শিক্ষাব্যবস্থায় সেক্যুলারিজম ও ঐতিহ্যবাহী মক্তব -তাহমিদ আহমদ

শুভ্র-শান্ত সকাল। ছোট্ট সোনামণিরা দলবেঁধে ছুটছে মক্তবের দিকে। কায়দা-আমপারা বুকে জড়ানো। আহা, কি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। এখন কি এই দৃশ্য আপনার চোখে তেমন একটা ধরা পড়ে? উত্তর যদি না হয়, তাহলে আপনার জন্যই আমার লেখা।
মুসলিম সুলতানি যুগ থেকে মোগল আমল পর্যন্ত দীর্ঘ ৮০০ বছর মুসলিমদের প্রধান শিক্ষাব্যবস্থা ছিল ধর্মীয় শিক্ষা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় চালু হয় হাজার হাজার মক্তব। কিন্তু জলদস্যুজাত ইংরেজদের শাসন আমলে অন্তত সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের উপমহাদেশ থেকে ছলেবলে কৌশলে মক্তব প্রথা বন্ধ করার চূড়ান্ত চেষ্টা চালানো হয়। এতে তারা সফলও হয়। তারা তদস্থলে চালু করে তথাকথিত পশ্চিমা শিক্ষাপদ্ধতি। ১৮৫৮ সালে প্রথমবারে মতো শুরু হয় মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা। এতে পাস মার্ক কত হবে- এটা নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়। আর তৎকালীন ব্রিটেনে একটি কথা প্রচলিত ছিল যে- The people of Indian subcontinent are half as intellectual and efficient as compared to the British. অর্থাৎ ব্রিটিশদের তুলনায় ভারতীয়দের জ্ঞান হচ্ছে অর্ধেক। ঐ সময় ব্রিটেনে পাস মার্ক ছিল ৬৫। তাই এর অর্ধেক বিবেচনায় আর হিসাবের সুবিধার্থে তখন পাস মার্ক হয় ৩৩। ইংরেজরা চলে গেছে, কিন্তু এই নীতি এখন অবধি চলমান। তারা ঐ সময় এমন একটা শিক্ষা পলিসি ধার করায় যার দ্বারা মানুষ শিক্ষিত হয়ে উঠবে পশ্চিমা ধাঁচে। যারা হবে রক্তে মাংসে ভারতীয়-মুসলিম কিন্তু চিন্তা চেতনায় হবে ইংরেজ। তারা তাদের প্ল্যান বাস্তবায়নে শতভাগ সফল হয়েছে। আমরা এখনো তাদের প্রবর্তিত শিক্ষা পলিসিতেই বড় হচ্ছি। মুসলিম জাতিসত্তার স্বকীয় শিক্ষাপদ্ধতি এখনো আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। এই প্রচেষ্টাতেই বাংলার সবুজ ভূমি রক্তে রঞ্জিত করে শাহাদাতের মর্যাদা অর্জন করেন শহীদ আব্দুল মালেক। আমরাও একই চেষ্টাই করে যাচ্ছি। জানি না শহীদ আব্দুল মালেকের স্বপ্ন আমরা কবে বাস্তবায়ন করতে পারবো!
গোটা শিক্ষাব্যবস্থা যখন আমাদের প্রতিকূলে। গোটা জাতি যখন সেক্যুলার শিক্ষায় দীক্ষিত হচ্ছে, ঠিক তখনও আমরা আশার ভেলায় ভাসছিলাম। আমাদের আশার সেই ছোট্ট তরীটি ছিল সকালের মক্তব। ছোটবেলায় শিশুদের ইসলামের মৌলিক ধারণা দেওয়ার অসাধারণ প্ল্যাটফর্ম এটি। কিন্তু আফসোস হচ্ছে এই মক্তব প্রথাটিও আজ বিলুপ্ত প্রায়। গ্রামেগঞ্জে এখন আর মক্তব তেমন একটা চোখে পড়ে না। এর কিছু কারণও আছে-
যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। গ্রামের যে উস্তাদ মক্তব পরিচালনা করেন তার বেতন-ভাতাসহ যথাযথ সম্মানী দেওয়া হচ্ছে না। তিনি অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে পড়ছেন। তুলনামূলক ভালো চাকরি পেলে তিনি চলে যাচ্ছেন। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবের দরুন মক্তবগুলোর কাঠামো দিনদিন নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে। উস্তাদদের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে শিক্ষকবৃন্দ ছাত্রদের মনমগজে আকর্ষণীয় পন্থায় ইসলাম এর প্রাথমিক ধারণা দিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যা মানুষের কাছে মক্তবের ইমেজ নষ্ট করছে। এই সমস্যাগুলোকে মোটা দাগে চিহ্নিত করে মুসলমানদের উচিত মক্তবগুলো জাগিয়ে তুলতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আধুনিক ও ইসলামী শিক্ষা এই দুটোর মধ্যে শ্রেণিবিভাজন করে আমরা ভুল করছি না তো? আমরা যখন আধুনিক শিক্ষাকে আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাবি, তখন এটা বুঝায় যে ইসলামী শিক্ষার মধ্যে আধুনিকতা নেই। এটা সেকেলের। এখানে বিজ্ঞান নেই, প্রযুক্তি নেই, যুগ-জিজ্ঞাসার যথার্থ জবাব নেই। আসলেই কি তাই? ইসলাম কি গতানুগতিক অন্যান্য ধর্মের ন্যায় শুধুই একটা ধর্ম?
আমরা ইসলামের পরিধিকে ছোট করে ফেলেছি। যেন একটা বৃত্তে আবদ্ধ করেছি। কিন্তু আসলে ইসলাম হচ্ছে পরিপূর্ণ একটি জীবনপদ্ধতি। এর ব্যাপ্তি বিশাল।
কোনো এক অখ্যাত গ্রামের জীর্ণ কুটিরে বসবাসরত একজন বৃদ্ধের জীবনপ্রণালি কিভাবে পরিচালিত হবে তা যেমন ইসলাম বলে দিয়েছে, সেভাবে হোয়াইট হাউজে বাসরত অন্য একজন মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ সমস্ত সমস্যার সমাধানও ইসলাম বলেছে। ইসলামের পরিধি বিশাল। কিন্তু আমরা এভাবে পার্থক্য তৈরি করে ইসলামের ব্যাপ্তিকে একটা গণ্ডিতে আবদ্ধ করে ফেলেছি। পৃথিবী বিখ্যাত সবচেয়ে পুরনো কারউইন বিশ্ববিদ্যালয় তো মুসলিমরাই প্রতিষ্ঠা করেছিল। আধুনিক সভ্যতার গোড়াপত্তনের মূল শেকড় হচ্ছে ইসলাম। খলিফা আল মামুনের হাউজ অব উইজডম তো ছিল জ্ঞান চর্চার প্রধান কেন্দ্র। তারপর মূর্খ জাতি মোঙ্গলদের সেই দুর্বিষহ লুটপাট। তিলে তিলে গড়ে তোলা সেই জ্ঞান চর্চার সার নির্যাসগুলোকে টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়ার কি করুণ ইতিহাস। এরপরও মুসলিম জ্ঞানসাধকদের কিছু গঠনমূলককর্ম আজো জীবন্ত হয়ে আছে।
সেই বিপ্লবী মর্দে মুজাহিদরা ইসলামকে দুনিয়াতে প্রস্ফুটিত করতে রুদ্ধশ্বাসে ছুটে বেড়িয়েছেন। উকবা বিন নাফি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ্, যদি সাগরের পানি আমার সামনে এসে না পড়তো, তাহলে আমি আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের মতো বিজয় যাত্রা নিয়ে ওপারেও পৌঁছে যেতাম।’ আর আমরা নাকি আজ মোটা দাগে মুসলিম পরিচয় দিয়েও ইসলামকে ধারণ করছি খুব সঙ্কুচিত ভাবে।
আমি ভাবছি গ্রাম-বাংলার সেই ছোট্টবেলার মক্তবের কথা, যার সুর বা আওয়াজ যাই বলি তা এখনো কানে বাজে। আজ কত বছর হয়ে গেল, এমন সুর শুনি না। যুগ যুগ ধরে চলে আসা তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামী বিশ্বাস আর দর্শন শিক্ষাকেন্দ্রগুলো আজ কোথায় হারিয়ে গেল? টিউটরের যুগ চলছে, কিন্তু এটাই কি সমাধান! শহুরে সন্তানদের জন্য টিউটর রেখে হয়তো আলালের ঘরের দুলালরা কিছু দীক্ষা পেলেও পেতে পারে, কিন্তু গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সন্তান তো সেই মূর্খই থেকে যাবে। ইসলামকে মৌলিক হিসেবে ধরে এদেশের শিক্ষাব্যবস্থা হওয়ার কথা। যেখানে দনী ও গরিবের সন্তানরা কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করবে এক বেঞ্চে বসে। কিন্তু আজ কত ব্যবধান আমাদের বিশ্বাস আর কর্মের মধ্যে। আমরা বিশ্বাস হিসেবে ইসলামকে ধারণ করছি কিন্তু বাস্তব কর্মে এসে ইসলামের ধারে-কাছেও ঘেঁষছি না। কী দ্বিমুখী নীতি আমাদের! তথাকথিত এই হ য ব র ল শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা আগামীর প্রজন্ম কিভাবে বিপ্লবী হবে? আর কিভাবেই তারা আগামীর সভ্যতা গড়ে তুলবে?
মক্তব পুনরুজ্জীবিত করার একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। তাহলে, অন্তত কিছু মানুষের বিশ্বাসগুলোকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারবো!
লেখক : শিক্ষার্থী, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ

SHARE

Leave a Reply