সর্বশেষঃ
post

শায়খ আবদুর রহমান আস

মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্

০৫ জুলাই ২০২২

শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইসি। তাঁকে প্রথম দেখেই মনে হয়েছিল তিনি এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। আর তাঁর কণ্ঠ হতে ভেসে আসছিল সুমধুর সুরে পাক কুরআনের ঐশী আয়াত। মাটির পৃথিবীতে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে একজন ইমাম পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করলেও আমার মনে হচ্ছিল যেন মহান আল্লাহ্ হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে আরশ হতে এখনই কুরআন নাজিল করছেন। তাঁর প্রতিটি শব্দ আর আয়াতের উচ্চারণে আমি অভিভূত, বিমোহিত হয়ে পড়ছিলাম। আমার দেহ-মন ছুটে যাচ্ছিল একনজর তাঁকে দেখার জন্য। তাঁর করস্পর্শ করার জন্য। একটু দোয়া নেওয়ার জন্য। কিন্তু চাইলেই তো সবকিছু আর মুহূর্তেই পাওয়া যায় না।

১৩ জানুয়ারি ২০০৫, বৃহস্পতিবার। জেদ্দা হতে ‘বায়তুশ শরফ হজ কাফেলার’ যাত্রী হিসেবে আমরা যখন পবিত্র মক্কা শরীফ পৌঁছি, তখন জোহর নামাজের জামাত চলছিল। আমাদের কাফেলার সব যাত্রী বাসেই অবস্থান করছিলেন। মিসফালাহ্য় মুয়াল্লিম অফিসের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না করে আমাদের বাস থেকে নামা নিষেধ ছিল। আমরা বাসে বসেই দোয়া-দরূদ পড়ছিলাম। আমাদের সামনে দিয়ে লক্ষ লক্ষ হাজী অদূরে পবিত্র কা’বা শরীফে নামাজ পড়তে গেলেন। নামাজ শেষ করে আবার যার যার গন্তব্যে ছুটে চললেন। সবাই পায়ে হেঁটে। পুলিশ হারাম শরীফের চারদিকে অন্তত ১০ বর্গ কিলোমিটার রাস্তা নামাজের জন্য পূর্বাপর এক ঘণ্টা বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থা হজ মৌসুমে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের জন্য বলবৎ ছিল।

আমাদের মন ছটফট করছিল এক নজর কা’বা শরীফ দেখার জন্য। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মহান আল্লাহ্ কিছুক্ষণ পরই আমাদের সে আশা পূরণ করলেন।

আমাদের জন্য পূর্বেই পবিত্র কা’বা শরীফের ১৫০ গজের মধ্যে আল-শামিয়াহ এলাকায় আত-তাইয়েব হোটেল ভাড়া করে রেখেছিলেন সুপ্রসিদ্ধ ট্র্যাভেল এজেন্ট এস.বি.আগা অ্যান্ড কোং-এর স্বত্বাধিকারী জনাব আলহাজ মাহবুবুর রহমান। হোটেলের সামনেই কা’বা শরীফ। রাস্তার এপার ওপার মাত্র। রুমের দরজা খুললেই চোখে পড়ে। যত দেখি মন ভরে না। বার বার দেখতে ইচ্ছে করে। সকালে, বিকেলে, সন্ধ্যায়, মধ্য রাতে, সুবহে সাদিকে।

মাহবুব ভাই আমাদের সাথেই ছিলেন। আমরা আত-তাইয়েব হোটেলে পৌঁছতে পৌঁছতে ৩টা বেজে গেল। আমাদের কাফেলার প্রধান বায়তুশ শরফের পরম শ্রদ্ধাভাজন পীর সাহেব হযরত মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (ম.জি.আ.) নির্দেশ দিলেন মুসাফির হিসেবে নিজ নিজ কক্ষে জামাতের সাথে জোহরের কসর নামাজ আদায় করে নিতে। আমরা তাই করলাম। এরপর খাবার-দাবার শেষ করে একটু বিশ্রাম নিতে না নিতেই আসর নামাজের আজান ধ্বনিত হল।

শ্রদ্ধেয় পীর সাহেবের নেতৃত্বে কাফেলার প্রায় সবাই মসজিদুল হারামের বহিঃচত্বরে গিয়ে পৌঁছালাম। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে পারলাম না। বাবুশ শামিয়াহ বা শামিয়াহ প্রবেশদ্বারের একপাশে আমরা সুন্নত নামাজ আদায় করে জামাতের জন্য অপেক্ষা করলাম। একটু পরই আসরের জামাত হলো। সালাম ফেরাতে না ফেরাতে জানাযা নামাজের ঘোষণা হলো। আমি বুঝিনি। জায়নামাজ গুছিয়ে উঠতে চাইলে পীর সাহেব হাত ইশারায় থামতে বললেন। আমরা জানাযা নামাজ আদায় করলাম। হজের দিনগুলো ব্যতীত মক্কা শরীফে ২০ দিন অবস্থানকালে এক ওয়াক্ত নামাজও বাদ পড়েনি অন্তত ২-৪ জন নর-নারী-শিশুর জানাযার নামাজ ছাড়া।

হারাম শরীফের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ পড়তে আমার বুকের ভেতর চিনচিন করছিল। রুমে ফিরে আমরা হালকা চা-নাস্তা করে পুনরায় সদলবলে আন্ডারগ্রাউন্ড পথে গিয়ে এক্সেলেটরে চড়ে তিন তলায় উঠলাম। কিন্তু তাতেও সামনে এগোতে পারলাম না। পীর সাহেবসহ আমরা মাঝামাঝি একটি জায়গায় বসে দোয়া-দরূদ, কুরআন পড়ছিলাম। মাগরিবের আজান হলো। হারাম শরীফের ভেতরে বাইরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লক্ষ লক্ষ মুমিন-মুসলমানের সাথে আমরাও জামাতে শরিক হলাম।

সুবহানাল্লাহ্! ইমাম সাহেবের কুরআন তিলাওয়াত এতই হৃদয়গ্রাহী হলো যে, আমি তাতে একেবারে দিওয়ানা হয়ে পড়লাম। সুন্নত, নফল প্রভৃতি নামাজ শেষে ছুটে গেলাম ৩ তলার চক্রাকার বারান্দায়। রেলিং ধরে উপুড় হয়ে দাঁড়ালাম কাবার পানে চেয়ে। চক্ষু স্থির করলাম কালো গিলাফে ঢাকা কাবা শরীফের প্রতি। বার বার উঁকিঝুঁকি দিলাম- যদি একবার ইমাম সাহেবকে দেখা যায়। না তা সম্ভব নয়। কারণ জামাত শেষ হতে না হতেই লক্ষ লক্ষ হাজী ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়ান্ নিঅ’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক- সমস্বরে তালবিয়া পাঠ করে কাবার চতুর্দিকে তাওয়াফ করছেন। বেহেশতি এ জনসমুদ্রে ইমাম সাহেব কোথায় হারিয়ে গেছেন কে জানে। হৃদয়ের গভীরে বার বার প্রশ্ন জাগছে, কে এই ইমাম? কণ্ঠে যার এত মধু। না জানি তিনি দেখতে কত সুন্দর! আমি ফিরে এলাম স্বস্থানে। কুরআন তিলাওয়াত করছি। কিন্তু বার বার কানে ভাসছে ইমাম সাহেবের ক্বিরাত। এক সময় আর স্থির থাকতে পারলাম না। পাশের একজন প্রবীণ হাজী সাহেব থেকে জানলাম ইনি কাবা শরীফের প্রধান ইমাম শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইসি।

ইশার আজান হলো। আমরা সুন্নত নামাজ পড়লাম। মুয়াজ্জিন দ্রুতলয়ে ইকামত দিলেন। আমরাও ইমামের সাথে সাথে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে জামাতে শামিল হলাম। আলহামদুলিল্লাহ! পুনরায় সেই ইমাম, সেই সুরেলা সুমধুর কণ্ঠ। ইমাম আস-সুদাইসি ইশার নামাজ পড়ালেন। হৃদয়-মন ভরে গেল তাঁর পেছনে নামাজ পড়ে রাত ৩টা ৩০ মিনিট। কোনরূপ আঁধারের চিহ্ন নেই। চারদিকে আলোর বন্যা। হারাম শরীফের ৮টি মিনার কী যে সুন্দর! আকাশ ভেদ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আলোকোজ্জ্বল মিনারকে মনে হচ্ছিল এক একজন অতন্দ্র প্রহরী। আল্লাহ্র ঘরের মেহমানদের দিবানিশি তারা শ্রান্তিহীন ক্লান্তিহীনভাবে প্রহরা দিয়ে যাচ্ছে। কী যে অপরূপ সুন্দর লাগছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

আমরা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পীর সাহেবের নেতৃত্বে দলবেঁধে হারাম শরীফে প্রবেশ করলাম। এবারও সে তিন তলায়। রাতের শেষ ভাগ হলেও কোথাও ঠাঁই নেই। তবে তুলনামূলকভাবে ভিড় কম। নিস্তব্ধ পরিবেশ। কাবা শরীফের চারদিকে তখনও তাওয়াফ চলছে। কত দেশের, কত বর্ণের নারী, পুরুষ, কিশোর তা বর্ণনাতীত। এ তিন তলার চক্রাকার বারান্দায়ও অসংখ্য অসুস্থ ব্যক্তি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা হুইল চেয়ারে বসে দোয়া-দরূদ পড়তে পড়তে তাওয়াফ করছেন। তাঁদেরকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন কোনো ভাড়া করা কাফ্রি খাদেম অথবা স্বীয় পুত্র, স্বামী বা নিকটাত্মীয়।

আমরা তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লাম। আবার দোয়া-দরূদ, কুরআন তিলাওয়াত। তন্দ্রা ভাব আসাতে আমি একটু পায়চারি করতে তিন তলার চক্রাকার বারান্দার দিকে গেলাম। হঠাৎ উদ্বেলিত হয়ে পড়লাম আবাবিল পাখির ডাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে, দলে দলে শত-সহ¯্র আবাবিল পাখি রাত্রির এ শেষভাগে, সুবহে কাজেবের পূর্ব মুহূর্তে পৃথিবীর দূর-দূরান্ত দেশ হতে আগত লক্ষ লক্ষ হাজীর সাথে কাবাঘর তাওয়াফ করছে। কণ্ঠে তাদের সুমিষ্ট হামদ। কাবার চত্বরে নগ্নপায়ে শত-সহ¯্র মানব-মানবী দুনিয়ার মায়া-মোহ ত্যাগ করে আল্লাহ্র ধ্যানে-নবীজির শেখানো সুন্নাতের অনুসরণে তাওয়াফ করছেন আর ঠিক তাঁদেরই মাথার ১০০ ফুট উপরে আবাবিল পাখিরা ডানা মেলে হৃদয় কাড়া গানে গানে ঘুরছে। একদল দূর থেকে ঝাঁক বেঁধে তাওয়াফ শেষে দূরে কোথাও ফিরে যাচ্ছে। আর একদল ছুটে আসছে। যতদিন কাবার চত্বরে গিয়েছি ফজরের আজানের বেশ পূর্বে এ দৃশ্য দেখেছি।

আবাবিল পাখি আল্লাহ্র নির্দেশে সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত দাম্ভিক বাদশাহ আবরাহার হস্তি দলকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাথর কণা মেরে নাস্তানাবুদ করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করেনি, এখনো হাজার বছর পরে কাবা শরীফকে শুধু তাওয়াফ নয় গানের আড়ালে প্রহরা দিয়ে চলেছে। প্রহরা দিতে থাকবে অনন্তকাল....

ভোরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে মুয়াজ্জিন ফজরের আজান দিলেন : আস্সালাতু খাইরুম মিনান নাউম.... আমরা সুন্নত পড়লাম। একটু অপেক্ষা। ইকামত হলো। আমরা জামাতে শরিক হলাম।

ইমাম সাহেবের আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন.... পড়তে না পড়তেই আমার খরাপীড়িত চৌচির তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে ঝরনাধারা বয়ে গেল। সেই কাক্সিক্ষত ইমাম, সেই ক্বারী যাঁর পেছনে এশার নামাজও পড়েছিলাম। ফজরের নামাজে তাঁর কেরাত পাঠ ছিল আরও শ্রুতিমধুর, আরও দীর্ঘ, আরও প্রাণবন্ত। প্রাণভরে পবিত্র কুরআনের অবগাহন করলাম। কখন যে ফজরের নামাজ শেষ হয়ে গেল টেরই পেলাম না।

১৪ জানুয়ারি ২০০৫, জুমাবার। ফজরের পর হতেই মনে এক অন্য রকম পুলক অনুভব করলাম। আল্লাহ্ যদি দয়া করেন জীবনে এ প্রথমবার পবিত্র কাবা শরীফকে সামনে নিয়ে, কাবার চত্বরে দাঁড়িয়ে, কাবার প্রধান খতিব ও ইমামের পেছনে জুমার নামাজ আদায় করব। মন বলছে ইমাম সাহেবের সাথে যেন দেখা হবে।

১১টার পূর্বেই অজু গোসল সারলাম। জুমার নামাজের দু’ঘণ্টা পূর্বে আমি ও চট্টগ্রাম ওয়াসার কম্পিউটার সিস্টেম অ্যানালিস্ট নিজাম ভাই কাবার চত্বরে পৌঁছলাম। ও আল্লাহ্! কা’বার মূল চত্বরের চারদিক কানায় কানায় ভর্তি। এখন কী করি? দু’জন তৃপ্তির সাথে জমজম কূপের পানি পান করলাম। এরপর একটু একটু করে মুসল্লিদের ফাঁকে ফাঁকে ধীরে-সুস্থে এক এক কাতার পেরিয়ে এগিয়ে গেলাম। নিজাম ভাই একটু দূরেই থেকে গেলেন। সম্ভবত সামনে এগোবার ফাঁক পাচ্ছিলেন না। আমি কাবাঘরের দরজার সামনে মাকামে ইব্রাহিম (আ) সোজা উত্তর-পূর্ব ৬০ গজ পেছনে গিয়ে একটি কাতারে দাঁড়ালাম। ইতোমধ্যে নিজাম ভাইও আমার পাশে এলেন। আমাদের পাশে, সামনে, পেছনে, কত দেশের হাজী সাহেবান! ইরানি, তুরানি, আফগানি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি, শ্রীলঙ্কান, মরোক্কান। একটি সুবিধামত জায়গা পাওয়াতে দু’জনই আল্লাহ্র দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করলাম। অবশ্য তখনো আমাদের দু’তিন কাতার সামনে দিয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ তাওয়াফ করছিলেন। আমরা জুমার ফরয নামাজের পূর্বে যেসব নামাজ পড়তে হয় তা যথাযথভাবে পড়ে দোয়া-দরূদ ও কুরআন তিলাওয়াত করে সময় কাটাচ্ছিলাম। নামাজের সময় ঘনিয়ে আসছে। জুমার আজান হলো।

আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম, কা’বার চারদিকে অব্যাহত গতিতে তাওয়াফ হচ্ছে। মুসল্লিরা মাকামে ইব্রাহিম (আ) ঘিরে নামাজ পড়ছেন। শত শত লোক কাবার দরজা স্পর্শ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন; এই অবস্থায় ইমাম সাহেব কিভাবে আসবেন, কোথায় দাঁড়াবেন? মিম্বর, মেহরাব কিছুই চোখে পড়ছে না।

এর উত্তর পেতে আমাকে বেশিক্ষণ দেরি করতে হলো না। নামাজের ১৫ মিনিট পূর্বে কা’বা শরীফ চত্বরের উত্তর-পশ্চিম কোণ হতে কয়েকজন খাদেম কাঠের তৈরি সোনালি ফ্রেমে স্বর্ণের কারুকার্যময় অপরূপ সুন্দর একটি চলন্ত মিম্বর টেনে এনে কাবা শরীফের দরজার সামনে ডান পাশে দাঁড় করালেন। আমরা যেখানটায় বসেছি ঠিক তার সামনে। ইমাম সাহেব ধীর পায়ে কয়েক সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে বসলেন। পুনঃ আজান হলো। তিনি দাঁড়ালেন। খুতবা আরম্ভ করলেন। হাতে কোন কিতাব দেখিনি। সম্ভবত ক্ষুদ্রাকার কাগজের স্লিপে বক্তৃতার নোট ছিল। আউজুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ পড়ার সাথে সাথেই, ‘যাঁকে দেখবো বলে যাঁর পেছনে নামাজ পড়বো বলে আকুল হয়ে আছি, সেই মহামান্য ইমাম আশ-শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইসি-ই খুতবা দিচ্ছেন’ একথা ভেবে কী যে ভালো লাগছিল তা কাউকে বোঝাতে পারব না।

এ এক জ্যোতির্ময় পুরুষ। শুধুমাত্র তাঁর কণ্ঠ সুষমার জন্য নয়। চেহারা-সুরতে, বাচন ভঙ্গিতে তিনি এক অনন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। আমরা আরবিভাষী নই। কিছু দোয়া-দরূদ আর নামমাত্র কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া আরবি ভাষা তেমন বুঝি না। কিন্তু আস-সুদাইসির খুতবার প্রতিটি শব্দ আমাদের অন্তরে বাজছে। তিনি আরবি ভাষার সর্বোচ্চ সাহিত্য সমৃদ্ধ শব্দচয়ন করে হজ পালনোপলক্ষে আগত বিশ্বের লক্ষ লক্ষ হাজী সাহেবকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। আর মাত্র ক’দিন পর অনুষ্ঠিতব্য হজ্জে আরাফাতের করণীয় সম্বন্ধে আল্লাহ্র মেহমানদের অভিহিত করেন। মিনা-মুজদালিফার দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধে বুঝিয়ে বলেন। এরপর ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মির ও চেচনিয়ার মজলুম মুসলমানদের ওপর খোদাদ্রোহী ইহুদি-নাসারাদের বর্বর অত্যাচারের কাহিনী তুলে ধরতে গিয়ে নিজেই কেঁদে ফেলেন, তাঁর সাথে কা’বা কেন্দ্রে উপস্থিত সবাই। চারদিকে কিছুক্ষণ যেন নীরবে শোকের মাতম বইল।

এবার আলিফের মত সোজা বুকটান দাঁড়িয়ে কা’বার ইমাম আস-সুদাইসি রাসূলে পাকের নেতৃত্বে স্বল্পসংখ্যক সাহাবীগণের জঙ্গে জিহাদে দুনিয়া কাঁপানো বিজয়ের গৌরবগাথা তুলে ধরে বিশ্ব মুসলিমকে সীসাঢালা প্রাচীরের মত ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানালেন। পৃথিবীর দেশে দেশে, পথে প্রান্তরে মুসলমানদের অধঃপতিত ও নির্যাতিত হবার জন্য তাদের অনৈক্য ও কুরআন-সুন্নাহ হতে দূরে সরে যাওয়াকে দায়ী করলেন। সবচাইতে বেশি দায়ী করলেন বিধর্মীদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করাকে। তিনি সূরা আলে ইমরানের একটি আয়াত উদ্ধৃত করে বললেন-

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না, তারা তোমাদের অমঙ্গল সাধনে কোনো ত্রুটি করে না। তোমরা কষ্টে থাক, তাতেই তাদের আনন্দ। শত্রুতাপ্রসূত বিদ্বেষ তাদের মুখ ফুটেই বের হয়। আর যা কিছু তাদের মনে লুকিয়ে রয়েছে তা আরো ভয়ঙ্কর।’... সুতরাং কে তোমাদের প্রকৃত দোস্ত বা দুশমন তা ভালোভাবে চিহ্নিত করেই পথ চলতে হবে।

পরিশেষে, কাবা শরীফের ইমাম সাহেব হাজী সাহেবানদের তাঁদের স্ব স্ব দেশে প্রত্যাবর্তনের পর স্বদেশ, স্বজাতি ও মুসলিম উম্মাহ্র কল্যাণব্রতে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান। সুন্দর, সুশৃঙ্খল পন্থা ও সুকৌশলে ইসলামের দাওয়াত সর্বসাধারণের মাঝে প্রচারের উপদেশ দেন। সর্বাবস্থায় বিতর্ক ও বিবাদ এড়িয়ে চলতে বলেন।

তাঁর ইমামতিতে জুমার নামাজ সমাপ্ত হলো। আমরা তৃপ্ত মনে শেফার নিয়তে ফিরতি পথে পুনরায় জমজমের সুপেয় পানি পান করে হোটেলে ফিরলাম। শ্রদ্ধেয় পীর সাহেব কাফেলার অন্য ভাইদের সাথে হোটেলে ফিরছেন। আল-শামিয়াহ গেটে তাঁকে ভক্তির সাথে সালাম দিলে তিনি সালামের জবাব দিয়ে আমরা কোথায় নামাজ পড়েছি জেনে নিলেন। তিনি আমাদের পাশে দেখতে না পেয়ে তাঁর উদ্বেগের কথা জানালেন।

মাহবুব ভাইকে একটু পেছনে টেনে বললাম, আজ আমাদের জীবন সার্থক। আমরা আস-সুদাইসির ঠিক সামনাসামনি বসে তাঁর খুতবা শুনেছি। তাঁর পেছনে নামাজ পড়েছি। তিনি শুনে খুশি হলেন। জিজ্ঞেস করলেন তাঁর সাথে কি হ্যান্ডশেক করেছেন? আমি বললাম, না। তা কী করে সম্ভব! তিনি যে সবসময় সিকিউরিটি পরিবেষ্টিত থাকেন, তাঁর সাথে কিভাবে করমর্দন করব? আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আপনি কি সে সুযোগ পেয়েছেন? হ্যাঁ, গত রমাদানে। তারাবির নামাজ শেষে সরাসরি হাত মেলালাম। তাঁর হাতে সে কী উষ্ণতা, সে কী সফ্টনেস! ও আল্লাহ্! তাহলে আপনি তো বেশ সৌভাগ্যবান।” আমি বললাম।

আমার এ উৎফুল্লতা আর স্থায়ী হলো না। ঐদিন আসরের নামাজের পর হতে নবীজির শহর পবিত্র মদিনাতুল মুনাওয়ার্য়া যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আর একটিবারের জন্যও তাঁকে দেখিনি, তাঁর পেছনে নামাজ পড়ারও সুযোগ হয়নি। নতুন আরও অন্তত তিনজন ইমাম অদল-বদল করে হারাম শরীফে নামাজ পড়িয়েছেন। তাঁরাও মান্যবর; জগদ্বিখ্যাত ক্বারী, আলেম, ইমাম। কিন্তু প্রথম শ্রবণ ও দর্শনে যে ইমাম আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা ও হৃদয়-মন কেড়ে নিয়েছেন তাঁকে আর দ্বিতীয়বারের জন্য পেলাম না। পরে বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পেরেছি, পবিত্র হজ ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে তিনি ছুটিতে গিয়েছেন।

শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইসির বড় পরিচয় তিনি পবিত্র কা’বা শরীফের প্রধান খতিব ও ইমাম। তাঁর অন্য একটি পরিচয় অনেকে জানেন না। তিনি মক্কায় প্রতিষ্ঠিত সুপ্রসিদ্ধ প্রাচীন বিদ্যায়তন উম্মুল কোরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সুযোগ্য প্রফেসর। কুরআনিক সায়েন্সে পিএইচডিধারী নামকরা ডক্টর। তিনি হাফেজ ও ক্বারী। কুরআন গবেষক ও তাফসিরকারক। তাঁর কণ্ঠনিঃসৃত পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের অডিও, ভিডিও ক্যাসেট পৃথিবীর সর্বত্র পাওয়া যায়। শুধুমাত্র হজের মৌসুমে তাঁর তিলাওয়াতকৃত সিডি, ভিসিডি ১০-১৫ লক্ষ পিস হাজীগণ ক্রয় করেন।

পবিত্র রমযানে কাবা শরীফে তিনি খতমে তারাবির অন্যতম প্রধান ইমাম। এ সময়ও লক্ষ লক্ষ সিডি, ভিসিডি বিক্রি হয়। যাদের ঘরে স্যাটেলাইট টিভি সংযোগ আছে তারা তো ঘরে বসেই সবসময় তাঁকে দেখতে পান। তাঁর মুখে ঐশী কুরআন শুনতে পান।

বাংলাদেশে পবিত্র কাবা শরীফের অন্তত তিনজন ইমাম এসেছেন। বাংলাদেশ সফরকালে ১৯৮৫ সালে এই চট্টগ্রামে, বায়তুশ শরফ মসজিদ কমপ্লেক্সে এসেছিলেন কা’বা শরীফের প্রাক্তন ইমাম আশ শায়খ আবদুল্লাহ্ আল সুবাইল।

আশা করি সরকারি বা বেসরকারি কোন সংস্থার আমন্ত্রণে কাবা শরীফের মহামান্য ইমাম ও খতিব; বর্তমানে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুর রহমান আস-সুদাইসি একদিন এদেশে আগমন করবেন। সে দিনের অপেক্ষায় বুক বেঁধে রইলাম।

লেখক : সম্পাদক, মাসিক দ্বীন দুনিয়া 

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির