত রাসূল (সা.)-এর প্রশংসা নয় বরং স্বগোত্রীয় লোকজনের কাছে নিজের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই সে এমন করতো। তবে ওহুদ যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই পূর্বের ন্যায় এই ভূমিকা রাখতে গেলে মুসলমানরা তার জামা টেনে ধরে বলেছিল: ‘আল্লাহর দুশমন, বস। তুই যা করেছিস তাতে তোর মুখে ওসব কথা শোভা পায় না।’ আর মুনাফিকদের এই আচরণ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
“এবং তাদেরকে যাতে শনাক্ত করা যায় যারা মুনাফিক ছিল। আর তাদেরকে বলা হলো এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই কর কিংবা শত্রুদিগকে প্রতিহত কর। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে, লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম। সেদিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬৭)
ওহুদের প্রান্তর হতে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের প্রস্থানের মাধ্যমে তার প্রকৃত মুখোশ উন্মোচিত হয়। মুসলিম সমাজের নেতৃত্বের মর্যাদায় থাকা এই মুনাফিকের প্রস্থান এটাই প্রমাণ করে যে মুনাফিক চিহ্নিতকরণের চূড়ান্ত পরীক্ষা হলো আল্লাহর পথে জিহাদ অর্থাৎ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। কারণ মুনাফিকরা অন্য সকল ইবাদত প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের মুসলমানিত্ব ধরে রাখতে পারলেও জিহাদের পরীক্ষায় তা পারে না। রসায়নের ভাষায় জিহাদ হলো মুনাফিকের জন্য এসিড টেস্ট। এসিড টেস্ট করলে যেমন যৌগে (যৌগিক মিশ্রণে) থাকা লবণ নিজের স্বকীয়তা আর লুকিয়ে রাখতে পারে না, তেমনিভাবে জেহাদের ডাক পড়লে মুনাফিকদের দুর্বলতাও প্রকাশ না পেয়ে থাকে না, বেরিয়ে আসে তাদের প্রকৃত পরিচয়। কারণ জিহাদের ময়দানে জীবন যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আর যেহেতু মুনাফিকদের লক্ষ্যই থাকে দুনিয়াবি চাহিদা পূরণ করে পার্থিব জীবনকে ভোগ করা, সেহেতু জীবন দেওয়ার প্রশ্নে তারা সব সময় পশ্চাৎগামী। তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা দিন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে প্রকৃত মুজাহিদ তৈরি করার জন্য প্রয়োজন জিহাদি চেতনাকে জাগ্রত রাখা। তবে জিহাদের ময়দান থেকেই খুঁজে পাওয়া যাবে দ্বীনি আন্দোলনের জন্য জীবন বিলিয়ে দেয়া মুজাহিদদের। আর বেরিয়ে আসবে লোকদেখানো জ্ঞান-গরিমা ও অধিক আনুগত্যপরায়ণতার ছলে লুকিয়ে থাকা তোষণকারীদের প্রকৃত পরিচয়।
মুনাফিকদের পৃষ্ঠপ্রদর্শনের পর আনসারগণ রাসূল (সা.)কে বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের মিত্রদের (ইহুদিদের) কাছে সাহায্য চাইলে কেমন হয়।’ জবাবে রাসূল (সা.) বললেন, ‘ওদের দিয়ে কোন কাজ নেই।’ এখানে মিত্র বলতে সেই সকল ইহুদিদের বুঝানো হয়েছে, যাদের সাথে সন্ধি হয়েছিল। রাসূল (সা.) নির্দ্বিধায় ইহুদিদের নিকট হতে সহযোগিতা নেয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করলেন। কারণ মুসলমানদের এই যুদ্ধ হলো সত্য অস্বীকারকারী কুরাইশ মুশরিকদের বিরুদ্ধে। আর মুশরিক কাফেরদের ন্যায় ইহুদিরাও পূর্ণ সত্যকে অস্বীকার করে চলেছে। ইহুদিরা এক আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করলেও আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাদের ছিল অনীহা। তাছাড়া ইহুদিরা রাসূল (সা.)-এর ওপর নাযিল হওয়া আল-কুরআনের বিষয়াবলি মেনে নেয়নি, যেমন মেনে নেয়নি মুশরিকরা। তাই মুশরিকদের (কাফেরদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইহুদিদের (কাফেরদের) সহযোগিতা নেয়া রাসূল (সা.) সমীচীন মনে করেননি। রাসূল (সা.)-এর এই নীতি থেকেও মুসলিম উম্মাহর জন্য রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।
এদিকে রাসূল (সা.) যেখানে অবস্থান করেছিলেন সেই স্থান এবং কাফেরদের বাহিনীর মাঝে প্রতিবন্ধক ছিল ওহুদ পাহাড়। অতঃপর রাসূল (সা.) ৭০০ জনের মুসলিম বাহিনী নিয়ে ওহুদ প্রান্তরে শেষ সীমানায় অবস্থিত উপত্যকার ওপর ঘাঁটি করে তাঁবু স্থাপন করেন। মুসলিম বাহিনীর সামনে ছিল মদিনা আর পেছনে ওহুদ পাহাড়। আর কুরাইশ বাহিনীর অবস্থান ছিল মুসলিম বাহিনী ও মদিনার মাঝখানে। অতঃপর রাসূল (সা.) মুসলিম সৈন্যদের বললেন: ‘আমি যুদ্ধের নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যুদ্ধ শুরু করবে না।’
এদিকে কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তারা তাদের সৈন্যদের কাতারবন্দী করে বিন্যাস করে। তাদের প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান সকল সৈন্যকে মাঝামাঝি জায়গায় নিজের কেন্দ্র নির্ধারণ করে। কুরাইশ বাহিনীর ডানদিকের নেতৃত্বে রাখা হয় খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে আর বাঁদিকে ইকরামা ইবনে আবু জাহেলকে। যারা ছিল মূলত অশ্বারোহী। তীরন্দাজ বাহিনীর নেতৃত্ব দেয়া হয়েছে আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়াকে আর সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া হল পদাতিক বাহিনীর প্রধান। আর ঐতিহ্যগতভাবে যুদ্ধের পতাকা ধারণ করেছিল বনু আবদুদ্ দার গোত্র।
অন্যদিকে প্রস্তুতির মাঝেই কুরাইশরা তাদের ঘোড়া ওদের নিকটবর্তী মুসলমানদের ফসলি জমিতে ছেড়ে দেয়। এমতাবস্থায় একজন আনসারি সাহাবী বলে উঠলো: ‘আউস ও খাজরাযের ফসলি জমি থেকে আমরা এখনও আমাদের প্রাপ্য অংশ আদায় করিনি। এমতাবস্থায় সেখানে পশু চরানো কিভাবে বরদাশত করা যায়?’ অতঃপর রাসূল (সা.) তাঁর ৭০০ জন সৈন্যকে যুদ্ধের জন্য বিন্যস্ত করতে শুরু করলেন। প্রথমে আবদুুল্লাহ ইবনে যুবায়ের এর নেতৃত্বে ৫০ জনের তীরন্দাজ বাহিনী বাছাই করে। এই বাহিনীকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত গিরিপথ পাহাড়ে নিযুক্ত করেন। মুসলমানদের মূল বাহিনী হতে এই গিরিপথের দূরত্ব ছিল মাত্র ১৫০ মিটার। তীরন্দাজ নেতাদের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) বলেন: ‘তোমরা ঘোড়সওয়ার শত্রুদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাদের আমাদের কাছ থেকে দূরে রাখবে। লক্ষ রাখবে তারা যেন পেছনের দিক থেকে আমাদের ওপর হামলা করতে না পারে। আমরা জয়লাভ করি অথবা পরাজিত হই, উভয় অবস্থায় তোমরা নিজেদের অবস্থানে অবিচল থাকবে। তোমাদের দিক থেকে যেন আমাদের ওপর হামলা হতে না পারে।’
এরপর সকল তীরন্দাজকে লক্ষ্য করে নবী করীম (সা.) বলেন, ‘তোমরা আমাদের পেছনের দিক হেফাজত করবে। যদি দেখো আমরা মারা পড়ছি, তবু আমাদের সাহায্যে এগিয়ে এসো না। যদি দেখো আমরা গনিমতের মাল গ্রহণ করছি, তবুও তোমরা আমাদের সাথে অংশ নেবে না।’ এ নির্দেশনার মাধ্যমে রাসূল (সা.) সেই গিরিপথ বন্ধ করলেন, যে পথ ধরে শত্রুবাহিনী মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করার সম্ভাবনা আছে। অতঃপর রাসূল (সা.) অবশিষ্ট সৈন্যদের দুটি ভাগে বিভক্ত করেন। ডানদিকে বাহিনীর প্রধান করা হয় হরযত মুনযের ইবনে আমরকে (রা) আর বাম দিকের বাহিনীর প্রধান করা হয় হযরত যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে (রা)। আর যুবায়ের (রা)-এর সহকারী হিসাবে দেয়া হয় মিকদাদ ইবনে আসওয়াদ (রা)কে। যুবায়ের (রা)কে এক বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে বলা হয়, তিনি যেন খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বাধীন শত্রুদের ঘোড়সওয়ার বাহিনীর প্রতিরোধ করেন। উল্লেখ্য যে, তখনো খালিদ বিন ওয়ালিদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। রাসূল (সা.)-এর সামরিক বিন্যাসের আরো একটি দিক ছিল জানবাজ সাহসী যোদ্ধাদের সম্মুখভাগে রাখা, যারা পূর্ব থেকেই ভালো যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিল। সৈন্যদের বিন্যস্ত করে কৌশল বর্ণনার পর রাসূল (সা.) তাদের মাঝে উৎসাহ উদ্দীপনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে বললেন: ‘এই তরবারির হক আদায় করতে কে প্রস্তুত আছো।’
এ কথা শুনে অনেকেই রাসূল (সা.)-এর দিকে এগিয়ে এলো, তবে তিনি তা কাউকে দেননি। এ সময় আবু দোজানা রাদিআল্লাহু আনহু এগিয়ে এসে বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! এ তরবারির হক কী?’
রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: ‘তরবারি দিয়ে শত্রুকে এত বেশি আঘাত হানতে হবে যেন তা বাঁকা হয়ে যায়।’
আবু দোজানা (রা) বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওটা আমি নেব এবং হক আদায় করব।’
এ কথা শুনে রাসূল (সা.) আবু দোজানাকে (রা) তরবারিটি দিলেন। আবু দোজানা (রা) ছিলেন সাহসী বীর যোদ্ধা। তরবারিটি নিয়ে তিনি শত্রুদের ব্যূহের মাঝে এগিয়ে চললেন। যুদ্ধের ময়দানে যেন পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পারে সে জন্য রাসূল (সা.) তাদেরকে একটি ধ্বনি শিখিয়ে দেন, আর এটি ছিল ‘আমিত, আমিত’। যার অর্থ হলো: ‘মরণ আঘাত হানো, মরণ আঘাত হানো।’ রাসূল (সা.)-এর শিখিয়ে দেওয়া এই ধ্বনি শুধু সাহাবীদের পরস্পরকে চিনতে সহযোগিতা করেনি বরং এই ধ্বনি সাহাবীদের মাঝে তৈরি করেছিল মরণপণ যুদ্ধের স্পৃহা। যে ধ্বনি ছিল দূরদর্শী ও সাহসী এক সেনানায়কের পক্ষ থেকে সৈনিকদের জন্য উন্নতর মোটিভেশন।
রাসূল (সা.) থেকে উৎসাহ ও প্রেরণা পেয়ে সাহাবীগণ প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগলেন। কাফেরদের পক্ষ থেকে প্রথম যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া তালহা ইবনে আবু তাবদারীকে ক্ষিপ্র বাঘের মত প্রতিহত করলেন জুবায়ের ইবনে আওয়াম (রা)। যার সাহসী ভূমিকা দেখে স্বয়ং রাসূল (সা.) আল্লাহু আকবার ধ্বনির আওয়াজ তোলেন। যে ধ্বনি শুনে অন্য সকল সাহাবীরাও তাকবির দেয়া শুরু করলো। যুবায়ের (রা)কে উদ্দেশ করে রাসূল (সা.) বলেন: ‘সকল নবীর একজন হাওয়ারি থাকে, আমার হাওয়ারি হচ্ছে যুবায়ের।’
যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনীর পতাকা বহন করছিল বনু আবদুদ্ দার গোত্র। (চলবে)
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply