শহীদ মামুন হোসাইন জীবন দিয়েছেন তবু আপস করেননি -মু. রাজিফুল হাসান বাপ্পী

১২ জানুয়ারি ’১৪। রোজ বৃহস্পতিবার। অন্যান্য দিনের মতো যথাসময়ে শাটল ট্রেন পৌঁছেছে ক্যাম্পাসে। ক্লাস পরীক্ষা শুরু হয়েছে সব অনুষদে। সকালের শীতের প্রতাপ কাটিয়ে সূর্যের উদ্দীপ্ত কিরণে উষ্ণ হয়ে উঠছে প্রতিটি ক্ষণ। বেলা ১টা। ক্লাস শেষ করে শিক্ষার্থীরা ছুটছে নিজ নিজ গন্তব্যে। কেউ হলে, কেউ মেসে, কেউবা কটেজে  এর উদ্দেশ্য  রওনা  করে । এই দিকে আগের দিন দলীয় কর্মী আহত হওয়ার প্রতিবাদে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি প্রতিবাদ মিছিল বের করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন থেকে শুরু করে ২ নং গেটের দিকে যায় মিছিলটি। স্বাভাবিকভাবে অন্য সকল কর্মসূচি কাটা পাহাড় আর শহীদ মিনার এলাকায় হলেও আজকের বৈপরীত্যের কারণ বুঝতে বাকি থাকল না কারো। মিনিট দশেক পরেই সশস্ত্র প্রস্তুতি নিয়ে চলা মিছিলটি কেন্দ্রীয় মাঠ ঘুরে আসে সোহরাওয়ার্দী হলের সামনে। হলকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয় মিছিল থেকে। অশালীন ভাষায় স্লোগান ওঠেÑ ‘ধর ধর শিবির ধর, ধরে ধরে জবাই কর।’ সামনে এগিয়ে মিছিল চলে যায় শাহ আমানত হলের সামনে। সশস্ত্র অবস্থায় দ্রুতগতিতে প্রবেশ করে হল ফটকের ভেতর। আক্রমণ শুরু করে শাহ আমানত হলে। শিবিরকর্মীদের নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার স্লোগানের শব্দে পিছু হটে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ। অবস্থান নেয় (হলের) মূল ফটকের সামনেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টরিয়াল বডি এবং পুলিশ প্রশাসনের সামনেই চলে সশস্ত্র মহড়া আর অশালীন বাক্যালাপ। শিবিরের দায়িত্বশীলদের একাধিক অনুরোধে নিশ্চুপ সময় ক্ষেপণ ছাড়া কিছুই করেনি চবি প্রশাসন। হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানের পরিবর্তে ছাত্রলীগের অবৈধ আবদারে সাড়া দিয়ে হল রেইড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। জাতির দর্পণ গণমাধ্যমকর্মীরা (সাংবাদিক) পুলিশের সাথে হলে প্রবেশ করতে চাইলে তাদেরকেও দেয়া হয় বাধা। হল দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর দেরি নয়। হল রেইডের নামে অবৈধভাবে গ্রেফতার করা হয় হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ২১ শিবির নেতা-কর্মীকে। তাদের অপরাধ শিবির করা ছাড়া অন্য কিছু নয়। এদিকে ২১ জন শিবির নেতা-কর্মী গ্রেফতার। আর হলে অবস্থানরত অন্যদেরকে ছত্রভঙ্গ করে রাখে পুলিশি হয়রানির মাধ্যমে। চবি প্রশাসন আর পুলিশের সহযোগিতায় তৈরি করে দেয়া সুযোগ হাতছাড়া করেনি ছাত্রলীগ। পিস্তল, রিভলবার আর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতায় আক্রমণ করে নিরস্ত্র, বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকা শিবিরকর্মীদের ওপর। অস্ত্রে সজ্জিত বাতিলের মোকাবিলায় নারায়ে তাকবির স্লোগান আর ইট-পাথর দিয়েই প্রতিরোধ গড়ে তোলে মুজাহিদের দল। বাতিলের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন শিবিরের আইন অনুষদের সেক্রেটারি। হাতে এবং মুখে গুলিবিদ্ধ হন শিবির বিজ্ঞান অনুষদ শাখার অফিস সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম। হাতে চাপাতির আঘাতে গুরুতর জখম হন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শিক্ষা সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম। দোতলার রেলিং থেকে পড়ে যাওয়া শাহ আমানত হল শাখার সাথী রাহাতকে একা পেয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয় তার মাথাসহ পুরো শরীরজুড়ে। মৃত ভেবে রেখে যায় তাকে।
এদিকে জনশক্তিদের রক্ষা করতে গিয়ে বাতিলের হাতে আটকা পড়েন শাহ আমানত হল সেক্রেটারি মামুন হোসাইন এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সভাপতি সাইদুল ইসলাম রকি। চাপাতি আর রামদা দিয়ে কোপানো হয় তাদের মাথাসহ সর্বাঙ্গে। (সেদিনের ঘটনায়) বেঁচে যাওয়া রকি ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম যখন মামুন আর রকি ভাই বাতিলের আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন, সিঁড়িতে তখন প্রায় জ্ঞানশূন্য রকি ভাইকে মৃত ভেবেই রেখে যায় তারা। আর মামুন বেঁচে থাকার চেষ্টায় নড়াচড়া করছিলেন, চেষ্টা করছিলেন শ্বাস গ্রহণের আর এটাই সহ্য হলো না বাতিলের। গলায় ছুরি বসিয়ে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করে বাতিলের দল। শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন প্রিয় মামুন হোসাইন। সকল ব্যস্ততাকে বিদায় দিয়ে চলে গেলেন ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে। গুরুতর আহত রকি, রাহাতসহ শহীদ মামুনের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে মামুনকে মৃত ঘোষণা করেন ডাক্তার। এদিকে রাহাত এবং রকিকে চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখা হয় এবং অন্য হাসপাতালে নিতে চাইলেও দেয়া হয় বাধা। যেন মৃত্যুই কামনা ছিল তাদের। এ ছাড়াও এই ঘটনায় আহত হন সংগঠনের সাথী হাফেজ আব্দুল কাইয়ূম এবং আমজাদ হোসেন (পা ভেঙে যায় তাদের)। একজনের শাহাদাত এবং সাতজন ভাইয়ের আহতের শোক বুকে চাপা দিয়ে যখন হলেই অবস্থানের সিদ্ধান্ত ছিল মুজাহিদদের ঠিক তখন হল ভ্যাকেন্টের ঘোষণা আসে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে সিলগালা করে দেয়া হয় হলের সকল রুম। পরিবারের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর শহীদের পিতা-মাতা। শহীদ মামুন হোসাইন ছিলেন শান্তশিষ্ট স্বভাবের আর বলার ভাষা ছিল অতি নমনীয়। তিনি এতটাই উদার ছিলেন যে ছোট-বড় কেউ তাকে অভিযুক্ত করতে পারেনি কোনো দিন। সহপাঠী আর দ্বীনি ভাইদের খেদমতে তিনি ছিলেন সবসময় নিবেদিত। তার নিরহঙ্কার চরিত্রটি আমি অনুধাবন করেছিলাম সেদিন, যেদিন শাহ আমানত হল থেকে তিনি আমার তোশকটি নিজে আগলিয়ে নিয়ে এসেছিলেন খতিব মঞ্জিলে (কটেজ)। অথচ তখন তিনি ছিলেন শাহ আমানত হল সেক্রেটারি। তিনি বললেই হয়তো যেকোনো একজন জনশক্তি তোশকটি আমার নিকট নিয়ে আসত। কিন্তু মামুন তা করেননি। তার আমল আখলাক আর খুলুসিয়াতের অসীম পরিধি আমি অনুধাবন করতে পেরেছিলাম সেদিন, যেদিন সদস্য বৈঠকে ব্যক্তিগত রিপোর্ট পেশ করতে গিয়ে তিনি পড়েছিলেন ‘আমার নামাজ কাজা এক (১) ওয়াক্ত।’ ব্যক্তিগত রিপোর্ট পেশ পর্যালোচনা পর্বের পরিচালক হিসেবে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কোন ওয়াক্ত? কিভাবে কাজা হলো? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন এশার নামাজের (ওয়াজিব অংশ) ৩ রাকাত বিতর পড়তে পারিনি।’ কারণ ছিল তিনি প্রতিদিন বিতরের নামাজটি শেষরাতে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার পর পড়তেন। তবে ঐদিন অতিরিক্ত ঘুমের কারণে তাহাজ্জুদ মিস হয়েছে বিধায় বিতর নামাজও মিস হয়ে গিয়েছিল। প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে আমি নিজে মনে মনে লজ্জা অনুভব করেছিলাম। কারণ মামুনের মতো আমি নিয়মিত তাহাজ্জুদ গুজারি ছিলাম না। তারপরও অসংখ্য দিন বিতর নামাজ কাজা করেছি, তবে তা কাজা নামাজ হিসেবে কখনো রিপোর্টে লিখে নিজেকে সংশোধনের অনুভূতি আমার জাগেনি। সেদিন হৃদয় থেকে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা জন্মেছিল। আজ বুঝতে পারি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কত নৈকট্যভাজন বান্দা ছিলেন শহীদ মামুন। আর হবেই না বা কেন? তার একটি ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তারই লেখা কিছু সিদ্ধান্ত পড়েছিলাম যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘জীবনে আর কোনো দিন কোনো প্রকার গুনাহ করা যাবে না।’ যিনি এই রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন তার তো শাহাদাতের মৃত্যু প্রাপ্যই বটে। আর আল্লাহর সাথে তার শপথও (ওয়াদা) ছিল তাই। সদস্য শপথগ্রহণের পর ভগ্নিপতিকে (বড় বোনের স্বামী) ফোনে বলেছিলেন, ‘আজ সদস্য শপথ নিলাম, সাথে আরো একটি শপথও নিয়েছি।’ ভগ্নিপতি অন্য শপথটির কথা জানতে চাইলে আব্বা-আম্মা এবং বড় আপাকে না বলার শর্তে জানিয়েছিলেন তার অন্য শপথটির কথা। সেটি ছিল তার ‘শাহাদাতের শপথ’। সত্যি আজ স্রষ্টার নিকট শহীদ মামুন একজন সফল মানুষ, যিনি পূরণ করেছেন তার স্রষ্টার সাথে কৃত ওয়াদা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ভাষায় “মিনাল মু’মিনিনা রিজালুন সদাকু মা আ’হাদুল্লাহা আ’লাইহি-ফা মিনহুমমান কদা নাহবাহু ওয়া মিনহুম মাইয়ান তাযির-ওয়ামা বাদ্দালু তাবদিলা।” (সূরা আহজাব : ২৩)
অর্থ: ঈমানদারদের মাঝে কিছু লোকতো এমন রয়েছে যারা আল্লাহ তায়ালার সাথে (জীবনবাজির) যে ওয়াদা করেছিল তা সত্য প্রমাণ করলো, তাদের কিছু সংখ্যক (মানুষ) তো নিজের কোরবানি পূর্ণ (করে শাহাদাত লাভ) করলো, আর কেউ এখনো (শাহাদাতের) অপেক্ষা করছে, তারা তাদের (আসল) লক্ষ্য কখনো পরিবর্তন করেনি। আর আমাদের জন্য শক্তি, সাহস ও অনুপ্রেরণা। যিনি কিনা জীবনের শেষ মুহূর্তেও আপস করেননি বাতিলের কাছে। সেদিন পরিকল্পিত ঘটনার প্রারম্ভেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর তৎকালীন চবি শিবির সভাপতি ইমরুল হাসান ভাইকে বলেছিলেন, ‘শাহ আমানত হল ছেড়ে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা যেন চলে যায়।’ তবে আপসের এই প্রস্তাব সেদিন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন ইসলামী আন্দোলনের ভাইয়েরা। আর শহীদ মামুন হোসাইন জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন ইসলামী আন্দোলনের পথ আপসের নয় বরং শাহাদাতের।

SHARE